গৌতম দাশ

শুধু নকুলের নিজের গাঁ হরিপুরেই নয়, আশপাশের আরও পাঁচখানা গাঁয়ে সেই প্রায় অবিশ্বাস্য খবরটা দাবানলের মতো দ্রুত ছড়িয়ে গেল। নকুল নাকি তার কাজকারবার ছেড়ে দিয়েছে। সকাল বেলা সতীশের চায়ের দোকানে কথাটা শুনে নন্দ ঘোষাল বেশ গম্ভীরভাবে বললেন, ‘কথাটা হঠাৎ শুনলে আশ্চর্য লাগে বটে কিন্তু ভেবে দেখলে এর মধ্যে অবাক হওয়ার মতো তেমন কিছুই নেই। এ দেশে এরকম ব্যাপার আগেও ঘটেছে। শুনেছ বোধ হয়, দস্যু রত্নাকর রামনাম করতে করতে মহাকবি বাল্মীকি হয়ে গিয়েছিলেন। খোঁজ নিয়ে দ্যাখো, নকুলও হয়তো রামনাম জপ করতে করতেই সাধু হয়ে গেল, চুরিচামারি করা ছেড়ে দিল। এরপর ভবিষ্যতে নকুল যদি পদ্য-টদ্যও লিখে ফেলে তা হলে আমি মোটেই অবাক হব না। এই ঘোর কলিকালেও রামনামের মাহাত্ম্য দেখেছ তো সতীশ? তোমার আজকের চায়ের পয়সাটা কিন্তু বাকি থাকবে।’
সতীশ চায়ের পয়সা বাকির কথায় একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘নকুল কাজকম্ম ছেড়ে ঘরে বসে বসে রামনাম জপ করত, এ কথা তো কখনো শুনিনি ঘোষালমশাই।’
নন্দ ঘোষাল চায়ের গেলাসে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আহা, সব কথা কি আর সবসময়ে কানে আসে? তা ছাড়া রামচন্দ্রের তো আরও তিনজন ভাই ছিল রে বাপু। তাঁরাও কম কেওকেটা নন। তাঁদের যে কোনো একজনের নাম জপ করলেও চুরি-ডাকাতির মতো ছোটখাটো বদভ্যাস মানুষের শরীর ছেড়ে বাপ বাপ করে পালায়। একটু সময় করে রামায়ণখানা একবার পড়ে নিও সতীশ। সেখানেই সবকথা পরিষ্কার করে লেখা আছে।’
এলাকার পয়সাকড়িওয়ালা কিছু মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। যাক বাবা, খবরটা সত্যি হলে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোনো যাবে। অবিশ্যি যাদের সন্দেহবাতিক আছে, তারা ভুরু কুঁচকে বসে রইল। উড়ো খবর কি চট করে বিশ্বাস করতে আছে? শেষে ভরাডুবি হোক আর কী!
দুপুর বেলা গোপাল কনস্টেবলের কাছে কথাটা শুনে দারোগা হীরেন মল্লিক তাঁর কাঁচাপাকা তাগড়াই গোঁফে হাত বুলিয়ে মুচকি হেসে মন্তব্য করলেন, ‘ব্যাটা মিচকে শয়তান, নিশ্চয়ই ভেতরে ভেতরে অন্য কোনো কুমতলব এঁটেছে। ভেবেছে, এইসব খবর ছড়িয়ে আমার চোখে ধুলো দিয়ে দাঁও মারবে। সেটা কি অত সোজা? ওরে, মল্লিক দারোগার নামে এখনও টাইগার অ্যাণ্ড কাউ একঘাটে জল খায়। তোরা তো নিতান্তই শিশু। ইচ্ছে করলে কি আর আজই ব্যাটার পেট থেকে আসল মতলবটা টেনে বের করে ঘোল খাওয়াতে পারি না? কিন্তু বুঝলে গোপাল, ইদানীং আমার শরীরে মায়া দয়ার পরিমাণ হঠাৎ এত বেড়ে গেছে যে মানুষকে কষ্ট দেওয়ার কথা ভাবলেই চোখে জল এসে যায়। এরপর কী করে যে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করব কে জানে? মাঝে মাঝে বড়ো দুশ্চিন্তা হয়।
দারোগাবাবুর কথাগুলো শুনতে শুনতে গোপাল কনস্টেবল ঝাড়া দশমিনিট এক নাগাড়ে, সায় দেওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে গেল। সেটাই নিয়ম।
খবরটা শুনে দুঃখ পাওয়ার লোকেরও অভাব নেই। যেমন বেজিখালির কানাই আর সুবল সেদিন রসুল্লপুরের হাটে শুকনো মুখে ঘুরে বেড়ানো নকুলের হাত ধরে মেছোহাটার পাশের বটতলায় টেনে নিয়ে গেল। সুবল কাঁধের গামছাখানা যত্ন করে পেতে তার ওপর নকুলকে বসাল। নিজেরা দু-জন সামনে ধুলোর ওপর ধপ করে বসে পড়ল। তারপর কানাই উদবিগ্ন গলায় বলল, ‘আজ দেখা না হলে কাল আমি তোমার বাড়িতে যেতাম। এসব কী সব্বোনেশে কথা শুনছি গো নকুলদা? তুমি নাকি তোমার তিনপুরুষের পেশা ছেড়ে দিয়েছ? কথাটা শুনে পর্যন্ত আমার তো গলা দিয়ে ভাত নামছে না। ধরো, তোমাদের কাছে শেখা বিদ্যে নিয়েই আমরা করে খাচ্ছি। আর তুমিই কিনা—ছি ছি, বাবা-ঠাকুরদাদার সুনাম ডুবিয়ে তাঁদের মুখে কি চুনকালি লেপে দিতে চাও নকুলদা?
তোমার ঠাকুরদাদাকে আমি দেখিনি বটে কিন্তু শুনেছি ভবানী ডাকাতের নামে এখানকার দারোগা-পুলিশ পর্যন্ত থরহরি কাঁপত। তোমার বাবা সাধু হাজরা ডাকাতির লাইনে গেলেন না কিন্তু দেখিয়ে দিলেন চুরিবিদ্যেকেও শিল্প করে তোলা যায়। তাঁর নামে এখনও এই অঞ্চলের সমস্ত চোর নাক-কান মলে কপালে হাত ঠেকায়। আর তোমারই কি কম হাতযশ? লোকে বলে, তুমি নাকি তা দেওয়া পাখির পেটের নীচ থেকে ডিম সরিয়ে নিয়ে এলেও পাখি টের পায় না। তা সে-কথাটা তো আর মিথ্যে নয়। তোমার মতো ওস্তাদের এমন মতিচ্ছন্ন হল কেমন করে নকুলদা?’
নকুল ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিমর্ষগলায় বলল, ‘লজ্জায় রে কানাই? আমার আর মুখ তুলে কথা বলার উপায় নেই। মরমে মরে আছি রে ভাই।’
কানাই সহানুভূতির গলায় বলল, ‘কথাটা ভেঙে বলো দেখি নকুলদা, কী এমন ঘটল যে তুমি হঠাৎ বিবাগী হয়ে গেলে? তোমার লজ্জা মানে আমাদেরও লজ্জা। তা সেই লজ্জায় মুখ লুকিয়ে বসে থাকলে চলবে? ব্যাপারটা নিয়ে একটু যুক্তি-পরামর্শ করে দেখা যেতে পারে। সব রোগেরই তো ওষুধ আছে।’
নকুল একটু চিন্তা করে বলল, ‘কথাটা নেহাত মন্দ বলিসনি। তা হলে বিত্তান্তটা শোন। আসল কারণটা এখনও কাউকে বলিনি। কাউকে বলতে পারলেও একটু হালকা হওয়া যায়। আমাদের হরিপুরের একেবারে দক্ষিণে বাদল দস্তিদারের বাড়ি আছে জানিস তো? বাদলরা শহরে চলে গেছে বলে অনেককাল ধরেই বাড়িটা তালাবন্ধ হয়ে পড়ে আছে। মাসখানেক আগে ওই বাড়িতে একজন ভাড়াটে এল। একটা লোক আর তার একজন গাঁট্টাগোট্টা চাকর। সঙ্গে আর কেউ নেই। লোকটার নাম বোধ হয় মনীশবাবু। তা মনীশবাবু পাড়ায় বাস করতে এল কিন্তু পাড়ার কারও সঙ্গে মিশতে চাইত না। পাড়ার লোকজন একদিন নাকি গিয়েছিল। মনীশবাবু তাদের চা-বিস্কুট খাইয়েছিল বটে তবে তেমন উৎসাহ দেখায়নি বরং কায়দা করে তাড়াতাড়ি ভাগিয়েই দিয়েছিল। ওদের নাকি বলেছিল, কীসব নিয়ে গবেষণা-টবেষণা করে বলে লোকের সঙ্গে বসে বসে গালগল্প করার একেবারে সময় নেই। লোকটা নিজে বাড়ি থেকে বিশেষ বের হয় না। তবে আমার কাছে খবর আছে, আট-দশ দিন অন্তর সেজে-গুজে বেরিয়ে শহরে যায়। ওর চাকরটা রোজ সকালে বাজার-হাট করে।
গত শনিবার রাতে নতুন পাড়ার বিশ্বনাথ সাহার বাড়িতে একটা কাজ করে ফিরছিলাম। আজকাল লোকের বাড়িতে কাঁসা-পিতলের বাসন উঠে গিয়েছে বলে নগদ টাকা আর সোনার গহনা যা পাওয়া যায়, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তবে বিশ্বনাথ সাহার ঘরে নগদ টাকা বিশেষ ছিল না, গয়নাগাঁটিও ব্যাঙ্কের লকারে। অল্প কিছু টাকা আর একটা বিছেহার পেয়েছিলাম।
তখন রাত প্রায় দুটো বাজে। বাদল দস্তিদারের বাড়ির পাশ দিয়ে আসার সময় মনে হল, দেখিই না একবার তল্লাশি করে মনীশবাবুর ঘরে কী আছে। পাঁচখানা গাঁয়ের কার ঘরে কি আছে তার নাড়িনক্ষত্র আমার জানা। শুধু এই ভাড়াটে লোকটার ঘরে কি আছে সেটা এখনও খোঁজ করা হয়নি। যদি সেরকম কিছু পাওয়া যায় হাতিয়ে নিতে দোষ কী!
পাঁচিল ডিঙিয়ে ঢুকে পড়লাম। বাবা-ঠাকুরদাদার আশীর্বাদে যেকোনো বন্ধ দরজাটা জানালা খোলা আমার কাছে নিতান্তই তুচ্ছ ব্যাপার। পেছনে বাগানের দিকে একটা জানলা খুলে শিক বাঁকিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলাম। চারটে ঘর আছে আর একটা রান্নাঘর। তিনটে ঘর তল্লাশি করে একটা ড্রয়ারে শ-দুয়েক টাকা পেলাম। সোনার জিনিস কিছু নেই। মুটকো চাকরটাকেও কোথাও দেখতে পেলাম না। শেষ ঘরটাই ছিল বেডরুম। সব ঘরেই দরজা ভেজানো ছিল। এ ঘরেও তাই। দরজা ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢুকতেই—’
এই পর্যন্ত বলে নকুল চুপ করে গেল।
সুবল উৎসাহের সঙ্গে বলল, ‘কী দেখলে নকুলদা? টাকার বাণ্ডিল?’
কানাই বাধা দিয়ে বলল, ‘দুর, লোকে আজকাল খুব চালাক হয়ে গিয়েছে। টাকার বাণ্ডিল কেউ আর ঘরে রাখে না। এটা হতে পারে, নকুলদা দেখল মালিক আর চাকর নাক ডাকানোর প্রতিযোগিতা লাগিয়েছে। তারপর তো কয়েক মিনিটের মামলা। ওখানে কী পেলে নকুলদা?’
নকুল দু-জনের দিকে একবার তাকিয়ে খুব ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘যা পেলাম, সেটাই এবারে শোন। দরজা ঠেলে ঢুকতেই খুট করে ঘরের লাইট জ্বলে উঠল। হতভম্ব হয়ে দেখলাম, খাটের পাশে একটা চেয়ারে মনীশবাবু হাসিমুখে বসে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে আরও একটু চওড়া করে হেসে মিষ্টিগলায় বলল, ‘‘এসো, ভাই এসো। তোমার নাম তো বোধ হয় নকুল, তাই না? তোমার সুনাম অনেক শুনেছি, চোখে দেখে বড়ো আনন্দ পেলাম। এই প্রথম তুমি এলে, একটু অসময়ে বটে কিন্তু তাও তো কষ্ট করে গরিবের ঘরে এলে। আমার পরমসৌভাগ্য যে রাতদুপুরে ঘুমটুম বাদ দিয়ে আমার এখানে আজ পায়ের ধুলো দিলে। বসো, ওই চেয়ারটায় আরাম করে বসো। হাতের ব্যাগটা সামনের টেবিলের ওপর রাখতে পারো। অনেকক্ষণ ধরেই তোমার আগমনবার্তা টের পাচ্ছিলাম। পেছনের বাগানের দিকের জানালাটা দিয়ে অনেক কেরামতি করে ঢুকলে, ঘরগুলো আঁতিপাঁতি করে খুঁজলে। ও ঘরের ড্রয়ারে কাল সকালের বাজার খরচ বাবদ দুশো টাকা ছিল, সেটা পেয়েছ তো? বেশ বেশ। তারপর খোঁজাখুঁজি করতে করতে এই ঘরে এসে শেষপর্যন্ত আমাকে পেলে। আসলে আমাকেই তো খুঁজছিলে, তাই না? আহা, দেখলেও ভালো লাগে। ওরে বাঁটুল, একটু দেখা দে বাবা। নকুলবাবুকে একটু মিষ্টিমুখ না করালে কি গেরস্তের মান থাকে?’’ ’
নকুল থেমে গেল।
সুবল হাঁ করে শুনছিল। ফাঁক পেয়ে বলে উঠল, ‘ওরে বাবা, তোমার তো বেইজ্জতির একশেষ! তারপর?’
নকুল উদাস গলায় বলল, ‘তারপর মিনিট দুয়েকের মধ্যেই বাঁটুল একটা প্লেটে করে চারটে রসগোল্লা আর একগ্লাস জল এনে টেবিলে রাখল।’
সুবল চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞাসা করল, ‘সেগুলো তুমি খেলে?’
নকুল তেতো গলায় জবাব দিল, ‘না খেয়ে উপায় কী? পেছনে পালাবার পথ বন্ধ। দরজা জুড়ে বাঁটুল পাহারায়। তবু ইতস্তত করছি দেখে মনীশবাবু খুব মোলায়েম স্বরে বলল, ‘‘খেতে ইচ্ছে করছে না বুঝি নকুল? ইচ্ছের আর দোষ কী বলো? অনেক সময় গভীর রাতে মিষ্টি দেখলে কারও কারও গা গুলোয়। তবু বাঁটুল যখন এনেছে, একটু কষ্ট করে খেয়ে নেওয়াই ভালো। ও আবার একটু রগচটা মানুষ, যদি অপমান বোধ করে চড়চাপড় কষিয়ে দেয়, সে ধাক্কা বোধ হয় তুমি সামলাতে পারবে না।’’ ’
সুতরাং বাধ্য হয়ে রসগোল্লাগুলো গিলতে হল। জলটাও। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘এবার তা হলে যাই? মনীশবাবু একগাল হেসে বলল, ‘‘যাই’’ নয়, বলতে হয় ‘‘আসি’’। ঠিক আছে, আজ এস ভাই। দুগগা দুগগা। কিন্তু আর কখনো এমন অসময়ে না আসাই ভালো। কেমন? এতে গেরস্তেরও অসুবিধা, তোমারও অস্বস্তি। খাতির যত্নও তেমন করে ওঠা গেল না। নিজেরও লজ্জা লাগে। ও, আরেকটা কথা—তোমার কাছে একটা ছোট্ট আবদার আছে। পেছনের জানলাটার তো বারোটা বাজিয়ে দিয়েছ। ওটার মেরামতি বাবদ কিছু খরচ আছে। সেটুকু তোমাকেই দিতে হবে বাপু। আমি গরিব মানুষ, খরচখরচা কোথায় পাব? তুমি যেন কিছু মনে কোরো না। ওরে বাঁটুল, দ্যাখ তো নকুলের ব্যাগে কিছু আছে কি না! আমাদের দুশো টাকাটাও নিয়ে নিস।’
সুতরাং বিশ্বনাথ সাহার বাড়ির থেকে আনা টাকাগুলো আর বিছেহারটাও ওরা হাতিয়ে নিল। রাত ফুরিয়ে খালি হাতে সাধু হাজরার ব্যাটা নকুল হাজরা ঘরে ফিরে এল। এরপরেও তোরা আমাকে কাজ কারবার চালু রাখতে বলিস? আমি ঠিক করে ফেলেছি, বাজারে একটা চায়ের দোকান দেব।
কানাই চিন্তিত গলায় বলল, ‘মানতেই হবে, লোকটা তোমায় জব্বর অপমান করেছে। কিন্তু একটা কথা কি ভেবে দেখেছ নকুলদা? প্রথমত, লোকটা অতিমাত্রায় সতর্ক, সম্ভবত রাতে ঘুমোয় না। কেন? নিশ্চয়ই সতর্ক থাকার কোনো কারণ আছে। দ্বিতীয়ত, তোমাকে বাগে পেয়ে হয় পাড়ার লোকের হাতে নইলে থানায় ধরিয়ে দেওয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সেটা না করে লোকটা এমন আচরণ করল, যাতে তুমি লজ্জায় আর কোনো দিন ওর বাড়িতে না যাও, অথচ লোক জানাজানিও না হয়। ওর ব্যাপারে পাড়ার লোকের কৌতূহল জেগে উঠুক এটা ও চায় না। কেন? এই কারণগুলো আমাদের জানা দরকার। তবে যে লোকগুলো রাতে ঘুমোয় না, তারা নিশ্চয়ই দুপুরে ঘুমোয়। আমাকে ও চেনে না। কাল দুপুরে আমি একবার ভিখারি সেজে ওর বাড়িতে ঢুকব। তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে থেকো, আমি যদি দেখি পরিস্থিতি অনুকূল, তোমাকে ডেকে নেব।’
কানাইয়ের আন্দাজ মতো দুপুর বেলা মনীশবাবু আর বাঁটুল দু-জনেই অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। ঘর তল্লাশি করতে গিয়ে কানাই আর নকুল দু-জনেরই চক্ষু চড়কগাছ। শোওয়ার ঘরের আলমারির মাথায় একটা ছেঁড়া চটের থলে খুলতেই—

ওরে বাঁটুল,দ্যাখ তো নকুলের ব্যাগে কিছু আছে কিনা ! আমাদের দুশো টাকাটাও নিয়ে নিস।
একঘণ্টা বাদে গাঁয়ের বকুলতলায় দুজনেই গামছা বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। তার আগে ইস্কুলের টিউবওয়েল থেকে জল নিয়ে মাথায় ঢেলেছে। দু-জনের মাথা কোনো কাজ করছে না। নকুল প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, ‘কত টাকা ওখানে আছে কে জানে? সব হাজার আর পাঁচশো টাকার নোটের বাণ্ডিল। ওরে বাবা, মাথাটা বড্ড ঝিমঝিম করছে রে কানাই, শরীরেও মোটেই বল পাচ্ছি না।’
ইতিমধ্যেই কানাই নিজেকে মোটামুটি সামলে নিয়েছে। ধড়মড় করে উঠে বসে বলল, ‘কিন্তু নকুলদা, আমার মনে হয় ওগুলো একটাও আসল টাকা নয়। তুমি ভেবে দ্যাখো যদি ওগুলো আসল টাকা হত তা হলে কি ব্যাঙ্কে না রেখে লোকটা ঘরে চটের থলের মধ্যে রাখত? আজকাল লোকে ঘরে এক হাজার টাকাই রাখতে ভরসা পায় না, আর ও লক্ষ লক্ষ টাকা ঘরে রাখবে? নির্ঘাত ওগুলো সব জাল টাকা। ওই লোকটা কিছুদিন অন্তর শহরে গিয়ে জাল টাকা এনে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে দেয়।’
নকুল উঠে বসে ফিসফিস করে বলল, ‘তাহলে কি হীরেন দারোগাকে খবর দেওয়া হবে?’
কানাই মাথা নেড়ে বলল, ‘না, হীরেন দারোগা নয়। ও খুব মাথামোটা লোক। সাজগোজ করে আসতে আসতে লোক জানাজানি হয়ে পাখি উড়ে যাবে। উঠে পড়ো, চলো তুমি আর আমি এক্ষুনি সদরে চলে যাই। খবরটা ওখানে দিলে হয়তো কাজটা তাড়াতাড়ি হবে।’
দু-দিন পরে রসুল্লপুরের হাটে সমস্ত হাটুরের মুখে একটা কথাই ঘুরছিল। হরিপুরের নকুল আর বেজিখালির কানাই মিলে একজন জালটাকার কারবারিকে লক্ষ লক্ষ জালটাকা সমেত ধরিয়ে দিয়েছে। তা ছাড়া তার সঙ্গে একটা খুনি-ডাকাতও নাকি থাকত, সে-ও ধরা পড়েছে। সরকার থেকে ওদের দু-জনকে নাকি পুরস্কার দেওয়া হবে। পুরস্কারের অঙ্কটা নিয়ে অবিশ্যি মতভেদ ছিল। কেউ বলছিল তিরিশ, কেউ পঁচিশ, কারও মতে বিশ কিন্তু দশ হাজারের নীচে কাউকে বলতে শোনা যায়নি। তবে সবাই খুব খুশি হয়েই কথাগুলো আলোচনা করছিল।
শুধু ক্ষুণ্ণ হলেন দারোগা। গোঁফে হাত বুলিয়ে দুঃখিত গলায় বললেন, ‘ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার তো কোনো দরকার ছিল না রে বাপু। আমাকে একবার কাকপক্ষীর মুখে খবরটা পাঠাতে পারতিস। তারপর দেখতিস, অ্যাকশান কাকে বলে। ওরে পাগলা, মল্লিক দারোগার নামে এখনও টাইগার অ্যাণ্ড কাউ একঘাটে জল খায়। যাক গে, মানুষ মাত্রই ভুল হয়। তবে গোপাল, আমি তোমাকে সেদিনই বলেছিলাম, আমাদের নকুল যখন চুরিচামারি ছেড়ে দিল, তখন একদিন ও দেশ এবং দশের মঙ্গলের জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিয়ে দেবে। বলিনি এ কথা?’
গোপাল কনস্টেবল যথারীতি ঘাড় নেড়ে সায় দিল।
মাসদুয়েকের মধ্যেই বাজারে নকুল আর কানাই মিলে একটা পাঁচমিশেলি জিনিসের দোকান খুলল। লোকে বলে আর ওরাও স্বীকার করে যে, সরকারি পুরস্কারের টাকাতেই দু-জনে দোকানটা খুলেছে। চুরি করা দু-জনেই ছেড়ে দিয়েছে। কানাইয়ের শাগরেদ সুবল কাঁচামালের ব্যাবসা করে আর অবসর সময়ে দোকানে এসে গল্পগুজব করে। ওদের দোকানটা দিব্যি চলছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন