গৌতম দাশ

লঞ্চে গঙ্গা পার হওয়ার সময় চোখে পড়ল পশ্চিম আকাশ অস্তগামী সূর্যের রক্তিম ছ-টায় রক্তাভ হয়ে উঠেছে। তার প্রতিফলনে গঙ্গার জলও হয়ে উঠেছে বর্ণময়। মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন অংশুমানবাবু। অদ্ভুত ভালো লাগছিল তাঁর। একটা কঠিন অঙ্ক মিলে গেলে যতখানি ভালো লাগে, ততখানিই কিংবা হয়তো তার চেয়েও বেশি।
কোনোরকমে সাইলেকটা গ্যারেজে জমা দিয়ে নবীনমাস্টার যথাসম্ভব দ্রুত পা চালালেন। মনে ক্ষীণ আশা, যদি ট্রেনটা লেট থাকে। কিন্তু মোড় ঘুরেই দেখলেন, প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা। অর্থাৎ ট্রেন বেরিয়ে গেছে। পরের ট্রেন আসবে চল্লিশ মিনিট বাদে। আর তাড়াহুড়ো করে কোনো লাভ নেই। চলার গতি ঢিমে হয়ে গেল।
স্কুলের কাজে তাঁকে কলকাতায় যেতে হচ্ছে। অনেকগুলো বই, কিছু অন্যান্য জিনিসপত্র কেনাকাটা আছে। ইচ্ছে না থাকলেও দায়িত্বটা শেষপর্যন্ত তাঁর ঘাড়ে এসে চাপল। হেডমাস্টারমশাই গতকাল তাঁকে একপাশে ডেকে গোপন কথা বলার মতো ফিসফিস গলায় বললেন, ‘আপনি ছাড়া দায়িত্বশীল লোক এই স্কুলে আর কে আছে বলুন? এতগুলো টাকা আর কারও হাতে দিয়ে পাঠাতে যে ভরসা হয় না। আপনি দায়িত্ব নিলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।’
সুতরাং না গিয়ে উপায় নেই। এই ট্রেনটা ধরতে পারলে ভালো হত। বাড়ি থেকে বেরোতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল বটে কিন্তু তার জন্য ট্রেন ফেল হত না। একটু জোরে সাইকেল চালালেই ঠিক সময়ে পৌঁছে যাওয়া যেত। নবীনমাস্টার সেই চেষ্টাই করছিলেন। রাস্তায় বিপত্তি ঘটে গেল।
একটু এগিয়ে গোরাচাঁদতলার হাট পড়ে। আজ হাটবার। ইতিমধ্যেই হাটতলি ছাপিয়ে বিকিকিনির ঢল রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এর মধ্যে দিয়েই দমকলের গাড়ির মতো লাগাতার ঘণ্টি বাজাতে বাজাতে যথাসাধ্য দ্রুতবেগে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ নবীনমাস্টার দেখলেন, রাস্তার প্রায় আধখানা জুড়ে একটা আলুর বস্তা বোঝাই লরি আর তার পাশে ভয়ংকর চেহারার একটা কালো রঙের ষাঁড় দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার অন্যপাশে রয়েছে জটাপাগলা। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে প্রায়ই ওকে ঘুরতে দেখেছেন। এই অঞ্চলেই ওর আস্তানা। শোনা যায়, লোকটা আগে নাকি অঙ্কের মাস্টার ছিল। মারকুটে না হলেও পাগল এবং ষাঁড় এই দুই শ্রেণিকেই মনে মনে বেজায় ভয় করেন নবীনমাস্টার।
নামবেন, না ঝুঁকি নিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাবেন সেটা ঠিক করার আগেই প্রায় ষাঁড়ের গায়ের কাছে পৌঁছে গেলেন। সম্ভবত ঘণ্টির শব্দে বিরক্ত হয়ে ষাঁড়টা একবার জোরে মাথা নাড়িয়ে আপত্তি জানাল। নবীনমাস্টারের হাত কেঁপে গেল। পরমুহূর্তেই টলমল করতে করতে সাইকেল সমেত ধরাশায়ী হলেন। বিপদের মুখোমুখি হলে বারবার যেমন হয়, আজও তাই হল—নবীনমাস্টারের চোখ বুজে গেল। কান খোলা ছিল বলে অনেক লোকের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলেন। প্রতিমুহূর্তেই মনে হতে লাগল, এক্ষুনি ষাঁড়ের একজোড়া শিং অথবা দু-জোড়া খুর তাঁকে নিয়ে বিচ্ছিরিভাবে ছিনিমিনি খেলবে। খুব খেপে থাকলে ষাঁড়টা একসঙ্গে শিং এবং খুর দুটোই ব্যবহার করতে পারে। তাহলে অবিশ্যি ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি মিটে যাবে।
হঠাৎ একজন কেউ তার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করিয়ে দিল। নবীনমাস্টার চমকে গিয়ে চোখ খুললেন। দেখলেন, ষাঁড়টা হেলেদুলে চলে যাচ্ছে আর জটাপাগলা বজ্রমুষ্টিতে তাঁর হাত ধরে আছে। নবীনমাস্টারের গলা শুকিয়ে গেল। বুকের মধ্যে ধড়ফড় করতে লাগল। ভেতরে ভেতরে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল।
শুনতে পেলেন, জটাপাগলা বেশ ক্রুদ্ধস্বরে বলছে,—সকাল থেকে একটা সহজ যোগ অঙ্ক কিছুতেই মিলছে না। বলো তো, এক লক্ষ সাতষট্টি হাজার পাঁচশো একুশের সঙ্গে বিরানব্বই হাজার আটশো উননব্বই যোগ করলে কত হয়? বেশি সময় দিতে পারব না, চটপট বলো।
নবীনমাস্টারের সব কিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল। প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলে ফেললেন, ‘ওরে বাবা, বিশ্বাস করুন স্যার, অঙ্কে আমি ভীষণ কাঁচা। স্কুলে আমি...বাংগোল পড়াই।’
নিজেই বুঝলেন, আতঙ্কে বাংলা আর ভূগোল মিলেমিশে বাংগোল হয়ে গেল। কিন্তু তাতেই জটাপাগলার হাত থেকে নিস্তার পেলেন। লোকটা হাত ছেড়ে দিয়ে বিরক্তস্বরে ‘ধুস’ বলে অন্যদিকে চলে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হাটের লোকজন এসে তাঁর গায়ের ধুলোবালি ঝেড়ে দিল। সাইকেলটা তুলে হাতে ধরিয়ে দিল। সবকিছু সামলে নিয়ে স্টেশনে পৌঁছোতে বিস্তার সময় লেগে গেল। ট্রেন কি আর এতক্ষণ অপেক্ষা করে।
কাউন্টার থেকে একখানা শিয়ালদার রিটার্ন টিকিট কিনে নবীনমাস্টার ওয়েটিং রুমে গিয়ে ঢুকলেন। ঘরটা প্রায় ফাঁকা। তিনি এককোণে গিয়ে বেঞ্চে বসলেন। সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনাটা মনে পড়ে গেল। শিউরে উঠলেন। উঃ, আজ জব্বর একটা ফাঁড়া গেল বটে! ভালোয় ভালোয় সংকট কাটানো গেছে এই ঢের। তবে এসব কথা বেশি না ভাবাই ভালো। ব্লাড প্রেশার চড়চড় করে বেড়ে যায়।
এই ভাবনা তাড়ানোর জন্য নবীনমাস্টার তাঁর সদ্যরচিত কবিতাটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন। ওটার শেষদিকটা নিয়ে একটু খুতঁখুঁতুনি রয়েছে। অন্তত শেষ চারটে লাইন পালটে দিতে পারলে কবিতাটা বেশ জমজমাট হয়। তিনি মনে মনে সেই ধরা না দেওয়া অংশটা খুঁজতে শুরু করলেন। চোখ বন্ধ হয়ে গেল। গভীরভাবে কিছু ভাবতে গেলেও তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে যায়।
অবসর সময়ে নবীনমাস্টার কবিতা লিখে থাকেন। এ পর্যন্ত অনেকগুলো লেখা হয়েছে। বেশ কিছু কবিতা বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠিয়েছেন কিন্তু কেউ ছাপেনি। তাতে নবীনমাস্টার আশ্চর্য হননি, হতাশও হননি। বড়ো বড়ো প্রতিভার ক্ষেত্রে অনেকসময় এইরকমই হয়। সমকালীন যুগ তাঁদের প্রতিভার মূল্যায়ন করতে পারে না। জগতে এমন দৃষ্টান্ত ভূরি ভূরি আছে। তিনি লেখেন ভবিষ্যৎকালের জন্য। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, একদিন বিস্তর লোক এই কবিতাগুলোর জন্য পাগল হবে। ভাবীকালের পাঠক-পাঠিকাদের জন্যই তিনি কবিতার পর কবিতা লিখে চলেছেন।
ভাবতে ভাবতে একটু ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। সেটা ভাঙল একটা প্রচন্ড ধমক শুনে। চমকে তাকিয়ে দেখলেন, ইতিমধ্যে ঘরে ভিড় জমেছে। কাল পর্যন্ত এখানকার বুড়োশিবতলায় একটা মেলা চলছিল। এরা বেশির ভাগই সেই মেলাফেরত লোক। সঙ্গে পোঁটলাপুঁটলি, নানা টুকিটাকি জিনিসপত্র রয়েছে।
তাঁর সামনের বেঞ্চে একজন মাঝবয়সি নধরকান্তি বাবরি চুলো লোক বসে আছেন। কপালে চন্দনের ফোঁটা। পরনে ধবধবে সাদা ধুতি আর হাফহাতা গেরুয়া পাঞ্জাবি। তাঁর পাশে একজন অপেক্ষাকৃত কমবয়সি তালপাতার সেপাই ধরনের রোগা লোক। চোখ পাকিয়ে চিৎকার সে-ই করছে। সামনে একজন ভালোমানুষ গোছের লোক কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
‘বাবাকে টাকার গরম দেখাচ্ছ? তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়। বারবার বলা হচ্ছে, টাকা দিতে হবে না—কথাটা কি কানে যায় না?’
বাবাজি একটা হাত তুলে নরম গলায় বললেন, ‘আহা, থাক গণেশ আর বকাঝকা কোরো না। ও বেচারি অবোধ, তাই বলে তুমি কেন মাথা গরম করে ফেলবে? ওহে বাপু, তুমি যাও, ওই টাকাটা দিয়ে কোনো মন্দিরে পুজো দিয়ে দিও। তাহলেই হবে। আর গণেশ, তোমাকেও বলি, তুমি এইরকম হঠাৎ হঠাৎ চিৎকার কোরো না। দ্যাখো তো, এই ভদ্রলোক নিবিষ্টমনে হয়তো গুরুতর কিছু চিন্তা করছিলেন, তুমি চিৎকার করে বিঘ্ন ঘটালে। কী তাই তো?’
বাবাজি নবীনমাস্টারের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলেন।
নবীনমাস্টার অপ্রতিভ গলায় বললেন, ‘না-মানে—’
বাবাজি মাথা দুলিয়ে বললেন, ‘না বললে শুনব কেন? এখানে বসার পর থেকেই দেখছি, আপনি প্রায় ধ্যানমগ্ন হয়ে রয়েছেন। বুঝতে অসুবিধা হয়নি, আপনাকে আর পাঁচজনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যায় না। আপনি একজন প্রতিভাবান পুরুষ। গণেশ না বুঝে অপরাধ করে ফেলেছে, ও আমারই সহচর, আপনি অনুগ্রহ করে ওকে মাপ করে দেবেন।’
নবীনমাস্টার বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। আশ্চর্য! বাবাজি তাঁকে দেখেই প্রতিভাবান বলে চিনে ফেললেন? কী অদ্ভুত ক্ষমতা? অত্যন্ত অবাক গলায় তিনি একটি মাত্র শব্দ উচ্চারণ করতে পারলেন,—
‘আপনি—’
বাবাজি স্মিত হেসে বললেন, ‘আমি একজন নগণ্য জনসেবক। মনে হয়তো প্রশ্ন জাগছে, আমি কেমন করে আপনার ব্যাপারটা বুঝলাম? উত্তরে সবিনয়ে জানাই, করুণাময় জগৎপিতা কৃপা করে আমাকে সামান্য কিছু ক্ষমতা দান করেছেন। তার মধ্যে একটা হল, মানুষের ললাটলিখন পাঠ করার ক্ষমতা। সেই পুঁজিটুকু নিয়ে আমি মানুষকে পথ দেখাবার চেষ্টা করি। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বিধাতাপুরুষ মানুষের ললাটে যা লিখে দেয়, তা অব্যর্থ। সাধারণ মানুষের সেটা জানার উপায় নেই, তাই বুঝতে পারে না, কোন পথে তার পূর্ণ বিকাশ ঘটবে। একটা উদাহরণ দিই। ধরুন, কারও একটুকরো জমি আছে। সেটা ধানচাষের উপযুক্ত জমি। সেই জমিতে কি আলুর ফলন ভালো হবে? জোর করে চাষ করলে সেখানে বড়োজোর মার্বেলের সাইজের আলু ফলতে পারে। কিন্তু সেই জমিতেই সে যদি ধানচাষ করে, তার গোলা ভরে যাবে। আমি মানুষকে সেইটুকুই বলে দিই। গত এক সপ্তাহ মেলায় সেই চেষ্টাই করেছি।
এইমাত্র যে লোকটিকে গণেশ তিরস্কার করছিল, মেলায় প্রথমদিনই ওকে সামান্য কিছু উপদেশ দিয়েছিলাম। বলতে আনন্দলাভ করছি, এই ক-দিনেই বেচারি অনেকখানি উপকৃত হয়েছে। তাই প্রণামী দিতে চায়। ওরে পাগল, জীবনধারণ করতে হলে অর্থের প্রয়োজন আছে ঠিকই, কিন্তু অধিক অর্থ যে অনর্থ ডেকে আনে। তৃতীয় রিপু বড়ো ভয়ংকর ভাই। কথায় বলে, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।’
নবীনমাস্টার মুগ্ধ হয়ে গেলেন। বললেন, ‘আমাকে যদি একটু পথ দেখান—’
বাবাজি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁর কপালের দিকে মিনিটখানেক তাকিয়ে রইলেন। তারপর চোখ বন্ধ করলেন। কয়েকমুহূর্ত পরে বললেন, ‘নাম কী?’
‘নবীন নন্দী।’
‘কী করা হয়?’
‘একটা স্কুলে শিক্ষকতা করি।’
‘অবসর সময় কাটে কীভাবে?’
‘আজ্ঞে, একটু-আধটু কবিতা লেখার বাতিক আছে।’
‘অতি উত্তম। একটা ফুলের নাম বলুন তো।’
‘নয়নতারা।’
নবীনমাস্টার তাঁর সদ্য রচিত কবিতাটার নাম দিয়েছেন নয়নতারা। এই কবিতাটা মাথায় ঘুরছিল বলে চট করে এই ফুলটার নামই মুখে এসে গেল।
বাবাজি এবারে চোখ খুললেন। গুরুগম্ভীর গলায় বললেন, ‘অসম্ভব। এটা হয় না।’
নবীনমাস্টার হকচকিয়ে গেলেন। বাবাজি কী বলছেন? নয়নতারা ফুল হয় না? এই অঞ্চলের সব জায়গাতেই বিস্তর নয়নতারা ফুল দেখা যায়। এমনকী স্কুলের একচিলতে বাগানেও—
আমতা আমতা করে বললেন, ‘আজ্ঞে, হয় বই কী। আমাদের স্কুলের বাগানেই তো একগাদা ফুলেভরা নয়নতারা গাছ রয়েছে।’
বাবাজি সামান্য হেসে বললেন, ‘নয়নতারা ফুল নিশ্চয়ই হয়, কিন্তু কবি হিসেবে আপনার খ্যাতিলাভ সম্ভব নয়।’
নবীনমাস্টার কাতর গলায় বললেন, ‘তাহলে?’
‘আপনি নাটক রচনা করুন।’
‘নাটক?’
‘হ্যাঁ, নাটক। সেটাই আপনার সঠিক পথ। কখনো চেষ্টা করেছেন?’
‘আজ্ঞে না।’
‘করুন। দেখবেন, কত স্বচ্ছন্দে লিখতে পারছেন। একটার পর একটা নাটক। ধরুন, শেক্সপিয়র যদি বলতেন, আমি নাটক লিখব না, হাসির গান লিখব, তাহলে কী হত?’
নবীনমাস্টার আকাশপাতাল হাতড়েও এই বিদঘুটে প্রশ্নের কোনো জবাব খুঁজে পেলেন না। ভ্যাবাচাকা খাওয়া মুখ করে তাকিয়ে রইলেন।
বাবাজি মৃদু হেসে বললেন, ‘উত্তরটা অতি সহজ। পৃথিবীর নাট্যামোদী মানুষ অনেকগুলো ভালো নাটক পেত না। আপনি যদি কবিতা লেখার চেষ্টা করে যান, বাংলার মানুষ কিছু ভালো নাটক থেকে বঞ্চিত হবে। আমি প্রথমেই আপনার ললাটলিপিতে এইরকম ইঙ্গিত পেয়েছিলাম। নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি পরীক্ষার আয়োজন করলাম। আপনি আর পাঁচটা জনপ্রিয় পরিচিত ফুলের নাম না বলে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত একটি ফুল বেছে নিয়েছেন—নয়নতারা। লক্ষ করুন, আপনার নাম, পদবি এবং নির্বাচিত ফুলের নামের আদ্যক্ষর হচ্ছে দন্ত্য ন। আমার বিশ্বাস, নাট্য ক্ষেত্রেই আপনার প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটবে। মোটামুটি বোঝাতে পেরেছি বোধ হয়। এবারে বলুন, আপনি কতদূর যেতে চান?’
‘আজ্ঞে, কলকাতা পর্যন্তই যাব। স্কুলের জন্য কিছু কেনাকাটা আছে।’
‘আমি তা বলিনি। জানতে চেয়েছিলাম, খ্যাতির শিখরে কতদূর পর্যন্ত আরোহণ করতে চান? আজ একখানা নাটক মঞ্চসফল হলে কাল টি ভি সিরিয়ালের চিত্রনাট্য, পরশু সিনেমার চিত্রনাট্য—এসব লেখার জন্য পরপর ডাক আসবে। তার সঙ্গে মঞ্চের নাটক তো রইলই। আজকাল গ্রামেগঞ্জে যাত্রাপালারও ভালোই কদর আছে। যাত্রাওয়ালারাও কি আর ছাড়বে? ধরে বসবে। কাকে ফেরাবেন, কার জন্য কতটুকু সময় দেবেন, সেসব তো আপনাকেই স্থির করতে হবে।’
‘সে সব তো অনেক পরের কথা। আগে ব্যাপারটা শুরু হোক।’
‘শুরু করে দিন। শুভস্য শীঘ্রম। অনেকদূর যেতে পারবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনাকে যেন একটু বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে। ক্লান্তি লাগছে বোধ হয়? গণেশ?’
গণেশ গদগদ গলায় সাড়া দিল, ‘বাবা।’
‘প্রসাদী সন্দেশ আছে?’
‘আজ্ঞে, অল্পই আছে।’
তা হোক, তার থেকে এঁকে একটু দাও। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে।
নবীনমাস্টার সেটা নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে মুখে দিলেন।
বাইরে মাইকে ট্রেন আসার খবর ঘোষণা করা হল। অর্থাৎ আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ট্রেন এসে যাবে।
নবীনমাস্টার সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভবিষ্যতে আপনাকে পেতে হলে কোথায় খোঁজ করব?’
বাবাজি প্রশান্ত গলায় বললেন, ‘ঈশ্বর আমার ললাটে কোনো স্থায়ী ঠিকানা লেখেননি ভাই। একটা আশ্রম আছে বটে কিন্তু সেখানে আর থাকা হয় কই? আজ এখানে, কাল ওখানে—এভাবেই দিনগুলো কেটে যায়। মানুষের সেবাতে জীবন উৎসর্গ করেছি—সেটুকু করতে পারলেই নিজেকে ধন্য মনে করব। আপাতত রানাঘাট স্টেশনে নামব, সেখান থেকে অন্য ট্রেন ধরব। মহানন্দপুর থেকে এক শিষ্যের ডাক এসেছে। যেতেই হবে। তবে যেখানেই থাকি না কেন, প্রত্যেক বছর এখানকার বুড়ো-শিবতলার মেলায় আমি আসি। সেখানেই আমাকে পাবেন।’
কথাগুলো শুনতে শুনতেই নবীনমাস্টারের কেমন ঘুম ঘুম পেতে লাগল। জোর করে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে পড়লেন। সবাই বাইরে যাচ্ছে। ট্রেন আসছে। ট্রেনে উঠে তিনজন পাশাপাশি বসলেন। দুটো স্টেশন বাদে বাবাজি গণেশকে নিয়ে নেমে গেলেন। যাওয়ার সময় কিছু একটা বলে গেলেন। নবীনমাস্টার সায় দিলেন বটে কিন্তু তখন দু-চোখ জুড়ে ভীষণ ঘুম নেমে আসছে।

গনেশ গদগদ গলায় সাড়া দিল, ‘বাবা।’ ‘প্রদাসী সন্দেশ আছে ?’ ‘আজ্ঞে অল্পই আছে।’
ঘুম ভাঙল ট্রেন শিয়ালদা স্টেশনে ঢোকার মুখে। কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের দোকানে গিয়ে নবীনমাস্টার আবিষ্কার করলেন, পকেটের সমস্ত টাকা উধাও। ঘটনাটা কোথায় ঘটল মনে করতে গিয়ে আবছা মনে পড়ল, ট্রেনে ওঠার সময় গণেশ ওঁকে প্রায় জাপটে ধরে উঠেছিল। অত ঘুম পাওয়ার কারণটা নিশ্চয়ই সন্দেশে ছিল। আরও মনে পড়ল, নেমে যাওয়ার সময় বাবাজি বলেছিলেন, ‘আপনার প্রথম নাটকটার নামকরণ আমিই করে যাই। নাটকটার নাম রাখবেন, ‘‘নেপোয় মারে দই’’। বুঝেছেন?’
ঘুমচোখে নবীনমাস্টার ঘাড় হেলিয়ে সায় দিয়েছিলেন। এখন মনে পড়ছে।
ফেরার পথে নবীনমাস্টার বিষণ্ণমনে ভাবছিলেন, আজ কী কুক্ষণেই যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে ছিলেম। সারাদিন দুর্গতির সীমা রইল না। সবচেয়ে বড়ো কথা, জোচ্চোরের পাল্লায় পড়ে স্কুলের টাকাগুলো পর্যন্ত খোয়ালেন। এখন ফিরে গিয়েহেডমাস্টারমশাইকে কী কৈফিয়ৎ দেবেন। অথচ সবকিছু বলতেই হবে। ছি ছি, কী লজ্জা!
পরদিন স্কুলের অফিসরুমে বসে অধোবদন নবীন মাস্টার একটু রেখেঢেকে নিজেকে যথাসম্ভব বাঁচিয়ে ঘটনাগুলো সবে বলা শেষ করেছেন, ইংরেজির চঞ্চলবাবু পাশে বসা অঙ্কের ভুবনবাবুর কানের পাশে ফিসফিস করে তৃতীয়বার ‘ডিসগাসটিং’ শব্দটা উচ্চারণ করেছেন এবং হেডমাস্টারমশাই অত্যন্ত বিরক্তমুখে নবীনমাস্টারের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা সম্বন্ধে একটা বক্তৃতা মনে মনে গুছিয়ে নিয়েছেন, ঠিক সেই সময়ে টেলিফোনটা বেজে উঠল। বক্তব্য শুরু করার আগেই বাধা পড়ল।
হেডমাস্টারমশাই ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে টেলিফোনটার দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে রিসিভার তুলে বাজখাঁই গলায় সাড়া দিলেন। তারপর মিনিট তিনেক ধরে শুধু হ্যাঁ-হুঁ-ঠিক আছে বলে গেলেন। ঘরের সকলেই অবাক হয়ে দেখলেন, এইটুকু সময়ের মধ্যেই তাঁর মুখ থেকে বিরক্তির চিহ্নগুলো মিলিয়ে গেছে। ভুরু জোড়াও ফের স্বাভাবিক। এমনকী মুখে যেন সামান্য হাসির আভাস।
হেডমাস্টারমশাই সকলের দিকে তাকিয়ে একবার গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘আপনারা সকলেই শুনুন, এইমাত্র রানাঘাট রেল পুলিশের অফিস থেকে ফোনটা করা হয়েছিল। গতকাল সন্ধ্যেবেলায় রানাঘাট স্টেশনে দু-জন প্রতারক একজন যাত্রীকে ঠকানোর সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছে। তাদের কাছ থেকে আমাদের স্কুলের কাগজপত্র এবং বেশ কিছু টাকা পাওয়া গেছে। চাপের মুখে তারা সবকিছু স্বীকারও করেছে। শনাক্তকরণের জন্য আমাদের ডাক পড়েছে। নবীনবাবু, উঠুন তাড়াতাড়ি, এক্ষুনি যেতে হবে।’
স্টেশন লক-আপে বাবাজি এবং গণেশ দু-জনেই শুকনো মুখে বসে ছিল। শনাক্তকরণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সব কাজ সেরে ফেরার সময় নবীনমাস্টার মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, আগামী বেশ কিছুকাল তিনি কবিতা লেখা স্থগিত রাখবেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন