আমি শুভ্র বলছি

গৌতম দাশ

উরিব্বাস! একটা মোবাইল ফোনের দাম ছত্রিশ হাজার প্লাস?

বিস্মিত সুবিমল কথাগুলো আপনমনে উচ্চারণ করলেন। তারপর কাগজ পড়ায় বিরতি এবং চোখ বুজে কয়েক মুহূর্তের মানসাঙ্ক—ওটার দামের মধ্যে তাঁর ক-মাসের বেতন লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞাপনে পণ্যবস্তুর দাম দেওয়া থাকলে সকালের কাগজ পড়ার ফাঁকে ফাঁকে এই অঙ্কটা হামেশাই করেন সুবিমল। কেমন যেন অভ্যাস হয়ে গেছে।

আসলে নেহাতই ছোটোমাপের চাকুরিজীবী সুবিমল। নিজের সারামাসের পরিশ্রমের ফসলের সবটুকুই ঘরে আনা সম্ভব হয় না। মাঝখানে নানারকমের লোনের চোরাবালিতে অনেকখানি হারিয়ে যায়। অথচ খবরের কাগজে গাড়ি, ফ্ল্যাট, মোবাইল, মোটরবাইক কিংবা অন্যান্য মহার্ঘ পণ্যসামগ্রীর ঝকঝকে মোহময় বিজ্ঞাপনগুলো তাঁকে প্রতিদিন আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। তখন অনিবার্যভাবে অঙ্কটা এসে যায়।

চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন বিশাখা। সুবিমল তাঁকে বিজ্ঞাপনটা দেখালেন। লঘুগলায় বললেন, ‘বুঝলে ম্যাডাম, এই ছত্রিশ হাজারি খুদে যন্তরটি একেবারে হালের খুড়োর কল। তবে শুধু এটা নয়, এখন নানা ধরনের আজব কলে বাজার একেবারে উপচে পড়ছে। কাগজ পড়ার সময় এগুলো তোমার চোখেও পড়ে নিশ্চয়ই। হাতে নেই বলে আক্ষেপ হয় কিনা সেটা জানি না।’

বিশাখা তির্যকদৃষ্টিতে সুবিমলের দিকে একবার তাকালেন কিন্তু কোনো জবাব দিলেন না। একটু থেমে সুবিমল আবার বললেন, ‘অবিশ্যি আক্ষেপ হলেও তোমাকে দোষ দেওয়া যায় না। এমন একজনের সঙ্গে তোমার জীবন জড়িয়ে গেছে যে-সারাজীবনই নেই রাজ্যের বাসিন্দা। ঝকঝকে ফ্ল্যাট, চকচকে গাড়ি, চোখ-ধাঁধানো জীবনযাত্রা এসব তো দূরের কথা, কখনো কখনো সংসারের এমন হাল যে, নুন আনতে পান্তা পর্যন্ত নেই। সম্পত্তির মধ্যে তারক চ্যাটার্জি লেনের এই ঝুরঝুরে পৈত্রিক বাড়িখানা আর কোনোরকমে অস্তিত্ব বজায় রাখার মতো একটা ছোট্ট চাকরি। চারদিকের বিলাস বৈভবের বিপুল আয়োজনের মাঝখানে যেন এক মূর্তিমান ছন্দপতন।’

বিশাখা বললেন, ‘আসলে আক্ষেপ ব্যাপারটা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর অনেকটা নির্ভর করে। আমি যতটুকু পাই ততটুকু নিয়েই খুশি থাকার চেষ্টা করি বলেই হয়তো তেমন কোনো কষ্ট আমার নেই। তা ছাড়া আমার শুভ্র রয়েছে। ওর কথা ভেবেই আমার দিন কেটে যায়, সমস্ত দুঃখকষ্ট তুচ্ছ হয়ে যায়। আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শুভ্রকে ওর লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পেরেছি, সেটা কি কম আনন্দ? শুভ্র সুস্থ থাকুক, ভালো থাকুক—তাতেই আমার শান্তি। আর কিছু চাই না।’

সুবিমল বললেন, ‘আজ ফোন করলে কয়েকদিনের জন্য শুভ্রকে ঘুরে যেতে বোলো। অনেক দিন আসেনি। মাঝে মাঝে মনটা বড়ো খারাপ হয়ে যায়। কতদিন ছেলেটা বাড়িছাড়া হয়ে রয়েছে। গতকাল সন্ধ্যেবেলা তো ফোন করল না, আজ নিশ্চয়ই করবে।’

শুভ্র ওঁদের একমাত্র সন্তান। আপাতত অন্ধ্রপ্রদেশের পালামপেটের কাছে একটা পাহাড়ি জায়গায় রয়েছে। একটা প্রোজেক্টের ইঞ্জিনিয়ার। গত কয়েকমাস ধরেই ওখানে রয়েছে। আরও মাসতিনেক থাকার কথা। সপ্তাহে তিনদিন সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে ফোন করে অনেকক্ষণ কথা বলে। অবিশ্যি মন খারাপ লাগলে বিশাখাও মাঝে মাঝে ফোন করেন। তবে শুভ্রকে ফোনে পাওয়া বেশ শক্ত। অধিকাংশ সময়েই টাওয়ার পাওয়া যায় না।

বিশাখার গলায় সামান্য উদবেগ ধরা পড়ে—এমন তো হয়নি কখনো। কাল কেন ফোন করল না কে জানে? আজ সকালে আমিও দু-বার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পেলাম না। ছেলেটার আবার অসুখবিসুখ করেনি তো? ভয় করে। পাহাড়-জঙ্গলে পড়ে থাকে। বোঝেও না, খবর না পেলে বাবা-মায়ের কত দুশ্চিন্তা হয়।

এই সময়েই ফোনটা বেজে উঠল।

সুবিমল ধরলেন। একবার মাত্র অস্ফুট আর্তধ্বনি ছাড়া প্রায় নি:শব্দেই শুনে গেলেন। তারপর রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখে বিশাখার দিকে ফিরলেন সুবিমল।

হাহাকারের গলায় উচ্চারণ করলেন—‘বিশাখা, গতকাল একদল আতঙ্কবাদী জঙ্গি আমাদের শুভ্র আর অন্য আরেকটি ছেলেকে অপহরণ করেছে। ওদের কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না।’

সারাশরীরে ব্যথা এবং যন্ত্রণার অনুভূতি নিয়ে চেতনায় ফিরল শুভ্র। চোখ মেলল। দূরের পাহাড়-চূড়াগুলোয় রোদের আভাস। কনকনে ঠাণ্ডা সকাল। প্রথমে একটু অদ্ভুত লাগল। তড়িঘড়ি উঠে বসতে চেষ্টা করল। পারল না। ঝনঝনে ব্যথা এবং যন্ত্রণা ওকে আবার শুইয়ে দিল। পা দুটো অসম্ভব ভারী। নাড়ানোর চেষ্টায় তীব্র যন্ত্রণা পায়ের পাতা থেকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল। একটু বাদে শুধু হাতদুটোর ওপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসল। ক্রমশ সবকিছু মনে পড়ে গেল।

পাহাড়ের একটা এবড়োখেবড়ো কার্নিশে ও পড়ে আছে। ওর ডানদিকে তিনহাত দূর থেকে পাহাড়ের খাদ নেমে গেছে। শেষপর্যন্ত দৃষ্টি চলে না। অনেক নীচে জমে থাকা কুয়াশায় আটকে যায়। কার্নিশটা এখানে ছ-সাত ফুট চওড়া। সামনের দিকে ক্রমশ সরু হতে হতে সেটা পাহাড়ের গায়ে মিলিয়ে গেছে। পিছনে একটা বড়ো পাথর। বাঁদিকে পাহাড়ের ঢাল। অন্তত কুড়ি ফুট ওপরে রাস্তা। যে রাস্তা থেকে জিপগাড়িটা কাল রাতে গড়িয়ে পড়েছিল।

গাড়িতে ওর সঙ্গে ছিল অতনু আর চারজন সশস্ত্র জঙ্গি। গত তিনদিন ওরা একসঙ্গে ছিল কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার ওদের কেউই এই ক-দিন শুভ্র বা অতনুর সঙ্গে একটাও কথা বলেনি। একজন দু-বেলা নি:শব্দে খাবার আর জল রেখে যেত। তবে কোনো কথা ছাড়াই ওরা চাপবাঁধা আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল। প্রতিরাতেই রাইফেলের নল দিয়ে ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসার ইঙ্গিতে শুভ্রের মনে হত, ঘরটাকে রক্তাক্ত করতে চায় না বলেই ওদের বাইরে ডেকে নিচ্ছে। কিন্তু আসলে প্রতিরাতেই আতঙ্কবাদীরা ডেরা বদল করছিল।

অতনু ওড়িশার ছেলে। ভদ্রকে বাড়ি। সবে কৈশোর অতিক্রম করেছে। ছেলেটা বড্ড ভেঙে পড়েছিল। সীমাহীন গাঢ় আতঙ্ক ওকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। শুভ্র সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করত বটে কিন্তু কথাগুলো নিজের কানেই যেন বেসুরো শোনাত।

মৃত্যু নিশ্চিত এতে কোনো সন্দেহ ছিল না । শুধু প্রশ্ন, সেটা কখন? আর দ্বিতীয় প্রশ্ন, সেই ঘটনা কলকাতার দু-জন মানুষকে আরও কতকাল ধরে তিলতিল করে পোড়াবে? ওর বাবা আর মা। মায়ের কাছে শুভ্র এখনও একটুও বড়ো হতে পারেনি। বাড়িতে গেলে ওর মা এখনও ভাত মেখে দেয়। ঘুম আসার আগে পর্যন্ত গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

অপহরণের ঘটনাটা তিনদিনের পুরোনো। রাও আর শ্রীনিবাসনেরও এই জিপেই আসার কথা ছিল। শেষমুহূর্ত হেড অফিসের ফোনে ওরা আটকে যায়। সেইজন্যেই বেঁচে গেল। কোনো সিনে-দৃশ্যের মতোই মাঝপথে ওদের জিপটাকে থামাল আরেকটা জিপ। তিনজন সশস্ত্র লোক ওদের দু-জনকে নামিয়ে নিয়ে নিজেদের জিপে তুলল। চোখ বেঁধে দিল। তারপর অনেকক্ষণ ধরে জিপটা চলতেই থাকল। এক জায়গায় থামার পর ওদের চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হল।

গভীর জঙ্গলের মধ্যে পুরোনো ভাঙাচোরা একটা বাড়ি। চারপাশে সশস্ত্র পাহারা। সেখানে ওদের হাজির করা হল জলপাই রঙের পোশাক পরা একজন লোকের সামনে। লোকটার চোখে-মুখে নিষ্ঠুরতার ছাপ অত্যন্ত স্পষ্ট। নিশ্চয়ই কোনো মতলব নিয়েই তাদের অপহরণ করেছে। ওর দাবি মেনে না নিলে ওদের দুজনকে মেরে ফেলার নির্দেশ দিতে লোকটার চোখের পাতা একবারও কাঁপবে না। ওদের দেখে একচিলতে হাসি ফুটে উঠেছিল ওর মুখে। পরমুহূর্তেই কোনো অজানা ভাষায় কিছু নির্দেশ দিয়েছিল এবং তৎক্ষণাৎ ওদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তারপর লোকটাকে আর দেখা যায়নি বটে কিন্তু এটা পরিষ্কার যে এই চারজন ওর অঙ্গুলি হেলনেই নড়াচড়া করে।

গত দু-রাত ছোটো-বড়ো পাহাড় ডিঙিয়ে ওরা আস্তানা বদল করেছে। কাল রাতে জিপটা এখানে কোনো সমস্যায় পড়ে। ঠিক কী হয়েছিল শুভ্র জানে না। তবে ব্রেক কষার তীব্র কর্কশ শব্দের সঙ্গে ড্রাইভারের চিৎকার কানে আসার সঙ্গে সঙ্গেই জিপটা উলটে গেল। একটা বিকট শব্দ, তীব্র আঘাত। আর কিছু মনে নেই, সব অন্ধকার। এখন বোঝা যাচ্ছে জিপ থেকে ছিটকে গিয়ে ও কোনোভাবে এই কার্নিশে আটকে গিয়েছিল। বাকিদের নিয়ে জিপটা অনেক নীচে, খাদে গড়িয়ে গেছে।

পাহাড়ের নীচে জমে থাকা চাপচাপ কুয়াশার মতো গাঢ় বিষণ্ণতা ক্রমশ শুভ্রকে গ্রাস করে ফেলে। অতনুর জন্য। নিজের জন্যও। অদৃষ্ট তাকে নিয়ে এক অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠেছে। তার দিকে এক চ্যালেঞ্জও ছুঁড়ে দিয়েছে। বাজি তার প্রাণ। জীবনের স্রোতে ফেরার একমাত্র উপায় বাঁদিকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কুড়ি ফুট উঠে যাওয়া। কাজটা অত্যন্ত কঠিন। পাহাড়ের এই জায়গাটা প্রায় খাড়া। পুরো দূরত্বটুকুর মাঝখানে একটা মাত্র বেঁটে পাইন গাছ আছে। মরা হলদেটে কিছু ঘাস। আর রুক্ষ পাথর।

শরীর সুস্থ থাকলে হয়তো এই দূরত্ব এতখানি অনতিক্রম্য মনে হত না। কিন্তু এই মুহূর্তে ডান-পা পুরোপুরি অকেজো। সম্ভবত ভেঙে গেছে। বাঁ-পায়ের অবস্থাও খুব ভালো নয়। তবু ওটাকে দিয়ে অল্পস্বল্প কাজ করানো যেতে পারে। সুতরাং, হাত দুটোর ওপরেই পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে। অবিশ্যি তাড়াহুড়ো কিছু নেই। একটা গোটা দিন হাতে রয়েছে। ধীরে ধীরে উঠে পাইন গাছটার গোড়ায় শরীর আটকে আধঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে।

শরীরটাকে পাক খাইয়ে হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিতে আনতে সর্বাঙ্গে তীব্র যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে একরাশ অন্ধকার । দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণাটা সয়ে নিল শুভ্র। আপনমনেই বলল,—কষ্ট তো হবেই। কিন্তু কিছুতেই হার মানলে চলবে না। কলকাতায় দু-জন মানুষ তোমার জন্য ভয়ংকর দুশ্চিন্তায় রয়েছে। তাদের কথা ভাবো। মানুষ কি কখনো এর চেয়েও কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসেনি?

পাহাড়ের ঢাল হাতের কাছে। পৌঁছে গেল। এরপরই আসল পরীক্ষা। মায়ের মুখখানা মনে ভেসে উঠল। শুভ্র বলল,—আমি ঠিক তোমার কাছে পৌঁছে যাব। দেখো।

শুরু করে শুভ্র বুঝতে পারল যতটা মনে হয়েছিল, আসলে লড়াইটা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। উপুড় হয়ে শুয়ে ঝুলে থাকা ঘাসের গোছা ধরে শুধু হাতের জোরে শরীরকে অত্যন্ত সাবধানে তুলে নিয়ে যেতে হচ্ছে। হাঁটুদুটোর সাহায্য খুব সামান্য। কয়েক ফুট ওঠার মধ্যেই দু-বার ঘাসের গোছা উপড়ে এলো। দু-বারই কোনোরকমে সামলে নিল। একসঙ্গে দুই হাত ফসকালে অনিবার্য মৃত্যু। কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যেও ওর সর্বাঙ্গ ঘামে ভেজা। গলা-বুক শুকিয়ে কাঠ। মুখের মধ্যে গড়িয়ে আসা ধুলো কাঁকর ঢুকে গিয়ে কিচকিচে অস্বস্তি।

তবু শুভ্র একসময়ে পাইনের গোড়ায় পৌঁছে গেল। আর মাত্র দশফুট। ইতিমধ্যেই ওর আঙুলের নখ ভেঙে গেছে। দুই হাতের তালুতে ঘাসের ধারে কেটে যাওয়া ক্ষত এবং ফোসকা। অনেকবার মনে হয়েছে শরীর বড়ো ভারী। সমস্ত সত্তায় গাঢ় আচ্ছন্নতা। শুভ্র ফিসফিসিয়ে হাত দুটোকেই যেন ভরসা জোগায়—আর একটু...একটুখানি। প্রায় এসে গেছি।

পাইনের গোড়ায় বেশিক্ষণ বিশ্রাম নিতে সাহস হল না। কেবলই চোখ বুজে আসছে। চোখে যেন ঘুমের পাহাড়। এখন বিশ্রাম নেওয়াটা বিপজ্জনক।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শুভ্র আবার শুরু করল। ধীরে, অতি ধীরে। সমস্ত বোধ এবং চেতনায় ক্রমশ কমতে থাকে দূরত্ব। চারফুট—তিনফুট—দুই—এক—

শুভ্র পারল। এবং তারপর আর পারলও না। ওপরের পাথুরে রাস্তার পাশে পৌঁছে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল। তখন দুপুর গড়ানো উষ্ণ রোদ ওকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানাচ্ছিল। হিমেল হাওয়া ওকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। অচেতন শুভ্র এসব কিছুই জানতে পারল না।

যখন জ্ঞান ফিরল তখন আকাশে ঝকঝকে চাঁদ। অসম্ভব ঠাণ্ডা রাত। প্রথমেই ওর মনে হল রাতে এই রাস্তায় আতঙ্কবাদীরা চলাফেরা করে। একটু আড়াল চাই। আহত জন্তুর মতো গড়িয়ে গড়িয়ে কোনোরকমে একটা পাথরের আড়ালে গিয়ে আশ্রয় নিল। সারাশরীরে তীব্র কষ্ট পাক খাচ্ছে। এসব কষ্ট নিয়ে শুভ্র ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে একটা দাঁড়কাকের তীক্ষ্ণ কর্কশ চিৎকারে ওর ঘুম ভাঙল। আবার এগোতে হবে। একটা লোকালয় না পাওয়া পর্যন্ত। কিন্তু চেষ্টা করেই শুভ্র বুঝতে পারল কাজটা একেবারেই অসম্ভব। পুরো ডান-পা বেশ ফুলে গেছে। যন্ত্রণা মারাত্মক। নাড়াতে গেলেই দপদপ করছে। আপ্রাণ চেষ্টায় ডানপায়ের জুতো, মোজা খুলে ফেলল। ফুলে ওঠা পায়ের পাতা দগদগে লাল। যেন রবারের তৈরি একটা নকল পায়ের পাতা। চোখ-মুখ পুড়ে যাচ্ছে। প্রচন্ড জ্বর এলে যেমন হয়।

পাহাড়ের বাঁক ঘুরে যে তিনজন লোক গল্প করতে করতে এগিয়ে আসছিল, তাদের কাছে নিজেকে গোপন রাখার কোনো চেষ্টাই করেনি শুভ্র। সে সাধ্যও ছিল না। শুভ্রকে দেখে ওরা দৌড়ে এল। উত্তেজিত স্বরে কথা বলতে বলতে ওর পাশে বসে পড়ে হাত পায়ের ক্ষতগুলো খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। ভাষা অজানা বলেই ওদের কথাগুলো শুভ্র বুঝতে পারছিল না, তবে আন্দাজ করতে অসুবিধা হয়নি—ওদের বিস্মিত প্রশ্নগুলো ওকে ঘিরেই। শুভ্র ডানপায়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, —‘অ্যাক্সিডেন্ট’। সঙ্গে সঙ্গেই নিজের গলার স্বরে নিজেই অবাক হয়ে গেল। ফিসফিসে ভাঙাচোরা কন্ঠস্বর।

ওরা কী বুঝল শুভ্র জানে না। কিন্তু দেখল, ওরা দ্রুত নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করে নিয়ে দু-জন দৌড়ে চলে গেল। একজন বসে রইল ওর পাশে। মাঝে মাঝেই সে আশ্বাসের ভঙ্গিতে হাত তুলে দ্রুত কথা বলে যাচ্ছিল।

খানিকক্ষণের মধ্যেই একটা দড়ির চারপাই নিয়ে চারজন ফিরে এল। ওদের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া আর তো কিছু করারও ছিল না। অত্যন্ত সাবধানে অনেকটা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ওরা প্রায় অচেতন শুভ্রকে নিয়ে পৌঁছে গেল একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামে। পাশে বসে থাকা লোকটির ঘরেই শুভ্র আশ্রয় পেল।

প্রথমে ওরা গরম জল দিয়ে ওর হাত-পা-শরীর অত্যন্ত যত্নে পরিষ্কার করে দিয়ে কোনো মলম জাতীয় ওষুধ লাগিয়ে দিল। তারপর জলে গুলে একটা ওষুধ খাইয়ে দিল। ক্রমশ শুভ্রর শরীরে একটু আরামের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। ততক্ষণে ওর চারপাশে গ্রামের অনেক মানুষের ভিড় জমেছে।

এরপর এল গরম দুধ, হালুয়ার মতো একধরনের খাবার এবং জল। আশ্রয়দাতা লোকটি যত্ন করে খাইয়ে দিচ্ছিল। শুভ্রর হাতদুটো জখম বলে নিজে খাওয়ার উপায় নেই। কিছুটা খেয়ে সুস্থবোধ করে ও। এর মধ্যেই একজনকে ওরা নিয়ে আসে যে ভালো হিন্দি জানে। শুভ্র তাকে আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা বলে কাছাকাছি কোনো শহরগামী বাসে ওকে তুলে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাল।

শ্রুভ্র ডানপায়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,-‘অ্যাক্সিডেন্ট’।

হিন্দি জানা লোকটি, যে নিজের নাম জানিয়েছিল রাজশেখর, বলল—‘প্রথমে চিকিৎসার জন্য তোমাকে যেতে হবে ওয়ারাঙ্গলে। রোজ একটা মাত্র বাস এই গ্রামের পাশ দিয়ে ওয়ারাঙ্গল যায়। কিন্তু শরীরের এই হাল নিয়ে তুমি সেই বাসে যেতে পারবে না। চিন্তা কোরো না। আজ বেঙ্কটেশের ঘরে খাও, ঘুমাও, আরাম করো। কাল সকালে তোমার ওয়ারাঙ্গল যাওয়ার বন্দোবস্ত হয়ে যাবে।’

কিছুক্ষণ ধরেই একেকজন এসে একটা করে পাত্র ঘরের মধ্যে রেখে যাচ্ছিল। ছোটো-বড়ো বিভিন্ন আকারের পাত্রে ক্রমশ ঘর ভরে উঠল। রাজশেখরকে কারণ জিজ্ঞাসা করাতে সে হেসে বলল—‘তুমি ভিন প্রদেশের মানুষ হয়ে আমাদের এখানে এসে বিপদে পড়েছ, সেটা আমাদের পক্ষে ভারী লজ্জার কথা। ইতিমধ্যেই গ্রামের সবাই জেনে গেছে যে, তুমি আতঙ্কবাদীদের হাত এড়িয়ে কোনোরকমে বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছ। এখন গোটা গ্রামের মানুষদের সহানুভূতি তোমার দিকে। তুমি আজ এই ইয়েল্লাপেট গ্রামের অতিথি। তাই গ্রামের যার ঘরে যা খাবার আছে, সাধ্যমতো তোমার জন্য এনেছে। তুমি কষ্ট করে হলেও একটু খেয়ো।’

শুভ্র অভিভূত হয়ে গেল। পৃথিবীতে এখনও অনেক নরম মনের ভালোমানুষ বাস করে। এই অনুভূতিটা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই নিশ্চিন্তে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল শুভ্র। মাঝে ঘুমচোখে বেঙ্কটেশের হাতে দু-বার খাওয়া, স্বপ্নের মতো আবছা ঘটনা।

পরদিন সকালে রাজশেখর একটা ছোটো ম্যাটাডোর জোগাড় করে আনল। ওরা তার মধ্যে বিছানা পেতে সাবধানে শুভ্রকে শুইয়ে দিয়ে কম্বল চাপা দিল। বেঙ্কটেশ আর রাজশেখর উঠে বসল ওর দু-পাশে।

সারা গ্রামের লোক তখন গাড়ির পাশে।

শুভ্রকে রাজশেখর বলল—‘এরা সবাই বলছে, এমন অবস্থায় তুমি এলে যে-এরা ঠিকমতো অতিথিসৎকার করতে পারল না। সেজন্য ওদের আপশোসের সীমা নেই। তুমি সুস্থ হয়ে আমাদের এখানে যদি একবার আসো, সকলে অত্যন্ত খুশি হবে। আর যদি ঘরে ফিরে যাও, সেখান থেকে বেঙ্গটেশের ঠিকানায় একটা অন্তত চিঠি লিখবে। তাহলেও আমরা সবাই খুব আনন্দ পাব। গ্রামের সবাই আজ সকালে তোমার জন্য মন্দিরে ভগবানের কাছে পুজো দিয়েছে। তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো, এটাই আমাদের সকলের কামনা।’

বেঙ্কটেশের ঠিকানা লেখা কাগজটা পকেটে রেখে সবার উদ্দেশে হাত নাড়ে শুভ্র। কোনো কোনো আনন্দ মানুষের চোখে জল এনে দেয়।

ওয়ারাঙ্গল পৌঁছোতে দুপুর গড়িয়ে গেল। ওকে হাসপাতালে ভরতি করে দিয়ে বারবার ওর মঙ্গল কামনা করে রাজশেখর আর বেঙ্কটেশ বিদায় নিল। অনেকটা পথ ওদের ফিরতে হবে।

ডাক্তার ওর পায়ের অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলেন। আগাগোড়া সব কথাই বলে গেল শুভ্র।

ডাক্তার ইঞ্জেকশন রেডি করতে করতে বললেন—‘আপনাদের অপহরণের ব্যাপারটা এখন প্রায় আন্তর্জাতিক খবর। সন্ত্রাসবাদীরা আপনাদের বদলে ওদের চারজন বন্দির মুক্তি দাবি করেছিল। কিন্তু গত দু-দিন ওদের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে অন্যরকমের ভাবনা আসাই স্বাভাবিক। যদিও দুর্ভাগ্যবশত আপনার বন্ধুর ক্ষেত্রে সেটাই ঘটে গেল। যাই হোক, আমি এক্ষুনি পুলিশ, মিডিয়া আর আপনাদের সংস্থায় খবর দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।’

শুভ্র বলল—‘তার আগে আমি কলকাতায় একটা ফোন করতে চাই। কাইণ্ডলি যদি—’

ডাক্তার বললেন—‘নিশ্চয়ই।’

শীতের সোনালি বিকালে তারক চ্যাটার্জি লেনের একটা বাড়িতে ফোন বেজে উঠল। যেখানে ফোনের আওয়াজ এখন আতঙ্ক ছড়ায়। সুবিমল চমকে উঠলেন। গত দু-দিন বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করেছেন। কেউ বিন্দুমাত্র আশা দিতে পারেনি। কোনো চরম দুঃসংবাদের আশঙ্কা তাঁর বুকে থিরথিরে কাঁপুনি তুলল। তবু ধরতেই হবে। সুবিমল রিসিভার তুললেন। ফুরিয়ে যাওয়া মানুষের গলায় সাড়া দিলেন।

ওপাশ থেকে ক্লান্ত, একটু ভাঙা-ভাঙা কিন্তু চেনা স্বর ভেসে এল।

‘বাবা, আমি শুভ্র বলছি। ওয়ারাঙ্গল থেকে—

মুহূর্তের মধ্যে সুবিমলের সমস্ত সত্তায় এক অদ্ভুত ঝংকার উঠল। শুভ্র ভালো আছে। নিজের অজ্ঞাতসারেই তিনি চোখ বুজে ফেললেন। সমস্ত একাগ্রতা শ্রুতিতে পৌঁছে গেল। তারপর সংক্ষেপে একটা কঠিন লড়াই আর কিছু মানুষের সহৃদয়তার এক আশ্চর্য কাহিনি শুনতে পেলেন। যে কাহিনির প্রত্যেকটা শব্দ বিন্দু বিন্দু আনন্দ হয়ে ছড়িয়ে গেল তার সমস্ত চৈতন্যে। দমবন্ধ করা জমাট আতঙ্ক ক্রমশ গলে গেল, মিলিয়ে গেল।

সুবিমল হঠাৎ সচকিত হলেন ওপাশ থেকে আসা অনুরোধে—‘এবারে মাকে একটু দাও।’

চোখ খুলেই তিনি দেখতে পেলেন দরজার ফ্রেমে নিদারুণ আতঙ্কে স্তব্ধ বিশাখার পাথুরে অস্তিত্ব। কাঁপা হাতে তাঁর দিকে রিসিভার এগিয়ে দিলেন সুবিমল। প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন—‘আমাদের শুভ্রর ফোন। তোমাকে চাইছে।’

অধ্যায় ১ / ১৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%