জয়দীপ চক্রবর্তী

কাজ যা হবার এইটুকুনিতেই হয়ে গেল। টোপটা নিখুঁতভাবে কাজে লেগে গেল। এক্কেবারে পরিকল্পনা মাফিক। ভদ্রমহিলা নাছোড়বান্দার মতন ধরে বসলেন, তাঁকে মৃত ছেলের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে হবে। প্রথমটা রাজি না হবার ভান করে শেষে নিমরাজি হয়ে পানুকে ফোন করেছিল ফড়িং। পরে একটু আড়ালে সরে গিয়ে প্ল্যানটাও জানিয়েছিল সংক্ষেপে। বুদ্ধিটা মনে ধরে গিয়েছিল পানুর।
আজ তাঁরা আসছেন। রাত আটটায় টাইম দিয়েছে ফড়িং। সাতটা তেইশ মিনিটে অমাবস্যা লাগছে। আত্মা আনয়ন ক্রিয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় গোছগাছে আরো আধঘন্টাটাক। পাক্কা আটটায় জপে বসবেন পানু তান্ত্রিক। এই সময়েই আসতে বলা হয়েছে ওঁদের। এখন আটটা বাজতে মিনিট দশেক বাকি। নিজেকে আয়নায় একবার দেখে নিল পানু। খোলা জটা, কপালে লাল সিঁদুরের টিপ, পরনে লাল টুকটুকে কাপড়, হাতে গলায় রুদ্রাক্ষের মালা...নাহ, ঠিকই আছে। একেবারে পাকা তান্ত্রিকের মতনই লাগছে তাকে। নিজেই নিজেকে তারিফ করে ওঠে পানু। আর তখনই দরজার কড়াটা খট খট শব্দে বার তিনেক নড়ে ওঠে। বড় বাতিটা এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দেয় পানু। ঘরের মধ্যে শুধুই একটা তেলের ছোট প্রদীপের আবছা ম্যাড়মেড়ে আলো। ছায়া ছায়া ঘরে তামার যজ্ঞবেদির ওপরে খানকতক বেল কাঠ অল্প শিখায় জ্বলছিল। দরজা খুলে আগন্তুকদের বসতে বলে জ্বলন্ত বেলকাঠের টুকরোগুলোর উলটো দিকের আসনে বসল পানু। চোখ বন্ধ করে বিড় বিড় করে খানিক মন্ত্র পড়ল। তারপর জলদ গম্ভীর স্বরে মহিলার দিকে চেয়ে বলে উঠল, 'কী চাস মা?'
'সবই তো জানো বাবা', অদ্ভুত খসখসে গলায় বিড়বিড় করে উঠলেন মহিলা। ও টুকু বলতেই গলা কেঁপে উঠল তাঁর। পানু তাকায় তাঁর দিকে। মনে মনে হাসে। আবছা ছায়া ছায়া আলোয় মহিলার মুখ দেখা যাচ্ছে না, তবু বোঝা যাচ্ছে ভয় পেয়েছেন তিনি। খুশি হয় পানু। এ সময় ভয় পাওয়া ভারি ভালো। ভেল্কি দেখাতে বেজায় সুবিধে হয় তাহলে। প্রায় নিভে আসা কাঠে একটু ধুনো ছড়িয়ে আবার বাজখাই গলায় সে বলে ওঠে, 'ছেলেকে দেখতে চাস?'
'হুঁ', ওপর নীচ মাথা দোলান মহিলা। তাঁর পাশে বসা ভদ্রলোকও মাথা নাড়ান নিঃশব্দে।
'তার প্রেত রূপ তোদের সহ্য হবে তো?'
'ভয় পেলে তুমি তো আছো বাবা'।
'হুঁ', আশ্বাসের ভঙ্গীতে মাথা নাড়ায় পানু, 'কী নাম ছেলের?'
'অনি, অনিকেত'।
ম্লান আলোয় আবার বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে পড়তে যজ্ঞকুন্ডের ওপারের মানুষদুটির মুখ পড়ার চেষ্টা করল পানু। কিন্তু ম্যাড়মেড়ে আলো আর ধুনোর ধোঁয়ায় ঠিক ঠাওর করতে পারল না। তাদের আবছা মুখদুটোর ওপর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে নিভে আসা আগুনে আরো খানিকটা ধুনো ছড়িয়ে দিয়ে পানু বলে, 'দুজনে নাম ধরে একসঙ্গে ডাকো এবার ছেলেকে। সে ডাক যেন অন্তর থেকে উঠে আসে। খেয়াল রেখো'।
তাঁরা ডাকতে থাকেন, 'অনি, সোনা আমাদের, আয় বাবা...আয়, নেমে আয়...'
তাঁদের আহ্বান যেন হাওয়ার মতন ফিসফিসে স্বরে বাজতেই থাকে ঘরের মধ্যে। ক্রমাগত পাক খেতে খেতে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে সেই ডাক। শব্দটা ক্রমশ পানুর শরীরকে পেঁচিয়ে ধরতে শুরু করে। গায়ে কাঁটা দিয়ে শীত করে ওঠে পানুর। শ্বাস রোধ হয়ে আসে। গা ছম ছম করে ওঠে তার। এমন অস্বস্তি হচ্ছে কেন আজ? এমন তো হবার কথা নয়? আর ফড়িংই বা আসছে না কেন এখনও? পিছন দিকের খোলা দরজা দিয়ে তার তো চলে আসার কথা এতক্ষনে মেক আপ নিয়ে...
হঠাৎই পানুর পাশে এসে দাঁড়ায় ফড়িং। আড়চোখে তার দিকে তাকায় পানু। তাকিয়ে চমকে ওঠে। ফড়িংকে একদম অন্যরকম লাগছে আজ। চেনাই যাচ্ছে না। ফড়িং খুব ধীরে বাতাসের মতন স্বরে বলতে থাকে, 'আমি এসেছি। কিন্তু এইভাবে আমার কাছে আসার কী দরকার ছিল বলো তো...'
'তবু তো আবার একসঙ্গে হলাম আমরা অনি...'
ধুনোর গন্ধ ছাপিয়ে একটা বিচ্ছিরি পচা পচা গন্ধ এসে লাগছে পানুর নাকে। বাতাস ভারি হয়ে যাচ্ছে সেই গন্ধে। ফড়িং বলেই চলেছে, 'বাবা, তুমি তো এসবে বিশ্বাস করতে না। ভন্ড প্রতারকদের ক্ষমাও করতে না কোনোদিন। তাহলে একেই বা ছাড়ব কেন আমরা? যারা পয়সার জন্যে মানুষ ঠকায়, ভন্ড সেজে মানুষের স্নেহ, ভালোবাসা নিয়ে ছিনিমিনি খেলে তাদের শাস্তি পাওয়াই উচিত...'
খুব রাগ হয়ে গেল পানুর। কী আজেবাজে কথা বকে যাচ্ছে ফড়িং? বাঁ হাত বাড়িয়ে তার পায়ে চিমটি কাটে পানু। কেটেই থতমত খেয়ে যায়। ফড়িং এর পা টা এত ঠান্ডা কেন? তাছাড়া চিমটি কাটার সময় তার আঙুলগুলো যেন নরম গলে যাওয়া মাংসের মধ্যে ঢুকে গেল একেবারে। সেই পচা গন্ধটাও যেন আরো তীব্র হয়ে উঠল ঘরের মধ্যে। পানু আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বড় বাতিটা জ্বালিয়ে দেয়। লাল চোখে তাকায় ফড়িং এর দিকে। আর তাকিয়েই ভয়ে আর্তনাদ করে উঠে বলে, 'কে তুমি?'
'চিনতে পারলে না, আমি অনিকেত। আমাকে দেখাবে বলেই তো মিথ্যে কথা বলে আমার বাবা মাকে ডেকে এনেছ এখানে', বলতে বলতেই গায়ের চাদরটা একটানে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল ছেলেটা। মুহূর্তে মাথা ঘুরে গেল পানু তান্ত্রিকের। ফড়িং নয়, ঘরের মধ্যে যে দাঁড়িয়ে আছে তার গা থেকে পচা গলে যাওয়া মাংস খসে খসে পড়ছে। হাড় বেরিয়ে গেছে শরীরের বিভিন্ন অংশে। ছেলেটির বাবা মায়ের দিকে তাকিয়েও হাড় হিম হয়ে গেল পানুর। তাদের মাথা থেকে, মুখ থেকে গড়িয়ে নামছে কালচে রক্তের স্রোত। মাথার একদিক ফেটে ঝুলে গেছে...আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে ছুটতে শুরু করল পানু। উদ্দেশ্যহীন। মনে হল তাকে শাস্তি দিতে পিছন পিছন ওরাও যেন দৌড়ে আসছে। ছুটতে ছুটতেই দুহাতে কান ধরে তাদের উদ্দেশ্যে প্রাণপনে বলে চলল পানু, 'এবারের মতন মাপ করে দাও। কথা দিচ্ছি জটা কেটে ফেলব। হাতের, গলার রুদ্রাক্ষের মালাগুলো নদীতে ভাসিয়ে দেব একেবারে। লাল কাপড় পুড়িয়ে দেব দরকার হলে। লোক ঠকানো ব্যবসার ধারও মাড়াব না আর এ জীবনে।'
কতদূর ছুটেছিল খেয়াল নেই। সামনে মস্ত জটলা দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল পানু। খেয়াল হল বড় রাস্তায় এসে পড়েছে সে দৌড়তে দৌড়তে। জটলার মধ্যে ফড়িংকেও চোখে পড়ে গেল। পানুকে অমন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসতে দেখে ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো সে। জিগ্যেস করল,'কী হয়েছে গুরু?'
হাঁফাতে হাঁফাতে বলতে শুরু করল পানু তান্ত্রিক, 'ফড়িং, তোর সেই ক্লায়েন্ট...'
'আর আসবে না', বলে ভিড়ের দিকে হাত বাড়ায় ফড়িং, 'ওই যে ওইখানে রাস্তার ওপরে রক্তে মাখামাখি হয়ে শুয়ে আছে। নিজেদের গাড়ি নিয়ে ঠিক সময়েই আসছিল দুজনে আমাদের কাছে। ড্রাইভার না নিয়ে নিজেই ড্রাইভ করছিলেন ভদ্রলোক। অন্যমনস্ক ছিলেন বোধহয়। বাঁ-হাতের রাস্তা থেকে লরিটা আসছিল খেয়ালই করেননি। লরি এসে ধাক্কা মেরে... মাথাদুটো পুরো থেঁতলে গেছে...স্টিয়ারিংটা দুমড়ে ঢুকে গিয়েছিল ভদ্রলোকের শরীরে। কী বীভৎস পরিস্থিতি...এক্কেবারে স্পট ডেড...'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন