নগেন গোঁসায়ের নিদান

জয়দীপ চক্রবর্তী

সকালে উঠে হাঁটাহাঁটির অভ্যাস কস্মিনকালেও ছিল না হরেন হালদারের। এমনিতেই এলাকায় অলস বলে তার বেশ নামডাক আছে। পৈতৃক সম্পত্তি কিছু ছিল বলে চাকরি-বাকরির ধার দিয়েই যায়নি সে। একজন জ্যোতিষী একবার কুষ্ঠি বানিয়েছিল হরেনের। এই গ্রামেই থাকতেন ভদ্রলোক। জীবন গোস্বামী। হস্তরেখা বিচার আর মানুষের জন্মছক বানানোর ব্যাপারে এই অঞ্চলে তাঁর ছিল বেজায় সুনাম। হরেনের কপালের দিকে ভুরু কুঁচকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে রায় দিয়েছিলেন জীবন গোস্বামী, 'না হে কিছু করার নেই। ওই ধরো আটচল্লিশ, কিংবা ঊনপঞ্চাশ।'

'আজ্ঞে?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিল হরেন।

'তোমার আয়ু। অনেক হিসেব নিকেশ করেও ওটা আর বাড়াতে পারলুম না বাপু'। আক্ষেপের সুরে বললেন জীবন।

'মানে পঞ্চাশ কিছুতেই আর পেরব না বলছেন?' বেশ উৎফুল্ল ভঙ্গীতে বলে হরেন, 'বেশি বাঁচার অনেক হ্যাপা।'

'কেন?' অবাক হয়ে বলেন জীবন, 'আমার তো বাপু বাঁচতে বেশ লাগে।'

'আচ্ছা বেশি বেঁচে লাভটা কী বলুন দেখি?'

'আমার নলেন গুড়ের পায়েসের খুব লোভ জানো তো, কিন্তু শীতকাল তো আর বারোমাস থাকে না। বছরে মাত্র একবার শীতকাল আসে আর তখন নলেন গুড়। সেই গুড়ে সন্দেশ, মোয়া, পায়েস...তারপর ধরো গিয়ে আমাদের দক্ষিণের বাগানের ল্যাংড়া আম। যেমন স্বাদ তেমনি গন্ধ। আর বাগানের এক্কেবারে বাঁ-দিকের কাঁঠাল গাছটা...আহা কাঁঠালের কোয়াগুলো যা না, এক্কেবারে খাজা। কচকচ করে চিবিয়ে খেতে হয়। আর কী মিষ্টি! মনে হয় প্রতিটা কোয়ার মধ্যে যেন লিচুর মধু ভরে রাখা রয়েছে। ভাবো দিকিনি একবার, ফট করে মরে গেলে এসব জিনিসের মজাটাও মরে যাবে আমার সঙ্গে। মরণের পরে তো আর জিভ নেই, স্বাদ গ্রহণের উপায়ও নেই। তাছাড়া মনে করো...'

'বুঝতে পেরেছি', হরেন হাসে, 'আমার অমন খাওয়ার লোভ নেই। বাঁচারও লোভ নেই। বেশি বাঁচলে বেশি খরচ। আর বেশি খরচ মানেই গায়ে-গতরে খেটে উপার্জন করা। অত খাটুনি আমার সইবে না। শরীরটা মন্দির বুঝেচেন, যে কদিন আছে, তাকে আগলে রাখতে হবে। গায়ে আঁচড়টি লাগতে দেওয়া যাবে না। আপনি আমায় আজ ভারি নিশ্চিন্ত করলেন। মনে বড় ভয় ছিল। ভাবতাম বেশিদিন বেঁচে গেলে শেষে জমা আমানতে টান পড়বে না তো? আজ সে ভয়টা কাটল। আর কার্পণ্য করার দরকার নেই। মনে মনে হিসেব কষে দেখলাম যা আছে পঞ্চাশ বছর অব্দি দিব্বি চলে যাবে। আপনি ঊনপঞ্চাশ বলেছেন, আমি সেফ থাকতে আরো একবছরের বাড়তি হিসেব ধরলাম।'

'তবু...' আমতা আমতা করে কিছু বলতে গেলেন জীবন। হরেন থামিয়ে দিল তাঁকে। জিজ্ঞেস করল, 'আপনার গণনায় ভুল নেই তো জেঠু?'

'হয়নি আজ অব্দি। তবে মানুষের হিসেব তো। ভুল হয়েও যেতে পারে...'

'হবে না', হরেন হাসে। ভারি নিশ্চিন্তির হাসি। মন থেকে আজ যেন একটা বিশমনি পাথর নেমে গেল।

সেই থেকে হরেন দিব্বি খেলিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। শুয়ে বসে আরাম করে হই হট্টগোল করে বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে জম্পেশ দিন কাটাচ্ছে সে।

প্রথম প্রথম দিব্বি খরচ খরচা করেছে সে দু হাতে। সেই খরচে অনেক সময়েই লাগাম থাকত না। সেইসব সময়ে হরেনের বেশ কিছু বন্ধু ছিল। নিত্য যোগাযোগ ছিল তাদের হরেনের সঙ্গে। এখন হরেনের জমা টাকা শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। কাজেই বন্ধুরা বড় একটা আজকাল আর আসে না তার কাছে। তার জন্যে অবশ্য হরেনের দুশ্চিন্তা নেই আর। সে জানে তার এই পৃথিবীর মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে। হিসেব মতন এই মাসেই উনপঞ্চাশ পূর্ণ হবার কথা তার। আত্মীয়-স্বজন হরেনের বড় একটা নেই। যে দু-চারজন আছে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই কোনো। নিজের লোক বলতে তাদের বাড়ির পুরনো কাজের লোক গৌরদা। কম বয়েসে বাবা মা গত হবার পরে এই গৌরদাই বলতে গেলে আগলে রেখেছে দু-হাতে। গৌরদার বয়েস হয়েছে, তবু বাড়ির যেটুকু প্রয়োজনীয় কাজ কর্ম ওই সারে এখনও পর্যন্ত।

কদিন আগে সঞ্চয়ের অবশিষ্ট যেটুকু ছিল তা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে এনে গৌরদার হাতেই তুলে দিল হরেন। সে চোখ বুজলে এই লোকটারই মুশকিল। গৌরদা চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, 'ব্যাপারটা কী বলো দেখি? আমায় হঠাৎ টাকা পয়সা দিচ্ছো কোন মতলবে? এই বুড়ো বয়েসে কাজ থেকে বরখাস্ত করছ নাকি হে?'

'ধুস, কী যে বলো গৌরদা', হরেন হাসে। 'মানুষের জীবনে কী ভরসা আছে বলো...আজ আছি, কাল তো না থাকতেও পারি। কাজেই এইটুকু রেখে দাও তোমার কাছে। কখন কী কাজে লেগে যায়...'

'থামো দিকিনি, শুধু অলুক্ষুনে কথা', মুখ ঝামটা দিয়ে বলে ওঠে গৌর। 'সে আমিও তো চোখ বুজুতে পারি যখন তখন। এ টাকা কি কাজে লাগবে তখন আমার? কাজেই তোমার টাকা তুমিই বাপু রেখে দাও যত্ন করে।' আসল কথাটা গৌরদাকে আর মনে করাতে ইছে করেনি হরেনের। টাকাটা তুলেই রেখেছিল। সেইদিন থেকে মনে চাপা অস্বস্তিটা যেন রয়েই গেছে।

আজ সারাদিনই ভ্যাপসা গরম। মাথার ওপরে পাখা বন বন করে ঘুরছে, কিন্তু আরাম হচ্ছে না একটুও। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিল হরেন। কেমন যেন একটা অজানা অস্বস্তি হচ্ছে। জল খাবার জন্যে বিছানায় উঠে বসল সে। আর তখনই লোকটাকে চোখে পড়ল তার।

বিছানা থেকে খানিক তফাতে তারই হাতলঅলা কাঠের চেয়ারটায় লোকটা বসেছিল। পরনে খাটো ধুতি। খালি গায়ে সুতির চাদর জড়ানো। লোকটাকে দেখে ভারি হকচকিয়ে গেল হরেন। চোর-টোর নাকি? কিন্তু পরক্ষনেই মনের মধ্যে খটকা লাগল। ঘরের দরজা তো ভেতর থেকে খিল দিয়ে আটকানো। নাইট ল্যাম্পের আলোয় খিলটা দেখাও যাচ্ছে আবছা আবছা। হ্যাঁ, ওই তো এখনও আটকানোই রয়েছে। তাছাড়া লোকটা যদি চোরই হবে তবে অমন নিরুদ্বিগ্ন ভাবে চেয়ারে বসে আছে কেন চুপটি করে? কথাটা মনে এসেছে কি আসেনি অমনি নিজের থেকেই শান্ত গলায় লোকটা বলে উঠল, 'তোমার বাপু বিবেচনা আছে। যতটা অবিবেচক ভেবেছিলাম তোমায়, তুমি সত্যিই ততটা নও। ঠিকই ধরেছো। আমি চোর নই। চোর হতে যাবই বা কেন বাপু? সাত কূলে কেউ কখনও চোর হয়নি আমাদের বংশে। চোর হোক আমার বংশের শত্তুরে।'

'কে আপনি?' বলে হাতের কাছের বেড সুইচ টিপে বড় আলোটা জ্বালিয়ে দিল হরেন।

'আহা করো কী, করো কী', বলে সিঁটিয়ে গেল লোকটা। তারপর একটু লাজুক ভঙ্গীতে বলে উঠল, 'আলোটা নেভাও বাছা। কাঁচা শরীর তো, চড়া আলোয় ফস করে গলে যেতে পারে।'

'মানে?' অবাক হয়ে বলে হরেন।

'নগেন গোঁসাই কি আজকের মানুষ রে ভাই? আমার রক্ত মাংসের আসল শরীরটা তো বহুকাল আগেই গত হয়েছে, তোমার সঙ্গে দুটি কথা বলার তাড়সে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এই শরীরটা তোমার চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলেছি বাপু। বেশি আলোয় এ শরীর স্থির হয়ে থাকতে চায় না। বেঁকেচুরে, খসে যায়। ধোঁয়া হয়ে বাতাসের সঙ্গে মিশেও যায় অনেক সময়ে। তাও এই শরীরটা বানাতেই কি কম কসরত করতে হয়েছে বাছা? কত বছর লেগে গেল এই বিদ্যেটুকু শিখতে। তাও রক্ষে, চেষ্টা ছিল বলে এইটুকু অন্তত হয়েছে। জীবন তো বহু চেষ্টাতেও এ বিদ্যে আয়ত্তে আনতে পারেনি এখনও। নইলে তোমার কাছে আমার তো আসার কথা নয়। ত্রুটি তার। কাজেই তারই এসে ভুলটা ঠিক করে দিয়ে যাবার কথা...'

হরেনের মাথার মধ্যে সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। কাঁপা গলায় সে বলে উঠল, 'জীবন মানে আপনি কি জীবন জেঠুর কথা বলছেন? মানে জীবন গোস্বামী?'

'আবার কে?' নগেন মৃদু হাসে, 'জীবন আমার নাতি। ছোট্টবেলা থেকে কোলে বসিয়ে জ্যোতিষের গূঢ় বিদ্যে শিখিয়েছি তাকে। হাতে ধরে দেখিয়েছি, বিচার ঠিকঠাক হলে এ শাস্ত্রে সিদ্ধান্ত কেমন অভ্রান্ত হয়...ছেলেটা বিদ্যেটা শিখেও নিয়েছিল। কিন্তু ওই যে বললাম বিচার ঠিক হওয়া চাই। অংকে সামান্য ভুল হলেই উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চলে যাবে...'

'তাতে কি খুবই অসুবিধা?'

'বলো কী হে', নগেন গোঁসাই বলে ওঠে মাথা নাড়াতে নাড়াতে, 'গণনার সামান্য ভুল হলে দিন যে রাত হয়ে যাবে গো...ভাবতে সামান্য ভুল। কিন্তু ধর সামান্য একটা ফুটকির ভুলে রামভক্ত যদি বামভক্ত হয়ে যায় তবে কী কেলেংকারি বলো দেখি...'

'তা ঠিক।' হরেন মাথা নাড়ে।

'এমন একটা ভুলই যে জীবন তোমার সঙ্গে করে বসে আছে বাবা...'

'অ্যাঁ আমার সঙ্গে?' থতমত খেয়ে বলে হরেন।

'হ্যাঁ। তোমার সঙ্গে।'

'কী ভুল?'

'ওই যে তোমার আয়ু বেঁধে দিয়েছে সে ঊনপঞ্চাশ, ওইখানে।'

'সে কী?' আতঙ্কিত গলায় বলে হরেন, 'আয়ুটা কী তবে এখন আবার বাড়িয়ে দেবেন নাকি আপনি দুম করে?'

'আমি বাড়ানোর কে?' নগেন গোঁসাই বলে, 'সে তো বেড়েই আছে। আরে মানুষ তো স্প্রিং-এ দম দেওয়া পুতুল। যদ্দিন দম আছে তোমায় ঘুরতেই হবে। থামব বললেও কেউ শুনবে না সে কথা।'

'কিন্তু এখন আমার আয়ু ফস করে বেড়ে গেলে আমি যে খুব বিপদে পড়ে যাব দাদু', হরেন প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে।

'আজব কথা শোনালে ভাই', নগেন গোঁসাই হেসে ওঠে। 'বাঁচার জন্যে মানুষ হাঁকপাঁক করে মরছে সর্বক্ষণ আর তুমি এমন যাই যাই করছ কেন বলো দেখি?'

'এই পৃথিবীতে কীসের টানে যে বাঁচব সেটা খুঁজে পাইনি আজ অব্দি। তাছাড়া...'

'তাছাড়া?'

'ঊনপঞ্চাশ বছর আয়ু ধরে নিয়ে সেইভাবেই হিসেব কষে তো জীবনটাকে সাজিয়ে নিয়েছিলাম। এখন আর সঞ্চয় কিছু নেই। অনেকদিন বাঁচতে হলে না খেতে পেয়ে মরতে হবে।'

'কিন্তু নব্বই-এর কাছাকাছি যে আয়ু তোমার।'

'টিঁকব না। তার ঢের আগেই না খেয়ে মরে যাব।'

'তুমি চাকরি বাকরি কর না?'

'নাহ।'

'ব্যবসা বানিজ্য?'

'ধুস।'

'জমি জিরেত তো ঢের আছে। বাগান-আগান, চাষবাস?'

'উঁহু।'

'কেন?'

'ভাল্লাগে না। কাজ করতে বড় আলস্য আমার।'

'তালে তো সত্যিই বড় বিপদ তোমার। চেষ্টা করেও মরা তোমার নব্বইয়ের আগে হচ্ছে না। কিন্তু এমন ভাবে বাঁচতে গেলে তোমার তো ভোগান্তির একশেষ।'

'মহা গেরোয় ফেললেন তো আপনি', চিন্তাক্লিষ্ট গলায় বলে হরেন। 'দিব্বি হেসেখেলে আর মজা করে শেষ করে ফেলছিলাম জীবনটা, আপনি এসে সব গোলমাল পাকিয়ে দিলেন। এখন কী করা যায় নিদেন দিন দেখি একখানা।'

'ভাবছি', বলে গালে হাত দিয়ে গম্ভীর মুখে খানিক বসে থাকে নগেন গোঁসাই-এর বুড়ো ভূত। তারপর বলে ওঠে, 'ভিটের পুব দিকে কাঠা বারো জমি আছে না তোমার বাপ ঠাকুদ্দার?'

'তা আছে। তবে পুরো জমিটা এখন জঙ্গল আর আগাছায় ভরে আছে।'

'আর সেই পুকুরটা?'

'কচুরিপানায় ভর্তি। পুকুর শরার উপায় নেই।'

'কিন্তু ওখানেই যে ছিল জিনিসটা।'

'কী ছিল?' কৌতূহলী গলায় জিগ্যেস করে হরেন।

'মোহর গো, মোহর', চাপা গলায় বলে নগেন।

'যাহ, গুল মারছেন আপনি।' হরেন বলে।

'না হে। জায়গাটা ঠিক মনে নেই। তবে ছিল। ওই জমিতে বা পুকুরের মাঝে। মাটিতে পুতে রাখা ছিল জানি।'

'সত্যি থাকলে তা দিয়ে তো আমার বাকি জীবন পায়ের ওপরে পা তুলে দিয়েই দিব্বি চলে যাবে।'

'তা তো যাবেই।'

'তাহলে ব্যাপারটা তো দেখতে হচ্ছে।'

'দেখো। তবে ব্যাপারটা পাঁচকান কোরো না। দিনকাল তো ভালো নয়...'

'ওই নব্বই বছরের হিসেবেটা ভুল নয় তো?'

'এক্কেবারে নির্ভুল। নিয্যস সত্যি। নগেন গোঁসাইয়ের গণনা বলে কথা।'

নগেন গোঁসাই উঠে পড়ে চেয়ার থেকে। শরীরটা ঝুরো ঝুরো হয়ে ধুলো হয়ে যেতে থাকে। সেই ধুলো ধুলো অবস্থাতেই মিহি গলায় হেসে ওঠে নগেন গোঁসাই। একবার দুলে উঠে বলে, 'আসি হে।'

'আসুন', বলে আনমনা হরেন আবার বিছানায় এসে বসে পড়ে। বুকের মধ্যে একটা কেমন অন্য রকমের অনুভূতি হচ্ছে তার। হরেন বুঝল শুয়ে লাভ নেই। আজ আর কিছুতেই ঘুম আসবে না তার।

বাইরে ভালো করে আলো ফোটার আগেই হাত মুখ ধুয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল হরেন। পুব দিকের পড়ে থাকা জমিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আগাছায় ভরে আছে জায়গাটা। চারদিকে শব্দ নেই কোনো। হাতের কোদাল আর বড় দা-টা দিয়ে প্রাণপনে আগাছা পরিস্কার করতে লাগল সে। পরিশ্রম হচ্ছে যথেষ্ট। গা ঘেমে উঠছে। শ্বাস দ্রুত হচ্ছে। তবু কাজ করতে বড় ভালো লাগছিল হরেনের। নিজের দু-হাতের দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল হরেন। এই দু-হাতের মধ্যে কত শক্তি মজুত রয়েছে, অথচ এতদিন সেই শক্তি কাজেই লাগায়নি সে!

গাছেদের গা থেকে ভারি সুন্দর গন্ধ বেরচ্ছে। সেই গন্ধ ভোরের স্নিগ্ধ মৃদু বাতাসে ভর দিয়ে উড়ে এসে হরেনের নাকে লাগছিল। বড় করে শ্বাস টেনে সেই গন্ধ বুকে টেনে নিল সে। আগাছার আড়ালে বহু আগে লাগানো ফুল গাছগুলোকে চোখে পড়ল তার। এত অবহেলাতেও এখনও ফুল ফুটিয়ে রেখেছে তারা। পাখিরা গাছের ডালে ডালে হইচই বাঁধিয়ে দিয়েছে নতুন দিনকে স্বাগত জানাতে একসঙ্গে জড়ো হয়ে।

এত ভোরে আগে কোনোদিন ঘুম থেকে জেগে ওঠেনি হরেন। আজ পুরো প্রকৃতি এক অদ্ভুত মায়ায় যেন ধীরে ধীরে জড়িয়ে নিচ্ছিল তাকে। হরেনের ভালো লাগছিল। কেন যে এমন ভালো লাগছে কে জানে, কিন্তু হরেন স্পষ্ট বুঝতে পারল এমন ভালো আর কখনও লাগেনি তার এর আগে। পুব দিকের আকাশে ঠিক এই সময়েই এক অদ্ভুত রঙের খেলা শুরু হল। আকাশ জুড়ে নানা রঙের কৌটো উপুড় করে যেন ঢেলে দিয়েছে কে। সেই আশ্চর্য সুন্দর সদ্য জেগে ওঠা আকাশের দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল হরেন। চোখের পাতাটি অব্দি ফেলতে ইচ্ছে করল না তার।

আজ এই প্রথম তার মনে হল পৃথিবী জায়গাটা বড় সুন্দর। হরেনের প্রাণ আকুল করে বাঁচতে ইচ্ছে করল আজ। এই সময়েই গৌরদা ডেকে উঠল তাকে পিছন থেকে, 'ছোটবাবা, কী হয়েছে তোমার? এই সাত সকালে ঘর ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছো যে আজ! ঘুম থেকে উঠে তোমায় দেখতে না পেয়ে কী যে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম...খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসে দেখি ভূতে পাওয়া মানুষের মতন হাঁ মুখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছো তুমি...'

'সত্যিই আমাকে ভূতে পেয়েছে আজ গৌরদা', কেমন ঘোর লাগা গলায় বলে ওঠে হরেন। 'বড় আফশোস হচ্ছে গো এই ভূতটা এতদিন কেন আমার ঘাড়টাকে এড়িয়ে গেল...'

হরেনের কথার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারল না গৌর। ফ্যালফ্যাল করে সে তাকিয়ে রইল হরেনের দিকে। হরেন তার মুখের দিকে চুপ করে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর চাপা গলায় বলে, 'তুমি তো বহুদিন এ বাড়িতে আছো গৌরদা?'

'তা তো আছিই', আকাশের দিকে চেয়ে বলে গৌর, 'সেই ছোট্টবেলায় বাবার হাত ধরে এসেছিলুম এ বাড়িতে। আর ফেরা হল না...'

'এই বাড়ির মধ্যে কোথাও কোনো লুকনো সম্পত্তির কথা জানো তুমি?'

'সম্পত্তি?' হাঁ করে হরেনের মুখের দিকে চেয়ে বলে গৌর।

'হ্যাঁ। গুপ্তধন', আবার বলে হরেন। 'এই পুবের জমি বা পুকুরের আশেপাশে? ওটা পাবার আমার ভারি দরকার গৌরদা। এখনও অনেকদিন বাঁচতে হবে আমায়। বাঁচতেই হবে। আর সেই বাঁচার জন্যে ওই সম্পত্তি আমার বড্ড প্রয়োজন।'

'মাটির চেয়ে বড় সম্পত্তি আর কি কিছু আছে গো?' গৌর হাসে। 'এই পুবের জমির মাটি বহু ফসলি। আর ওই পুকুরের জল চিরকাল মিষ্টি। গায়ে-গতরে খেটে এগুলোকে সেবা যত্ন করলে এরা তোমাকে সত্যিই সোনার মোহর ফেরত দেবে। কিন্তু কথাটা হল সেই পরিশ্রম করার মানুষ কি আর তুমি গো?'

'কেন নয়? আমি কি পারব না বলছ?'

'কে জানে', ঠোঁট উলটে বলে গৌর, 'একদিনে কি পালটে যায় সব? এ দীর্ঘ অধ্যাবসায়ের ফল। এতদিন ধরে শরীরকে বসিয়ে বসিয়ে তুমি যে তাকে অপক্ত করে ফেলেছ...'

'সেই আমি আর নেই গো', হরেন হাসে। 'সেই অলস হরেন কাল রাতে মারা গেছে। আজ সকালে একটা নতুন হরেন জন্ম নিয়েছে। সে সব পারে। পাহাড় ফাটিয়েও জল বের করতে পারে সে।'

অবাক হয়ে হরেনের দিকে তাকিয়ে থাকে গৌর। ছেলেটাকে সত্যিই আজ কেমন অচেনা মনে হচ্ছে তার। এই কণ্ঠস্বর এই আত্মপ্রত্যয় আগে তো কখনও দেখেনি সে হরেনের মধ্যে। আজ তার সামনে সত্যিই যেন অন্য একজন মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। আনমনে ভাবতে থাকে গৌর এমন সত্যিই কি হয়? একটা রাতের মধ্যে একজন মানুষ মরে গিয়ে নতুন করে বেঁচে উঠতে পারে?

নিজের প্রশ্নগুলো মনের মধ্যে চেপে রেখেই বলে সে, 'তাহলে কী বলছ, এই জমিকে মেরামত করা হবে? আর ওই পুকুর?'

'আলবাত।' জোর দিয়ে বলে হরেন।

'কাল থেকে কাজে লেগে পড়ি চলো দুজনে।'

'কাল নয়, আজ', বলে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে হরেন। কথাটা গৌরদা মিথ্যে বলেনি। মোহর কি শুধু ঘড়ায় করে মাটিতে পোঁতা থাকে? এই মাটিই যে সোনার তাল দিয়ে তৈরি। মনে মনে নগেন গোঁসাইকে একবার প্রণাম করে নেয় হরেন। সঙ্গে প্রণাম করে নেয় জীবন জেঠুকেও। জীবন জেঠুর গণনাও একেবারে ভুল ছিল না। এই ঊনপঞ্চাশ বছর বয়েসে সত্যিই তো মৃত্যু হল সেই পুরোনো অলস হরেনটার...

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%