টমটম বাবার পাঠশালা

জয়দীপ চক্রবর্তী

রাস্তাটা ঢালু হয়ে গড়িয়ে ক্রমশ নীচের দিকে নেমে যাচ্ছিল। হাঁটতে তাই একটুও অসুবিধা হচ্ছিল না। রাস্তার একদিকে পাহাড়ের এবড়ো-খেবড়ো গা। সেই অমসৃণ গা জড়িয়ে আছে নানা রকম গাছপালার জঙ্গল। কিছু গাছ মস্ত বড়, কিছু গাছ আবার লতানো। অন্য গাছের গা জড়িয়ে ধরে ওপরে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করছে তারা। মাঝে মাঝেই মেঘ এসে গাছেদের গা জড়িয়ে ধরে এখানে। সবুজ পাতাগুলোকে আদর করে, চুমু খায়। তারপর কখনও অন্য কোথাও, অন্য কোনো গাছ বা পাহাড়ের কাছে উড়ে যায়, অথবা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে টুপটাপ ঝর ঝর শব্দে। এখানে না এলে কখনও জানাই হত না হয়তো দীপ্তর, গাছের পাতা কত ভিন্ন ভিন্ন রকমের সবুজ হতে পারে। তাছাড়া ভিজে ভিজে পাহাড় আর পাহাড়ের গা বোঝাই অরণ্যের যে একটা নিজস্ব গন্ধ আছে দীপ্ত আগে তা জানতই না। এখানে এসে জেনেছে। এমনকী বৃষ্টি-ধোয়া আকাশের যে ঝকঝকে নীল রং তাও নিজের বাড়িতে থাকলে দেখা যায় না কখনও।

ছোট মেসো ব্যাঙ্কে চাকরি করেন। কয়েক বছর অন্তর অন্তর বদলি হয়ে যেতে হয় তাঁকে। আগে কিছুদিন মেদিনীপুরে ছিলেন, তার আগে কলকাতাতেই, এখন শিলং। এখানে আসার পর থেকেই দীপ্তদের বার বার বলছেন তিনি ওখানে ঘুরে আসার জন্যে। কিন্তু যাব বললেই কি যাওয়া...বাবার অফিস, মায়ের স্কুল, দীপ্তর নিজের স্কুল সব সামলে ছুটি বের করা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। অবশেষে মেসো এখানে আসার প্রায় দেড় বছর পরে এবারে গ্রীষ্মের ছুটিতে শিলং বেড়াতে এসেছে দীপ্তরা।

মেসো যে বাড়িটায় থাকেন সেটা মূল শহরের বাইরে। টিনের চাল বাংলো প্যাটার্নের বাড়িটা ছবির মতন সুন্দর। বড় বড় পর্দা দেওয়া কাচের জানালা, সামনে ছোট্ট বাগান। সেই বাগানে এসে দাঁড়ালেই দূরের পাহাড়গুলো হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। অনেকখানি জায়গা ছেড়ে ছেড়ে বেশ কিছু ছোট-ছোট বাড়ি আছে এখানে পাহাড়ের খাঁজে-খাঁজে। সেসব বাড়ির কয়েকটায় মানুষ আছে। আবার কিছু বাড়ি এক্কেবারে ফাঁকা পড়ে আছে। মেসো বলছিলেন এটা একসময় একটা বাঙালি কলোনি ছিল। এখন তাদের অনেকেই চলে গেছে। এলাকাটার পরিবর্তনও হয়েছে অনেক। কিন্তু এখানকার প্রকৃতি এখনও একইরকম সৌন্দর্য বিছিয়ে রেখেছে চারদিকে। এখানকার পাহাড়, আকাশ, মেঘ, রৌদ্র সবাই মিলে এমন আকুল আমন্ত্রণ জানায় সব্বাইকে যে এ জায়গাটাকে ভালো না বেসে আর উপায়ই থাকে না কারো। দীপ্তরও জায়গাটা ভালো লেগে গেছে খুব। সেই যে দিন প্রথম এল সেদিন থেকেই।

এখানে এসেই মা বলে দিয়েছিলেন, 'শোনো, অচেনা জায়গা, আমাদের সঙ্গে ছাড়া এক পাও ফেলবে না কোথাও।' কিন্তু মাসি-মেসো দুজনেই উড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর কথা। মাসি হেসে বলছিলেন, 'তুই কী রে দিদি, ছেলেটাকে বড় হতে দিবি না নাকি...এখানে কী হবে একলা বেরোলে। গাড়ি ঘোড়ার ভয় নেই, হারিয়ে যাবার ভয় নেই। ক'টা দিনের জন্যে এসেছে ঘুরুক না একটু নিজের মতন'। ভাগ্যিস বলেছিলেন মাসি কথাটা। তা নাহলে এমন করে ইচ্ছে মতন কিছুতেই ঘুরে বেড়াতে পারত না দীপ্ত।

মাসির মেয়ে রুচিরা দীপ্তর চেয়ে দু-বছরের ছোট। কিন্তু দীপ্তকে দাদা হিসেবে একেবারেই পাত্তা দেয় না সে। তাছাড়া দীপ্ত সঙ্গে করে একটা ম্যাগনেটিক চেস এনেছিল কলকাতা থেকে আসার সময়। সেটা দীপ্তর খুবই প্রিয়। রুচিরা বায়না করে আজ মায়ের কাছ থেকে ওটা বাগিয়ে নিয়েছে। দীপ্ত ওটা দিতে চাইছিল না একেবারেই। কিন্তু মা ওর কথা শোনা তো দূরের কথা উলটে বকা দিলেন ওকে। দীপ্ত তবুও হয়ত এতটা রেগে যেত না, কিন্তু দাবাটা নিজের হাতে নিয়ে ওর দিকে চেয়ে এমন বিচ্ছিরি করে হাসল রুচিরা যে তখন থেকে মাথায় যেন একেবারে আগুন জ্বলে আছে দীপ্তর। দীপ্তর মনে হচ্ছিল রুচিরা অনেকটা যেন ওর ক্লাশের রুদ্রর মতন। বিশ্বের হিংসুক। পরীক্ষার সময় কাউকে হেল্প করে না।

একদিন বাংলার রমাপদ স্যারের ক্লাশে পড়া করে যায়নি দীপ্ত, স্যার ক্লাশে আসামাত্র এ কথাটা তাঁকে বলে দিয়ে ওকে মার খাইয়েছিল রুদ্র। পরে একসময় সে অবশ্য সরি বলেছিল দীপ্তকে; কিন্তু দীপ্ত ব্যাপারটা মনে রেখে দিয়েছে। সময় সুযোগ মতন রুদ্রকেও ঠিক একদিন মার খাওয়াবে ও। এটা বলতে গেলে ওর একটা প্রতিজ্ঞা। তেমন বাড়ি ফেরার আগে রুচিরাকে অন্তত একটা শিক্ষা দেবেই দেবে এটা সে আজ মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে।

আজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে এই কথাটাই ভাবছিল ও। নানা প্ল্যান করছিল কী ভাবে মেয়েটাকে প্যাঁচে ফেলে দেওয়া যায়। ও যেমন দীপ্তর চেস নিয়ে নিয়েছে তেমন ওর খুব প্রিয় জুল ভার্ন এর গল্পের বই এর পুরো সেটটা মাসিকে বলে হাতিয়ে নেবে ও? কিন্তু এটা ঠিক পছন্দসই হল না। কলকাতায় বইগুলো পাওয়া যাবেই, শুধুমুধু এখান থেকে বয়ে নিয়ে যাওয়া মানে নিজেরই কষ্ট। তাহলে কি বাড়ির সামনে ওর প্রিয় ফুলগাছটা ভেঙে দিয়ে যাবে বাড়ি ফেরার আগে? কিন্তু তাতে মাসি আর মেসোও তো কষ্ট পেতে পারেন। জুতসই কোনো প্ল্যানই যেন মাথায় আসতে চাইছে না।

হঠাৎ শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়ার স্রোতটা গায়ে এসে লাগতেই সম্বিৎ ফিরল দীপ্তর। এই রে অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে-হাঁটতে এত দূরে চলে এসেছে খেয়ালই করেনি এতক্ষণ। ঢালু গড়ানো সহজ পথে আনমনে দিব্বি হেঁটে গেছে সে এতক্ষণ। তাছাড়া চার্চের পাশে যেখানে রাস্তা দু-ভাগ হয়ে দুদিকে চলে গেছে, সেখানে ভুল করে যে পথে যাওয়ার কথা তার উল্টো পথে চলে এসেছে সে নিজের অজান্তেই। গা ছম ছম করে উঠল দীপ্তর। এ দিকটা নির্জন, জনমনিষ্যিহীন। তাছাড়া এ দিকটা নাকি ভালো নয়। প্রথম যে দিন একা বিকেলে বাইরে বেরোল সেইদিনেই মেসো বার বার বলে দিয়েছেন এদিকে না আসতে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে বিছিয়ে থাকা জঙ্গল এদিকে অনেক বেশি ঘন। পাহাড়ের গা দেখাই যায় না প্রায়। বড় বড় গাছ তো আছেই এ ছাড়াও নানারকম লতা-গুল্মে পাহাড়ের সবুজ আরো যেন বেশি গাঢ় মনে হচ্ছে এখন।

পেঁজা তুলোর মতন মেঘ এসে দীপ্তকে জড়িয়ে ধরল এই সময়ে। সামনের নীচু হয়ে যাওয়া রাস্তাটা চোখের সামনে থেকে আবছা হয়ে মুছে গেল। মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে। ইশ, বাড়ি থেকে বের হবার সময় আকাশ ঝকঝকে ছিল দেখে ছাতা রেনকোট কিছুই সঙ্গে নেয়নি দীপ্ত। এক্ষুনি যদি ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে কোথায় দাঁড়াবে সে? পাহাড়ের খাঁজে পা রেখে বড়সড় গাছ দেখে তার নীচে গিয়ে দাঁড়াবে যে তারও জো নেই। এ দিকের জঙ্গলে নাকি জন্তু-জানোয়ারের অভাব নেই। চিতা-টিতাও থাকতে পারে। এখন মনে হল খানিক আগে পথের পাশে একটা বোর্ডে যেন বাঘের ছবি দিয়ে তেমন কথাই লেখা ছিল...গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল দীপ্তর, আর তখনি টুপটাপ টুপটাপ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। দীপ্ত থমকে দাঁড়ালো একটু। তারপর পিছু ফিরল। ভাবল জোরে দৌড় লাগাই। তেড়েফুঁড়ে বৃষ্টি নামার আগেই যে ভাবে হোক বাড়ি পৌঁছতে হবে। এখন জলে ভিজলে আর রক্ষে নেই। এমনিতেই বারোমাস ঠান্ডা লাগার ধাত তার।

বুক ভরে দম নিয়ে দৌড় শুরু করতে গেল দীপ্ত, আর ঠিক তখনি খিক খিক খিক খিক করে চাপা হাসির শব্দটা কানে এল তার। ছুটতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল দীপ্ত। এমন নির্জন জায়গায় অমন কুৎসিত ভাবে হাসে কে... শব্দ অনুসরণ করে ডান দিকে তাকায় সে, আর তখনই ছেলেটাকে চোখে পড়ে তার। হাল্কা নীল ট্রাউজার আর ফুলস্লিভ সাদা জামা পরা ছেলেটা রাস্তার পাশে খানিক তফাতে যেদিকে পাহাড়ি রাস্তার গা গড়িয়ে ঢালু খাদটা নেমে গেছে নীচের দিকে, সেইখানে দাঁড়িয়ে চোখ মটকে হাসছিল দীপ্তর দিকে চেয়ে।

ছেলেটাকে দেখে প্রথমটা অবাক হয়ে গেল দীপ্ত। বলা নেই কওয়া নেই দুম করে ভোজবাজীর মতন ছেলেটা কোত্থেকে এসে হাজির হল এখানে! পরক্ষণেই ছেলেটার ওপরে রাগ হয়ে গেল তার। রুচিরার ওপরে জমে থাকা রাগটা প্রায় অকারণেই গিয়ে পড়ল এই অচেনা ছেলেটার ওপর। মনে হল এক ঠেলা মেরে ফেলে দিই ওকে ঢালু খাদের দিকে। মজা বুঝবে তখন। শুধুমুধু বোকার মতন ওর দিকে তাকিয়ে অমন টিটকিরি মারা হাসি তখন বেরিয়ে যাবে। এই ভেবে কটমট করে ওর দিকে তাকাতেই ছেলেটা ক্যামন যেন থতমত খেয়ে গেল। মুখটা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল তার। তার এই থতমত ভাবটা বেশ উপভোগ করল দীপ্ত। তারপর তার দিকে দু পা এগিয়ে গিয়ে গলাটা যথাসম্ভব ভারি করার চেষ্টা করে বলে উঠল, 'আমায় দেখে খামোকা অমন বিচ্ছিরি করে হাসছিলে ক্যানো?' বলেই মনে হল তার ব্যাপারটা বোকামি হয়ে গেল। এখানকার ছেলে বাংলা বুঝবে না তো। তার হিন্দি বলা উচিৎ ছিল। কিন্তু হিন্দিতে কথাটা গুছিয়ে নিতে যে টুকু সময় লাগে তার মধ্যেই বেশ স্পষ্ট আর ঝরঝরে বাংলাতেই কাঁচুমাচু মুখে ছেলেটা বলে উঠল, 'আমি তো এমনিই হাসছিলাম, তোমার কাণ্ড দেখে। হাসিটা তোমার বিচ্ছিরি লাগবে আমি বুঝতে পারিনি, বিশ্বাস কর...'

ছেলেটার কথায় আরো রাগ হয়ে গেল দীপ্তর। কঠিন মুখে সে বলল, 'আমি বাঁদর না হনুমান...আর কী এমন কাণ্ড আমি করলাম যে তোমার অমন হাসি পেয়ে গেল আমায় দেখে। আমি জানি তুমি আমায় দেখে ইচ্ছে করে আমায় প্যাঁক মারার জন্যেই হেসেছ। এখন মনে হচ্ছে এটা এ জায়গাটারই দোষ। এখানকার সব ছেলে-মেয়েই বোধহয় এই রকম। ছিটেল আর অসভ্য...'

'ওরেবাবা, এখানকার আর কে তোমার সঙ্গে এমন করল?' কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল ছেলেটা।

'কে আবার, রুচিরা', ঠোঁট উলটে বলল দীপ্ত।

ছেলেটার মুখে একটা মৃদু হাসি ফিরে এল আবার। খুব মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করল সে, 'রুচিরা কে?'

'আমার বোন'। দীপ্ত গম্ভীর হয়েই উত্তর দিল।

'ওর ওপরে তোমার খুব রাগ দেখছি...'

'হবে না, সবসময় আমার পিছনে পড়ে আছে। আমায় তো দাদা বলে মানেই না...'

'এটা সত্যিই অন্যায় ওর'। ছেলেটা মাথা নাড়ে।

'অন্যায় নয় বলো...'

'একশবার অন্যায়'। বলে দীপ্তর মুখের দিকে চেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল ছেলেটা। ছেলেটা হঠাৎ তার পক্ষ নিয়ে নেওয়ায় ওর ওপরে জমে ওঠা রাগটা খানিক হাল্কা হয়ে গেল দীপ্তর। অনেকটা স্বাভাবিক গলায় সে বলল, 'ঠিক আছে আমাকে আর ভয় পাবার দরকার নেই। এক্ষুনি তোমাকে একটা শাস্তি দেবার কথা ভেবেছিলাম, আপাতত সেটা মুলতুবি করে দিলাম...'

'কিন্তু আমি তো তোমায় ভয় পাইনি একটুও', দীপ্তকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে ওঠে ছেলেটা।

'তুমি মিথ্যে বলছ। আমি দেখলাম তুমি ভয়ে মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে ছিলে আমি ধমকে ওঠার পর'। দীপ্ত প্রতিবাদ করে ওঠে।

'আমি মিথ্যে বলি না। ভয়ও পাই না। আমাদের ভয় পাওয়াও মানা, মিথ্যে বলাও মানা। আমি ভয় পেয়েছি শুনলে বা মিথ্যে বলেছি জানলে টমটমবাবা খুব কষ্ট পাবেন মনে মনে। তিনি বলেন যারা অপরাধ করে তারাই মিথ্যে দিয়ে নিজেদের আড়াল করে আর অযথা ভয় পায়। যারা সঠিক পথে চলে আর যাদের নিজেদের ওপরে বিশ্বাস আছে তারা ভয় পায় না, তারা মিথ্যেও বলে না...' বলতে বলতেই খপ করে দীপ্তর ডান হাতটা নিজের বাঁ হাতে চেপে ধরে ছেলেটা তারপর আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে একবার তাকিয়ে নিয়েই দীপ্তর হাত ধরে টান দেয়, 'এক্ষুনি আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। জোর পশলা হবে একখানা। জোরে বৃষ্টি নামার আগেই আমাদের পাঠশালায় পৌঁছোতে হবে'।

'পাঠশালা...!' অবাক হয়ে বলে দীপ্ত, 'এখানে এই নির্জন পাহাড়ি জংলা পথে পাঠশালা কোত্থেকে আসবে ?'

'টমটমবাবার পাঠশালা...' বলেই দীপ্তর হাত ধরে দ্রুত পাহাড়ের গা দিয়ে চলা পিচের বাঁধানো রাস্তা ছেড়ে একটা পাকদন্ডী পথে চলতে শুরু করে সে। দীপ্ত বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় এবার। ছেলেটাকে চেনে না সে। এই অচেনা জায়গায় কোন অজানা পাকদন্ডী পথে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। না জেনে কোনো বিপদে পড়তে চলেছে নাকি সে...

ছেলেটা যেন দীপ্তর মনের কথাটা নিজে থেকেই পড়ে ফেলল। দীপ্ত কিছু বলার আগেই সে দীপ্তর হাতে একটা আলতো চাপ দিয়ে বলল, 'ভয় পেও না। তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। আমি তো আছি, আর টমটমবাবা আছেন...'

'আমি বাড়ি যাব'। তার কথায় আশ্বস্ত হতে পারল না দীপ্ত।

'বাড়ি গিয়ে পৌঁছনোর আগেই তুমি ভিজে চুপ্পুস হয়ে যাবে। আর বৃষ্টিতে ভিজলেই তো তোমার আবার হাজারটা হ্যাঁচ্চো...' ছেলেটা চলতে চলতেই বলে উঠল হাসতে হাসতে।

ও কী করে জানল যে বৃষ্টিতে ভিজলে সহজেই ঠান্ডা লেগে যায় দীপ্তর, আর একবার ঠান্ডা লাগলেই হাঁচির চোটে একশা হয়ে যায় সে। ছেলেটার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে নিল সে। পাহাড়ের গাছগাছালি ঝোপ জঙ্গল ঠেলে দীপ্তর হাত ধরে ক্রমশ ওপরের দিকে উঠছে এখন সে। দীপ্তর বেশ কষ্ট হচ্ছে। হাঁফ ধরে যাচ্ছে। ছেলেটা নির্বিকার। ওকে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে দীপ্তর। দীপ্তকে অবাক করে দিয়ে ঠিক তখনি বলে উঠল ছেলেটা, 'ওপরে উঠতে কষ্ট হচ্ছে তোমার, হাঁফিয়ে যাচ্ছো?'

'হ্যাঁ'। ছোট্ট উত্তর দেয় দীপ্ত, 'তোমার কষ্ট হচ্ছে না?'

'উঁহু', ছেলেটা আবার মিষ্টি করে হাসে, 'আগে হতো। টমটমবাবা তখন বলতেন মনে রাখিস রবিন উঁচুতে ওঠা সবসময় কঠিন। কিন্তু তাই বলে ওপরে ওঠার চেষ্টাটা কখনও ছাড়বি না...'

'তোমার নাম তাহলে রবিন?'

'হ্যাঁ'।

'আমার নাম দীপ্ত। বন্ধুরা আমায় দীপ বলে ডাকে', বলে একটু থামে দীপ্ত। তারপর বলে, 'তুমি যে বারবার টমটম বাবার কথা বলছ উনি কে? আর ওনার পাঠশালাটাই বা কোথায়?'

এতক্ষণে স্বাভাবিক উচ্ছলতায় হই হই করে হেসে ওঠে রবিন। চোখ চকচক করে ওঠে তার, 'টমটমবাবা হলেন গিয়ে আমাদের ফাদার টমসন। এই অঞ্চলের আশপাশের গাঁয়ের-গরীব গুরবো ছেলে-মেয়েদের জন্যে শিক্ষাদানের জন্যে স্কুল খুলেছিলেন তিনি। তাদের খাওয়া পরা চিকিৎসারও ব্যবস্থা করেছিলেন। এখানকার মানুষ খুবই ভালোবাসে তাঁকে। নির্ভর করে তাঁর কথায়। আদর করে তাঁকে ডাকেন টমটমবাবা বলে। আর তাঁর স্কুলকে বলে টমটমবাবার পাঠশালা...' বলতে বলতেই একজায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ে রবিন। ডান হাতটা সামনে উঁচু করে বলে এই যে এসে গেছি...'

গাছ পাতার ফাঁকে বেড়া দিয়ে ঘেরা টিনের চালের অনাড়ম্বর ঘরগুলো এবারে চোখে পড়ে দীপ্তর। দমকা হাওয়ায় গাছের ডালে দোলা লেগেছে তখন। বৃষ্টির ফোঁটা বাড়তে শুরু করেছে। রবিন বলল, 'দৌড়ও...'

পায়ের নীচের স্যাঁতসেতে জমা পাতা মাড়িয়ে হরজাই গাছপালার মধ্যে দিয়ে ছুট লাগালো দীপ্ত। রবিনের হাত ছাড়িয়ে। সঙ্গে সঙ্গে হাঁক দিল রবিন, 'দীপু, দাঁড়াও। হাত ছেড়ো না আমার। আমার হাত ছেড়ে দিলে তুমি পাঠশালাটাকে খুঁজেই পাবে না আর...'

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল দীপ্ত। রবিনের কথাটা বুঝতে পারল না সে ঠিকঠাক। রবিন দ্রুত এগিয়ে এসে আবার তার ডান হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে ভরে নিল। তারপর দীপ্তর পায়ের সাথে পা মিলিয়ে ছুট্টে চলে এল নিরিবিলি স্কুল বাড়িটার মরচে ধরা লোহার নীচু গেটের সামনে।

ঘটাং করে গেটের মাথায় লাগানো অর্ধবৃত্তাকার লোহার হুড়কোটা খুলে যেই দীপ্তকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল রবিন, অমনি কোত্থেকে পেল্লায় একটা কুকুর দৌড়ে এল। তারপর দীপ্তর দিকে চেয়ে ভয়ানক চিৎকার করতে লাগল হিংস্র ভঙ্গীতে। কুকুরটা এত বড় আর এমনই ভয়ংকর যে দীপ্ত মারাত্মক ভয় পেয়ে গেল। আড়চোখে একবার দীপ্তর দিকে তাকিয়ে নিয়েই চাপা গলায় কুকুরটাকে ধমকে উঠল রবিন, 'আহ টাইগার, ওকি অসভ্যতা, দীপু আমার বন্ধু...' কুকুরটা রবিনের দিকে একপলক তাকিয়ে দীপ্তর সামনে থেকে সরে গিয়ে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে মুখ দিয়ে বিচ্ছিরি গররর গররর করে আওয়াজ করতে লাগল। রবিন দীপ্তর হাত ধরে টেনে আরো একটু এগিয়ে বাঁ দিকের লম্বা বাড়িটার বারান্দায় উঠল আর তখনই জোরে বৃষ্টিটা নেমে পড়ল হুড়মুড় করে। টাইগার নামে কুকুরটাও একলাফে বারান্দায় উঠে এসে লম্বা হয়ে শুয়ে সামনের পা দুখানার ওপরে মাথা রেখে রাগী-রাগী চোখে তাকিয়ে রইল দীপ্তর দিকে। ওর চোখের দিকে তাকাতে ভয় করছিল দীপ্তর। রবিনকে ভয়ে ভয়ে বলেই ফেলল ও, 'কুকুরটা আমায় একেবারেই পছন্দ করছে না রবিন...'

'হুঁ'। প্রতিবাদ করল না রবিন দীপ্তর কথায়।

'কামড়ে দেবে না তো?'

'না'।

'তুমি অমন নিশ্চিত হচ্ছ কী করে?'

'আমি জানি'।

'কী করে জানলে?'

'এখানে এই পাঠশালায় আমরা যারা থাকি তারা অন্যকে আঘাত করি না, কষ্ট দিই না, হিংসা করি না...ফাদার টমসন আমাদের এসব ভুলিয়ে দিয়েছেন...' বলে আকাশের দিকে চেয়ে রইল রবিন উদাস চোখে।

'তাহলে আমার দিকে অমন রাগী চোখে তাকিয়ে আছে ক্যানো কুকুরটা?'

রবিন হাসল, 'তোমার শরীর থেকে যে অরা বেরিয়ে আসছে সেটা ও মেনে নিতে পারছে না দীপু...'

'মানে?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে দীপ্ত।

'আমাদের সকলেরই শরীর আসলে নানা রকম তরঙ্গ দিয়ে তৈরি জানো তো, আমাদের মনের গতিপ্রকৃতি সেই তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে অনেকসময়...'

'আমি তবুও বুঝতে পারছি না রবিন', অসহায় কন্ঠে বলে ওঠে দীপ্ত।

একটা চাপা হাসির শব্দে দু'জনেই চমকে তাকায়। বৃষ্টি থেমেছে। সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে তাদের খুব কাছেই এসে দাঁড়িয়েছেন এক বৃদ্ধ। কখন যে এলেন তিনি বুঝতেই পারেনি দীপ্ত। এখন তাঁর দিকে তাকিয়ে মনটাই যেন ভালো হয়ে গেল। তাঁর মাথার সাদা চুলগুলো ছোট করে ছাঁটা। ফর্সা মুখে হাল্কা সাদা দাড়ি গোঁফ। পরনে সাদা আলখাল্লা, গলায় রুপোর তৈরি পবিত্র ক্রশ। তিনি দীপ্ত আর রবিনের দিকে চেয়ে ভারি মিষ্টি করে হাসলেন। সে হাসি এত সুন্দর যে মুগ্ধ না হয়ে পারাই যায় না। দীপ্ত নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলল তাঁকে। রবিন মাথা নীচু করে প্রণাম জানাল তাঁকে। তারপর দীপ্তর দিকে ফিরে বলল, 'দীপু ইনিই ফাদার টমসন। এঁর কথাই বলছিলাম তোমায়'। ফাদার দীপ্তর দিকে চেয়ে হাসলেন। তোমার নাম দীপু?'

'হ্যাঁ, এটা আমার ডাকনাম। আসলে আমার নাম দীপ্ত...'

'আমারও একটা নিকনেম আছে জানো তো', ফাদার দীপ্তর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলেন, 'এখানকার বেশিরভাগ মানুষ আমায় টমটমবাবা বলে ডাকে। তুমিও আমাকে তাই বলেই ডাকতে পারো, অবশ্য নামটা যদি তোমার খুব অপছন্দ না হয়...'

দীপ্তর মানুষটাকে দেখে এমনিতেই শ্রদ্ধা জাগছিল মনে। এবারে সে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার জন্যে নীচু হল তাঁর সামনে। টমটমবাবা ওর হাতদুটো ধরে ফেললেন, 'ডোন্ট টাচ মাই ফিট...'

'ক্যানো টমটমবাবা?'

'তোমার মধ্যে যিনি আছেন আমি যে তাঁকে শ্রদ্ধা করি। তাঁকে আমি প্রণামও করি মনে মনে...' বলেই প্রসঙ্গ পালটে ফেললেন তিনি। রবিনের দিকে ফিরে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'কী নিয়ে তোমাদের কথা হচ্ছিল রবিন...'

রবিন তাঁর কথায় একটু লজ্জা পেয়ে গেল। মাথা নামিয়ে নীচু গলায় সে বলতে লাগল, 'দীপুর মনের মধ্যে হিংসা আর আত্মাভিমানের তরঙ্গ দেখতে পেয়ে টাইগার ওর ওপরে রেগে যাচ্ছে। আমি ওকে এ বিষয়ে সতর্ক করার চেষ্টা করছিলাম ফাদার...'

দীপ্ত মনে মনে ভয়ানক চমকে উঠল এ কথাটা শুনে। কুকুরটা সত্যি সত্যি ওর মনটাকে পড়তে পারে, নাকি এমনি এমনিই। এ বিষয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে যায় দীপ্ত। ওদের থেকে পনের বিশ ফুট দূরে ঘাসের ওপর দিয়ে সর সর করে বুকে হেঁটে এগিয়ে আসা সাপটা নজরে পড়ে যায় ওর। সাপটা বেশ বড়। ধূসর কালো রঙ। নিশ্চিত বিষধর হবে ওটা। দীপ্ত ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল, 'টমটমবাবাআআআ'—

দীপ্তর চিৎকারে ফাদার টমসন সাপটার দিকে তাকালেন। রবিনও। কিন্তু তাদের কারো চোখেই উদ্বেগের লেশমাত্র নেই। সাপটা আরো এগিয়ে এসেছে এখন। দীপ্তর থেকে মাত্র হাত পাঁচ-ছয় তফাতে। দীপ্ত একটু নড়তেই লেজের ওপরে ভর দিয়ে পুরো শরীরটাকেই সোজা করে উঠে দাঁড়াল সে মস্ত ফনা তুলে। দীপ্তর দিকে চেয়েই ধীরে দুলতে লাগল ডান দিক, বাঁদিক। ভয়ে জিভ শুকিয়ে গেছে এখন দীপ্তর। গলা শুকিয়ে কাঠ। পা দুটো থির থির করে কাঁপছে। পাথরের মূর্তির মতন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। রবিন চাপা গলায় বলল, 'ভয় পেয়ো না'। কিন্তু মনে একটুও ভরসা এল না দীপ্তর। টমটমবাবা হঠাৎ তাঁর ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে দুদিকে দোলাতে লাগলেন আর খুব নরম গলায় বলতে লাগলেন, 'নো, নো মাই চাইল্ড...তুমি জঙ্গলে ফিরে যাও, তুমি জঙ্গলে ফিরে যাও...' আর কী আশ্চর্য, সাপটা একটুক্ষণ স্থির হয়ে থেকেই ফনা নামিয়ে নিল। তারপর অত্যন্ত বাধ্য ভঙ্গীতে পিছু ফিরে যেমনি এসেছিল ঠিক তেমনই শুকনো পাতায় সর সর আওয়াজ তুলে আবার গাছপালার আড়ালে হারিয়ে গেল। দীপ্ত বড় বড় চোখ করে তাকালো টমটমবাবার দিকে, 'আপনি কি ম্যাজিক জানেন?'

'উঁহু', ফাদার টমসন হাসলেন, 'এটা কোনো অলৌকিক ঘটনা নয় দীপু, ম্যাজিকও নয়।'

'তবে?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করে দীপ্ত।

'এটা জীবন চর্চার এক বিশেষ অনুশীলন...'

'কীরকম?'

'মাই সান', ফাদার দীপ্তর মাথায় হাত রাখলেন, 'তুমি যদি মনের মধ্যে লোভ আর হিংসা জমিয়ে রাখো তাহলে প্রকৃতি ও তার আনুষঙ্গিক সমস্ত কিছুই আরো আরো বেশি লোভী আর হিংসুটে হয়ে গিলে ফেলতে আসবে তোমায় সারা জীবন জুড়ে। কিন্তু তুমি যদি সত্যি সত্যি মন থেকে হিংসার ভাবটা সরিয়ে ফেলতে পারো, দেখবে এই পৃথিবীটা সত্যিই কত স্নিগ্ধ, কত সুন্দর আর কত বিপদবিহীন...'

'তাই বলে সাপের মতন বিচ্ছিরি আর বিপজ্জনক প্রাণীও...'

'ওকে ক্যানো তুমি মিছিমিছি বদনাম করছ, ও তো আত্মরক্ষা ছাড়া অন্য কোনো সময় হিংস্রতা দেখায় না, অথচ আমরা যারা সভ্য মানুষ বলে দাবি করি তারা ভেবে দেখ আরো কত বেশি হিংস্র হয়ে উঠি মাঝে মাঝে অকারণ...'

কথাটা মিথ্যে নয়। দীপ্ত মাথা নামিয়ে ফেলে। ফাদার টমসন বলে চলেন, 'অহিংসা আর ভালোবাসা দিয়ে সব জিতে নেওয়া যায়। তুমি যদি ভালোবাসো অন্যেরাও একদিন ঠিক বাধ্য হয়ে যাবে তোমার। আমি এই কথাগুলো শেখাবার জন্যেই এখানে কতদিন ধরে অপেক্ষা করে আছি জানো...আমার এখানে থাকতে কষ্ট হয়, রবিনেরও। বাকিরা তো চলেই গেছে এই কষ্ট সইতে পারবে না সেই ভয়ে...'

'কোথায় টমটমবাবা?' দীপ্ত জিগ্যেস করে।

'অনেক দূরে। আসলে এখানকার কাজ আমাদের শেষ। আমাদের ফিরে যাবার কথা। অথচ আমি ফিরতে পারছি না। শুধু মনে হচ্ছে কাজ বাকি রয়ে গেল, বাকি রয়ে গেল। মানুষকে ভালোবাসা শেখানোর যে ব্রত নিয়ে এখানে এসেছিলাম তা কিছুতেই শেষ করতে পারছি না...একের পর এক হিংসুটে মানুষ, লোভী মানুষ, অসৎ মানুষ, মিথ্যুক মানুষ স্রোতের মতন আসতে থাকে, আসতেই থাকে। আর আমারও কিছুতেই এ জায়গা ছেড়ে যাওয়া হয় না আর। ফিরে আসতে হয়...' বলতে বলতে বেদনায় ভারি হয়ে আসে তাঁর কণ্ঠস্বর। দীপ্তর বুকের মধ্যে গিয়েও সেই যন্ত্রণার ঢেউ ধাক্কা মারে। মনের মধ্যে তোলপাড় করে ওঠে তার। ফাদারের জন্যে চোখে জল গড়িয়ে আসে। তাঁর হাতদুটো নিজের হাতে চেপে ধরে সে ভেজা গলায় বলে ওঠে, 'আমি আপনার কথা মনে রাখব টমটমবাবা। কক্ষনও ভুলে যাব না'।

'ঠিক বলছ?'

'ঠিক বলছি। আমি রুচিরার ওপরে আর কখনও রাগ করে থাকব না। ওকে আমার সব ভালো খেলনা দিয়ে দিতে হলেও মন খারাপ করব না। স্কুলের বন্ধুদের সবসময় সাহায্য করব...'

'ওদের আমার কথা বোলো। বোলো ছোটরা হিংসুটি হলে টমটমবাবার আর ফিরে যাওয়া হবে না কোনোদিন...এমনি করেই কষ্ট পেতে হবে তাঁকে মনে মনে...'

'বলব। আর কাল রুচিরাকে আপনার কাছে নিয়ে আসব। ও খুব ভালো মেয়ে। খুব বুদ্ধি ওর। ও আপনার সব কথা আরো ভালোভাবে বুঝবে। আমি তো বোকা। আমি সব বুঝি না...'

'কে বলে তুমি বোকা?' আবার ওর মাথায় হাত রাখেন ফাদার টমসন।

'আমার মা বলেন, রুচিরাও বলে...'

'তুমি খুব ভালো ছেলে দীপ্ত। তোমায় আমার খুব ভালো লেগেছে। তাই তো তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম আমি তোমার স্থান আর তোমার কালকে পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে...'

'মানে?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে দীপ্ত।

'এখানে একটা নির্দিষ্ট কালখন্ডকে জোর করে ধরে রেখেছি আমরা। সময় এখান থেকে নড়তে পারে না কিছুতেই।'

টমটমবাবার কথার মানে বুঝতে পারল না দীপ্ত। বলল, 'কাল আবার আমি আসব এখানে টমটমবাবা।'

টমটমবাবা হাসলেন। তার কথার উত্তর দিলেন না। রবিনের দিকে চেয়ে বললেন, 'ওকে এই সময়ের বেড়াটুকু পার করে দিয়ে এস রবিন। এরপরে সত্যিই দেরি হয়ে যেতে পারে দীপ্তর।

বাড়ি ফিরতে সন্ধে পেরিয়ে গেল দীপ্তর। মা-মাসি দু'জনেই দুশ্চিন্তা করছিলেন। মেসো বাড়ি ফিরে এসেছেন আজ তাড়াতাড়ি। দীপ্ত গেটের লোহার দরজা ঠেলে উঠোন মাড়িয়ে ঘরে ঢুকতেই হাল্কা গলায় বলে উঠলেন, 'এই তো এসে গেছে দীপু। অহেতুক এত চিন্তা করো তোমরা... বললাম তো কোথায় আর হারাবে ছেলেটা এই ছোট্ট জায়গায়। গেছে হয়ত এদিক ওদিক। ঘুরে-টুরে দেখছে আশপাশটা...' রুচিরা মুখ টিপে একটু হেসে যোগ করল, 'দু-চার ফোঁটা বৃষ্টি পড়তেই মাসি এমন করতে শুরু করল যে আমার মনে হল ও বোধহয় নুনের পুঁটুলি, গায়ে জল লাগলে গলে যাবে একেবারে...'

মাথাটা দুম করে গরম হয়ে যাচ্ছিল দীপ্তর। ঝট করে সামলে নিল সে নিজেকে। টমটমবাবাকে সে কথা দিয়েছে রাগ, হিংসা, লোভ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করবে। কাজেই রুচিরার কথাটাকে আমলই দিল না দীপ্ত। বরং পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে রুচিরার দিকে এগিয়ে দিল সে, 'এই নে। ফেরার সময় কিনলাম। আমার একটা আর একটা তোর। ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছিল। অনেকটা হেঁটে ফেলেছি আজ। আসলে অন্যদিন যে দিকে যাই আজ অন্যমনস্ক হয়ে একেবারে উল্টোপথে চলে গিয়ে...'

'উল্টোপথ মানে, কোন দিকে গিয়েছিলি তুই?' মাসি জিগ্যেস করলেন।

'গির্জার দিকে। তারপর ওখানে পথটা যেখানে দু-ভাগ হয়ে দু-দিকে চলে গেছে সেখানে গিয়ে ভুল করে আমি বাঁ হাতি পথটা ধরে অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছিলাম...'

'মাই গড', মেসোর গলায় এই প্রথম উদবেগ টের পেল দীপ্ত, 'ওদিকে যেতে আমি বারণ করেছিলাম যে...'

'আমি ইচ্ছে করে না, অন্যমনস্ক হয়ে চলে গিয়েছিলাম। অনেক্ষণ পরে যখন খেয়াল হল তখন পাহাড়ি ঢালু পথে অনেকটা পথ এগিয়ে গেছি আমি। আমার তখন ভয় লাগছিল। তাড়াতাড়ি যে বাড়ি আসব সেও হল না, হঠাৎ বৃষ্টি এসে গেল। ভাগ্যিস সে সময় রবিনের সাথে দেখা হল...'

'কে?' মাসি তার মুখের কথা কেড়ে নিলেন।

'রবিন', আবার বলে দীপ্ত, 'ও আমায় টমটমবাবার পাঠশালায় নিয়ে গিয়ে তুলল। তা নাহলে বৃষ্টিতে ভিজতেই হতো আমায়...'

'কী সব আবোল-তাবোল বকছিস তুই', মাসি চোখ গোল করে বললেন, 'কার কাছে শুনলি বলতো দেখি টমসন সাহেবের গপ্প?'

'কার কাছে আবার শুনব', খুব স্বাভাবিক গলায় বলে দীপ্ত, 'আমি যে নিজে সেখানে গেলাম, তাঁর সাথে দেখা হল, কথা হল। কী ভালো মানুষ...আমার এত ভালো লেগেছে...ভাবছি কাল আবার যাব ওখানে...'

'না, যাবে না', মাসি আঁতকে উঠে বললেন, 'একা আর বাইরে বেরিও না তুমি...'

দীপ্তর বাবা সব শুনছিলেন এতক্ষণ। এবার কৌতূহলী হয়ে বললেন, 'ব্যাপারটা কী বলুন তো?'

মেসো বললেন, 'জানি না দীপু আমাদের সাথে জোক করছে কিনা, কিন্তু ও যে কথাটা বলছে সেটা প্রায় অসম্ভব'।

'ক্যানো?' দীপাঞ্জন আবার জিগ্যেস করলেন।

'অনেকদিন আগে এদিকটা যখন বাঙালি কলোনি ছিল, গির্জার বাঁদিকের রাস্তা ধরে অনেকখানি পাহাড়ি পথ পেরিয়ে একটা মিশনারি স্কুল ছিল। ফাদার টমসন সেটি চালাতেন। পুরোন লোকেদের কাছে অনেক সুখ্যাতি শুনেছি তাঁর। গরীব-গুরবো মানুষজনকে সাহায্য করতেন তিনি দরাজ হাতে। বাচ্চাদের অসম্ভব ভালোবাসতেন। তাদের মরালিটি বাড়ানোর কাজে দিনরাত পড়ে থাকতেন নাকি মানুষটা। এখানকার বাঙালি ছেলেরা অনেকেই তাঁর স্কুলে পড়তে যেত। কলোনির লোকেরা স্কুলটার নাম দিয়েছিল টমটম বাবার পাঠশালা। সকালে স্কুলে গিয়ে সেখানেই সারাদিন পড়াশুনো, খাওয়াদাওয়া, খেলাধুলো সেরে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে আসত তারা। তাঁর সঙ্গে থাকত শুধু রবিন নামে একটি অনাথ ছেলে আর তাঁর পোষা কুকুর টাইগার...'

'তারপর?'

'একরাতে ভয়াবহ এক ভূমিকম্পে স্কুলবাড়ি ধসে পড়ে। পাহাড়েও ধস নামে বিরাট জায়গা জুড়ে'।

'ইশ', দীপ্ত বলে ওঠে, 'আর টমটম বাবা, রবিন, টাইগার?' 'স্কুলবাড়ি চাপা পড়ে যায়। সকালে রেসকিউ পার্টির লোক তাদের মৃতদেহ সনাক্ত করে। ওইখানেই সমাধি দেওয়া হয় তাদের তিনজনকেই। পাশাপাশি। জায়গাটা এখন দুর্গম, জঙ্গলে মোড়া। বন্য জন্তু জানোয়ারও থাকতে পারে ওদিকে। এসে থেকে দেখেছি ওই দিকটা এখানকার মানুষ নানা কারণে এড়িয়ে যায়...' মেসো থামলেন। শ্বাস নিলেন বড় করে। দীপ্ত চুপ করে রইল। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। বুকের ভেতরটা ভারি হয়ে উঠছে। রবিনের জন্যে, টমটম বাবার জন্যে, এমনকী টাইগারের জন্যেও চোখে জল এসে যাচ্ছিল তার।

ফিরে আসার দিন রুচিরাকে নিজের ড্রয়িং সেটটা দিয়ে দিল দীপ্ত। রুচিরা চায়নি, তবুও। দিয়ে মনে এত আনন্দ হল যে দীপ্ত নিজেই অবাক হয়ে গেল। কাউকে কিছু দিয়ে এত আনন্দ পাওয়া যায় আগে জানতেই পারেনি সে। এই আনন্দে রুদ্রকেও মনে মনে সে আজ ক্ষমা করে দিল। ফিরে গিয়ে যে প্রতিশোধ নেবার প্রতিজ্ঞাটা ছিল তা বাতিল করে দিল সে। দিয়ে কী অদ্ভুত, ভালোই লাগল তার। মাসি-মেসোকে প্রণাম করে চলে আসার সময় রুচিরা তার সামনে এসে দাঁড়ালো। দীপ্ত দেখল ফাজিল মেয়েটার মুখটা আজ যেন অন্য রকম লাগছে। রুচিরার চোখ ছলছল করছিল। দীপ্তর হাত জড়িয়ে ধরে ভেজা গলায় সে বলল, 'তোকে খুব মিস করব দাদাভাই। তুই প্লিজ আমায় ফোন করিস মাঝে মাঝে। আর আমি জানি জুল ভার্ণ তোর খুব প্রিয়। আমার সেটটা পুরোন হয়ে গেছে না-হলে ওটাই তোকে দিয়ে দিতাম। তুই কিন্তু বইটা কিনিস না। বাবাকে বলেছি নেক্সট ভ্যাকেশনে তোদের বাড়িতেই যাব। তখন ওই বইটা আমি তোর জন্যে নিয়ে যাব। প্রমিস।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%