হারায় না কিচ্ছুটি

জয়দীপ চক্রবর্তী

ভূতের অস্তিত্বের কথা সেই ছোট্টবেলা থেকেই বিস্তর শুনেছি আমি। তবু পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারিনি মন থেকে। তাদের সম্পর্কে মনের মধ্যে ভয়ের ভাবটাও তৈরি হয়নি একটুও। অথচ, সত্যি বলতে কি, আমি অবিশ্বাসী নই। বরং মনে প্রাণে চেয়েছি, তারা যে আছে এই সত্যটা প্রকাশ হোক আমার কাছে। কিন্তু বার বার এই সংশয়ে ভুগেছি, আমাদের আশেপাশে তারা যদি থাকবেই, আমি তাদের দেখতে পাই না কেন? আর যারা আছে কিনা তাই জানি না নিশ্চিত করে, তাদেরকে খামোখা ভয় পেতেই বা যাব কেন বোকার মতন? কাজেই ভূতের ভয়ে আমি ভীত নই। অন্তত নিজের সম্পর্কে তেমনই ধারনা ছিল আমার এতদিন। সেই ইস্কুলে পড়ার বয়েস থেকেই শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়িয়েছি আমি রাতে, দুপুরে। ঝিমধরা বিকেলে স্থির হয়ে বসে থেকেছি বড় বড় পুরনো গাছের ছায়ায় মাখামাখি হয়ে থাকা গোরস্থানের মধ্যে। কোনোদিন গা ছমছমটুকুও টের পাইনি।

মা বলতেন আমি নাকি বড় হয়ে ডাকাত হব। তাই আমার অমন দামালে স্বভাব। কেন যে ওই বয়েস থেকে অমন শ্মশান, গোরস্থানে ঘুরে বেড়িয়েছি একা একা, সে কথা কাউকে বলিনি। এমনকি আমার মা-কেও নয়। আমি ভূত খুঁজে বেড়াতাম। ভাবতাম যদি দেখতে পাই তাদের কাউকে, তাহলে নিশ্চিত হতে পারি যে মৃত্যুতে সত্যিই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। মৃত্যুর পরেও একটা জগত আছে যেখানে চলে যাওয়া মানুষেরা থেকে যান। আর তাই যদি হয়, তাহলে নিশ্চিত বাবার সঙ্গেও কোনো না কোনোদিন আমার দেখা হবে এই আশাটাকে বাঁচিয়ে রেখে বেঁচে থাকা যাবে আরো অনেকগুলো দিন।

আমার বাবা ছিলেন না। মায়ের কাছে শুনেছি আমার যখন বছর দেড়েক বয়েস তখনই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি চিরদিনের জন্যে। ঘরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা বাবার বাঁধানো ছবিটা দেখলেই বাবার জন্যে আমার বুকের মধ্যিখানটায় চিন চিন করত। ভূত বলে যদি কিছু থাকতই, আমার বিশ্বাস বাবার সঙ্গে একবার না একবার ঠিক দেখা হয়ে যেত আমার সেই বয়েসে।

আমি বরং মানুষকে ভয় পেতাম। প্রাণপনে এড়িয়ে চলতাম মানুষের সঙ্গ। আমার বন্ধু ছিল না। মানে আমি নিজেই কাউকেই বন্ধু করিনি ইচ্ছে করে। আমার একা থাকতে ভালো লাগত। আমি একা থাকা অভ্যাস করেছিলাম প্রাণপনে।

এই কথাটা আমাকে বলেছিল কালীক্ষ্যাপা তান্ত্রিক। বড়দের মুখে শুনেছিলাম, লোকটার নাকি বেজায় সাধন ক্ষমতা। ভূত-প্রেত নাকি মেনি বেড়ালের মতন তার পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়াত রাত দিন। লোকটার সন্ধানে খিরিশতলার শ্মশানে হাজির হয়েছিলাম এক সন্ধেয়। আমাকে দেখে লাল চোখ কুঁচকে লোকটা তাকিয়েছিল খানিক। তারপর গম্ভীর গলায় বলে উঠেছিল, 'তুই এই সময়ে এখানে কেন? কার সঙ্গে এয়েচিস?'

'একা এসেছি'। উত্তর দিয়েছিলাম আমি।

'কেন?'

'আপনার সঙ্গে দেখা করতে।'

'আমার সঙ্গে?' অবাক হয়ে গিয়েছিল কালী তান্ত্রিক।

'হ্যাঁ।'

'আমাকে তুই ভয় পাস না?'

'না'।

'ভূতেরা আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকে এ কথা জানিস?'

'শুনেছি।'

'তুই ভূতে ভয় পাস না?'

'উঁহু', মাথা নাড়ি আমি, 'আমি ভূত দেখতে চাই।'

'কেন দেখতে চাস?'

আমি সেই একবার আমার মনের কথাটা বলেছিলাম যে কথা কাউকে বলিনি। বলেছিলাম বাবাকে দেখার জন্যে আমার বুকের মধ্যে জমা হয়ে থাকা আকুলি-বিকুলি কষ্টটার কথা। সব শুনে কালী তান্ত্রিকের কড়া চাউনিও কেমন যেন নরম হয়ে গিয়েছিল। আমার মাথায় হাত রেখে লোকটা বলেছিল, 'তাদের কি ইচ্ছে করলেই দেখা যায় রে বোকা? তাদের দেখার জন্যে দৃষ্টিকে আরো অনেক সূক্ষ্ম করতে হয়।

'কী করে তা করতে হয়?' আমি জিগ্যেস করেছিলাম।

'সে তুই পারবি না', কালী তান্ত্রিক মাথা নেড়ে হেসেছিল, 'সে খুব কঠিন কাজ। নিজেকে ভিড় থেকে সরিয়ে রেখে একা থাকার সাধনা করতে হবে প্রাণপনে।'

মুখে কিছু বলিনি সেদিন। কিন্তু মনে মনে বলেছিলাম, 'পারব। পারতে আমাকে হবেই। বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্যে যে কোনো কঠিন কাজ করতে রাজি আছি আমি।'

ছোটবেলায় একলা সার্কাসের মাঠের ঘাসের ওপরে গ্রীষ্মের রাতে চিত হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে অজস্র তারার ভিড়ের মধ্যে আমি আমার বাবাকে খুঁজে বেড়াতাম। এই খেলাটা আমার খুব প্রিয় ছিল। রান্নাবান্নার শেষে মা এসে মাঠ থেকে বাড়ি নিয়ে যেতেন আমাকে। মাঝে মাঝে বকাও দিতেন, 'ভূত-পেত্নীর ভয় নাই বা পেলি, কিন্তু মাঠে-ঘাটে এমনি করে যে শুয়ে পড়ে থাকিস, সাপখোপের ভয়ও কি নেই তোর?'

আমার ভয় করত না। সত্যিই আমার ভয় করত না। ভয়ই বোধহয় মনে মনে ভয় পেত আমাকে। সে আমার থেকে তফাতে সরে থাকতে চাইত প্রাণপনে।

আমার মা যখন মারা গেলেন আমি তখন কলেজে পড়ি। থার্ড ইয়ার। গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়েছে। সাম্মানিক ডিগ্রি পাবার পরীক্ষাটুকু বাকি। তখন এমনই নিয়ম ছিল। এই নিয়ম বদলে গেছে এখন।

আমার বাবা আর্থিক দিক থেকে খুব স্বচ্ছল ছিলেন না। আমরা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। বাবা মারা যাবার পরে মা আমাকে নিয়ে এসে উঠেছিলেন আমার মামার বাড়িতে। মামার বাড়িতে আমার আদরের অভাব ছিল না, তবু আমি নিজেই চেয়েছিলাম ওখান থেকে দূরে কোথাও চলে যেতে। মনে হয়েছিল আমার ভাগ্যই যখন বার বার চেয়েছে আমি একা হয়ে যাই, তখন সকলকে জড়িয়ে বেঁচে লাভ কী?

আত্মীয়স্বজন কারোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাইনি বলে স্কুলের চাকরিটা ইচ্ছে করেই শহর থেকে অনেক দূরে নিয়েছিলাম। একটা প্রান্তিক গ্রামে। চওড়া পিচ রাস্তায় সারাদিন ভারী গাড়ির দাপাদাপি ছিল না সেখানে। বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করে উঠত না সেখানকার রাত। বরং গাছপালা, বাগানে ঢাকা ছিল সেই গ্রাম। পুকুর ছিল। নদীও ছিল একখানা গ্রামের প্রান্তে। জোয়ার ভাঁটা না খেললেও প্রায় সারা বছরই সেই নদীতে জল থাকত। তালের ডিঙিতে চেপে চরাচর অস্বচ্ছ করে দেওয়া সন্ধ্যায় একা একা আমি সে নদী পারাপার করেছি বহুবার। নদীর পাড়েই, যেখানে মস্ত বটগাছটা আকাশ আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে, সেইখানেই শ্মশান। আমি সেখানেও যাতায়াত করতাম নিয়মিতই।

আমি স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েছিলাম। নিজে বেছে নিয়েছিলাম এই স্কুল। প্রথম যেদিন স্কুলে এসেছিলাম চাকরিতে যোগ দেবার জন্যে, হেডমাস্টারমশাই অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিলেন, 'অতদূর থেকে এই গন্ডগ্রামের স্কুলে এসেছেন আপনি চাকরি করতে! পরীক্ষায় র‌্যাঙ্ক কি একেবারেই শেষের দিকে হয়েছিল?'

'উঁহু', দুদিকে মাথা নেড়ে আমি হেসেছিলাম, 'আমার নাম এক্কেবারে প্রথম দিকেই ছিল। আমি ইচ্ছে করেই এখানে এসেছি। আমি চেনা মানুষের থেকে দূরে পালাতে চেয়েছিলাম।'

হেডমাস্টারমশাই অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়েছিলেন। আমি ভেবেছিলাম এরপর আমাকে অনেক ব্যক্তিগত প্রশ্ন করবেন তিনি। কিন্তু আমাকে স্বস্তি দিয়ে সে পথে একেবারেই তিনি হাঁটলেন না। একটা বড় নিঃশ্বাস ছেড়ে শুধু জিগ্যেস করলেন, 'এখানে থাকবেন তো, নাকি দু-এক বছরের মধ্যে আবার পরীক্ষা দিয়ে পালাবেন এখান থেকে?'

'যাব না। কোত্থাও যাব না আর', আমি আশ্বস্ত করেছিলাম তাঁকে, 'শুধু এখানে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিন আমাকে অনুগ্রহ করে।'

'যতদিন না নিজের একখানা আস্তানা বানাতে পারছেন, আমার বাড়িতেই থেকে যান না', খুব আন্তরিক গলায় বলেছিলেন তিনি। 'আমরা এখানকার পুরোনো বাসিন্দা। বনেদি পরিবার। পৈতৃক বাড়িটা বলতে গেলে ফাঁকাই পড়ে আছে। থাকুন না তারই একখানা ঘর আগলে।'

'না', আমি সবিনয়ে তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, 'আমি একা থাকতে চাই। এক্কেবারে একা। নিঃসঙ্গ। আমার জীবন তাই দিতে চেয়েছে আমায়'।

'বেশ', তিনি অবাক চোখে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, 'আমি দেখছি। আপনার মনের মতন একখানা বাসা আমি ঠিক যোগাড় করে দেব। যে ক'দিন না পাই সেই ক'টাদিন অন্তত আমার বাড়িতে থাকুন। দেখুন, আমার বাড়িটাও আপনার পছন্দ হয়ে যেতে পারে। সত্যি বলতে কি, বাড়িটার একদিক থেকে অন্য দিকে গেলে মনে হয় অন্য একটা পৃথিবীতেই পৌঁছে গেছি সম্ভবত।'

উপায় ছিল না আর। আমি তাঁর প্রস্তাবেই রাজি হয়ে গিয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত।

স্কুলের ছুটির ঘন্টা বাজার পরে আরো কিছুক্ষণ আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। তারপরে হেডমাস্টারমশাই সঙ্গে করে আমাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। মস্ত বাড়ি। যদিও বাড়ির অনেকখানিই এখন ভগ্নস্তূপ হয়ে আছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে বললাম, 'আপনারা কি জমিদার-টমিদার ছিলেন নাকি এককালে?'

'ছিলাম।' হেডমাস্টারমশাই, যাঁর নাম জেনে ফেলেছি ততক্ষনে, শ্রী শশিভূষণ হালদার বললেন একগাল হেসে, 'তবে এখন তালপুকুরে ঘটিটুকুনিও আর ডোবে না...'

আমি সদর দরজা পেরিয়ে অন্দরমহলে ঢুকতেই চারকোনা উঠোনের একধারে একখানা ঘর চোখে পড়ল। ঘরের সামনেই দু-খানা মস্ত চাঁপা গাছ। ঘরের পাশ দিয়ে পায়ে চলা সরু রাস্তা চলে গেছে পিছনের পুকুরের দিকে। কয়েক পা এগিয়ে দেখলাম পুকুরের সামনে বাঁধানো ঘাট রয়েছে, ঘাটের দু-ধারেই বসার জায়গা আছে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। কিন্তু যেভাবে আগাছায় ভরে আছে জায়গাটা, তাতে এই পুকুর কেউ ব্যবহার করে বলে মনে হল না। পুকুর বেড় দিয়ে ঠিক ওদিকে আর একটা কোঠাঘর। বেশ উঁচু। জানলা নেই সেই ঘরে। সে বাড়ির ছাদ ফাটিয়ে আকাশের দিকে মাথা উঁচিয়ে একটা মস্ত পাকুড় গাছ চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে পুকুরের পানার আড়ালে লুকিয়ে থাকা জলের দিকে চেয়ে। এই জায়গাটা কেন কে জানে, মনে হচ্ছিল আমাকে যেন কেমন টানছিল। ইচ্ছে করছিল সান বাঁধানো ঘাটে বসে বাড়িটাকে আরো কিছুক্ষন দেখি।

শশীবাবু আমার হাত ধরে টান দিলেন, 'চলে আসুন।'

'জায়গাটা আমার ভারি ভালো লাগছে', আমি সম্মোহিতের মতন বলে উঠি। 'আর একটু থাকি না এখানে?'

'না', শশীবাবু দৃঢ় গলায় বললেন, 'এদিকটা দ্রুত পেরিয়ে যাই চলুন। এ জায়গাটা ভালো না। এদিকে আসে না কেউ। আপনিও আসবেন না এদিকে।'

'কেন?' আমি অবাক হয়ে বলি।

'বললামই তো, বাড়ির এইদিকটা ভালো নয়। এটা অভিশপ্ত এলাকা। আমরা সকলে প্রাণপনে এড়িয়ে চলি বাড়ির এই অংশটা।'

'পুকুরের ওই পারের ভাঙা ঘরটা অমন অদ্ভুত জানলাবিহীন কেন? কী কাজে লাগত ওই জঙ্গলে মোড়া ঘরটা?' আবার জিগ্যেস করি আমি কৌতূহলী গলায়।

'জমিদারদের সব কাজই যে ভালো ছিল এমনটা তো নয়'—পুকুরের দিক থেকে চৌকো উঠোনের দিকে ফিরে এলেন শশিভূষণ, 'তাদের জীবনচর্চায় কিছু মন্দ কাজও ছিল...'

'যেমন?'

'ওটা ছিল গুমঘর। বহু অবাধ্য প্রজাকে গুমখুন করা হয়েছিল ওখানে। তাদের অতৃপ্ত আত্মারা এখনও ঘোরাঘুরি করে মহল্লার এই দিকটায়। কাজেই বাড়ির এই দিকটা পরিত্যক্ত। এ দিকে কেউ থাকে না। আসেও না। আমি বাড়ির এইদিকে আপনাকে নিয়ে এলাম এই কারণেই। আপনাকে সাবধান করে দিতে যে ভুলেও ভবিষ্যতে যেন বাড়ির এই অংশে চলে আসবেন না আপনি। চলুন, এবার ভেতরে যাই। এবার যেদিকটায় যাব, সেইদিকটা বাসযোগ্য তো বটেই, নিরাপদও। এই বাড়ির যে কজন শরিক এখনও এই গ্রামে পড়ে আছি তারা বাড়ির ওই দিকটাতেই থাকি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে। ক্রমে তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যাবে আপনার। বাড়ি থেকে এত দূরে এসে ওদের এই সঙ্গ ভালোই লাগবে আপনার দেখবেন...' খুব আন্তরিক গলায় বললেন শশীবাবু।

'না, আমি সঙ্গ চাই না কারো। সত্যিই চাই না', মাথা নেড়ে নীচু গলায় আমি বলি। 'আমি যদি এ বাড়িতে থাকি তাহলে এই ঘরটায় থাকব', বলে চাঁপা গাছের ওইদিকের বন্ধ ঘরটার দিকে আঙুল তুলি আমি। 'ওই ঘরটা ভারি পছন্দ হয়েছে আমার।'

'না না তা কেমন করে হবে?' শশীবাবু আপত্তি করে উঠলেন তীব্রস্বরে, 'জেনেশুনে আপনাকে আমি হেমবাবুর ঘরে একলা রেখে দিতে পারব না। আপনাকে এখানে রেখে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যেতে পারব না কিছুতেই'।

'হেমবাবু কে?' আমি অবাক হয়ে বলি।

'এ বাড়ির মেজোকর্তা। আমার মেজ জেঠু', শশীবাবু মৃদু হাসলেন। 'আপনারই মতন একা থাকতেই পছন্দ করেছেন সারাজীবন। একগুঁয়ে জেদি মানুষ ছিলেন, কিন্তু খুব শৌখিন। বিয়ে থা করেননি। এই ঘরেই থাকতেন। স্বপাক খেতেন আজীবন। কারো সাহায্য নিয়ে বেঁচে থাকা একদম পছন্দ করতেন না। এ ঘরটাকে বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না। আসলে এটা একটা কমপ্লিট অ্যাপার্টমেন্ট। মস্ত শোবার ঘর। ফার্নিশড। সঙ্গে অ্যাটাচড বাথ এন্ড কিচেন। মেজজেঠু বছর চারেক হল মারা গেছেন। তবু আমরা এই ঘরটাকে সাফসুতরো এবং বাসযোগ্য করে রেখেছি যত্ন করে। কেননা আমাদের বিশ্বাস উনি এখানেই থাকেন এখনও।'

'এমন অদ্ভুত বিশ্বাসের কারণ?' একটু বিরক্ত হয়েই আমি জিজ্ঞেস করি, 'তাঁকে কি দেখেছেন একবারও মৃত্যুর পরে?'

মনে মনে আমি চাইছিলাম শশীবাবু 'হ্যাঁ' বলুন। কিন্তু তিনি দু-দিকে মাথা দোলালেন কয়েকবার, 'না দেখিনি। তবে...'

'তবে?' তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আমি বলি।

'মেজজেঠু মার্গসঙ্গীতের ভক্ত ছিলেন খুব। গভীর রাতে এই ঘরে ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে চুপটি করে তিনি গ্রামোফোনে গান শুনতেন। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, মাঝেমধ্যে কোনো কোনো জ্যোৎস্নামাখা মধ্যরাতে এই ঘর থেকে সেই অদ্ভুত গানের সুর এখনও ভেতর বাড়ি অব্দি পৌঁছে যায়...'

'আপনার বাড়িতে ডেকে এনে কেন শুধুশুধু আমাকে ভূতের গল্প শোনাচ্ছেন স্যার?' আমি কষ্ট করে গলাটাকে নম্র রাখলাম, 'আমি ওসবে বিশ্বাস করি না। আসলে ছোটবেলা থেকে এ ধরনের গপ্প এত শুনেছি...'

'তবু ব্যাপারটা সত্যি', শশিভূষণ প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন।

'সত্যি হলেও আমার অসুবিধে নেই কিছু। মানুষের থেকে ভূতের সঙ্গ আমার কাছে বেশি সহনীয়। আপনাদের খুব কিছু পারিবারিক আপত্তির যায়গা না থাকলে আমি এই ঘরেই থাকব। আর হ্যাঁ, হেমবাবুর মতন আমিও আমার রান্না নিজে করে নেব।'

'বেশ তাই। কী আর বলব আপনাকে। একান্তই যখন কথা শুনবেন না...'

'আর ভাড়ার ব্যাপারটা...'

'ছি ছি ছি ছি' জিভ বের করে শশীবাবু দু-হাত আমার দু-কাঁধে রাখেন, 'এতক্ষন যতই আপনি আজ্ঞে করি না কেন তুমি ভাই আমার চেয়ে ঢের ঢের ছোট। জয়ন্ত, তুমি আমার ছোট্ট ভাইটির মতনই এই বাড়িতে থেকে যেও যদ্দিন ইচ্ছে। আর আমাকে দাদার মতনই দেখো...'

শশীবাবুর কথায় কৃত্রিমতা ছিল না একটুও। আমি বেশ বুঝতে পারলাম। মানুষটার আন্তরিকতা আমাকে ছুঁয়ে দিচ্ছিল ভিতর থেকে। এমন মানুষের সঙ্গ খুব বেশি পাইনি জীবনে। আমার ভয় করছিল এমন সব মানুষ আশপাশে বেশি জুটে গেলে আমার একাকীত্বের তপস্যায় না বিঘ্ন ঘটে যায় আবার। আমি জানি মানুষের সঙ্গ ভালোবেসে ফেললে বিপদের অন্ত নেই। মানুষের জীবন খুব ক্ষনস্থায়ী। কাচের মতন ভঙ্গুর। এই পৃথিবীর মায়া কাটাতে এক মুহূর্ত সময় লাগে না তার। কাজেই সেই চিরঅনন্তযাত্রী মানুষকে বোকার মতন বেজায় ভালোবেসে জড়িয়ে পড়লে কষ্টের আর অন্ত থাকে না। মা-বাবা এই দুজন ভালোবাসার মানুষকেই আমি অকালে হারিয়েছি। আমি অহেতুক জীবনে আর নতুন কোনো কষ্ট ডেকে আনতে চাই না।

স্কুলে শিক্ষকমন্ডলীকক্ষে আমি একধারে চুপটি করে বসে থাকতাম। প্রথম দু- তিনদিন অন্য মাস্টারমশাইরা আমার সঙ্গে ভাব জমানোর খুব চেষ্টা করেছিলেন। আমি ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছি প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথায় আমার আগ্রহ নেই একটুও। এখন আমাকে নিয়ে তাঁরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন। নীচু গলায় আমার মানসিক সুস্থতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন। আমি বুঝতে পারি। আমি শুনতে পাই। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না আমার মধ্যে। ছাত্ররাও আমার থেকে দূরে-দূরেই থাকা নিরাপদ মনে করে।

একসপ্তাহের মধ্যেই আমি স্কুলে পাগলস্যার নামে পরিচিত হয়ে গেলাম। আমার তাতে অসুবিধে ছিল না কোনো। দিব্বি নিজের মতন থাকতাম। স্কুল করতাম। শ্মশানে নদীতে ঘুরে বেড়াতাম। একা একা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতাম গ্রামের ধুলো ওড়া পথে পথে। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার এই প্রথম সাত দিনের মধ্যে শশীবাবুর বাড়িতে হালদারবাড়ির মেজকত্তার ঘরে কোনো অসুবিধেই হল না আমার। ঘরটা সাজানো গোছানো। পেল্লায় পালঙ্ক, কাঠের টেবিল চেয়ার, বইয়ের আলমারি, পুরোনো দিনের নানান রেকর্ড দিয়ে সাজানো ঘরটাকে রাজকীয়ই বলা চলে। আর সেই ঘরে ছিল একটা দোল খাওয়া ইজি চেয়ার। একমাত্র ওই চেয়ারটার দিকে চোখ পড়ে গেলেই আমার কেমন যেন মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি হত। মনে হত কে যেন বসে আছে ওই চেয়ারে। মাঝে মাঝে আপনা আপনি চেয়ারটা দুলেও উঠত বেখাপ্পাভাবে। অন্য কেউ হলে এতে ভয় পেয়েই যেত হয়তো, কিন্তু ওই অস্বস্তিটুকু ছাড়া আমার তেমন কিছু অসুবিধে হয়নি। বরং যত দিন যাচ্ছিল মনে মনে আমি বেশ আশাবাদীই হয়ে উঠছিলাম।

প্রথম সমস্যাটা টের পেলাম সপ্তাখানেক বাদেই। মনে হল রাত্রিবেলায় ঘরের মধ্যে কে যেন পায়চারি করছে। আবছা অবয়ব, তবু বোঝা যায়। আমি দু-বার কে কে বলে উঠতেই আবছা চেহারাটা মিলিয়ে গেল। তারপরেই দোল খাওয়া ইজি চেয়ারটা দুলতে শুরু করল। মনে হল কেউ বসেছে ওটায়। বাইরের চাঁপা গাছ থেকে তখনই কী একটা পাখি ডেকে উঠল বিশ্রী শব্দ করে। অন্য কেউ হলে হয়ত ভিরমি খেত সেদিন, কিন্তু মিথ্যে কথা বলব না, আমি মনে মনে খানিক আনন্দই পেলাম।

এর পরের ঘটনা আরো দিন কয়েক হেমবাবুর ঘরে কাটানোর পর। সেদিন পূর্ণিমা ছিল বোধহয়। বাইরে চাঁদের আলো চাঁপা গাছের পাতার আড়াল থেকে গড়িয়ে নীচের উঠোনে এসে নামছে তখন। বাতাস দিচ্ছিল। সেই বাতাসে গাছের পাতা কেঁপে কেঁপে ফিসফিস করে কথা বলছিল নিজেদের মধ্যে। আর ফুলেরা বাতাসে গন্ধ ঢেলে দিচ্ছিল পাপড়ি থেকে। আমার অকারণ মন খারাপ লাগছিল সেদিন। রাতে রান্না করতে ইচ্ছে করল না। পেট ভরে জল খেয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে পালঙ্কের ওপরে আড় হয়ে শুয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আমি।

হঠাৎ একটা হাল্কা খুট করে আওয়াজ হতেই আমি ফিরে তাকালাম। অবাক হয়ে দেখলাম, গ্রামোফোনে কে জানি রেকর্ড চাপিয়েছে একখানা। তারপর রেকর্ড ঘুরতে শুরু করল। খুব মৃদু স্বরে একটা বাজনা শুরু হল। সম্ভবত শরোদ। আমি নিশ্চিত ছিলাম না। গান বাজনার সমঝদার শ্রোতা কোনোকালেই ছিলাম না আমি। আমার ভাবনার রেশ ধরেই কানের কাছে ঠিক সেইসময়ে কে বলে উঠল ফিসফিস করে, 'হ্যাঁ শরোদ। এটা মধ্যরাতের রাগ। দরবারি...বড় প্রিয় রাগ আমার...বাইরে জ্যোৎস্না উঠলে রাত বারোটা থেকে আমি শুনি... এতদিন শুনছি, তবু পুরনো হচ্ছে না কিছুতেই...'

আমি চমকে সোজা হয়ে উঠে বসলাম। জানালার গরাদ গলে চাঁদের আলো ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে অবাধে। সেই আলোয় ঘরের মধ্যের সবকিছুই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমি ছাড়া ঘরের মধ্যে দ্বিতীয় কাউকে চোখে পড়ল না আমার। সেই অপার্থিব জ্যোৎস্নায় দরবারি কানাড়ার সুর মিশে যাচ্ছে। ঘরের মধ্যে রাখা ইজিচেয়ারটা দুলে যাচ্ছে ক্রমাগত। নির্দিষ্ট ছন্দে। জীবনে এই প্রথম আমার গা শিরশির করে উঠল। কাঁটা দিয়ে উঠল গায়ে। বুঝতে পারছি বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে আমার পিঠে। তবু এক আশ্চর্য আনন্দের শিহরন খেলে গেল আমার মনে। তবে সত্যিই তো তাঁরা আছেন। তাঁদের অস্তিত্বের কথা তো মিথ্যে মনে হচ্ছে না আর। ভাবতে ভাবতেই বুঝলাম ওই ঘরের মধ্যে থাকাটা ক্রমশই অসহ্য হয়ে উঠছে আমার কাছে।

মানুষহীন চেয়ারের যন্ত্রসঙ্গীতের তালে তালে ক্রমাগত সমঝদারি দোল খাওয়ার দৃশ্য জীবনে প্রথমবার খানিক ভয় পাইয়ে দিল আমাকে। আর তখনই বুঝলাম সঠিক কারণে ভয় পাওয়ায় আমার মনে কী অপার্থিব আনন্দের ঢেউ উঠতে পারে। আমি দরজা খুলে বাইরে বেরোলাম। চাঁপা গাছের পাশ দিয়ে ঘরের পিছনের সান বাঁধানো পুকুরটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। পুকুরের ও পাশের গুমঘরটা চাঁদের আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছিল। বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘোর লেগে গেল আমার। কিছুতেই ওই পুরনো জীর্ন বাড়িটা থেকে যেন চোখ ফেরাতে পারছি না মনে হল। আমার মাথার মধ্যে ফিস ফিস করে কে যেন ডাকতে লাগল বার বার, 'আয়, আয়, আয় আয়...'

নিজের অজান্তেই আমি অস্ফুটে বলে উঠলাম, 'যাব। আমি যেতে চাই...'

আর তখনই আমার কোমরের কাছ থেকে কে যেন বলে উঠল, 'সত্যিই যাবে তুমি?'

তাকিয়ে দেখি একমাথা ঝাঁকড়া চুল নিয়ে একটা ছোট্ট ছেলে দু-চোখে কৌতূক নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার সেই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। আমি চোখ নামিয়ে নিয়ে বললাম, 'যাব'।

'চলো তবে', ছেলেটার মুখে হাসি ফুটে উঠল। একটা অদ্ভুত, ধারালো হাসি।

'ঠিক কোথায় যেতে হবে আমাকে?' সম্মোহিতের মতন জিগ্যেস করি।

'ওই যে পুকুরের ওইদিকের বাড়িটা', ছেলেটা তার শীর্ণ হাত তুলে গুমঘরের দিকে দেখালো আমাকে। 'ওই বাড়িটার মধ্যে অতীত আটকে আছে। সেই অতীতে তুমি যেতে চাও?'

'অতীত কি চোখের সামনে সত্যিই দেখা যায়?' বোকার মতন বলে ফেলি আমি।

খিলখিল করে হেসে উঠল ছেলেটা। তার হাসিতে আমি কেঁপে উঠলাম। সে আমার হাত ধরল। কী অসম্ভব ঠান্ডা তার হাত। তার স্পর্শে আমার শীত করে উঠল। ছেলেটা বলে চলেছে, 'ওই বাড়িতে আমার বাবাকে খুন করা হয়েছিল। আরো অনেককে। আর আমাকে আছড়ে মেরে ফেলা হয়েছিল এইখানেই। এই সানের ঘাটের পাথরের চাতালে। তারপর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া আমার রক্তমাখা ছোট্ট শরীরটা ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল এই পুকুরের জলে...'

ছেলেটার কথা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল। তবু সান্ত্বনার ভঙ্গীতে বলে উঠলাম, 'তুমি তো তবু চোখের সামনে তোমার বাবাকে দেখতে পাও। কিন্তু আমি...শুধুমাত্র তাঁকে দেখতে পাব এই আশাতেই জেনেশুনে এই বাড়িতে, এই ঘরে... আচ্ছা ওই গুমঘরে গেলে আমিও কি আমার বাবাকে দেখতে পাব?'

'তা কি দেখা যায়? এই ব্যাপ্ত তরঙ্গ জগতের কোথায় কীভাবে মিশে আছেন তিনি তা জানবে কেমন করে?' ভারি গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে তাকিয়ে সেই সম্ভ্রান্ত চেহারার দীর্ঘদেহী মানুষটাকে দেখতে পেলাম। আমাকে ফিরে তাকাতে দেখে তিনি হাসলেন, 'আমি হেমকান্ত। তুমি আমারই অতিথি হয়ে আমার ঘরে বাস করছ আপাতত। তোমাকে বাঁচানো আমার কর্তব্য জয়ন্ত। তাই কালের গর্ভ থেকে এই অস্থায়ী শরীর তৈরি করে আমি ছুটে এলাম। এই ছেলেটির শরীরও অস্থায়ী। আমরা কেউ আর নেই। এই জীবনের জগত থেকে অনেক দূরে চলে গেছি আমরা। কিন্তু গিয়েও সত্যিকারের যেতে পারছি কই বলো...আমাদের তরঙ্গ দিয়ে এই মহাবিশ্বের তরঙ্গকে ছুঁতে পারছি বটে, কিন্তু মিশে যেতে পারছি না তার সঙ্গে কিছুতেই। আমরা আসলে একটা নির্দিষ্ট তরঙ্গমন্ডলে বন্দী হয়ে আছি জয়ন্ত। আমাদের মুক্তি নেই। ও তোমাকে সেই বন্দীত্বের দিকেই নিয়ে যেতে চাইছিল হাত ধরে। তুমি নিজেও সেই বন্দীত্বের সাধনাই করে এসেছ এতদিন ধরে। আমারই মতন। সেই সাধনা একাকীত্বের সাধনা। জীবনের আলোস্রোত থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার সাধনা। তোমার কাছে এখনও সুযোগ আছে। তুমি বিরুদ্ধতরঙ্গ দিয়ে এই ক্ষুদ্র তরঙ্গের প্রাচীর ভেঙে দিয়ে বৃহৎ জগতের মধ্যে মিশে যাও...এই বিরাট আলোজগতের হাজারো সৎকাজের মধ্যে ছড়িয়ে দাও নিজেকে। তোমার ছড়িয়ে যাওয়ার স্রোতে ভেসে গিয়ে আমরাও যেন মুক্তির পথ দেখতে পাই একদিন...'

'আমি পারব?' কেমন ঘোর লাগা গলায় বলি আমি।

'নিশ্চয়ই পারবে। পারতে যে তোমাকে হবেই ভাই। জগতের শুভকাজের হাজারো আলোকতরঙ্গে নিজেকে যদি ভাসিয়ে নিয়ে যেতে না পারো তবে তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হবে কী করে তোমার? তিনিও যে আলোপথে ভাসিয়েছিলেন নিজেকে...'

'বাবার সঙ্গে তাহলে আমার আবার দেখা হবে বলছেন?'

'আলবাত হবে'।

'তিনি সত্যিই আছেন? চিরদিনের মতন হারিয়ে যাননি তাহলে?'

'বোকা ছেলে', হেমকান্ত এগিয়ে এসে আমার কাঁধে তাঁর ভারহীন হাতখানা রাখলেন, 'এ বিশ্বে কিছুই হারিয়ে যায় না ভাই। সমুদ্রে আবহমানকাল ধরে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি ঢেউ উঠছে। সে ঢেউ ভেঙে গিয়ে মিলিয়েও যাচ্ছে। কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে কি? ওই অনন্ত জলরাশির মধ্যেই যে মিশে থাকে সে ভাই...তেমনই তুমি আমি, তোমার বাবা, এই ছেলেটি, তোমার স্কুলের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীরা সকলে, সব্বাই একই স্রোতে মিশে আছি অনাদি কাল থেকে...'

হেমকান্তের কথার মাঝখানেই পুকুরের অপর পারের গুমঘর থেকে সম্মিলিত গোঙানির শব্দ ভেসে এল কানে। আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, 'ও কীসের শব্দ?'

'আশাভঙ্গের বেদনা', ম্লান হাসলেন হেমকান্ত, 'আমি মাত্র চার বছর এই বেদনার শরীক হয়ে আছি এখানে। এরা বহু বছর...'

'কীসের এত বেদনা?' কৌতূহলী হয়ে জিগ্যেস করি আমি।

'বন্দীত্বের বেদনা', হেমকান্ত হাসলেন, 'মানুষের লোভ, মানুষের হিংসা, মানুষের অত্যাচারের ঋণাত্মক তরঙ্গে মৃত্যু হয়েছিল এদের সক্কলের। সেই তরঙ্গের মধ্যেই বন্দী হয়ে আছে এরা এতকাল। প্রতি মাসে পূর্নচন্দ্র ওঠে আকাশে। এরা ভাবে সেই স্নিগ্ধ আলোয় মানুষের লোভ ধুয়ে যাবে। হিংসা ধুয়ে যাবে। ঈর্ষা ধুয়ে যাবে। আর সেই খাঁটি মানুষের ধন্যাত্মক তরঙ্গে ভেসে গিয়ে মুক্তি পাবে এরা। কিন্তু তা আর হয় কই? পূর্ণিমার পর পূর্ণিমা চলে যায়। তেমন মানুষ আর এসে পৌঁছয় না এখানে...'

'ইশ', আপনিই শব্দটা বেরিয়ে আসে আমার মুখ থেকে, 'এমন মানুষ কেউ নেই?'

'আছে। অবশেষে পেয়েছি তাকে এত দিনে।'

'কে সে?'

'তুমি।'

'আমি?'

'আবার কে? এই যে বাবার জন্যে এত ভালোবাসা তোমার বুকের মধ্যে। মায়ের জন্যে চেপে রাখা সত্যিকারের কষ্ট...এই কষ্ট, এই ভালোবাসা ছড়িয়ে দাও সকলের জন্যে। সেই উত্তাল ভালোবাসার ঢেউ সব অশুভ তরঙ্গ ধুয়ে মুছে সরিয়ে দিক। আমরাও মুক্তি পাই এই প্রেতযাপনের হাত থেকে।'

'আমি পারব?' সংশয় আসে আমার মনে।

'পারলে তুমিই পারবে। পারতে তোমাক হবেই', হেমকান্ত ভরসা দিয়ে বলেন আমাকে স্নেহার্দকণ্ঠে।

স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আমার এখন অসীম ব্যস্ততায় দিন কাটে। স্কুলের বাইরেও গ্রামের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে সখ্য আমার। এতদিন মানুষের থেকে গুটিয়ে রেখেছিলাম নিজেকে। এখন মানুষের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি। বুঝেছি সকলের মধ্যে ছড়িয়ে থেকে কত সুখ। হেমকান্ত আমাকে সঙ্গীতে আগ্রহী করেছেন। এখন নিজেই আমি গ্রামোফোনে কাকভোরে আহিরভৈরোঁ শুনি। সন্ধেবেলা ইমন, পূরবী। মাঝরাতে কলাবতী, রাগেশ্রী। জ্যোৎস্না উঠলে দরবারি চালিয়ে দিই। আর ঘুম আসে না যেদিন, শেষ রাতে আনন্দভৈরবী। হেমকান্ত খুশি হন। তাঁর নিজের ইজিচেয়ারে এসে বসেন অবয়বহীন। চেয়ারের হাতলে তাল দেন। তাঁর অদৃশ্য দুই হাতের তালে তালে দুলে দুলে ওঠে সেই চেয়ারটি। চোখের সামনে না থেকেও কী প্রবল ভাবে তিনি আমার সঙ্গে রয়েছেন ভেবে শিহরিত হই। আনন্দিতও হই।

হ্যাঁ, আর একটা কথা। বাবার জন্যে সেই আকুলি-বিকুলি ভাবটা আর নেই আমার মধ্যে। তাঁর সঙ্গে এখন নিত্য দেখা হয়। দেখা হয় আমার মায়ের সঙ্গেও। দেখি আমারই মধ্যে বসে আছেন তাঁরা। চিরদিন এমনই তো থাকতেন। অথচ আমিই শুধু দেখতে পাইনি এতদিন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%