ডায়মন্ডহারবার লোকালের সেই লোকটি

জয়দীপ চক্রবর্তী

সকাল থেকেই আকাশ গোমড়ামুখো। মাঝে মাঝে টিপটিপে বৃষ্টিও চলছিল। তবু আজ কলেজ কামাই করার উপায় ছিল না। আসলে কলেজে একটা ছোট-খাটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল, যার আয়োজকদের মধ্যে সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যগ্যবশত আমাকেও থাকতে হয়েছিল কাজকর্ম্ম করার লোক হিসেবে। অন্যদিন হলে নিশ্চিত ডুব মারতাম কিন্তু আজ দায়ে পড়ে আসা। কেননা বি.এড কলেজে এইসব অনুষ্ঠানে থাকাটা বাধ্যতামূলক। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-টনুষ্ঠান যে আমার ভালো লাগে না তা নয়, কিন্তু কলেজটা আমার উল্টোদিকে হয়েই যত বিপত্তি।

আসলে কলকাতা থেকে আমাদের এদিকে আসা যাওয়ার যে সুবিধা ডায়মন্ডহারবার থেকে তা নয়। এখান থেকে ফিরতে হলে একমাত্র ট্রেন ভরসা। আর একটু ভারি বৃষ্টি-টৃষ্টি হলে এই সিঙ্গল লাইনে প্রায়শই গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়ে সে এক ভীষণ চিত্তির। তখন তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। আর সে অপেক্ষার পর অবশেষে যখন আবার ট্রেন চলতে শুরু করে তখন আর এক বিপদের শঙ্কা কড়া নাড়তে থাকে বুকের মধ্যে। রাত একটু ঘন হলেই ট্রেন ডাকাতি লেগেই থাকে এদিকে।

আজও তাই হল। সন্ধেবেলা অনুষ্ঠান শেষ হবার পর যখন স্টেশনে এসে দাঁড়ালাম তখন শুনলাম ট্রেন বন্ধ। অবশ্য আজকে ট্রেন বন্ধ হবার কারণ বৃষ্টি নয়। বাসুলডাঙ্গা স্টেশন ছাড়িয়ে একটুখানি গিয়ে নাকি কে একজন ট্রেনে কাটা পড়েছে খানিকক্ষণ আগে। সেজন্যই নাকি বাসুলডাঙ্গায় আটকে আছে ডাউন ট্রেন। অগত্যা আমরা পাঁচ ছয়জন বন্ধু মিলে স্টেশনেই আড্ডা জুড়লাম।

অবশেষে ট্রেন যখন ছাড়া পেয়ে ডায়মন্ডহারবার স্টেশনে এসে ঢুকল তখন রাত আটটা বেজে গেছে। প্ল্যাটফর্মেও ফিরতি মানুষের ঢল। সেই প্রাণপণ হুড়োহুড়িতে পাত্তা না পেয়ে আমার বন্ধু দিবাকর একটু পিছিয়ে এল। আমায় বলল,

'কি রে কী করবি বল—'

আমি ঠোঁট উল্টে বললাম, 'করব আর কী—যেতে তো হবেই। এই ট্রেন তো আর ছেড়ে দেওয়া যাবে না।' অন্যরাও স্বাভাবিকভাবেই আমার সঙ্গে সহমত। আসলে ভিড়ের জন্য ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার বিলাসিতা এই পরিস্থিতিতে চলে না।

দিবাকর একটু হতাশ হয়ে গেল।

'সারাদিন পরিশ্রমের পর আবার এই ঠেলাঠেলি, তায় আবার এই ওয়েদার—'

দিবাকরের কথাটা মিথ্যে নয়, কিন্তু উপায়ও তো কিছু নেই। এই সময় প্রশান্ত বলল, 'তোরা দাঁড়া। আমি দেখে আসি কোথায় ভিড়টা একটু হাল্কা আছে—'

মিনিট দুই বাদে ছুটতে ছুটতে প্রশান্ত ফিরে এল। তারপর বেশ উত্তেজনার সঙ্গে বলে উঠল, ব্যবস্থা হয়েছে। চ।'

'কোথায়?' আমরা অবাক।

'একটা কামরা আছে একদম ফাঁকা। লোকজন ভয়ে ওঠেনি।'

'কিসের ভয়ে?'

'অন্ধকারের—' প্রশান্ত হাসল। 'কম্পার্টমেন্টটায় আলো নেই।'

দিবাকর হাসল। বলল, 'ভালোই হয়েছে। হাত পা ছড়িয়ে আরাম করে যাওয়া যাবেখন।'

আমি বললাম, 'তাছাড়া দুটো একটা স্টেশন পেরোলেই দেখবি আমাদের মতন অন্যরাও এই কামরাটাকেই টার্গেট করতে শুরু করেছে—'

প্রশান্ত একটু ঝুঁকে সিগন্যালটা দেখে বলল, চল উঠে পড়ি। আলো হলুদ হয়েছে—

কামরাটায় উঠে আমরা হাত-পা খেলিয়ে বসতে না বসতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। ট্রেনটা স্টেশন পার হবার সঙ্গে সঙ্গে নিকশ অন্ধকার এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল কামরার মধ্যে। আর অন্ধকারের সঙ্গে ছুটে এল একটা বিশ্রী অস্বস্তি— আমাদের সকলের মধ্যেই।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমি বললাম, 'মানস একটা গান ধর বরং—' অন্য সময় হলে কী করত জানি না, আজকে কোনো ধানাই পানাই না করে গান ধরল ও। কিন্তু গাড়ির আওয়াজের আড়ালে হারিয়ে গেল ওর গলা। ব্যাপারটা জমছে না দেখে মানসই বলল, 'আয় তার চেয়ে সবাই মিলে কোরাস গাই—'

গান গাইতে গাইতে ভালোই সময় কাটছিল। তিন চারটে স্টেশন কখন পেরিয়ে গেছে খেয়ালই করিনি। মাঝে ঝিরঝির করে বৃষ্টি নেমেছিল। কাজেই জানলাও বন্ধ। কিন্তু হঠাৎ ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বরে আমরা গান থামালাম—

'কী চেঁচামেচি জুড়েছো—একটু শান্তিতে থাকতে দেবেনা আমায়—'

চমকে আমরা কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে কিছুই দেখতে পেলাম না অন্ধকারে—লোকটা আবার বলে উঠল, 'চুপ করে থাকো অথবা নেমে যাও এ কামরা থেকে—'

'ক্যানো নেমে যাব?' দিবাকর লোকটার শেষ কথায় বিরক্ত হয়ে বলল।

'উঠলে কেন এই কামরায়—অন্ধকারে?'

'আপনি কেনো উঠলেন?'

'আমি তো উঠিনি—আমাকে তোলা হয়েছে'—লোকটা হাসল ক্যামন ফ্যাঁসফেঁসে গলায়, মনে হল কষ্ট করে—

'মানে?'

লোকটা উত্তর দিল না।

আমাদের অস্বস্তি ক্রমশ বাড়ছে। লোকটার কথায় বার্তায় কী যেন একটা আছে যেটা আমাদের শরীরে মনে একটা কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে ক্রমাগত। আমাদের সকলের মধ্যেই একটা চাপা উত্তেজনা।

ট্রেন একটা স্টেশনে ঢুকছে। কামরার মধ্যে আলো এসে পড়েছে। আর সেই আলোয় লোকটাকে দেখা গেল এবার। সিটের ওপর পা তুলে উঁচু হয়ে বসেছে লোকটা। মাথা দু-হাঁটুর ওপর নোয়ানো। একটা চাদর ওপর দিয়ে ঢাকা—

কিন্তু চাদরে চুঁইয়ে চুঁইয়ে উঠছে যে দাগটা কালচে মতন, ওটা—ওটা কি? সিটের নীচে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে ঝরতে ঝরতে এখন গড়াতে শুরু করছে যেটা—যার ওপর ভন ভন করে উড়ছে একপাল মাছি—

অ্যা তো রক্ত—অ্যা তো রক্ত—

আমার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম ব্যাপারটা ওরাও দেখেছে এবং মুখ ওদের ফ্যাকাশে।

ট্রেনও চলতে শুরু করেছে আবার।

'আপনি কি অসুস্থ?' জিগ্যেস করল মানস। কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারলাম ওর গলা কাঁপছে। বুক কাঁপছিল আমারও। লোকটা ডাকাত-টাকাত নয়তো? হয়তো পুলিশ বা কারো সঙ্গে এনকাউন্টারে আহত হয়েছে লোকটা। মাঝে এমন গল্পও শুনেছিলাম যে এই ট্রেনে সদ্য কাটা গয়না সমেত মহিলার হাত নিয়ে যেতে গিয়ে ধরা পড়েছিল এক ডাকাত—আর সেও ধরা পড়েছিল তার হাতের চটের ব্যাগের মধ্যে থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্তের ফোঁটা দেখে সহযাত্রীদের সন্দেহ হওয়ায়। তবে কি এই লোকটাও—

সাহস সঞ্চয় করে আমি জিগ্যেস করলাম 'কে আপনি?'

অন্ধকার থেকে কোনো উত্তর এল না।

'আবার জিগ্যেস করলাম আমরা সবাই একসঙ্গে, 'বলুন আপনি কে? এত রক্ত কেন আপনার চারপাশে?

'আমাকে একা থাকতে দাও। বিরক্ত কোরো না। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে আমার—'

আমাদেরও জেদ চেপে যাচ্ছে তখন।

'চালাকি করবেন না। ভুলে যাবেন না আপনি একা আর আমরা ছ'জন—'

লোকটা উত্তর দিল না। শুধু গোঙানির মতন অদ্ভুত আওয়াজ এল একটা।

আমি উঠে দাঁড়িয়েছি এখন। অন্যরাও। স্টেশন আসছে। দূরে আলোর রেখা—সেই আলো ক্রমশ কাছে আসছে এখন। বাইরেও দুটো একটা বাড়ি আর ছোটখাটো দোকান চোখে পড়ছে। ট্রেনের মধ্যে ঠিকরে আসছে হালকা আলোর রেখা—

আমরা লোকটার দিকে এগোতে শুরু করলাম—বিরক্ত হয়ে লোকটা এবার উঠে দাঁড়াল। হিসহিসে ঠান্ডা গলায় বলল, 'সত্যি জানতে চাও কে আমি?'

'চাই', আমরা এখন ভীষণ উত্তেজিত।

'সহ্য করতে পারবে?'

'চালাকি রাখুন—'

ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে। সম্ভবত হোটর। লোকটা গায়ের চাপা সরিয়ে ছুঁড়ে দিল—আর আমরা দেখলাম লোকটার মাথার একটা অংশ প্রায় নেই— আর বাকি অংশটা দোমড়ানো থ্যাঁতলানো—বীভৎস—বীভৎস—সে বীভৎসতা বলে বোঝানো যায় না—

ট্রেনের হুইসেলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে এখন লোকটার ভয়ঙ্কর উন্মত্ত হাসি—

'বাসুলডাঙ্গায় একটু আগে এই ট্রেনটা, এই ট্রেনটাই আমাকে এই জগৎ থেকে ছিটকে ফেলে দিল পরলোকে—অথচ আমি এখানে থাকতে চাই— থাকতে চাই—'

গাড়ি দুলে উঠেছে। লোকটা এখন মুর্তিমান পিশাচের মতো এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। গাড়ি গতি বাড়াবার আগেই ঝড়ের মতো পরপর প্ল্যাটফর্মের ওপর লাফিয়ে পড়লাম আমরা—চলন্ত ট্রেন থেকে অন্য সব শব্দ ছাপিয়ে তখনও ভেসে আসছে এক ক্রুর হাসি। আর ট্রেনে শেষবারের মতো ভেসে উঠল সেই বর্ণনাতীত ভয়ঙ্কর মুখ, যে মুখ কখনও ভোলা যাবে না এ জীবনে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%