জয়দীপ চক্রবর্তী

বরুণ স্যার বরাবরই বলতেন ভুতোটাকে ভূতে পেয়েছে। তা না হলে এই বাজারে অঙ্কে কেউ পঞ্চাশের মধ্যে পাঁচ পায়? এমনিতেই সিলেবাস এখন আগের চেয়ে অনেকটাই কমে গেছে, তার ওপরে নম্বর দেওয়ার যে বিধি সেই অনুযায়ী মাস্টারমশাইরা পরীক্ষার খাতার ওপরে হাত সবসময় উপুড়ই করে রেখেছেন। তা সত্ত্বেও এত নিখুঁতভাবে অঙ্কগুলোকে ভুলভাল কষার জন্যে বাস্তবিকই এলেম লাগে। ভুতো নিজেও মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যায় নিজের কথা ভেবে। সে অনায়াসে সাঁতরে নস্করপুকুর এপার ওপার করতে পারে, ঢিল ছুঁড়ে গাছ থেকে আম পেড়ে ফেলতে পারে চোখ বুজিয়ে, এমনকি ফুটবল মাঠেও স্কুল টিমে সে অপরিহার্য। কোনো কিছুতেই দক্ষতার তার অভাব নেই। যা কিছু মুশকিল শুধু তার অঙ্কের খাতায়।
ভুতোর বাবা খুব একটা অর্থবান নন। তার ওপরে মানুষটাও তিনি সহজ সরল। গ্রামের একপ্রান্তে একচিলতে একটা দোকানঘরে দিন কেটে যায়। সকালে খেয়ে দেয়ে টিফিন কোটোয় খাবার নিয়ে বেরোন, ফিরতে ফিরতে রাত্তির। সারাদিন চা তৈরি করা, ঘুগনি বানানো, আটা মেখে রুটি ভাজা এসব করে খদ্দের সামলাতে হয় তাঁকে। সারাদিন কাজ নিয়ে থাকেন আর ভাবেন ভুতোটা মানুষ হলে সব কষ্ট সার্থক হয় তাঁর। বাড়ির খবরাখবর সারাদিন বড় একটা রাখা হয় না তাঁর। ভুতোর পড়াশোনার ব্যাপারেও বোঝেন কম বলে মাথা গলান না তিনি। ভুতো স্কুলে যায়, বছর বছর নতুন ক্লাশে ওঠে এটুকু তিনি জানেন আর এটুকুতেই যতটা সম্ভব খুশি থাকার চেষ্টা করেন তিনি।
এভাবেই চলছিল বেশ। কিন্তু, গোল বাঁধল কাশীপুর শ্মশানের তারাতান্ত্রিকের কথায়। লোকটা অন্য ধরনের। কাজকর্ম তেমন কিছুই করে না। শ্মশানে বসে কী সব মন্ত্র-টন্ত্র পড়ে নাকি রাত জেগে। ইদানীং শ্মশানের পাশে চট প্লাস্টিক দিয়ে শ্মশান কালীর মন্দির বানিয়েছে একটা। পুজো-আচ্চা নিয়ে থাকে। রোজই প্রণামী বাবদ মন্দিরে টাকা-পয়সা কিছু পড়ে। তাছাড়া শ্মশানযাত্রীরাও দু-পাঁচ টাকা করে দিয়ে যায় তাকে মাঝে মধ্যে। তাই দিয়েই চলনসই গোছের জীবন কেটে যায় লোকটার। গ্রামের সাধারণ মানুষ নানা কারণে লোকটাকে এড়িয়ে চলে। কেউ কেউ বলে লোকটা ভণ্ড। কেউ বলে ডাকাতদলের স্পাই। আবার কেউ আরো এককাঠি বাড়িয়ে তাকে একবারে ডাকাত দলের সর্দারই ভাবে মনে মনে। হরিপদর অবশ্য লোকটাকে অতখানি ভয়ঙ্কর মনে হয় না। তার দোকানে এসে প্রায়ই চা বা এটা ওটা খায় লোকটা। হরিপদর সঙ্গে গল্প করে। ধর্ম-কম্মের কথাও হয় দু-পাঁচটা। হরিপদর মন্দ লাগে না। এমন কি খাওয়ার জন্যে লোকটার থেকে পয়সাও নেয়-না সে। সেদিনও হরিপদর দোকান বসে চা আর মুড়ি খাচ্ছিল তারাতান্ত্রিক। আর হরিপদকে বোঝাচ্ছিল এ জগতে ভীতু আর দুর্বল মানুষের কী দুর্গতি। এই কথার রেশ ধরেই হরিপদ বলে উঠেছিল হঠাৎ, 'ভয়-ডরের কথা যদি বলেন ঠাকুর, মানুষকে আমি ভয় পাইনি কখনও—'
'তবে কাকে ভয় তোমার, সাপ না বাঘ?'
'তাও না।'
'তবে কি কুকুর? অনেকে টিকটিকি আরশোলা এসবেও ভয় পায় শুনেছি। তোমারও কি—'
'আজ্ঞে না ঠাকুর।' তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে হরিপদ, 'এই বয়েসে বলতে লজ্জা লাগে, তবে আপনাকে বলতে তো সঙ্কোচ নেই, আমার বড্ড ভূতের ভয়—'
প্রথমটা তার কথায় হাঃ হাঃ করে হেসে ওঠে তারাতান্ত্রিক। তারপর হঠাৎ ভারী গম্ভীর হয়ে—তারপর বলে, 'এখন তো আর ভয় পাই বলে চোখ বুজিয়ে বসে থাকলে চলবে না। সামনে অনেক কাজ—'
'কাজ—' অবাক হয়ে বলে হরিপদ।
'ছেলেটাকে সুস্থ করতে হবে না?'
'ছেলে, মানে ভুতো—ক্যানো কী হয়েছে ওর? এই তো সকালে দেখে এলাম দিব্বি, রয়েছে, বেরোনোর সময় বলল পাঁচটা টাকা দিতে, ঘুড়ির সুতোর মাঞ্জা কিনবে নাকি—'
'আচ্ছা আলাভোলা মানুষ তো তুমি। ছেলেটাকে যে ভূতে পেয়েছে সে খবরই রাখো না? আমি তো লোক মুখে শুনে ছুটে এলাম তোমার কাছে—'
'ভারী সাব্বোনেশে কথা শোনালেন তো—'
'কথাটা যে সে লোক বলেননি বাপু, খোদ বরুণ মাস্টার বলছেন এ কথা। অঙ্কের লোক। খুব বলতেন ভূতটুত সব মিথ্যে—এবার কী হল বাপু!' ঘোর কলি হোক আর যাই হোক সত্যিটা তো শেষমেশ বেরোলো মুখ দিয়ে—ভূতের কারসাজিতেই ছেলেটা অঙ্কে ফেল করছে ফি বছর—'
'ছেলেটার তাহলে কী হবে এখন ঠাকুর' ভারী উদ্বেগের সঙ্গে বলে ওঠে হরিপদ, ছেলেটার অঙ্কে মাথা খেলে না বলে কত লোকের কত কথাই তো শুনলাম বলুন। ব্রাক্ষিশাক, হোমিওপ্যাথি গুলি—এখন আপনিই বলুন দিকিনি ভূতের ওষুধ কোত্থেকে জোগাড় করি আমি—'
'আহা অত ভাবনার কী আছে, আশ্বাস দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে তারাতান্ত্রিক, আমি তো আছি। মন্ত্রে কী না হয়। একটু খরচ খরচা করতে হবে এই যা। তা তুমি গরিব মানুষ। তাছাড়া আমার বড় কাছের জনও বটে। তোমার জন্যে না হয় ইন্সটলমেন্টের ব্যবস্থা করে দেওয়া যাবেখন—সামনের শনিবার সন্ধেবেলা ছেলেটাকে আমার মন্দির নিয়ে এসো। ভূতটাকে বের করে বেঁধে ফেলবখন আমি, চিন্তা নেই।'
'খুব চিন্তামুক্ত করলেন আমায় ঠাকুর—' বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হরিপদ।
বরুনবাবু নিজের ঘরে বসে নিবিষ্টমনে অঙ্ক করছিলেন। রাতে খাওয়া দাওয়ার পর কিছুক্ষণ বিছানায় বসে অঙ্ক কষা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। না হলে ঠিকমতন ঘুম আসে না। আজ অঙ্কে মশগুল হয়ে গিয়ে খেয়ালই ছিল না তাঁর যে রাত রীতিমতন গভীর হয়েছে। বাইরে অন্ধকার থমথম করছে। ঘর এবং ঘরের বাইরে, দুই-ই এমন চুপচাপ যে দেওয়ালে বসা একটা টিকটিকি ঠিক ঠিক বলে বলে তাঁর অঙ্ককে তারিফ করে উঠতেই চমকে খাতা থেকে মুখ তুললেন তিনি। আর তখনই লোকটাকে দেখতে পেলেন বরুণবাবু। বই-এর র্যাকটার পাশে দেওয়ালের সঙ্গে লেপটে ক্যামন যেন চ্যাপ্টা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানুষটা। লোকটাকে দেখে ভারী অবাক হয়ে গেলেন বরুনবাবু। এতরাতে এ লোকটা তাঁর ঘরে ক্যানো? তাছাড়া ঘরের দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ। এ লোকটা ঘরে ঢুকল ক্যামন করে। চুরি-টুরির মতলবে আগে থেকেই কি ঘরে ঢুকে বসেছিল নাকি? বরুনবাবু ভীতু নন। শরীর স্বাস্থ্যেও তাকত আছে। মনে মনে লড়াই এর প্রস্তুতি নিয়েই বেশ ভারিক্কি গলায় লোকটাকে জিগ্যেস করলে তিনি, 'কী চাই?'
লোকটা ভারী মিহি করে হাসল। বলল, 'আপনার সঙ্গে কিছু দরকারি কথা ছিল—'
'দরকারি কথা, আমার সঙ্গে—' সন্দেহ গলায় বললেন বরুণবাবু, 'এই এত রাতে?'
'রাতটাই আমাদের যথার্থ সময় যে। দিনের আলোয় শরীর তৈরি করতে খুব কসরৎ করতে হয় আমাদের—' লোকটা রিনরিনে গলায় বলল বিনয়ের সঙ্গে।
'বুঝলাম না—'
'আসলে শরীরটা তো সত্যি এখন আর নেই আমাদের। খুব প্রয়োজনে মাঝে মাঝে এটা তৈরী করতে হয় কিছুক্ষণের জন্যে।'
'আমায় পাগল ঠাউরেছো?'
'আজ্ঞে না। সেইজন্যেই তো আপনার কাছে আসা। আমাদের বিশ্বাস বুঝিয়ে বললে নিশ্চিত বুঝবেন, আপনি। হাজার হোক বুঝদার মানুষ আপনি—'
'কিন্তু তুমি কে বাপু?'
'নাম বললে কি আর চিনবেন? আপনার ঠাকুর্দা চিনতেন আমায়। ছোটবেলায় একসাথে কত খেলেছি। তারপর আমার তিরিশ-বত্রিশবছর বয়েসে কলেরা হল। মরে গেলাম। তোমার ঠাকুর্দা, মানে আমাদের ত্রিলোচন দুঃখু পেয়েছিল খুব—'
'ইয়ার্কির জায়গা পাওনি ছোকরা—' বলে বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে লোকটার ঘাড়টা বাগিয়ে ধরতে গেলেন বরুনবাবু। কিন্তু কী আশ্চর্য, লোকটার শরীরের মধ্যে দিয়ে তাঁর হাতটা গলে গেল। আর লোকটাও যেন বাতাসে ভেসে তাঁর থেকে একটু তফাতে সরে দাঁড়ালো।
বরুণবাবু বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। থম মেরে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর লোকটার দিকে চেয়ে, আত্মসমর্পনের ভঙ্গীতে বললেন তিনি, 'সত্যিই তাহলে আপনি—'
'আজ্ঞে হ্যাঁ। ভূত—'
'বিশ্বাস করতে সত্যি কষ্ট হয়।'
'কষ্টের কী আছে। ভূত মানে অতীত। অতীতকে কি অস্বীকার করা যায় নাকি—'
'না মানে আগে বিশ্বাস করতাম না তো—'
'ওতে লজ্জার কী আছে। আজকালকার পড়াশুনাও তো হচ্ছে ওইরকম। কীসব ছাঁইপাঁশ শিখিয়ে মানুষকে অবিশ্বাসী করে তুলছে দিন দিন। ত্রিলোচনও খুব দুঃখ করছিল এই নিয়ে—'
'আমার দাদু?'
'হ্যাঁ। এ বাড়িতে দু'জনে একসঙ্গেই থাকি কিনা—'
'তাহলে তিনি কোথায়—'
'আপনি যা বলে বেড়াচ্ছেন ভূতেদের নামে, লজ্জায় তিনি তো মুখ দেখাতে পারছেন না আর ভুতসমাজে—'
'ক্যানো?'
'ভুতো অঙ্ক কষতে পারে না, এই দোষটা কোনো এভিডেন্স ছাড়াই আপনি আমাদের ঘাড়ে চাপালেন। জানেন, কেসটা ভূতাধিকার কমিশন পর্যন্ত গড়িয়ে গেছে—কোন আক্কেলে আপনি বললেন ভূতেরা অঙ্ক কষতে জানে না—'
'ভূতেরা অঙ্ক জানে?'
'চেষ্টা করুন—'
বরুণবাবু জুতসই ক'টা অঙ্ক দিলেন ভূতটাকে। সে মুখে মুখে অঙ্কগুলো কষে ফেলল মুহূর্তের মধ্যে। কাগজকলমে হাতই ছোঁয়াল না। উল্টে বরুণবাবুর দিকে চেয়ে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে উঠল, 'ছোঃ এই তো আপনাদের অঙ্কের স্ট্যান্ডার্ড। এই নিয়েই খামোখা গর্ব করেন এত। বরুণবাবু মাথা নামিয়ে বললেন, 'মানছি হে কাজটা আমার ঠিক হয়নি।'
'কিন্তু ভূতেরা এত সহজে মানবে ক্যানো। যে অপমান আপনি করেছেন। তাছাড়া অবস্থার সুযোগ বুঝে তারাতান্ত্রিক তো আবার আর এক চাল চেলেছে—'
'কী রকম?'
'শোনেননি কিছু?'
'না—বলে একটু চুপ থাকেন বরুণস্যার। তারপর বলেন, আমায় আর আপনি বলবেন না প্লিজ। আপনি আমার দাদুর বন্ধু হাজার হোক—'
'আসছে শনিবার সে যে ভুতোর ভূত ছাড়ানোর জন্যে যজ্ঞের আয়োজন করছে। বেচারা হরিপদ গরিব মানুষ। শুধুমুধু তার কিছু অর্থ গচ্চা যাবে।' ভূতটা গোমড়া মুখে বলে।
'ছি! ছি!—তারাটা এতখানি ভন্ড হয়ে উঠেছে আজকাল—'
কথাটা আপনি হয়তো বুঝলেন। অন্যেরা তো বুঝবে না। তারা ভাববে তারাতান্ত্রিক সত্যিই এলেমদার মানুষ। আর আমাদের আরো কিছু মিথ্যে হজম করে যেতে হবে মুখ বুজিয়ে। আমরা পুরোনো ভূত, অনেক কিছু সহ্য করতে পারি। কিন্তু সদ্য যারা ভূত হয়ে আসছে, তারা একালের ছোঁড়া। তারা এ অপমান মুখ বুঁজে সাইবে কি আর—'
'তাহলে সত্যিই তো বিপদ হল—'
'তা তো হলই। আর ওদের প্রথম টার্গেটই তো তুমি। ওরা বলছে তোমার ঘাড়ে বসে সত্যি সত্যি তোমায় অঙ্ক ভুলিয়ে দেবে। পরিস্থিতি দেখে ত্রিলোচন তো শয্যাশায়ী। ভাগ্যিস আগে একবার মরেছিল তাই মরার ভয়টা শুধু নেই—'
'তাহলে উপায়?'
'প্রকাশ্যে তোমার কথা উইথড্র করো। বলো ভূতেরা মানুষের চেয়ে ভালো অঙ্ক কষে।
'কিন্তু হাতের সামনে একটা ভালো উদাহরণ তো চাই—'
'কী করতে বলো—'
'আজ্ঞে ভুতোর মাথায় একটু অঙ্ক ঢুকিয়ে দিন দয়া করে। তাতে আমার বলতেও সুবিধা, আর তারাতান্ত্রিকের যজ্ঞেরও প্রয়োজন রইল না আর—'
ভূতটা খুক খুক করে হাসল। বলল, 'আমায় মান্যিগন্যি করে, আপনি-আজ্ঞে শুরু করে দিলে যে দেখছি। হম্বি-তম্বিগুলো গেল কোথায়—'
'আর লজ্জা দেবেন না আমায়—'
ঠিক আছে, ঠিক আছে—'বলতে বলতে ভূতটা মিলিয়ে গেল বই-এর আলমারির পিছনে।
ভুতোর অঙ্কের মাথা খুলে গেছে হঠাৎ করে। অঙ্ক কষায় উৎসাহও হয়েছে খুব। তারাতান্ত্রিকের কাছে তাকে আর নিয়ে যেতে হয়নি। তারাতান্ত্রিক এ গ্রামে নেই আর। গ্রামের কিছু লোক তাকে ভূত ভূত বলে অবস্থানে চিৎকার করতে করতে প্রাণভয়ে দৌড়তে দেখেছিল গ্রামের রাস্তা ধরে দু-একদিন আগে। বরুণবাবু এখন ঘোরতর ভূতবিশ্বাসী। ভূতের প্রশংসায় তিনি এখন পঞ্চমুখ। এলাকায় এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে যে আজকালকার অঙ্কের নানা জটিল সমস্যার সমাধানে তিনি নাকি ভূতেদেরই শরণাপন্ন হচ্ছেন রাতে-বিরেতে গোপনে, লোকচক্ষুর অন্তরালে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন