জয়দীপ চক্রবর্তী

ছুটির দিনে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে মা-বাবা দুজনেই যে সময়টা ঘুমিয়ে পড়েন, সেইসময়টা ভারি আনন্দে কাটে প্রীতমের। এই সময়টা তার। কেবলমাত্র তারই। তার ওপরে খবরদারি করার কেউ নেই। নিজের ইচ্ছে মতন খেলাধুলো, বাগানে ঘোরা, পুকুর পাড়ে বসে জলের ওপর থেকে ছোঁ মেরে মাছরাঙার মাছ তুলে নিয়ে যাবার দৃশ্য দেখা কিংবা খোলামকুচি দিয়ে ব্যাংবাজি করার ক্ষেত্রে এইসময়ে কোনো বাধা থাকে না।
মা অবশ্য প্রতিদিনই শুতে যাবার আগে বলে দেন, 'পুলু, আমি ঘুমিয়ে পড়লে এক্কেবারে বাইরে যাবি না কিন্তু। একলা একলা খবরদার ঘোরাঘুরি করবি না পুকুরের ধারে। বরং এইসময়টা অংক করিস। বাবা কদিন আগে ট্রানস্লেশন প্র্যাকটিস করার জন্যে যে বইটা কিনে এনে দিয়েছেন, সেটা থেকে ট্রানস্লেশনও করতে পারিস নিজে নিজে'।
প্রীতম প্রতিদিনই মায়ের কথা চুপ করে শোনে, কিন্তু মা ঘুমিয়ে পড়লে কথাগুলো আর মনেই থাকে না তার। মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে মস্ত সুবিধা। আশেপাশে কোথায় কী যে ঘটে চলেছে তা আর তাঁরা দেখতে পান না। কাজেই প্রীতম সারা দুপুর বাগানে ছাদে দাপিয়ে বেড়ালেও মা কিচ্ছুটি টের পান না কোনোদিন।
আজ ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে একমনে দুটো ঘুড়ির প্যাঁচের লড়াই দেখছিল প্রীতম। এগিয়ে পিছিয়ে, লাট খেয়ে দুটো ঘুড়ি ক্রমাগত কাটার চেষ্টা করে চলেছে একে অপরকে। ঘুড়ি দুটোকে দেখে বেশ মজা লাগছিল প্রীতমের। আকাশের বুকে জায়গাটা তো নেহাত কম নয়। দিব্বি নিজেদের মতন উড়ে বেড়ালেই তো পারে তারা। কিন্তু তা হবে না। একটা ঘুড়ির অন্যকে কেটে ধ্বংস করেই মজা। সব জায়গাতেই সারাক্ষণ যেন এই কাটাকুটি খেলা চলছে। একসঙ্গে মিলেমিশে থাকা নয়, প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে টিকে থাকা।
এই যেমন তাদের ক্লাশের অরিন্দম। পড়াশোনায় সত্যিকারের ভালো ছেলে। তার সঙ্গে বন্ধুত্বও দিব্বি জমাট। অংক আর ইংরেজিতে মারাত্মক রকমের তুখোড় অরিন্দম। যেমন বাংলা আর ইতিহাসে চিরকালের টপার প্রীতম। কিন্তু বাংলা ইতিহাসে ভালো পেয়ে পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়া যায় না। প্রীতমকে অরিন্দম হারিয়ে দেয় ফি বছর। এই নিয়ে বাবা খুবই অখুশি। মায়েরও ভীষণ রাগ প্রীতমের ওপরে। কেন সে পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে পারে না অরিন্দমকে হারিয়ে দিয়ে।
এ বছরে বাবা তো বলেই দিয়েছেন জন্মদিনে প্রতিবছর বাবা তাকে তার পছন্দ মতন গল্পের বই কিনে দেন চারখানা করে, কিন্তু পরীক্ষায় অরিন্দমকে হারিয়ে এবারে যদি ফার্স্ট হতে না পারে, তাহলে এ বছরের গিফট ক্যানসেল।
গত কয়েকদিন ধরে খুব চেষ্টা করে দেখেছে প্রীতম কিছুতেই অংক আর ইংরেজির প্রশ্নগুলোকে পোষ মানাতে পারছে না সে। পরশু স্কুলে গিয়ে অরিন্দমকে সব কথা খুলে বলে আবেদনও জানিয়েছিল একটা বছর সে যদি ইচ্ছে করে পরীক্ষাটা একটু খারাপ দিয়ে তাকে ফার্স্ট হবার একটা সুযোগ করে দিতে পারে। কিন্তু অরিন্দম রাজি হয়নি। হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, 'তাতে লাভটা কী শুনি?'
'আমি চারটে বই পেলে তোর পছন্দ মতন একখানা বই আমার থেকে নিয়ে নিবি তুই'। প্রীতম বলেছিল তাকে।
'ধুস। একটা বইতে হবে না'।
'তালে দুটো নে। ফিফটি ফিফটি। তোর দুটো, আমার দুটো'।
'না আমি পরীক্ষা ইচ্ছে করে খারাপ দিতে পারব না', মাথা-টাথা চুলকে তার প্রস্তাব নাকচ করে দিল অরিন্দম। তারপর থেকে একটু মুষড়ে আছে প্রীতম।
আকাশে পাক খেতে খেতে একটা ঘুড়ি নিজের সুতো দিয়ে প্রাণপনে পেঁচিয়ে ধরেছে আর একটা ঘুড়ির সুতোকে। দুটো ঘুড়িই নানা কসরত করছে অন্যটাকে কেটে দেবার। প্রীতম হাঁ করে দেখছিল। দেখছিল আর অপেক্ষা করছিল। যে ঘুড়িটা কেটে যাবে, টলতে টলতে নিয়ন্ত্রণবিহীন সেই ঘুড়িটা আকাশের গায়ে ভাসতে ভাসতে খসে পড়বে পৃথিবীর ওপরে। প্রীতম দৌড়তে দৌড়তে অনুসরণ করবে তাকে। তারপর কুড়িয়ে আনবে ঘুড়িটা।
বলতে বলতেই ওই যে কেটে গেল দুটোর মধ্যে একখানা ঘুড়ি। ঘুড়িটা ভাসছে। ভাসতে ভাসতে উড়তে উড়তে অনেক উঁচু থেকে ক্রমশ নেমে আসছে নীচের দিকে। ছাদ থেকে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসে প্রীতম। আলতো হাতে, শব্দ না করে খিড়কির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে ছুটতে শুরু করে সে ঘুড়িটার দিকে নজর রেখে। ঘুড়ির সঙ্গে ছুটতে ছুটতে কতদূর যে চলে এসেছে খেয়ালই থাকে না। ঘুড়িটা নামতে নামতে একটা গাছের ডালে আটকে যেতেই সম্বিৎ ফেরে তার। প্রীতম থামে। তখন সে রীতিমতন ঘেমে গেছে। চারপাশে চেয়ে বেশ গা ছম ছম করে ওঠে তার।
এটা সেই পুরনো গোরস্থান। আর একটু এগিয়ে গেলেই বাঁ হাতে পড়বে মাতা মেরীর গীর্জা। ওই দিকে বেশ কিছু খ্রিস্টান পরিবার বসবাস করেন। ওদের সঙ্গে পড়ে কুনাল, ওর বাড়িও এই দিকটায়। বড়দিনে কুনাল নেমন্তন্ন করে ওদের প্রতি বছর। যে গাছটার ডালে আটকে গিয়ে ঘুড়িটা লটর-পটর করে দুলছিল তার ঠিক নীচেই একটা বাঁধানো সমাধি। ঘুড়িটা হাওয়ায় দুলছিল। ঠোক্কর খাচ্ছিল গাছের শক্ত ছুঁচলো শুকনো ডালটায়। মন খারাপ হয়ে গেল প্রীতমের। এতটা পরিশ্রম এক্কেবারে মাটি হয়ে গেল। ঘুড়িটা অক্ষত থাকবে না। ছিঁড়ে ফালা ফালা হয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।
এই জায়গায় আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ নয় বুঝেই তড়িঘড়ি পিছু ফিরল প্রীতম। আর তখনি লোকটাকে সে দেখতে পেল। পরনে ফুল প্যান্ট, গায়ে সাদা শার্ট। তার ওপরে বেশ পুরনো একটা কোট চাপানো। মাথায় টুপি। এই গরমে লোকটা যে কী করে গায়ে কোট চাপিয়ে আছে কে জানে! যে গাছের ডালে ঘুড়িটা ঝুলছিল, সেই গাছটার পাশ থেকেই ভারি উদাস ভঙ্গীতে বেরিয়ে এল লোকটা। তারপর অবাক চোখে প্রীতমের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তোমার নাম তো প্রীতম, তাই না?'
প্রীতম ভয়ানক অবাক হয়ে গেল। লোকটা তার নাম জানল কী করে? এর সঙ্গে আগে তো কখনও তার আলাপ হয়নি। ইতস্তত ভঙ্গীতে সে বলে উঠল, 'আপনি আমাকে চেনেন?'
'চিনি বৈকি, খুব চিনি', লোকটা হাসল, 'এই অঞ্চলে কাকেই বা চিনি না বলো। তোমাকে চিনি, তোমার বাবাকে চিনি, তোমার ঠাকুর্দাকেও চিনতাম। চেনা ছাড়া উপায় নেই যে গো...সারাদিন ধরে আমি যে কেবল এই অঞ্চলের মানুষজনের ওপরে লক্ষ রাখি এক মনে...'
'কেন?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল প্রীতম।
'ও আমার এক নেশা। সবার দিকে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি কবে কাকে কাছে পাব আর আমার একটা পুরনো হিসেব তার সাহায্যে মিটিয়ে নিতে পারব নিশ্চিন্তে'।
'কীসের হিসেব?'
'অত কথা তুমি বুঝবে না', লোকটা মাথা থেকে বিবর্ণ টুপিটা খুলে খানিক মাথা চুলকোয়, 'বাদ দাও। তোমার তো একটা ছোট্ট নাম আছে। আমি বরং তোমায় ওই নামেই ডাকি কেমন, ওতে ডাকতে সুবিধে হবে'।
'আপনি আমার ডাক নামও জানেন?'
'জানি'।
'কী বলুন তো?' অবিশ্বাসী গলায় বলে প্রীতম।
'পুলু। কী হে ঠিক বললাম তো?'
'হ্যাঁ', লাজুক গলায় বলল প্রীতম।
'তাহলে আর একটু বলি। দেখো মিলছে কিনা। ভুল বললে ঠিক করে দিও, কেমন?'
'বলুন', লোকটার কথায় বেশ মজা পাচ্ছিল এবার প্রীতম।
'স্কুলে তোমার ক্লাশে তুমি কিছুতেই ফার্স্ট হতে পারছ না। অরিন্দম তোমাকে বার বার অংক আর ইংরেজিতে গো হারা হারিয়ে দিয়ে ফার্স্ট হয়ে যাচ্ছে ফি বছর...'
'একদম তাই। আমি অংক আর ইংরেজিতে বড্ড কাঁচা'।
'জানি। ওই জন্যেই তো তোমাকে সাহায্য করতে আমি তোমার কাছে এলাম'।
'আমাকে আপনি সাহায্য করবেন কীভাবে? আর খামোকা আমাকে সাহায্য করতে চাইছেনই বা কেন?'
'কারণ একটা তো আছেই পুলুবাবু'।
'আমি কি সেটা জানতে পারি?'
'আচ্ছা খানিক বলি তবে। মন দিয়ে শোনো', বলে ডান হাতে টুপিটা ধরে হাওয়া খেতে খেতে বলতে লাগল লোকটা, 'আমার নাম জিতেন হেমব্রম। দেশী খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম আমার। ওই সামনের পাড়াতেই থাকতাম একসময়'।
'এখন আর থাকেন না?' জিতেন হেমব্রমের কথার মাঝখানেই বলে ওঠে প্রীতম।
'নাহ। আর সেখানে থাকার উপায় নেই'।
'কেন?'
'তুমি বাপু কথায়-কথায় বড্ড কেন কেন করো। আরে বাবা সব কেনরই কি আর উত্তর হয় গো', বলে দু-হাতে আঙুল মটকাতে মটকাতে আবার কথা বলা শুরু করে জিতেন হেমব্রম, 'তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী অরিন্দমের দাদু আমার সহপাঠী ছিল...'
'ধুস, আপনি গুল মারছেন', হেসে ওঠে প্রীতম, 'গোলোকদাদু এক্কেবারে বুড়ো হয়ে গেছে। আর আপনি দিব্বি জোয়ান। দেখে মনে হচ্ছে আমার বাবার থেকে কয়েক বছরের মাত্র বড় হবেন আপনি'।
'আহা, আমার বয়েসটা যে আর বাড়ার উপায়ই নেই। আমি যে একটা বিন্দুতে দাঁড়িয়ে পড়েছি হে সেই কোনকালে...'
'কেন?'
'আবার কেন... তুমি জ্বালালে বাপু...'
'কী করব, আপনি যে প্রশ্ন করার মতন কথাই বলছেন। বয়েস কি কারো দাঁড়িয়ে থাকে কোনোদিন?'
'থাকে। একবার কেউ যদি মরে যায় আর তার বয়েস বাড়ার ফুরসত থাকে না'।
'তার মানে আপনি বলছেন যে আপনি আর বেঁচে নেই?'
'কথাটার মানে তেমনই তো দাঁড়াচ্ছে'।
'আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আপনি ভূত হলে আপনাকে দেখে আমার নিশ্চয়ই ভয় লাগত'।
'তোমাকে যতটা বুদ্ধিমান ভেবেছিলাম তুমি ততটা বুঝদার ছেলে নও পুলু', জিতেন হেমব্রম মাথা নাড়তে থাকেন আক্ষেপের ভঙ্গীতে, ' আরে ভূত দেখলেই ভিরমি খেতে হবে এমন মাথার দিব্বি কে কাকে দিয়েছে বলো দেখি। যাকগে শোনো, গোলোকের সঙ্গে আমার একটা প্রাচীন শত্রুতা আছে'।
'কীসের শত্রুতা?' প্রীতম প্রতিবাদের সুরে বলে, 'গোলোকদাদুর সঙ্গে কারো শত্রুতা থাকতেই পারে না। ভীষণ ভালো মানুষ উনি। শুধু আমি নই, আমাদের এলাকার সক্কলে এ কথা বলে'।
'আহা গলু ছেলে খারাপ এ কথা বলছি না, কিন্তু ওই যে আমারও তোমার মতন...'
'কী আমার মতন?' রেগে গিয়ে বলে প্রীতম।
'তোমারই মতন আমাকেও ক্লাশে ওই গলুই আটকে দিয়েছে চিরকাল। তোমার যেমন অরিন্দম, আমার তেমন গোলোক, কিছুতেই গাঁট পেরিয়ে ফার্স্ট হতে পারিনি কোনোদিন। ও আমার জাত শত্রু। আমি বদলা নিতে চাই'।
'কী বদলা?'
'এই নাও এই কলমটা রাখো', বলে কোটের পকেট থেকে একটা কলম বের করে প্রীতমের হাতে দেন জিতেন হেমব্রম, 'এই কলমের মধ্যে আমার মেধা ভরে দিলাম। অংক ইংরেজি তোমার পায়ে মেনি বেড়ালের মতন হামাগুড়ি দেবে এরপর থেকে। দেখি ওই গোলোক বেটার নাতি কী করে এবারে টেক্কা দেয় তোমায়। গলুর ওপরে পারিনি, এবারে ওর নাতিকে হারিয়ে জ্বালা মেটাবো। উহ কী কষ্ট করে ঘুড়িটাকে আকর্ষণ করে এদিকে নিয়ে এলাম যাতে তোমাকে হাতের কাছে পাই... যাও কেটে পড়ো। কলমটার কথা কাউকে বোলো না দয়া করে। তাহলে আমার প্ল্যানটাই বানচাল হয়ে যাবে'। যেমন হঠাৎ করে গাছের আড়াল থেকে সামনে হাজির হয়েছিলেন জিতেন হেমব্রম, তেমনি আচম্বিতেই আবার গাছের আড়ালে হারিয়ে গেলেন তিনি। এতক্ষণ ভয় করেনি, কিন্তু চোখের সামনে আস্ত একটা মানুষকে অমন ফুস করে হাওয়ায় মিশে যেতে দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল প্রীতমের। কোনো দিকে না তাকিয়ে সে সোজা ছুট লাগালো বাড়ির দিকে।
শমিত স্যারের অংক ক্লাশে নিজেই অবাক হয়ে গেল প্রীতম। প্রশ্নমালার সবচেয়ে শক্ত অংকটা, যেটা অরিন্দম বুঝেই উঠতে পারেনি সেটা কষতে ঠিক তিন মিনিট সময় নিল সে। কুন্তল স্যারের ইংরেজি ক্লাশে এমন ঝরঝরে আর আলংকারিক সব বাক্য লিখল রাইটিং স্কিলের খাতায়, কুন্তল স্যার নিজেই বিষম খেয়ে কেশে টেসে অস্থির। প্রীতম অন্যদের চোখ এড়িয়ে কলমটাকে একবার পেন্নাম ঠুকে নিল। সত্যি এলেম আছে জিতেন হেমব্রমের। এক দিনের মধ্যে ক্লাশে প্রীতমকে একেবারে হিরো বানিয়ে দিয়েছে কলমটা। এই কলম কাছে থাকলে বার্ষিক পরীক্ষায় তার ফার্স্ট হওয়া আটকায় সাধ্য কার। জন্মদিনে মনের মতন চারখানা গল্পের বইও একেবারে বাঁধা।
ছুটির পরে বাড়ি ফেরার পথে অরিন্দম এসে হাত রাখল পিঠের ওপরে, 'এই পুলু, ব্যাপারটা কী রে?'
'কী ব্যাপার?' গলাটাকে স্বাভাবিক রেখে জিজ্ঞেস করল প্রীতম।
'তুই যে হঠাৎ অংক ইংরেজিতে এমন তুখোড় হয়ে গেলি এক রাত্তিরের মধ্যে? মা সরস্বতী দুম করে তোকে কিছু বর-টর দিয়ে দিলেন নাকি রে?'
'ইয়ার্কি মারিস না যা', ছদ্ম রাগের ভঙ্গীতে বলে প্রীতম, 'ফার্স্ট পজিশনটা তো নিজের সম্পত্তিই বানিয়ে ফেলেছিস তুই। কত করে বললাম একটা বছর আমাকে ছেড়ে দে। রাজি হলি না। অমন ভালো ভালো বই হাতছাড়া হতে চলেছে। কী করব বল, মরিয়া হয়ে খাটছি এখন'।
'খাট খাট। জোর কদমে চালিয়ে যা। আমার কোনো অংক আটকে গেলে তোর হেল্প নেব। তুই ঠিক পারবি। দাদু বলেন মানুষের অসাধ্য কিছু নেই। কেউ যদি মন দিয়ে কিছু চায় আর তার জন্যে চেষ্টা করে, তাহলে সে তা পাবেই। জোর করে তাকে আটকে রাখার সাধ্য কারো নেই'।
'আচ্ছা আমি যদি তোকে হারিয়ে দিয়ে ফার্স্ট হই, তোর আমার ওপরে রাগ হবে না? মনে হবে না আমার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া দরকার?'
'তোর মাথাটা গেছে পুলু', হা হা করে হেসে ওঠে অরিন্দম, 'অভ্যাস নেই তো, হঠাৎ করে রাত জাগছিস, নিশ্চিত পেট গরম হয়েছে তোর, নইলে মাথার ব্যারাম', বলে ব্যাগের মধ্যে হাত গলায় অরিন্দম। তারপর একটা ডাঁসা পেয়ারা বের করে এনে প্রীতমের হাতে দেয়, 'এই নে খা। আমাদের গাছের পেয়ারা। তোর জন্যে এনেছিলাম...'
পেয়ারাটা হাতে নিয়েই তাতে কামড় বসায় প্রীতম। তারপর অরিন্দমের দিকে চেয়ে বলে, 'অরিন, তুই জিতেন হেমব্রমের নাম শুনেছিস?'
'কে?' চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে অরিন্দম।
'জিতেন হেমব্রম। গোলোকদাদুর সঙ্গে একসঙ্গে স্কুলে পড়তেন'।
'তুই কী করে চিনলি তাঁকে?'
'শুনেছি ওনার কথা', আসল ঘটনা চেপে গিয়ে বলে প্রীতম, 'আমার ওঁর সম্পর্কে খুব জানার ইচ্ছে। বাড়ি ফিরে দাদুকে জিজ্ঞেস করে জানাবি আমায় একটু ফোন করে ওই ভদ্রলোকের কথা?'
'আচ্ছা বেশ। জানাবো', বলে স্থির দৃষ্টিতে একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকে অরিন্দম প্রীতমের দিকে। তারপর হাঁটা লাগায় বাড়ির পথে।
বাড়ি ফেরার ঘন্টাখানেকের মধ্যেই অরিন্দমের ফোন এল মায়ের মোবাইল নম্বরে। প্রীতম ফোন ধরতেই অরিন্দম বলে উঠল, 'নে সরাসরি দাদুর সঙ্গেই কথা বলে নে'।
'দে দাদুকে', বলে অপেক্ষা করতে থাকে প্রীতম। কয়েক মুহূর্ত পরেই ফোনের অপর প্রান্তে গোলোকদাদুর কন্ঠস্বর শুনতে পায় সে, 'পুলুদাদু, বলো, কী ব্যাপার?'
'দাদু, তোমার জিতেন হেমব্রমকে মনে আছে? তোমার সঙ্গে স্কুলে পড়তেন?'
'কেন মনে থাকবে না', গোলোকদাদুর কথায় উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ে, 'হি ওয়াজ আ জিনিয়াস। ওর মতন ইংরেজি খুব কম লোকে লিখতে পারে। অংকেও ভীষণ স্ট্রং ছিল জিতেন। কিন্তু...'
'কিন্তু কী দাদু?' কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে প্রীতম।
'ছেলেটা খুব অ্যামবিশাস ছিল। আর অন্যের সাফল্য, বিশেষত অন্য কেউ তাকে ছাপিয়ে যাবে এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারত না জিতেন। যে কারণে তার কোনো বন্ধু ছিল না। জিতেনের কাছে সকলেই ছিল প্রতিযোগী, কমপিটিটর...'
'তুমি তো বোধহয় পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে স্কুলে তাই না?'
'হ্যাঁ'।
'তাহলে তোমার ওপরেও জিতেন হেমব্রমের রাগ ছিল খুব?'
'ছিল'।
'তুমি জানতে সে কথা?'
'আমরা বাকি সব বন্ধু জানতাম। জিতেন রাগে আমার সঙ্গে কথা বলত না পর্যন্ত। এই নিয়ে আড়ালে আমরা সকলে খুব হাসাহাসি করতাম'।
'তারপর কী হল?'
'জিতেন সংসার করেনি। একটু খ্যাপাটে মতন হয়ে গিয়েছিল। কলেজ পাশ করার পর চার্চে যোগ দেয়। তারপর...'
'তারপর কি দাদু?'
'ভেরি স্যাড', বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন গোলোকদাদু, 'ওর যখন মিড ফর্টি, তখন একটা কার অ্যাকসিডেন্টে জিতেন মারা যায়। চার্চের উত্তর দিকে খানিক হেঁটে যে গ্রেভ ইয়ার্ড ওখানেই কবর দেওয়া হয়েছিল ওকে। আমরা বন্ধুরা কয়েকজন গিয়েছিলাম সেদিন। কিন্তু তুমি হঠাৎ এতদিন বাদে জিতেনের কথা কী করে জানলে দাদু?'
'আমি একদিন স্কুল-ফেরত যাব তোমার কাছে অরিনের সঙ্গে। তখন সব কথা বলব তোমায়', বলে ফোন রেখে দেয় প্রীতম।
রাতের বেলায় পড়ার টেবিলে বসে ব্যাগ থেকে জিতেন হেমব্রমের কলমটা বের করে সামনে রাখল প্রীতম। ওটা হাতে নিলেই শমিত স্যারের দেওয়া হোমওয়ার্কের অংকগুলো মুহূর্তের মধ্যে হয়ে যাবে সে জানে, তবু কলমটা ছুঁয়ে দেখল না প্রীতম। নিজের কলম দিয়েই অংকগুলো কষার চেষ্টা শুরু করল সে। ভুল হল, আবার নতুন করে অংক শুরু করল সে। আবার, আবার। গোলোকদাদু বলেছেন মানুষ ইচ্ছে আর চেষ্টা করলে সবকিছু করতে পারে। সেও পারবে। পারবেই। নিজের চেষ্টাতেই পারবে একদিন।
জিতেন হেমব্রমের কলমটার দিকে তাকায় প্রীতম। লোকটার জন্যে মায়া হয়। এত বড় প্রতিভাবান মানুষ, কিন্তু শুধুমাত্র হিংসাই শেষ করে দিল তাঁকে। মৃত্যুর পরেও মানুষটার মনে শুধুই প্রতিশোধস্পৃহা। মরার আগেও বন্ধুত্বের অলৌকিক আস্বাদন তিনি পাননি, মৃত্যুর পরেও জানতে চাননি কখনও, প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতাই মানুষকে কাঙ্ক্ষিত আনন্দের অনিঃশেষ জগতে পৌঁছে দেবার রাস্তাটা চিনিয়ে দিতে পারে ঠিকঠাক।
প্রীতম মন ঠিক করে ফেলল। সুযোগ মতন সে আর অরিন একসঙ্গে গিয়ে দাঁড়াবে একবার জিতেনদাদুর সমাধির সামনে। পারলে গোলোকদাদুকেও নিয়ে যাবে। প্রাণপনে বোঝানোর চেষ্টা করবে ওঁকে বন্ধুত্বের স্পর্শমাখা সম্পর্কগুলো কত আরামের আর শান্তির। তার স্থির বিশ্বাস জিতেনদাদু বুঝবেন। বুঝবেনই। আর তখন তিনি নিজেই তাঁর কলমটা চেয়ে নেবেন প্রীতমের কাছ থেকে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন