মাধো সর্দারের শেষ ডাকাতি

জয়দীপ চক্রবর্তী

রঘুনাথগঞ্জের আশেপাশের দু-দশটা গ্রামে একসময় মাধো ডাকাতের নামেই থরথর করে কেঁপে উঠত মানুষজন। বাচ্চারা ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলতো তার নাম শুনলে। গেরস্থ বাড়িতে মাধো ডাকাতের চিঠি এসেছে শুনলে পুলিশ চৌকিতে পর্যন্ত থরহরি কম্প লেগে যেত। যেমনি ছিল তার ইয়া পেল্লাই দশাসই চেহারা, তেমনি শক্তি ছিল গায়ে। দশ বিশজন লেঠেলের সঙ্গে একাই মহড়া নিতে পারত মাধো সর্দার। মাধো ডাকাতের এক পূর্বপুরুষ দুর্ধর্ষ লাঠিয়াল ছিল একসময়। সেই রক্তই পেয়েছিল মাধো ডাকাত। তার হাতের লাঠি যখন ঘুরত, শুধু আওয়াজ শোনা যেত ভোমরার ডানার শব্দের মতন। দেখা যেত না কিচ্ছুটি। সেই লাঠির সামনে দাঁড়াবে এমন সাধ্য কার? বন্দুকের গুলি পর্যন্ত সেই ঘুরন্ত লাঠির গায়ে লেগে ঠিকরে চলে যেত দূরে। মাধোর গায়ে আঁচড়টি কাটতে পারত না তারা। গভীর রাতে আরাধ্য দেবীর সামনে বলি দিয়ে যখন ডাকাতি করতে বেরতো মাধো ডাকাতের দল, রাস্তার কুকুরগুলো অব্দি ডাকতে ভুলে গিয়ে দু-পায়ের খাঁজে লেজ ঢুকিয়ে নিয়ে বশংবদ ভঙ্গীতে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকত রাস্তার পাশে সরে গিয়ে।

এখন দিন বদলে গেছে। ডাকাতির সেই সৌন্দর্য এখন আর নেই। শক্তি আর সাহসের কদর কমে গেছে মানুষের মন থেকে। গঞ্জে বিদ্যুতের আলো এসে গেছে। বন জঙ্গল ফাঁকা হয়ে গেছে অনেক। মানুষ বাড়িতে সোনা-দানা টাকা-পয়সা রেখেও দেয় না আর আগের মতন। ব্যাংক গজিয়ে উঠেছে পাড়ায় পাড়ায়। তাছাড়া, মাধো সর্দারের শরীরে বয়েস থাবা বসিয়েছে। যৌবনের জৌলুস খসে গেছে গা থেকে। হাতের লাঠির গতি কমেছে। কমেছে চোখের দৃষ্টি আর গলার তেজও। মাথার চুল ফাঁকা হয়েছে, গায়ের মাংস ঢিলে হয়েছে। ডাকাতি ছেড়ে তার দলের সকলেই প্রায় অন্য কাজ কারবারে থিতু হয়েছে অনেক দিন। কিন্তু মনে একটা খচখচানি লেগেই ছিল মাধো সর্দারের। সে চিঠি পাঠিয়ে ডাকাতি করার স্পর্ধা জানিয়েছে এক কালে। আজ দুম করে কাজ থেকে বসে পড়তে বড়ই ইজ্জতে লাগছিল তার। শেষ পর্যন্ত মাধোর শাকরেদ বৃন্দাবনই বিস্তর মাথা খাটিয়ে এই বুদ্ধিটা বের করল।

রাত গভীর হলে অভ্যাস মতন সপ্তায় একবার এখনও রঘুনাথগঞ্জের প্রান্তে যে জঙ্গল, তার মধ্যেই মজা নদীর ধারে পরিত্যক্ত ডাকাতে কালীর মন্দিরের চাতালে জমায়েত হয় মাধোর দল। জঙ্গলের অন্ধকারে মশাল জ্বলে ওঠে তখন। পরিত্যক্ত কালী মন্দিরে মূর্তির পায়ে জবা ফুল পড়ে। কপালে সিঁদুর দিয়ে পাকা বাঁশের লাঠিগুলো মাথার ওপরে তুলে বনবন ঘোরায় মাধোর দল। গাছের ডালে ঘুমিয়ে পড়া পাখিরা তখন জেগে উঠে বিরক্তিতে ডানা ঝটপট করে ওঠে জঙ্গল জুড়ে। নিমেষে সময় একলহমায় পিছিয়ে যায় কয়েক দশক। মাধোর দলের ডাকাতদের পুরনো রক্ত খানিকক্ষনের জন্যে উষ্ণ হয়ে ওঠে আবার। অবশ্য দল বলতে সাকুল্যে জনা চারেকে ঠেকেছে এখন। মাধো, বৃন্দাবন, বাঁটু আর বুধন। বাকিরা হয় গ্রাম ছেড়ে অন্য জায়গায় থিতু হয়েছে, নয়ত বেঁচেই নেই আর।

শনিবারের সেই সাপ্তাহিক জমায়েতেই কথাটা পেড়েছিল বৃন্দাবন। লাঠিটাটি ঘুরিয়ে হাঁফ ধরেছিল খানিক। মন্দিরের চাতালে বসে মশালের আলোর দিকে চেয়ে সে বলে উঠল, 'সর্দার, এবার একটা স্থির সিদ্ধান্তে আসা দরকার।'

'কীসের?' গলাটাকে গম্ভীর করার চেষ্টা করে মাধো।

'এই কাজের।'

'কাজ আর কোথায়?' হতাশ হয়ে বলে মাধো, 'কতদিন যে কাজে বেরোই না আর। হাত-পা তো বলতে গেলে বসেই গেল একেবারে।'

'সেজন্যেই তো বলছি সর্দার, সব কাজেই থামতে হয় একদিন। এবার আমাদেরও পুরোনো কাজ থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর নিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে।'

'আনুষ্ঠানিক অবসর?' অবাক হয়ে বলে মাধো।

'আলবাত। আমরা কি যে সে ডাকাত?' পেকে যাওয়া গোঁফ চুমরে বলে বৃন্দাবন, 'আমাদের শুরু যেমন হয়েছিল জমিদারবাড়িতে লোমহর্ষক ডাকাতি দিয়ে, শেষটাও জমজমাট হওয়া চাই। নইলে মুড়ি মিছরি যে এক হয়ে যাবে। অন্যসব ছিঁচকে দলের সঙ্গে আমাদের এক করে দেবে আগামি দিনের মানুষ। কী বলিস তোরা?' বৃন্দাবন অন্যদের সম্মতি চায়।

'একশো বার, হাজার বার', নিজেদের হাতের লাঠি মাথার ওপরে তুলে চেঁচিয়ে ওঠে বাঁটু আর বুধন।

'হিরণপুরের জমিদারদের তখন পড়তি দশা, তবু সম্পদ কম ছিল না মহল্লায়। চিঠি দিয়ে গিয়েছিলাম আমরা। লাঠিয়াল চাড্ডি জমায়েত করেছিলেন বটে জমিদার রমেন তপাদার, কিন্তু পেরে ওঠেননি আমাদের সঙ্গে...' মাধো সর্দার স্মৃতিতে ডুবে যায়।

'মনে আছে সর্দার?' বৃন্দাবনের ছানি কাটানো চোখ চকচক করে ওঠে মশালের আলোয়।

'থাকবে না আবার?' মাধো সর্দার উঠে দাঁড়ায়, 'গিন্নিমা আমার সামনে হাতজোড় করে বলেছিলেন সব নে মাধো, কিন্তু এয়ো স্ত্রীদের সোনা বাঁধানো শাঁখা পলাগুলো নিসনি বাপ। আর পারলে হাতে গলায় দু চারটে রেখে যাস। ঘরের মেয়ে বউরা খালি হাতে গলায় ঘুরলে গেরস্থের বড় অকল্যান হয়...'

'মনে আছে সর্দার', বাঁটু বলে, 'আপনি সে কথা রেখেওছিলেন। কত্তা খুশি হয়ে যাবার সময় আমাদের হাতে মতিচুরের লাড্ডু দিয়েছিলেন বয়ামে ভরে...'

'বলেছিলেন তোদের সাহস আর শক্তি দেখে ভারি খুশি হলুম', বুধনের ঠোঁটের কোনে হাসির ঝিলিক ওঠে।

'কাজেই আমাদের শেষ ডাকাতিটাও আমরা জমিদার বাড়িতেই করতে চাই। তারপর অবসর। লাঠিগুলো মন্দিরের পাশের এই মজা খালে বিসর্জন দিয়ে দেব ফিরে এসে।'

'আর কি পারব রে বেন্দাবন?' মাথা নাড়ায় মাধো, 'শরীরে তাকত নেই যে আর...'

'তবু...' বৃন্দাবন বলে, 'এ যে আমাদের ঘরানার পুরনো প্রথা। সে প্রথা আপনি ভেঙে দেবেন সর্দার?'

'কিন্তু জমিদার বাড়ি পাবি কোথায়? জমিদারি যে কবেই উঠে গেছে। তাছাড়া লোকলস্কর পুলিশ বন্দুক জুটিয়ে তারা যদি রুখে দাঁড়ায়, এই বুড়ো শরীরে পারব কি চারজন তাদের সঙ্গে টেক্কা দিতে?' মাধো ডাকাতের গলায় সংশয় ফুটে ওঠে।

'সে কি আর আমি বুঝি না সর্দার?' মাটিতে লাঠি ঠুকে বলে বৃন্দাবন, 'তেমন জমিদার বাড়ির কথাই ভেবেছি যেখানে আমাদের প্রথাটাও বজায় থাকবে, অথচ গোলোযোগও কিছু থাকবে না...'

'তোর মতলবটা ঝেড়ে কাশ তো দেখি', উৎসাহের সঙ্গে বলে এবার মাধো সর্দার।

'এই জঙ্গলের ওপাশেই তো নদীর পাড়ে গঞ্জের একধারে চৌধুরী জমিদারদের পেল্লায় প্রাসাদখানা ভেঙেচুরে গাছপালা আর আগাছায় মুড়ে পড়ে রয়েছে কতদিন ধরে। আগে তবু দোল দুর্গোৎসবে বাবুরা আসতেন, আজকাল তাও আসেন না। ভুতুড়ে বাড়ি হয়েই প্রাসাদখানা একলা একলা একধারে পড়ে আছে বারোমাস। আমরা সামনের কৃষ্ণপক্ষে ওই বাড়িতেই ডাকাতি করতে যাব। তার আগে একদিন না হয় সময় মতন আলতা দিয়ে একখানা চিঠি লিখেও ফেলে দিয়ে আসা যাবেখন বার বাড়ির বারান্দায়...' বৃন্দাবন মাধো ডাকাতের দিকে তাকায়, 'আপনি শুধু অনুমতিটা দিন সর্দার...'

'ফাঁকা পরিত্যক্ত বাড়িতে যাব ডাকাতি করতে?' কিন্তু কিন্তু গলায় বলে মাধো, 'পোড়ো বাড়িতে ডাকাতি করে কী নিবি রে বেন্দাবন?'

'নেওয়াটা তো বড় কথা নয়, আসল কথা হল ডাকাতিটা করা। শেষ ডাকাতিটা বনেদি বাড়িতে করে প্রথা রক্ষা করা। কী বল রে বুধন?' বৃন্দাবন বলে।

'হুঁ', মাথা চুলকে বলে বুধন।

'কী রে বাঁটু, তুই কী বলিস?' বৃন্দাবন জিজ্ঞেস করে।

'বুদ্ধিটা মন্দ বের করিসনি বেন্দাবন। সাপও মরবে, অথচ লাঠি ভাঙবে না। মানতেই হবে তোর মাথা আছে'। বাঁটু বলে মাধোর দিকে চেয়ে।

'কিন্তু যে বাড়িতে মানুষই নেই, সে বাড়িতে ডাকাতিটা হয় কী করে?' মাধো সর্দার যুক্তি দেখায়, 'মানুষ না থাকলে যে লোটার মতন সম্পদও থাকে না। শেষে কিনা বুড়ো বয়েসে পোড়ো বাড়ির কড়ি বরগা চুরি করতে যাব রে? এ তো ছিঁচকে চোরের কাজ হয়ে যাবে হে? এ কাজে কি আমাদের সম্মান থাকবে?'

'লোক থাকলে যে লড়াইও থাকবে?', বৃন্দাবন বলে, 'অনভ্যাসে হাড়ে যে মরচে পড়ে পড়ে গেছে সর্দার। লাঠি কি ঘুরবে আগের মতন?'

'কথাটা ঠিকই', মাথা নাড়ায় মাধো, 'তবু আঁতে লাগছে রে বেন্দাবন...'

'চিঠি পাঠিয়েই তো যাচ্ছি। দেখুন জমিদারবাড়ির ব্যাপার, লোক-লস্কর জুটেও যেতে পারে শেষ পর্যন্ত', বৃন্দাবন নিভে আসা মশালের দিকে চেয়ে বলে।

'আর সম্পদ?'

'কপাল ভালো থাকলে তাও জুটে যেতে পারে সর্দার?'

'কী করে?'

'শুনেছি চৌধুরী জমিদারদের লাঠিয়ালরা একসময় প্রচুর সোনাদানা লুঠ করে এনে ওই প্রাসাদের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছিল সকলের নজর এড়িয়ে। সে সম্পদের হদিশ নাকি আজ অব্দি পাওয়া যায়নি সর্দার। চলুন আমরা বরং সেই সাত রাজার ধনই লুটে আনি ওখান থেকে।' বৃন্দাবনের চোখ চকচক করে ওঠে।

'বেশ তবে তাই হোক', মাধো সর্দার উঠে দাঁড়ায়, 'দলের সকলের যখন এটাই ইচ্ছে, আমি আর বাধা দিই কেন...তাহলে কথামতন সামনের কৃষ্ণপক্ষেরই কোনো এক দিনে আমাদের শেষ ডাকাতি চৌধুরীদের বড়কুঠিতে। লুঠের মাল আপোষে বাঁটোয়ারা হবে চারজনের মধ্যে। রাজি সকলে?'

'রাজি সর্দার', সকলে একসঙ্গে বলে ওঠে।

'ওইদিন তাহলে এইখানেই জমায়েত। তার আগে দিনকয়েক লাঠি ঘোরানো প্রাকটিস করে নিতে হবে আমাদের। মনে থাকবে?'

'থাকবে ওস্তাদ।'

'মায়ের কাছে পুজো দিয়ে কাজে বেরবো আমরা শেষবারের জন্যে...'

'জয়, মাধো সর্দারের জয়', বলে ওঠে বৃন্দাবন।

'জয়, আমাদের মাধো সর্দারের জয়', লাঠি উঁচিয়ে বলে উঠল বুধন আর বাঁটুও।

ডানা ঝটপটিয়ে কয়েকটা পাখি উড়ে গিয়ে আরো উঁচু ডালে বসে পড়ল সেই আওয়াজে ভয় পেয়ে।

অনেকদিন পরে আজ আবার মালকোঁচা মেরে ধুতি পরেছে মাধো সর্দার। মাথায় পাগড়ি। কপালে সিঁদুরের টিপটাও লাগিয়েছে বেশ চড়া করে। কোমরে কোমরবন্ধ। সেখানে ছুরি গোঁজা। ছুরিতে খানিক মরচে পড়েছে অবশ্য। তবু তাতে কিছু যায় আসে না। মেজাজটা বেশ শরিফই লাগছে। মাথাটাও ফুরফুরে। গলাতেও বেশ একটা জোশ এসে গেছে আজ। হাতের লাঠিখানা অনেকদিন বাদে যেন কথা বলে উঠতে ইচ্ছে করছে। অন্ধকার জংলি পথে হাঁটতে হাঁটতে মাধোর মনে হল শরীরে যেন সেই দু-কুড়ি বছর আগের বলশক্তি ফিরে এসেছে হঠাৎ করে। কানে গোঁজা জবা ফুলটাকে হাতের তেলো দিয়ে একটু ঠিকঠাক করে নিয়ে মাধো হাঁক পাড়ল, 'বেন্দাবন—'

মাধোর গলার আকস্মিক পরিবর্তনে খানিক অবাক হয়ে গিয়েই থতমত স্বরে সাড়া দিল বৃন্দাবন, 'কত্তা...'

'চিঠিটা ঠিকঠাক ফেলেছিলি তো দালানে?' বাজখাই গলায় বলে মাধো। সেই আওয়াজে বুধন আর বাঁটুর বুকের ধুকপুকুনি বেড়ে যায়। তাদের অভিজ্ঞ মন বার বার জানান দিচ্ছে, কী একটা যেন ঘটতে চলেছে। মাধো সর্দারের মধ্যে অন্য কে যেন এসে বাসা বেঁধেছে আজ। আর সে লোকটা বুড়োহাড়া রোগে ভোগা নয় মোটেই। এ যেন সেই পুরনো দিনের মাধো সর্দার।

বৃন্দাবনের মনটাও কেঁপে ওঠে। মনে মনে ঈষ্ট স্মরণ করে সে। বড়কুঠির নানান বদনাম আছে। অনেকে বলে কুঠিটা ফাঁকা, তবু নাকি ফাঁকা নয়। বয়স্ক মানুষেরা বলাবলি করেন এ বাড়িতে নাকি অনেক রহস্য। চৌধুরীদের বড়কুঠুরিতে গুপ্তসুড়ঙ্গ আছে বলেও শোনা যায়। সে মোটেও ভীতু নয়, তবু এই প্রথম বৃন্দাবনের মনে হল তাদের জীবনের শেষ অভিযানটার জন্যে এই বাড়িটাকে না বাছলেই বোধহয় ভালো হত।

নীচু গলায় বৃন্দাবন জবাব দেয়, 'চিঠি ঠিকমতনই দেওয়া হয়েছে সর্দার। সে চিঠিতে বেশ স্পষ্ট করেই লিখে দেওয়া হয়েছে বড়কুঠিতে যারা বাস করে ক্ষমতা থাকলে তারা মাধো ডাকাতকে রুখে দিক। যদি কেউ রুখতে পারে, মাধো দলবল নিয়ে তার দাস হয়ে কাটাবে বাকি জীবন...'

'হুঁ', ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ আর তর্জনি দিয়ে নিজের গোঁফ চুমরে নেয় মাধো সর্দার। তারপর জঙ্গল ঠেলে লাঠি বাগিয়ে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। খান কতক শেয়াল আগুনে চোখ নিয়ে একটু দূর থেকে ডাকাতের এই দলটার ওপরে নজর রাখছিল কিছুক্ষণ ধরে। মাধোর বিক্রম দেখে তারা তফাতে সরে গেল। ব্যাপারটা মাধো ডাকাতের নজর এড়ায়নি। শেয়ালগুলো তাকে সম্মান দিল দেখে মনটা বেজায় খুশি হয়ে উঠল তার।

মাধো ডাকাতের দল যখন বড়কুঠির মরচে ধরা একদিকে ভেঙে পড়া লোহার গেটটার সামনে এসে পৌঁছল, মাঝরাত তখন সবে ভোর রাতের দিকে ঝুঁকেছে। অন্ধকার ফিকে করে একপাল মিটমিটে তারাদের মধ্যে তখন ভোঁতা চাঁদটা ভেসে উঠেছে। তার আবছা হলদেটে আলো এসে পড়েছে বড়কুঠির পলেস্তারা খসা দেওয়াল আর হরজাই গাছে ঢাকা বাগান জুড়ে।

মাধো লোহার দরজার ওপর লাঠি ঠুকে বলে উঠল, 'বেশ একটু হারে রে রে করে চিল্লে ওঠা হবে নাকি রে সবাই মিলে?'

'থাক সর্দার', লোহার দরজার ভেঙে যাওয়া দিক দিয়ে বড়কুঠির বাগানে ঢুকতে ঢুকতে বলে বাঁটু, 'রাতের আওয়াজ অনেক দূর অব্দি ছড়িয়ে পড়ে। আওয়াজ কানে গিয়ে গঞ্জের মানুষ যদি ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে তাহলে বিপদের আর শেষ থাকবে না। কদিন ধরে বাতের ব্যথাটাও এমন চাগাড় দিয়েছে যে প্রয়োজনে ছুটতেও পারব না প্রাণ খুলে।'

মাধো মনে মনে বিরক্ত হল। শেষ ডাকাতির রোমাঞ্চে যেন খানিক ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। তবে মুখে সে আর বলল না কিছু। চেল্লামিল্লির দিকেও গেল না। বরং খানিক অনুমতি নেওয়ার ভঙ্গীতেই বলে উঠল, 'তাহলে পুরনো গেটটায় খান কতক লাথি কষাই অন্তত। ওটা মাটিতে শুয়ে পড়ুক। নইলে যে চোরের মতন ঢোকা হয়ে যাবে, কী বলিস রে বুধন। ও বেন্দাবন, কী কইছিস বল বাপু...'

'সে আপনি করতেই পারেন সর্দার', মাথা নেড়ে সম্মতি দেয় বৃন্দাবন, 'কিন্তু কাজটা সাবধানে করবেন। বয়েসটা আর আমাদের সঙ্গে নেই মাথায় রাখবেন। হুট করে পায়ে একটা চোট টোট লাগিয়ে বসবেন না যেন।'

বড়কুঠির গেট মাটিতে শুইয়ে দিয়ে বেশ বুক ফুলিয়েই ভেতরে ঢুকে পড়ল মাধো ডাকাতের দল। হাতের লাঠি বাগিয়ে হই হই করে এগিয়ে চলল তারা অন্দরমহলের দিকে। বারমহলের সদর দরজা পেরিয়ে অন্দরের উঠোনে এসে দাঁড়ালো ডাকাতের দল। বাঁধানো চত্বরের চারপাশে সারি দেওয়া ঘর দালান। হাতের লাঠি মাথার ওপরে তুলে তিনপাক ঘুরিয়ে নিয়ে মাধো চেঁচিয়ে উঠল, 'যতই পড়ে থাকা কুঠি হোক। মাথায় রাখিস, বড়কুঠি বড়কুঠিই। তন্ন তন্ন করে খুঁজবি মহলগুলো। লুকনো সম্পত্তির হদিশ পেলেই ডাক দিবি। সে সম্পদের কিচ্ছুটি যেন পড়ে না থাকে'।

'যে আজ্ঞে সর্দার', বুক ঠুকে বলল বুধন। এতক্ষনে সেই পুরনো উন্মাদনাটা সেও যেন ফিরে পেল। নিজের গলার আওয়াজে নিজেই চমকে উঠল সে। মনে মৃদু সন্দেহ হল, গলাটা তার নিজেরই তো?

অন্দরমহলে ঢোকবার আগে ফস করে হাতের মশালটা জ্বালিয়ে নিল বাঁটু। আর তখনই বেজায় গম্ভীর গলাটা ধমক দিয়ে উঠল, 'খবরর্দার। আমি থাকতে বড়কুঠির একটা ইটও তুলে নিয়ে যেতে পারবে না কেউ'। সেই কণ্ঠস্বরে বড়কুঠির দুর্বল জানলা দরজার নড়বড়ে পাল্লাগুলো থরথর করে কেঁপে উঠল। বুধন, বাঁটু আর বৃন্দাবনের বুকও কেঁপে উঠল। কিন্তু মাধো ডাকাত হুংকার দিয়ে উঠল, 'কে তুই? কার এত সাহস? মাধোডাকাতের চিঠি পেয়েও ভয় পাস না তুই?'

'পাই না।' সেই গম্ভীর কন্ঠস্বর আবার বলে উঠল।

মাধোর শরীর গরম হয়ে উঠছিল ক্রমাগত। রক্তে আবার পুরনো দিনের প্রবাহ। ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া যুবক আর দুর্দম সেই মাধোডাকাত ফিরে এল তার বুড়োটে শরীরের মধ্যে। হাতের লাঠি বাগিয়ে চিৎকার করে উঠল সে, 'সাহস থাকে তো সামনে আয় বেয়াদপ।'

তেল চপচপে চেহারার দৈত্যের মতন দেখতে যে মানুষটা অন্ধকার ফুঁড়ে লাঠি হাতে মাধোর সামনে এসে দাঁড়াল, তাকে দেখে যে কোনো সাধারণ লোকেরই ভিরমি খাবার কথা। কিন্তু মাধো ডাকাতকে তো আর সাধারণ লোকের মধ্যে ফেলা যায় না, কাজেই মাধো মোটেই তাকে দেখে ভয় পেল না। ভিরমিও খেল না। বরং লাঠি হাতে বীরবিক্রমে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার ওপরে। লোকটা অদ্ভুত কায়দায় মাধো সর্দারের লাঠির মোক্ষম আঘাতটা এড়িয়ে গেল। মাধোর লাঠিটা হাওয়া কেটে শূন্যে ঘুরে গেল দু পাক। অন্য কেউ হলে টাল সামলাতে না পেরে নিজেই উলটে পড়ত। মাধো অবশ্য নিজেকে সামলে নিল। ক্রমশ লাঠির লড়াই জমে উঠল। বয়েসের বাধা সরিয়ে আজ এতদিন বাদেও দিব্বি সুরে কথা বলতে লাগল মাধো সর্দারের হাতের লাঠি, কিন্তু সেই লোকটিকে লাঠিটা কিছুতেই কব্জা করতে পারল না।

হঠাৎই, ভোজবাজির মতন অন্দরমহলের দালানের দেওয়ালে সার দিয়ে থাকা কুলুঙ্গির মধ্যে আলো জ্বলে উঠল। সেই আলোয় চোখে পড়ল পরনে ধুতি, আদুড় গায়ের আরো কিছু লাঠিয়াল। দালানের মেঝেয় লাঠি ঠুকে ঠুকে তারা উৎসাহ দিতে লাগল মাধোদের। তখনই সম্ভ্রান্ত চেহারার একজন নেমে এলেন সিঁড়ি দিয়ে। গায়ে সিল্কের আলোয়ান। গলায় সোনার মালা, হাতের আঙ্গুলগুলোয় হীরে জহরতের আংটি। লাঠিয়ালদের কয়েকজন ব্যস্তসমস্ত হয়ে চেয়ার এগিয়ে দিল তাঁকে। তামাক সেজে গড়গড়ার নল এনে ধরল মুখের কাছে। খোলা চত্বরে দুই লাঠিয়ালের লড়াই দেখে শিশুর আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলেন তিনি, 'ছোঁড়াটাকে সাবাশি দে গোবিন্দলাল। তোর লাঠির সামনে এতক্ষণ যুঝে যাচ্ছে তো বাচ্ছাটা...ওরে কে আছিস, ওর সঙ্গী ছেলে তিনটেকে বসার আসন দে...বাচ্ছাগুলো আর কতক্ষন অমনি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে...'

দুটো লোক সে কথার উত্তরে 'হ্যাঁ হুজুর', বলে তাঁর পায়ের কাছেই বসার বন্দোবস্ত করে দিল বৃন্দাবনদের।

একটা ঠান্ডা শিরশিরে বাতাস বইছিল। সেই বাতাসে অম্বুরি তামাকের গন্ধ উড়ছে। আরো নানারকমের গন্ধ মিশে যাচ্ছে সেই গন্ধের সঙ্গে। কেমন যেন একটা ঘোর লেগে যাচ্ছিল সক্কলের। বড়কুঠির আকাশে পাতলা কুয়াশার চাদর দেখা দিল এই গ্রীষ্মকালেই। কিচ্ছুটি বুঝতে পারছিল না বৃন্দাবন। আজ এ কী সব ঘটনা ঘটছে বড়কুঠির মধ্যে? স্বপ্ন দেখছে না তো? সত্যিই জেগে আছে কি বৃন্দাবন? এ লোকগুলো কারা? লোকগুলো স্বাভাবিক তো? তাদের মতন বুড়োদের এরা বাচ্চা বলছে কোন হিসেবে?

বাঁটু আর বুধনের হতভম্ব মুখের দিকে চেয়ে আর একটা সম্ভাবনাও উঁকি দিল বৃন্দাবনের মনে। আর সম্ভাবনাটা মাথায় আসতেই ভয়ে হাত পা হিম হয়ে গেল তার।

কুলুঙ্গিগুলো থেকে ঠিকরে আসা ছায়া ছায়া আলোয় প্রাণপনে লাঠি হাতে লড়ে যাচ্ছিল মাধো। লড়তে লড়তে কেমন যেন লড়াইয়ের নেশায় পেয়ে বসেছিল। সঙ্গে হার না মানা জেদ। অনেকদিন বাদে হাতের লাঠিটাও যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। গায়েও সিংহের বিক্রম ফিরে এসেছে মাধো সর্দারের। আজ আর কিছুতেই হার মানার কথা নয়, কিন্তু সিংহাসনের মতন দেখতে চেয়ারের ওপরে বসে থাকা মানুষটার মুখে গোবিন্দলাল নামটা শুনেই হাতের লাঠি শিথিল হয়ে গেল তার। হাতের লাঠি ফেলে দু-চোখে অবিশ্বাস নিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল মাধো।

লোকটা সিংহের মতন গর্জন করে উঠল, 'যদ্দিন বেঁচে ছিলুম এ বাড়ির নুন খেয়েই শরীরটা খাড়া থেকেছে। আজ মরে গেছি বলে কি এ বাড়ির ঋণ ভুলে গেছি ভেবেছিস? গোবিন্দলাল এ বাড়ির আলোছায়ায় যতদিন মিশে আছে, কারুর সাধ্যি আছে এ বাড়ির ক্ষতি করবে?' বলেই জমিদারবাবুর দিকে চেয়ে মাথা নীচু করল সে।

এতক্ষন ধরে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে লড়ে যাচ্ছিল মাধো। এখন বুঝতে পারল পা দুখানা তিরতির করে কাঁপছে। দু'হাত বুকের কাছে জড়ো করে সে বলে উঠল, 'অপরাধ নেবেন না। আপনারই বংশধর হয়ে আপনার দিকে লাঠি তুলেছি। সেই ছোট্টবেলা থেকে কত্ত নাম শুনেছি আপনার। সকলে বলেছে আপনার মতন লাঠিয়াল এ বিশ্বসংসারে তৈরি হয়নি আর। সেকালের চৌধুরী জমিদার হেমকান্তবাবুর আপনিই ছিলেন বলতে গেলে ডান হাত। লাঠি দিয়ে বাজিমাত করে কত মানুষের জমিজিরেত ধনসম্পদ যে লুঠ করে বাবুর পায়ে এনে ফেলেছিলেন, ভাবতেই শ্রদ্ধায় মাথা হেঁট হয়ে যায়...লুঠতরাজ আজকের মানুষেও কি করছে না? বলতে গেলে বেশিই তো করছে। ভদ্দরলোকেদের থেকে বড় লুঠেরা কি আমি আপনি হতে পেরেছি বলুন? কিন্তু আপনার লুঠে যে শিল্প ছিল, যে শৌর্য আর সাহস ছিল তা হারিয়ে গেছে এখনকার সমাজ থেকে... আমার সৌভাগ্য আজ চর্মচক্ষুতে আপনার বিক্রম প্রত্যক্ষ করতে পারলুম...'

'চিনেছো তাহলে আমায়?' গোবিন্দলাল খুশি হয়ে মাধোর কাঁধে হাত রাখে। ঠান্ডা বরফের মতন সেই স্পর্শ। কিন্তু মাধোর ভয় করল না আর। গোবিন্দলালের পায়ের কাছে বসে গদগদ ভঙ্গীতে সে বলে চলল, 'আমি আপনার অধস্তন চতুর্থ পুরুষ। অধমের নাম মাধবলাল...'

'ওঠো হে', তাকে দু-হাতে ধরে উঠিয়ে নেয় গোবিন্দলাল, 'লাঠিয়াল হিসেবে তুমিও মন্দ নয়। দিব্বি পাল্লা দিচ্ছিলে আমার সঙ্গে...'

'আপনার কাছে আমি নস্যি', মাধো বিনয়ের সঙ্গে বলে।

'মাধবলাল'—চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন জমিদার হেমকান্ত চৌধুরী, 'বলেছিলে না লাঠির কেরামতিতে হেরে গেলে সারাজীবন দাস হয়ে থাকবে?'

'আজ্ঞে বলেছিলাম। স্বীকার করছি কত্তামশাই।'

'তোমায় তো কথা রাখতে হবে হে...'

'রাখব হুজুর। যে কদিন বাঁচি আপনার হাত পা টিপে সেবা যত্ন করে...'

মাধোর কথার মাঝখানেই হা হা করে হেসে ওঠেন হেমকান্ত, 'ওরে বাপু হাত পা-ই তো নেই আর। শরীরটা তো কবেই ছেড়ে দিয়েছি বাপ। সেবা আর দিবি কোথায়। বহু কষ্টে খানিকক্ষনের জন্যে এই মায়াশরীর তৈরি করেছিলাম সবাই। কিন্তু আলো ফোটার সময় যত এগিয়ে আসছে শরীরটাও ফিকে হয়ে আসছে ক্রমাগত...'

'তাহলে কী করতে হবে আমাকে কত্তা? আদেশ দিন।' মাধো ডাকাত বলে। বৃন্দাবন, বাঁটু আর বুধনও তার পাশে এসে হাত জোড় করে দাঁড়ায়, 'আমরাও আছি কত্তা...'

হেমকান্ত চোখের ইশারা করেন গোবিন্দলালকে। গোবিন্দলাল অন্দরমহল থেকে পিতলের ঘড়া নিয়ে আসে কাঁধে করে। হেমকান্তের সামনে এনে রাখে। হেমকান্ত হাসেন, 'পাকা সোনার মোহর। এ বাড়িতেই আগলে রেখেছিলাম এতদিন। বাবা মাধবলাল, শেষ ডাকাতিতে কিছু সঙ্গে করে না নিয়ে গেলে যে ভারি বেইজ্জত হয় তোর, তাই এগুলো তোকেই দিলাম। কিন্তু একটা কাজ তোকে করতে হবে এগুলো দিয়ে...'

'কী কাজ হুজুর?'

'শোন বাবা, লুঠের মাল তো এসব। এই সম্পদের পিছনে অনেকের কান্না মিশে আছে। রক্তও লেগে আছে এই মোহরে। গোবিন্দর লাঠির ঘায়ে কম লোক তো মরেনি একসময়। তাদের আত্মাগুলো এখনও দেখা হলে শাপসম্পাত করে আমাদের। এই বয়েসে আর ওসব ভালো লাগে না বাপু। তাই ঠিক করেছি এগুলো দিয়ে জনসেবা করব...'

'সে তো ভালো কথা কত্তা।'

'ভালো তো বুঝলাম। কিন্তু শরীর না থাকলে কাজটা করি কী করে?'

'কথাটায় যুক্তি আছে।' মাথা নাড়ে মাধো।

'আমার আর গোবিন্দর হয়ে এই কাজটা তোদেরই করতে হবে বাবা।'

'যে আজ্ঞে।'

'নফরগঞ্জে হাসপাতাল হবে।'

'হবে।'

'রঘুনাথগঞ্জে ইস্কুল।'

'বেশ।'

'মাধবপুরে হিমঘর করতে হবে একখানা। ওদের ফসল নষ্ট হয় ফি বছর।'

'হয়ে যাবে কত্তা। আপনারা শুধু মাথার ওপরে থেকে কাজগুলো দেখভাল করে দেবেন আর দরকারি পরামর্শগুলো দিয়ে যাবেন ঠিকঠাক। আমাদের মোটা মাথা। আপনারা পাশে না থাকলে কী করতে কী করে ফেলব ভুল করে...'

'থাকব রে থাকব। ভূতে-মানুষে মিলেমিশে সোনা ফলিয়ে দেব এবার চারধারে দেখে নিস।'

কলসি বোঝাই মোহর কাঁধে নিয়ে জঙ্গলের কালীমন্দিরের দিকে রওনা দিল মাধো ডাকাতের দল। রাত ফরসা হতে বেশি দেরি নেই। তার আগেই এইসব ধনরত্ন ঠিকমতন বিলিবন্দোবস্ত করে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে দিতে হবে। মানুষের লোভী চোখ বড্ড খারাপ। শুভ কাজে হানিকর।

সামনে অনেক কাজ। ঠান্ডা মাথায় বিচার বিবেচনা করে পথ হাঁটতে হবে আগামী দিনগুলোতে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%