লাস্ট মিনিট সাজেশন

জয়দীপ চক্রবর্তী

মৃদুলের দেওয়া প্রস্তাবে একটুও সায় ছিল না আমার। জাকিরদার থেকে দশ টাকার আলু কাবলি কিনে কাঠি দিয়ে তরিবত করে খাচ্ছিলাম তখন স্কুলের পাঁচিলের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। আলুকাবলিটা একটু ঝাল ছিল ঠিকই, কিন্তু খেতে মন্দ লাগছিল না। সুধন্য বলল, 'একাই সবটা সাবড়ে দিবি নাকি রে, দে খাই একটু'।

স্কুলে আসার দিন প্রায় শেষ। টেস্ট পরীক্ষার পরে স্পেশাল ক্লাশ চলছিল কদিন। হেডস্যার বলে দিয়েছেন, 'অনেক হল। এবার বাকি কটা দিন বাড়িতেই পড়াশুনো কর তোরা। আমার হাতের ঠোঙাটা সুধন্যর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, 'হ্যাঁ রে সুধন্য, ফাইনাল পরীক্ষার সময় ইংরেজির শর্ট কোশ্চেনগুলো ম্যানেজ করতে পারবি তো ঠিকঠাক?'

একসঙ্গে অনেকখানি আলুকাবলি মুখের মধ্যে পুরে দিয়ে সুধন্য বলল, 'ইংরেজি বাংলা নিয়ে তো চিন্তা নেই, আমার চাপ ফিজিক্স কেমিস্ট্রি নিয়ে। এখনও অনেকগুলো চ্যাপ্টার তৈরি হয়নি'।

দেবতনু বলল, 'আর অংকের কথা বলছিস না যে কেউ। আমার তো অংক শব্দটা উচ্চারণ করলেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে এখন থেকেই'।

ঠিক তখনই মৃদুল ওর ওই বিচ্ছিরি আর ভয়ংকর প্রস্তাবটা পেশ করল আমাদের সামনে। আমি এমনিতেই ভীতু। রাত্তিরবেলা টিউশন পড়ে একলা বাড়ি ফেরার পথে বটতলা আর বোসেদের পোড়ো বাড়িটা পেরোতে প্রায় প্রতিদিনই মনে মনে ভিরমি খাই। এলাকায় ওই দুটো জায়গা সম্পর্কেই বেজায় বদনাম। মফসসল শহরে প্রায় সব এলাকাতেই মার্কামারা কিছু ভূতুড়ে জায়গা থাকে। আমাদের এলাকায় সে জায়গাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক বোসেদের ওই পরিত্যক্ত বাড়িটা। একসময় এই বাড়িতে দোল দুর্গোৎসব হত বলে শোনা যায় বড়দের মুখে। এখন বাড়িটা খাঁ খাঁ। বাদুড়ের আস্তানা। আর আস্তানা গেড়ে রয়েছেন বিমলদা, মানুদি আর মিনতিমাসিমা।

বোস বাড়ির সব শরিক কলকাতায় চলে যাবার পরেও মিনতিমাসিমা আর মানুদিদিই কেবল থেকে গিয়েছিল ওই বাড়ির ভাঙাচোরা দুখানা ঘরে। একরাতে রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার লিক করে আগুনে পুড়ে মারা যায় দুজনেই। তখন থেকেই বাড়িটার বদনাম শুরু। সকলে বলত মৃত্যুর পরেও মানুদি আর তার মা নাকি ও বাড়ি ছেড়ে যায়নি। রাত-বিরেতে কেউ কেউ ও বাড়ির আশেপাশে তাদের ছায়াশরীরকে ঘুরেফিরে বেড়াতেও দেখেছে কয়েকবার।

বিমলদা ওসব বিশ্বাস করত না। বিমলদা ওই বাড়ির একটা ঘরে ক্লাব খুলে নাটকের দল নিয়ে রিহার্সাল করাত রাত্তিরবেলা। রাত হয়ে গেলে এক এক দিন সেখানে থেকেও যেত একলা একলা। কিন্তু এক রাতে ওই ক্লাব ঘরেই গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ল বিমলদা। কেন কেউ জানে না। বিমলদা মানুষটা খুব কাছের লোক ছিল আমাদের। খুব উৎসাহ পড়াশোনায়। আমাদের ডানপিটেমিতেও। মৃদুল, দেবতনু, মইনুল, সায়ন্তন, সুধন্য, সুতনুরা বিমলদার কাছে টিউশন পড়ত। প্রথমটা রাজি না হলেও, আমাদের জোরাজুরিতে অংক বিজ্ঞানের দুর্দান্ত সাজেশন দিয়েছিল বিমলদা মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে-আগে।

মৃদুল বলল, 'প্ল্যানচেট করব। ডেকে নিয়ে আসব বিমলদাকে। বলব কোনো কথা শুনতে চাই না, আমাদের ফাইনাল পরীক্ষার জন্যে লাস্ট মিনিট সাজেশন আর সম্ভাব্য প্রশ্নগুলো বলে দিতেই হবে...'

কথাটা শুনেই ভয়ে বুকের মধ্যে রক্ত ছলকে উঠল আমার। মৃদুলটা বলে কী? ভূত-প্রেত নিয়ে ফাজলামি মারতে চাইছে, নাকি এইসব বলে টলে ভয় দেখাতে চাইছে আমায় ইচ্ছে করে?

কোনো দিন মাঝরাতে আচমকা ঘুম ভেঙে গেলে ভয়ে আমি খোলা জানালার ও পাশের অন্ধকারের দিকে চোখ মেলে তাকাতে পারি না। সেই আমি কিনা বসব প্ল্যানচেটে? মৃদুলের প্রস্তাবে সায় দেওয়াটা আমার কাছে সত্যিই অসম্ভব আর হটকারি বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু দেবতনুটা মহা পাকা। ও অমনি মৃদুলের কথায় দুম করে রাজি হয়ে গেল। সুধন্য আমার এত কাছের বন্ধু। ও তো আমাকে দিব্বি চেনে জানে। সে পর্যন্ত মৃদুলকে প্রশ্রয় দিয়ে বলে উঠল, 'ব্যাপারটা কিন্তু দারুন ইন্টারেস্টিং হবে'।

আমি তবু মিনমিন করে একটু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিলাম, 'এসব আষাঢ়ে পরিকল্পনা বাদ দে। প্ল্যানচেট করে সত্যিই কি কখনও বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্ন জানা যায়?'

'কেন যাবে না?' সবজান্তার মতন মুখ করে বলে মৃদুল, 'একবার মারা গেলে মানুষের কাছে অজানা বলে আর কিছু থাকে না। ভূত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবই তখন তার হাতের মুঠোয়...'

'তাই যদি হত তাহলে বছর বছর এত ছেলেপুলে ফেল করত না পরীক্ষায়। চাকরির পরীক্ষাতেও সক্কলে পাশ করে যেত অনায়াসে', বিরক্ত হয়ে বলে মইনুল,'ব্যাপারটা যখন এতই সহজ আর সস্তা, স্রেফ প্ল্যানচেটে কোনো একটা প্রেতাত্মাকে ডেকে নিয়েই কাজ হাসিল করে ফেলত সব্বাই। আমি এসবের মধ্যে নেই...'

মইনুলের কথাটাকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে দেবতনু জিগ্যেস করল, 'প্ল্যানচেটটা করা হবে কোথায়?'

'বোসেদের পরিত্যক্ত বাড়িটায়', স্থির অচঞ্চল গলায় বলল মৃদুল, 'যে ঘরে বিমলদা মারা গিয়েছিল, সেখানেই'।

'কবে, কখন?' ভিজে নরম হয়ে যাওয়া আলুকাবলির ঠোঙাটাকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সুধন্য জিজ্ঞেস করল।

'আসছে মঙ্গলবার। সন্ধের পর', গম্ভীর গলায় উত্তর দিল মৃদুল, 'ওইদিন অমাবস্যা। আমাদের কাজে সুবিধে হবে। এইসব তিথিতে প্রেতাত্মারা বেশি সক্রিয় থাকে'।

'বাড়ি থেকে কিছুতেই রাজি হবে না দেখিস', মরিয়া হয়ে বলি আমি।

দেবতনু, সুধন্য, মৃদুল সবাই বিচ্ছিরি মুখ করে হেসে ওঠে আমার দিকে চেয়ে। মুখ বিকৃত করে আমাকে ভেঙিয়ে দিয়ে বলে, 'ওরে ভীতুরাম, এই কথা কি বাড়িতে বলা যায়? বাড়িতে অন্য কিছু দরকারের কথা বলেই আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে সেদিন। আর হ্যাঁ, দয়া করে সেলফোনগুলো বন্ধ রেখো। প্ল্যানচেটে বসার পর পকেটে ফোন বেজে উঠলেই রাম কেলো। ফালতু শব্দ-টব্দের মধ্যে বিমলদা কিছুতেই আর আসতে চাইবে না তাহলে...'

ফ্যাঁসাটে গলায় আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'ঘরে আলোও জ্বলবে না?'

'উঁহু', দেবতনু বলল বিজ্ঞের মতন মুখ করে, 'আলো জ্বেলে এসব কাজ হয় না। তবে মোমবাতি আর দেশলাই আমাদের সঙ্গে থাকবে। আপতকালীন বন্দোবস্ত হিসেবে'।

'একদম', মাথা নেড়ে ওর কথায় সায় দেয় মৃদুল।

প্রথমটা আসব না ভাবলেও শেষ পর্যন্ত না এসে থাকতে পারলাম না। না যদি আসতাম, জানিই তো অন্যেরা এক্কেবারে আমার পিছনে পড়ে যেত। বন্ধু বলে রেয়াত তো করতই না, উপরন্তু কতদিন ধরে যে ক্ষেপিয়ে মারত আমাকে কে জানে। তাছাড়া অস্বীকার করব না, মনে মনে কৌতূহলও হচ্ছিল। নিজেই নিজেকে বোঝালাম, 'বিমলদা বেঁচে থাকতে আমাদের তো খুবই স্নেহ করত। কাজেই সত্যিই যদি বিমলদার আত্মা আমাদের ডাকে সামনে এসে দাঁড়ায়, অন্তত ঘাড়ে টাড়ে চেপে বসবে না দুম করে'।

ঘরে ধুলোর আস্তরণ পড়ে গিয়েছিল। তার ওপরে পুরনো খবরের কাগজ পেতে গোল হয়ে বসে পড়লাম আমরা। আমরা মানে আমি, দেবতনু, সুধন্য আর সুতনু। মৃদুলের আসতে দেরি হচ্ছিল। আমাদের ফোন বন্ধ। আমি পকেট থেকে ফোন বের করে অন করতে যেতেই দেবতনু ইশারায় বারণ করল আমাকে। চাপা গলায় বলল, 'দরকার নেই, এসে পড়বেখন এক্ষুনি'। বাইরে ফ্যাকাশে হয়ে আসা আলো দ্রুত নিভে আসছিল আর ঘরের মধ্যের অন্ধকার ঘন হচ্ছিল ক্রমাগত। আমরা কেউ কথা বলছিলাম না। মৃদুলের পরামর্শ মতন এক মনে কেবল বিমলদার কথা ভেবে যাচ্ছিলাম। ঘরের এক কোনের ঝুপসি অন্ধকারের মধ্যে থেকে বিচ্ছিরি শব্দ করে একটা তক্ষক ডেকে উঠল। আমার মনে হল কে যেন চাপা নিঃশ্বাস ফেলল আমার ঘাড়ের ওপরে। চমকে উঠে আমার পাশে বসা দেবতনুর বাঁ হাতটা চেপে ধরলাম আমি। ঘরের মধ্যের ক্ষীণ আলোটুকুর ওপরে অন্ধকারের চাদর চাপা পড়ে গেছে তখন। তবুও দেখতে পেলাম খোলা দরজা দিয়ে ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে মৃদুল বসে পড়ল চুপ করে। অন্যরাও খেয়াল করেছে তাকে। সুতনু ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, 'এত দেরি করলি কেন রে মৃদুল?'

অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছে এখন খানিক। দূরে রাস্তার ল্যাম্প পোস্টের অতি মৃদু আলোর রেখা জানলা গলে ঘরের মধ্যে ঢুকে আমাদের ছায়া শরীরগুলোকে যেন অপার্থিব করে তুলেছে। সেই মরা আলোয় দেখলাম মৃদুল তার ডান হাতের তর্জনি ঠোঁটের ওপরে রেখে আমাদের চুপ থাকতে নির্দেশ দিল। একটা শিরশিরে হাওয়া এসে পাক খাচ্ছিল ঘরের মধ্যে। মার্চ মাস পড়ে গেছে। তবু সেই হাল্কা বাতাসেই আমার শীত করছিল। বিচ্ছিরি শব্দ তুলে একপাল কুকুর বেমক্কা কেঁদে উঠল বাইরের রাস্তায়। বোসবাড়ির বাগানে চ্যাঁ চ্যাঁ শব্দ করে প্যাঁচা ডেকে উঠল এই ভর সন্ধেবেলাতেই। আমার মনে হল, যে ঘরে বসে আছি তার পাশের ঘরে কারা যেন হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। এই নিস্তব্ধ বাড়িতে তাদের পায়ের শব্দ, চুড়ির শব্দ, শাড়ির মৃদু খসখস শব্দও স্পষ্ট হয়ে আমাদের কানে এসে পৌঁছল। ঠিক তখনি একটা লম্বা ঘোলাটে মূর্তি ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালো। শরীরটা অস্পষ্ট। কিন্তু তার দাঁড়ানোর ভঙ্গীটি ভারি চেনা।

সুতনু অস্ফুটে বলে উঠল, 'বিমলদা...'

আমার বুকের মধ্যে দুম দুম করে শব্দ হচ্ছিল। কাঁটা দিয়ে উঠেছে গায়ে। বুঝতে পারছিলাম শিড়দাঁড়ার কাছটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।

মৃদুল তার ডান হাতটা শূন্যে তুলে বাড়িয়ে দিল সেই ধোঁয়া ধোঁয়া আবছা মূর্তিটার দিকে। দেখলাম ওর হাতটা কাঁপছে। অবাক হয়ে গেলাম। ওর মতন ডাকাবুকো ছেলেও ভয় পেয়ে গেল নাকি?

সেই ছায়া ছায়া আগন্তুকের দিকে চেয়ে চাপা স্বরে দেবতনু বলে উঠল, 'তুমি কি সত্যিই বিমলদা?'

উত্তর এল না। সেই ঘোলাটে অবয়বটার মধ্যে একটা অস্থিরতা চোখে পড়ল শুধু। মারাত্মক ছটফটানি। যেন যন্ত্রনায় কুঁকড়ে যাচ্ছে ও। সেই ছায়াশরীর থেকে একটা তীক্ষ্ন, বুক কাঁপিয়ে দেওয়া আর্তনাদের মতন শব্দ ঠিকরে এল। অমনি একটা মৃদু গোঙানির মতন শব্দ করে উঠল মৃদুল। মৃদুল মাথা নীচু করেই বসে ছিল। মনে হল ওর মাথাটা বুকের কাছে আরো নুয়ে পড়ল। বাইরে কুকুরগুলো আবার কেঁদে উঠল সমস্বরে। ক্রমশ আরো ঠান্ডা হতে থাকা হাওয়াটা ঘরের মধ্যে আবার পাক খেতে খেতে আমাদের জড়িয়ে ধরল আষ্টেপৃষ্ঠে। ভয়ে আমার হাত পা অবশ হয়ে আসছিল। মনে হল চেতনা হারিয়ে যাবে আমার। তখনই সেই পাক খেতে থাকা হাওয়ার মধ্যে থেকে বিমলদার খুব পরিচিত কণ্ঠস্বরটা শুনতে পেলাম। হাওয়ার মিশে গিয়েও সেই মিহি কণ্ঠস্বর বলে চলেছে, 'তোদের দেখে আমার কষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট...'

'কিসের কষ্ট বিমলদা?' দেবতনু আড়ষ্ট গলায় জিগ্যেস করল ফিসফিস করে। ওর গলা কাঁপছিল।

'এখানকার ভারি বাতাসের গায়ে মৃত্যু লেগে আছে। তোরা এই মৃত্যুর জগৎ থেকে পালিয়ে যা...এই বাড়িতে যারা ঢোকে মৃত্যু খুঁজে খুঁজে বেড়ায় তাদের...কেন তবু মৃত্যুকে নেমন্তন্ন করতে গেলি মৃদুল...জীবন থেকে একবার যে ঝরে যায়, জীবনকে দেবার মতন আর যে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না তার...'

'ওদের আমি কথা দিয়েছিলাম তোমাকে ডেকে এনে ফাইনাল পরীক্ষার লাস্ট মিনিট সাজেশন যোগাড় করে দেব...কিছু একটা করো তুমি বিমলদা। আর তো কখনও চাইব না কিছু...প্লিজ বিমলদা, প্লিজ...' মৃদুলের গলাটা কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে এখন।

আমাদের সামনে কিছু সাদা কাগজ আর একটা পেনসিল রাখা ছিল আগে থেকেই। মৃদুল বলেছিল, 'মিডিয়াম করে দেব সুতনু কিংবা দেবতনুকে। বিমলদার আত্মা ওদের কারো মধ্যে ঢুকে ওদের হাত দিয়েই সাজেশন লিখে দেবে ওই সাদা কাগজে। পেনসিল দিয়ে। কিন্তু সুতনু বা দেবতনু কিছু লেখার আগেই একটা সাদা কাগজ নিজের খেয়ালেই লাফিয়ে উঠে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল হাওয়ায় ভর দিয়ে। পেনসিলটাও শূন্যে উঠে গেল মাটি ছেড়ে।

ঘরের মধ্যে ঝোড়ো হাওয়া বইছে মনে হচ্ছে। সেই হাওয়ায় আমরা কেঁপে যাচ্ছি, অথচ কাগজটা স্থির হয়ে আছে। ঘোলাটে মূর্তিটা আরো স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পেনসিল আপনা আপনিই কী যেন লিখে চলেছে কাগজের ওপরে।

দেবতনু ভয় পাওয়া গলায় বলে উঠল, 'মৃদুল, এসব কী হচ্ছে রে? এমন তো কথা ছিল না। বলেছিলি জয়ন্তকে ভয় পাওয়ানোর জন্যে স্রেফ একটু অ্যাক্টিং করতে হবে আমাদের সক্কলকে...যা ঘটছে তা তো আমরা কেউ ঘটাচ্ছি না...সত্যিই যে অলৌকিক ঘটনা ঘটছে এখানে। তুইই বা অমন অন্ধকারের মধ্যে একটাও কথা না বলে চুপ করে বসে আছিস কেন ভূতের মতন? আমার ভয় করছে মৃদুল...'

সুধন্য চিৎকার করে উঠল, 'মৃদুল ওঠ। জয়ন্ত, সুতনু, দেবতনু এক মুহূর্ত দেরি করিস না। চল পালা এখান থেকে। স্পষ্ট শুনতে পেলাম আমার কানের কাছে মুখ এনে মানুদি ফিসফিস করে বলে উঠল, চলে যা এখান থেকে। এক্ষুনি চলে যা। নইলে খুব বিপদ...এ বাড়িতে অভিশাপ আছে। সেই অভিশাপের আঁচ গায়ে লাগলে তোরাও কেউ আর বেঁচে থাকতে পারবি না...'

'মানুদি?' শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া গলায় কোনোক্রমে বলে উঠি আমি, 'তা কী করে হবে? তুই ঠিক শুনেছিস তো?'

'ঠিকই শুনেছি। কোনো ভুল হয়নি আমার। এখানে সত্যি সত্যিই সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটছে। আমরা মজা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই মজা নেই আর। কিছুই আমাদের প্ল্যান মাফিক ঘটছে না আর...' বেদম ভয় পাওয়া গলায় চেঁচিয়ে ওঠে সুধন্য।

সুতনুও ভয় পাওয়া গলায় আমাকে বলল, 'দেশলাইটা জ্বালা জয়ন্ত। মোমবাতি জ্বালা। কুইক...'

'নাআআআ', আর্তনাদের মতন আছড়ে পড়ল শব্দটা মৃদুলের মুখ থেকে, 'সাজেশনটা এখনও লেখা হয়নি বিমলদার...তাছাড়া...'

মৃদুলের কন্ঠস্বর চাপা পড়ে গেল বোস বাড়ির বাইরে থেকে ভেসে আসা চিৎকারে। চিৎকারটা ক্রমশই বাড়ির ভিতরে ঢুকে এল। কে যেন আমাদের নাম ধরে তীব্র স্বরে ডেকে চলেছে প্রাণপনে। ডাকটা কাছে চলে এসেছে। আমাদের ঘরের দরজার বাইরেই টর্চের তীব্র আলো এসে পড়ল। এতক্ষণ কেমন ঘোরের মধ্যে ছিলাম। মাথা কাজ করছিল না। আচম্বিতেই সম্বিৎ ফিরে পেলাম। গলার আওয়াজটা চিনতে পারছি এইবার। মইনুল। আমাদের বন্ধু। আমাদের নাম ধরে একটানা ডেকেই চলেছে। আমি দাঁড়িয়ে উঠে দরজার দিকে পা বাড়ালাম। আমার পিছন পিছন অন্যরাও বাইরে বেরিয়ে এল হুড়মুড় করে।

মইনুল হাঁফাচ্ছিল। অসম্ভব উস্কোখুস্কো দেখাচ্ছিল ওকে। আমাদের দেখে মইনুল দৌড়ে এল। উদবেগের সঙ্গে জিগ্যেস করল, 'ঠিক আছিস তোরা?'

'আছি'। মাথা নাড়লাম আমি, 'কিন্তু তোকে এমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন?'

'বলছি আয়', বলে আমাদের পোড়ো বাড়িটার বাইরে এনে দাঁড় করাল মইনুল। তারপর ভেজা গলায় বলল, 'মৃদুলের খবর কিছু শুনেছিস?'

'মৃদুলের খবর?' অবাক হয়ে বলে দেবতনু, 'এই তো আমাদের সঙ্গেই রয়েছে মৃদুল', বলেই আমাদের দিকে তাকায় ও। আমরাও তাকাই নিজেদের দিকে। না মৃদুল আমাদের মধ্যে নেই।

'ও তাহলে সেই ঘর থেকে বেরোয়নি আমাদের সঙ্গে। নিশ্চিত বিপদে পড়েছে মৃদুল', বলে সুধন্য বাড়িটার দিকে পা বাড়ায়।

মইনুল টান দেয় ওর হাত ধরে। বিষন্ন গলায় বলে, 'কী যা তা বলছিস পাগলের মতন। আজ বিকেলেই বাইক অ্যাকসিডেন্টে...'

'বাইক অ্যাক্সিডেন্ট, মৃদুলের? ইয়ার্কি মারছিস নাকি?' সুতনু বলে।

'খুবই কষ্টের। তবু এটাই বাস্তব', মাটির দিকে মুখ নামিয়ে বলে মইনুল, 'একটা ট্রাকের সঙ্গে, জয়শ্রী জুয়েলার্সের সামনে...মাথায় হেলমেট ছিল না। থাকলে হয়ত...সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। খবর পেয়ে আমিও গিয়েছিলাম। ততক্ষনে সব শেষ। ওখানেই ছিলাম এতক্ষন। তোদেরও ফোন করেছিলাম। সকলেরই সুইচড অফ। পোস্টমর্টেমে রওনা করিয়ে দিয়ে এখানে এলাম...'

'কিন্তু সত্যিই মৃদুল আমাদেরই সঙ্গে ছিল। এই বাড়িতেই। বিশ্বাস কর মইনুল', আমি বলি। আমার গলা কাঁপছিল।

'না রে। ভুল হচ্ছে কোথাও'। আমার পিঠে হাত রাখে মইনুল।

পরিশিষ্ট

সব কথা শুনে আর একবার ওই বাড়িতে ঢুকতে রাজি হয়েছিল মইনুল। সেই নির্দিষ্ট ঘরে আবার এসে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা সবাই মিলে। সেই রাতেই। কিন্তু মৃদুল সত্যিই কোথাও ছিল না। বিমলদাও না। খোলা জানালা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়া হাল্কা হাওয়ায় ঘরের মেঝেয় ছড়ানো ছিটোনো সাদা কাগজের পাতাগুলো ফরফর করে উড়ছিল। তারই মধ্যে একটায়, টর্চের আলোয় পেন্সিলে লেখা দুটো বাংলা বাক্য চোখে পড়ল, 'জীবনে ভালো কিছু করার শর্টকাট পদ্ধতি বলে কিছু নেই। জীবনের কোনো পরীক্ষাই কোনোদিন শুধুমাত্র সাজেশনের ওপরে নির্ভর করে দিবি না, এই আমার তোদের জন্যে দেওয়া লাস্ট মিনিট সাজেশন'।

হাতের লেখাটা যে বিমলদারই, এ বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ ছিল না। আমরা তার হাতের লেখা চিনতাম। মইনুলও। তার যুক্তিবাদ এক্ষেত্রে আর খাটেনি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%