জয়দীপ চক্রবর্তী

আজকাল রেডিও আর তেমন শোনাই হয় না প্রিয়নাথের। অথচ একটা সময় ছিল যখন রেডিও ছাড়া একটা সারাদিনের কথা ভাবতেই পারতেন না তিনি। অফিস থেকে বাড়িতে ফিরে রাতের বেলা রেডিওর খবর না শুনলে খাবার হজমই হত না সে সময়। এ ছাড়া গান নাটকের আকর্ষণ তো ছিলই। এসব কথা মনে পড়লে আজকাল নিজেই অবাক হয়ে যান প্রিয়নাথ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষগুলোই শুধু নয় তাদের যাবতীয় অভ্যাসও সব ক্যামন পাল্টাতে থাকে।
টেলিভিশনের যুগে এমনকী প্রিয়নাথেরও আর রেডিও শোনার কথা সারাবছরে মনেই পড়েনা তেমন। শুধু যখন বর্ষা পেরিয়ে আকাশের নীল শরীরে সাদা সাদা মেঘের দল ভাসতে শুরু করে, আর শিউলি গাছ থেকে টুপ টাপ ঝরতে শুরু করে শিউলিফুল, তখন রেডিওটাকে আবার বের করে আনেন প্রিয়নাথ। ওটার ঝাড়পোঁছ শুরু হয়, ব্যাটারি পালটে যত্ন করে বসানো হয় শোবার ঘরে মাথার পাশের কাঠের টুলটার ওপরে। আসলে মহালয়ার ভোরে আকাশবানী থেকে প্রচারিত প্রভাতি অনুষ্ঠানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় চন্ডীপাঠ না শুনলে এখনো পুজো এসেছে বলে বিশ্বাসই হয় না প্রিয়নাথের। সেই কোন ছেলেবেলা থেকেই এই অনুষ্ঠানটা শুনে আসছেন। তবু আজো ওটা পুরোনো হল না একটুও। পুজোর মাস এসে যেতেই যথারীতি রেডিওটা আবার তাক থেকে নামালেন তিনি। ধুলো ঝাড়লেন মনোযোগ দিয়ে। তারপর নতুন ব্যাটারি পরিয়ে চালু করলেন ওটাকে প্রতি বছরের মতন।
কিন্তু এ বছর রেডিওটা আর চালু হল না। প্রিয়নাথ রেডিওটা চালু করার বিস্তর চেষ্টা করলেন। চাপড়-চোপড় মারলেন খানিক রেডিওটার গায়ে। তবু কোনো আওয়াজ বের করতে পারলেন না ওর মধ্যে থেকে। প্রিয়নাথের স্ত্রী একটু তফাতে দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটা চুপচাপ দেখছিলেন এতক্ষণ। এবার বলে উঠলেন, 'কতবার বলেছি ওটার মায়া কাটাও এবার। দরকার মনে করলে ছোট একটা নতুন সেট কিনে নাও দোকান থেকে। কস্মিনকালে কোনো কথাই তো তুমি শুনলে না আমার।'
প্রিয়নাথ মাথা নাড়লেন দুদিকে, 'কী করে তোমাদের বোঝাই বলো দিকিনি, আসলে রেডিওটার মূল্য আমার কাছে অন্য কারণে অনেকখানি। বাবার আদরের জিনিস, তাছাড়া সেই শৈশবকাল থেকে কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এটার সঙ্গে—'
'তাহলে স্মৃতি নিয়ে বসে থাকো আর মাঝে মাঝে চড়-থাপ্পড় কষাও ওটার ওপর', হালকা হেসে বললেন তাঁকে সুতপা।
'দেখা যাক', বলে উঠে পড়লেন প্রিয়নাথ। আলনা থেকে জামাটা নিয়ে গায়ে গলালেন। তারপর রেডিওটা হাতে নিয়ে বললেন, 'যাই, জিনিসটা শম্ভুদাকে দেখিয়ে আনি একবার—'
শম্ভু মুখুজ্জে এলাকার পুরোনো দোকানদার। আজকাল রেডিও সারানোর ভালো মিস্ত্রী পাওয়া খুবই মুশকিল। এসব দোকান উঠেই যাচ্ছে ক্রমশ। তার মধ্যে শম্ভু মুখুজ্জে এখনও দোকানটাকে টিকিয়ে রেখেছেন কোনওমতে। খদ্দেরপাতি তেমন আসে না। তবু অন্য কোনো ব্যবসাপত্তরের কথা তিনি ভাবেননি কখনও। শম্ভুবাবুর বয়েস প্রিয়নাথের বাবার থেকে এমন কিছু হয়ত কম নয়। তবু কেন কে জানে ওর বাবাকে তিনি কাকাবাবু বলে ডাকতেন চিরকাল। আর প্রিয়নাথও ছেলেবেলা থেকে তাঁকে বলেন শম্ভুদা। শম্ভুদা মানুষটা খুব সৎ, প্রিয়নাথকে ভালোও বাসেন। অতএব তাঁর কাছে গেলে রেডিওটার নিশ্চিত হিল্লে হবে ভেবে তাঁরই শরনাপন্ন হলেন প্রিয়নাথ।
শম্ভু মুখুজ্জে রেডিওটা অনেকক্ষণ নাড়লেন চাড়লেন। স্ক্রু ট্রু খুলে ভেতরটা দেখলেন মন দিয়ে। তারপর হতাশ হয়ে মাথা নাড়িয়ে বললেন, 'ভরসা দিতে পারছি না ভায়া, তবু বিকেলে একবার খোঁজ নিয়ে যেয়ো। দেখি ব্যাটাকে দিয়ে কথা বলাতে পারি কিনা।'
বিকেলে কাজ ছিল একটা। সেটা মিটিয়ে দোকানে আসতে সন্ধে হয়ে গেল। শম্ভু মুখুজ্জে একলাই বসে ছিলেন দোকানে। প্রিয়নাথ বেশ আশা নিয়েই জিজ্ঞেস করলেন, 'শম্ভুদা রেডিওটা হয়েছে?'
'না হে বাপু', ব্যাজার মুখে বললেন শম্ভু মুখুজ্জে, 'এবার কাকাবাবুর রেডিওর মায়া তোমায় ছাড়তেই হবে মনে হচ্ছে।'
'সারা গেল না?' বিমর্ষ গলায় বলেন প্রিয়নাথ।
'সারা গেল না নয়, সারা যাবে না আর', শম্ভু ম্লান হাসেন। 'আগেকার আমলের জিনিস বলে এতকাল সার্ভিস দিল একটানা। এখন বিগড়েছে। কিন্তু এর স্পেয়ার পার্টস আর তো ভূ-ভারতে খুঁজে পাওয়া যাবে না ভায়া।'
'তাহলে উপায়?' হতাশ গলায় বলেন প্রিয়নাথ, 'মহালয়ার অনুষ্ঠানটা শুনতে সত্যিই তাহলে নতুন রেডিও কিনতে হবে এবার!'
'অগত্যা', বলে একটু কী ভাবেন শম্ভু মুখুজ্জে। তারপর প্রিয়নাথের দিকে চেয়ে বলেন, 'আপাতত একটা কাজ তুমি করতে পারো ভায়া।'
'কী বলুন দেখি?' উৎসাহিত হয়ে বলেন প্রিয়নাথ।
'আজ সকালে একজন আমায় একটা রেডিও দিয়ে গেছে। লোকটা আমার যে খুব পরিচিত তা নয়, তবু বিশ্বাস করে পুরোনো রেডিওটা আমার জিম্মায় রেখে সে বলল যে ওটা নাকি সে বেচতে চায়। তার নিজের বাড়িতে ওটার কোনো প্রয়োজন নেই, কাজেই আমার কাছে দিয়ে গেছে। বলেছে বিক্রি হলে তাকে কিছু দেবার হলে দিতে, বিক্রি না হলে আমার কাছেই রেখে দিতে।'
'অদ্ভুত তো—'
'আর বলো কেনো, কত কিসিমের লোকজন যে রয়েছে দুনিয়ায়', শম্ভুদা চোখ গোল গোল করে বলে। 'এ রেডিও পয়সা ফেললেও পাওয়া যাবে না আর। কী সাউন্ড, নিজে কানে না শুনলে ভাবতে পারবে না। এ জিনিসের এমন অযত্ন করে কেউ—একসময় কারও শখের জিনিস ছিল নিশ্চয়ই।'
'তা তো বটেই', প্রিয়নাথ সায় দেন তাঁর কথায়।
'আমি বলি কি ওই রেডিওটাই বরং তুমি নিয়ে যাও, আপাতত শোনো টোনো, পরে পছন্দসই মনে হলে নামমাত্র দামে কিনে নিও আমার থেকে।'
ব্যবস্থাটা মনে ধরে গেল প্রিয়নাথের। রেডিওটা বাড়ি এনে ব্যাটারি ভরে একবার চালিয়ে দেখে নিলেন তিনি। শম্ভুদার কথা মিথ্যে নয়। রেডিওটার আওয়াজ সত্যিই ভারী সুন্দর। মহালয়ার আগে কদিন চালিয়ে টালিয়ে নিলে আওয়াজটা আরও খোলতাই হয়ে যাবে সন্দেহ নেই। বিছানার পাশে কাঠের টুলের ওপরে ওটাকে অন্যান্য বছরের মতনই জায়গা করে দিলেন প্রিয়নাথ।
সাধারনত রাতে প্রিয়নাথ ভালোই ঘুমোন। এক ঘুমে রাত কেটে গিয়ে ভোরের আলো ফুটে ওঠে জানলার ওপাশে। অথচ আজ ঘুমটা ভেঙে গেল। গত প্রায় দশ বছর রাতে একাই ঘুমোন তিনি। তিনি ঘুমিয়ে পড়ার পর এ ঘরে কেউ ঢোকে না কখনও। কিন্তু আজ বার বার মনে হচ্ছে কে যেন ঘরে ঢুকেছে। আলো নেভানো। জানলা দিয়ে বাইরের স্ট্রিট লাইটের আবছা আলো ঢুকে এসেছে ঘরে। একটুখানি চোখ চেয়ে থাকার পর ঘরের ভেতরটা এখন ভালোই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ঘরের মধ্যে কাউকেই দেখতে পেলেন না প্রিয়নাথ। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করা। খিল দেওয়া নেই অবশ্য। থাকেও না কখনও। তাঁর ঘরে আসবাবপত্রের এমন বাহুল্য নেই যে তার আড়ালে লুকিয়ে থাকবে কেউ। প্রিয়নাথ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। এমন তো আগে কখনও হয়নি। সন্তর্পণে বিছানা থেকে তিনি উঠলেন। ঘরের মধ্যে সন্ধানী দৃষ্টি বোলালেন। জল খেলেন। তারপর আবার এসে শুয়ে পড়লেন বিছানার ওপর। আর ঠিক তখনই আওয়াজটা শুনতে পেলেন তিনি। একটানা। কর্কশ। ঘড়ঘড়ে গলায় কে যেন একটা কিছু বলার চেষ্টা করছে প্রাণপনে। প্রথমটা ভারি ঘাবড়ে গেলেন প্রিয়নাথ। ভয়ও পেয়ে গেলেন খানিকটা। সাধারণত এ বয়েসে ভূতের ভয় পাওয়ার কথা নয়। তাই ওই ভয়টাকে মন থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন তিনি। ভয়টা অবশ্যি মনের মধ্যে রয়েই গেল।
ভূত নেই এ কথাটা প্রাণপনে ভাবতে ভাবতে তিনি আজ আবার আবিষ্কার করলেন ভূতকে বিশ্বাস করা এবং ভয় পাওয়া দুটোই মনের মধ্যে দিব্বি রয়ে গেছে তাঁর এখনও পর্যন্ত। আর এই সময়েই রেডিওটার দিকে নজর পড়ল তাঁর। ঘটনার আকস্মিকতায় ওটার কথা মনেই পড়েনি এতক্ষণ। ভুল নেই বিটকেল শব্দটা রেডিওর মধ্যে থেকেই বেরিয়ে আসছে। প্রিয়নাথ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। সাহসটাও ফিরে এল আবার। তিনি রেডিওটার কাছে এগিয়ে গেলেন। ঘুমনোর আগে কি ওটা বন্ধ করতে ভুল হয়ে গিয়েছিলেন? আপন মনে মাথা নাড়লেন প্রিয়নাথ। উঁহু, এমন ভুল তো হবার কথা নয়। তাঁর স্পষ্ট মনে পড়ছে নব ঘুরিয়ে বন্ধ করে তবে শুতে গিয়েছিলেন তিনি। তাহলে কে চালাল রেডিওটা—ভাবনাটা মাথায় আসতেই চলে যাওয়া ভয়টা আবার ফিরে এল মনের মধ্যে। চিন্তাটা মাথা থেকে সরাতে নিজেই নিজেকে বোঝালেন তিনি, পুরোনো জিনিস, কানেকশন লুজ টুজ আছে নিশ্চিত।
আওয়াজটাকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে রেডিওটা বন্ধ করে দিয়ে আবার শুয়ে পড়লেন তিনি। সে রাতে রেডিওটা আর সমস্যা করল না কোনো। কিন্তু একটা অস্বস্তি যেন মাথার মধ্যে থেকেই গেল প্রিয়নাথের। বার বার মনে হতে লাগল কাল রাতের ঘটনাটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা বোধহয় নাও হতে পারে। কথাটা অবশ্য বাড়িতে আর কাউকে তিনি জানালেন না। অযথা অন্যদের দুশ্চিন্তায় ফেলে তো লাভ নেই। সকালে রেডিওটাকে নিজের ঘরে বিছানার পাশের টুলের ওপরে বসিয়ে রেখেই অফিসে রওনা দিলেন তিনি।
বাড়ি ফিরতেই সুতপা একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন প্রিয়নাথকে। অফিস থেকে ফিরে বাইরের জামা কাপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে সবে এসে বিছানায় বসেছেন, তাঁর হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে দিয়েই জিগ্যেস করলেন সুতপা, 'লোকটা কে ছিল গো, শম্ভুদার দোকানের কেউ?'
'কোন লোকটা?' প্রায় আকাশ থেকে পড়লেন প্রিয়নাথ, 'কার কথা বলছ বলো দিকিনি?'
'কোন লোকটা আবার, যে সকালে তোমার ঘরে বসে রেডিওটা নাড়াচাড়া করছিল। বয়স্ক মানুষ, ধুতি আর ফতুয়া পরা, মাথায় টাক। তুমি তখন বাথরুমে। লোকটাকে ঘরে দেখে আমি আর ওদিকে যাইনি বাপু। কখন চলে গেলেন তাও খেয়াল করিনি। তারপর তুমি অফিস বেরিয়ে যাওয়ার পরেও আবার একসময় দেখলাম রেডিওটা হাতে নিয়ে বসে আছেন। আমি চা খাবেন কিনা জিগ্যেস করতে মৃদু হেসে মাথা নেড়ে না বললেন।'
'কই আমি তো জানি না কিছু', অবাক হয়ে বললেন প্রিয়নাথ। 'তোমার ভুল হচ্ছে না তো কোথাও, ঠিকঠাক দেখেছ তো?'
'কি যে বলো, ভুল হবার উপায়ই নেই কোথাও। আমি যে ভদ্রলোকের সাথে কথা বললাম—'
প্রিয়নাথের কপালে ভাঁজ পড়ল। মুখে আর কোনো কথা না বলে গম্ভীর হয়ে রইলেন তিনি। রাতে খাবার সময়েও আজ আর বিশেষ কথা-টতা বললেন না। দরজা ভেজিয়ে রেডিওটা ঠিক মতন অফ করা হয়েছে কিনা আর একবার দেখে নিয়ে শুয়ে পড়লেন তিনি। সারাদিন অফিসে খাটাখাটনি গেছে, কাজেই ঘুম আসতে দেরি হল না। প্রিয়নাথ ঘুমিয়ে পড়লেন অঘোরে। কিন্তু আজ আবারও রাত দুটো নাগাদ ঘুমটা ভেঙে গেল তাঁর। ঘরের মধ্যে ঘড়ঘড়ে গলায় কে যেন একটা কিছু বলতে চাইছেন প্রাণপনে। প্রিয়নাথ সাহসী মানুষ, তবু আজ গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তাঁর। সকালে সুতপাও একটা লোককে এই ঘরের মধ্যে দেখেছিল। এই জড়ানো ঘড়ঘড়ে আওয়াজটার সঙ্গে ওই বুড়ো লোকটার কি কোনো সম্পর্ক আছে?
প্রিয়নাথ চোখ না খুলেই কানদুটোকে সজাগ করলেন। আওয়াজটা শোনার চেষ্টা করতে লাগলেন মন দিয়ে। একটুখানি শোনার পরেই প্রিয়নাথ বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা বেশ ঘোরালো। আওয়াজটা স্পষ্ট নয় ঠিকই, তবু কান খাড়া করে শুনলে দিব্বি বোঝা যাচ্ছে একজন বয়স্ক মানুষ কাকে যেন বার বার মিনতি করে বলার চেষ্টা করছেন, 'কাজটা তুমি ঠিক করছ না রমেশ। কটা টাকার লোভে এ ভাবে খুন করছ তুমি আমায়। পাপ কিন্তু কিছুতেই চাপা থাকেনা। তুমি হয়ত ভাবছ আমার এই মৃত্যু বৃদ্ধ বয়েসের স্বাভাবিক মৃত্যু বলে ঠিক চালিয়ে দেবে, আর তোমার শাকরেদ ওই ডাক্তার ছোঁড়াটাকে দিয়ে ডেথ সার্টিফিকেটও লিখিয়ে নেবে টাকার ভাগ দেবার লোভ দেখিয়ে। তবু বলছি তোমায় সত্যি কিন্তু প্রকাশ পাবেই।' একটা বিকট হাসিতে বয়স্ক মানুষটার গলা চাপা পড়ে গেল।
প্রিয়নাথ লাফিয়ে বিছানার ওপরে উঠে বসলেন। রেডিওটা থেকে একটা হালকা চোঁ-ওও—করে আওয়াজ বের হচ্ছে এখন। প্রিয়নাথ কিছুক্ষণ হতভম্বের মতন তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। রেডিওটা বন্ধ করলেন নব ঘুরিয়ে। তারপর ভাবতে লাগলেন নিবিষ্ট মনে। রেডিওয় কি কোনো নাটক চলছিল? রহস্য গল্প-টল্প কিছু পাঠের অনুষ্ঠানও হতে পারে। পরক্ষণেই নিজের মনে উদয় হওয়া সম্ভাবনা নিজেই খারিজ করে দিলেন তিনি। তা কি করে হবে! এত রাতে রেডিও স্টেশন খোলা থাকার তো কথা নয়। তার চেয়েও যেটা বড় কথা রেডিওটা অন করল কে? রাত্তিরে শুতে যাওয়ার সময় রেডিওটা নিজে হাতে বন্ধ করেছেন প্রিয়নাথ, এমনকী শেষ মুহূর্তে আরো একবার দেখেও নিয়েছিলেন আগের রাতের অভিজ্ঞতার কথা ভেবে। তাহলে!
পাখার ঠিক নীচে বসেও প্রিয়নাথ ঘামতে শুরু করলেন। রেডিওটার দিকে চোখ পড়তেই গা ছমছম করে উঠল তাঁর। রেডিওর মধ্যে থেকে ভেসে আসা কথাগুলোকে মনের মধ্যে আর একবার ঝালিয়ে নিলেন তিনি। রমেশ নামটা মনে মনে দুবার আওড়ে নিলেন প্রিয়নাথ। কাল অফিস ফেরত শম্ভুদার দোকানে গিয়ে রেডিওর মালিক সম্পর্কে একটু বিশদ খোঁজ খবর করাটা বড্ডই জরুরী বলে মনে হল তাঁর।
প্রিয়নাথের প্রতিটি কথা মন দিয়ে শুনলেন শম্ভু মুখার্জী। বার কয়েক মাথা নাড়লেন চিন্তান্বিত মুখে। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, 'ব্যাপারটা নিয়ে তো ভাবতে হচ্ছে ভায়া। তুমি বললে বলে মনে পড়ল যেদিন অচেনা লোকটা এসে রেডিওটা গছিয়ে গেল আমায় সেদিন লোকটা চলে যেতেই দেখি দোকানের ওপাশের ফুটপাতে বয়স্ক একজন মানুষ স্থির চোখে আমার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে। সারাদিন কত মানুষই তো কত ফিকিরে ঘুরছে চারদিকে, কাজেই আমি গুরুত্ব দিইনি ব্যাপারটায়। একটু পরে লোকটাকে দেখতেও পাইনি আর। আবার দেখলুম তোমায় রেডিওটা দেবার পর। মনে হল তোমার পিছন পিছন লোকটাও যেন হেঁটে গেল রাস্তা দিয়ে। আমার মনে হয়েছিল তোমারই চেনা জানা কেউ হয়তো—'
'কেমন দেখতে বলুন তো লোকটা?' উত্তেজিত হয়ে জিগ্যেস করেন প্রিয়নাথ।
'যেমন তুমি বললে হুবহু সে রকমই, বউমার বিবরণের সঙ্গে এক্কেবারে মিলে যাচ্ছে হে—'
'এখন কী করা উচিত বলুন দিকিনি তাহলে?' খুবই চিন্তাগ্রস্ত গলায় বলেন প্রিয়নাথ।
'দাঁড়াও, সেই ছোঁড়াটার দেওয়া ঠিকানা লেখা কাগজটা বের করি আগে', বলে একটা ক্লিপ বোর্ডে আটকে রাখা গুচ্ছের কাগজ পত্র হাঁটকাতে শুরু করলেন শম্ভুবাবু। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পরে একটা কাগজ হাতে নিয়ে একবার চোখ বুলিয়েই মারাত্মক উত্তেজিত হয়ে পড়লেন শম্ভু মুখজ্জে। গোল গোল চোখে প্রিয়নাথের দিকে চেয়ে বললেন, 'এ যে সব্বোনেশে ব্যাপার হে প্রিয়নাথ।'
'কেনো, কী হল শম্ভুদা?' প্রিয়নাথ কৌতূহলী কণ্ঠে জিগ্যেস করেন।
'ছোঁড়াটা নিজের নাম তো রমেশ বলেই লিখেছে হে, রমেশ তপাদার। চাম্পাহাটির দিকে বাড়ি। মোবাইল নম্বরও দিয়ে রেখেছে একখানা।'
'ওই নাম্বারে কি ফোন করে দ্যাখা হবে একবার?'
'ক্যানো?'
'বয়স্ক মানুষটার কোনো খোঁজ খবর পাওয়া যায় যদি।'
'মাথাটা গেছে বাপু তোমার,' চাপা গলায় বললেন শম্ভু মুখুজ্জে।
'কী বলতে চাচ্ছেন বলুন তো শম্ভুদা?' অবাক হয়ে বলেন প্রিয়নাথ। মাথা সত্যিই আর কাজ করছিল না তাঁর। সব ক্যামন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে মাথার মধ্যে। বুড়ো লোকটা সত্যি সত্যিই তাহলে—প্রিয়নাথের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বইতে শুরু করল হঠাৎ। হাত পা ঝিন ঝিন করছে। দোকানের একটা টুলের ওপর ধপাস করে বসে পড়লেন প্রিয়নাথ। বাইরে অন্ধকার ঘন হয়েছে তখন। প্রিয়নাথের মনে হতে লাগল সেই বৃদ্ধ লোকটা রাস্তার ও পারে দাঁড়িয়ে তাঁকে একদৃষ্টিতে যেন দেখছে সর্বক্ষণ। প্রিয়নাথ ভয়ানক ভয় পেলেন। ভয় পাওয়া গলাতেই বলে উঠলেন শম্ভু মুখুজ্জেকে, 'বুড়ো লোকটা সত্যিই তাহলে খুন হয়েছে বলছেন ওই রমেশের হাতে?'
'খোঁজ নিতে হবে,' তার দিকে চেয়ে আশ্বাসের ভঙ্গীতে বললেন শম্ভু মুখুজ্জে। 'হতেই পারে পুরো ব্যাপারটাই আমাদের কল্পনা হয়তো।' প্রিয়নাথ অবশ্য আশ্বস্ত হলেন না বড় একটা। কল্পনার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাঁর কান যে ভুল শোনেনি তা তো প্রমাণিত। ছেলেটার নাম সত্যিই যে রমেশ। আর সুতপার চোখও তো ভুল দেখেনি। তাঁর দেখার সাথে শম্ভুদার দেখা হুবহু মিলে যায় কী করে যদি তাঁর চোখ ঠিক না দেখে থাকে। শরীরের অস্বস্তিটা আবার ফিরে এসেছে এখন প্রিয়নাথের। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে ঢক ঢক করে তিনি জল খেলেন খানিক। তারপর শম্ভুদার দিকে চেয়ে ছেলেমানুষের মতন মুখ করে বলে উঠলেন, 'শম্ভুদা, আমায় আজ একটু বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেবেন?'
বাড়ি ফিরতেই সুতপা মুখঝামটা দিয়ে উঠলেন, 'কী যে কর না, বাইরের লোক বাড়িতে ঢুকিয়ে রেখে যাচ্ছ, বলেও যাও না কিছু, আমরা যে কী মুশকিলে পড়ি—'
'কী হল আবার, কাকে বাড়িতে ঢুকিয়ে রেখে গেলাম?' কাঁপা গলায় জিগ্যেস করেন প্রিয়নাথ।
'সেই বুড়োটা,' সুতপা হেসে বলেন, 'তুমি বেরিয়ে যেতেই তোমার ঘরে সেই রেডিওটা নিয়ে পড়লেন। আমি ঘরে উঁকি মারতেই নিজে থেকেই ভারি গলায় বললেন চা লাগবে না—'
'আর কিছু বললেন?' সুতপাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললেন প্রিয়নাথ।
'বললেন। তবে সব কিছু মাথায় ঢুকল না আমার।'
'যেমন?'
'বলছিলেন রেডিওটা ওঁর খুব প্রিয় তবু তোমায় দিয়ে দেবেন যদি রমেশের দুষ্কর্মের শাস্তির ব্যবস্থা করে দিতে পারো তুমি। সেই আশা নিয়েই উনি নাকি তোমার কাছে আসেন। ওই রমেশ না কে তার ওপরে ওনার খুব রাগ জানো তো, ওই নাকি—'
'ওই নাকি'—আতঙ্কিত গলায় বলে ওঠেন প্রিয়নাথ। সুতপা কতখানি জানে ব্যাপারটা আঁচ করতে পারছিলেন না তিনি। সুতপা অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। চেনা মানুষটাকে আজ ক্যামন যেন অন্যরকম লাগছে। খুব চিন্তাগ্রস্ত, ভয় পাওয়া। প্রিয়নাথকে আগে কখনও এমন দেখেননি সুতপা। নিজের কথা থামিয়ে তাঁকে জিগ্যেস করেন তিনি, 'কী হয়েছে তোমার?'
'কিছু না,' হাতের চেটো দিয়ে কপালের ঘাম মোছেন প্রিয়নাথ, 'ওই ভদ্রলোকের সাথে বেশি কথা-টথা বোলো না আর।' নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে থাকেন প্রিয়নাথ। সুতপা আর জিগ্যেস করেন না কিছু। তবে প্রিয়নাথের চেহারা আর কথাবার্তায় একটা অজানা রহস্যের আঁচ পান তিনি। রহস্যের গন্ধ রয়েছে ওই বৃদ্ধ মানুষটাকে নিয়েও। কে ওই লোকটা, ক্যানো ওই রেডিওটার কাছে এসে বসে থাকে সে। প্রিয়নাথ থাকতে লোকটা আসে না কেনো?
সকাল হতে না হতেই শম্ভুদা এসে হাজির। প্রিয়নাথ নিজের ঘরেই বসে ছিলেন। আজ অফিসে যাবার মেজাজ নেই। শরীরটাও যেন বড় অবসন্ন লাগছে। সারা রাত ঘুম নেই চোখে। রেডিওটার দিকে তাকালেই গা ঘেমে উঠছে ভয়ে। মনে হচ্ছে এখুনি ওটাকে হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে গিয়ে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে আসতে। শম্ভুদার ওপরেও রাগ হচ্ছিল খুব। কী দরকার ছিল যেচে এ রেডিওটা তাঁর হাতে গছিয়ে দেবার। কাল রেডিওর মধ্যে থেকে সটান তাঁর চোখের সামনে হাজির হয়েছিল লোকটা। প্রথমটা কিছু বুঝতেই পারেননি তিনি। রেডিওটা চুপ ছিল। আগের দুদিনের মতন আচমকা বেজে ওঠেনি মাঝ রাত্তিরে। তবুও একটা দমবন্ধ করা অস্বস্তির মধ্যে ঘুমটা ভেঙে গেল তাঁর। জল খাবার জন্যে বিছানায় উঠে বসতেই লোকটাকে চোখে পড়ল। রেডিওটা কোলে নিয়ে বিছানার পাশে একটা চেয়ারে তিনি বসেছিলেন। লোকটাকে দেখে এমন চমকে উঠলেন প্রিয়নাথ যে আর একটু হলে হৃদপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে যেত। লোকটা স্থির চোখে প্রিয়নাথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রিয়নাথের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। গলার কাছটা কে যেন টিপে ধরেছে মনে হচ্ছে দু-হাত দিয়ে। ভয়ে দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল তাঁর। অতি কষ্টে বলে উঠলেন তিনি লোকটার দিকে চেয়ে, 'কী চান আপনি?'
'রমেশের শাস্তি।' ঘড়ঘড়ে গলায় বলে ওঠেন সেই বৃদ্ধ চাপা স্বরে।
'আপনি আমার কাছ পর্যন্ত যখন ধাওয়া করেছেন এ শাস্তি আপনি নিজেই তো তাকে দিয়ে দিতে পারেন।' মরিয়া হয়ে জিগ্যেস করেন প্রিয়নাথ, 'আমার জীবন এমন বিপন্ন করে তুলেছেন আপনি, আমি তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি—'
'পারি', খসখসে গলায় উত্তর দিলেন বৃদ্ধ। 'শাস্তি তাকে নিজে হাতে দেবোও হয়তো, কিন্তু তাতে জগত এই কুৎসিত ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পারবে না। আমি তার কুকীর্তি সবাইকে জানিয়ে দিতে চাই।'
'আমি কী করতে পারি এ বিষয়ে বলুন—'
'পুলিশকে ইনফরম করুন আসল সত্যিটা।'
'পুলিশকে আমি বললেই শুনবে কেনো তারা, আমার হাতে তো প্রমাণ নেই কোনো।'
'লাগবে না। আপনারা সোনারপুর থানার বিপ্লব বোসের সাথে যোগাযোগ করুন। ছেলেটা ভালো। আমায় চিনত। আমার নাম হরিচরণ মিত্র। ওকে সব কথা বলুন', বলতে বলতে হাওয়ার সাথে মিলিয়ে গেলেন ভদ্রলোক। প্রিয়নাথ অনেক কষ্টে চেতনাটা জিইয়ে রেখেছিলেন এতক্ষণ। লোকটাকে চোখের সামনে হাওয়ায় মিশে যেতে দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে রইলেন বিছানার ওপরে। জ্ঞান ফিরল সকালের দিকে। নিজেই উঠে বসলেন তিনি। জল খেলেন। জানেন সুতপাকে এসব জানতে দেওয়া যাবে না। একটু পরে হাত মুখ ধুয়ে আবার ঘরে এসে বসলেন তিনি। তখনি সুতপা খবর দিলেন যে শম্ভু মুখুজ্জে এসে বসে আছেন বাইরের ঘরে। একেবারে তৈরি হয়েই বাইরে এলেন প্রিয়নাথ। সোনারপুর থানায় যেতে হবে আজই। ব্যাপারটা যত দ্রুত সম্ভব হেস্তনেস্ত করে ফেলতে হবে।
তাঁকে বাইরে আসতে দেখে উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন শম্ভুবাবু। বললেন, 'ক্যাডাভ্যারাস কাণ্ড ভায়া, রেডিওটা রমেশবাবুর কাকা হরিচরণ মিত্তিরের। কদিন আগেই হঠাৎ হার্ট ফেল করে মারা গেছেন ভদ্রলোক। চাম্পাহাটিতে আমার এক পুরোনো কাস্টোমার আছে, তার কাছে খবর নিয়ে জানলুম।' প্রিয়নাথ অবাক হলেন না। সুতপার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললেন, 'একটু চা খেয়ে নিয়ে বেরোতে হবে শম্ভুদা, সোনারপুরে। চলুন দুজনে মিলে ঘুরে আসি।'
'এখুনি?' শম্ভু মুখুজ্জে ইতস্তত করছিলেন, 'বাড়িতে জানে না, তাছাড়া দোকানে কিছু আরজেন্ট কাজ ছিল—'
'পরে হবে ওসব, এখন আর দেরি করার মতন সময় হাতে নেই দাদা। আর দেরি করলে আমার পৈতৃক প্রাণটা নিয়েই না টানাটানি পড়ে যায়।'
'ঠিক আছে', শম্ভু মুখুজ্জে বললেন, 'তবে বেরোনোর আগে বাড়িতে বলে যাই একটু। বয়েস হয়েছে তো, বাড়িতে চিন্তা করবে না বলে কয়ে হুট করে কোথাও চলে যাই যদি।'
বিপ্লব বসু মানুষটা সত্যিই ভারি ভালো। সব শুনে গম্ভীর মুখে প্রিয়নাথ আর শম্ভু মুখার্জীর দিকে চেয়ে রইলেন খানিক। তারপর বিষণ্ণ মুখে বললেন, 'ভেরি স্যাড। যদিও এক্ষুনি আইনের চোখে ব্যাপারটা স্ট্যান্ড করানো যাবে না। হরিচরণবাবুকে আমি চিনতাম। ভারি ভালো মানুষ ছিলেন। আমি কথা দিচ্ছি বিষয়টা গুরুত্ব দিয়েই দেখব আমি।'
রমেশ তপাদার দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন হরিচরণ মিত্রের খুনের মামলায়। অবিবাহিত কাকার বিপুল টাকার এল.আই.সি.-র নমিনি ছিলেন তিনিই। ভদ্রলোক লোভে পড়ে অপেক্ষা করতে পারেননি আর। তাঁর বন্ধু ডাক্তারও নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন পুলিশি জেরায়। তিনি এখন জেলে।
তবে রমেশ তপাদারকে জেলে রাখা যায়নি। শাস্তি ঘোষনার পরদিনই কোনো এক অজ্ঞাত কারনে তিনি পাগল হয়ে যান। অজানা আতঙ্কে সবসময়েই কুঁকড়ে রয়েছেন তিনি, কার কাছে আপন মনে ক্ষমা চাইছেন সর্বক্ষণ। চিকিৎসার কারণে রমেশ তপাদারকে আপাতত মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাখা হয়েছে। হরিচরণ সুতপাকে বলেছিলেন রমেশের শাস্তির বন্দোবস্ত করলে রেডিওটা প্রিয়নাথকেই দেবেন।
সোনারপুর থানায় বিপ্লব বসুর সাথে কথা বলার পর থেকে সত্যি-সত্যিই হরিচরণ মিত্তির তাঁর ধারে কাছে আসেননি আর। তবু রেডিওটা প্রিয়নাথ আর নিজের কাছে রাখতে রাজি হননি। শম্ভু মুখুজ্জে বললেন, 'আমিও জেনেশুনে ও জিনিস আর কাছে রাখব না ভায়া।' কাজেই সেটা অফিস যাওয়ার পথে একদিন গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এসেছেন প্রিয়নাথ। এ বছরই প্রথম মহালয়ার দিন ভোরে রেডিওর প্রভাতি অনুষ্ঠান শোনা হয়নি তাঁর। দূরদর্শনের অনুষ্ঠান দেখেই দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছেন। শম্ভু মুখুজ্জে অবশ্য এই বলে অভয় দিয়েছেন তাঁকে যে কয়েকটা দিন সবুর করলে নিজে হাতে একটা বাঘের বাচ্চার মতন রেডিও বানিয়ে দেবেন, অন্তত দু-পুরুষ হেসে খেলে চলে যাবে ওটায়। নতুন রেডিও কেনার হ্যাপায় অন্তত প্রিয়নাথকে আর এ জীবনে অন্য কোনো বিপদে পড়তে হবে না কোনোদিনই।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন