পানু তান্ত্রিকের প্রায়শ্চিত্ত

জয়দীপ চক্রবর্তী

কালীপুরের মানুষ বিপদে পড়লে বা বিষাদে থাকলে পানু তান্ত্রিকের পোয়া বারো। ঝাড়ফুঁক, তন্ত্র-মন্ত্র, মারণ, উচাটন কিছু একটা করে চট জলদি সমাধান সে ঠিক বের করে দেবেই। সবসময় তার ফন্দি-ফিকিরে যে ষোলো আনা কাজ হয় তা নয়, কিন্তু কালীপুরের মানুষ তাতেই খুশি। যুক্তি-টুক্তি দিয়ে কষে ভেবে তার বিরুদ্ধে দু-কথা বলবার মতন ফুরসত বা সাহস কোনোটাই তাদের নেই। পানু তান্ত্রিক, মানে পান্নালাল ডাকসাইটে মানুষ। এলাকার প্রবীন মানুষেরা বলেন, 'পান্নালাল আমাদের সহজ মানুষ নয় বাপু। বিস্তর এলেমদার লোক সে। আসামের গভীর জঙ্গলে কঠিন সাধনা করে অনেক সিদ্ধাই-টিদ্ধাই জড়ো করে রেখেছে পান্নালাল তান্ত্রিক। ভূত প্রেতের দল মেনি বেড়ালের মতন দিন রাত্তির পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ায় তার। পানু তান্ত্রিকের হুকুম কে আগে তামিল করবে এই নিয়ে তাদের মধ্যে নাকি রীতিমতন প্রতিযোগিতা এখন।'

কাজেই এ মানুষকে চটানোর মতন আহাম্মকি কে করবে? অতএব পান্নালাল সকলেরই নমস্য। তার প্রতি মানুষের এই যে একটা গা ছমছমে ভক্তিভাব, সে সম্পর্কে পানু নিজেও বেশ ওয়াকিবহাল। মানুষের মন থেকে এই বিশ্বাসটা যাতে ফিকে হয়ে মিলিয়ে না যায় তার জন্যে সবসময় সতর্কও থাকতে হয় তাকে। মাথার লম্বা জটাটায় উকুন বাসা বেঁধেছে অনেক দিন। সারাদিন বেজায় চুলকোয়। তবু জটাটা কাটতে পারে না সে। কালীপুরের মানুষ জানে জটাই তার শক্তি। ওই জটার চুল ঘরে রাখলে অপদেবতার ভয় থাকে না। প্রতি অমাবস্যায় গঞ্জ ছাড়িয়ে শহর থেকেও ভক্তেরা আসে মোটা প্রণামির বিনিময়ে সেই জটার চুল নেবার জন্যে। তাছাড়া হাত গুনে গ্রহদোষ বিচার করে গ্রহশান্তির মাদুলি দেবার ব্যবসাটা তো আছেই।

আজকের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। কাজটা ঝুঁকির, তবু দায়িত্বটা ঘাড়ে নিয়েছে পানু। কাজে ঝুঁকি থাকলে আমদানির অংকটাও বাড়ে। সে জানে, ফন্দিটা কাজে লেগে গেলে এলাকায় প্রতিপত্তি বাড়বে। তাছাড়া এই কাজটার বিনিময়ে শোকগ্রস্ত লোকটার থেকে যে টাকাটা বাগিয়ে নিতে পারবে তা দিয়ে কয়েকমাস পায়ের ওপরে পা তুলে বসে খেতে পারবে পানু আর ফড়িং।

ফড়িং পানুর নিত্য সহচর। ভারি ভক্তি করে তাকে। পান্নালালকে একরকম গুরু বলেই মানে সে। ছেলেটার বয়েস কম, কিন্তু বেশ করিতকর্মা। সত্যি বলতে কি আজকের এই ক্লায়েন্ট ফড়িং এর হাত যশেই ছুটে আসছে পানুর কাছে। ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলার সঙ্গে ফড়িং এর দেখা হয়েছিল গত শুক্কুরবার শহরে সন্তাপহারিনী মন্দিরের চাতালে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে দুজনেই তখন আকুল হয়ে বিলাপ করছিলেন বিগ্রহের সামনে। বার বার বলছিলেন, 'ছেলেটা কোথায় যে হারিয়ে গেল...একটিবারও যদি আবার দেখা হত তার সঙ্গে...'

ফড়িং এই সুযোগটা লুফে নিয়েছিল একেবারে। মন্দির চত্বর থেকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নীচু গলায় বলেছিল তাঁদের পানু তান্ত্রিকের কথা। যতটা সম্ভব বাড়িয়েই বলেছিল। দু হাত কপালে ঠেকিয়ে বলেছিল, 'ওনার সম্পর্কে কীই বা বলি বলুন। যাই বলি কম বলা হবে। মৃত্যুর ওপারের জগতটা বলতে গেলে আজকাল উনি একা হাতেই সামাল দিচ্ছেন। সকলের সঙ্গেই নিবিড় যোগাযোগ তাঁর। কিন্তু ও পারের মানুষদের সঙ্গে এই যে তাঁর এমন হলায় গলায় সম্পর্ক, সে কথা কাউকে বুঝতেটি দেন না কিছুতেই। আমার সৌভাগ্য, অথবা পূর্বপুরুষের পুণ্যি বলতে পারেন যে এমন মস্ত মানুষটা বড্ড স্নেহ করেন আমায়। সেই স্নেহের বশেই গুহ্য কথাটা কথায় কথায় মুখ ফসকে একদিন আমার সামনে বলে ফেলেছিলেন। অবশ্য পই পই করে বারণও করে দিয়েছেন যাতে কথাটা আমি পাঁচকান না করি।'

ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলার মুখের ওপর দিয়ে একবার আলতো চোখ বুলিয়ে নেয় ফড়িং। তাঁদের প্রতিক্রিয়াটা লক্ষ্য করে। তারপর তাঁদের মনের ভাবটা খানিক পড়ে নিয়ে আর একটু চড়িয়ে দেয় সে তার গল্পটাকে, 'একদিন খুব বায়না করায় আমার মৃত বাপের সঙ্গে দেখাও করিয়ে দিতেও তিনি রাজি হয়ে গেলেন এক অমাবস্যায়'।

'সত্যি?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন মহিলা।

'নইলে আর বলছি কী', ফড়িং মাথা চুলকে বলে, 'আজ অব্দি এ সব কথা পেটের মধ্যেই লুকিয়ে রেখেছিলাম, আপনাদের দেখে আজ এত মায়া লাগল যে কথাটা আর চাপতে পারলাম না। কে জানে তিনি অপরাধ নেবেন কিনা। তিনি যে আবার সর্বজ্ঞ। এখানকার কথা নির্ঘাত তাঁর কানে তুলে দেবে পানুবাবার পোষা ভূতগুলো'। চোখেমুখে যতটা সম্ভব ভয়ের ভাব ফুটিয়ে তুলে মিনতি করে বলে ফড়িং, 'বিশ্বাস করে বলে ফেললাম। আপনারা কাউকে যেন গপ্প করতে যাবেন না আবার...'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%