শেষ রাতের ট্রেন

জয়দীপ চক্রবর্তী

হলফ করে বলতে পারি, গল্পটা আমার মনগড়া নয়। যদিও নয় নয় করে বিশ বিশটা বছর পেরিয়ে গেছে, তবু সে রাতটার কথা দিব্বি মনে আছে আমার। এই কুড়ি বছরে সাকুল্যে একজনকেই এই অভিজ্ঞতার কথা বলে উঠতে পেরেছি মন খুলে। চট করে কাউকে গল্পটা বলতে ইচ্ছে করেনি এইজন্যেই যে, জানি তারা আমার কথা বিশ্বাস করবে না। নানা যুক্তি খাড়া করে আমায় বোঝাতে চেষ্টা করবে কোথাও একটা ভুল হচ্ছে আমার। হয় আমি ইয়ার্কি করছি, নাহলে গাঁজাখুরি মনের ভুলকে সত্যি বলে চাউর করতে চাইছি। আমি সেদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই অহেতুক তর্কাতর্কি খুব সচেতনভাবেই এড়াতে চেয়েছিলাম।

আমার গাদা বন্দুকটাকে ঘাড়ে করে সেদিন সকাল থেকে শখের শিকারের নেশায় উত্তর ইংল্যান্ডের নির্জন পাহাড়ি এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। সকাল পেরিয়ে দুপুর গড়িয়ে সন্ধে নেমে গেলেও একটা শিকারও ভাগ্যে জোটেনি আমার তখনও। ডিসেম্বর মাস। পুব দিক থেকে হাড় কাঁপিয়ে দেওয়া ঠান্ডা কনকনে হাওয়া বইছিল হু হু করে। আমার খেয়ালই ছিল না কোনোদিকে। যখন সম্বিৎ ফিরল, ঘষা কাঁচের মতন অস্বচ্ছ আকাশ থেকে পেঁজা তুলোর মতন নরম আর হাল্কা বরফের গুঁড়ো নেমে আসতে শুরু করেছে। সূর্যের আলো মরে এসেছে তখন। চারদিক কালো করে সন্ধে নেমে আসছে হুড়মুড় করে।

পাহাড়তলির গ্রামে আমার হোটেলে ফেরার জন্যে ফেলে আসা পথে ফিরতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম পাহাড়ি রাস্তায় আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে খানিক দাঁড়ালাম। ভাবলাম যদি লোকজন কাউকে চোখে পড়ে তাহলে ফেরার পথটা জিজ্ঞেস করে নেব। কিন্তু চারদিকে তাকিয়েও জনমনিষ্যির চিহ্ন দেখতে পেলাম না। অন্ধকার তখন আরো ঘন হয়েছে। আকাশ থেকে নেমে আসা বরফের পরিমাণও বাড়ছে ক্রমাগত। অগত্যা নিজেই নিজেকে বোঝালাম এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ তো নেই কিছু। কাজেই চলা যাক। চলতে চলতে নিশ্চিত মানুষের বসতি চোখে পড়ে যাবে একসময়। তারা যদি আমাকে পথের সন্ধান দিয়ে দেয় তাহলে মাঝরাতে হলেও অন্তত নিজের হোটেলে গিয়ে উঠতে পারব।

অতএব আমি আবার হাঁটতে লাগলাম। আমার গিন্নির জন্যে মন কেমন করে উঠল এবার। বেচারা হোটেলে একা রয়েছে। সকালের টিফিন খেয়ে বেরিয়ে আসার সময় বলে এসেছিলাম সন্ধে নাগাদ ফিরে আসব। নিশ্চিত আমার জন্যে দুর্ভাবনা শুরু করে দেবে সে একটু পর থেকেই। কিন্তু আরো খানিক হেঁটেও জনবসতির কোনো চিহ্ন আমার চোখে পড়ল না। এবার আমি ভয় পেয়ে গেলাম। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। তেষ্টাও পেয়েছে বিস্তর। সঙ্গে খাবার নেই। জলও যেটুকু ছিল শেষ হয়ে গেছে অনেক্ষণ আগেই। ঠান্ডা বাতাস হাড়ের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে একেবারে। পথের ওপরে পড়া বরফে পা ঢুকে যাচ্ছে এবার। হাঁটতে হাঁটতে সেইসব মানুষের কথা মনে আসতে লাগল আমার, যাঁরা এমনি করেই পাহাড়ি পথে রাস্তা হারিয়ে ফেলে চলতে চলতে একসময় হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেলে এই সাদা বরফে ঢাকা পৃথিবীর ওপরেই ঘুমিয়ে পড়েছে চিরতরে...

আমি নিজেই মনে মনে নিজেকে ভরসা দিলাম। আমি এ ভাবে মরতেই পারি না। যে করে হোক এ রাতটুকু কাটানোর জন্যে একটা মাথা গোঁজার আশ্রয় জোগাড় করতেই হবে। হাঁটতে হাঁটতেই প্রাণপনে চিৎকার করতে লাগলাম আমি। যদি কেউ সেই আওয়াজ শুনে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। কান খাড়া করে শুনতে লাগলাম প্রতিউত্তর ভেসে আসে কিনা, কিন্তু পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে আমার নিজের কন্ঠস্বরই ফিরে ফিরে আসতে লাগল বার বার। হাওয়ার শব্দও আরো জোরালো হতে লাগল। খিদে, তেষ্টা, প্রবল ঠান্ডা আর ক্লান্তিতে বাঁচার আশা ক্ষীণ হয়ে এল যখন ঠিক তখনি মনে হল কে যেন আমার চিৎকারে সাড়া দিয়ে উঠল আর তারপরেই দূর থেকে একটা হলদেটে গোল আলো এগিয়ে আসতে দেখলাম আমি। প্রথমটা চোখের ভুলই ভেবেছিলাম, কিন্তু ক্রমশ আলোটাকে আমার দিকেই এগিয়ে আসতে দেখে উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করতে শুরু করলাম আমি আবার।

লন্ঠন হাতে বয়স্ক মানুষটা একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে পড়ল আমার সামনে। তাকে দেখে আনন্দে বার বার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতে লাগলাম আমি। লোকটা মনে হল যেন খুব বিরক্ত হল। হাতের লন্ঠনটা উঁচু করে ধরে সে আমার মুখটা দেখল ভালো করে। তারপর রুক্ষস্বরে বলে উঠল, 'কী ব্যাপার, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেবার মতন কী এমন ঘটল?'

'এই যে এমন ভয়ংকর রাতে আর ঘোর বিপদের মধ্যে আমি আপনাকে পেয়ে গেলাম, এ তো তাঁরই দয়া বলুন', আমি আনন্দে বলে উঠি, 'আমি তো বলতে গেলে মরার জন্যেই তৈরি হচ্ছিলাম মনে মনে একটু আগে'।

আমার কথাগুলোকে পাত্তাই দিল না লোকটা। কঠিন, ভাবলেশহীন গলায় জিজ্ঞেস করল সে, 'তা যাবেন কোথায় আপনি?'

'ডুলডিং', উৎসাহের সঙ্গে বললাম আমি, 'আচ্ছা ও গ্রামটা এখান থেকে কতখানি বলতে পারেন?'

'প্রায় বিশ মাইল' ঠান্ডা গলায় বলে উঠল লোকটা, 'এই বরফ পড়া রাতে সেখেনে পৌঁছনো যে অসম্ভব তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। কাজেই মরণই নাচছে আপনার কপালে'।

আমি ভীষণই দমে গেলাম লোকটার কথা শুনে। মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'আশেপাশে পাহাড়ি গ্রাম নেই কোনো, যেখানে রাত্তিরটা মাথা গোঁজা যায় কোনোক্রমে?'

'গ্রাম?' খসখসে শুকনো মুখে হেসে উঠল লোকটা, 'এখান থেকে সবচেয়ে কাছের গ্রাম ওয়াইকি অন্তত বারো মাইল'।

'তাহলে আপনি থাকেন কোথায়?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম আমি।

'ওই তো ওইদিকে', বলে লন্ঠনশুদ্ধু হাতটা তুলে কোনদিকে যে দেখালো লোকটা কে জানে!

আমি নিরুপায় হয়ে বলে উঠলাম, 'তাহলে আজ রাতটুকু আপনার বাড়িতেই যদি থাকতে দেন...একটু তেষ্টার জল আর সামান্য কিছু খাবার হলেই চলবে...শুধু রাতটুকু, অন্ধকার ফিকে হলেই বেরিয়ে পড়ব আমি...'

'অসম্ভব', আকাশ থেকে ক্রমাগত খসে পড়া বরফেরই মতন ঠান্ডা গলায় বলে উঠল লোকটা।

'কেন?'

'কত্তামশাই কিছুতেই রাজি হবেন না। বাইরের মানুষ একেবারেই পছন্দ করেন না উনি'।

'কত্তা মানে? কৌতূহলী হয়ে বলি, 'তিনি আবার কে?'

'এত কিছু জানার দরকারটা কী বাপু...' বেশ বিরক্ত হয়ে বলে লোকটা।

'আপনি আমায় নিয়েই চলুন না একবার তাঁর কাছে', প্রায় অনুনয় করে বলি আমি, 'আমার দুরবস্থার কথা বুঝিয়ে বললে দেখবেন কিছুতেই আপত্তি করবেন না তিনি। আমি নিশ্চিত'।

'দেখুন', বলে পিছন ফিরে লোকটা হাঁটতে শুরু করল মুখ বুজিয়ে। আমিও নাছোড়বান্দার মতন লন্ঠনের ক্ষীণ আলো অনুসরণ করে হাঁটতে লাগলাম তার পিছু পিছু।

বেশ কিছুক্ষণ একনাগাড়ে হাঁটার পর অন্ধকারের মধ্যে আরো জমাট অন্ধকারের মতন একলা দাঁড়িয়ে থাকা একটা উঁচু বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম আমরা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'এই বাড়ি?'

'হুঁ', গম্ভীর গলায় উপর নীচ মাথা দোলায় লোকটা।

'এই নিকষ অন্ধকার বাড়িটার মধ্যে সত্যিই মানুষ থাকে?' সংশয় নিয়ে আমি বলি। লোকটা কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। প্রকান্ড একটা কুকুর ভয়ংকর গর্জন করে ছুটে আসছে তখন অন্ধকার চিরে। বুড়ো লোকটা হাত তুলে থামতে ইশারা করল কুকুরটাকে। তারপর লম্বা কোটের পকেট থেকে চাবি বের করে দরজার গায়ে একটা ছোট্ট ফুটোর মধ্যে ঢুকিয়ে পাক মারতে শুরু করল। দরজাটা বিশাল। ভারীও। দেখলে মনে হয় জেলখানার দরজা। একবার ঢুকে পড়লে যেন আর বেরোবার উপায় নেই এখান থেকে। কুকুরটা আমার দিকে চেয়ে ভীষনই রাগী গলায় গরগর করছিল। লোকটা মৃদু ধমক দিল তাকে, 'আঃ রাজা, চুপ'। আমি দরজার দিকে নজর রাখছিলাম। ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছি তখন। দরজাটা একটু ফাঁক হতেই বুড়ো লোকটাকে এক ঠেলা মেরে সটান ভেতরে ঢুকে পড়লাম আমি।

ঘরটা বেশ বড় আর উঁচু। হাল্কা আলো জ্বলছে ঘরের মধ্যে। আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখছি যখন হঠাৎই ঢং ঢং করে ঘন্টা বেজে উঠল। বুড়ো লোকটা আমার দিকে চেয়ে অদ্ভুতভাবে হাসল। সে হাসি দেখে আমার সারা শরীর অজানা আতঙ্কে যেন শিউরে উঠল। লোকটা হিসহিসে গলায় বলে উঠল, 'এই ঘন্টা আপনার জন্যে। প্রভু আপনাকে ডাকছেন। চলুন', বলে ঘরেরই আর একদিকে একটা নীচু কাঠের দরজার দিকে হাত বাড়ালো। মাথা নামিয়ে ঘরে ঢুকে লোকটার মুখোমুখি দাঁড়ালাম। এ ঘরটা বই পত্তরে ঠাসা। লোকটার সামনের টেবিলটাতেও হরেক বই এমন অগোছালোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যেন হুড়মুড় করে নীচে পড়তে শুরু করে দেবে ওগুলো। বইগুলোর ওপরে ঝুঁকে পড়েছে লোকটা। শনের মতন লটপটে অবিন্যস্ত চুল মুখের চারদিকে লুটিয়ে আছে। আমি ঘরে ঢুকতেই লোকটা মুখ তুলল। আমি তার দিকে চেয়ে একেবারে ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম। তার চোখদুটো ধক ধক করে জ্বলছিল।

গনগনে গলায় সে জিজ্ঞেস করল, 'কে তুমি? এখানে এলে কীভাবে? কী চাও তুমি?' তারপর অন্য লোকটার দিকে চেয়ে অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে চিৎকার করে উঠল, 'জ্যাকব, একে কেন ঢুকতে দিয়েছ এখানে?'

জ্যাকব হাত কচলাতে কচলাতে বলতে লাগল, 'আমি একে আনিনি স্যার। এ নিজেই আমাকে অনুসরণ করে এখানে এসেছে। এমনকি আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে জোর করে ঢুকে পড়েছে বাড়ির ভেতরে।

'কেন এমন করেছ?' আমার দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধস্বরে ধমকে উঠল লোকটা।

'প্রাণ বাঁচাতে', কাঁপা স্বরে উত্তর দিলাম আমি।

'মানে?' ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করল সে।

'বাইরে যে হারে বরফ পড়ছে আজ, আমি সারারাত বাইরে থাকলে বরফের নীচে চাপাই পড়ে যেতাম। তাছাড়া খিদে আর তেষ্টায় এমনিতেই আধমরা হয়ে আছি আমি'।

লোকটা গম্ভীর মুখে জানালার পাল্লা খুলে বাইরের জমে থাকা বরফের দিকে তাকিয়ে নিল একবার। তারপর একটু নরম গলায় বলল, 'থাকো কোথায়?'

'আজ্ঞে ডুলডিং', ওখানে একটা হোটেলে আমার স্ত্রী আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। শিকারে এসে অন্ধকার পাহাড়ি পথে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি আমি। আমার নাম জেমস। পেশায় ডাক্তার'। অনেকগুলো কথা একসঙ্গে বলে ক্লান্তিতে হাঁফাতে লাগলাম আমি। লোকটা আমাকে আপাদমস্তক দেখে নিল একবার। আপনমনে বলে উঠল, 'ডুলডিং। হ্যাঁ জায়গাটা দূরই বটে। সত্যিই কুড়ি মাইলের পথ'। তারপর জ্যাকবের দিকে চেয়ে বলল, 'জ্যাকব ও আজ রাতে এখানে খাবে। আমাদের খাবার টেবিলে দাও'।

জ্যাকব কিছুটা মাংস, রুটি আর জল এনে রাখল আমাদের সামনে। লোকটা রুক্ষ গম্ভীর গলায় বলে উঠল, 'ঝটপট খেয়ে ফ্যালো। এর বেশি আর কিছু খাওয়াতে পারলাম না তোমাকে'। খেতে খেতে লোকটাকে মাঝে মাঝে আড়চোখে দেখছিলাম আমি। কে এই লোকটা? মস্ত মাথা। মুখে বলিরেখা। সেখানে বৈদগ্ধ আর গাম্ভীর্য। লম্বা চুল। আচরণ রহস্যময় ও ভয়জাগানো। এ আদৌ মানুষ তো? খাওয়া শেষ করতে না করতেই তাড়া দিয়ে তুলে দিল আমায় লোকটা, 'তুমি ডুলডিং যাবে বলছিলে না?'

'হ্যাঁ', মাথা নাড়লাম আমি।

'তাহলে শিগগিরি বেরিয়ে পড়তে হবে তোমায়'।

'এখন, এই রাতে!' আতঙ্কিত হয়ে বলি আমি, 'এই তুষারপাতের মধ্যে এত পথ কীভাবে যাব আমি?'

'তুমি না বলছিলে তোমার স্ত্রী তোমার জন্যে অপেক্ষায় আছে?'

'হ্যাঁ', বিহ্বল হয়ে বলি, 'নিশ্চিত এতক্ষনে সে আমার জন্যে মারাত্মক দুশ্চিন্তা করছে'।

'পাহাড়ি পথের চড়াই উতরাই পেরিয়ে কিছুটা এগোলে একটা রাস্তা আছে। ওল্ড কোচ রোড। রোজ শেষ রাতে সেই পথে কয়েকটিমাত্র কামরা নিয়ে একটা ট্রেন যায়। কোথাও থামুক না থামুক, ডুলডিং-এ সে ট্রেন থামবেই', বলে আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে নিল লোকটা, 'হাতে আরো সোয়া ঘন্টাটাক সময় আছে। এক্ষুনি বেরিয়ে পড়লে সে ট্রেন পেয়ে যাবে তুমি'। আমি ইতস্তত করে বলি, 'এই দুর্যোগের রাতে...'

'বরফ পড়া থেমে গেছে', কঠিন গলায় বলে ওঠে লোকটা, 'জ্যাকব ওল্ড কোচ রোড পর্যন্ত সঙ্গে যাবে তোমার। আশা করি তারপরের রাস্তাটুকু তুমি নিজেই চিনে নিতে পারবে। মনে রেখো, ওল্ড কোচ রোডের পাঁচিল বরাবর খানিকটা হেঁটে গেলেই সাইনপোস্ট স্টেশন। ওখানে ট্রেন থামলে উঠে পোড়ো তুমি'। খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম সত্যিই বরফ পড়া বন্ধ হয়েছে তখন। জ্যাকব আমার হাতে হাত রাখল, 'চলো। বেরিয়ে পড়তে হবে। আর সময় নেই। এরপর দেরি হয়ে যাবে...' আমি চমকে তাকালাম জ্যাকবের দিকে। উঃ কী অসম্ভব ঠান্ডা তার স্পর্শ।

জ্যাকব সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে খসখসে গলায় বলে উঠল, 'ওই যে ওল্ড কোচ রোড। একটা কোমর সমান উঁচু ভাঙা ভাঙা পাঁচিল দেখছেন?'

'হ্যাঁ', আমি বললাম। আকাশ আগের চেয়ে কিছুটা পরিস্কার হয়েছে এখন। আবছা কুয়াশামাখা আলো ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। সেই কুয়াশার চাদরের ওপাশে পাঁচিলটা চোখে পড়ল আমার। ওই পাঁচিলের ওপাশ দিয়ে রেললাইন এগিয়ে গেছে। সোজা, উঁচুনীচু পথ বেয়ে। জ্যাকব হঠাৎই হেসে উঠল। হালকা হাওয়ার সঙ্গে মিশে যেতে লাগল সেই হাসি। আমার কেমন ভয় করে উঠল।

জ্যাকব বলতে লাগল, 'কুড়ি বছর আগে এই লাইনে একটা ভয়ানক দুর্ঘটনা হয়েছিল। দুদিকের পাঁচিলের মধ্যিখানে যে রাস্তাটা সেটা সরু। প্রায় পাঁচিলের গায়ে লেগে লেগেই চলে ট্রেনটা। ওখানে পাঁচিল ভেঙে গিয়েছিল। লাইনটাও একটা ধস নেমে আচমকা নেমে গিয়েছিল অনেক অনেক নীচে। এই ধরুন প্রায় পঞ্চাশ ফুটের মতন। এই পথ দিয়েই আরো এগিয়ে ট্রেনটা বাঁ পাশের ভাঙা পাঁচিল পেরিয়ে ঝাঁপ দিয়েছিল সেই ভাঙা রাস্তা ধরে নীচে। সেইদিন সে ট্রেনে কত্তার ছেলে ছিল। তারপর আরো অনেকে...কেউই বাঁচেনি। বাঁচা সম্ভবই ছিল না, বুঝছেনই তো বলুন...তারপর থেকেই আমার কত্তা অমন', বলে থেমে গেল জ্যাকব। তারপর আবার একবার সেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠা হাসিটা হেসে বলল 'আসি। বাকি পথটুকু একলাই চলে যান ডানদিকে পাঁচিলটাকে নিশানা করে। শুধু মনে রাখবেন সাইনপোস্ট...' জ্যাকব আর ফিরে তাকাল না। ফিরতি পথে হাঁটতে লাগল হনহন করে।

একা হয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গা শিরশির করে উঠল আমার। ভয় ক্রমশই চেপে বসতে লাগল মনের মধ্যে। এই নিঝুম রাত্তিরে এই রহস্যময় রেলপথ যেন গিলে খেয়ে নিতে আসছিল আমাকে। পা ভারী হয়ে আসছিল ক্রমশ। অথচ এগোতে আমায় হবেই। আমি নিজেই প্রাণপনে নিজেকে ভরসা যোগাতে যোগাতে পাঁচিলটাকে ডানহাতে রেখে হাঁটছিলাম।

পাঁচিলটা অধিকাংশ জায়গাতেই ধসে পড়েছে। বরফে জমা পুরনো রেলপথ চুপিসাড়ে শুয়ে আছে সেই বরফের নীচে। কেন যেন মনে হল এই পথ কখনও শেষ হবে না। শেষ হবে না আমার পথ চলাও। ডুলডিং গ্রামে অপেক্ষায় থাকা স্ত্রীর কথা মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল আর কখনও কোনোদিন দেখা হবে না ওর সঙ্গে।

চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল দূর থেকে ঠিকরে আসা কুয়াশা চেরা আলোর রেখা পথে এসে পড়ায়। সঙ্গে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠা একটা ঝমাঝম ঝমাঝম শব্দে। ট্রেন আসছে। চমকে রেললাইনের ওপর থেকে সরে এলাম আমি। দূরে ট্রেনের আলো দেখতে পাচ্ছি এখন। অবাক হয়ে গেলাম। বেখেয়ালে সাইনপোস্ট স্টেশন কি তবে ফেলে এলাম আমি? ট্রেনটা কাছে চলে এসেছে। গতি কমার লক্ষন নেই তার এতটুকু। তারমানে আশেপাশে স্টেশন থাকার সম্ভাবনাই নেই কোনো। তাহলে সাইনপোস্ট স্টেশন? কখন ছেড়ে এলাম তাকে? প্রানপনে হাত নেড়ে আর চিৎকার করে ট্রেনটাকে থামানোর চেষ্টা শুরু করলাম আমি। সম্ভবত চালক দেখতে পেয়েছেন আমায়। গতি কমে এল ট্রেনের। আমার সামনে দিয়ে একটা একটা করে অন্ধকার নিঝঝুম কামরাগুলো সরে সরে যাচ্ছে ধীর গতিতে। আমি প্রাণপনে একটা কামরার দরজার হাতলটাকে আঁকড়ে ধরে টান দিলাম গায়ের জোরে। দরজা খুলতেই লাফিয়ে উঠে পড়লাম কামরার মধ্যে। আর কী আশ্চর্য, আমি সেই অন্ধকার কামরায় উঠে পড়তেই গাড়ির গতি বেড়ে গেল। দুলে উঠল কামরাগুলো প্রবলভাবে। মনে হল যে কোনো সময় তারা যেন দুলুনির চোটে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে ট্রেন থেকে।

ট্রেনের মধ্যেটা এমনই নিস্তব্ধ যে আমি ভেবেছিলাম এই কামরায় যাত্রী আমি একা। ভেতরে ঢুকে সিটে বসে পড়লাম আমি হেলান দিয়ে। চোখ বুজে এল। কিন্তু একটা মারাত্মক অস্বস্তি ক্রমশই ঘিরে ধরল আমায়। একটা বিচ্ছিরি গন্ধ নাকে আসছে। মাংস পচা গন্ধ। মাটির নীচে দীর্ঘদিন আটকে থাকা সোঁদা গন্ধ। আমার মনে হল ভুল করে কোনো প্রাচীন গোরস্থানে ঢুকে কবরের মুখগুলো যেন ভুল করে খুলে দিয়েছি আমি। আতঙ্ক আর অস্বস্তিতে আমি চোখ মেললাম। আর তখনি চোখে পড়ল কামরার মধ্যে আমি একা নই।

বাইরে আকাশে চাঁদ উঠেছে তখন। চাঁদের আলো চুঁইয়ে ঢুকে পড়েছে জানালার শার্সি টপকে রেলগাড়ির কামরার মধ্যে। সেই আলোয় আমার সহযাত্রীদের দিকে তাকালাম আমি। সংখ্যায় তারা তিন জন। ওরা সকলেই চুপ করে বসেছিল। আমি তাদের সঙ্গে আলাপ করার চেষ্টা করলাম।

বললাম, 'আজ বড্ড ঠান্ডা পড়েছে'। তারা আমার দিকে তাকাল কিন্তু উত্তর দিল না। আবার বললাম, 'বাইরেটা খুব ঠান্ডা আজ'। এবারেও তারা সাড়া দিল না কেউ। শুধু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল স্থির দৃষ্টিতে।

এবার আমি ভালো করে চেয়ে দেখলাম তাদের দিকে। প্রত্যেকেরই মুখ কাগজের মতন সাদা আর খসখসে। মুখে অভিব্যাক্তি নেই কোনো। শুধু তাদের চোখদুটো যেন জ্বলছিল। একটা অদ্ভুত অপার্থিব আলো ঠিকরে আসছিল তাদের স্থির, পাথুরে চোখগুলো থেকে। সেই বদখত গন্ধটা যেন পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরছে কামরার মধ্যে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। শীতে হাত পা অবশ হয়ে আসছে ক্রমশ, তবু আমি আবার জিগ্যেস করলাম, 'আমি কি জানলার কাচটা একটু তুলতে পারি?' এবারেও নিরুত্তর রইল তারা।

অসহায়ের মতন চিৎকার করে বার বার একই প্রশ্ন করতে লাগলাম আমি। কিন্তু কামরার অসহ্য নীরবতা ভেঙে তারা কথা বলে উঠল না। আমি নিজেই কামরার জানলা খুলতে গিয়ে স্থির হয়ে গেলাম। জানলার কাচে বহু বছরের নোঙরা জমে শক্ত হয়ে আছে। কাচ নাড়ানোর উপায় নেই।

আমি এবারে ভালো করে তাকালাম কামরার ভেতর দিকে। সেখানেও সর্বত্র আবর্জনা আর আবর্জনা। কামরাটাও জীর্ণ, নড়বড়ে, ভাঙ্গাচোরা। মেঝের ওপরে জঞ্জালের স্তুপ। দেখলেই বোঝা যায় যে কোনো মুহূর্তে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে পড়বে পুরো কামরাটাই। এবার আমার কাছে সব যেন স্পষ্ট হতে লাগল। আমার সহযাত্রীদের রক্তহীন ঠোঁট, শুকনো সাদা মুখ, জ্বলন্ত চোখজোড়া সবকিছু থেকেই মৃত্যুর স্পষ্ট গন্ধ উড়ে আসছে। তাদের গা থেকে, চুল থেকে কবরের গন্ধ উঠে আসছে তখন। একটুক্ষন খুঁটিয়ে দেখে তাদের অন্তত দুজনকে বেশ চিনেও নিতে পারলাম আমি। আমাকে তাদের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে একসাথে হো হো হি হি করে হাসতে শুরু করল তারা। হাসির দমকে দমকে তাদের হাড়ে হাড়ে ঠোকাঠুকি লেগে খটাখট শব্দ হতে লাগল।

আমার এতটুকুও সংশয় রইল না যে আমার সহযাত্রীদের একজনও আর বেঁচে নেই। বেঁচে আছে শুধু তাদের ভয়ানক আগুনে চোখগুলো। ঝমঝম শব্দ তুলে দুলতে দুলতে তীব্র গতিতে সেই ভাঙাচোরা পুরনো ট্রেনটা ছুটে চলেছে অজানা গন্তব্যের দিকে। আমার সহযাত্রীরা গোল হয়ে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। হাওয়ায় হাওয়ায় আহ্বান বাজছে, 'আয়, আয়, আয়...' আমি সিট থেকে লাফিয়ে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। একটানে খুলে ফেললাম দরজা। আর তখনই চোখে পড়ল একটা পরিত্যক্ত প্ল্যাটফর্ম পার হয়ে যাচ্ছি আমরা দ্রুত গতিতে। প্ল্যাটফর্মের গ্যাসের আলো নিভে আছে, তবুও চাঁদের আলোয় দিব্বি স্টেশনের নামটা পড়তে পারলাম। একটা বোর্ডের ওপরে আবছা ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া অক্ষরে লেখা রয়েছে 'সাইনপোস্ট'। খোলা দরজা দিয়ে ঝাঁপ দেব মনস্থ করছি তখন। হঠাৎই খেয়াল করলাম সামনে রেললাইন বলে কিছু নেই আর। রাস্তাটা দুম করে অনেক, অনেক নীচে নেমে গেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। এরপর একটা ভয়ংকর কান ফাটানো আওয়াজ হয়েছিল মনে আছে। আর কিচ্ছুটি মনে ছিল না আমার। আজ অব্দি মনে করতে পারিনিও আর কিছু।

যখন জ্ঞান ফিরেছিল, আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। মাথার পাশে ঝুঁকে রয়েছে আমার স্ত্রীর উদ্বেগমাখা মুখ। ক্লান্ত রুগণ গলায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'কী হয়েছিল আমার?'

'তুমি পড়ে গিয়েছিলে গো', আমার স্ত্রী আমার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিল, 'সেই যেখানে পরিত্যক্ত রেলপথ শেষ হয়ে গেছে তার নীচের পঞ্চাশ ফুট গভীর খাদে পড়ে গিয়েছিলে তুমি। নেহাত কাল রাতে প্রচুর বরফ পড়েছিল তাই বেঁচে গেছ তুমি। ওই নরম বরফে পড়েও হাত ভেঙে গেছে তোমার, মাথায় আঘাত...কাল যদি অত বরফ না পড়ত...' কথা না বলে মুখে হাত চাপা দিয়ে কান্না আটকেছিল সে। আমি আবার জিগ্যেস করলাম, 'আর এখানে এলাম কীভাবে?'

'দুজন মেষপালক হারিয়ে যাওয়া ভেড়া খুঁজতে গিয়ে দেখতে পেয়েছিল তোমায়', ও বলেছিল, 'ভাগ্যিস তোমার পকেটে আমাদের হোটেলের নাম ঠিকানা আর তোমার নাম লেখা কাগজ ছিল...'

আমার অ্যাকসিডেন্টের আসল কারণ ওকে বলিনি, কিন্তু ডাক্তারকে বলেছিলাম। তিনি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ক্লান্ত অবসন্ন ক্ষুধার্ত মস্তিস্কের এ এক অলীক স্বপ্ন। মাথায় আঘাত লাগার জন্যেও এমন ভ্রম হতে পারে বলে তাঁর অভিমত। আমি তর্ক করিনি। করার প্রয়োজনও তো ছিল না। কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক, কীই বা যায় আসে আমার। আমি নিজে তো জানি, আজ থেকে কুড়ি বছর আগে পরিত্যক্ত ওল্ড কোচ রোডের ভূতুড়ে কামরায় সত্যি সত্যিই আমি সেই শেষ রাতের অলৌকিক যাত্রায় অংশ নিয়েছিলাম।

(এমিলিয়া বি এডওয়ার্ডস এর THE GHOST COACH গল্পের ছায়া অবলম্বনে)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%