অন্য ভূতের গল্প

জয়দীপ চক্রবর্তী

আত্মারামের নামের শেষের ওই রাম শব্দটিতে প্রবল আপত্তি ভূতেশ স্যারের। তাঁর সাফ কথা এই স্কুলে রামান্তক কোনো শব্দ দিয়ে নাম ব্যবহার করা যাবে না। আত্মারাম তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, সত্যি সত্যি তো আর রামনাম উচ্চারণ করতে কোনো কষ্ট হয় না তাদের। তাছাড়া যখন বেঁচেছিল তখন একটা গল্পের বইতে নিধিরাম নামে একজন ভূতের কথা পড়েছিল সে। ভূতেশ স্যার কিছুতেই এ কথা মানবেন না। আত্মারামের কানে কটাং করে একটা চিমটি কেটে বললেন তিনি, 'কদিনের ভূত তুমি হে যে অত লম্বা চওড়া কথা কইছো? ভূতেদের নিয়ম কানুন, আদব কায়দা ঐতিহ্য সম্পর্কে কতটুকু জানো তুমি! এখনও গাল টিপলে মানুষের গন্ধ বেরোয়, আর তুমি এলে কিনা আমায় জ্ঞান দিতে—'

আত্মারাম অপ্রস্তুত ভঙ্গীতে মাথা চুলকোয়। তারপর মিনমিন করে বলে, 'জ্ঞান দেওয়া নয় স্যার, ওই গল্পে পড়েছিলাম একসময়, তাই—'

'গল্পে কিনা হয়,' তাকে থামিয়ে দিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলেন ভূতেশ স্যার, 'গল্প মানেই তো ঝুড়ি-মুড়ি মিথ্যে কথা। আর সে গল্প যদি ভূতের গল্প হয় তাহলে তো কথাই নেই। পড়লে মনে হয় যেন গুলগাপ্পির বান ডেকেছে।'

'কিন্তু স্যার রাম শব্দটা তো সত্যিই উচ্চারণ করতে পারি আমরা—'

'তবু করব না।'

'ক্যানো?'

নিয়ম। ঐতিহ্য। রীতি। তাছাড়া ওই বিটকেল শব্দটুকু বাদ দিলে কী মিষ্টি নাম হয়ে গেল তোমার। আত্মা। আহা আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে কী মানানসই নাম-কাজেই আত্মারাম নয়, আজ থেকে তুমি শুধুই আত্মা।

আত্মা, আত্মা, আত্মা—সারা ক্লাস হই হই করে ডেকে উঠল তার নাম ধরে।

আত্মারাম চুপ করে বসে পড়ল। প্রতিবাদ করার সাহস হল না তার। এমনিতেই সে ভীতু প্রকৃতির। কেউ জোরে হাঁক মারলেই হাড়ে হাড়ে খটখটি লেগে যায় তার। আর ভূতেশ স্যার তো অত্যন্ত রাগী ভূত। পান থেকে চুন খসলেই এমন শাস্তি দেন যে তার চেয়ে আর একবার মরে যাওয়া সহজ। গাছের ডালে বসে পা-টাকে লম্বা করে মাটিতে ঠেকানোর পরীক্ষায় একটা বাচ্ছা-ভূত ফেল করেছিল বলে ভূতেশ স্যার তার একটা পা খুলে রেখে দিয়েছিলেন নিজের কাছে। তিনদিন এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলার পরে নিজের পা ফেরত পেয়েছিল সে। তাছাড়া মাঝে মাঝেই ভূতুড়ে কলা-কৌশল শেখানোর ফাঁকে ফাঁকে ছাত্রদের এমন সব গা ছমছমে মানুষের গল্প শোনান তিনি যে মাথার চুল খাড়া হয়ে ওঠে ভয়ে। একলা পথে বেরোনোই দায় হয় তখন। রাতের আঁধার ফিকে হলেই একটু দূরের ঝাঁ-চকচকে ঘরবাড়িগুলো যেন গিলতে আসে। ভয়ের চোটে ঝুপসি গাছের ডালে, পাতার আড়ালে কিংবা পোড়োবাড়ির আনাচে-কানাচে জমা অন্ধকারের আবডাল ছেড়ে বাইরে বেরোনোর আর সাহস থাকে না। সব সময় ভয়, এই বুঝি মানুষে ধরল।

মানুষে ধরার কথাটা মাথায় এলেই ভয়ে বুক শুকিয়ে যায়। তেমন তেমন মানুষে যদি ধরে তাহলে সত্যি সত্যিই বিপদের একশেষ। মানুষের খপ্পর থেকে মুক্তি পাওয়া সোজা কথা নয়। একবার তাদেরই পাড়ার সিধেসাদা গোছের একজন ভূত বেখেয়ালে এক বেয়াড়া মানুষের পাল্লায় পড়েছিল কয়েকমাস আগে। লোকটা ভয়ানক। মন্ত্র তন্ত্র জানত বিস্তর। বাগে পেয়ে ভূতটাকে কাচের বোতলে পুরে রেল লাইনের পাশে ফেলে দিয়ে এসেছিল সে। ওইটুকু বোতলের মধ্যে কী কষ্টেই যে ছিল সে, শুনতে শুনতে দুঃখে আত্মার চোখে জল এসে গিয়েছিল। ট্রেন যাবার সময় পাথর ঠিকরে এসে বোতলটা ভেঙে গিয়েছিল বলে সে যাত্রা রক্ষে পেয়েছিল ভূতটা।

তার পাড়ার বেচারা ভূতটার কথা ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল আত্মারাম। ভূতেশ স্যারের পড়া আর কানে ঢুকছিল না তার। ভুতেশ স্যার কড়া প্রকৃতির। আত্মার অন্যমনস্কতা তাঁর নজর এড়াল না। রাগে গরগর করতে করতে আত্মরামের দিকে এগিয়ে এলেন তিনি। বজ্রকন্ঠে ডাক ছাড়লেন, 'আত্মা—'

চিন্তা ছুটে গিয়ে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল আত্মারাম।

কোটরে ঢোকা গোল গোল চোখ লাল করে ভূতেশ স্যার জিগ্যেস করলেন, 'কী পড়াচ্ছিলাম বল—'

আত্মারাম চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

'কথার উত্তর দিচ্ছিস না যে বড়? ক্রমশ গলা চড়তে শুরু করল ভূতেশ স্যারের, 'পড়াশুনোর সময় মনটা কোথায় পড়ে থাকে?'

আত্মারামের হাত পা কাঁপতে লাগল। কী শাস্তি যে কপালে আছে এখন তার কে জানে। সারা ক্লাস চুপ। এমন সময় ছুটির ঘণ্টা বাজল ঢং ঢং করে। আত্মারাম চুপি চুপি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। আজ তাহলে বোধহয় বেঁচেই গেল সে।

অন্য ভূতেরা সারি দিয়ে ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হই হই করে। আত্মা তাদের পিছু নিতে যেতেই খপাৎ করে তার বাঁ-হাতটা ধরে ফেললেন ভূতেশ স্যার। কড়া গলায় বললেন, 'চললি কোথায়?'

'আমাদের আর ক্লাস নেই।' আমতা আমতা করে বলে আত্মারাম।

'তোর এখন ছুটি হবে না। দু-ঘণ্টা বসে থাকতে হবে স্কুলে। এই তোর অন্যমনস্কতার শাস্তি।'

মানুষের চেয়ে আত্মারামদের গা-হাত-পা এমনিতেই বেশি ঠান্ডা। এ কথা শুনে তা আরও ঠান্ডা হয়ে গেল। এখন গ্রীষ্মকাল। রাত ছোট। দু-ঘণ্টা স্কুলে আটকে থাকলে রাত প্রায় শেষই হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সূর্যের আলো নেমে আসবে চারধারে। স্কুল থেকে তার বাড়ির পথটাও কম নয়। একা একা ফটফটে আলোয় অতটা পথ যাবে কী করে সে। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল তার। কান্না পেয়ে গেল। ভূতেশ স্যার এসব দেখেও দেখলেন না। দয়ামায়া বরাবরই তাঁর অন্যদের চেয়ে কম। উপায়ন্তর না দেখে ধপাস করে বেঞ্চের ওপর বসে পড়ল আত্মারাম।

আত্মারাম যখন ছুটি পেল শেষমেশ, রাত শেষ হতে খুব বেশি বাকি নেই। আত্মারাম হিসেব কষে দেখল স্কুল থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি পৌঁছতে আজ সূর্যের আলো ফুটে যাবে। বুকটা ধড়াস করে উঠল তার। আজ সঙ্গী-সাথী পাওয়া যাবে না একজনকেও। এতক্ষণে বাড়ি পৌঁছে গাছে-গাছে, হাটে-মাঠে, ভাঙা বাড়ির আনাচে-কানাচে খেলাধুলো সেরে তার বন্ধুরা আস্তানায় ঢুকে পড়েছে। এবার একটু পড়াশুনো। তারপর দিন একটু গভীর হলেই খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুম। আবার ভর-সন্ধেয় ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসা। তারপর স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি। আত্মারামের দু'একজন বন্ধু অবশ্য দিন-জেগে পড়াশুনা করে। ভরদুপুর পর্যন্ত একলা একলা জেগে বসে থাকতেও একটুও ভয় পায় না তারা। আত্মারাম অত সাহসী নয়। দিনের আলোয় গা ছমছম করে তার। আর চোখের সামনে জলজ্যান্ত মানুষ দেখলে হয়ত ভিরমিই খাবে সে ভয়ে।

আত্মারাম স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সোজা পথটা ছেড়ে আজ ঘুরপথ ধরল। যে পথে রোজ বাড়ি ফেরে সে, সে পথটা আগে জঙ্গলে মোড়া ছিল। মানুষজনের যাতায়াত এদিকে ছিল না। ইদানীং জঙ্গল কেটে এখানে একটা চওড়া রাস্তা তৈরি হয়েছে। রাস্তায় গাড়ি চলাচল শুরু হয়নি ঠিকই, কিন্তু অনেক মানুষ আজকাল ভোরবেলা এদিকে হাঁটতে আসে। তাদের মুখোমুখি হতে ইচ্ছে হল না আত্মারামের। যে পথটা সে ধরল আজ, সে পথটা বাস্তবিকই নির্জন। মানুষজনের বসবাস তো নেই-ই, এদিকে লোকজনের আসা যাওয়া নেই, বললেই চলে। তাছাড়া পথের দুপাশটা ভারি মনোরাম। এ পথের দু'ধারে যে মস্ত মস্ত গাছগুলো তার ডালে ডালেই এ অঞ্চলে ভূতেদের সবচেয়ে বড় ও পুরোনো কলোনী। সেই কলোনী পার হলেই পুরোনো পরিত্যক্ত একটা শ্মশান। শ্মশান পেরিয়ে আর একটু এগোলেই রাস্তার দু'পাশে গোরস্থান। তারপরেও অবশ্য বাড়ি পৌঁছনোর আগে অনেকটা পথ তাকে হাঁটতে হবে। তবু আগের পথের চেয়ে এ পথটা তার বেশি নিরাপদ মনে হল। সরু সরু পা চালিয়ে আত্মারাম দ্রুত পথ চলতে শুরু করল।

শ্মশান গোরস্থান পেরিয়ে হরজাই গাছের ঝোপজঙ্গলের পাশ দিয়ে নিরাপদে হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছিল আত্মারাম। মন থেকে মানুষের ভয়টাও ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছিল তার। কিন্তু হঠাৎই ঝুপসি অশ্বত্থ গাছটার পাশ দিয়ে ডানদিকে বাঁক নিতেই বুকের মধ্যেটা ছাঁৎ করে উঠল আত্মারামের। ভয়ে হাড়ে হাড়ে ঠোকাঠুকি শুরু হয়ে গেল তার। উল্টোদিক থেকে লাঠি হাতে ধুতি পাঞ্জাবি পরা যে অবয়বটা ক্রমশ তার দিকে এগিয়ে আসছে সেটা তো কোনো ভূত-প্রেতের শরীর নয়। চোখের সামনে এ যে জলজ্যান্ত মানুষ একটা। খুব বিপদের সময় নিজের শরীরটাকে ভেঙেচুরে বাতাসের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারে আত্মারামেরা। পরে সময় মতন শরীরটাকে আবার গড়ে পিটে তৈরি করে নিতে হয় আগের মতন। এর জন্যে প্রত্যেক ভূতেরই একটা নিজস্ব পাসওয়ার্ড থাকে। চোখের সামনে জলজ্যান্ত মানুষটাকে দেখে আত্মারাম কিছুতেই তার পাসওয়ার্ডটা মনে করতে পারল না। অথচ মানুষটা ক্রমশই এগিয়ে আসছে তার দিকে। উপায়ন্তর না দেখে মানুষের মুখোমুখি হওয়ার বিপদ এড়াতে অশ্বত্থ গাছটার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল আত্মারাম।

ভুবনপুর হাইস্কুলের অঙ্কের মাস্টারমশাই প্রবাল স্যারকে ছাত্ররা চিরকাল আড়ালে আবডালে পাগলস্যার বলে ডাকত। স্কুলের ক্লাসটুকুর বাইরে কিছুতেই তারা প্রবাল স্যারের মুখোমুখি হতে চাইত না। অথচ প্রবাল স্যার মানুষটা খারাপ নন। ছাত্রদের কটুকথা বলা বা মারধর করার পথেও কোনোদিন হাঁটেননি তিনি। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই। সব ছেলেকে অঙ্কে চৌখস করে তুলবেন তিনি। লক্ষ্যটা মহৎ, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু সারাজীবন মাস্টারি করেও একটা ছেলেরও সহযোগিতা পাননি তিনি এ বিষয়ে। অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে নিজের উদ্যোগে কিছু ছেলেকে বাড়িতে ডেকে নিয়েছেন তিনি মাঝে মাঝে। তাদের যত্ন-আত্তি, খাওয়া দাওয়ার বন্দোবস্ত করেছেন, তাঁর কাছে এসে ভালোভাবে অঙ্ক কষার জন্য চকোলেট -চিপস এর টোপ দিয়েছেন তিনি বহুবার, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। দু'দিনের বেশি কোনো ছেলেকেই তাঁর বাড়িমুখো করা যায়নি। যতদিন স্কুলে ছিলেন, প্রবাল স্যারের ছিল অঙ্কের পাগলামি। স্কুল থেকে রিটায়ার করার পর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিবেশ সুরক্ষার পাগলামি। পথেঘাটে ছেলে বুড়ো যাদের সঙ্গেই দেখা হোক প্রবাল স্যার পাকড়াও করেন তাদের, চলো গ্রামের পথের দু'পাশে গাছ লাগাই, এসো পচা ড্রেনগুলোকে সাফ সুতরো করি, কিংবা পুকুরগুলোকে সংস্কার করি সবাই মিলে। এসব কাজে খুব বেশি লোক কখনই পাওয়া যায় না। প্রবাল স্যার একজনকেও পেলেন না। শেষমেশ তো প্রবাল স্যারের মুখোমুখি পড়লে নানান ব্যস্ততার অজুহাতে সরে পড়ত সবাই। কেউ বলত, হাঁড়িতে জল চেপে গেছে, এক্ষুনি চাল না আনলেই নয়, কারো মনে পড়ে যেত কোন দোকানে ছাতা ফেলে এসেছে, কেউ জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বলত, 'স্যার, আপনার সাথে কথা বলতে যে কী ভালো লাগে অথচ উপায় নেই, আত্মীয়-কুটুম্বে বাড়ি ভরে আছে, এক্ষুনি না গেলেই নয়—' প্রবাল স্যার আজকাল আর কারো ওপরেই ভরসা করতে পারেন না। গ্রামের মানুষগুলোর দিকে তাকাল মনখারাপ লাগে। এত কর্মব্যস্ত সবাই, অথচ সে কাজের সিকিভাগও সামনের দিনগুলোকে সুন্দর করার তাগিদ থেকে নয়। চোখের সামনে মানুষগুলো যেন যন্ত্র হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন।

মনের দুঃখে লোক লস্কর এড়িয়েই থাকেন এখন প্রবালবাবু। গ্রামের একপ্রান্তে একটেরে হয়ে দিন কাটান একলা একলা। দোকান-বাজার যাওয়ার প্রয়োজন ছাড়া মানুষজনের ডাকে আর বেরোন না। ভোরবেলা হাঁটতে বেরোনোর অভ্যাসটা বহুদিনের। সেটা আর ছাড়তে পারেননি। ভালো করে আলো ফোটার আগেই বেরিয়ে পড়েন বাড়ি থেকে। একলা একলাই হাঁটেন শ্মশানঘাট, কবরস্থানের পাশের নির্জন রাস্তা ধরে। গাছপালা দেখেন। আকাশ দেখেন। মাঝে মাঝে মাথার ওপর দিয়ে কলরব করতে করতে পাখির ঝাঁক উড়ে যায়। প্রবালবাবু তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকেন তাদের দিকে। মনে হয় এরাই যেন প্রকৃত বন্ধু তাঁর। একেকদিন একলা হাঁটতে হাঁটতে ভারি অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি হয়। মনে হয় গাছপালার আড়ালে আড়ালে কারা যেন ফিস ফিস করে কথা কইছে। আগে সেই ফিসফাস শুনে তিনি চমকে উঠতেন। ভয় পেতেন। আজকাল আর গা ছমছম করে না। কাঁটা দেয় না গায়ে। ব্যাপারটা বেশ গা সওয়া হয়ে গেছে।

আজ ঘুমটা একটু তাড়াতাড়িই ভেঙে গিয়েছিল। কাজেই তাড়াতাড়িই হাঁটতে বেরিয়েছিলেন আজ প্রবাল স্যার। বেশ কিছুটা হাঁটার পর অশ্বত্থতলার কাছাকাছি আসতেই সামনে তাকিয়ে ভারী অবাক হয়ে গেলেন তিনি। একটা রোগা পটকা ছেলে একা একা হেঁটে আসছে হনহন করে। এদিকে মানুষজন বড় আসেনা। এসব জায়গার বেশ বদনামই আছে গ্রামেগঞ্জে। ভূতপ্রেতের নাকি আখড়া এই অঞ্চলে। ছেলেটার সাহস আছে বলতে হবে। তাছাড়া স্বাস্থ্য সম্পর্কেও সচেতনতা আছে। আলস্য নেই। ভোররাতে উঠে হাঁটতে বেরিয়েছে একা একা। প্রবালবাবু মনে মনে বেশ খুশি হলেন। ছেলেটার সঙ্গে আলাপ করা দরকার। এমন ছেলেই তো চাই তাঁর, দু-চার কদম এগোতেই ছেলেটা মুখ তুলে একবার চাইল তাঁর দিকে। তারপরেই সাঁৎ করে অশ্বত্থ গাছটার পিছন দিকে লুকিয়ে পড়ল তাঁর নজর এড়াতে।

ছেলেপুলেরা তাঁকে দেখে লুকিয়ে পড়ছে এমন ঘটনা প্রবালবাবুর কাছে নতুন নয়। বরং এমন ঘটনা দেখতে দেখতেই বছরের পর বছর কাটিয়ে দিলেন তিনি। কিন্তু আজ, ছেলেটার লুকিয়ে পড়ার ধরনটা ক্যামন যেন অন্যরকম লাগল তাঁর। অন্যেরা তাঁকে এড়িয়ে যাবার জন্যে লুকোয়, কিন্তু এ ছেলেটার চোখেমুখে যেন অন্য একধরনের আতঙ্ক দেখলেন আজ। ভারি চিন্তায় পড়ে গেলেন প্রবাল স্যার। তাঁর সান্নিধ্য কি সত্যিই এমনই ভয়ঙ্কর, নাকি তাঁর চেহারাটার মধ্যেই—

কী হল কে জানে, আজ প্রবালবাবুর মনে জেদ চেপে গেল। ব্যাপারটা খতিয়ে দেখা দরকার। ধুতির কোঁচাটা হাতে ধরে দৃপ্ত পায়ে অশ্বত্থ গাছটার দিকে এগোতে লাগলেন তিনি।

আত্মারাম অশ্বত্থ গাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে থর থর করে কাঁপছিল। মানুষেরা ভূতের ভয়ে অনেকসময় ভগবানকে ডাকে। কিন্তু ভূতেরা মানুষের ভয়ে কাকে ডাকবে? আত্মারাম এই ঘোর বিপদে কোনো উদ্ধারকারীর নাম মনে করতে পারল না। তার ঘাম হতে লাগল। কান্না ঠেলে উঠতে লাগল বুকের মধ্যে। সাধারণত ভূতেদের ঘাম হয় না, কাঁদেও না তারা চট করে। ছোটবেলায় আত্মারামের একবার এমনটা হয়েছিল। পাড়ার মাতব্বর ভূতেরা বলেছিল, ছেলেটার বাতাস লেগেছে। মানুষের বাতাস। ভালো করে ঝাড়াতে হবে ওকে। তারপর একটা চিমড়ে মতন ভূত এসে খুব মারধর করেছিল তাকে শেওড়াগাছের ডাল দিয়ে। ভয়ে আত্মারামের বুক শুকিয়ে গেল। এবারে কী হবে কে জানে। ধরতে পারলে তাকেও নিশ্চয়ই বোতলে পুরে ফেলবে লোকটা। অশ্বত্থগাছের গোড়ায় ঝুপসিমতন যে আসশ্যাওড়ার ঝোপটা, তার মধ্যে ঢুকে বসে পড়ল আত্মারাম।

অশ্বত্থগাছের কাছে এসে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন প্রবালবাবু। ছেলেটা গেল কোথায়? তাঁকে দেখে হাওয়া হয়ে গেল নাকি? হঠাৎ সামনের আসশ্যাওড়ার ঝোপটা সামান্য নড়ে উঠতেই সেদিকে চোখ গেল প্রবালবাবুর। আর তখুনি ছেলেটাকে দেখতে পেলেন তিনি। তাঁর নজর এড়াতে ছোঁড়াটা ঝোপের মধ্যে ঘাড় গুঁজে বসে আছে চুপটি করে। এতক্ষণে আর একটা সম্ভাবনার কথাও উঁকি মারল তাঁর মনে। ছেলেটা ছিঁচকে চোর-টোর নয়তো? তা নাহলে তাঁকে দেখে এমন মরিয়া চেষ্টা কেন লুকোনোর! তাছাড়া এই নির্জন পথে তো সাধারণ মানুষজন বড় একটা আসে না!

প্রবালবাবু ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়লেন, 'এই ছেলে বেরিয়ে আয় ঝোপ থেকে।'

আত্মারাম ইতস্তত করতে লাগল।

প্রবালবাবু আবার বললেন, 'বেরিয়ে আয় বলছি—'

আত্মারাম ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে প্রবালবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল ঠকঠক করে।

প্রবালবাবু ছেলেটাকে আপাদমস্তক দেখলেন। কালচে রঙ। রোগা হাড়গিলে চেহারা। দেখলেই মনে হয় ভালো করে খাওয়া জোটেনি অনেকদিন। মনটা নরম হয়ে গেল তাঁর। একটু নীচু গলায় খানিকটা প্রশ্রয়ের সুরে জিগ্যেস করলেন তিনি, 'চুরি-চামারি করিস বুঝি?'

হঠাৎ অ্যামন প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে গেল আত্মারাম। তবে মুখে কথা না বললেও প্রত্যয়ের সঙ্গে ঘন ঘন দু'দিকে মাথা নাড়াতে লাগল সে।

প্রবাল স্যার খুশি হলেন। ছেলেটার সঙ্গে যেহেতু ব্যাগ বা পুঁটলি টুটলি নেই, সে সত্যি কথা বলছে বলেই মনে হয় তাঁর। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললেন তিনি, 'হাঁটতে বেরিয়েছিলি বুঝি?'

ছেলেটা আবার দুদিকে মাথা নাড়াল।

'তবে?' প্রবালবাবু অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন।

'আমি বাড়ি যাচ্ছিলাম—' কাঁপা কাঁপা রিনরিনে গলায় উত্তর দিল আত্মারাম।

'এত সকালে গিয়েছিলি কোথায়?'

'স্কুলে—'

'অ্যাঁ—বলিস কী—রাত-বিরেতে স্কুল? তুই কি ইয়ার্কি মারছিস নাকি আমার সঙ্গে?

'উঁহ—' আবার দু'দিকে মাথা নাড়ায় আত্মারাম।

প্রবালবাবু অবাক চোখে ছেলেটাকে জরিপ করেন খানিক। রোগা, গোবেচারা চেহারা। মিথ্যে বলছে বলে মনে হয় না। অথচ—ছেলেটাকে ঘিরে ক্যামন যেন একটু রহস্যের গন্ধ পান প্রবালবাবু। ওর আর একটু কাছে এগিয়ে এসে জিগ্যেস করেন, 'তোর বাড়ি কোথায়?'

'ওই দিকে' হাত উঁচু করে একদিকে দেখায় আত্মারাম। প্রবালবাবু ধন্দে পড়লেন। 'ওদিকটা তো বাড়িঘর আছে বলে জানা নেই রে—' চুপ করে থাকে আত্মারাম।

প্রবালবাবু আবার বলেন, 'বাড়িতে আর কে আছে তোর, মা, বাবা ভাই বোন—'

'কেউ নেই।'

'কেউ নেই?'

'আমাদের কেউ থাকে না। আমরা সকলেই একা একা—'

ছেলেটার কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না প্রবাল স্যার। তবে এটুকু বুঝতে পারেন যে তাঁরই মতন এ ছেলেটারও তিনকূলে কেউ নেই। ছেলেটার জন্যে ভারি মায়া হয় তাঁর। স্নেহমাখা গলায় তিনি বলেন, 'কিছু খেয়েছিস সকাল থেকে?'

'উঁহু—'

তবে চল আমার সঙ্গে—' বলে খপ করে ছেলেটার ডানহাতের কব্জিটা চেপে ধরেন প্রবাল স্যার। ছেলেটার হাত ঠান্ডা। কব্জিটাও বেশ সরু।

আত্মারাম ভয়ে কুঁকড়ে গেল। তার কপালে যে কী আছে কে জানে। শরীর আনচান করতে লাগল তার। নেহাত ভূতেরা অজ্ঞান হতে জানে না। নাহলে কবেই ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেত আত্মারাম। মানুষটার হাত থেকে আর নিস্তার নেই বুঝতে পেরে ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করল সে, 'কোথায় যাব আমি?'

'আমার বাড়ি।'

'ক্যনো?'

'আমার সাথে থাকবি খাবি—'

'ক্যানো?'

'আমি তোকে অঙ্ক শেখাবো—'

'অ্যাঁ—'

'হ্যাঁ। অঙ্ক শিখবি, মানুষ হবি।'

'মানুষ হতে হবে আমায়?' আঁৎকে উঠে বলে আত্মারাম।

'আলবাৎ। তারপর দু'জনে মিলে দেখিয়ে দেব যে সদিচ্ছে থাকলে দু'জনে মিলেই কাজ করে দেখিয়ে দেওয়া যায়—'

'কী কাজ?'

'ভালো কাজ—আমরা রাস্তার আবর্জনা সাফ করবো, পুকুরগুলো পরিস্কার করব, গাছ লাগাব, মাটি কেটে নদীতে বাঁধ দেব—' বলতে বলতে চোখ চকচক করে ওঠে প্রবাল স্যারের। আত্মারাম এসব কথায় একটুও খুশি হয়না। তবে প্রতিরোধও তৈরি করতে পারে না নিজেকে বাঁচানোর জন্যে। প্রায় সম্মোহিতের মতন এক বুক ধুকপুকুনি নিয়ে বাধ্য ছেলের মতন সে হাঁটতে থাকে প্রবাল স্যারের পিছু পিছু।

ভূতেদের সত্যিকারের মা-বাবা দাদা-দিদি কাকা-পিসি মামা-মাসি কিছুই হয়না। আসলে হঠাৎ করেই তো একদিন মানুষ থেকে ভূত হয়ে যায় তারা। সত্যিকারের আত্মীয়স্বজন তখন অনেক দূরে সরে যায়। মরার আগে যে ছিল হয়ত হরিহর আত্মা, জীবনের সুতোটা ছিঁড়ে গেলেই তাকে আর আপনজন বলে ভাবা যায় না। বরং তাকে দেখে গা ছমছম করে তখন। হঠাৎ চোখের সামনে পড়ে গেলে আঁৎকে উঠতে হয় ভয়ে। আর বেঁচে থাকতে যাদের কথা ভাবলে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যেত, মরার পরে তারাই সব নিকটজন, আত্মীয়-বন্ধু। এমনই সব হঠাৎ পাওয়া নিকটজনের সঙ্গে বাস করত আত্মারাম। তাদের অনেকেই বেশ বয়োজ্যোষ্ঠ, আবার কেউ কেউ তার সমবয়েসি, সহপাঠী। সাধারণত রাত গড়িয়ে ভোর নামার অনেক আগেই ফিরে আসে আত্মারাম। আজ সে ফিরল না। অন্য ছেলে ছোকরারা ফিরে এসে বলেছিল বটে যে ভূতেশ স্যার শাস্তি দিয়ে স্কুলের শেষে আটকে রেখেছেন তাকে, তবুও এতটা দেরি হবার তো কথা নয়। রাত গড়িয়ে ভোর হয়ে গেল। ভোর গড়িয়ে সকাল। এলাকার অন্য ভূতেরা চিন্তায় পড়ে গেল খুব। আত্মারাম এমনিতেই ভীতু। মানুষের ভয়ে অস্থির। তার ওপর চারদিকে এমন বিচ্ছিরি ফটফটে আলো বেরিয়ে গেল। সত্যি সত্যিই কেনো বদ মানুষের পাল্লায় পড়ে গেল না তো ছেলেটা? বেশ সাহসি ভূতেদের একটা দল এই দিনেদুপুরেই আত্মারামকে খুঁজতে বেরোবে বলে ঠিক করল। তবে বয়স্করা বললেন, বেলা একটু পড়লেই বরং মানুষের সমাজে ঢোকা উচিত। আলো মরে গেলে মানুষেরা মনের দিক দিয়ে দুর্বল থাকে। আমাদের তখন কাজে কর্মে সুবিধা হয় একটু।'

অতএব দিন ফুরিয়ে সন্ধে নামতে না নামতেই আত্মারামের খোঁজ তল্লাশ শুরু হল। মন্দির-মসজিদ, রেললাইন, পাকারাস্তা সর্বত্র তার খোঁজ করে বেড়াতে লাগল প্রতিবেশী ভূতেরা।

ভূতনাথ মাত্র ক'দিন হল ভূত হয়ে এসেছে এ তল্লাটে। তবে অল্প কদিনেই বেশ নাম করে ফেলেছে এলাকায়। এমনিতেই ডাকাবুকো চেহারা তার। মানুষ-টানুষে ভয়-ভীতি নেই একটুও। তাছাড়া কিছুদিন আগে পাশের পাড়ার এক উঠতি তান্ত্রিককে এমন ভয় দেখিয়েছিল সে যে তান্ত্রিক বাবাজি একেবারে গ্রাম ছাড়া। সেই থেকে এলাকায় ছেলে-ছোকরা ভূতেরা তাকে খুব সম্ভ্রমের চোখে দেখে। আত্মারামও খুব ভক্ত হয়ে পড়েছিল তার অল্পদিনের মধ্যেই। প্রায়ই তাকে দুঃখ করে বলত ছেলেটা, 'ভুতনাথদা, আমিও যদি তোমার মতন সাহসি হতাম, বড় ভালো হত তাহলে।'

'কী করতিস?' হেসে বলে ভূতনাথ।

'দিনের পৃ,থিবীটাকেও ভালো করে দেখতে পারতাম—'

'দেখে কী হত—'

'জানি না। তবে আমার খুব কৌতূহল।'

'ক্যানো?'

'আমার না খুব শখ একবার মানুষের মুখোমুখি হতে—'

'হ না। আটকাচ্ছে কে?'

'কিন্তু আমি যে বড় ভীতু ভূতনাথ দা—'

'তা বললে তো চলবে না—ভালো ভূত হতে গেলে অত মানুষের ভয় করলে কি চলে? বলে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল ভূতনাথ।

অন্ধকারের সাথে মিশে হাওয়ার মতন মিহি শরীর নিয়ে পথ চলছিল ভূতনাথ। আত্মারামের জন্যে মনটা বড় খারাপ লাগছিল তার। ছেলেটা বড় ভালো। বড় সরল। মনটাও খুব নরম। সত্যি সত্যি কোনো বদ মানুষের পাল্লায় পড়লে বিপদে পড়ে যাবে ছেলেটা। আত্মারামের কথা ভাবতে ভাবতেই ঝুপসি অশ্বত্থ গাছটা পেরিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে সোজা হাঁটতে থাকে ভূতনাথ। হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশ এসে পড়ে গ্রামের প্রান্ত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছোট্ট বাড়ির সামনে। কী ভেবে পায়ে পায়ে বাড়িটার একটু কাছে এগিয়ে যেতেই চেনা-চেনা ভূত-ভূত গন্ধটা নাকে এসে লাগে ভূতনাথের। হাওয়ায় শরীরটাকে ভাসিয়ে দিয়ে সাঁৎ করে বাড়িটার একটা খোলা জানলার পাশে চলে আসে সে। তারপর চোখ রাখে বাড়ির ভেতরে। আর তখনই আত্মারামকে দেখতে পেয়ে যায় ভূতনাথ। ঘরের মেঝের ওপর মাদুর পেতে বসে মাথা নীচু করে কাগজ কলম নিয়ে একমনে কী সব লিখছে সে। বিস্মিত ভূতনাথ জানলা গলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। আর ঢুকে পড়তেই প্রবাল স্যারের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল তার।

প্রবাল স্যারের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে এসে পৌঁছনোর পর প্রথমটা বেশ ভয়ে ভয়েই ছিল আত্মারাম। মানুষটার কী মতলব কে জানে। সত্যি সত্যিই এ মানুষটা তাকে বোতলের মধ্যে ঢোকানোর চেষ্টা করবে নাকি? আত্মারাম ঘরের চারদিকে সন্ধানী দৃষ্টি বোলাতে লাগল। তেমন কোনো খালি বোতল টোতল অবশ্য নজরে পড়ল না তার। প্রবাল স্যারের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর মানুষ সম্পর্কে ভয়টাও যেন ক্রমশ ফিকে হয়ে এল। আত্মারাম মনে মনে বেশ ভালোই বেসে ফেলল মানুষটাকে। আর ভালোবাসতে পেরে মনটা এমনই খুশি খুশি হয়ে উঠল যে তার আবার আফশোসও হল। ভূতসমাজের আদব-কায়দা মানতে মানতে ভালোবাসায় যে এমন সুখ তা তারা ভুলেই গেছে। বেলা একটু ঘন হতে চোখের পাতা বুজে আসছিল তার। আসলে দিন জাগার অভ্যাস তো বড় একটা নেই তার। শেষমেশ মাদুরের ওপর শুয়ে বেশ খানিকক্ষণ ঘুমিয়েই নিল আত্মারাম। প্রবাল স্যারই বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে বলে ডেকে তুললেন তাকে। ধড়মড় করে মাদুরের ওপর উঠে বসে দু-হাতে চোখ রগড়াতে লাগল আত্মারাম।

প্রবাল স্যার ভারি স্নেহের সঙ্গে বললেন, 'সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমোলে হবে, বেলা পড়ে আসছে, খাবি কখন, ওঠ দুটো মুখে দে। এরপরে খেলে যে শরীর খারাপ করবে—'

আত্মারাম হাসে। বলে, 'এসময় তো খাই না আমরা—'

'জানি বাপু জানি,' প্রবাল স্যার বলেন, 'এত বেলায় কি কেউ খায়, কিন্তু এমন ঘুম ঘুমোচ্ছিলি তুই যে আমার মায়া হল—'

আত্মারাম খাবার-দাবারগুলো দেখছিল। এসব খাবার তাদের সমাজে অচল। কেমন খেতে হবে কে জানে। দোনামনা করে খাবারের থেকে একটু তুলে নিয়ে মুখে দিল সে। স্বাদটা মন্দ লাগল না। বরং তাদের খাবার-দাবারের থেকে এগুলো যেন আরো বেশি সুস্বাদু ঠেকল তার মুখে। মনের আনন্দে পেট ভরে খেয়ে নিল আত্মারাম।

দিনের আলো নিভতেই প্রবাল স্যার বললেন, 'এবার পড়তে বোস। কাকভোরে আর ভরসন্ধেয় পড়াশোনায় মন বসে ভালো। এজন্যে এই সময়টা নষ্ট করতে নেই—'

আত্মারাম বাধ্য ছাত্রের মতন পড়তে বসে গেল তাঁর কাছে।

প্রবাল স্যার বললেন, 'এতক্ষণে নামটাই তো জানা হয়নি তোর—'

'আমার নাম আত্মারাম—'

'বেশ নাম।'

আত্মারাম খুশি হয়। ভূতেশ স্যারের মতন এই মানুষটার নাম নিয়ে তেমন ওজর আপত্তি নেই। তাছাড়া আত্মার চেয়ে আত্মারাম নামটাই বেশি পছন্দ তার।

'সরল করতে পারিস? প্রবাল স্যার জিগ্যেস করলেন।

'আজ্ঞে না—' লাজুক, মুখে জবাব দেয় আত্মারাম।

'ল.সা.গু—গ.সা.গু?'

'উঁহু—'

'সমীকরণ, ফ্যাক্টর?'

'নাঃ—'

' সে কি কথা রে—' হতাশ গলায় বলেন প্রবালস্যার, ' তোদের স্কুলে অঙ্ক শেখায় না?'

'না।'

'শেখায়টা কি তাহলে সেখানে?'

'গাছে ঝুলে থাকা, হাত পা লম্বা করা, বিপদে আপদে শরীর হালকা করে বাতাসে মিশে যাওয়া, তাছাড়া মানুষকে ভয় দেখানোর নানারকম কলা-কৌশল—'

'তুই কি ইয়ার্কি করছিস আমার সঙ্গে?'

'আজ্ঞে না—'

'তবে—'

'সত্যিই এসব শেখানো হয় আমাদের স্কুলে। ভূতেশ স্যার খুব কড়া। একটু ফাঁকিবাজি করলেই কড়া শাস্তি—'

'ছি ছি ছি—' হতাশ গলায় বলেন প্রবালস্যার।

'কী হল?' অবাক হয়ে বলে আত্মারাম।

'আমার লজ্জা করছে—'

'ক্যানো?'

'আমিও যে শিক্ষক—ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে আমার যে এ কালেও কোনো কোনো স্কুলে এইসব ফালতু কাজে সময় নষ্ট হচ্ছে আসল পড়াশুনা শিকেয় তুলে—এসব চললে তোরা সব মানুষ হবি কী করে?'

'মানুষ হব?' ভয় পাওয়া গলায় ঢোক গিলে বলে আত্মারাম।

'আলবাৎ—'

'কিন্তু—'

'আবার কিন্তু কী—ওসব কিন্তু —টিন্তুতে কনফিডেন্স কমে যায়—'

'আমাদের মানুষ হওয়া পাপ, ওসব ভাবতে নেই আমাদের।'

'মানে?'

'আমরা একসময় মানুষ ছিলাম, এখন আর নেই। আমরা এখন আত্মা, মানে ভূত—'

'যাঃ—'

'সত্যি।'

'বিশ্বাস করতে পারছি না।'

'আচ্ছা দেখুন' বলে, হাতটাকে লম্বা করে দেয় আত্মারাম, মাথাটাকে বনবন করে দুপাক ঘুরিয়ে নেয় ঘাড়ের ওপর, অদৃশ্য হবার পাসওয়ার্ডটা মনে পড়তে একটুক্ষণ অদৃশ্য হয়েও দেখিয়ে দেয় প্রবাল স্যারকে।

প্রবাল স্যারের হাঁ মুখটা বুজতে একটু সময় লাগে। গা-টা একটু শিরশিরও করে ওঠে প্রথম চোটে। তবে একটুক্ষণের মধ্যেই ধাতস্থ হন তিনি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগতোক্তি করলেন, তিনি, 'এই বরং ভালো হল—'

'কী', ভয়ে ভয়ে বলে আত্মারাম, 'আমাকে বোতলে পুরে বন্দী করে রাখবেন নাকি?'

'দুর বোকা। ভূত মানে তো অতীত। অতীতকে বন্দী করতে আছে কখনও—বরং অতীতকে মর্যাদা দিয়েই তো বর্তমানের ভিত গড়তে হয়,' একগাল হেসে বলেন প্রবাল স্যার। ছেলেগুলোকে তো মানুষের মত মানুষ বানাতে পারলাম না, আমার কাছেই তো ঘেঁষতে চায় না ওরা। না শিখল অঙ্ক, না করল সমাজের কাজ। দরকার নেই। তোকেই বরং সব দিই। খেটেখুটে সত্যি সত্যি একটা ভূতের মতন ভূত হ দিকিনি দেখি বাবা—' খাতা কলম নিয়ে মাদুরে বসে অঙ্ক শিখতে শুরু করল আত্মারাম। প্রবাল স্যার বললেন, 'শোন একেবারে শুরু থেকে শেখানো শুরু করি তোকে। সবসময় মনে রাখবি জগতে যা কিছু ঘটে, সবকিছুর পিছনেই কিছু নির্দিষ্ট অঙ্ক থাকে, ক্যালকুলেশন বুঝলি—এই ধর তোর গাছে ঝুলে থাকা, তার জন্যেও ক্যালকুলেশন—কত ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঝুলবে শরীর, কত মিনিট পর পর টনটন করতে পারে হাত—'

আত্মারামের মন্দ লাগাছিল না। অন্তত ভূতেশ স্যারের ক্লাশের থেকে এই পড়াশুনাটা অনেক সহজ ও মনোগ্রাহী। প্রাথমিক অমনোযোগিতাটুকু কেটে যেতেই অঙ্কের মধ্যে একেবারে ডুবে গেল আত্মারাম।

কতক্ষণ এভাবে কাটল কে জানে। হঠাৎই একটা খুব পরিচিত ভূত ভূত গন্ধ নাকে এল তার। গন্ধটা বেশ চেনা। অঙ্ক থেকে মনটা বাইরে বেরিয়ে এল আত্মারামের। খাতা থেকে মাথা তুলল সে। আর তখনি দেখতে পেল ভূতনাথদাকে। শরীরটাকে সরু করে জানলা গলে ঘরের মধ্যে এসে নামল ভূতনাথদা।

ভূতনাথকে দেখে প্রথমটা আনন্দই হয়েছিল আত্মারামের। বিপদের মধ্যে হঠাৎ প্রিয়জনকে দেখলে যা হয়। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই আনন্দটা ফিকে হয়ে এল আত্মারামের। ভূতনাথদা বড় ভয়ঙ্কর ভূত। মানুষকে ভয় পাইয়ে দেবার দেদার কলা-কৌশল আয়ত্তে আছে তার। এমনকি মানুষের ঘাড়ে-টাড়েও চেপে পড়তে পারে সে। প্রবালস্যারের জন্যে ভারী দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ল সে। মানুষটাকে মনে মনে বেশ ভালোবেসে ফেলেছে আত্মারাম। আত্মভোলা অঙ্ক-পাগল মানুষটার যদি ভূতনাথদার সামনে পড়ে কোনো বিপদ ঘটে এই আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠল তার।

তার থেকে একটু তফাতে একটা চেয়ার নিয়ে বসে আছেন প্রবালস্যার। আত্মারাম আড়চোখে দেখল চেয়ারে বসা প্রবাল স্যার মাথা তুলে সোজা চোখে তাকালেন ভূতনাথদার দিকে।

জানলা গলে ঘরে ঢোকার সময় মনটাকে বেশ শক্ত করে নিয়েছিল ভূতনাথ। ঠিক করেই ফেলেছিল, আত্মারামের মতন এমন নিষ্পাপ গোবেচারা গোছের একটা পুচকে ভূতকে যে মানুষ অপহরণ করে এনে আটকে রাখে নিজের বাড়িতে তার উচিত শিক্ষা পাওয়া উচিত। কিন্তু ঘরে ঢোকার পরেই ক্যামন যেন হতোদ্দম হয়ে গেল সে। আত্মারামকে দেখে একটুও মনে হল না যে সে কষ্টে আছে। বরং তাকে দেখে বেশ খুশি খুশিই মনে হল তার। ঘরের চারদিকে সাবধানী দৃষ্টি বোলাতে-বোলাতে হঠাৎই ভূতনাথের চোখ পড়ল চেয়ারে বসা মানুষটার দিকে, আর মানুষটার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল সে। সেই রাগ রাগ মারকাটারি ভাবটা হারিয়ে গিয়ে হঠাৎ করেই ক্যামন যেন একেবারে মিইয়ে গেল সে। লোকটা যে আর কেউ নয়, স্বয়ং প্রবাল স্যার। অঙ্ক-পাগল মানুষটা একসময় তাকে অঙ্ক শেখানোর জন্যে কী চেষ্টাই না করেছিলেন। ভূতনাথ শেখেনি অবশ্য কিছুই। শেখার ইচ্ছেও বড় একটা ছিলনা তার। মাধ্যমিক পরীক্ষায় যা হবার তাই হল, অঙ্কে ডাহা ফেল। পড়াশুনো বেশিদূর এগোয়নি আর ভূতনাথের। রুজি-রুটির চেষ্টাতেও তেমন একটা সুবিধা হল না। পথে পথে কাজ খুঁজে বেড়াতো সে মাসের পর মাস। তারপর একদিন বাসের ধাক্কায়—

আজ প্রবাল স্যারকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে ভারী লজ্জা লাগছিল তার। ছোটবেলায় মানুষটার কথা শুনলে বেঁচে থাকাটা হয়তো অন্যরকম হতে পারত। এই সময়েই প্রবালবাবুর নজর পড়ল তার দিকে। চোখ সরু করে একটুক্ষণ তিনি তাকিয়ে রইলেন ভূতনাথের দিকে। তারপর বিস্মিতকণ্ঠে বলে উঠলেন, 'তুই পুবপাড়ার ভূতনাথ না?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ। বিনীতভাবে জবাব দেয় ভূতনাথ।

'তুই না সেই বাসের ধাক্কায়—' চোখ গোল গোল করে বলে ওঠেন প্রবাল স্যার।

'হ্যাঁ স্যার। বছর সাতেক হল প্রায়।' মাথা নীচু করে বলে ভূতনাথ।

'হ্যাঁ তা তো হবেই, আনমনে বলেন প্রবাল স্যার, 'শুনে মনটা বড্ড খারাপ হয়েছিল রে,' গাঢ় গলায় বলে চলেন তিনি। 'আজ এতদিন পরে তোকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে যে কী ভালো লাগছে, আসলে শুধুই তো ছাত্র নোস, তোরা তো আমার সন্তানও—'

এমন হবার কথা নয়, তবু আজ বুকের ভেতরটায় ক্যামন যেন তোলপাড় হচ্ছিল ভূতনাথের। এতদিন মানুষকে ভয় দেখিয়ে আনন্দ পেত সে, আজ যেন তার মানুষকে বড় ভালোবাসতে ইচ্ছে করল। অদ্ভুতভাবেই, প্রবাল স্যার তাকে দেখেও যে ভয় পেলেন না এতে ভারি স্বস্তিবোধ করল সে।

আত্মারাম এতক্ষণ অবাক হয়ে দেখছিল সবকিছু। এবার বলে উঠল নীচুগলায়, 'ভূতনাথদা, তুমি কি আমাকে খুঁজতে এসেছিলে এখানে?'

'হ্যাঁ।' মাথা নাড়ে ভূতনাথ, 'কিন্তু এখানে এসে কী যে হল, তোকে নিয়ে যাবার কথা মনেই ছিল না আর—' লাজুক গলায় বলে ভূতনাথ।

একটুক্ষণ চুপ করে থাকে আত্মারাম। তারপর আব্দেরে গলায় বলে, 'আমার যে আর ফিরে যেতে ইচ্ছেই করছে না ভূতনাথদা—'

'আমারও—'

'তাহলে চলো না এখানেই স্যারের সঙ্গে থেকে যাই আমরা। তাঁর হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করি একসঙ্গে, পড়াশোনা শিখি—'

'সত্যি থাকবি?' উজ্জ্বল মুখে বলে ওঠেন প্রবাল স্যার, মানুষগুলোকে কত খোশামোদ করলাম। কাজ তো তেমন হল না। শুধু মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে না থেকে আয় বরং ভূতে-মানুষে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে কাজ করি। তাক লাগিয়ে দিই সকলকে। একদম নতুন একটা জগৎ গড়ে তুলব সবাই মিলে। কী রে রাজি?'

আত্মারাম বলল, 'রাজি।'

ভূতনাথ বলল, 'রাজি।'

পুরো ভুবনপুর জুড়েই হই চই পড়ে গেছে এখন। যারা আগে প্রবাল স্যারকে পাগলস্যার বলত, তারা এখন তাঁকে দেখলে নিজে থেকে এসে কথা বলে, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে পথে-ঘাটে। প্রথম প্রথম খবর রটেছিল গাঁয়ের লোককে না পেয়ে ভিন গাঁ থেকে লোক এনে রাস্তা ঘাট পুকুর আগাছা সাফ-সুতরো করাচ্ছেন প্রবাল-স্যার। প্রথমটা গা না করলেও ক্রমশ সকলেরই মনে হল যে কাজগুলো মন্দ তো নয়ই, বরং জরুরি। তাছাড়া চক্ষুলজ্জা বলেও একটা বস্তু আছে। কাজেই একজন দু'জন করে ক্রমশই তাঁর সহযোগী বাড়তে লাগল। এখন গ্রামের সকলেই এ ব্যাপারে স্বতস্ফুর্ত। একথাও অজানা নয় যে গ্রামের লোকের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যে অচেনা লোকগুলো কাজ করে নিত্যদিন তাদের বেশিরভাগই মানুষ নয়। বুড়ো চৌকিদার রামপদর খবর অনুযায়ী সপ্তায় অন্তত তিনদিন রাতদুপুরে প্রবালস্যার গ্রামের ও প্রান্তের জঙ্গলে ভূতেদের ইস্কুলে নাকি পড়াতে যান। সন্ধের পর দু-চারটে ছেলে ছোকরা ভূত আজকাল তাঁর কাছে অঙ্কের টিউশন নিতে আসে। বিনা বেতনে তিনি অঙ্ক শেখান তাদের। এমনকী ভুবনপুরের স্কুল পড়ুয়ারাও তাঁকে আর তেমন ভয়-টয় পাচ্ছে না। পাটিগণিতের সুদকষা কিংবা বীজগণিতের ফ্যাক্টর অথবা জ্যামিতির এক্সট্রা আটকালে তারাও আজকাল ছুটছে প্রবাল স্যারের কাছেই।

অধ্যায় ২১ / ২১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%