একটু অন্তত ভয় পাওয়ান

জয়দীপ চক্রবর্তী

ছেলেগুলো যেদিন আমন্ত্রণ জানাতে এসেছিল সেদিনই বলে রেখেছিলেন প্রাণকৃষ্ণবাবু খুব বেশিক্ষণ তাঁকে আটকে রাখা যাবে না। ছেলেগুলোও বিগলিত ভঙ্গীতে জানিয়েছিল, 'আপনি আমাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছেন এতেই আমরা কৃতার্থ স্যার। সত্যি বলতে কি গণ্ডগ্রামের একটা ছোট পত্রিকার উদবোধন অনুষ্ঠানে আপনি যে যেতে রাজি হবেন তাই ভাবতে পারিনি আমরা প্রথমটা। দেখবেন স্যার, সন্ধের মধ্যেই আপনাকে ছেড়ে দেব। জানি তো এতখানি পথ ফিরতে হবে আপনাকে আবার। আমরা যে গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে যাব আপনাকে সেই আর্থিক ক্ষমতা তো নেই আমাদের...অথচ সেটাই উচিত ছিল'।

'না না, গাড়ি-টাড়ি কী দরকার আবার', তাদের কথাটাকে যেন বিনয়ে ভাসিয়ে দিলেন প্রাণকৃষ্ণ, 'ছোট কাগজের পুঁজি ছোট জানি। কিন্তু ভালোবাসা, সেটা যে অফুরান। সেই টানেই তো আমি...'

'আপনার মতন এমন একজন সেলিব্রিটি লেখককে নিয়ে যাচ্ছি আমাদের অনুষ্ঠানে। ওখানে কত যে ভক্ত আপনার, একবার শুধু গিয়ে দেখবেন স্যার...' ছেলেগুলো কৃতজ্ঞতায় গলে গিয়ে বলে গাঢ় গলায়। ছেলেগুলোর কথা খুব উপভোগ করছিলেন প্রাণকৃষ্ণবাবু। বিশেষ করে শেষের কথাটা। অন্যের মুখে নিজেকে সেলিব্রিটি লেখক শুনলে শরীরের মধ্যে যেন আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। তিড়িং-বিড়িং করে নেচে ওঠে মনের ভেতরটা।

ভাগ্য কখন যে কার ক্ষেত্রে দুম করে প্রসন্ন হয়ে যায় কেউ বলতে পারে না। এই যে প্রাণকৃষ্ণবাবু এতদিন ধরে একজন জাঁদরেল লেখক হয়ে ওঠার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন প্রাণপণে, সেখানে পরিশ্রমে তো ঘাটতি ছিল না। অথচ লাভ হল লবডংকা। দিনের পর দিন প্রায় সব কাগজ তাঁর লেখাগুলোকে নির্মমভাবে বাতিল করে দিয়েছে। বড়দের কাগজ পাত্তাই দেয়নি তাঁকে কোনোদিন, ছোটদের পত্রিকার সম্পাদকেরাও মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিলেন তাঁর দিক থেকে। কিন্তু খেয়ালবশেই হঠাৎই তিনি যেই ভূতের গল্প লিখতে শুরু করলেন অমনি খ্যাতি আর প্রচার যেন হুড়মুড়িয়ে এসে দাঁড়ালো তাঁর দরজার সামনে। যেসব কাগজে উপেক্ষা পেয়ে এসেছেন এতদিন, তারাই এখন লেখা পাবার জন্যে খোশামোদ করছে তাঁকে, যেসব সমকালীন লেখক পথে-ঘাটে তাঁকে দেখেও দেখতে না পাওয়ার ভান করে সরে পড়তেন, তাঁরা এখন তাঁর প্রতি একেবারে বিগলিত।

আসলে ভূতের গল্পে প্রাণকৃষ্ণ একটা আলাদা ঘরানা তৈরি করে ফেলেছেন আজকাল। ভূত সম্পর্কিত সম্পূর্ণ নিজস্ব একটা ভাষা, নিজস্ব ধারনা ও তত্ত্ব। প্রাণকৃষ্ণের ভূতেরা ভয়ংকর নয়। মানুষের ঘাড় মটকায় না তারা। ঘাড়ে-টাড়েও চাপে না। তারা নিরীহ, লাজুক, উপকারী, এমনকি ভীতুও। তাঁর গল্প পড়ে গা ছম ছম করে না, দাঁত কপাটি লাগে না ভয়ে। রাত-বিরেতে বুক গুড় গুড়ে হাড় হিম করা ভাবও হয় না কখনও। বরং ভূতগুলোর জন্যে কেমন একটা মায়া, একটা মন কেমন করা ভাব ফুটে ওঠে পাঠকের মনে। বেশ একটা সমবেদনায় ভরপুর ভালোবাসাও মনের মধ্যে খেলা করে বেড়ায় তাঁর লেখা পড়ে।

কিন্তু সে যাই হোক, পাঠক খাচ্ছে তাঁর গল্প এ বিষয়ে সন্দেহ নেই এতটুকু। তাঁর ভূতের গল্পের বিক্রিবাটাও ভালোই। সেসব কথা বিবেচনা করে এই গণ্ডগ্রামের অনুষ্ঠানে না এলেও পারতেন প্রাণকৃষ্ণবাবু, কিন্তু হিসেব-নিকেশ করেই না বলেননি তিনি ছেলেগুলোকে। আসলে পাঠক ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। তাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে পারলে আখেরে লাভ হয় তিনি দেখেছেন। জনপ্রিয়তা বাড়ে, সঙ্গে বাড়ে বই-এর বিক্রিও। কিন্তু অনুষ্ঠানটা এতখানি লম্বা হয়ে যাবে উদ্যোক্তারা নিজেরাও বুঝতে পারেননি আগে থেকে।

অনেকক্ষণ থেকেই উঠি উঠি করেও ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল তাঁর। বারুইপুর স্টেশনে যখন ট্রেন থেকে নামলেন হাতঘড়ির কাঁটা সাড়ে এগারোটা ছুঁই-ছুঁই। অটো স্ট্যান্ডে অটো নেই আর। খানিকটা হেঁটে একটা রিকশা পেলেন বটে, কিন্তু মওকা বুঝে এমন ভাড়া হাঁকাল লোকটা যে প্রাণকৃষ্ণবাবুর মেজাজটাই গেল খিঁচড়ে। এখান থেকে তাঁর বাড়ি বড়জোর দেড় কিলোমিটারের পথ। রাস্তাটা নির্জন ঠিকই, কিন্তু চুরি-ছিনতাই-এর ভয়-টয় তেমন নেই। অতএব প্রাণকৃষ্ণবাবু ফাঁকা রাস্তায় একা একাই হাঁটা শুরু করলেন বাড়ির দিকে।

স্টেশন রোড পেরিয়ে, শ্রীগুরু পুস্তক ভান্ডার বাঁয়ে ফেলে নস্করদের বিশাল দিঘিটা পার হয়ে যেই ঝুপসি খিরিশ গাছটা বেড় দিয়ে ডাইনে বাঁক নিয়েছেন তিনি, অমনি আচম্বিতে ঘটনাটা ঘটল। খিরিশ গাছটার আবছা অন্ধকারের মধ্যে থেকে কে যেন চাপা খসখসে গলায় ডেকে উঠল, 'স্যার, একটু যদি সময় দেন, কটা কথা ছিল...'

প্রথমটা শোনার ভুল মনে করেই এগিয়ে গিয়েছিলেন প্রাণকৃষ্ণবাবু। এই রাতে এখানে কে ডাকবে তাঁকে! কিন্তু দু-পা এগোতে না এগোতেই ডাকটা আবার শুনতে পেলেন তিনি, 'স্যার, প্লিজ। বেশিক্ষণ না, সামান্য সময় নেব আপনার। যদি একটু দাঁড়িয়ে যান কষ্ট করে...'

প্রাণকৃষ্ণবাবু দাঁড়িয়ে পড়লেন। থতমত গলায় জিগ্যেস করলেন, 'আমাকে বলছেন?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি ছাড়া এ তল্লাটে আর কেউ তো নেই স্যার। সেইজন্যেই ভরসা করে আপনাকে আজ ডাকলাম। অনেকদিন ধরেই আপনাকে সুযোগ সুবিধে মতন পাবার চেষ্টা চালাচ্ছিলাম। সুযোগটা আজই বলতে গেলে ঠিকঠাক পেলাম স্যার'। খসখসে গলাটা সাবধানী গলায় বলে উঠল।

'কে আপনি? আমি তো দেখতেই পাচ্ছি না কাউকে...' প্রাণকৃষ্ণবাবু অবাক হয়ে বলে উঠলেন।

'পাবেন স্যার, নিশ্চয়ই পাবেন। একটু সময় দিন। বায়বীয় শরীর তো, চেহারাটাকে দৃশ্যমান করতে এখনও একটু সময় লেগে যায়। ঝপ করে নিজেকে তৈরি করে ফেলতে পারি না। ট্রেনিং এ আছি অবশ্য। মাস দুয়েকের মধ্যে আশা করি স্যার ব্যাপারটা সড়গড় হয়ে যাবে। তখন চক্ষের নিমেষে আস্ত একটা শরীর ধারণ করে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে যেতে পারব প্রয়োজন মতন। এই যেমন ধরুন আপনাদের পাড়ার যদুদা দিব্বি যখন তখন শরীর ধারণ করতে শিখে গেছে এখন...'

'মানে', প্রায় আঁতকে উঠলেন প্রাণকৃষ্ণবাবু, 'যদু, মানে হালদার বাড়ির যদু, যে গেল বছর রেলে কাটা পড়ল শুঁলিপোতায়?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার।'

প্রাণকৃষ্ণের বুদ্ধিশুদ্ধি যেন তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগল। তাঁদের বাড়িতে কাজ করতে আসে কমলার মা। সে প্রায়ই বলে যদু নাকি ভূত হয়ে দেখা-টেখা দেয় মাঝে মাঝে। গ্রামে-মফসসলে এমন ভূতুড়ে গল্প নিত্যিদিন হাওয়ায় ভাসে। এ কোনো নতুন কথা নয়। প্রাণকৃষ্ণবাবু এসবে বিশ্বাস-টিশ্বাস করেননি কখনও। এখন কথাটা শুনে কেমন খটকা লাগল। সন্দেহের সঙ্গে বলে উঠলেন তিনি, 'যদুর নিত্য দেখা পাওয়া আপনার পক্ষে তো সম্ভব নয়?'

'আজ্ঞে আমার পক্ষেই তো দেখা পাওয়া সম্ভব।' খসখসে গলা ভারি অমায়িক ভঙ্গীতে হাসে। তারপর খিরিশ গাছের পিছন দিক থেকে একটু দুলতে দুলতে সামনের দিকে এগিয়ে এসে প্রাণকৃষ্ণবাবুর চেয়ে খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে পড়ে। প্রাণকৃষ্ণ স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন একটুক্ষণ। ছেলেটা খুব বেশি হলে বছর পঁচিশেক বয়েসের। লম্বা। একটু বেশি রোগা। পরনে ট্রাউসার। ফুলহাতা শার্ট গুঁজে পরা। চাঁদের আলোয় মনে হল গলায় টাই রয়েছে ছেলেটার।

'কেন?' তার দিকে চেয়ে জিগ্যেস করেন প্রাণকৃষ্ণবাবু।

'আমিও যে স্যার আর বেঁচে নেই।'

'যাহ, আপনি কি ইয়ার্কি করছেন নাকি?' অবিশ্বাসী গলায় বলেন প্রাণকৃষ্ণবাবু।

'আজ্ঞে না', ভারি বিনয়ের সঙ্গে বলে ছেলেটা। 'স্যার আমায় দয়া করে আপনি বলবেন না। আপনি সম্মানীয় ব্যক্তি। আমি অত্যন্ত সাধারণ একজন ভূত। অল্প পারিশ্রমিকের চাকরি করে কোনোক্রমে মাথা গোঁজার একটা আশ্রয় পেয়েছি এ অঞ্চলে। তবে আমি পরিশ্রমী। কাজের প্রতি ডেডিকেশনেরও অভাব নেই আমার...'

'সত্যিই তুমি ভূত?'

'যে আজ্ঞে?'

'তবু তোমায় চাকরি করতে হয়?'

'হ্যাঁ স্যার। যা কম্পিটিশন আজকাল। সাধারণ রোগে ভোগা মানুষ তো মরতই আগে। কিন্তু আজকাল ভাবুন চতুর্দিকে কত নাশকতা, গণহত্যা, তারপর বাসে-ট্রেনে জলে-আকাশে-হাজারো দুর্ঘটনা...এ পারে জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে ক্রমাগত। অথচ থাকার জায়গা কমছে। জঙ্গল সাফ হয়ে যাচ্ছে, পোড়ো বাড়ি উধাও হয়ে ফ্ল্যাট গজিয়ে উঠছে। শ্মশান-টশানগুলো পর্যন্ত অত্যাধুনিক হয়ে সেজেগুজে যেন টুরিস্ট স্পট একেকটা। অনেকে তো সন্ধেবেলা শ্মশানে এমনিই ঘুরতে আসে আজকাল। সেকেলে ভূতেরা এসব পরিবর্তন মানিয়ে নিতে পারেন না চট করে। আমরা বাধ্য হয়ে মেনে নিচ্ছি। এরই মধ্যে একটু ভালোভাবে থাকতে হলে বা ধরুন একটা ব্রাইট কেরিয়ার তৈরি করতে চাইলে এইসব প্রতিকূলতাকে তো জয় করতেই হবে বলুন...'

'এখানেও কেরিয়ার, এখানেও কম্পিটিশন?'

'হ্যাঁ স্যার। আর সে জন্যেই আমি আজ আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।'

'আমি কী করতে পারি বাপু এক্ষেত্রে?'

'আপনিই পারেন স্যার। অন্যদের দিয়ে হবে না'।

'মানে?'

'স্যার আমরা জানি আপনি আমাদের নিয়ে প্রচুর গল্প লেখেন।'

'তোমরা এ খবরও রাখো?'

'রাখতে হয় স্যার। নিজেদের ভালো মন্দের কথা মৃত্যুর আগেও যেমন ভাবতে হয়, মৃত্যুর পরেও ভাবতে হয় বৈকি। যাইহোক রাত বাড়ছে। আপনাকে বেশি দেরি করাব না আর। আসল কথায় আসি বরং।'

'সে কথাটা কী বলো দেখি?'

'দেখুন আপনার গল্পে আপনি আমাদের বড় হ্যাটা করছেন। মজা-টজা করে এমন করছেন যে আমাদের সম্পর্কে ভয়-টয়ের ব্যাপারটা একেবারে মুছে যাচ্ছে মানুষের মন থেকে। এতে আমাদের অস্তিত্বের সংকট দেখা দিচ্ছে। কে কত ভয় পাওয়াতে পারল মানুষকে এ নিয়ে আমাদের চার বছর অন্তর ভলিম্পিক, আই মিন ভূতুড়ে অলিম্পিক পর্যন্ত চালু আছে। আমরা মানুষের ক্ষতি করতে চাই না, কিন্তু তারা যে আমাদের ভয় করে, শ্রদ্ধা-সম্মান করে এমন জানলে আমরা বড় খুশি হই। আমাদের এ জগতে ওইটুকুই তো বিনোদন বলুন...আর কী আছে আমাদের...মানুষকে একটু ভয়-টয় দেখিয়ে সমাজে কলার তুলে ঘোরা। দুঃখের বিষয় আপনার মতন মানুষেরা আমাদের সেটুকু আমোদ—আহ্লাদও কেড়ে নিচ্ছেন...'

'কিন্তু এই লেখা আমার পাঠকেরা চাইছে যে...'

'চাইলেই করতে হবে? এই যদি আমার ইচ্ছে করে মট করে আপনার ঘাড়টা মটকে দিই, করব আমি, বলুন? সমাজে উচিৎ, অনুচিত এইসব শব্দগুলো কি তাহলে উঠেই যাবে নাকি একেবারে বলুন...কাজেই আপনি দয়া করে ভয় পাওয়ানো ভূতের গল্প লিখুন এবার থেকে।'

'আমি একা লিখলেই হবে', মরিয়া হয়ে বলেন প্রাণকৃষ্ণ, 'আরও অনেকেই তো ভূত নিয়ে মজার গল্প লিখছেন। তাঁদের অনেকেই কিংবদন্তি লেখক...'

'আমাদের কোম্পানির রিপ্রেসেন্টেটিভরা তাঁদের সকলের কাছেই পৌঁছে যাচ্ছে বা যাবে। আমাদের কোম্পানি এই অ্যাসাইনমেন্টটা অনেক কষ্টে পেয়েছে। এটা বড় একটা প্রজেক্ট। আমরা একটা টিম হিসেবে কাজটা করছি। মানুষের মনে ভূত নিয়ে ছেলেমানুষি ঠাট্টা তামাশা বা ধরুন অবজ্ঞা কিংবা ফাজলামি এসব দূর করে আগেকার সেই গা ছমছমে ভয়-ভয় ভাবটা ফিরিয়ে আনতে চাইছি আমরা। আমাদের কাজের সাফল্যের ওপরে ভবিষ্যতে অনেক কিছু নির্ভর করে আছে স্যার...'

'কিন্তু তোমাদের কথা ভেবে আমি আমার এমন একটা তৈরি জায়গা ছাড়ব কেন? আমারও তো লেখক হিসেবে একটা ভবিষ্যৎ আছে। আমিও তো অনেক কষ্টে এই জায়গাটা তৈরি করেছি...'

'স্যার প্লিজ', ছেলেটার গলায় বিষণ্ণতা ঝরে পড়ে, 'স্যার, বেঁচে থাকতে প্রায়শই একটা স্বপ্ন দেখতাম আমি। আমার দুর্ভাগ্য, সে স্বপ্নটাকে কিছুতেই আর বাস্তবে রূপ দিতে পারিনি। মরার পর আচম্বিতেই আমার সামনে সেই স্বপ্নটা সত্যি করার একটা সুযোগ এসেছে, কিন্তু আপনি আমার কথায় রাজি না হলে এ বারেও স্বপ্নটাকে আর সত্যি করে তোলা হবে না আমার। আর সত্যি বলতে কি সুযোগটা এবারেও যদি কাজে লাগাতে না পারি তাহলে আমার এই ভূতজন্মটাও বেকার হয়ে যাবে একেবারে। একবার মরলে আর মরা যায় না। তা নাহলে এই ব্যর্থতার জন্যে আমাকে, মানে আমাদের দুজনকে হয়ত আরো একবার মরণের পথটাই বেছে নিতে হত...' ছেলেটা মাথা ঝুঁকিয়ে খুবই দুঃখিত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে থাকে চুপটি করে।

'তোমার স্বপ্নটা কী?' কৌতূহলী হয়ে জিগ্যেস করেন প্রাণকৃষ্ণবাবু।

'সে কথা বলতে গেলে একটু আগে থেকে বলতে হয়', ছেলেটা লাজুক গলায় বলে, 'আপনার কি আর অত কথা শোনার সময় হবে?'

কনুই থেকে বাঁ হাত ভাঁজ করে রিস্ট ওয়াচের দিকে নজর বোলালেন একবার প্রাণকৃষ্ণ। রাত্তির বারোটা বাজতে চলেছে। সত্যিই দেরি হয়ে যাচ্ছে এইবার। তাছাড়া কদিন ধরে বাড়িতেও একটা বিচ্ছিরি ক্যাচাল চলছে। তাঁর মেয়ে বাবলিকে নিয়ে বেশ একটা ঘোরালো পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই চলছেন তিনি। কিন্তু ছেলেটার গল্পটা শোনার লোভও সামলাতে পারছেন না উনি।

প্রাণকৃষ্ণ নিজেই নিজেকে বোঝালেন শেষমেশ, ট্রেনে উঠে বাড়িতে তো ফোন করে বলেই দিয়েছেন যে ফিরতে অনেকই দেরি হবে, কাজেই বাড়িতে চিন্তা করার কিছু নেই। তাছাড়া বাবলিকেও নিশ্চিত চোখে চোখে রেখে দেবে ওর মা। অতএব ছেলেটার কথাগুলো শুনেই নেওয়া যাক আপাতত। তাছাড়া ছেলেটার ওপর কেমন যেন মায়াও পড়ে যাচ্ছে একটা। ওর আচরণে এমন একটা শিষ্ট অথচ বিষাদের ভাব আছে যে চট করে ওর ওপরে যেন কেমন একটা দুর্বলতা এসে যায় মনের মধ্যে। প্রাণকৃষ্ণবাবু একবার কেশে নিয়ে বলে উঠলেন, 'বলেই ফেল হে। তবে খুব বেশি বিশদে যেও না।'

'যে আজ্ঞে', বলে বলতে শুরু করে ছেলেটা, 'মরার আগে আমার নাম ছিল ঋষভ। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিপ্লোমা করে একটা চাকরি পেয়েছিলাম চেন্নাইতে। খুব লুক্রেটিভ কিছু না, তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম পরিশ্রম আর চেষ্টা দিয়ে আমি ধীরে ধীরে অনেক ওপরে চলে যাব একদিন। যাবই। কিন্তু অন্বেষার বাবা কিছুতেই এটা মানতে পারল না জানেন...'

'অন্বেষাটা কে? তোমার গার্লফ্রেন্ড বুঝি?'

'হ্যাঁ', খুব লজ্জা পাওয়া গলায় উত্তর দেয় ঋষভ। 'সেই ক্লাশ ইলেভেন থেকেই স্টেডি রিলেশন আমাদের। অলক স্যারের ব্যাচে ফিজিক্স পড়তে গিয়ে আমরা ভালোবেসেছিলাম দুজন দুজনকে...আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি তখনই বলেছিলাম ওকে,' 'দেখিস, একদিন অনেক বড় হব আমি। মস্ত চাকরি পাব। তোকে নিয়ে বিদেশে হনিমুন করতে যাব। সে যদি বিয়ের অনেক পরেও হয়, তবুও সেটা আমাদের অ্যানাদার হনিমুন হবে...' ও এই কথায় লজ্জা পেত খুব। প্রথম প্রথম বিশ্বাসই করত না। তারপরে আমি যখন চাকরি পেয়ে চেন্নাই গেলাম তখন একদিন বলল আমার কথাটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে সে...'

'তারপর?'

'তারপর...' বিষাদে বুজে এল ঋষভের গলা, 'অন্বেষার বাবা আমাদের রিলেশনটাকে মেনে নেওয়া দূরের কথা, পাত্তাই দিলেন না। জোর করে ওর বিয়ে ঠিক করলেন কোন এক বিশাল ব্যবসায়ীর একমাত্র ছেলের সঙ্গে। অন্বেষা বিষ খেয়েছিল। কোথা থেকে যোগাড় করেছিল কে জানে...আমি দিন-চারেক পরে খবর পেয়েছিলাম। অন্বেষা নেই, আমি কী করে বেঁচে থাকি বলুন? সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়লাম। এই যে গলার দাগটা রয়েছে এখনও। দেখবেন নাকি সত্যি বলছি কিনা?' বলে প্রাণকৃষ্ণের দিকে কয়েক পা এগিয়ে এল ঋষভ। নিজের অজান্তেই এই প্রথম প্রাণকৃষ্ণবাবু ভয় পেয়ে দ্রুত পিছিয়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন।

ভয় পাওয়া গলায় বলে উঠলেন, 'না, না আমি দেখতে চাই না। আমি বিশ্বাস করছি তোমার কথা...' চোখ বুজিয়ে বুজিয়েই প্রাণকৃষ্ণের মনে হল ঘটনাটা যেন চেনা ঠেকছে তাঁর। তারপরেই মনে পড়ল খবরটা কাগজে বেরিয়েছিল। সেই ছেলেটা, সেই ঋষভই তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আজ এই রাতে? গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তাঁর।

'এই তো আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে ভয় পেয়েছেন আপনি', উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ে ঋষভের গলায়। 'এই ভয়টাই এবার থেকে যদি আপনার গল্পগুলোতেও চারিয়ে দেন তাহলে আমি প্যাকেজটা পেয়ে যাব।'

'প্যাকেজ মানে? কিসের প্যাকেজ?' প্রাণকৃষ্ণবাবু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেন।

কোম্পানির অফার আছে যদি আপনাকে ভূতে ভয় পাওয়ার ব্যাপারটা আর আপনার গল্পে ভূতকে ভয় পাওয়ানোর বিষয়টা নিশ্চিত করতে পারি তাহলে পৃথিবীর যে কোনো শ্মশান বা গোরস্থানে থ্রি ডেজ ফোর নাইট থাকা খাওয়া ফ্রি। কাজেই আপনি যদি কথা দেন যে এবার থেকে ভয়ের গল্প লিখবেন এবং সত্যিই সে লেখা শুরু করেন তাহলে অন্বেষাকে দেওয়া কথাটা রাখতে পারি...'

'অন্বেষা এখানে?'

'না হলে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলতে গেলাম কেন? কী কষ্ট যে হয়েছিল সেই সময়...একটু বাতাসের জন্যে হাঁসফাঁস অবস্থা...অক্সিজেনটা যে কী মারাত্মক আরামের তখনই তো বুঝলাম। যাক গে এখানে এসে অন্বেষাকে পেয়ে সে কষ্ট ভুলে গেছি স্যার। দুটিতে বেশ মিলেমিশে আছি একসাথে। এবার আপনি যদি এখন পাওয়া ভয়টা ধরে রাখতে পারেন...'

একটা ভয়-ভয় ভাব সত্যিই কাজ করছিল প্রাণকৃষ্ণের মনে। শিড়দাঁড়ার কাছটা শির-শির করছিল। কথা বলতে গিয়ে দেখলেন জিভ শুকিয়ে আসছে ক্রমশ। তবু জিগ্যেস করলেন তিনি কাঁপা গলায়, 'কোথায় যাবে কিছু ভেবেছ?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে অন্বেষা তো ইংরেজি নিয়ে পড়েছিল। ওর বড় শখ একবার ইংল্যান্ডে যাবার। ওই যে ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবি আছে, ওখানেই ক'টা দিন ওর প্রিয় কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে কাটিয়ে আসব দুজনে। আমি ইংরেজিতে অবশ্য খুব ফ্লুয়েন্ট নই তবু কাজ চালিয়ে নিতে পারব...তাছাড়া...'

প্রাণকৃষ্ণবাবু তার কথা শেষ করতে দিলেন না আর। তিনি বেশ বুঝতে পারছিলেন ক্রমশই হাতের তেলো আর পায়ের পাতা ঠান্ডা হয়ে আসছে তাঁর। আপন মনে বিড় বিড় করে তিনি বলতে লাগলেন, 'তোমাদের ভালো হোক। সুখি হও তোমরা দুজনে। আমি তোমার কথা রাখব। ভয় পাওয়ানো ভূতের গল্পই লিখব এবার থেকে। নিশ্চিন্তে থেকো তুমি।'

ঋষভের মুখের দিকে তাকানোর কথা আর মনে পড়ল না প্রাণকৃষ্ণবাবুর। মাথা নামিয়ে ভারী পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন তিনি আনমনে। একটা মারাত্মক জরুরি কথা মনে পড়ে গেছে তাঁর। আজ এত রাতে আর সম্ভব নয়। তবে ব্যাপারটা নিয়ে গড়িমসি করার সময়ও আর একটুও নেই। কাল রবিবার। ইউনিভার্সিটি ছুটি। বেদানুষা, মানে বাবলি বাড়ি থাকবে কাল। ওর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা দরকার। খোলা মনে। কয়েকমাস আগেই প্রাণকৃষ্ণবাবুর স্ত্রী খুব উদবেগ নিয়ে জানিয়েছিলেন তাঁকে যে বেদানুষা ওরই ইউনিভার্সিটির একটি ছেলেকে ভালোবাসে। ভবিষ্যতে তাকেই বিয়ে করতে চায় সে।

ছেলেটি সম্পর্কে প্রাণকৃষ্ণবাবু খোঁজ-খবর নিয়েছেন। ছেলেটা এসেওছে দু-একবার এ বাড়িতে। একটু ভোলেভালা। উস্কোখুস্কো একমাথা চুল। গালে নরম দাড়ি। উদাস ভাসা-ভাসা চোখ। কবিতা লেখে। রবি ঠাকুরের গান গায়। বেশ গলা। সুরও ভারি ভালো খেলে ছেলেটার গলায়। কিন্তু বেদানুষাকে তার হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে তীব্র আপত্তি তাঁর। তাঁর স্থির বিশ্বাস স্থায়ী ও নিশ্চিন্ত হবার মতন উপার্জন করার ক্ষমতা ও ভালো সংসারি হবার গুণ এ দুটোর কোনোটাই ছেলেটার নেই। স্ত্রীকে নিজের আপত্তির কথা স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন প্রাণকৃষ্ণবাবু। বাবলিকেও জানিয়েছেন।

প্রাণকৃষ্ণবাবু দু-একটি ভালো সম্বন্ধের কথা বাড়িতে বলছেনও কদিন ধরে। বাবলির মধ্যে অবশ্য এইসব সম্বন্ধ নিয়ে কোনো উৎসাহ বা কৌতূহল চোখে পড়েনি তাঁর। তবু হাল ছাড়েননি তিনি একদিনে। কিন্তু আজ প্রাণকৃষ্ণের মনে হল আপত্তির পাশাপাশি মেয়েটার চোখে সে সময় অন্যরকম একটা অন্ধকারও দেখেছিলেন তিনি। প্রাণকৃষ্ণের বুকের মধ্যেটা ভারি হয়ে গেল। কাল সকালেই বেদানুষাকে বলতে হবে ছেলেটাকে একদিন বাড়িতে নিয়ে আসার জন্যে। লিখুক না কবিতা, গাক না গান। কী এমন ক্ষতি। ছেলেটার মুখখানা তো খারাপ নয়। আর ভাসা-ভাসা চোখদুটোর মধ্যে যে স্বপ্নগুলো সে এঁকে রেখেছে তাঁর অলক্ষে, চেষ্টা করে দেখাই যাক না সবাই মিলে, সেগুলো জীবনের এ পারেই সত্যি করে তোলা যায় কিনা...

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%