জয়দীপ চক্রবর্তী

চার-পাঁচশো বছর আগে পর্যন্ত এই আদি গঙ্গায় কুল কুল শব্দে জল ছুটত পাক খেতে খেতে। সেই জলে ছোট ছোট জাহাজ চলত যাত্রী নিয়ে, আবার মালপত্র নিয়েও। সেইসব জাহাজের কিছু কিছু তীব্র স্রোতে ডুবেও যেত মাঝগঙ্গায়। মানুষের আর্তনাদ উড়ত আকাশে আর আশেপাশের ঘন জঙ্গল জুড়ে। এখন সেই বিশাল চওড়া নদী শুধুই একটা মজা খাল। আর এই মজে যাওয়া আদিগঙ্গার ধারেই এই পুরোনো শ্মশান। এলাকায় বসতি বেড়েছে গত কয়েক দশক ধরে ক্রমাগত। বন জঙ্গল কেটে শহর এগিয়ে চলেছে ক্রমাগত। রাস্তাঘাট, আলোবাতি, লোকলস্করে জমজমাট হয়ে যাচ্ছে চারপাশ। তবু, এখনও এই জায়গাটা নির্জন। প্রাচীন সব গাছপালায় মোড়া। সভ্যতা এখানে পৌঁছতে যেন ভয় পায় এখনও। সভ্য মানুষজনও।
দিনের বেলাতেও এই পথে লোকজনের আনাগোনা তেমন নেই। শ্মশানে দাহ হয় কদাচিৎ। পুরো শ্মশান জুড়ে শেয়ালদের দাপাদাপি। আজও একপাল শেয়াল ছুটোছুটি করছিল শ্মশান জুড়ে। মাঝে একবার আকাশের দিকে মুখ তুলে তারা ডেকে উঠেছিল সমস্বরে। একবারই। এখন আবার চুপ। যেন কী এক ভয়ংকরের সম্ভাবনায় ভয় পেয়েছে ওরা।
শ্মশানের মাঝমধ্যিখানে একটা হলদেটে পুরনো বাল্ব জ্বলছিল উঁচু ল্যাম্পপোস্টের মাথায়, আর শ্মশানের এক প্রান্তে, মজে যাওয়া গঙ্গার দিকে, শ্মশানকালীর টালির চালের ছোট্ট মন্দিরে একটা প্রদীপ জ্বলছিল টিমটিম করে। মন্দিরে নিয়মিত সন্ধেপ্রদীপ জ্বলে এমন নয়, তবে আজ প্রদীপ জ্বলছে। সুব্রত ফিসফিস করে বলল, 'এসে গেছি।'
'এ কোথায় নিয়ে এলি আমাকে?' ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া গলায় বলি আমি, 'এই রাতে এখানে তোর কী কাজ? আর সে কাজে আমাকেই বা লাগবে কেন?' আমি মাথা নেড়ে অসন্তোষ প্রকাশ করি,'এ কিন্তু তোর ভারি অন্যায়। বললাম কাজ আছে, বাড়ি ফিরে আমাকে অরগ্যানিক কেমিস্ট্রির তিন-তিনখানা চ্যাপ্টারের পড়া তৈরি করতে হবে। কোনো কথা শুনলি না, জোর করে ধরে নিয়ে এলি তুই এই বিচ্ছিরি জায়গায়...'
সুব্রত আবার হাসল। বাতাসের মতন মিহি সেই হাসি, 'আগে আমরা হুটহাট এমন কত জায়গায় চলে গেছি বল সাইকেল চালিয়ে...'
'তা গেছি', মাথা নেড়ে সায় দিই আমি, 'তাই বলে এই অন্ধকার রাতে, এইরকম একটা বিদিকিচ্ছিরি জায়গায়?'
'এই শ্মশানের নাম রামসাঁতালের শ্মশান', সুব্রত আমার কথাটা শুনতেই পায়নি এমন ভাব করে বলতে থাকে, 'অনেকদিন আগে গঙ্গার ধারের এই নির্জন জায়গায় ওই বটগাছের নীচে রামসাঁতাল তপস্যা করতেন', হাত বাড়িয়ে অন্ধকার শ্মশানের এক প্রান্তে আরো অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মস্ত বটগাছের দিকে দেখায় আমায় সুব্রত। 'তিনি ছিলেন মস্ত তান্ত্রিক, পিশাচসিদ্ধ।'
'পিশাচসিদ্ধ মানে?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি আমি।
'সাধনার এ এমন একধরনের সিদ্ধি যে ভূত-প্রেতরা সাধকের বশীভূত হয়ে থাকে। সেই সাধক ইচ্ছেমতন তাদের দিয়ে নানান কাজ করিয়ে নিতে পারেন। তারা তখন তাঁর ভৃত্য, অনুগত দাস...একটু অপেক্ষা কর না, নিজে চোখেই দেখতে পাবি সব পিলু...'
'কী দেখতে পাব? ইয়ার্কি মারছিস নাকি আমার সঙ্গে?'
সুব্রত খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতে লাগল আমার দিকে চেয়ে। ওর হাসি শুনে আমার গা পিত্তি জ্বলে গেল। ধমকে উঠলাম আমি, 'অ্যাদ্দিন বাদে দুম করে উদয় হয়ে তুই আমাকে ভূতের ভয় দেখাতে চাইছিস নাকি জোর করে এখানে টেনে এনে?'
'বোকার মতন খামোখা ভয় পেতে যাবি কেন...' বলতে বলতে আমার হাত ধরে সুব্রত শ্মশানের সেই ঝুপসি বটগাছটার দিকে এগোতে থাকে, 'দারুণ দিনে তোকে নিয়ে এসেছি রে পিলু। তুই সত্যিই ভাগ্যবান। আজ এখানে একটা সম্মেলনে স্বয়ং বাবা রামসাঁতাল বক্তব্য রাখবেন। জীবনের অন্য পারে গিয়ে পৌঁছেছে যারা তাদের দিকনির্দেশ দেবেন তিনি। ভূতেদের কর্মপন্থা নির্ধারিত হবে এই সভায়। তুই নিজে চোখে দেখতে পাবি ওঁকে।'
সুব্রত আমার ছোট্টবেলার বন্ধু। ক্লাশ সিক্স থেকে একই স্কুলে পড়াশোনা করেছি একসঙ্গে। ছেলেটা চিরকালই খ্যাপাটে। বনে বাদাড়ে শ্মশানে গোরস্থানে ঘুরে বেড়াত টো টো করে। ভয়-ডর কোনোদিনই তেমন ছিল না। এইসব অ্যাডভেঞ্চারে আমাকেও প্রায়ই সামিল করত ও। সত্যি কথা বলতে কী, সেইসব অ্যাডভেঞ্চার আমার ভালোই লাগত। কিন্তু মাধ্যমিক পরীক্ষার পরেই ওর বাবা অন্য কোথায় যেন বদলি হয়ে গেলেন। সুব্রতও স্কুল ছেড়ে চলে গেল। আর দেখা হয়নি ওর সঙ্গে এই দু বছরের মধ্যে।
হঠাৎ আজ বিনা নোটিশে ওর আবির্ভাব। আমি ইয়ারফোনে গান শুনতে শুনতে রেল লাইনের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পড়তে যাচ্ছিলাম। স্যারের বাড়ি যাবার অন্য রাস্তা আছে, কিন্তু এই পথে গেলে রাস্তাটা অনেকখানিই কমে যায়। ও বোধহয় পিছন থেকে আমাকে নাম ধরে ডেকেছিল কয়েকবার। আমি শুনতে পাইনি। আচমকা পিঠে একটা চাপড় খেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি সুব্রত। একটা ট্রেন ঝমঝম করে ছুটে গেল তক্ষুনি। সেই আওয়াজে স্পষ্ট শোনা গেল না, তবু মনে হল সুব্রত বলল, 'এখানে আর একটুও দাঁড়াস না। প্রশ্নও করবি না একটাও। কোনোদিকে না তাকিয়ে শিগগিরি চলে আয় আমার সঙ্গে।'
'কোথায় যাবি এখন?' জিজ্ঞেস করাতে কোনো উত্তর না দিয়েই হনহন করে হাঁটা লাগিয়েছিল সুব্রত। ঠিক হাঁটা নয়, যেন উড়ছিল ও। অগত্যা পিছু নিয়েছিলাম। ফল এই দুর্ভোগ। রাত-বিরেতে শ্মশানে দাঁড়িয়ে গুচ্ছের আজগুবি গল্প শোনাতে আরম্ভ করেছে ও আমায়।
হঠাৎই জলদগম্ভীর একটা কন্ঠস্বরে চমকে সামনে চাইলাম। বটগাছের গোড়ায় একটা দীর্ঘ ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়িয়েছে। আকাশের অসংখ্য নক্ষত্রের আলোয় তাঁর আবছায়া অবয়ব দেখতে পাচ্ছিলাম। মাথায় জটা, মুখে দাড়ি, পরনে দীর্ঘ জোব্বার মতন আলখাল্লা। গঙ্গার মজা খালের দিকে হাত বাড়িয়ে তিনি ডাকছেন, 'ওরে তোরা আয়, তোরা আয়...'
সেই ডাক আমার চারদিকে পাক খেতে খেতে যেন আমার শরীরের মধ্যে ঢুকে গেল। গা শিরশির করে উঠল আমার। মনে হল এই ডাক আমিও উপেক্ষা করতে পারছি না। সুব্রত কানের কাছে মুখ এনে নীচু গলায় বলল, 'বাবা রামসাঁতাল। কয়েকশ বছর আগে মারা গেছেন, তবুও অসম্ভব শক্তিশালী। তাঁর ডাক, তাঁর নির্দেশ অমান্য করার সাধ্য নেই কারও।'
বাবা রামসাঁতাল বলেই চলেছেন, 'গঙ্গার পাঁকে পুঁতে রাখা যত নাভি, তোরা ঘুম ভেঙে জেগে ওঠ,...ওরে শরীরহীনের দল, তোরা ছায়াশরীরে ছুটে আয় আমার কাছে। সামনে অনেক কাজ। জীবন তোদের ডাকছে, আমি তোদের ডাকছি...'
আমার বেজায় ভয় করছে এখন। খালের দিক থেকে টলতে টলতে কাঁপতে কাঁপতে ছায়াশরীরের মিছিল এগিয়ে আসতে শুরু করেছে তখন বটতলার দিকে। আমি শুকনো গলায় বলে উঠলাম, 'আমরা এখানে থেকে কী করব সুব্রত, চল পালিয়ে যাই আমরা...'
'পালাবি কেন? শুনছিস না উনি ডাকছেন...'
'আমার ভয় করছে।'
'ভয় কী, আমি আছি তো...' সুব্রত সাহস দেয়। আমরা বটগাছটার দিকে এগিয়ে যাই আরও।
এখন সামনে সেই দীর্ঘ ছায়াপুরুষ। সেই কবেকার পৃথিবীর শক্তিশালী তান্ত্রিক বাবা রামসাঁতাল। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে নির্দেশ দিচ্ছিলেন, 'দীপাবলি আলোর উৎসব। সদ্য ভূতচতুর্দশীতে যে যার ভিটে পরিদর্শন করে এসেছ তোমরা। দেখেছ এই আলোর উৎসবেও নিজেদেরকে তারা কেমন অন্ধকারের পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সত্যিকারের আলো দেখানোর জন্যে কে তাদের পাশে দাঁড়াবে?'
'কে প্রভু?' শ্মশান জুড়ে হাহাকার উঠল।
'এই দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে', দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রামসাঁতাল। 'এসো আজ শপথ নিই, মানুষকে ভয় দেখিয়ে বা তাদের ঘাড়ে চেপে জীবন উপভোগ করার নিন্দিত পথ ছেড়ে আমরা মানুষের কল্যাণের কাজে আত্মনিয়োগ করি।'
'কী ভাবে ঠাকুর?' ঝোড়ো হাওয়ার মতন ফিসফিসানি উঠল শ্মশান জুড়ে।
'সবরকম অন্যায় আর হিংসার বিরুদ্ধে অশরীরী প্রতিরোধ গড়ে তুলে', গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করলেন তিনি।
'প্রয়োজনে যারা সন্ত্রাসী, যারা অসহিষ্ণু, যারা বিভেদকামী তাদেরকে শাস্তি দেব আমরাই। ভয় কী, একবার মরার পর আর তো কেউ হত্যা করতে পারবে না আমাদের...'
'ঠিক, ঠিক।'
'অতএব বিলম্ব নয়। এবারে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ো তোমরা।'
'যে আজ্ঞে', বলে চারদিকে ছড়িয়ে যেতে লাগল সেইসব না-মানুষ প্রহরীর দল।
রাস্তায়, জনপদে, বাসে-ট্রেনে, সভা-সমিতিতে। মানুষকে অন্যায় করতে দেখলে নিরস্ত করবে তারা। প্রয়োজনে শাস্তিও দেবে। নিজেদের শরীর নেই বলে তারা জানে জীবন কতখানি দামি। কত যত্নে কত আন্তরিকতায় জীবনের এই স্রোত টিঁকিয়ে রাখতে হয় প্রাণপণে।
ভয়ানক অস্বস্তি হচ্ছে আমার। সুব্রতর হাত জোরে চেপে ধরে মরিয়া হয়ে আমি বললাম, 'প্লিজ সুব্রত, চল ফিরে যাই এবার।'
'কোথায়?' বিষণ্ণ গলায় বলে সুব্রত।
'কোথায় আবার', বিরক্ত হয়ে বলি, 'বাড়ি।'
'তুই কি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছিস না পিলু?'
'কী?'
'আয় তাহলে আমার সঙ্গে', বলে আমার হাত ধরে বাতাসের মতন দ্রুত ছুটতে থাকে ও। আমাকে নিয়ে এসে দাঁড় করায় সেই রেল লাইনের ধারে, যেখানে ওর সঙ্গে আজ আমার দেখা হয়েছিল। সামনে হাত বাড়িয়ে আমাকে বলে, 'দ্যাখ ভালো করে...'
লাইনের পাশে একটা থ্যাঁতলানো ছিন্নভিন্ন শরীর পড়ে ছিল। ক্রমশ লোক জমছে সেই শরীরের আশেপাশে। তবু নিজেকে চিনতে অসুবিধে হল না। হাত পা কাঁপতে শুরু করল আমার। রাগ হল নিজের ওপর। ইশ, ওই ইয়ারফোন...কতবার কতজন বারণ করেছে। তবু...আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম।
সুব্রত কাঁধে হাত রাখল, 'কষ্ট পাস না পিলু। তুই বেঁচে নেই আর। ভাগ্যিস নেই, তাই তো তোকে ফিরে পেলাম আবার।'
'মানে?'
'আমিও বেঁচে নেই রে...তোরই মতন অমন একটা ছোট্ট ভুলে...'
'কী হয়েছিল তোর?'
'গতবছর কালীপুজোর বিসর্জনের সময় অসাবধানে প্রতিমার নীচে চাপা পড়ে তলিয়ে গিয়েছিলাম গঙ্গায়...'
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু গলায় জিগ্যেস করলাম, 'আমরা তাহলে এখন কী করব?'
'কী আর করব?' সুব্রত হাসে, 'রামসাঁতাল বাবার কথা তো শুনলি।'
'হুঁ', মাথা নাড়ি আমি।
একটা সামান্য ভুলে শরীর চলে গেছে আমার। সুব্রতরও। কিন্তু যারা বেঁচে আছে এখনও, আজ থেকে তাদের ভালোর জন্যে আমি প্রহরী হয়ে রয়ে গেলাম সুব্রতদের সঙ্গে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন