জয়দীপ চক্রবর্তী

বাস থেকে যখন মাটিতে পা রাখলুম গাঁ জুড়ে তখন শাঁখের ফুঁক পড়ছে অনবরত। খুব হালকা ছাই ছাই সন্ধে নামছে হামাগুড়ি দিয়ে, চুপিচুপি। বাস থেকে নামলেই রাস্তার বাঁদিক ঘেঁষে যে ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছটা ডালপালা উঁচিয়ে আড়াল করে দিয়েছে আকাশটা, তার নীচে দাঁড়িয়ে আমি ক্রমাগত চোখ ঘোরাচ্ছিলুম ডানদিক-বাঁদিক। আশা ছিল চিঠি দিয়েই আসছি যখন সুবিমল বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে নিতে আসবে নিশ্চয়ই। অবশ্য আগে যতবার ও আমাকে ওর এখানে আসার কথা লিখে চিঠি দিয়েছে, প্রত্যেকবারই বার বার উল্লেখ করেছে যে একবার বাস থেকে নেমে যে কোনো লোককে জিগ্যেস করলেই নাকি আমি অনায়াসে বিমল মাস্টারের বাড়ি পৌঁছে যেতে পারব। সুবিমল বেশ গর্ব করেই লিখেছিল শহরের দিকে মাস্টারদের অবস্থা যাই হোক গাঁয়ের লোকেরা এখনও তাঁদের দেবতা বলেই মানিগণ্যি করে।
লক্ষ্মণপুরের মতন অখ্যাত গ্রামের ততোধিক অখ্যাত বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার আবাল্য বন্ধু সুবিমল চাটুজ্জের জনপ্রিয়তা নিয়ে আমার বড় একটা মাথাব্যথা ছিল না। আমার সমস্যাটা ছিল অন্য। বাস থেকে নামবার সময়েই দেখেছিলুম এখানে নামবার লোক আমি একাই। আর বাস থেকে নেমে দেখলুম রাস্তার আশপাশ একেবারে শুনশান-জনমানবশূন্য। বাসস্ট্যান্ডের ধারেকাছে কোনো চা-সিগারেটের দোকান থাকবে না এতখানি আমি সত্যিই ভাবতে পারিনি আগে। এদিকে একটু আগেই আবছা আলোয় বাসরাস্তা থেকে ঢালু হয়ে নেমে গিয়ে যে রাস্তাটাকে দূরে গিয়ে দু'ভাগ হয়ে শুয়ে থাকতে দেখছিলুম জলাজমির মাঝখান দিয়ে, সেটাও গা ঢাকা দিয়েছে অন্ধকারে। বেশ দূরে কয়েকটা খোড়ো চালের বাড়ি থেকে ফাঁক-ফোকর গলে যে দু'এক চিলতে মৃদু আলো এসে পড়ছিল পথের ওপর, সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বেশ বিরক্তি লাগছিল; সুবিমলের ওপর। কোথায় আমার সাত নম্বর অখিল মিস্তিরি লেন, আর কোথায় এই লক্ষ্মণপুর। ফিরে যাবো যে সে উপায়ও নেই আর।
সবে ভাবছি একটু পা চালিয়ে যে কোনো একটা বাড়িতে গিয়েই জিগ্যেস করি সুবিমলের কথা, এমন সময় পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল, 'আপনি বুঝি মাস্টারবাবুর বন্ধু?'
চমকে পিছন ফিরতেই দেখলুম একজন বুড়োমতন লোক আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে হাসি। কখন যে নিঃশব্দে আমার পেছনে এসে দাঁড়ালো লোকটা রাস্তা পেরিয়ে, খেয়ালই করিনি। অবাক হয়ে বললুম, 'হ্যাঁ, কিন্তু মাস্টারবাবু, মানে আপনাদের বিমল মাস্টারের বাড়িটা যে কোনটা আমায় যদি একটু দেখিয়ে দেন—'
'সে কি কথা বাবু। আপনাকে নিয়ে যাব বলেই তো আমি এলাম। আপনি কিনা আমাদের মাস্টারমশায়ের বন্ধু... কদ্দূর থেকে কষ্ট করে এসে এখানে চরণের ধুলো দিলেন আজ্ঞে—' আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই লোকটা বলে উঠল। তারপর দাঁত বার করে হাসল আমার দিকে চেয়ে। মনে মনে ভাবছিলুম কি বলে ডাকব লোকটাকে, অন্ততঃ সুবিমল কি বলে যে ওকে সম্বোধন করে যদি জানা যেত—
আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই যেন লোকটা বলে উঠল, 'আমার নাম চরণদাস, তা মাস্টারবাবু আমাকে চরণ বলেই ডাকেন।' তারপর হঠাৎ যেন একটু ব্যস্ত-সমস্ত হয়েই তাড়া লাগাল আমায়, 'আপনার দেরি হয়ে গেল বাবু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, চলুন এবার একটু পা চালাই—'
চরণ অন্ধকার ভেদ করে দ্রুত পা চালাল, আঁকা বাঁকা পথ ধরে। আর আমিও নিঃশব্দে অনুসরণ করলুম ওকে। এখটুখানি হেঁটে যাবার পরেই দেখলুম আর কোনো বাড়িঘরের চিহ্ন নেই রাস্তার দু'পাশে। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ফাঁক দিয়ে সরু একফালি চাঁদ উঠেছে। সেই হালকা আলোয় দেখলুম রাস্তার দুদিকেই ধূ-ধূ করছে ধানজমি। এখন চাষ শেষ হয়ে গেছে তাই মাঠ একেবারে ফাঁকা।
মিনিট পাঁচ সাত হাঁটার পর কেমন যেন একটা অস্বস্তি শুরু হল মনের মধ্যে। এই অন্ধকারে আর কতদূর চলতে হবে অন্ধের মতন? এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ যদি কোনো সাপ-খোপের গায়ে পা তুলে দিই আচম্বিতে—
ভয়ে শিরশির করে উঠল গা-হাত পা। বললুম, 'আর কদ্দুর যেতে হবে চরণ?'
'এই তো এসে গেচি বাবু, ওই যে সামনে একটা আলোর রেশ দেখছেন ওইটেই মাস্টারবাবুর ঘর, আর তার পেছনেই ওই যে দেখছেন, অন্ধকারের মধ্যেই আর একটা যেন অন্ধকারের পাহাড় উঠেছে, ওইটে আমাদের ইস্কুলবাড়ি—'
সামনে তাকাতে এবার ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল একটা বেশ পুরোনো ইঁটের বাড়ি। জানলা-দরজা বন্ধ, তবু তার ভেতরে টিমটিম করছে মৃদু আলোর আভা।
চরণ এগিয়ে এসে দরজা খুলল, চাবি ঘুরিয়ে। তারপর আমায় বলল, 'আসুন বাবু।'
এবার আমি বেশ অবাক হয়ে গেলুম। জিগ্যেস করলুম, 'চরণ, তোমার মাস্টারবাবু গেলেন কোথায়?'
চরণ হ্যারিকেনের পলতেটাকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, 'আজকের রাতটা মাস্টারবাবু থাকতে পারলেন না বাবু। বিশেষ কাজে তাঁকে একটু বাইরে যেতে হল, আপনার কোনো চিন্তা নেই। আমি রইলুম, রাতটুকু একটু কষ্ট করে একা একা কাটিয়ে দিন, কাল সকালবেলাতেই মাস্টারবাবু ফিরে আসবেন বলে গেছেন।' চরণ দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলুম সন্তর্পণে। ঘরটা বেশ বড়সড়ই। মেঝে মাটির হলেও ছাদটা পাকা। ঘরের এক কোণে শোয়ানো রয়েছে একটা তক্তপোস, ধবধবে সাদা চাদর পাতা। পাশে বই-এর র্যাক, দেখলেই বোঝা যায় পড়াশুনার সেই পুরনো অভ্যাস সুবিমলের এখনও বজায় আছে। উত্তর দিকের দেওয়ালে বেশ বড়সড় দুটো জানলা। এখন বন্ধ। অনেকক্ষণ বন্ধ থাকায় কেমন যেন গুমোট লাগছিল। আমি এবার এগিয়ে গিয়ে জানলাদুটো খুলে দিলুম হাট করে।
অল্প সময়ের মধ্যেই চরণদাস সমস্ত ব্যবস্থা করে রেখেছে। বাইরে বারান্দায় বেরিয়ে দেখলুম এক কোণে বালতি করে হাত-মুখ ধোওয়ার জলের ব্যবস্থা করে দিয়েছে চরণ। ওপরে দড়ির ওপর ধবধবে পরিষ্কার পাট করা গামছা। ঘরের মধ্যেও কুঁজোয় করে জল রাখা আছে দেখেছি। পাশে নতুন কাঁচের গেলাস। সুবিমলের ওপর জমে থাকা রাগটা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছিল চরণদাসের ব্যবস্থাপনার গুণে। ভালো করে চোখে মুখে জল দিয়ে আমি বিছানায় এসে একটু লম্বা হলুম। সারাদিনের পথশ্রম আর ক্লান্তি কামড় বসাচ্ছে শরীরে। ছাদের কড়িকাঠ গুণতে গুণতে ফুরফুরে হাওয়ায় আমি ঘুমিয়েও পড়লুম একসময়।
ভয়ানক একটা বাজ পড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসলুম আমি। হাতঘড়িতে চোখ বুলিয়ে দেখলুম রাত একটা। বাইরে কখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে বুঝতে পারিনি। এবার শুরু হল ভয়ানক ঝড়, চারদিকে থিকথিক করছে অন্ধকার। গ্রামের রাত যে এতখানি কালো জানা ছিল না। মাঝে মাঝে ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎ আর জানলা দিয়ে আচম্বিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে খাঁ খাঁ প্রেতপুরীর মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জীর্ণ স্কুলবাড়িটা। বাইরের হাওয়ায় ঘরের লন্ঠনের শিখা কেঁপে কেঁপে উঠছে ক্রমাগত। আমি এবার জানলাগুলো বন্ধ করার জন্য বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ালাম। জানলার পাশেই ঘন বাঁশঝাড়ের মধ্যে ঝড়ের তাণ্ডব চলছে আর কট-কট-কড়-ড়-ড়- আওয়াজ আছড়ে উঠছে ক্রমাগত।
মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল সন্ধে থেকে পেটে কিছু পড়েনি। ক্ষিদেবোধটাও তীব্র হয়ে উঠল হঠাৎ। এদিকে ঝড়ের তাণ্ডব অব্যাহত। বাইরে অজস্র অজানা শব্দের ভিড় আর বৃষ্টির একঘেয়ে ঝমঝম গান। দমকা হাওয়ায় এক পশলা বৃষ্টি লাফিয়ে ঘরে ঢুকে পড়তেই আমি তাড়াতাড়ি জানলার জীর্ণ পাল্লা ধরে টান মারলুম, বন্ধ করার জন্যে; কিন্তু জানলা বন্ধ হল না। প্রচণ্ড এক দমকা হাওয়া এসে লণ্ডভণ্ড করে দিল সবকিছু, আর তিন-চারবার দপদপ করে উঠেই আমার ঘরের লন্ঠনটাও গেল নিভে।
অন্ধকার আমাকে এখন আঁকড়ে ধরেছে আষ্টেপৃষ্ঠে। বাইরে ক্রমাগত পাক খাওয়া দমকা বাতাস—আর ঝমঝম বৃষ্টি। পুরো পৃথিবীটাকেই বুঝি এবার ওলোট-পালোট করে দেবে এই বন্য প্রকৃতি। অজানা এক আতঙ্কে আমি এবার চিৎকার করে উঠলুম, 'চর-ণ—চরণদা-স—'
এক ঝলক দমকা বাতাস হাহাকারের মতন তীব্র আওয়াজ তুলল ঘরময়, চরণদাসের কোনো আওয়াজ পাওয়া গেল না। সন্ধেবেলা ঘরে ঢুকেই জামার পকেট থেকে বার করে দেশলাইটাকে বিছানার ওপর রেখেছিলুম। এখন অন্ধকার ঘরে পাগলের মতন দেশলাইটাকে খুঁজতে লাগলুম।
ঠিক এই সময়েই অন্ধকার চিরে আকাশের গায়ে ঝলসে উঠল আবার তীব্র গোলাপি বিদ্যুতের রোশনাই আর সেই আলোতেই জানলার গরাদের বাইরে মুহূর্তের জন্যে স্পষ্ট হয়ে উঠল যেন কার একটা ভয়াবহ মুখ। সাদা, বিবর্ণ, রক্তহীন সেই মুখ, কোটরাগত নিষ্পলক চোখ আর মাথায় কাঁচা-পাকা অবিন্যস্ত চুল—চরণ—
তীব্র আতঙ্কে ক্রমশই হিম হয়ে যাচ্ছে আমার শরীর। নিজের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন নিজের কানে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে ক্রমাগত, পালস বিট একশো ছাপিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। স্থির, নিস্পন্দ আমি চুপচাপ বসে রইলুম বিছানার ওপর। বাইরে বৃষ্টির রেশ কমে এসেছে। হাওয়া দিচ্ছে এলোমেলো, আর হাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে কার অট্টহাসি, স্কুলবাড়ির ইঁটের পাঁজর বার করা ঘরগুলোর আনাচে-কানাচে।
প্রকৃতপক্ষে আমার এখন আর কিছুই করার নেই। আমি বন্দী, আমি নিঃসঙ্গ, আমি অসহায়—
আমি কি সত্যিই নিঃসঙ্গ? নিজের সাথেই লড়াই চলছে ক্রমাগত। যদি সত্যিই এ ঘরে আমি একা হই, তবে চারদিকে কাদের মৃদু ফিসফাস, মাঝে মাঝে কার নিঃশ্বাস পড়ছে আমার কাঁধের ওপর? সামনে, পিছনে ডানদিকে, বাঁদিকে—যেদিকেই হাত বাড়াই শুধু শূন্য। অন্ধকার নিবিড়, নিকষ, চটচটে। আলকাতরার চেয়েও গাঢ় অন্ধকার।
বুকের নীচের একটা হালকা রিনরিনে অনুভূতি আর শিরদাঁড়া বেয়ে গড়িয়ে নেমে আসা একটা মৃদু শিরশিরানি— এছাড়া আমার শরীরে আর কোনো বাড়তি উত্তেজনা বা আতঙ্ক নেই এখন। বেশ বুঝতে পারছি যে ক্রমশঃ ভয় পেতেও ভুলে যাচ্ছি আমি। চরণকে ডেকে কোনো লাভ নেই। জানি সে আর আসবে না। অগত্যা আমি চুপচাপ। প্রতিরোধহীন। বসে রইলুম।
এভাবে কতক্ষণ বসে ছিলাম জানি না। সম্বিৎ ফিরল দরজার কড়া নাড়ার শব্দে। সঙ্গে বেশ কিছু বিস্মিত কণ্ঠস্বর যার মধ্যে একটা আমার খুবই চেনা। '...কিন্তু কাল তো আমি দরজার তালা লাগিয়ে গিয়েছিলুম, চাবি এখনও আমার পকেটে।'
কণ্ঠস্বরটা চিনতে পারলুম পুরোপুরি। এ কণ্ঠস্বর সুবিমলের।
'সুবিমল, সুবিমল—' বিছানায় বসেই আমি চিৎকার করে উঠলুম।
'আরে দীপ, কি আশ্চর্য তুই এখানে—' সুবিমলের কণ্ঠ উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল।
ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে সুবিমলের গায়ে এলিয়ে পড়লুম আমি। জড়িয়ে ধরলুম ওকে দু'হাত দিয়ে।
সুবিমল দু'হাতে জড়িয়ে নিয়ে আমাকে আবার এনে বসালো বিছানায়। তারপর আমার দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল, 'তোর কি হয়েছে দীপ?'
আমি কোনো জবাব দিতে পারলুম না।
সুবিমল দু'হাত দিয়ে শক্ত করে আমার গায়ে তীব্র ঝাঁকুনি দিল এবার।
'দীপ বি ক্যাজুয়াল—ব্যাপারটা কী—আর, আর—বিমল একটু থামল তারপর আমার দিকে ফিরে অবাক গলায় জিগ্যেস করল, তাছাড়া তুই ঘরে ঢুকলি কি করে, ঘরে তো তালা দেওয়া ছিল—'
আমি তখনও স্বাভাবিক হতে পারছিলুম না। থেমে থেমে বললুম, 'আমার চিঠি পেয়ে তুই যাকে আনতে পাঠিয়েছিলি আমায়, বাসস্ট্যান্ডে,—
সুবিমল বলল, 'কী যা-তা বলছিস। আমি তো তোর কোনো চিঠি পাইনি, তোকে নিয়ে আসার জন্যেও পাঠাইনি কাউকে বাসস্ট্যান্ডে—'
'তবে যে চরণদাস বলল—'
'চরণদাস!' লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে এবার সুবিমল।
'হ্যাঁ চরণদাস।' আমি স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলুম। 'মাথায় কাঁচাপাকা অবিন্যস্ত চুল, কোটরাগত চোখ, বিবর্ণ ফ্যাকাসে মুখ—'
'তোর বিবরণে কোনো ভুল নেই দীপ, তবু এ হতে পারে না, এ মিথ্যে।' উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে এখন সুবিমল।
আমি কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে সুবিমলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম।
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সুবিমলই কথা বলল আবার। 'চরণদাস আমাদের স্কুলের দারোয়ান ছিল দীপ। কাল সকালে রক্তাল্পতায় ভুগে ভুগে তার মৃত্যু হয়। ওকে দাহ করার জন্যেই কাল রাতে আমি—'
সুবিমলের কোনো কথাই আর কানে ঢুকছিল না আমার। হাত-পা দ্রুত অবশ হয়ে আসছে আমার, বেশ বুঝতে পারছি। মাথাটাও ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। সংজ্ঞা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হবার আগে জানলা দিয়ে একবার বাইরের দিকে তাকালুম। জানলার বাইরের জমাট বাঁধা অন্ধকার ক্রমশ ফিকে হয়ে গিয়ে হালকা নীল আলো ফুটছে স্কুলের মাঠে। আকাশ জুড়ে হালকা গোলাপি রঙের উঁকিঝুঁকি। স্কুলের মাঠে দুটো দুধ-সাদা বক এতক্ষণ চুপচাপ ঘাড় গুঁজে বসে ছিল। আমি চোখ বুঁজে ফেলার আগেই এইমাত্র তারা নীল আকাশের দিকে পাখা মেলে দিল, যেখানে চরণের কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন