জয়দীপ চক্রবর্তী

ভুবনপুরে রঞ্জন দত্তর কোনও কালেই সুনাম ছিল না। পড়াশোনায় কোনওদিনই খুব একটা মতি ছিল না তার। ছেলেবেলা থেকেই সে নিদারুণ বখাটে আর দুরন্ত। তা ছাড়া তার দৌরাত্ম্যে আশপাশের বাড়ির বাগানে আম-কাঁঠাল পাকার জো থাকত না। রঞ্জনের মা নিতান্ত ভালোমানুষ। কম বয়সে স্বামীকে হারিয়ে এমনিতেই শোকে-তাপে কাতর। তার উপর ছেলের এই দস্যিপনায় শরীরে, মনে আরও ভেঙে পড়লেন তিনি। রঞ্জনের যখন বছর পনেরো বয়স, তখন দেহ রাখলেন। রঞ্জন ছিল দস্যি। মা মারা যাওয়ার পর সে হয়ে গেল দুর্বৃত্ত। দুষ্কৃতীদের দলে ভিড়ে কী একটা খুনখারাপির মামলায় ফেঁসে গিয়ে কিছুকাল পর জেল হয়ে গেল তার।
জেল থেকে ফেরার পর রঞ্জন দত্ত মানুষটা কেমন যেন পালটে গেল। চুপচাপ। কথা বলে না কারও সঙ্গে। কারও ক্ষয়ক্ষতি তো করেই না, উপরন্তু বিপদে-আপদে অন্যের পাশে এসে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে প্রাণপণে। এমন করে ক'দিন চলার পর রঞ্জন আবার একদিন কোথায় উধাও হয়ে গেল। সারা ভুবনপুর জুড়ে হইচই পড়ে গেল। কেউ বলল, ও ব্যাটা আবার নিশ্চয়ই কোনও কুকর্ম করে শ্রীঘরে ঢুকেছে। কেউ-কেউ আবার দুঃখ-দুঃখ মুখ করে বলল, 'আহা রে, রঞ্জনটা নিজের ভুল বুঝতে পেরে শুধরনোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু ওর পুরনো সাঙ্গো-পাঙ্গরা কি আর ছাড়ে ওকে? নির্ঘাত গুমখুন করে দিয়েছে ওরা ছেলেটাকে।
তবে এত জল্পনা-কল্পনাকে নস্যাৎ করে দিয়ে মাত্র দু-চারমাস পরেই ফিরে এল রঞ্জন। তবে যে ফিরল, সে আর রঞ্জন দত্ত নয়, দস্তুরমতো রঞ্জনতান্ত্রিক। পরনে রক্তবস্ত্র, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর মুখে গোঁফদাড়ির জঙ্গল। কোথাকার কোন এক ভয়াবহ শ্মশানের জাঁদরেল তন্ত্রসাধক নিজে ডেকে এনে নাকি মন্ত্র দিয়েছেন রঞ্জনকে। তারপর পাশে বসিয়ে একের পর এক শিখিয়ে দিয়েছেন মারণ উচাটন, বশীকরণের সব গুহ্যতত্ত্ব। রঞ্জন নিজের চোখে নাকি তার গুরুবাবার আশ্চর্য সাধনক্ষমতা প্রত্যক্ষ করে এসেছে সেই অমাবস্যার নিশুতি রাতে।
দাসবাবুর বাড়িতে কাজ করতে আসে মানকের মা। সে তো এখন রীতিমতো রঞ্জনবাবার ভক্তই হয়ে গিয়েছে। জনে-জনে বলে বেড়াচ্ছে যে, রঞ্জনতান্ত্রিকের অসীম ক্ষমতা। ইচ্ছে করলেই দিনকে রাত করে ফেলতে পারে সে। মৃত মানুষরা তার চারপাশে অনুগত ভৃত্যের মতো ঘুরঘুর করে সারাক্ষণ। যে-কোনও লোকের, যে-কোনও সমস্যায় রঞ্জনঠাকুরের দ্বারস্থ হলে পাঁচ মিনিটেই প্রতিকার। একটা তেল-সিঁদুর মাখানো মড়ার মাথার খুলি আছে তার। ওর উপর ফুল দিয়ে কী সব মন্ত্র আওড়াতে থাকে সে, আর সঙ্গে-সঙ্গে দুলে ওঠে খুলিটা। ব্যস, কাজ শেষ। রঞ্জনবাবার মাথার মধ্যে ঢুকে সব সমস্যার সমাধান বলে দিয়ে যেতে থাকে প্রেতাত্মারা।
মানকের মায়ের কথা প্রথমটা অনেকেই বিশ্বাস করেনি। কিন্তু রঞ্জনের নামে অকথা-কুকথা বলার ক'দিনের মধ্যে যখন হরেন দুধওলার গাভীন গোরুটা হঠাৎ মরে গেল মাঠে চরা খেতে গিয়ে, তখন থেকে এলাকার লোক আর বিশেষ ট্যাঁ ফোঁ করে না রঞ্জনকে নিয়ে। বরং সকলে মিলে চাঁদা তুলে একটা মন্দির তৈরি করে দিয়েছে রঞ্জনের আবদারমতো। আজকাল ভালো ভিড়ও হচ্ছে সেখানে নিত্যদিন। তবু লোকজনের মনে সন্দেহ ও প্রশ্নের অন্ত নেই, রঞ্জনের এই সব কাণ্ডকারখানাকে ঘিরে।
রঞ্জন চিরকালই ডাকাবুকো। ভূতের ভয় তার কোনওকালেই ছিল না, আজও নেই। রাত-বিরেতে শ্মশানে-মশানে বিস্তর ঘোরাঘুরি করেছে সে। ডাকাতের দলে ভিড়ে ডাকাতিও করেছে এক সময় অনেক। রঞ্জনের ভগবানে বিশ্বাস নেই। অতএব পাপ-পুণ্যের পরোয়াও সে করে না। রঞ্জন মানুষ খুন করে জেল খেটেছে। মানুষকে ঠকিয়ে পথে বসিয়েছে অনেকবার। এসব নিয়ে কোনও অনুশোচনা নেই তার। বরং তার স্থির বিশ্বাস, ইদানীং তাকে তান্ত্রিকের ভেক ধরতে হয়েছে খানিকটা বাধ্য হয়েই। আসলে, এখনও তো বেশ কিছু মানুষের এই সব তন্ত্রমন্ত্র, ঝাড়ফুঁকের উপর একেবারে অন্ধ আস্থা। তো, সেই বিশ্বাসটাকে কাজে লাগিয়ে বেশ সহজেই দু'পয়সা করে নেওয়া যায়। খাওয়া-পরার কোনও অভাব থাকে না। আর, বেশ একটু মান্যিগণ্যিও করে লোকে। এই মান্যিগণ্যির ব্যাপারটায় খুব লাভ আছে রঞ্জনের। সে জানে যে, এই লাল পোশাক আর ধর্মের নাম বুজরুকির আড়ালে তার মাঝরাতের যে আসল ব্যবসাটা, সেটাকেও যদি চালিয়ে নেওয়া যায় সন্তর্পণে, তা হলে পুলিশও চট করে সন্দেহ করতে পারবে না তাকে।
রঞ্জন বরাবরই ধড়িবাজ। তান্ত্রিক হিসেবে পসার জমানোর জন্য হরেন দুধওলার গোরুটাকে সে-ই মেরেছে ঘাসের সঙ্গে বিষ খাইয়ে। মড়ার খুলির নড়াচড়াটাও তারই হাতের কারসাজি। রঞ্জনের কারবার বেশ ভালোই চলছিল। লোকজনও আসছে ভালোই। মন্দিরে টাকা-পয়সাও মন্দ পড়ছে না। তবু আজ দিন-দুই হল, একটা ব্যাপারে ভারী খটকা লাগছে রঞ্জনের। ঠিক ভয় না পেলেও একটা অস্বস্তি জমা হচ্ছে মনের মধ্যে। প্রথমে ব্যাপারটা ঠিক ধরতে না পারলেও এখন রঞ্জনের মনে কোনও সন্দেহ নেই যে, আজকাল মড়ার খুলিটা মাঝেমধ্যে সত্যি-সত্যিই যেন আপনা থেকে নড়ে উঠছে তার হাতের নীচে। আরও একটা ব্যাপার লক্ষ করছে রঞ্জন। ইদানীং রাতে শুতে গেলেই তার স্পষ্ট মনে হচ্ছে, কারা যেন সব ফিসফাস করছে তার বিছানা ঘিরে। রাতে কখনও ঘুম ভেঙে চোখ খুললেই মনে হয় দপদপে আগুন-চোখ নিয়ে কারা যেন মশারির বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। সত্যি বলতে কী, গত তিন-চার রাত ঠিকমতো ঘুমোতে পারেনি রঞ্জন।
এখন শীতের সময়। বেলা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। ঠান্ডার জন্য এদিকটা লোকজন বেশি আসে না। আসলে, নির্জনতা আর গাছপালার জন্য ঠান্ডাটা এদিকে যেন একটু বেশি গায়ে লাগে। তা ছাড়া তাকেও লোকজন একটু ভয়-টয় পায়। তার নামে এলাকায় অনেক গল্প-টল্পও রটেছে ইদানীং। সে নাকি সন্ধের পর ভূতেদের নিয়েই পড়ে থাকে। মৃত লোকদের ডেকে নিয়ে কথা বলে তাদের সঙ্গে। ছোট্ট মন্দির কাম বসতবাড়ির বারান্দায় বসে আপনমনে হাসে রঞ্জন। ভাবে, সত্যি-সত্যিই যদি ভূত-প্রেত বলে কিছু থাকে, তা হলে তাদের বাগ মানাতে পারলে মন্দ হয় না। রাতের অন্ধকারে তাদের দিয়ে কাজ হাসিল করিয়ে নিয়ে কোটিপতি হয়ে যেত সে রাতারাতি। নিজের হাতে খুন-খারাপি, ডাকাতি-টাকাতির ঝামেলা নিতে হত না আর। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রঞ্জন। অনভ্যাসে হাত বসে যাচ্ছে তার। পুরনো ব্যবসাটা এবার নতুন করে শুরু করলে মন্দ হয় না।
কথাটা ভাবতে-ভাবতেই একটা হালকা পায়ের শব্দে চমকে সামনে তাকাল রঞ্জন। আর তাকিয়েই অবাক হয়ে গেল। একটা বছর বারো-তেরোর বাচ্চা ছেলে শুকনো মুখে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে চেয়ে। রঞ্জন সেদিকে তাকাতে ছেলেটা আরও একটু সামনে এগিয়ে এল। বেলাশেষের ক্ষীণ আলো এসে পড়েছে তার গায়ে। সেই আলোয় রঞ্জন তাকে একটু জরিপ করে নিল। ছেলেটার পরনে হাফপ্যান্ট, পা খালি আর গায়ে একটা কালচে চাদর জড়ানো। মাথার চুলগুলো রুক্ষ, এলোমেলো। চেহারার স্পষ্ট দারিদ্রের ছাপ। সরু চোখে তার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভারী গলায় জিগ্যেস করল রঞ্জন, 'কী চাই? এখানে এসেছিল কেন, সন্ধেবেলা?'
'আমার বড্ড বিপদ বাবা', কাঁপা-কাঁপা গলায় উত্তর দিল ছেলেটা।
'কী বিপদ?' আবার জিগ্যেস করে রঞ্জন।
'আমার মায়ের ভারী অসুখ...'
'অসুখ তো ডাক্তারের কাছে যা। আমার কাছে এসেছিস কেন?'
'অসুখটা যে অন্যরকম। হালদার ডাক্তার বললেন যে, ওষুধ-বিষুধে কাজ হবে না। ওঝা ডাকতে হবে অসুখ সারাতে গেলে', বলতে-বলতে কষ্টে গলা বুজে আসে ছেলেটার।
'হালদার ডাক্তার। নাম শুনিনি তো কখনও।' অবাক গলায় বলে রঞ্জন, 'চেম্বার কোথায়? মানে, কোথায় বসেন?'
'ওই তো, ওই দিকে' আঙুল তুলে বলে ছেলেটা। কিন্তু ঠিক কোন দিকে যে দেখায়, বুঝতে পারে না রঞ্জন। ছেলেটার কাছে একটু সরে এসে কৌতূহলী গলায় জিগ্যেস করে সে, 'তোর মায়ের হয়েছেটা কী?'
'মাথার গন্ডগোল। রাত গভীর হলেই বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে।'
'সে কী? তোর বাবা কিছু বলেন না।'
'বাবা তো নেই আমার।'
'নেই মানে?'
'হারিয়ে গিয়েছে', বলেই ছুটে এসে রঞ্জনের পায়ের উপর পড়ে ছেলেটা। কাঁদতে-কাঁদতে বলতে থাকে, 'মা ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আপনি একবার আমার সঙ্গে চলুন আমাদের বাড়ি। আমার মাকে আপনি যেভাবেই হোক ঠিক করে দিন বাবা।'
রঞ্জন ছেলেটাকে হাত ধরে তুলে দাঁড় করায়। ছেলেটার হাত দুটো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে শীতে। একটু মায়া হয় রঞ্জনের, ছেলেটার জন্য। কিন্তু পরক্ষণেই সামলেও নেয় নিজেকে। যে পেশায় নিজেকে সে জড়িয়েছে, সেখানে দয়ামায়ার লেশও যদি মনে থেকে যায়, তা হলে কাজের খুব মুশকিল। কাজেই একটু চুপ করে থেকে সে বলে, 'দ্যাখ, তোর মায়ের উপর যে অশুভ শক্তি ভর করে আছে, মায়ের কৃপায় তাকে এখনই দূরে সরিয়ে দিতে পারি ঠিকই, কিন্তু তাতে তো খরচ অনেক। যজ্ঞ করতে হবে সারারাত।'
'খরচ,' বলে বিষণ্ণ মুখে কী যেন খানিক ভাবল ছেলেটা। তারপর তার মলিন হাফপ্যান্টের পকেট থেকে দুটো চকচকে গোল চাকতি বের করে বাড়িয়ে দিল রঞ্জনের দিকে।
চাকতি দুটো হাতে নিয়ে অবাক হয়ে গেল রঞ্জন। খাঁটি রুপোর টাকা ওগুলো।
রঞ্জনকে টাকা দুটোর দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মৃদু হাসে ছেলেটা। তারপর থেমে-থেমে বলে, 'আমরা তো গরিব, কী আর দেব আপনাকে বাবা। তবে এরকম খুচরো টাকা আমাদের কাছে অনেক আছে। ক'দিন আগে উঠোনের একধারে মাটি কোপাতে-কোপাতে পেয়েছি। একটা মাটির কলসিতে রাখা ছিল মুখবাঁধা অবস্থায়!'
শুনতে-শুনতে চোখ দুটো চকচক করে ওঠে রঞ্জনের। টাকা-পয়সার কথা সে তুলেছিল ছেলেটাকে কাটিয়ে দেওয়ার জন্যই। কিন্তু রুপোর টাকাগুলো দেখার পর এত দ্রুত সিদ্ধান্ত বদল করল সে। রুপোর বাকি টাকাগুলো আজ রাতেই নিজের হাতে নিয়ে নিতে হবে। তার জন্য যে কাজই করতে হোক না কেন, কোনও কিছুতেই পিছপা হওয়া যাবে না। হোক উন্মাদ, তবু রুপোর টাকাগুলো হাতানোর সময় ছেলেটার মা যদি কোনও ঝামেলা-টামেলা পাকানোর চেষ্টা করে। ঝুঁকি না নিয়ে ঘরে ঢুকে ওর মাঝারি মাপের ছোরাটাকে লাল পোশাকের আড়ালে কোমরে গুঁজে নেয় রঞ্জন। কতদিন হয়ে গেল ব্যবহার করা হয়নি ছোরাটা। আজ অনেকদিন পরে ওটাকে মুঠোয় ভরে মনের মধ্যে রোমাঞ্চ হয়। উত্তেজনায় চকচক করে ওঠে রঞ্জনের চোখ দুটো।
ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে সে ছেলেটার সামনে এসে দাঁড়ায়। ভারী গলায় বলে, 'তোর বাড়িটা কোন দিকে?'
'আমার বাড়িতে আপনি তা হলে যাচ্ছেন বাবা?' ছেলেটা খুশি হয়ে জিগ্যেস করে।
'হ্যাঁ, যাচ্ছি।' বলে নিচু হয়ে মড়ার মাথার খুলিটা হাতে তুলে নেয় রঞ্জন।
'আমার বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। ওই যে ঋষি বঙ্কিমনগর, ওটা পেরিয়ে বেদেপাড়া, তারপর রেললাইন পেরিয়ে খানিক হাঁটলেই পৌঁছে যাব আমরা। আপনি আমার সঙ্গে আসুন। আমিই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে।' বলে পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করে ছেলেটা। রঞ্জন অনুসরণ করে তাকে নিঃশব্দে।
বেদেপাড়া পার হয়ে রেললাইনটা টপকে দাঁড়াল ছেলেটা। রঞ্জন বলল, 'কী রে, দাঁড়ালি কেন?'
'সোজা রাস্তায় গেলে আমাদের বাড়ি বেশ ঘুরপথ। ডান দিকে বেঁকে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে শর্টকাট রাস্তায় যাব?' ছেলেটা সরলভাবে জিগ্যেস করে রঞ্জনকে।
'তাড়াতাড়ি হয় যদি তো চল', রঞ্জন নির্বিকারভাবে জবাব দেয়।
আর কোনও কথা না বলে ওকে নিয়ে মূল রাস্তা ছেড়ে ডান দিকে বাঁক নেয় ছেলেটা। তারপর পায়ে-হাঁটা পথ ধরে আম আর পেয়ারা গাছের বাগানের মধ্যে ঢুকে যায়। গাছগুলো বেশিরভাগই বড় বড়। ভিতরটা ঝুপসি অন্ধকার। রঞ্জনের মনে হল, তার হাতে ধরে থাকা মড়ার মাথার খুলিটা যেন থিরথির করে কেঁপে উঠল হঠাৎ। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল রঞ্জনের। আর তখনই তার কাঁধের উপর কে যেন বড় করে নিশ্বাস ফেলল একটা। চমকে উঠে থেমে গেল রঞ্জন। পিছনে তাকাল। কিন্তু অন্ধকার আর কালো-কালো গাছপালা ছাড়া কিচ্ছু চোখে পড়ল না তার।
ছেলেটার হাসির শব্দে চমক ভাঙল রঞ্জনের। ছেলেটা হাসতে-হাসতেই জিগ্যেস করল, 'কী, ভয় পেলেন?'
'ধুস', বলে ওর কথাটা উড়িয়ে দিতে গেল রঞ্জন। কিন্তু হঠাৎ খুকখুক করে তার ঘাড়ের পাশ থেকে কে যেন হেসে উঠতে কথা আটকে গেল তার।
'কী হল?' ছেলেটা আবার জিগ্যেস করল।
'কে হাসল বল তো আমার কথা শুনে?' কাঁপা-কাঁপা গলায় জিগ্যেস করে রঞ্জন। তারপর কেমন বিভ্রান্তের মতো ছেলেটার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে বলে, 'তুই হাসিসনি তো আমার কথা শুনে?'
'আমি হাসব কেন?' অবাক গলায় বলে ছেলেটা।
'তা হলে আমি কি...'
'হ্যাঁ, আমার হাসিই শুনেছ রঞ্জন,' রঞ্জনের কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠে হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে ওর সামনে উঠে দাঁড়ানো একটা লোক।
রঞ্জনের হাতে ধরে থাকা খুলিটা হঠাৎ যেন বড় বেশি চঞ্চল হয়ে ওঠে। ভীষণ ভয় পেয়ে সেটাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে কোমর থেকে একটানে ছোরাটাকে বাইরে বের করে আনে সে। তারপর লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেটা চালিয়ে দেয় লোকটার শরীরে। আশ্চর্য ব্যাপার, কিছুই হল না লোকটার। রঞ্জনের মনে হল, ছোরাটা যেন বাতাসের মধ্যে দিয়ে ভেসে গেল।
লোকটা আবার হাসতে শুরু করল হাঃ হাঃ করে। হাসিটা যেন অন্যরকম, হিংস্র, ভয়ংকর।
লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে জীবনে এই প্রথমবার অন্য রকম এক আশঙ্কায় ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে রঞ্জন। আর কাঁপতে কাঁপতে বলে, 'কে আপনি?'
'চিনতে পারছ না? আর একটু ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখো তো আমার মুখের দিকে,' হিসহিসে গলায় বলে ওঠে লোকটা রঞ্জনের দিকে তাকিয়ে।
আকাশে চাঁদ উঠেছে তখন। গাছের ফাঁক-ফোকর গলে টুকরো-টুকরো আলো এসে পড়েছে লোকটার মুখে। সেই আলোয় লোকটার মুখের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়েই চিৎকার করে ওঠে রঞ্জন, 'এ হতে পারে না। এ অসম্ভব। জেলে যাওয়ার অন্তত দেড় বছর আগে নিজের হাতে খুন করেছিলাম তোমায়।'
লোকটা আবার হাসে। তারপর ঠান্ডা গলায় বলে, 'এই পৃথিবীতে কী সম্ভব আর কী অসম্ভব, তার কী-ই বা জানো তুমি রঞ্জনডাকাত? না হলে আমার মৃত্যুর চার বছরের মধ্যে না-খেতে পেয়ে মরে যাওয়া আমার একমাত্র ছেলেটার ডাকে কি তুমি এত সহজে এসে পড়ো আমার খপ্পরে?'
লোকটার কথায় চমকে উঠে ছেলেটার দিকে তাকায় রঞ্জন, আর আতঙ্কিত চোখে দ্যাখে, ছেলেটার বদলে সেখানে দাঁড়িয়ে মৃদু-মৃদু দোল খাচ্ছে একটা ছোট্ট কঙ্কাল, যার শূন্য চোখের কোটরের মধ্যে ধকধক করে জ্বলছে প্রতিশোধের তীব্র আগুন।
সারা ভুবনপুরে প্রবল হই চই পড়ে গিয়েছে সকাল থেকেই। বঙ্কিমনগর পেরোলে যে বেদেপাড়া, তার পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে রেললাইন, তার পাশে ভারী রহস্যজনকভাবে মরে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে রঞ্জনতান্ত্রিককে। শরীরের কোথাও একটা আঁচড় পর্যন্ত নেই। শুধু তার চোখ দুটো বিস্ফারিত এবং আতঙ্কগ্রস্ত। সারা এলাকা প্রায় ভেঙে পড়েছে রেললাইনের ধারে। সকলেই অবাক। রঞ্জনের মৃত্যুর কারণ নিয়ে চতুর্দিকে হাজার আলোচনা। শুধু বেদেপাড়ার পিছন দিকে বংশীবটতলা ফেলে যে নস্করপাড়া, সেই নস্করপাড়ায় বহুদিন আগে খুন হয়ে যাওয়া নগেন নস্করের পাগল বউটা নাকি সকাল থেকে বারবার ছুটে এসেছে রঞ্জনের মৃত শরীরটার কাছে। আর চিৎকার করেছে গলা ফাটিয়েছে, 'এতদিনে মুরোদ হল? বলি এতদিন কি হাতে জোর ছিল না তোমার?'
তার কথাগুলো পুলিশও নাকি শুনেছে। কিন্তু মাথার ঠিক নেই বলে সেগুলো পাত্তা দেয়নি কেউই।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন