জয়দীপ চক্রবর্তী

বিপুলবাবু ব্যবসায়ী মানুষ। লাভ ক্ষতির কথা না ভেবে একটি পা-ও তিনি কখনো ফেলেন না। ব্যবসা ঠিকমতন সামলাতে গেলে সব রকম লোকজনের সঙ্গেই সদ্ভাব রাখতে হয়। কখন কী কাজে লেগে যায় বলা যায় না। সরাসরি কাজে নাও যদি লাগে অন্তত প্রয়োজনীয় কাজের সময় বাগড়া না দেয় যাতে সেটা নিশ্চিত করাটাও জরুরী। এ সব কাজে খানিকটা অর্থ অনর্থক খরচা হয়ে যায় মাঝে সাঝে। মনে মনে খুব কষ্টও পান তখন বিপুলবাবু। কিন্তু উপায় নেই। এসব মেনে না নিয়ে কাজেকম্মে উন্নতি করা মুশকিল এই বাজারে।
কদিন ধরেই একজন লোক ঘোরাঘুরি করছেন তাঁর কাছে। দেখলেই বোঝা যায় পয়সার অভাব নেই তাঁর। বিপুলবাবুর বাড়ি ছাড়িয়ে আধ মাইলটাক গেলেই পুরোন মজা খালটার পাশে বিঘে খানেক জমি আছে তাঁদের। ভদ্রলোক সেই জমিটা কিনে ওখানে একটা বহুতল বানাতে চান। আগে এসব অঞ্চলে ফ্ল্যাট বাড়ির চল ছিল না। ইদানীং আর পাঁচ জায়গার মতন এখানেও দোকান পাট লোক-লস্কর বাড়ছে। নতুন রাস্তা-ঘাট গাড়ি-ঘোড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাপও বেড়ে চলেছে ক্রমাগত। কাজেই জায়গার ঘাটতি অনিবার্য। আজ না হোক কাল নিজস্ব জমি বাড়ির চেয়ে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে থাকবার চল এখানেও নিশ্চিত শুরু হয়ে যাবে।
বিপুলবাবু বোঝেন একটু গ্রামের দিকে জমি কিনে প্রোমোটারির ব্যবসা করার আইডিয়াটা মন্দ নয়। ঠিকঠাক টাকা ঢাললে ভালো লাভ পাওয়া যাবে। তাঁর নিজের আর্থিক সামর্থ্য থাকলে নিজেই হয়তো নেমে যেতেন এই লাইনে। ভদ্রলোক দর দাম মন্দ দিচ্ছেন না। উপরন্তু দোতলায় একটা ফ্ল্যাটও তাঁকে দেবার কথা। কিন্তু তবু একটা বিষয়ের কথা ভেবে কিছুতেই মন স্থির করতে পারছিলেন না বিপুলবাবু। বিপুলবাবু এমনিতে যথেষ্ট ডাকাবুকো মানুষ। চোর-ডাকাত-কুকুর-আরশোলা কোনোকিছুতেই ভয়-ডর নেই তাঁর। ভয় শুধু তাঁর একটি জিনিসেই। আর এই বস্তুটির সঙ্গে কোমর বেঁধে লড়াই করাও যায় না। খালের পাশের যে জমিটা তাঁর ঠাকুরদার আমল থেকেই প্রায় অব্যবহৃত পড়ে আছে সে জমিটি নাকি তাদেরি বাসস্থান। আজ তিন পুরুষে কেউ তাদের কখনও বিরক্ত করার চেষ্টা করেন নি। তাদেরকে তাদের মনের মতন করেই থাকতে দিয়েছেন এতকাল ধরে।
বিপুলবাবু যখন ছোট, একবার তাঁর মা ওই জমিতে শান্তি স্বস্তেন করার কথা তুলেছিলেন। বিপুলবাবুর স্পষ্ট মনে আছে তাঁর বাবা এবং ঠাকুমা দুজনেই একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠেছিলেন সেই প্রস্তাব শুনে। একটু বড় হবার পরে বিপুলবাবু বাবার মুখে শুনেছিলেন ওই জমিতে দীর্ঘদিন যারা বাস করছে তারা নাকি সব বাস্তুভূত, ওদের তাড়ানোর কথা ভাবতে নেই। সূক্ষ্মে থেকে তারা নাকি এই পরিবারের মঙ্গল সাধন করে সকলের অজান্তে। কাজেই ওদের বাস্তু থেকে উৎখাত করলে গৃহস্তের অকল্যান অবশ্যম্ভাবি। আজকাল অনেকেই এসব কথা বিশ্বাস করে না। বিপুলবাবুর ছেলে পর্যন্ত হাসাহাসি করে এই নিয়ে। কিন্তু বিপুলবাবু নিজে কথাটাকে চেষ্টা করেও মন থেকে সরাতে পারেননি কিছুতেই। অতএব আর্থিক লাভের হাতছানি সত্বেও জমিটা বিক্রির ব্যাপারে ভারি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন বিপুলবাবু।
বিপুলবাবুর একটিই ছেলে। সেও ব্যবসায়ী। শহরের দিকে নানারকমের ব্যবসা আছে তার। বাবার ব্যবসায় বড় একটা গরজ তার কোনোদিনই ছিল না। বেশ কিছুদিন ধরেই বাড়িতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিপুলবাবুর সামনে সে বলে যাচ্ছে তার নাকি ব্যবসার কাজে কয়েক লক্ষ টাকার দরকার। জমিটা বিক্রি হলে টাকাটার বন্দোবস্ত হতে পারে। তাছাড়া নতুন ফ্ল্যাটটার ওপরেও বেশ লোভ আছে তার। কাজেই মায়ের কাছে দরবার করে বিপুলবাবুকে বোঝানোর জন্যে ঝুলে পড়ল সে। বিপুলবাবুর স্ত্রী প্রথমটা গাঁই গুঁই করলেও ছেলের কথাটাও খুব ফেলনা মনে হল না তাঁর। কাজেই রাত্রিবেলা বিপুলবাবুর কাছে কথাটা পেড়ে ফেললেন তিনি। রাতের খাওয়া সেরে পান মুখে দিয়ে বিপুলবাবু সবে বিছানায় এসে বসেছেন, সুজাতা পাশে এসে বসলেন, একটু কেশে গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বললেন, 'কী ঠিক করলে তাহলে?'
'কী ব্যাপারে বলো দিকিনি?' বিষয়টা ধরতে না পেরে বললেন বিপুলবাবু।
'কী আবার', মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠেন সুজাতা, 'ওই পোড়ো জমিটার কথা বলছি। এই বাজারে অতখানি জমি অমন অবহেলায় পড়ে আছে, কাজেই লাগছে না কোনো। বিক্রি বাঁটা যদি সত্যিই করে ফেলতে পারো তাহলে লাভ বই তো লোকসান নয়। ছেলেটারও টাকার দরকার বলছে। মুখ ফুটে বলতে পারছে না হয়ত তোমায়। তাছাড়া একটা তিন ঘরঅলা ফ্ল্যাট'—
'তা টাকাটা তার কিসে দরকার শুনলে কিছু?' একটু বিরক্তি নিয়েই বললেন বিপুলবাবু।
'কিসে আবার, ব্যবসারই কাজ নিশ্চয়ই, দুম করে হয়ত বড় অর্ডার ধরেছে কিছু। হাতে অত টাকা নেই এখন'—
'সবই তো বুঝলাম', পানের পিক ফেলে বলেন বিপুলবাবু, 'কিন্তু জমিটার ব্যাপার তো সবই জানো, সেই কবেকার বাস্তু-ভূত সব। হুট করে তাদের যদি ভিটে ছাড়া করি রেগেমেগে এ বাড়িতেই হয়ত উঠবে এসে।'
কথাটা শুনে বুকের মধ্যেটা হঠাৎ ছাঁৎ করে উঠল সুজাতার। 'কী সব অলুক্ষণে কথা বলো না' বলে চারদিকে একবার তাকিয়ে নেন তিনি। তারপর নীচু গলায় বলেন সন্দেহের চোখে, 'সত্যি সত্যিই কি আর ওরা ওখানে আছে এতদিন ধরে। সেই কবেকার ভূত, তোমার ঠাকুরদার আমলের। এখনও কি আর টিঁকে আছে তারা, দেখগে যাও কবেই মরে হেজে গেছে'—
'তোমার যা বুদ্ধি,' বিপুলবাবু বিরক্ত হয়ে বলেন, 'মরবে কি গো, মরেই তো ওরা ভূত হয়েছে। ভূতেরা আর দ্বিতীয়বার মরে না।'
'যাই বলো বাপু, আমার কিন্তু সন্দেহ আছে। ভূতেরা যদি আর কখনও না মরে তাহলে ভূতে ভূতে পৃথিবীটা ছেয়ে যেত অ্যাদ্দিনে, মানুষ থাকারই জায়গা থাকত না আর।'
'তবু আমার এ ব্যাপারটায় একটু ভয় করে। মানুষের সঙ্গে এঁটে ওঠা যায়, কিন্তু ওদের কথা ভাবলে আমার এখনও হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়।'
'তাহলে কচি ছেলের মতন ভূতের ভয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকো। এত বড় সুযোগটা ফস্কেই যাক তাহলে। ও জমি আর তোমার থাকলে হয়। কোনদিন দেখবে জবর দখল হয়ে বে-হাত হয়ে যাবে সবকিছু। সবাই তো আর তোমার মতন ভূতের ভয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। নিজের লাভের কথা আজকাল সকলেই ভাবে'।
কথাটা উড়িয়ে দেবার মতন নয়। জমি বে-দখল হচ্ছে না যে এমনটিও নয়। তবু শেষ চেষ্টা করলেন বিপুলবাবু, 'জেনেশুনে ভূতুড়ে জায়গাটা লোকগুলোকে গছিয়ে দেব, কাজটা কি ভালো হবে?'
'তুমিও যেমন, যারা জমিটা কিনতে চাইছে তারা কি আর খবর না নিয়ে কিনতে চাইছে ভাবছ, ওরা জেনেশুনে যদি নিতে চায় তোমার কি? ভূত থাকলে তাদের সঙ্গে ওরাই বোঝাপড়া করে নেবেখন।'
বিপুলবাবু মুখ নীচু করে ভাবলেন খানিক। সুজাতার কথাগুলো যুক্তিসঙ্গতই মনে হল তাঁর। জমিটা পড়েই আছে কবে থেকে। আয় ইনকাম কিছুই দিচ্ছে না জমিটা। তাছাড়া জবর দখলের আশঙ্কাটাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছেনা। এই তো বাস রাস্তার পাশে সুবল নস্করের একটা কাঠা চারেকের জমিতে এলাকার ছেলে-ছোকরারা ক্লাব ঘর বানিয়ে ফেলল কদিন আগে। সুবল অনেক চেষ্টা করেও তুলতে পারল না তাদের। সুবলের জমিতে ইটের ঘর তুলে দিব্বি সকাল সন্ধে একদল ছেলে ক্যারম পিটছে দু-বেলা। কথাটা মনে পড়ে যেতে গা রি কি করে উঠল বিপুলবাবুর। বলা যায় না এসব ছেলেদের ভূতেও ভয় পায়। এ জমিটাও কোনোদিন নিয়ে নিতে পারে ওরা। তখন আর করার কিছুই থাকবে না। আইন আদালতে দমবার পাত্তর ওরা নয়। অতএব দ্বিধা ঝেড়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন বিপুলবাবু। সামনের সপ্তায় আসার কথা আছে লোকটার। বোকার মতন ভূতেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এত বড় ক্ষতি স্বীকার করার মানেই হয় না।
ব্যবসার কাজ সেরে পা চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন বিপুলবাবু। খিদে পেয়েছে। তাছাড়া সন্ধেও পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। এদিকটা এমনিতেই নির্জন। লোক চলাচল নেই বললেই চলে। এলাকাটা গাছ-গাছালিতে ভরা। দিনের বেলা এ পথে চলতে মন্দ লাগে না। কিন্তু রাতে গাছপালার আড়ালে আকাশের আলো এমন আটকে যায় যে পুরো অঞ্চলটাই অন্ধকারে যেন মুড়িসুড়ি দিয়ে বসে থাকে চুপটি করে। সেই চুপচাপ থমথমে অন্ধকার বুকের মধ্যে ভারি অস্বস্তি বয়ে আনে। বিপুলবাবুরও অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কারা যেন ফিসফিস করে কথা কইছে আশপাশ থেকে। নির্জন পথে তিনি একা, তবু বার বার মনে হচ্ছে বুঝি তিনি ঠিক একা নন। জিভটা শুকনো মনে হল বিপুলবাবুর। শিরদাঁড়ার কাছটা শির শির করছে ক্রমাগত। তিনি আরো জোরে পা চালালেন। আর তখনি লোকটা যেন ম্যাজিকের মতন অন্ধকার ফুঁড়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালো। লোকটা বেশ রোগা, লম্বা এবং চটপটে। অন্ধকারে এমন মিশে আছে যে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয় যে তার গায়ের রঙ যথেষ্ট কালো। লোকটা বিপুলবাবুর দিকে চেয়ে মিহি করে হাসল। তারপর নীচু গলায় বলল, 'বিপুল, বাধ্য হয়েই প্রায় তোমার সামনে আসতে হল বাবা। তা নইলে সামনে তো আমরা আজকাল বড় একটা আসি না কারো'—
বিপুলবাবু সরু চোখে লোকটার দিকে চাইলেন। সটান নাম ধরে কথা বলছে লোকটা তাঁর সঙ্গে। অথচ মানুষটাকে একটুও চেনা ঠেকল না। বিপুলবাবু সতর্ক হলেন। দিন কাল ভালো নয়। কে কখন যে কী মতলব নিয়ে ঘোরে বোঝা যায় না। আজ একজন পাওনাদারের কাছ থেকে কিছু টাকা পয়সা পেয়েছেন। সে টাকাও পকেটে রয়েছে। টাকার পরিমানও নেহাত কম নয়। আলতো করে প্যান্টের পকেটে একবার হাত বুলিয়ে নিলেন তিনি। চোর-ছিনতাইবাজ হয় যদি লোকটা তাহলে একা ওর মোকাবিলা করাও কঠিন। বিপুলবাবু বেশ একটু ঘাবড়ে গেলেন। লোকটা তাঁর মনের কথা পড়ে ফেলেই যেন অভয় দিয়ে উঠল হাত নেড়ে, 'চোর টোর ভাবার দরকার নেই বাপু আমায়। সারা জীবন মাস্টারি করে খেয়েছি যদ্দিন দেহে ছিলুম। চিরকাল ছেলেপুলেকে শিখিয়েছি বাঁকা কথা বোলো না, বাঁকা পথে চোলো না। সবাই যে কথা শুনেছে তা নয় অবিশ্যি। এই তো আমাদের প্রাণকৃষ্ণের ছেলে বিশু আমার কথায় আমল না দিয়ে গুন্ডা হল। ফলও পেল। বোম বাঁধতে গিয়ে ফেটে অকালে প্রাণটা গেল। এখন খুব আফশোস করে'—
'এখন আফশোস করে মানে?' বিস্মিত হয়ে বলেন বিপুলবাবু, 'আপনি কী ঠাউরেছেন আমায় বলুন দেখি, মরার পরে সে আপনার কাছে এসে আফশোস করছে। ইয়ার্কির জায়গা পাননি মশাই'—
'আহা না বুঝে অমন ভাষায় কথাটা বলা কি তোমার ঠিক হচ্ছে বাছা, হাজার হোক তোমার বাবার গৃহশিক্ষক ছিলুম আমি। পড়াশোনায় সে অবিশ্যি খুব গবেট ছিল, তবু তোমার ঠাকুদ্দার কথায়—বড় ভালোবাসতেন আমায়। সমবয়েসি ছিলাম তো, বন্ধুই ভাবতেন তাই আমায় মনের কথা সব বলতেন। আমিও আর কথা ফেলতে পারতুম না। তা মরার পরেও আমায় ছাড়লেন না। বললেন 'কোথায় যাবে আর এদিকে সেদিকে। আমার খালের ধারের জমিটা পড়ে রয়েছে বন জঙ্গল হয়ে, ওখানেই বরং একসাথে থেকে যাই দুজনে' বেঁচে থাকতে পড়াশুনোকে বড় ভালোবাসতুম তো, তাই ওই জমিতে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ভূতেদের জন্যে স্কুল বানালেন উনি। প্রথম প্রথম ছেলে-ছোকরা ভূতগুলো আসতেই চাইত না। ক্রমে ওরাও বুঝেছে মুখ্যু হয়ে ভূতুমি করার কোনো মানেই হয় না। আধুনিক শিক্ষা ছাড়া ভূতেদের অগ্রগতি কিছুতেই আর সম্ভব নয় এ বাজারে।
বিপুলবাবুর মনের মধ্যে সব ক্যামন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। লোকটা সত্যি ভূত হলে তাঁর এখন বিষম ভয় পাওয়ার কথা। এমনকি দাঁতে দাঁতে ঠোকাঠুকি বা ভিরমি খাওয়ারও অত্যন্ত মানানসই সময় এটা। কিন্তু কী আশ্চর্য, তাঁর এসব কিছুই হল না। স্বাভাবিকভাবেই লোকটার ভূতত্ত্বে ঠিক বিশ্বাস এল না বিপুলবাবুর। অন্ধকারে চোখটা সয়ে আসাতে লোকটাকে আরো ভালো করে নজর করলেন তিনি। গড়নটা রোগাটে ঠিকই, কিন্তু লোকটাকে খুব একটা অসমর্থ মনে হল না। মনে মনে নিজেকে বকা দিলেন তিনি। কাজটা ঝুঁকিরই হয়ে গেছে। এত টাকা পকেটে নিয়ে একা এ রাস্তায় আসাটা মোটেও বুদ্ধিমানের মতন কাজ হয়নি। অনেকক্ষণ আগেই একবার মনে হয়েছিল কে বুঝি পিছু নিয়েছে। ব্যাপারটা আমল দেননি তখন।
লোকটা একই রকম মিহি গলায় আবার বলতে শুরু করল, 'বাবার কাছে আমার নাম হয়ত শুনেছ তুমি। আমায় এককালে এ গ্রামে একডাকে সবাই চিনত মহিমমাস্টার নামে'—
বিপুলবাবুর বুকটা এই প্রথম ধড়াস করে উঠল একটু। নামটা সত্যিই শোনা লাগছে। কিন্তু এও কি সম্ভব? মরিয়া হয়ে তিনি বলে উঠলেন, 'ক্যানো শুধুমুধু ভূতটুতের কথা তুলছেন মশাই, রাত হয়েছে, এলাকাটা এমনিতেই সুবিধের নয়—বিশ্বাস করুন শ-দুই টাকা পকেটে আছে। বোঝেনই তো ব্যবসার বাজার মন্দা। পাওনাদার টাকা দিতে চায়না, তা এই টাকা কটা নিয়ে আমায় ছেড়ে দিন আজকের মতন—'
লোকটা বিষাদের সঙ্গে হেসে উঠল, 'আমার কথাটা কি বিশ্বাস হল না হে?'
'বিশ্বাস কি করা যায় বলুন'—
'আচ্ছা এই দেখ', লোকটা নীচু সুরে বলে উঠল, 'খুব দরকার ছাড়া এসব আমরা আজকাল আর দেখাই না যদিও, তবু তুমি আমাদের ঘরেরই লোক যখন' বলেই হাতটা হঠাৎ সামনে বাড়িয়ে দিল লোকটা। হাতটা বড় হতে হতে বড় হতে হতে এতখানি লম্বা হয়ে গেল যে বিপুলবাবু বাস্তবিক হাঁ হয়ে গেলেন একেবারে। লোকটা বিপুলবাবুর দিকে তাকাল একবার। তারপর স্নেহের সুরে বলল, 'এতেও যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে এই কেরামতিটা দেখে নাও একবার। আমাদের স্কুলে প্রাইমারি সেকশনে এসব শেখানো হয় আজকাল'—বলেই গলার ওপর মাথাটাকে দু-পাক ঘুরিয়ে নিয়েই শরীরটাকে হাওয়ার সঙ্গে একেবারে যেন মিশিয়ে দিয়ে চ্যাপ্টা আর স্বচ্ছ হয়ে গেল লোকটা।
বিপুলবাবুর পক্ষে ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গেল বোধহয়। চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে এল তাঁর। মাটিতে পড়ে যেতে যেতেই তাঁর মনে হল কে যেন ভারি সন্তর্পণে তাঁর শরীরটা দু-হাতে ধরে ফেলল। খানিক বাদে ধাতস্ত হবার পর যখন চোখ খুললেন বিপুলবাবু, তখন মহিমমাস্টারকে দেখে আর ততটা ভয় লাগল না। আসলে ভয় পেতে পেতে ভয়টা বেশ সয়ে গেছে এতক্ষণে।
মহিমবাবু মুখে চুক চুক করে আওয়াজ করলেন একটু। তারপর তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, 'যাই বল বাপু আমাদের কালে এমন কথায় কথায় ভয় পাবার চল ছিল না। এ অঞ্চল তখন তো আরো ঝোপে-ঝাড়ে ভরা ছিল। ভূত-প্রেতেরও অভাব ছিল না। পথে চলতে ফিরতে হরবখত দেখা হয়ে যেত ওনাদের সঙ্গে। কী ভাব খাতির ছিল তখন ভূতে-মানুষে। সেই সব পুরোনো দিনের ভূতেদের সঙ্গে দেখা হলে এখনও দুখ্যু করে সে সব কথা বলেন। তোমাদের দেখলে মনে মনে আবার মরে যেতে ইচ্ছে করে লজ্জায়।'
মহিমবাবুর কথায় লজ্জা পেয়ে গেলেন বিপুল। কান চুলকোতে চুলকোতে ভারি লাজুক ভঙ্গীকে তিনি বললেন, 'আর এমন হবে না। ফস করে অমন ভয় পেয়ে যাওয়াটা সত্যিই বড় অনুচিত হয়েছে।'
মহিমমাস্টার খুশি হলেন। চওড়া করে হেসে বললেন, 'বাদ দাও। যে কারনে আসা আমার তোমার কাছে সেটা এবার বলি।'
'আজ্ঞে, বলুন'। খুব বংশবদ ভঙ্গীতে বললেন বিপুলবাবু। লোকটাকে মহিমমাস্টার বলে মেনে নিতে আর সন্দেহ হল না তাঁর। মহিমমাস্টারও ব্যাপারটা বুঝে খুশি হলেন। তারপর বললেন, 'শুনলুম খালপাড়ের জমিটা তুমি নাকি প্রোমোটারের হাতে দিতে চাচ্ছো?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ, এই বাজারে অতখানি জমি বে-ফালতু জঙ্গল হয়ে পড়ে আছে। আয় ইনকাম নেই। ওই জামিতে চাষ আবাদও হয় না'—
'তাই বলে আমাদের এতদিনের বাস তুলে দেবে তুমি, কত নমস্য মানুষ ভূত হয়ে আলো করে রেখেছেন জায়গাটা। শক্ত পোক্ত পা নেই বলে তাঁদের পদধূলি হয়ত সে মাটিতে মিশছে না, কিন্তু তাদের ছায়া শরীরের হাওয়া তো মিশছে ওই জমির বাতাসে। তাছাড়া তাদের আশীর্বাদেরও একটা জোর আছে। তারপর ধরো আমার স্কুলটা—এতগুলো নিষ্পাপ ভূতশিশুর শিক্ষা-দীক্ষার আয়োজন পন্ড করবে তুমি, ধম্মে কি সইবে এসব? তোমার বাপ ঠাকুদ্দার মনের অবস্থাটাই বা কী হবে ভেবে দেখেছ কখনও?'
'এমনভাবে সত্যিই ভাবিনি, সঙ্কোচের সঙ্গে জানালেন বিপুলবাবু, 'বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমার জমিটা বেচার ইচ্ছেও খুব ছিল না। কিন্তু'—
'ছেলে বউ চাপ দিল'—তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠলেন মহিমমাস্টার।
'কথাটা মিথ্যে নয়, তবে ওদের প্রস্তাবটাও আবার পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। ব্যবসায়ী মানুষ তো, অর্থ ক্ষতি সইতে পারি না। এই বাজারে অতখানি জমির অনেক দাম। টাকাটা ছাড়া বোকামিই হয়ে যায় বুঝলেন না?'
'তোমরা এই টাকা টাকা করেই মরলে বাপু', একটু বিরক্তির সঙ্গেই বললেন মহিমমাস্টার, 'যতই দেখচি তোমাদের অবাক হয়ে যাচ্ছি হে। বলি বাপু টাকাটাই কি দুনিয়ার সব যার জন্যে ভূত ভবিষ্যৎ সকলের কথা ভুলে বসে থাকতে হবে?'
'কিছু মনে করবেন না স্যার' বিপুলবাবু হাসলেন, 'আপনি সেকেলে মানুষ তো সবটা তাই ধরতে পারবেন না। তবে কি জানেন টাকা পয়সার ব্যাপারটা সত্যিই এ বাজারে আর ফেলনা নয়, টাকা যত মান্যিগন্যিও তত। ভূতেদের কথা ভেবে ভবিষ্যতটাকে জলাঞ্জলি দেওয়াটা বোকামিই হয়ে যাবে'—
'শোনো বাবা বিপুল, ভূত মানে অতীতও। এটা অস্বীকার করতে যেও না, অতীতকে স্বীকার না করলে ভবিষ্যতটা বড় গোলমেলে হয়ে যায়।'
কথাটা বিপুলবাবুর কাছে বেশ কঠিন শোনালো। তবে ক্যানো যেন কথাটা তাঁর ঠিক মিথ্যে বলেও মনে হল না। অসহায়ের মতন মুখ করে তিনি বললেন, 'তাহলে কী করতে বলেন আমায়?'
'ও জমিটায় আর হাত দিও না বাবা। বরং লোক দিয়ে পরিষ্কার-টরিষ্কার করিয়ে খেলার মাঠ বানাও। এলাকায় খেলার মাঠের বড় অভাব। সব খোলা জমিগুলোয় বাড়ি ঘর দোকান-পাঠ উঠে যাচ্ছে হু-হু করে। পরের প্রজন্মের ছেলেগুলো আর সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারবে না এরপর। আমাদের স্বপ্ন দেখতে নেই, তবু তোমার কাছে বলতে দ্বিধা নেই, মাঝে সাঝে লুকিয়ে চুরিয়ে আমি একটা স্বপ্ন খুবই দেখি—'
'কী স্বপ্ন?' অবাক হয়ে বলেন বিপুলবাবু।
'তোমাদের খালপাড়ের জমিটায় সত্যি একটা স্কুল হবে। সেখানে ভারী ব্যাগ আর গুচ্ছের বই পত্তরের বাহ্যাড়ম্বর থাকবে না, ছেলেরা মাঠ দাপিয়ে হই হই করে খেলবে, গান গাইবে, ছবি আঁকবে, আবার জীবনে সত্যিকারের বড় হবার শিক্ষাটুকুও কুড়িয়ে নেবে। গাছে গাছে পাখি ডাকবে। সকালের সোনালি রোদ আর রাত্তিরের রূপোলি চাঁদের আলো গায়ে মেখে স্কুলবাড়িটায় সকালে মানবশিশু আর রাতে ফুলের মতন কচি কচি ভূতগুলো শিক্ষার আলো পেয়ে ঝলমল করে উঠবে—'
'সে না হয় হল। কিন্তু আমার লাভ কী হবে তাতে' অসহায় গলায় জিগ্যেস করলেন বিপুলবাবু, 'মানে আমার ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করুন, বাড়ির লোকগুলোকে কিছু একটা লাভের কথা বলে রাজি করাতে হবে যে—'
'আবার সেই লাভ ক্ষতির অঙ্ক কষছ বাছা?' দুঃখিত হয়ে বললেন মহিমবাবু।
'কী করি বলুন, উপায় নেই যে—'
'দেখ স্কুলের নাম যশ যত বাড়বে তোমার নাম, খ্যাতিও বাড়বে। লোকে ধন্য ধন্য করবে তোমায়।'
'আজ্ঞে ব্যবসায়ী মানুষ তো, ওতে আমার ঠিক মন উঠছে না।'
'শুধু এই এলাকার মানুষের কল্যানের জন্যে নয়, ভূতেদের কল্যানে যারা আন্তরিক কাজ করেছেন সেই ভূতুড়ে ইতিহাসে তোমার নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।'
'সোনার অক্ষর কাজে লাগে না যে মাস্টারমশাই, যদি তার বদলে সোনার টাকা কিছু দিতেন তবু কাজে আসত সংসারে। তাছাড়া এ বাজারে আপনার স্বপ্নটাকে বাস্তবে রূপ দিতেও তো কম টাকা লাগবে না—'
'তা টাকা পয়সা তো কম নেই বাপু তোমার। তবু হিসেবি মানুষ তুমি, এমনি কিছু সহজে করবে না বুঝতেই পারছি। ঠিক আছে, লেগে পড় এ কাজে, টাকার যোগান আমরা দেব। তোমার কাজের শেষে সোনার টাকাও দেব মাসে মাসে। ভেবে দেখ এবার চুক্তিটা লাভজনক হল কিনা—'
'সোনার টাকার নমুনা দিন তাহলে—'
'তুমি বড্ড হিসেবি আর পয়সা-পিশাচ বাপু। নাও হাত পাতো', বলে দুখানা সোনার টাকা বিপুলবাবুর হাতে দিলেন মহিম মাস্টারমশাই। তারপর বললেন, 'কাল খালপাড়ে দেখা কোরো। বুড়ো বয়েসে তোমার পিছনে এদিক সেদিক ঘুরতে পারব না বাছা।'
বিপুলবাবুর মনটা এখন বেশ খুশিই। পকেটে সোনার টাকা। খালপাড়ের জমিটারও দিব্বি বিলি বন্দোবস্ত হল। বাপ পিতামহর কথামতন বাস্তু ভূতেদের চটানোর দরকার হল না। আবার আমদানিরও পথ হয়ে গেল একটা। বাড়ি ফিরে পাওনাদারের টাকাগুলো গিন্নির হাতে দিয়ে দরাজ গলায় বললেন তিনি, 'ভালো এক কাপ চা খাওয়াও দেখি কড়া করে।'
সুজাতা কথা না বলে চা আনতে চলে গেলেন। বিপুলবাবুর ক্যামন বেসুরো ঠেকল সুজাতার চলে যাওয়ার ভঙ্গীটা। চা নিয়ে তিনি ফিরে আসতেই আবার বললেন তিনি, 'জমিটার অন্য ব্যবস্থা করার সুযোগ এসে গেল গিন্নি, লাভ মন্দ নয়, মাসে মাসে গিনি। স্কুল দাঁড়ালে তার লাভ তো আছেই। তাছাড়া জমিটাও হাতছাড়া হল না—'
সুজাতা উৎসাহ দেখালেন না। বিপুলবাবু অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, 'কী ব্যাপার বল তো—'
'ছেলে বউমা ছুটকুকে নিয়ে শহরে চলে যেতে চাইছে নতুন ফ্ল্যাট কিনে—'
'অ্যাঁ, সে কি, কে বলল?'
'ওই জন্যে টাকার দরকার ওর। নাহলে ফ্ল্যাটটা নেওয়া হবে না। ব্যাঙ্ক লোন পেতে কী নাকি অসুবিধা আছে ওর। বউমাকে বলছিল, আমি শুনে ফেলেছি।'
কিন্তু চলে যেতে চাইছে ক্যানো?'
'বলছে ছুটকু একটু বড় হলেই তাকে তো পড়াশুনো শেখাতে হবে ঠিক করে। আর এ গ্রামে থেকে তা সম্ভব নয়। ছুটকুর ভবিষ্যতের কথা ভেবে ওদের গ্রাম ছাড়তেই হবে এক বছরের মধ্যে—'
'বটে'—সুজাতার কথার মাঝখানেই বলে ওঠেন বিপুলবাবু, 'ইয়ার্কি পেয়েছে নাকি। দাঁড়াও না যাওয়াচ্ছি ওদের'—
ছুটকুটা চলে গেলে আমি এ বাড়িতে থাকতে পারব না, বাড়িটা খাঁ খাঁ করবে সবসময়, তুমি বরং ওই জমিটা বেচো না। তাহলে টাকার অভাবে শহরের ফ্ল্যাটটা আর কিনতে পারবে না ও'—
'এটা কোনো কাজের কথা নয় গিন্নি,' বলে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন বিপুলবাবু, 'কেনার কারণটা যদি থেকে যায় তাহলে আজ না কিনতে পারলেও কাল কিনবে ফ্ল্যাটটা। কাজেই আমি ওভাবে ব্যাপারটা আটকাতে চাই না। আমার সঙ্গে মহিম মাস্টার আছেন। শুধু দেখে যাও কী করি। এ গ্রামের মধ্যেই এমন স্কুল বানাব যে তাক লেগে যাবে সবার। শুধু তোমার ছেলে ক্যানো, এ গাঁয়ের একজনও আর পড়াশুনোর অসুবিধার জন্যে ভিটে ছাড়া হবার চিন্তা আনবে না মনে। একটা রাত্তিরের মামলা। কালই খালপাড়ে গিয়ে কথা দিয়ে দেব মহিম মাস্টারমশাইকে। আর সোনার টাকা দুটোও ফেরত দিয়ে দেব তাঁকে। টাকার চেয়েও অনেক দামি আর দরকারি জিনিস আছে আমাদের, যেগুলোকে যত্ন করে আগলে রাখতে হবে। পয়সার কথা ভেবে সেগুলোকে হাতছাড়া হতে দেওয়া যাবে না কোনো ভাবেই।'
সুজাতা হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন বিপুলবাবুর দিকে। তাঁর কথাগুলো অদ্ভুত ঠেকছে। মানে বুঝতে পারছেন না। তবু কী ভীষণ ভালো লাগছে যে কথাগুলো। মনে ক্যামন যেন ভরসা আসছে নতুন করে। তিনি বিপুলবাবুর দিকে তাকিয়েই রইলেন চুপটি করে। মানুষটাকে আজ একেবারে অন্যরকম লাগছে। অচেনা, মায়াবী আর ভারি আপনজনের মতন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন