সুজন দাশগুপ্ত
হঠাৎ করেই ব্যাপারটা ঘটে গেল। বাজারের থলি হাতে বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে চৌকাঠে কোলাপুরি চটির স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে শান্তনু প্রায় উলটে পড়ছিল। সুললিতা দেবী পাশেই ছিলেন। ছেলেকে ধরতে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে গোড়ালিতে একটা মোক্ষম মোচড় লাগালেন। দেখতে দেখতে সেটা বড়সড় ফুটির মতো ফুলে উঠল, সঙ্গে কনকনে ব্যথা। রোগীর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও শান্তনু ও বহুদিনের চাকর গিরিজা সুললিতা দেবীকে ধরাধরি করে ডাক্তার সেনের চেম্বারে নিয়ে তুলল।
সঞ্জীবন সেন পাড়ার নতুন ডাক্তার। বছর দুয়েক হল প্র্যাকটিস শুরু করেছে। হাসিখুশি ভদ্র ছেলে, সুললিতা দেবীর অতিশয় স্নেহের পাত্র। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সুললিতা দেবীর শরীর আজকার আর অত ভালো যায় না। সঞ্জীবনকে ডাকলেই বাড়িতে আসে, যত্ন করে চিকিৎসা করে। শুধু আসে তাই নয়, সুললিতা দেবীর বক্তব্য সে মন দিয়ে শোনে। আর সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা। আজকালকার দিনে শ্রোতা পাওয়া কঠিন। সবাই নিজের কথা বলতে ব্যস্ত, শুনতে কেউ রাজি নয়। সঞ্জীবন তেমন ছেলে নয়। ইদানীং অবশ্য পসার বেড়েছে, একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাও ভারী ভদ্র। নতুন গাড়ি, রোগীভর্তি চেম্বার— সুললিতা দেবী এগুলো দেখেন আর খুশি হন। সৌভাগ্য যদি কারও হতে হয়, তাহলে সঞ্জীবনের মতো ছেলেরই হওয়া উচিত।
চেম্বারে রোগী গিজগিজ করছে, কিন্তু সুললিতা দেবীকে বসতে হল না। সঞ্জীবন সেন ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভে বিশ্বাসী নয়, রোগীবিশেষে তার পক্ষপাতিত্ব আছে। সুললিতা দেবীকে দেখেই সে হইহই করে উঠল, “কী হল মাসিমা, কী বাধিয়েছেন আবার?” বলেই অবশ্য প্রমাদ গুনল। এই গুরুতর প্রশ্নের উত্তর কখনোই দু-এক কথায় শেষ হতে পারে না। পুরো জবাবটা শুনতে হলে সকালটা নির্ঘাত কাবার হয়ে যাবে। কিন্তু এখন আর শোধরাবার উপায় নেই!
সুললিতা দেবী বললেন, “আর বলো কেন সঞ্জীবন, বুবুল বাজারে যেতে চাইল। আমি বললুম গাড়িটা খারাপ, আজ আর গিয়ে কাজ নেই। ও কি তা শোনে!...”
“বসুন, চেয়ারটাতে বসুন। নিন, এই টুলের ওপর পা-টা তুলুন… তুলুন… আর একটু… এই তো… ব্যস।”
“রাখছি বাপু, রাখছি, অত তাড়াহুড়ো কোরো না। শোনো, তারপর বেরিয়ে তো আর ট্যাক্সি পাই না। বাসও আর আসে না। অনে-এ-এ-ক পরে শেষ পর্যন্ত একটা বাস এল। আট নম্বর বা বারো নম্বর, নম্বরগুলো আবার মনেও থাকে না ছাই!”

শান্তনু একবার মাকে থামাবার চেষ্টা করল, “এগুলো আর বলে কী হবে!”
“তুই চুপ কর তো, রোগীর কথা না শুনলে ডাক্তার ওষুধ দেবে কী করে? কী বলছিলাম জানি? ও হ্যাঁ, বাস তো এল, কিন্তু কী প্রচণ্ড ভিড়!”
“বুঝতে পেরেছি এখন, বাসে উঠতে গিয়েই এই অবস্থা।”
“খেপেছ নাকি, সেই বাসে আমি উঠি! বললুম ট্যাক্সি ধরতে পারিস তো ভালো, নইলে আমি হাঁটছি, এই ভিড় বাসে উঠে গুঁতোগুঁতি করতে পারব না।”
“ওইখানেই তো ভুল করলেন মাসিমা। অনভ্যাসের হাঁটাহাঁটি, ফল তো এখন ভুগতেই হবে। এখানে টিপলে লাগে?”
“আরে শোনো না আগে কী হল, তারপর তোমার ডাক্তারি কোরো।”
“শুনছি, শুনছি, আপনি বলুন, আমি ততক্ষণ পা-টা দেখতে থাকি।”
“শেষমেশ ট্যাক্সি তো একটা পাওয়া গেল। কিন্তু ড্রাইভার ব্যাটার কী তেজ! বলে কিনা মিটারের থেকে তিরিশ টাকা বেশি দিতে হবে। দিনকাল যে কী হচ্ছে সঞ্জীবন? উঃ উঃ, কী করছ ওখানে?”
“সরি মাসিমা, ব্যথা লাগল বুঝি? ব্যস, আর কিছু করব না, দেখা হয়ে গেছে আমার।”
“ফ্র্যাকচার হয়েছে না কি?” শান্তনু উদ্বিগ্নভাবে প্রশ্ন করল।
“মনে হয় না। তবে স্প্রেইনটা বেশ সিভিয়ারই হয়েছে। একটা স্ট্রং পেইনকিলার দিচ্ছি, ব্যথাটা তাতে কমবে। একটা ইলাস্টিক ব্যান্ডেজও বেঁধে দিচ্ছি। সেটা মাঝে মাঝে খুলে গুলার্ড সল্যুশন দিয়ে গোড়ালিটা ভিজিয়ে রাখবেন।”
“ফোলাটা কি আপনি-আপনিই কমে যাবে?”
“উচিত।” সঞ্জীবন আলমারি খুলে ব্যান্ডেজ খুঁজতে পাগল।
“ও সঞ্জীবন, শুনলেই না তো আমার কথাটা!” সুললিতা দেবী অনুযোগ করলেন।
“বা রে, আপনিই তো বললেন না।” হাসিমুখে সঞ্জীবন উলটো চাপ দিল।
“ঠিক আছে, তাহলে বলি। বাজার-টাজার সেরে ফিরেছি। বুবুলের যত তড়িঘড়ি, ট্যাক্সি থেকে নেমেই ছুটেছে। পায়ে আবার বড় বড় স্যান্ডেল, কী যে ফ্যাশন হয়েছে আজকাল! হোঁচট খেয়ে প্রায় পড়ছিল আর কি! কিন্তু পড়ার আগেই খপ করে ধরেছি। তখন খেয়াল হয়নি, বেকায়দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম বোধ হয়…”
“যাক, কমের ওপর দিয়েই গেছে বলতে হবে,” সুললিতা দেবীর বর্ণনার সংক্ষিপ্ততায় মুগ্ধ হল সঞ্জীবন সেন। “ব্যান্ডেজটা বাঁধি এখন? ব্যথা লাগলেই কিন্তু বলবেন।”
“একটু সাবধানে বাঁধো বাপু, ব্যথা আমার সর্বত্র।”
“ভয় নেই মাসিমা, খুব আস্তে আস্তে বাঁধব।”
“ভয়-ফয় আমার নেই। শুধু বলো কত দিন লাগবে সারতে?” সুললিতা দেবী একটু যেন অস্থির।
“বলা শক্ত। সাবধানে কাটান ক-দিন। যদি একেবারেই না কমে, তাহলে এক্স-রে করতে হবে।”
“সে কী কথা! এই বৃহস্পতিবার আমায় যে সুখচিন্তাপুর যেতে হবে!”
“উঁহুঁ, এই অবস্থায় একদম নড়াচড়া করবেন না। ক্যানসেল করে দিন যাওয়াটা।”
“আরে বাপু, এসব শুভ কাজ কি এত সহজে ক্যানসেল করা চলে!” সুললিতা দেবী সস্নেহে পুত্রের দিকে তাকালেন।
শান্তনু চঞ্চল হল। ব্যান্ডেজে ক্লিপ লাগাতে লাগাতে অন্যমনস্ক সঞ্জীবন সেন মুখ ফসকে “শুভ কাজ!” বলেই মনে মনে জিভ কাটল। আবার একটা ফ্যাসাদ বাধাল নিজেই! অসহায় দৃষ্টিতে পর্দার ফাঁক দিয়ে অপেক্ষমাণ রোগীদের দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি শোধরাবার চেষ্টা করল, “অবশ্য ব্যাপারটা পরে ধীরেসুস্থে শোনাই ভালো। এই ভিড়ের মধ্যে ওসব… তা ছাড়া আপনার পায়েও ব্যথা।”
“পায়ে আবার এমন কী ব্যথা? এলামই যখন বলে ফেলি তোমায়! এ কি আর একদিন-দুদিনের কথা, এ আমার বহুদিনের সাধ…”
শান্তনু তাড়াহুড়ো করে মাকে থামাবার চেষ্টা করল। “মা, ডক্টর সেন এখন ব্যস্ত, রোগীরা সব অপেক্ষা করছে!”
প্রসঙ্গটা পালটাবার সুযোগ পেয়ে সঞ্জীবন সেন লাফিয়ে উঠল, “মা! আরে এই দেখুন, আলাপই হয়নি আপনার সঙ্গে। মাসিমার মুখে কত শুনেছি আপনার কথা! এলেন কবে?”
“এই তো দিন কয়েক হল।”
“ক-দিন আছেন?”
“মাস দেড়েকের মতো থাকব।”
“খুব গরম লাগছে নিশ্চয়, ঠান্ডার দেশ থেকে আসছেন!”
“তা একটু লাগছে। তবে যেখান থেকে আসছি সেখানেও মন্দ গরম পড়ে না।”
“গরম ওদেশেও পড়ে তাহলে! তবে এরকম প্যাচপ্যাচে নিশ্চয়ই নয়।”
শান্তনু হাসল।
“সাবধানে থাকবেন। বাইরে গেলে সবসময়ে বোতলের জল খাবেন। আপনারা তো ব্যাকটেরিয়া খেতে অভ্যস্ত নন। বাড়িতে রিভার্স অসমোসিস থাকলে চিন্তা নেই, তবে সবচেয়ে সেফ হল জল ফুটিয়ে খাওয়া।”
“শুধু খাবার জল নয় বাপু, বাসনপত্রও ধোয়াচ্ছি গরম জলে,” সুললিতা দেবী বললেন।
“চমৎকার, তাহলে তো চিন্তাই নেই।”
“তা তোমাকে যা বলছিলুম,” সুললিতা দেবী আবার পুরোনো খেই ধরে শুরু করলেন, “যাচ্ছি শুকতারার বাড়ি। শুকতারাকে চেনো তো, সুনন্দার ভাসুরের মেয়ে, চন্দ্রিমার জ্যাঠতুতো দিদি।”
“নামটা যেন শুনেছি,” সঞ্জীবন এবার একটু উৎসুক।
“শান্তনুকে একবার দেখতে চায় শুকতারা আর পুষ্পেন্দু, বহুদিন দেখেনি তো।”
“আই সি।” বলার ধরনেই বোঝা গেল রহস্যটা সঞ্জীবন সেনের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। না হওয়াটাই অস্বাভাবিক, এ জগতে তেমন বোকা বিশেষ কেউ নেই। সঞ্জীবন সেনকে নমস্কার জানিয়ে মাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে বেরিয়ে পড়ল শান্তনু।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন