সুজন দাশগুপ্ত
পুষ্পেন্দু মিত্র এক নির্বিরোধ গোবেচারা ভদ্রলোক। ধবধবে ফরসা রং, মাথায় অল্প একটু টাক, বেঁটেখাটো গুটগুটে চেহারা। বউকে বড্ড ভালোবাসেন, আবার সেইসঙ্গে ভয়ও করেন বেশ। বন্ধুরা সবাই খ্যাপায় মেনিমুখো, ম্যাদামারা, শ্রীচরণের ছুঁচো বলে। পুষ্পেন্দুবাবু তাতে চটেন না। বরাবরই তিনি চালিত হয়েছেন স্ত্রী-শক্তির তাড়নায়। তাঁর মাতৃদেবী ছিলেন অতিশয় জাঁদরেল মহিলা। পুত্র পুষ্পেন্দুকে তিনি লৌহ-কঠিন শাসনের মধ্যে রেখেছিলেন। বিয়ের পরে নাকি পুরুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন ঘটে। পুষ্পেন্দুবাবুর ক্ষেত্রে কথাটা কিন্তু একদম খাটেনি। পরিবর্তনের মধ্যে তিনি শুধু মায়ের হস্তচ্যুত হয়ে বউয়ের খপ্পরে এসে পড়েছেন। মা ও বউয়ের মধ্যে পুষ্পেন্দুবাবুর মালিকানা নিয়ে যে টাগ-অফ-ওয়ারের সম্ভাবনা ছিল, সেটাও তেমন জমে ওঠার সময় পায়নি। বিয়ের অতি অল্পদিনের মধ্যেই দূরদর্শী মাতৃদেবী রণে ভঙ্গ দিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। সুতরাং পুষ্পেন্দুবাবুর জটিলতাবিহীন জীবন কেটেছে নিরবচ্ছিন্ন বশ্যতায়, স্ত্রীজাতির হুকুম পালন করে। তাতেই তিনি অভ্যস্ত ও সন্তুষ্ট। মাঝে মাঝে অবশ্য বিদ্রোহ করেছেন, কিন্তু সেটা মনে হয় দলিত মথিত হয়ে পুনর্শাসিত হবার লোভেই। পৌরুষের প্রতীক হিসেবে কেবল একটা জিনিসই তিনি সযত্নে রক্ষা করেছেন। সেটা হচ্ছে চার্লি চ্যাপলিন মার্কা একটি গোঁফ। স্ত্রীর ঘোরতর আপত্তি সত্ত্বেও সেই গোঁফ তিলে তিলে বেড়েছে। এখন সেটাকে দেখলে তারিফ না করে থাকা যায় না। ঘন পুরু কালো ভেলভেট নাকের নিচ থেকে ঠোঁট পর্যন্ত নেমে যেন থমকে গেছে। পুষ্পেন্দুবাবু মাঝে মাঝেই চিরুনি দিয়ে ওটাকে টেনে তরিজুত করে ছাঁটেন, মাঝেমধ্যে ওটাতে আতর-টাতরও লাগান। বলতে গেলে ওটাই ওঁর একমাত্র শৌখিনতা।
সেদিন পুষ্পেন্দুবাবু সকালে উঠেই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কেবলডাঙায় একটা ব্রিজ ইন্সপেকশনে তাঁর যাওয়ার কথা। অফিসের জিপটা মেরামতে গেছে। সুতরাং ট্রেন ধরতে হবে। নিজের গাড়িটা একবার নেবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু শুকতারা মতলবটা শুনেই নাকচ করে দিয়েছেন। ট্রেনের কথা চিন্তা করলেই পুষ্পেন্দুবাবুর পেটব্যথা শুরু হয়। হই-হট্টগোল, ধাক্কাধাক্কি, ছিনতাই, ডাকাতি, কলিশন… বাস্তবিকই একটা বিপদসংকুল বাহন! কিন্তু যেতে তাঁকে হবেই। দু-দিন আগে ফোনে কথা হয়েছে। কলকাতা থেকে কনট্রাক্টর কোম্পানির চিফ ইঞ্জিনিয়ার আসছেন। পুষ্পেন্দুবাবুর অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পরিমল ইতিমধ্যেই কেবলডাঙা পৌঁছে গেছে। সুতরাং এখন আর ওঁর পিছোবার পথ খোলা নেই। কনট্রাক্টর কোম্পানির সাইট ইঞ্জিনিয়ার দিবাকর আবার পুষ্পেন্দুবাবু ভাগনে, মাসতুতো দিদির ছেলে। দিদি থাকেন সুখচিন্তাপুরের কাছেই। ক-দিন আগে দিদি এসে একগাদা কাপড়চোপড়, বইপত্র পুষ্পেন্দুবাবুর কাছে রেখে গেছেন। ছেলের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য। সেগুলো নিয়েই পুষ্পেন্দুবাবু আপাতত হিমশিম খাচ্ছেন।
“শুনছ?” শুকতারা নিচ থেকে হাঁক দিলেন।
“বলো,” পুষ্পেন্দুবাবু দোতলায় জিনিসপত্র বোঝাই সুটকেসটাকে কোনোমতেই কব্জা করতে পারছিলেন না।
“তোমার প্যাকিং শেষ হয়েছে?”
“হ্যাঁ।
“তাহলে নেমে এসো।”
“এক মিনিট। মুখটা এখনও বন্ধ করতে পারিনি।”
“কী করতে পারোনি?”
“মুখটা গো, সুটকেসের মুখটা। বন্ধ হতে চাচ্ছে না, ঝামেলা করছে বড্ড।”
“এই যে বললে প্যাকিং হয়ে গেছে!”
“প্যাকিং শেষ। আসলে বড্ড বেশি জিনিস ঢুকিয়েছি, ডালাটা তাই… উঃ, প্রায় হয়ে গিয়েছিল,” আর একটা চাপ দিয়ে ডালাটা আটকাবার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন পুষ্পেন্দুবাবু।
“তাড়াতাড়ি করো, দশটার সময় তোমার ট্রেন, খেয়াল আছে সেটা?”
“আছে গো আছে। কালীচরণ কী করছে?”
“রিকশা ডাকতে গেছে। কেন?”
“একটু বসতে বলতাম সুটকেসের ওপরে। একটু বসলেই ছিটকিনি মানে টিপকলটা লাগানো যেত।”
“কী ছিট, টিপ বলছ?”
ধ্যাত্তেরি! কী যে বলে এটাকে? পুষ্পেন্দুবাবু মনে করতে পারলেন না। ‘ল্যাচ’ বোধ হয়। “ওই যে গো সুটকেসের ল্যাচটা।”
“ল্যাজ আবার কী?”
“যেটা দিয়ে ডালাটা নিচে আটকায়। টিপকলের মতো... ঢুকিয়ে তালা লাগাতে হয়।”
“কালীচরণ কী করবে?”
“একটু বসবে ডালাটার ওপরে।”
“তুমি নিজে বসো না।”
“আমার ওজনে ঠিক হচ্ছে না। মোক্ষদা কী করছে, বাসন মাজা শেষ হয়েছে ওর?”
“মোক্ষদাকে দিয়ে কী হবে?”
“বসতে বলতাম একটু।”
“লজ্জা করে না তোমার, নোংরামো যত!”
“নোংরামোর কী আছে এর মধ্যে? সুটকেসে বসলেই টুক করে ল্যাচটা লাগিয়ে ফেলতাম। এর মধ্যে আবার ইয়ে কী দেখলে তুমি?”
“চুপ করো, যতসব উদ্ভুট্টে কথা! বুড়ো বয়সে ভীমরতি। তাড়াতাড়ি নেমে এসো।”
“দুত্তোর,” পুষ্পেন্দুবাবু চাপা স্বরে স্বগতোক্তি করলেন।
হঠাৎ তাঁর মাথায় একটা প্ল্যান খেলল। স্ট্যাটিক ফোর্সের বদলে ডায়নামিক ফোর্স দিলে কেমন হয়? সুটকেসের ওপর লাফিয়ে উঠলে ডালাটা মুহূর্তের জন্য হলেও খানিকটা অন্তত দেবে যাবে। টাইমিং করে ঠিক সেই মুহূর্তে ল্যাচটা আটকাতে পারলেই কেল্লা ফতে! পরিকল্পনাটা নিঃসন্দেহে অভিনব। কিন্তু তার সুষ্ঠু সম্পাদন হল না ক্ষিপ্রতার অভাবে। আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও সুটকেসের ডালা যথেষ্ট নেমে এলেও ল্যাচ লাগাবার মাহেন্দ্রক্ষণটা মিস হয়ে যাচ্ছিল। ব্যাপারটা যখন নিজের কাছেই হাস্যকর হয়ে দাঁড়াল, তখন ‘ধু-উ-উ-স’ বলে হাল ছেড়ে বসে পড়লেন।
একটু দেরি করেই ফিরল কালীচরণ। শুকতারা কঠিন স্বরে প্রশ্ন করলেন, “এত দেরি করলি যে?”
“দেরি কই মা?”
“রিকশা ধরেছিস?”
“আজ্ঞে না তো।”
“সে কী! না ধরেই চলে এলি?”
“আপনি তো ধরতে বলেননি!”
“বলিনি মানে! পাঠালাম কেন তোকে বদ্রীবাবুর কাছে?”
“সে তো ন-টার সময় রিকশা পাঠানোর জন্য।”
“তাই তো জিজ্ঞেস করছি!”
“বদ্রীবাবু ঠিক ন-টায় শিবুকে পাঠাবেন।”
“তার মানে তো রিকশা পেয়েছিস!”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“তবে বললি কেন পাসনি?”
“কখন বললাম?”
“কী যা-তা বকছিস মাতালের মতো! একটু আগে যে বললি রিকশা পাসনি?”
“আমি ভাবলাম আপনি জানতে চাচ্ছিলেন ধরে এনেছি কি না।”
“উজবুক! উলটোপালটা বকে সময় নষ্ট করিস! যা, ওপরে গিয়ে বাবুর সুটকেসের ওপর গিয়ে বস।”
“আজ্ঞে?”
“শুনতে পাস না নাকি? বলছি, ওপরে গিয়ে বাবুর সুটকেসে বসতে।” হতভম্ব কালীচরণকে উপেক্ষা করে শুকতারা পুষ্পেন্দুবাবুর উদ্দেশ্যে বললেন, “শুনছ, কালীচরণকে পাঠাচ্ছি।”
পুষ্পেন্দুবাবু উৎসাহ পেয়ে আবার উঠে দাঁড়ালেন, “ভেরি গুড।”
“চটি পরে যাচ্ছিস কোথায়? চটি খোল!” শুকতারা ধমক লাগালেন কালীচরণকে। পুষ্পেন্দুবাবু শুধু শেষটুকু শুনতে পেলেন।
“চটি পরে নেই আমি,” প্রিয়তমাকে জানালেন।
“আঃ, তোমাকে নয়।”
“ও আচ্ছা। এই কালী, ভারী কিছু নিয়ে আয় তো নিচ থেকে, তোর একার ওজনে হয়তো কুলোবে না।” পুষ্পেন্দুবাবু হুকুম দিলেন ওপর থেকে।
“আচ্ছা বাবু।”
“ভারী জিনিস আনতে বললাম না তোকে?”
“এই তো এনেছি বাবু।” কালীচরণ হামানদিস্তাটা দেখাল।
“ধু-উ-স, ওতে কী হবে! মরুক গে যাক! তুই-ই সুটকেসের ওপর বস। আর আমি ল্যাচটা লাগাবার চেষ্টা করি।”
পেটমোটা সুটকেসের চেহারা আর বাবুর বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে কালীচরণ ভারী আমোদ পেল। ছ্যাতলা-পড়া দাঁত দু-পাটি বার করে হেসে ফেলল সে।
“হাসছিস যে বড়?” পুষ্পেন্দুবাবু ধমক লাগালেন।
কালীচরণ উত্তর দিল না। সুটকেসের চারিদিকে হাত দিয়ে চেপে সে মন্তব্য করল, “বসলে হবে না বাবু।”
“কীসে হবে তাহলে?”
“তা জানি না, তবে বসলে হবে না।”
“ভারী সবজান্তা তুই! যা বস।” পুষ্পেন্দুবাবু হুকুম দিলেন।
পুষ্পেন্দুবাবুর ধমক খেয়ে কালীচরণ বসতে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ মাথায় কিছু খেলল তার।
“আপনি সুটকেসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝোঁক দিন, আমি ঠিক তালা লাগিয়ে দেব।”
‘ঝোঁক’ কথাটার তাৎপর্য কী সেটা জানা না থাকায় কালীচরণের বক্তব্যটা পুষ্পেন্দুবাবুর ঠিক হৃদয়ঙ্গম হল না। “ঝোঁকটা আবার কী জিনিস?”
পুষ্পেন্দুবাবুর অজ্ঞতায় অবাক হল কালীচরণ। “ঝোঁক কী জানেন না? এই যে এইরকম,” হাঁটু দুটোকে ভাঁজ করে হঠাৎ সে ক্যাঙারুর মতো লাফ দেবার ভঙ্গি করল।

“আই সি, অলরাইট। ঝোঁকটা তাহলে তুই-ই দে, আমি বরং ল্যাচটা লাগাই।” একটু আগের একটানা পরিশ্রমের ফলে হার্টের ধুকপুকানিটা তখনও শান্ত হয়নি, তাই আবার লম্ফঝম্পর মধ্যে যেতে চাইলেন না পুষ্পেন্দুবাবু।
কালীচরণের তাতে আপত্তি দেখা গেল না। বলতে কী, বাবুর কাছে নিজের ঝোঁক-নৈপুণ্য দেখানোর সুযোগে সে বেশ খুশিই হল। তড়াক করে সুটকেসের ওপর লাফিয়ে উঠে অতি মোক্ষমরকমের একটা ঝোঁক প্রদর্শন করল সে। ভিতর থেকে মুড়মুড় শব্দ বেরোল। সেই ঝোঁকের নিদারুণ চাপে দিদির দেওয়া চানাচুর আর নিমকিগুলো নিঃসন্দেহে চূর্ণবিচূর্ণ হল। কিন্তু পুষ্পেন্দুবাবুর সেসব শোনার অবস্থা নেই। অর্জুনের মাছের চোখ দেখার মতো বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে তিনি সুটকেসের ল্যাচ আর ক্যাচ দেখছেন। সফল হতে হতেও একটুর জন্য হলেন না।
“কালীচরণ!” নিচ থেকে শুকতারার ডাক এল।
“এক মিনিট দাঁড়াও গো, আমাদের প্রায় হয়ে এল।” পুষ্পেন্দুবাবু কালীচরণের হয়ে জবাব দিলেন। “নে এবার আর একটা ঝোঁক দে… ভেরি গুড! আর একটু জোরে দে।”
“এই কালীচরণ, বাবুর মোবাইলটা টিং টিং করছে, মেসেজ এসেছে…বাবুকে দিয়ে আয়।” নিচ থেকে শুকতারার অসহিষ্ণু গলার স্বর।
“আসছে, আসছে… একটু সবুর করো।... এই কালীচরণ, আর একটু ঝোঁক দে, বাঃ, এই তো আটকে গেছে, দিব্যি আটকেছে!”
এস এম এস-টা এসেছে শান্তনুর কাছ থেকে... ‘অ্যারাইভিং টিউসডে আফটারনুন, মাদার আনেব্ল টু কাম।’
মেসেজটা শুকতারাকে দিতেই শুকতারা ঠোঁট চেপে ভুরু কুঁচকে বসে রইলেন। পুষ্পেন্দুবাবু একটু সন্ত্রস্ত হলেন। স্ত্রীকে তিনি বিলক্ষণ চেনেন। চাপা ঠোঁটের অর্থ নানান গোলমেলে চিন্তা শুকতারার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই চিন্তাজাল ছিন্ন করার জন্য তাড়াতাড়ি বললেন, “যাঃ বড্ড ঝামেলা হল তো! বাবাজি আসছে, আর আমিও এদিকে বাইরে।”
“ব্যাপারটা আমার কাছে গোলমেলে ঠেকছে বেশ, মাসিমার না-আসার কারণটা…”
পুষ্পেন্দুবাবু কথাটা আর শেষ করতে দিলেন না, “নিশ্চয় শরীর খারাপ। বুঝলে তো, প্যাচপ্যাচে বৃষ্টি, এই সময় আবার বাত-ফাতের ব্যথা বাড়ে।”
“বাজে বোকো না তুমি। মাসিমার কোনোদিন বাত ছিল না।”
“সর্দিকাশি তো হতে পারে, ফ্লু বা ওই ধরনের কিছু।”
“শুধু মাসিমা আসছেন না তা নয়, শান্তনুও বৃহস্পতিবারের বদলে মঙ্গলবার আসছে।”
পুষ্পেন্দুবাবু সমস্ত ব্যাপারটা একটু হালকা করার চেষ্টা করলেন, “বুঝছ না, হবু স্ত্রীর দিদি-জামাইবাবুকে দেখার জন্য বাবাজির আর তর সইছে না।” জুতমতো কথাটা বলতে পেরে ভারী খুশি হলেন তিনি। গোঁফের ফাঁক দিয়ে একটু হাসিও যোগ করে দিলেন সেইসঙ্গে।
শুকতারা মিত্র বিরক্ত হলেন। “রসিকতা রাখো, কোনও লঘুগুরু জ্ঞান যদি তোমার থাকে।”
“এর মধ্যে আবার গুরুতর কী দেখলে তুমি?”
“একটা লোক হঠাৎ এস এম এস পাঠিয়ে দু-দিন আগে আসছে কোনও কারণ ছাড়া, বললেই আমি শুনব?”
হঠাৎ পুষ্পেন্দুবাবু উত্তেজিত হয়ে পড়লেন, “এর মধ্যে ইয়ে কী দেখলে তুমি? ওর নাম গিয়ে, শান্তনু নিশ্চয় বিষ্যুদবার কোনও একটা প্ল্যান বাধিয়ে বসে আছে, সেই জন্যেই... মানে...”
শুকতারার অগ্নিদৃষ্টি দেখে, আর নিজের ঔদ্ধত্য উপলব্ধি করে কেমন একটু থতমত খেয়ে মাঝপথে থেমে গেলেন পুষ্পেন্দুবাবু।
“যা বোঝো না, তা নিয়ে মাথা ঘামাতে যেও না। আর সুপুরি মুখে দিয়ে কথা বোলো না, কতবার বারণ করেছি। ম্যানার্স শিখে উঠলে না এখনও।”
বমালসমেত ধরা পড়ে কোঁত করে পুষ্পেন্দুবাবু সুপুরিটা গিলে ফেললেন।
“যাক গে, আমি ওসব চিন্তা করতে পারি না। এস এম এস না পাঠিয়ে একটা ফোন করলে তো পারত... পরিষ্কার হয়ে যেত ব্যাপারটা। আমাদের মোবাইল টাওয়ার গন্ডগোল করছে, হয়তো সেইজন্যেই। আমার ফিরতে ফিরতে তো বিষ্যুদবার, এর মধ্যে শান্তনুর থাকার ব্যবস্থা কী করবে?”
“সে নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। পাকড়াশীবাবুর বাড়ির ঠিকানা আর ডিরেকশন দিয়ে চিঠি তো আগেই দিয়েছি। সেখানেই নিশ্চয় আসছে। আমি মোক্ষদাকে দিয়ে সবকিছু ঠিক করিয়ে রাখব।”
“তাহলে তো সব মিটেই গেল।” পুষ্পেন্দুবাবু স্বস্তি প্রকাশ করলেন।
“তোমার প্যাকিং শেষ?”
“হুঁ।”
“জামা-প্যান্ট, দাড়ি কামাবার জিনিসপত্র?”
“সব নিয়েছি।”
“টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, চিরুনি?”
“সব গো সব।”
“গরম চাদরটা নিয়েছ?”
“ওই যাঃ!”
“যাও প্যাক করে ফ্যালো।”
“বড্ড গরম এখন, দরকার লাগবে কি?”
“সকালে হিম পড়ে এখনও, তোমার তো আবার সর্দির ধাত— দিনরাত ফ্যাচফ্যাচ।”
“দু-দিনে মনে হয় কিছু হবে না। এক্সট্রা ধুতি আছে, গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ব।”
“তর্ক কোরো না, যাও প্যাক করো।”
সুটকেস বন্ধ করার ঝামেলার কথা মনে পড়তেই পুষ্পেন্দুবাবু সিঁটিয়ে গেলেন, “না নিলে হয় না?”
“না।”
“সুটকেসটা বন্ধ হতে চাচ্ছিল না।”
“কী ছেলেমানুষি হচ্ছে!”
“যাচ্ছি বাবা, যাচ্ছি! এই কালীচরণ ওপরে চল, সুটকেস বন্ধ করতে হবে।”
“সুটকেস তো বন্ধ!” কালীচরণ অবাক হয়ে বলল।
“আবার বন্ধ করবি, চল হতভাগা!” বউয়ের ওপর জমা উষ্মাটুকু কালীচরণের ওপর ঝেড়ে দিলেন পুষ্পেন্দুবাবু।
পুষ্পেন্দুবাবু ওপরে যাবার পর শুকতারা মিত্র ঠান্ডা মাথায় মিনিট দশেক চিন্তা করলেন। প্রথম কাজ হল ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছে পরিষ্কারভাবে জানা। ল্যান্ডলাইনও খারাপ হয়ে বসে আছে এক সপ্তাহ হল। মোবাইলও কাজ করছে না ভালো। উপায়? একটা প্ল্যান মাথায় এল। মাসিমার বাড়ির ফোন নম্বর দিয়ে... দু-চার লাইনে ব্যাপারটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে একটা চিঠি লিখল বন্ধু ইভাকে। ইভার বাড়ি মাইল তিনেক দূরে। ওর ল্যান্ডলাইন কাজ করছে। ইভা যদি মাসিমাকে ফোন করে খবরটা নেয়। কালীচরণ নামলে চিঠিটা ইভাকে দিয়ে আসবে। ইতিমধ্যে সুরম্য-টা ঝাঁটপাট দিয়ে ঝাঁ-চকচকে করে ফেলা প্রয়োজন। ব্যবস্থার কোনও খুঁত যেন শান্তনু দেখতে না পায়। আমেরিকার মতো স্টাইলে না থাকলেও এ দেশের মানুষও যে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকতে পারে, সেটা শান্তনুকে তিনি ভালোভাবেই বোঝাবেন। কানাঘুষো শুনেছেন, শান্তনু নাকি এ দেশে ফিরতে চায় না, স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং খারাপ বলে। শুনে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছেন শুকতারা মিত্র।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন