তেরো

সুজন দাশগুপ্ত

পুষ্পেন্দুবাবুর বুকের ভিতরে একটু একটু করে ঝড় বইতে শুরু করেছে। একটা কিছু গোলমাল কোথাও রয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মেয়ে একটি অবশ্যই এর মধ্যে জড়িত। কিন্তু মেয়েটি কে? এখানকার না বাইরের? শান্তনুর সঙ্গে তার কী সম্পর্ক? শান্তনু কি কলকাতা থেকে মেয়েটাকে নিয়ে এসেছে? না এখান থেকে জোগাড় করেছে? বাজারের মেয়ে? কেন এটা শান্তনু করল? চিন্তাগুলো একের পর এক পুষ্পেন্দুবাবুর মাথায় আসছে আর অসোয়াস্তিকর ঘোঁট পাকাচ্ছে! কিন্তু যেটা সবচেয়ে ভয়াবহ, যেটা ভেবে তাঁর হাত-পা সিঁটিয়ে আসছে, সেটা হল শুকতারা যখন মেয়েটাকে আবিষ্কার করবে... তখন কী ঘটবে ভেবে! ও কি চেঁচিয়ে পাড়া মাত করবে, হিস্টিরিক হয়ে হাত-পা ছুঁড়ে ভিরমি খাবে, আঁচড়া-আঁচড়ি, খামচা-খামচি করবে, না শান্তভাবে কড়া কড়া দুটো কথা বলে বিদায় নেবে? শেষেরটা কখনোই ঘটবে না... এটাই পুষ্পেন্দুবাবুর বিশ্বাস। কিন্তু এটা গেল ভয়ের দিক। এছাড়াও তিনি আত্মগ্লানিতে জর্জরিত হচ্ছিলেন। এই ঘটনার পরিণতি কখনোই সন্তোষজনক হবে না, হতে পারে না। অথচ ঘটনাচক্রের উৎসস্থলে রয়েছেন তিনি। তাঁর একটা নির্দোষ উক্তি কী দ্রুতগতিতে একটা চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে... সেটা ভেবে মনে প্রাণে দগ্ধ হচ্ছিলেন।

নিঃশব্দে প্রবেশ করা হল না। দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ। ডোরবেল বাজার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজাটা খুলে গেল। শান্তনুই খুলে দিল দরজাটা। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে প্রাণপণ বিরক্তি চেপে সে একটা স্বাভাবিক বিস্ময়ের ভাব ফোটানোর চেষ্টা করছে। চোখে একটু ঘুম ঘুম, মুখে অল্প একটু বিরক্তির ছায়া। কিন্তু সেই ছায়াটুকু ধীরে ধীরে মুছে গিয়ে একটা আন্তরিকতা ফুটে উঠছে।

“আপনারা এই সময়?”

শুকতারা মিত্র শুকনো স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “এসেছ তাহলে?”

“হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছি।” শান্তনু মুখটা হাসি হাসি করার চেষ্টা করল।

“অনেক দেরি করেছ আসতে। আমি ঠায় পাঁচ ঘণ্টা তোমার জন্য বসে অপেক্ষা করে শেষে বাড়িতে গেছি। কখন এলে?”

“সত্যি কথা বলতে কী, একদম খেয়াল নেই। নানান পর্ব গেছে, বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে। তা আপনাদের সব খবর কী?”

শুকতারা প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, “একবার ফোন করলে পারতে, অত চিন্তা হত না তাহলে।”

“খুব ঠিক কথা। কিন্তু মুশকিল হল কোথাও পাবলিক ফোনবুথ পেলাম না। বড়সড় কোনও দোকানও চোখে পড়ল না। আর আপনাদের এখনকার লাইনও তো দেখছি খারাপ হয়ে পড়ে আছে। মোবাইলে লাইন পাচ্ছি না।”

“এখান থেকে তো ফোন করে দিতে পারতে?”

“কাজ করছে না ফোনটা।”

“তাই নাকি!” শান্তনুকে পাশ কাটিয়ে খটখটিয়ে হেঁটে সাইড টেবিল থেকে ফোনটা তুলে কানে লাগালেন শুকতারা। “কে বলল কাজ করছে না, দিব্যি কাজ করছে।”

সত্যিকারের বিস্ময় ফুটে উঠল শান্তনুর মুখে, “কী আশ্চর্য! আপনার কাজের মেয়েটি যে বলল কাজ করছে না?”

“আমাদের লাইনটা কাজ করছে না, সেটাই বোধ হয় বলেছে।” পুষ্পেন্দুবাবু বললেন।

“তুমি চুপ করো তো!”

একটা অস্বস্তিকর নীরবতা। শান্তনুই ভাঙল সেটা। “কাজের মেয়েটি বলেনি বুঝি যে আমি ঠিকঠাক এসে পৌঁছেছি?”

“বলেছে। থাক ও কথা। সুললিতা মাসি এলেন না যে?”

শান্তনু সংক্ষেপে ব্যাপারটা জানাল।

“অনেক আশা করে বসেছিলাম আমরা।” শুকতারা বললেন।

“সেই, হঠাৎ এমন করে ঘটে গেল ব্যাপারটা।”

“হুম, কী আর করা! যাক, খেয়েছ ভালো করে?”

“খেয়েছি মানে? অপূর্ব রান্না।” একটু তেল দিল শান্তনু। “নিশ্চয় আপনি রেঁধেছিলেন?” চিড়ে কতটা ভিজল বোঝা গেল না।

“তারপর, কী করছিলে এতক্ষণ?” শুকতারা প্রশ্ন করলেন।

“কী করছিলাম,” শান্তনু একটু চিন্তা করল। “চান-টান করে, খেয়েদেয়ে, সুটকেস গুছিয়ে…” শান্তনু কথাটা শেষ করতে পারল না।

“সে কাজটা তো এখনও সম্পূর্ণ হয়নি দেখছি।” টেবিলের ওপর হাঁ-করা সুটকেস আর ওলটপালট কাপড়ের স্তূপের দিকে তাকিয়ে শুকতারা মন্তব্য করলেন।

“ও হ্যাঁ, আসলে সুটকেসটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের ভারী হয়ে পড়েছিল। তাই ওটা আর ওপরে তুলতে পারিনি।”

“ও।”

“নিচ থেকেই দরকারি জিনিসগুলো নিয়ে যাচ্ছি।”

“শোবার জায়গা ঠিকমতো খুঁজে পেয়েছ তো?”

“হ্যাঁ।” মাথা নাড়ল শান্তনু, “দেখবেন নাকি?”

উৎসাহের আতিশয্যে এটাই একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলল শান্তনু। শুকতারা মিত্রের নাক ও ভুরু দুটোই কুঁচকে উঠল মুহূর্তের জন্য। অবশ্য শান্তনুর দেখার ভুলও হতে পারে।

“কেন?”

সামলে নেবার চেষ্টা করল শান্তনু। “বাঃ, এত সুন্দর বন্দোবস্ত করেছেন, সেগুলো ঠিকমতো ব্যবহার করছি কি না দেখবেন না?”

“বেশ চলো, দেখব আমি। তুমি নিচে থাকো।” পুষ্পেন্দুবাবুকে নির্দেশ দিলেন শুকতারা।

বেঁচে গেলেন পুষ্পেন্দুবাবু। সোফায় বসে পড়লেন তিনি। বুকের ধুকপুকানিটা যেন আর থামতে চাইছে না।

“শোবার ঘরটা কিন্তু খুব সুন্দর।” শান্তনু উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল। “বড় বড় জানলা, একেবারে রাস্তার ওপর। সবকিছু দিব্যি দেখা যায়!”

“কী দেখা যায়?”

“মানে রাস্তা। জানলায় দাঁড়িয়ে রাস্তাটা বেশ চোখে পড়ে।”

শুকতারা অন্যমনস্ক হয়ে শাড়িতে পা জড়িয়ে প্রায় হোঁচট খাচ্ছিলেন। সামলে উঠে বিরক্ত স্বরে বললেন, “কথাটার কোনও তাৎপর্য আছে নাকি?”

“না না, আসলে পুষ্পেন্দুদা বলছিলেন একটু আগে ওই জানলা দিয়ে মাকে দেখেছিলেন। আসলে আমার ছায়ামূর্তিটা ওঁর চোখে পড়েছে... চেহারায় মিল আছে তো আমাদের!” শান্তনু হো হো করে হাসার চেষ্টা করল।

এক্কেবারে কাঠ কাঠ শোনাল, সুবিধা হল না ঠিক। শান্তনুর রসিকতা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শুকতারা মিত্র শ্যেনদৃষ্টিতে ঘরটা পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন। নাকটা দিয়ে মনে হল কিছু একটা শুঁকছেন। প্রমাদ গুনল শান্তনু। দেবযানী একটা সুন্দর সেন্ট মেখেছিল... জুঁইফুলের গন্ধ। গন্ধটা শান্তনুর নাকে আর আসছিল না। হয়তো অভ্যস্ত হয়ে গেছে বলে।

“একটা ফ্লোরাল সেন্ট পাচ্ছ না?” দুবার জোরে নিঃশ্বাস টেনে শান্তনুকে জিজ্ঞেস করলেন।

“হ্যাঁ, জুঁইফুলের গন্ধ। আসার পথে একটা ছেলে জোর করে একটা মালা গছিয়ে দিল। আমি ফুল-টুল তেমন ভালোবাসি না। ছেলেটাকে দেখে মায়া হল বলে কিনলাম। এখানেই ছিল ফুলগুলো, একটু আগে জানলা দিয়ে মাঠে ফেলে দিয়েছি। আমার আবার ফুলে একটু অ্যালার্জিও আছে।”

শুকতারা ওপরে চলে যাবার পর পুষ্পেন্দুবাবু গা ঝেড়ে উঠে বসলেন। ঘরে ঢুকেই গন্ধটা উনি পেয়েছিলেন, কিন্তু উচ্চবাচ্য করেননি। জুঁইফুলের একটা চাপা সুবাস ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে আছে। নাক কুঁচকে ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে তিনি উৎসটা খুঁজতে লাগলেন। ছেলেবেলা থেকেই ওঁর নাকটা বেশ তীক্ষ্ণ। ব্লাডহাউন্ডের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারলেও, ফুলের গন্ধ শুঁকতে তাঁকে ফুলের কাছে যেতে হয় না, দূর থেকেই টের পান। ঘরে কিছুক্ষণ ফুল থাকলেই তিনি বুঝতে পারেন। জুঁইফুলের এই গন্ধটা, ঠিক তাজা ফুলের বোধ হয় নয়, এটা এসেন্সের গন্ধ। শান্তনু যতই অস্বীকার করুক না কেন, তিনি নিশ্চিত একজন সুগন্ধি স্ত্রীলোক এ বাড়িতে ছিল। এই মুহূর্তে সে আছে কি না অবশ্য বলতে পারবেন না। হয়তো তাকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। খুব আবছাভাবে প্রথমবার এসেও পেয়েছিলেন, তখন সেভাবে ভাবেননি। কিন্তু এবার গন্ধটাও যেন একটু বেশি লাগছে ওঁর নাকে। অবশ্য স্ত্রীলোকের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হলেও উনি ঠিক করলেন যে এ ব্যাপারে কোনোরকম সাড়াশব্দ করবেন না। একবার মুখ খুলে যে যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, সেটাতে আর ইন্ধন জোগাবেন না। শুকতারা যদি এর মধ্যে কিছু আবিষ্কার করে ফ্যালে তাহলে অন্য কথা। কিন্তু এই ফাঁড়া যদি কেটে যায়, তাহলে নোংরা জল আর এতটুকু গড়াতে দেবেন না তিনি। অপ্রিয় সত্যের উদ্‌ঘাটন না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। চিন্তায় হঠাৎ ছেদ পড়ল তাঁর।

“ম্যাও!” একটা বিশ্রী আওয়াজ করে কোত্থেকে এক বেড়াল আচমকা পুষ্পেন্দুবাবুর কাঁধে লাফ দিয়ে পড়ে আর এক লাফে রান্নাঘরের পাশ দিয়ে অদৃশ্য হল। পুষ্পেন্দুবাবু তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। হৃৎপিণ্ডের ধুকধুকটা একঝলকের জন্যে যেন থেমে গেল! ঘাম ছুটল শরীর থেকে। এতটাই চমকালেন যে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। বেড়ালটা অবশ্য অপরিচিত নয়, পাকড়াশীদের বেড়াল, নাম মিষ্টি। এর আগেও একবার গা বেয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে। তবে এটা একেবারে বোল্ট ফ্রম দ্য ব্লু!

গেল কোথায় বেড়ালটা? গুটিগুটি রান্নাঘরের দিকে এগোলেন পুষ্পেন্দুবাবু। রান্নাঘরের পাশেই একটা ছোট ঘর, ভাঁড়ারঘরের মতো। সেই দরজাটা অল্প একটু খোলা। মনে হয় না তার মধ্যে দিয়ে মিষ্টি গলে যেতে পারে বলে। তবে অসম্ভব নয় কিছুই। বেড়ালের হাড়গোড় আবার খুব ফ্লেক্সিব্‌ল। দরজাটা একটু ফাঁক করলেন। ঘরটা অন্ধকার ঘুটঘুট্টি। ঢুকতে সাহস হল না পুষ্পেন্দুবাবুর। বাইরে থেকেই আহ্বান জানালেন, “চুঃ, চুঃ, বেরিয়ে এসো, কোনও ভয় নেই। বেরিয়ে এসো।”

উত্তর এল তৎক্ষণাৎ। বেড়ালের নয়, এক পূর্ণ মানবীর। “বাঁচিয়েছেন, পায়ে একেবারে ঝিঁঝি ধরে গিয়েছিল।”

ভয়ে, বিস্ময়ে, রোমাঞ্চে পুষ্পেন্দুবাবুর গায়ের লোম আর মাথার চুল একেবারে খাড়া খাড়া হয়ে গেল! কুলকুলিয়ে ঘাম নামতে শুরু করল পিঠ বেয়ে। কিছু বলার আগেই ঘরের ভিতর থেকে একটা ভয়ার্ত স্বর ভেসে এল, “ও গড, নো...” একঝলক জুঁইয়ের গন্ধ... সঙ্গে সঙ্গে ধুপধাপ, ঝনাৎঝন শব্দ। একটা বিদঘুটে ধরনের আওয়াজ বেরিয়ে এল পুষ্পেন্দুবাবুর গলা দিয়েও। দরজাটা সজোরে বন্ধ করে ছিটকিনি লাগিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে সোফায় বসে পড়লেন। সর্বনাশ! এ তো ভৌতিক কিছু নয়, শান্তনু যে হারেম খুলে বসেছে! শুকতারার চোখে ধুলো দিতে চাইছে? ছোঁড়ার সাহস তো কম নয়!

sujan5

“কী হল পুষ্পেন্দুদা, কী হচ্ছে নিচে?” ওপর থেকে শান্তনু উচ্চস্বরে প্রশ্ন করল।

“কিছু নয় ভাই। বেড়ালটা আওয়াজ করল।”

“বাসন পড়ার আওয়াজ শুনলাম মনে হল?” শুকতারা সিঁড়ির মাঝামাঝি পর্যন্ত নেমে এসেছেন।

“কই না তো?”

“তা হলে আওয়াজটা কীসের?”

“আওয়াজ?”

“আঃ, বাসনকোসনের আওয়াজ!”

“ওঃ, সেই আওয়াজ! বললাম যে বেড়াল, মানে বেড়ালটা পালাবার সময় রান্নাঘর দিয়ে পালাল। নিশ্চয় ধাক্কা লাগিয়েছে বাসনপত্রে।”

“তা ছাড়া আরও কী জানি শুনলাম?”

“অন্য আওয়াজ!” পুষ্পেন্দুবাবু সচকিত হলেন, “কী রকম?”

“আপনারই তো সেটা জানার কথা,” বিদ্রুপ ঝরল শান্তনুর গলায়।

পুষ্পেন্দুবাবু চুপ করে রইলেন। শান্তনুর এই হঠকারিতা এ আলোচনা কতদূর নিয়ে যাবে কে জানে!

“আমিও শুনেছি আওয়াজটা, একটা চোঁ চোঁ শব্দ।” শুকতারা বললেন।

“ও-ও, তাই বলো,” সুস্থির নিঃশ্বাস ফেললেন পুষ্পেন্দুবাবু। “আমিই ডাকছিলাম বেড়ালটাকে চুঃ চুঃ করে।” শব্দের উৎস সম্পর্কে সবাইকে নিঃসন্দেহ করতে বাড়াবাড়ি রকমের দরদ দিয়ে আওয়াজটা বার করলেন।

“থাক থাক, হয়েছে।” এই নাটকীয়তায় বিরক্ত হলেন শুকতারা মিত্র। “জংলিদের সঙ্গে কাজ করে করে জংলি স্বভাব হচ্ছে তোমার!”

“এছাড়া বেড়ালকে আর কীভাবে ডাকব?” প্রতিবাদ করলেন পুষ্পেন্দুবাবু। তাঁর বুকের ভিতর যে কী হচ্ছে তিনিই জানেন! তিনি জংলি? চমৎকার! ভদ্র পরিবেশ রক্ষা করার সমস্ত দায়িত্ব তো তিনিই নিয়েছেন। এই মুহূর্তে হাঁটে হাঁড়ি ভেঙে শান্তনুর পশুত্ব আর শুকতারার জংলিত্ব প্রমাণ করে দিতে পারেন তিনি। তবে করছেন না, কারণ করে কী লাভ?

“চুপ করো, রান্নাঘরের বাতিটা জ্বালাও। অন্ধকারে হাত পা ভাঙবে এবার।” আদেশ এল শুকতারা মিত্রের কাছ থেকে।

“আমি জ্বালাচ্ছি, পুষ্পেন্দুদাকে এবার ছেড়ে দেওয়া যাক।”

“মানে?”

“মানে পুষ্পেন্দুদার আজকে সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে, উলটোপালটা দেখছেন, ভুলভালও শুনছেন, সজাগ নন মোটেই। অবশ্য সেটা আশ্চর্যের কিছুই নয়,” ঘড়ির দিকে তাকাল শান্তনু, “প্রায় বারোটা বাজতে চলল।”

শুকতারার তরফ থেকে কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। শান্তনু আর একটা হিন্ট দিল। “আমার মনে হয় সবারই শুয়ে পড়া উচিত এখন। আপনাদের কথা জানি না, আমার কিন্তু চোখ জড়িয়ে আসছে।” বলতে বলতেই দু-তিনটে হাই তুলল শান্তনু।

“আমার আসছে না, তোমার?” পুষ্পেন্দুবাবুর উদ্দেশে শুকতারা প্রশ্ন ছুঁড়লেন।”

“ঘুম ঠিক নয়, তবে শরীরটা খানিক বিশ্রাম চাইছে।”

শুকতারা কিছু একটা ভাবলেন। “বেশ, বাড়িই যাওয়া যাক তাহলে।”

“কাল তাহলে দেখা হবে,” শান্তনু চট করে দরজাটা খুলে দিল।

“হুঁ।”

শুকতারার পিছন পিছন পুষ্পেন্দুবাবু বেরোলেন। হঠাৎ ঝড়ের বেগে মিষ্টি ওঁদের দুজনের পায়ের ফাঁক দিয়ে গলে অদৃশ্য হল।

“ওই তো, ওই তো,” পুষ্পেন্দুবাবু শুকতারার হাতটা ধরার চেষ্টা করলেন।

শুকতারা ঝাঁকানি দিয়ে হাত সরিয়ে বললেন, “খামচাচ্ছ কেন, কী হয়েছে?”

“বেড়ালটা পালাল।”

“তাতে কী?”

অনেক কথাই বলার ছিল সে নিয়ে, কিন্তু অসীম আত্মসংযম দেখিয়ে নিরুত্তর থাকলেন পুষ্পেন্দুবাবু।

দেবযানী কাঁচুমাচু মুখে বলল, “ভীষণ ভুল হয়ে গেছে আমার। আমি ভাবলাম আপনি ডাকছেন। তাই বেরিয়ে আসছিলাম, দেখি আর এক ভদ্রলোক।”

“ঘাবড়াবেন না, ভদ্রলোক কিছুই বোঝেননি। আপনাকে বেড়াল ভেবেছেন।”

“সে কী! আমি যে কথা বললাম ওঁর সঙ্গে?”

“অ্যাঁ!” শান্তনুর চোখ কপালে উঠল।

“ঠিক সোজাসুজি নয় অবশ্য, আড়াল থেকে বলেছিলাম।”

“কী বলেছিলেন আপনি?”

“ঠিক মনে নেই, বাঁচালেন বা ওইরকম কিছু।”

“পুষ্পেন্দুদা কী বললেন?”

“পুষ্পেন্দুদা?”

“মানে ওই ভদ্রলোক।”

“শোনামাত্র দরজা বন্ধ করে উনি পালালেন।”

“মাই গড! এতক্ষণে নিশ্চয় ওই মহিলাটি বুকে বাঁশ দিয়ে সব কথা আদায় করে নিয়েছেন। ভাগ্যিস এখানেই পুষ্পেন্দুদা হাঁড়ি ফাটাননি। যাচ্ছেতাই কাণ্ড হয়ে যেত তাহলে!”

“ইসসস, ভারী বিপদ হল তো!”

“তা একটু হল,” শান্তনু স্বীকার করল, কিন্তু দমল না।

“যাক, কী আর করা যাবে? দরজায় খিল দিয়ে দিয়েছি। আজ রাতে আর খুলছি না। কাল ভোরে আপনার একটা গতি করে ফেলতে হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস কাল সাতসকালে মহিলাটি এসে ঝামেলা শুরু করবেন।”

“আমার জন্যেই এটা হল!” দোষী দোষী মুখে দেবযানী বলল।

“আঃ, ওসব ভাববেন না। যান, ওপরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।”

“আপনি?”

“আমি নিচে সোফায় শুচ্ছি, সেরকমই তো আমাদের প্ল্যান ছিল!”

দেবযানী সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে একটু থামল। পাতলা গোলাপি ঠোঁটে ঝিকমিক রোদ্দুরের মতো একটা হাসি খেলল।

“জানেন, এত বিপদ আর ঝামেলার মধ্যেও কিন্তু মন্দ লাগছে না। একটা থ্রিলিং এক্সপিরিয়েন্স। মনে হচ্ছে…” কী ভেবে একটু লাল হল হঠাৎ। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “আপনার বোধ হয় খুব খারাপ লাগছে, তাই না?”

শান্তনু জামাকাপড় কিছু পুঁটলি করে বালিশ বানাবার চেষ্টা করছিল। বলল, “খেপেছেন! ভালো-খারাপের প্রশ্ন কোথায়? এতক্ষণ তো নার্ভাসনেসের মধ্যেই কাটল। অভিনয় করতে নেমেছি, অথচ সংলাপ জানি না। নাটকের পরিণতিটাও জানা নেই। ভাবুন তো একবার অবস্থাটা? যাক, প্রথম অঙ্ক সমাপ্ত। দ্বিতীয় অঙ্কের আগে একটা ঘুম দেবার চেষ্টা করা যাক।” বাড়ি থেকে আনা চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল শান্তনু।

ঘুমের মধ্যে মনে হল কেউ মাথার কাপড়ের পুঁটলিটা সরিয়ে একটা নরম বালিশ গুঁজে দিচ্ছে। সুন্দর জুঁইফুলের গন্ধ। প্রায় ঘুমের মধ্যেই শান্তনু বলল, “আপনি কীসে শুচ্ছেন?”

“কোলবালিশ আছে তো একটা! গুড নাইট।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%