এক

সুজন দাশগুপ্ত

শান্তনুর প্রথম থেকেই আপত্তি ছিল সুখচিন্তাপুরে বেড়াতে যাবার। কাছাকাছি শান্তিনিকেতন বা দিঘার মতো জায়গা থাকতে ধ্যাড়ধ্যাড়ে সুখচিন্তাপুর কেন? অবশ্য নিছক বেড়াতে যাওয়া যে মা-র উদ্দেশ্য নয়, সেটা শান্তনু জানে। মূল উদ্দেশ্য শুকতারা আর পুষ্পেন্দুর সঙ্গে শান্তনুর মোলাকাত করানো। শুকতারা এবং পুষ্পেন্দু দুজনেই শান্তনুকে চেনেন ছেলেবেলা থেকে, আবার নতুন করে আলাপ করানোর কী কারণ থাকতে পারে? কারণ একটা আছে, সেই জন্যেই ধিকিধিকি জ্বলছিল শান্তনু। কিন্তু সুললিতা দেবী, অর্থাৎ শান্তনুর মা, সবাইকে সন্তুষ্ট না করে শুভ কাজে এগোতে রাজি নন। চন্দ্রিমার জ্যাঠতুতো দিদি শুকতারা মিত্র সেই ‘সবার’ মধ্যে খুব ভালোভাবেই পড়েন। শুধু পড়েন তাই নয়, এই শুভ কাজে যদি কেউ বিঘ্ন ঘটাতে পারেন, অবিসংবাদিতভাবে সেই ব্যক্তি একমাত্র তিনিই। তার মানে এই নয় পুষ্পেন্দু মিত্রের স্ত্রী যত্রতত্র বাগড়া দিতে ভালোবাসেন। নিন্দুকেরা যাই রটাক না কেন, শুকতারা মিত্র মোটেই কুচুটে, পরশ্রীকাতর, প্রতিহিংসাপরায়ণ মহিলা নন। তবে সন্দিগ্ধমনা তাঁকে নিঃসন্দেহে বলা চলে। নিজের ছোট্ট খুড়তুতো বোনটিকে তিনি একান্তই ভালোবাসেন। আজেবাজে লোকের হাতে পাত্রস্থ করে তার ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে তিনি প্রস্তুত নন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই সংসারে সতর্কতার মূল্য আছে। নিজের জীবনে অনেক ঠকেছেন। যাদের ভালোবাসেন, তাদের যেন কখনও ঠকতে না হয় সে চেষ্টা তিনি নিরন্তর করে যাবেন, লোকে যাই ভাবুক বা বলুক না কেন! পাড়ার ছেলে শান্তনুকে তিনি চেনেন। পাত্র হিসেবে তাকে ফেলনা বলা চলে না, তবে আহামরিও কিছু নয়। অন্যদের কাছে শান্তনুর সবচেয়ে বড় যোগ্যতা, সে কাকিমার বন্ধু সুললিতা মাসির ছেলে। শুকতারা মিত্রের কাছে সেটা ফালতু সেন্টিমেন্ট। শান্তনুর আসল যোগ্যতা, সে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আমেরিকাতে গিয়ে এম বি এ করেছে। যতদূর জানা যায় মোটামুটি ভালোই চাকরি করছে সেদেশে। এই ‘যতদূর’ শব্দটার ওপর একটু জোর দেওয়া দরকার। যদু মধু সবাই আজকাল আকছার বিলেত আমেরিকা যায়, তারপর দেশে ফিরে লম্বাচওড়া কথা বলে, রাজা উজির মারে। খোঁজ নিলে বেরিয়ে পড়বে হয়তো রেস্টুরেন্টে ডিশ ধুয়েছে, বড়জোর ব্যাংকে টেলার ছিল। কিন্তু শান্তনুর ক্ষেত্রে সেটা সত্যি নয়, শুকতারা মিত্র ভালো করেই খোঁজ নিয়েছেন। কিন্তু তার চরিত্র? ধোয়া তুলসীপাতা সে নিশ্চয়ই নয়, ব্রহ্মচর্য কখনোই পালন করেনি! পাড়ায় নেলি সেন, দীপা রায়, কৃষ্ণা কী যেন, এদের সঙ্গে অলিতে গলিতে ফিসফাস, গুজগুজ করতে নিজের চোখেই দেখেছেন। তার বেশি কিছু ঘটতে অবশ্য দেখেননি ঠিকই। কিন্তু ওঁকে দেখিয়ে সেরকম কিছু ঘটবেই বা কেন? হাজার হোক পাড়ার দিদি তো! আচ্ছা, এগুলো না হয় বাদই দেওয়া গেল। কিন্তু গত চার বছর মার্কিন মুলুকে থেকে কী করেছে সে? সাদা মেয়েরা তো এসব ব্যাপারে খুবই ঢিলেঢালা, যখন তখন যার-তার সঙ্গে বিছানায় চিত হচ্ছে। এসব লোভ কি সামলানো সহজ? শান্তনু কি মাথার দিব্যি দিয়ে বলতে পারে, এই চার-চারটে বছরে কারও সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করেনি? আর সত্যিই যদি করে থাকে, তবে বিয়ের পর আবার যে করবে না, তারই বা গ্যারান্টি কী?

হাতে সময় খুব নেই, সেটাই সুললিতা দেবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা। শান্তনু মাত্র ছ-সপ্তাহের জন্যে দেশে এসেছে। এর মধ্যে বিয়ে দেওয়াটা যে সহজসাধ্য হবে না, সেটা তিনি বিলক্ষণ জানেন। শান্তনু এ যুগের ছেলে। ‘বিয়ে কর’ বললেই টোপর মাথায় গুটিগুটি বিয়ের পিঁড়িতে বসবে না। প্রথমে তাকে বিয়েতে রাজি করাতে হবে, সেটাই হবে সবচেয়ে দুরূহ কাজ। বিয়েতে আপত্তি না থাকলে, তার অনুষ্ঠান ও আনুষঙ্গিক সব কিছুই অতি সহজে সুসম্পন্ন হবে— সুললিতা দেবীর অন্তত তাই বিশ্বাস। পাত্রী পছন্দে আটকাবে না। একুশে পা দেওয়া মিষ্টি মেয়ে চন্দ্রিমাকে শান্তনু ভালোই চেনে, অপছন্দের কিছুই নেই। আর শান্তনু? সে বিষয়ে বলার কী আছে? বলতে গেলে দুজনে একরকম রাজযোটকই! এই নিয়ে বহু আলোচনা ও পরিকল্পনা সুললিতা দেবী ও ছোটবেলার বন্ধু চন্দ্রিমার মা সুনন্দা দেবীর মধ্যে হয়ে গিয়েছে। ওঁরা দুজনেই প্রস্তুত। এখন পাত্রপাত্রীর সম্মতি মিললেই উৎসব শুরু করা যায়।

শান্তনু এয়ারপোর্টে নামার পরপরই সুললিতা দেবী কথাটা পেড়েছিলেন। সোজাসুজি নয়, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। সেটাই সুললিতা দেবীর স্টাইল। প্রশ্ন কিংবা উত্তর কোনোটাই তিনি দু-কথায় সারতে পারেন না। কিন্তু তা বলে যাঁদের ধারণা তিনি অবান্তর বকেন, সুললিতা দেবীকে তাঁরা অল্পই চেনেন। নিজের বক্তব্যের বিষয়বস্তু ও লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ সচেতন। লোকে শুনতে চাক বা না চাক, নিজের যা বলার সেটুকু না বলে তিনি ছাড়েন না। শুধু কথা শোনানোতেই নয়, কাজ আদায় করার ব্যাপারেও তাঁর ধৈর্য অপরিসীম। জোর জবরদস্তি করে কাউকে দিয়ে কোনও কাজ করাতে তিনি অপছন্দ করেন। কিন্তু সুললিতা দেবীর মতলব মতো কাজ না করে নিষ্কৃতি পাওয়াটাও সহজ ব্যাপার নয়। বারবার ঘুরেফিরে সেই একই প্রসঙ্গে এসে ব্যক্তিবিশেষের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলার ক্ষমতা তিনি রাখেন। প্রসঙ্গত, এই ক্ষমতাটুকু ছিল বলেই অসংখ্য বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হয়েও শান্তনুকে তিনি মানুষ করতে পেরেছেন। হঠাৎ করে যখন বিধবা হয়েছিলেন, শান্তনুর বয়স তখন মাত্র পাঁচ। সে এক দীর্ঘ কাহিনি। এই গল্পের সঙ্গে যোগ না করাই ভালো।

সুললিতা দেবীর প্রস্তাব শোনামাত্র শান্তনু চিড়বিড়িয়ে উঠেছিল। তিনদিনের মধ্যে সেই ঘোরতর আপত্তি নিমরাজিতে এসে ঠেকেছে। সুতরাং মনে হচ্ছে শুভ কাজটা সময় মতোই হয়ে যাবে। অন্য যার কাছ থেকে এ ব্যাপারে বড়সড় বাধা আসতে পারে, সে হল সুনন্দার ভাসুর-কন্যা, অর্থাৎ চন্দ্রিমার জ্যাঠতুতো দিদি শুকতারা মিত্র। সুনন্দাদের পরিবারে শুকতারা মিত্রের একটা আলাদা দাপট আছে। সে সম্ভাবনাটাকেও সুললিতা দেবী অঙ্কুরে বিনাশ করতে চান। সুখচিন্তাপুর বেড়াতে যাবার মাস্টারপ্ল্যানটা ঠিক এই উদ্দেশ্যেই।

এদিকে শান্তনু নিতান্তই দোটানার মধ্যে পড়েছে। সুখচিন্তাপুর যাওয়ার ব্যাপারে নয়, বিয়ের বিষয়ে। একদিকে বিদেশ যাওয়ার পর থেকে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ ব্যাপারটার প্রতি ওর তীব্র বিতৃষ্ণা, অন্যদিকে মায়ের একান্ত ইচ্ছের বিরোধিতা করার মনঃকষ্ট। তবে শান্তনু হোপলেসলি রোম্যান্টিক নয়, প্রেম করে বিয়ে করলেই যে জীবন ফুলে ফলে ভরে ‘হ্যাপিলি এভার আফটার’ হবে— এই ধরনের ভ্রান্ত ধারণা ওর নেই। বিয়েটা যে জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়াখেলা, শান্তনু তা জানে। এইসব বিশ্বাস-অবিশ্বাস, পছন্দ-অপছন্দর ব্যাপার বাদ দিয়েও, একটা মানুষকে ভালোভাবে না জেনে, তার সঙ্গে মনের বোঝাপড়া না করে, কীভাবে এত বড় একটা দায়িত্ব নিয়ে ফেলা যায়— সেটাই শান্তনুর কাছে প্রহেলিকা। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজটা কি পুতুলের বিয়ে নয়? পাত্রপাত্রীরা যেন ঠিক মানুষ নয়, তাদের ভালোমন্দ বিচার করার শক্তি নেই, গোরু ভেড়ার মতো জোড়ায় জোড়ায় মিলিয়ে দিয়ে সমাজের শান্তি। কী অসহ্য!

এবার দেশে এসে চন্দ্রিমাকে দেখেনি শান্তনু। সুললিতা দেবী দেখার কথা তুলেছিলেন, শান্তনু আপত্তি জানিয়েছে। নিজের প্রিন্সিপলের বিরুদ্ধে গিয়ে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজই যদি করতে হয়, তবে সে চোখ কান বুজেই করবে। পাত্রীকে দেখতে না যাওয়ার সঙ্গে ‘চোখ কান বুজে বিয়ে করা’-র ব্যাপারটা কিন্তু এক্ষেত্রে খাটে না। গতবার শান্তনু যখন দেশে এসেছিল... সেটা কত বছর? বছর চারেক? হঠাৎ করেই দেখে হয়েছিল সপ্তদশী চন্দ্রিমার সঙ্গে। কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে যখন বেরোচ্ছিল, চন্দ্রিমা তখন ঢুকছিল বন্ধুদের নিয়ে। ঝকঝকে মুখ, তন্বী চেহারা… পল্লবিনী, সঞ্চারিণী টাইপ। এমন মেয়ের স্বামী হওয়া নিঃসন্দেহে লোভনীয়। এক্ষেত্রে আপত্তিটা একান্তই নীতিগত। যা হোক, আপাতত ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এরকম— শান্তনুকে নিয়ে সুললিতা দেবী সুখচিন্তাপুর যাচ্ছেন বৃহস্পতিবার। সেখানে তাঁরা দিন দুয়েক থাকবেন।

চন্দ্রিমার দিদি শুকতারা মিত্র আর যাই হন না কেন, অতিথি আপ্যায়ন করতে জানেন। শান্তনুদের সুবিধা হবে বলে আলাদা একটা বাড়িরই বন্দোবস্ত করেছেন। অবন লেনের ওপর বাড়িটার নাম ‘সুরম্য।’ যাবার ডিরেকশন দিয়ে এমন সুন্দর একটা আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছেন যে কোনোমতেই তা উপেক্ষা করা যায় না।

অধ্যায় ১ / ১৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%