সুজন দাশগুপ্ত
গাড়িটা বড় রাস্তায় এনে পুষ্পেন্দুবাবু ক্ষণকাল থামলেন। সাংসারিক জীবনে তিনি পদে পদে অপদস্থ ও অপমানিত হয়েছেন। এসব তাঁর গা-সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু আজকের এই ঘটনাটা কেমন জানি স্বতন্ত্র। স্বচক্ষে যে সত্য তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, সেটাকে উপহাস করে শান্তনুর উড়িয়ে দেওয়াটা ওঁকে ভীষণভাবে পীড়িত করেছে। এই মুহূর্তে নিজের মস্তিষ্কের স্থিরতা সম্পর্কে তাঁর মনে এতটুকু সন্দেহ নেই। তিনি মোটেই মাতাল হননি। শরীর ও মনের দিক থেকে তিনি পূর্ণমাত্রায় সচেতন— আগেও ছিলেন, এখনও আছেন। তাঁর দৃষ্টিশক্তি, মননশক্তি সম্পূর্ণ অটুট রয়েছে— এতটুকু ভ্রংশ হয়নি। অবশ্য একটু আগেই যে তোয়ালেকে মানুষ ভেবেছিলেন তা অনস্বীকার্য। কিন্তু তার একটা যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা খাড়া করা যায়। তীব্র ভয় ও শঙ্কা তাঁর চিন্তাশক্তিকে সাময়িকভাবে কবজা করেছিল, ভালো করে তাকিয়ে দেখার সাহস হয়নি। এ ভুল সবারই হতে পারে। কিন্তু স্টেশন থেকে ফেরার সময় সেই মানসিক অবস্থা তাঁর ছিল না। সুস্থির ও নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে তিনি জানলার দিকে তাকিয়েছিলেন এবং সুস্পষ্টভাবেই দেখেছিলেন একটি স্ত্রীলোককে। তখন অবশ্য ধরে নিয়েছিলেন মহিলাটি সুললিতা মাসি। এখন চিন্তা করে মনে হল ভুলটা সেখানেই হয়েছিল। সুললিতা মাসির আসার কথা আর স্ত্রীলোকের ছায়া— দুইয়ে দুইয়ে এক করেছিলেন। একটু তলিয়ে দেখলে বুঝতে পারতেন সেটা না-হওয়াই সম্ভব। ক্ষণিক দেখা স্ত্রীলোকের ছায়াটি নিঃসন্দেহে কোনও ক্ষীণাঙ্গীর। সেক্ষেত্রে শুকতারার সন্দেহকেই প্রশ্রয় দিতে হয়। এইদিক থেকে বিচার করলে জলটা বহুদূর গড়াবে। মনে মনে শিউরে উঠলেন পুষ্পেন্দুবাবু। ব্যাপারটা চেপে যাওয়াই ভালো। দূর থেকে সুরম্যর দোতলার জানলার দিকে তাকালেন তিনি। জানলাটা বন্ধ। একবার মনে হল একটু আগেও যেন জানলাটা খোলা ছিল। কে জানে রে বাবা! আবার গাড়ি স্টার্ট করে গিয়ার দিলেন তিনি। কিন্তু এগোতে পারলেন না। গাড়ির সামনে হাজির হয়েছে রতনের রিকশা।
রিকশার সওয়ারিকে চিনতে অসুবিধা হল না পুষ্পেন্দুবাবুর। শুকতারা মিত্র! রিকশা থেকে নেমে রতনকে বিদায় করে বললেন, “এখানে দাঁড়িয়ে কী করছ?”
“একটু ভাবছিলাম,” গাড়ির কাচটা নামিয়ে ঘাবড়ে গিয়ে জবাব দিলেন পুষ্পেন্দুবাবু।
“কী?”
“ভাবছিলাম ওই জানলাটা বন্ধ ছিল কি না।” আঙুল দিয়ে দেখালেন কোন জানলার কথা বলছেন।
শুকতারা মিত্র মাথা উঁচু করে জানলার দিকে তাকালেন। কথাটার তাৎপর্য ক্ষণিকের মধ্যেই পরিষ্কার হল তাঁর কাছে।
“জানলা বন্ধ থাকলে ছায়া দেখলে কীভাবে?”
“বুঝছি না কী করে সম্ভব। মনে হয় ছিল না।”
“কী সম্ভব, কী ছিল না— পরিষ্কার করে বলো।” ধমক লাগালেন শুকতারা মিত্র।
“মানে আমি বলতে চাচ্ছি যে মনে হয় না জানলাটা বন্ধ ছিল।” একদমে ধাঁ করে বলে ফেললেন কথাটা।
“চুলোয় যাক খোলা বন্ধ! বাড়িতে ঢুকেছিলে?”
“হুঁ।”
“হুঁ কী?”
“ঢুকেছিলাম। শান্তনুর সঙ্গে কথাও হল। বলল সুললিতা মাসি নেই।”
“আঃ, সে তো আমিও জানি!”
“ওর কথামতো কোনও মেয়েছেলেই নেই।”
“তুমি যে বললে একটা মেয়েকে দেখেছিলে?”
“হ্যাঁ, তা অনেকটা ঠিকই,” ঢোঁক গিললেন পুষ্পেন্দুবাবু, “তবে সেটা শান্তনুর ছায়াও হতে পারে... মানে হওয়াটা অসম্ভব নয়।”
পুষ্পেন্দুবাবুর ব্যাখ্যা শুনে শুকতারা মিত্র বিস্ফারিত চোখে তাকালেন।
“শান্তনুর শরীরটা কি মেয়েদের মতো?”
“তা ঠিক নয়,” আমতা আমতা করে স্বীকার করলেন পুষ্পেন্দুবাবু।
“তাহলে?”
“আসলে এত অল্প সময়ের জন্য তাকিয়েছিলাম। মাথার মধ্যে ছিল তো যে সুললিতামাসি আসতে পারেন...” বলতে বলতেই হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন পুষ্পেন্দুবাবু। “দ্যাটস ইট... ইট ওয়াজ নাথিং বাট উইশফুল থিংকিং। ছায়া দেখার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হয়েছে, সুললিতা মাসি! বুঝলে শুকু... আমি এখন সিওর এটাই ঘটেছে... ব্যস, কনফিউশানটা মিটে গেল... এবার চলো, গাড়িতে ওঠো,” গাড়ির দরজা খুলে দিলেন পুষ্পেন্দুবাবু। “বাড়ি যাই।”
শুকতারা মিত্র নড়লেন না। “তবে যে বললে লম্বা লম্বা চুল আঁচড়াচ্ছিল?”
“তাই নাকি! ও হ্যাঁ, বলেছিলাম বটে। নিশ্চয় তাই মনে হয়েছিল তখন। এখন মনে হচ্ছে অপটিক্যাল ইল্যুশন, চোখের ধাঁধা। হয়তো শার্টটাই খুলছিল শান্তনু অথবা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছছিল... অনেকটা এইরকম করে...” চুল মোছার একটা ভঙ্গি করলেন পুষ্পেন্দুবাবু। কিন্তু স্টিয়ারিং সামনে থাকায় কাজটা নিখুঁত হল না।
“গাড়ি থেকে নামো।” হুকুম দিলেন শুকতারা।
“কেন?”
“বাড়ির ভিতরে যাব।”
“আমি তো ওখান থেকেই এইমাত্র বেরোলাম!”
“তাতে কী?”
“শুকু, এটার কি কোনও দরকার আছে? আমি তো শান্তনুর সঙ্গে কথাবার্তায় সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হয়েছি।”
“কী কথাবার্তায়?”
“মানে সুললিতামাসির না-আসার ব্যাপারটায়।”
“তুমি ঘরগুলো সব ঘুরে ঘুরে দেখেছ?”
“না।”
“দোতলার শোবার ঘরে যাওনি?”
“বললাম তো যাইনি কোনও ঘরে।”
“তাহলে কী করে তুমি নিশ্চিন্ত হতে পারো?”
পুষ্পেন্দুবাবু চুপ করে রইলেন।
“কী করে জানলে তুমি শোবার ঘরে কোনও মেয়েছেলে নেই?”
“শান্তনু তো পরিষ্কার বলল যে ও ছাড়া বাড়িতে কেউ নেই, সোজাসুজি বলল কথাটা।”
“তুমি বলেছিলে একটা মেয়েকে দেখেছ?”
“হুঁ।”
“উঁ কী, হ্যাঁ কি না?”
“বললাম তো, হ্যাঁ।”
“কীভাবে নিল কথাটা?”
“হেসেই উড়িয়ে দিল। বলল উলটোপালটা দেখেছি। ঠাট্টা করে বলল, ও ছাড়া একটা বেড়াল আছে। সেটা হুলো না মেনি জানে না।”
“তুমি ওকে বলেছিলে যে আমি আসতে পারি?”
“বলেছিলাম কি? বোধ হয় না। তবে ও বড্ড ক্লান্ত ছিল, শুতে যাচ্ছিল। জার্নিটা তো কম ধকলের নয়।”
ঠোঁটটা কামড়ে কিছু একটু ভাবলেন শুকতারা মিত্র।
“আজ ছেড়ে দাও শুকু। চলো, ঘুমোতে দাও ওকে... কাল বরং...”
“চলো,” কমান্ডারের দৃঢ় গলায় হুকুমটা দিয়ে সদর দরজার দিকে এগোলেন শুকতারা মিত্র। ‘চলো’ মানে ফেরা নয়, ‘চার্জ’। গাড়ি থেকে নেমে অগত্যা পিছু নিলেন পুষ্পেন্দুবাবু। কাতর স্বরে জানালেন, “আবার যাওয়াটা কিন্তু আমার পক্ষে কিন্তু নিতান্ত অভদ্রতা হবে। কী বলব আমি?”
“নিজে চিন্তা করো, সবকিছু আমায় বলে দিতে হবে নাকি!”
“মাথায় খেলছে না যে কিছু।”
“আঃ, আস্তে, চেঁচিও না! আর পা টিপে টিপে হাঁটো। যাতে বুঝতে না পারে বাইরে থেকে কেউ আসছে।”
“এটা কিন্তু অনধিকার প্রবেশ হচ্ছে শুকু, ক্রিমিনাল ট্রেসপাস।”
“চুপ! গাছে তোয়ালে ঝুলছে কেন?”
“জানি না, একটা মানুষ মনে হয়েছিল প্রথমবার।”
“তোমার মুন্ডু!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন