সতেরো

সুজন দাশগুপ্ত

ব্রিগেডিয়ার সরকার গাড়ি চালাচ্ছিলেন। আজকের পুরো ব্যাপারটাই তাঁকে প্রভূত আনন্দ দিয়েছে। ছোটবেলায় নাটক করতে ভালোবাসতেন। শুধু ভালোবাসতেন নয়, সেটাই ছিল ওঁর নেশা। কলেজ শেষ করে গায়ে চড়ালেন খাকি পোশাক, নাট্যজীবনের সেখানেই ইতি। তারপর তিরিশ বছর থিয়েটারের ধারেকাছে ঘেঁষেননি। আজ বহু বছর বাদে যখন অভিনয় করার সুযোগ এল, তখন তিনি যে শুধু উৎসাহিত হলেন তা নয়, সুযোগের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করলেন। বস্তুত তাঁর নিখুঁত অভিনয়ের জন্যই শান্তনু দেবযানীকে নিয়ে শুকতারার মতো দজ্জাল মহিলার বজ্রমুষ্টি থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পারল। সাফল্যের এর চেয়ে বড় মাপকাঠি আর কী হতে পারে! আত্মতৃপ্তিতে তিনি ক্ষণে ক্ষণেই আপ্লুত হচ্ছিলেন। রিয়ারভিউ মিররে দেবযানীর ঢলঢলে মিষ্টি মুখটা চোখে পড়তেই হঠাৎ করে স্নেহ উথলে উঠল। প্রথমে শান্তনুর কাছে ঘটনাটা শুনে শুধু সহানুভূতিই হচ্ছিল মেয়েটার প্রতি। আহা রে, বাবা নেই, বাবার পরিবারের কেউ নেই... আমেরিকান মা ছেড়ে রেখে চলে গেছে, সৎ-বাবা অর্ধোন্মাদ! স্বল্পজীবনে কতই না কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা। হ্যাঁ, খাতায় কলমে এখন অ্যাডাল্ট ঠিকই, সেকেন্ড ইয়ারে যখন পড়ছে... বয়স বছর উনিশ তো হবেই। কিন্তু এই বয়সে একা একা জীবনের পথে চলা তো সহজ ব্যাপার নয়! মেয়েটার সঙ্গে কথা বলার পরে তো মায়ার জালে আটকা পড়লেন ভালোরকমই! ঠিক এদেশে তো বড় হয়নি কন্যা... হাসিখুশি, খোলামেলা আচরণ, ছেলেমানুষি মিষ্টি ভাব, সরল বিশ্বাস— একে ভালো না বেসে থাকা যায়? নিজের মেয়ে ছিল না বলে চিরদিন একটা দুঃখ ছিল, এতদিনে সেটা বোধ হয় ঘুচল। স্ত্রীকে হারিয়েছেন বহুদিন, একা ছেলেকে মানুষ করেছে। বিয়ে দিয়েছেন। বউমাকে নিয়ে ছেলে চলে যাবার পর বাড়িটা একেবারে শূন্য হয়ে গেছে। ভাবছিলেন, সুখচিন্তাপুরে এই যে হঠাৎ আসাটা... এটা প্রভিডেন্স ছাড়া আর কী? পুরো দৈবের খেলা! শান্তনুর সঙ্গে দেখা হওয়া, সেই সূত্রে দেবযানী। দেবযানীকে দেখামাত্র মনে হয়েছে বড্ড আপন! ওঁর ওই ভালো লাগাটা দেবযানীও বুঝেছে... মেয়েটাও স্নেহের কাঙাল। হাত জড়িয়ে পাশে বসেছিল কতক্ষণ... যেন নিজেরই বাবা! মনটা ভরে গেছে ব্রিগেডিয়ার সরকারের। স্থির করে ফেলেছেন এখন থেকে দেবযানীর দেখভালের দায়িত্ব ওঁর... ওই অর্ধ-উন্মাদ সিংজির বাড়িতে ছুটি কাটাতে যাবার কোনও প্রশ্নই নেই।

শুকতারা মিত্রের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে দেবযানীকে কী করে পাচার করা যায়, তাই নিয়েই শান্তনু এতক্ষণ ব্যস্ত ছিল। ব্যাপারটার সমাধান বেশ অভাবনীয়ভাবেই হয়ে গেল। কলকাতায় ক-দিন থাকার জন্য দেবযানীকে আর বন্ধুদের খোঁজ করতে হবে না, পাতানো কাকা ব্রিগেডিয়ার সরকারের বাড়িতেই থাকবে। আর এত রিসোর্স ব্রিগেডিয়ারের, এর মধ্যেই শান্তনুর গাড়িটা সারানোর বন্দোবস্ত হয়ে গেছে, এমনকী কলকাতায় নিয়ে আসারও! নিশ্চিন্তি বলে নিশ্চিন্তি! শুকতারা দেবী ল্যাং খেয়েছেন। তাঁকে যদি এতটুকু শান্তনু চিনে থাকে, তাহলে চন্দ্রিমার সঙ্গে বিয়েতে উনি বাগড়া দেবেনই। মনে হচ্ছে চন্দ্রিমার বিয়ের দায় থেকেও দিব্যি মুক্তি পাওয়া যাবে। সত্যি কথা বলতে কী, সুখচিন্তাপুরে আসার আগে চন্দ্রিমাকে ঘিরে যেটুকু রোমান্টিক ভাব আসব আসব করছিল, সেটা পুরোপুরি উবে গেছে। যার দিদি শুকতারা মিত্র, তার সঙ্গে জীবন জড়ানো খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হত না। ব্যাপারটা মাকে একটু বুঝিয়ে বলতে হবে। এসব বিষয়ে সুললিতা দেবী বড্ড অবুঝ! দেবযানীর থাকার বন্দোবস্ত হয়ে যাওয়ায় একটা দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়েছে সে। নিজের অজান্তেই দায়িত্বটার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিল। এখন নিশ্চিন্ত মনে মার্কিন মুলুকে পাড়ি দিতে পারবে। কিন্তু পারবে কি? দেবযানীর গা থেকে জুঁইফুলের সুবাসটা এখনও পাচ্ছে। ভারী ভালো এই ফুলটা। কলকাতায় গিয়ে দেবযানীর সঙ্গে আর দেখা হবে কি না কে জানে! হয়তো এই শেষ দেখা। সমস্যাসংকুল একটা রাত, তার দৌলতেই কিছুটা সান্নিধ্য... লাভের মধ্যে এইটুকুই। কলকাতায় ব্রিগেডিয়ার মেসোমশাইয়ের স্নেহচ্ছায়ায় দেবযানীর দিন কাটবে। তারপর একদিন ঘটা করে দেবযানীর বিয়ে হয়ে যাবে... অসম্ভব? সেটা কখনোই ঘটতে দেবে না শান্তনু। দেবযানী যেরকম সুন্দরী, কলকাতায় অনেকেই উদগ্রীব হবে এরকম রূপসীকে পেতে। কিন্তু তাদের গলায় মালা দেবার আগে দেবযানী কি শান্তনুর কথা একবারও ভাববে না! এসব যে ভাবছে... শান্তনু নিজেই বিশ্বাস করতে পারল না। আসলে টেনশনের মধ্যে থাকার দরুন মনের কোমল অনুভূতিটা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ, অদ্ভুতভাবেই দেবযানীর প্রেমে ও পড়েছে। ভীষণভাবেই পড়েছে। কিন্তু দেবযানী? ওর মনোভাবটা তো জানা দরকার! এখুনি ওর মত না পেলেও শান্তনু অপেক্ষা করতে রাজি। শান্তনু পিছনের সিটে তাকাল। একটা খন্দে পড়ার ঝাঁকুনিতে দেবযানীর চোখটা খুলল। শান্তনুর দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় মধুর হাসি হাসল। এটাই কি শান্তনুর প্রশ্নের উত্তর? দেবযানীর এই হাসিটা নজর এড়াল না ব্রিগেডিয়ার সরকারের।

“হ্যাঁ রে মা, জেগে আছিস?” ব্রিগেডিয়ার সরকার জিজ্ঞেস করলেন। দিব্যি তুই-তোকারি সম্পর্ক হয়ে গেছে।

“হ্যাঁ, কাকু।”

“তোর কলেজ খুলছে কবে?”

“এই তো, দু-সপ্তাহ বাদে।”

“আর শান্তনু, তুমি আমেরিকা ফিরছ কবে?”

“আমি আরও সপ্তাহ চারেক আছি।”

“আপনি আমেরিকায় থাকেন?” প্রশ্নটা দেবযানীর। শান্তনু কোথায় থাকে এই প্রথম সে জানল।

উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেল না শান্তনু। তার আগেই ব্রিগেডিয়ার বললেন, “দেখ আর কতদিন ওদেশে পড়ে থাকবে।... দেবযানীর তো আবার আমেরিকা ভালো লাগে না… তাই না, মা?”

“হ্যাঁ, কাকু।” শান্তনুর দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল দেবযানী।

“ও হস্টেল না যাওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন আমার বাড়িতে আসবে... বুড়ো কাকুর সঙ্গে আর কত গল্প করবে মেয়েটা!” মুচকি হাসলেন ব্রিগেডিয়ার।

লাল হল শান্তনু।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%