এগারো

সুজন দাশগুপ্ত

এমনিতে রাত দশটা বা এগারোটা এমন কিছু রাত নয়। কিন্তু সুখচিন্তাপুরে এটা গভীর রাত্রি। পুষ্পেন্দুবাবুর মোটেই বেরোবার ইচ্ছে ছিল না এই রাত্রে। তিনি নির্ভীক বেপরোয়া টাইপ নন। গাড়িতে উঠে তাঁর প্রথম যে অনুভূতিটা হল, সেটা নিদারুণ ভীতি। নানান দুর্ভাবনা, দুশ্চিন্তা ঝাঁকে ঝাঁকে মাথায় এসে ভিড় করল। পথঘাট একদম নির্জন। এত রাত্রে রিকশা অবশ্য থাকে না, কিন্তু দু-একটা গাড়ি চোখে পড়ে। আজ তাও নেই। গাড়ি যদি এখন খারাপ হয়? ভাবতেই শরীর হিম হয়ে গেল তাঁর। চলন্ত গাড়িতে তবু একটা নিরাপত্তা আছে। কিন্তু মাঝপথে যদি গাড়ি বিগড়োয়? অবশ্য চলন্ত গাড়িও চলন্ত থাকবে না, ডাকাতরা গাড়ি আটকালে! সেক্ষেত্রে গুলি খেয়ে প্রাণ হারানোরও সমূহ সম্ভাবনা! এই শুকতারার জন্যেই যত বিপদ! বিয়ে হওয়া অবধি একনাগাড়ে হুকুম দিয়ে চলেছে! এতদিন কোনও প্রতিবাদ করেননি, নীরবে সহ্য করেছেন, আজকে কিন্তু সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে! একটা হেস্তনেস্ত অবশ্যই করা দরকার। স্টিয়ারিং-এর ওপর একটা চাপ দিয়ে পুষ্পেন্দুবাবু ঠিক করলেন গাড়ি ঘুরিয়ে নেবেন। বাড়ি ফিরে সবকিছুর চূড়ান্ত ফয়সলা করবেন আজকে। শুকতারা যদি গোয়েন্দাগিরি করতে চায় নিজে করুক। পুষ্পেন্দুবাবু একজন পদস্থ গেজেটেড অফিসার, এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার। আজ বাদে কাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার হবেন। ভবিষ্যতে চিফ ইঞ্জিনিয়ার হওয়াটা গ্যারেন্টিড না হলেও, সম্ভাবনা তো বটেই। মানসম্ভ্রম বলে তাঁর একটা জিনিস আছে। রাতদুপুরে ভদ্র যুবকের বাড়ি হানা দিয়ে নারীঘটিত কেচ্ছা আবিষ্কার করা তাঁর কাজ নয়। এটাই সাফ সাফ জানিয়ে দেবেন শুকতারাকে, কাদা ঘাঁটাঘাঁটি করা এই পুষ্পেন্দু মিত্রের কাজ নয়। ব্রেকে পা দিলেন পুষ্পেন্দুবাবু। ভাগ্যিস দিয়েছিলেন! সামনেই একটা বড় সাইজের গাছের ডাল রাস্তা জুড়ে পড়ে রয়েছে। ক-দিন আগেই জিটি রোডে ডাকাতি হয়ে গেছে ঠিক এইভাবেই। রাস্তা বন্ধ করে গাড়ি থামিয়ে রাহাজানি করেছে কয়েকজন দুর্বৃত্ত। পুষ্পেন্দুবাবু বিদ্যুৎগতিতে ব্যাকগিয়ার দিতে যাচ্ছিলেন, পেছন থেকে দুটো রিকশা হঠাৎ দেখা দিল। পাশের মেঠো রাস্তা থেকে উঠে এসেছে।

আরে, এ তো রতন! রতন পুষ্পেন্দুবাবুদের বাঁধাধরা রিকশাঅলা।

পুষ্পেন্দুবাবুকে হাত দেখিয়ে দাঁড়াতে বলে রতন আর তার সঙ্গী সামনে এগিয়ে ডাল সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। চেনা মুখ দেখে পুষ্পেন্দুবাবু বল পেলেন।

“কী ব্যাপার রে রতন?”

“আরে বাবু, আপনি? চললেন কোথায় এত রাত্রে?

“পাকড়াশীবাবুর বাড়ি। এক বন্ধু এসেছে। ডালটা এখানে এল কোত্থেকে?”

“শুকনো ডাল বাবু, হাওয়া লেগে পড়ে গেছে।”

“ও।” লজ্জা লাগল পুষ্পেন্দুবাবুর। খামোখা যতসব আজগুবি চিন্তা করছিলেন। রাস্তা পরিষ্কার হতেই সোজা সুরম্যর দিকে গাড়ি চালিয়ে দিলেন।

সুরম্যতে তখনও আলো জ্বলছে। যাক, শান্তনু জেগে আছে তাহলে। গাড়িটা শান্তনুর গাড়ির পিছনে দাঁড় করিয়ে নেমে পড়লেন। সদর দরজার দিকে যেতে যেতে নজরে পড়ল ঝোপে আটকানো শান্তনুর তোয়ালেটা। চাঁদের আলোয় মনে হল একটা লোক যেন সাদা আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে! আর্ত চিৎকার করে হুড়মুড়িয়ে বারান্দায় লাফিয়ে উঠে পড়লেন। তাড়াহুড়োতে সামনে বেতের কয়েকটা চেয়ার উলটে পড়ল। দরজা আটকানো ছিল না, তাই ধাক্কা লাগতেই খুলে গেল। সবেগে ভিতরে প্রবেশ করলেন পুষ্পেন্দুবাবু, কোনোমতে দেয়াল ধরে সামলালেন নিজেকে।

শান্তনু নিচে ছিল। চেয়ার উলটে পড়ার আওয়াজ, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পুষ্পেন্দুবাবুকে দেখে হতভম্ব হয়ে বলল, “আপনি? এত রাত্রে কোত্থেকে?”

পুষ্পেন্দুবাবু হাঁপাচ্ছিলেন। দরজা বন্ধ করার অছিলায় ঘুরে দাঁড়িয়ে উত্তেজনা প্রশমনের একটা ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। না পেরে হাঁপাতে হাঁপাতেই প্রশ্ন করলেন, “কী খবর, ভালোভাবে এসে পৌঁছেছ তো?”

“তা পৌঁছেছি। কিন্তু সেটা জানতে এমনভাবে দৌড়ে এলেন এত রাত্রে?”

পুষ্পেন্দুবাবুর মস্তিষ্কের স্থিরতা সম্পর্কে প্রশ্ন জাগল শান্তনুর।

“রাত্রি অনেক হল নাকি?”

“তা প্রায় এগারোটা।”

“যাঃ, তাহলে তো বেশ রাত্রিই হয়েছে। খেয়াল হয়নি তো একদম!”

শান্তনু কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইল।

পুষ্পেন্দুবাবু খেই ধরে শুরু করলেন, “ভাবলাম অচেনা জায়গা, যদি কিছু দরকার-টরকার হয়।”

“দরকার হলে নিশ্চয় ফোন করতাম বা মেসেজ পাঠাতাম। আপনি বৃথাই দুশ্চিন্তা করছিলেন।” একটু বিরক্তি ঝরল শান্তনুর গলায়।

“তা বটে,” পুষ্পেন্দুবাবু মানলেন। “আসলে খানিক আগে রাস্তা দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম, দেখলাম দোতলায় আলো জ্বলছে। তোমাকে অবশ্য দেখিনি, কিন্তু সুললিতা মাসিকে এক ঝলক দেখেছিলাম। এত রাতে মাসিকে আর ডিস্টার্ব করতে চাইনি। পরে মনে হল আলো যখন জ্বলছে, তুমিও নিশ্চয় জেগেই আছ। তাই...”

sujan5

“কাকে দেখেছিলেন?”

“কেন, সুললিতা মাসিকে? দোতলার জানলায় দাঁড়িয়েছিলেন যে একটু আগে?”

শান্তনুর মুখটা হাঁ হয়ে গেল। পুষ্পেন্দুবাবু সেটা খেয়াল করলেন না। জামার ওপরে হঠাৎ একটা পোকা এসে বসায় চমকে সেটাকে জামা-চ্যুত করতে তিনি তখন ব্যস্ত। শান্তনু ইতিমধ্যে নিজেকে সামলে নিয়েছে।

“আপনার চোখটা একবার দেখান পুষ্পেন্দুদা!”

“কেন বলো তো?”

“মা এখানে কোথায়?”

“কী আশ্চর্য, একটু আগে যে দেখলাম আমি!”

“কী দেখলেন?”

“বললাম যে... সুললিতা মাসিকে!”

“কোথায়?” শান্তনুর অবিশ্বাসের বহর যেন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

“আঃ, জানলার ধারে!”

“কোন জানলার ধারে?”

“দোতলার! একটা জানলা আছে তো ওখানে?”

“মা কলকাতায়,” পুষ্পেন্দুবাবুর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথাটা বলল শান্তনু।

যে কোনও ‘স্থির দৃষ্টি’ পুষ্পেন্দুবাবুকে শুকতারার কথা মনে করিয়ে দেয়। চোখটা সরিয়ে নিলেন পুষ্পেন্দুবাবু। কিন্তু না বলে পারলেন না, “আমি কিন্তু একজন মহিলাকে দেখেছি দোতলায় শোবার ঘরে।”

“আমার শোবার ঘরে একজন মহিলা? কী যা-তা বলছেন আপনি?”

“আরে না, আমি দিব্যি কেটে বলতে পারি। লম্বা চুল, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলেন মহিলাটি।”

“তার মানে আপনি অভিযোগ করছেন যে আমার ঘরে একটি মহিলা রয়েছেন, তাই তো?” কড়া স্বরে প্রশ্নটা করল শান্তনু।

“অ্যাঁ!” নিজের কথাগুলোর তাৎপর্যটা এতক্ষণে যেন হৃদয়ঙ্গম হল পুষ্পেন্দুবাবুর। “না, না, মানে বুঝতে পারছ তো... ব্যাপারটায় আমার একটু গোলমাল লেগে যাচ্ছে। আমি হলপ করে বলতে পারি একজন মহিলাকে দেখেছি।”

হুইস্কির গন্ধটা এলাচমুক্ত হয়ে ভক করে শান্তনুর নাকে এসে লাগল।

“রাত্রে কিছু পান করেছেন আপনি?”

“তার মানে?”

“তরল পদার্থ, মানে মদ জাতীয় কিছু?”

“কেন?” পুষ্পেন্দুবাবু একটু মিইয়ে গেলেন।

“বলুন না?”

“হুইস্কি, কিন্তু বলতে গেলে নামমাত্র।”

“বোঝা গেল এতক্ষণে!” শান্তনু একটা সুস্থির নিঃশ্বাস সশব্দে বার করল বুক থেকে।

“কিন্তু নেশা-ফেশা হয়নি আমার, বিশ্বাস করো!”

“লজ্জা পাবেন না পুষ্পেন্দুদা, এরকম আমারও হয়েছে। মনে হয়েছে নেশা হয়নি, কিন্তু উলটোপালটা কত কিছু দেখে ফেলেছি! প্লিজ, এ নিয়ে একদম টেনশন করবেন না।”

“কিন্তু কী করে এমন হল?” পুষ্পেন্দুবাবু হতভম্ব হয়ে বললেন, “এই একটু আগে, মাইরি বলছি, বাড়ি ফেরার পথে স্পষ্ট দেখলাম...”

“বাড়ি ফেরার পথে মানে?” শান্তনু এবার চঞ্চল হল।

“বাড়ি যাচ্ছিলাম স্টেশন থেকে, এই পথ দিয়েই তো যেতে হয়। তখনই নজরে পড়ল।”

“শুকতারাদিকে জানিয়েছেন নাকি?”

“অ্যাঁ? ও হ্যাঁ, অনেকটা সেরকমই। সেইজন্যেই বলতে গেলে আবার ফিরে আসা।”

“এই সেরে…” ঘন ঘন কেশে সামলে নিল শান্তনু।

“কী বললে তুমি?”

“বলছি ঝামেলা হল তো! শুকতারাদি অনেক আশা করে বসে থাকবেন। জেগে আছেন উনি, না শুয়ে পড়েছেন?”

“শুয়ে কোথায়? অপেক্ষা করছে আমার জন্য। খবর পেলেই চলে আসবে এখানে।” কীসের খবর আর বিশদ করলেন না পুষ্পেন্দুবাবু।

“সর্বনাশ! আপনি এখুনি বাড়ি যান, খুলে বলুন ব্যাপারটা। আশায় আশায় বসিয়ে রাখবেন না।”

“যাচ্ছি, যাচ্ছি। কিন্তু তুমি একদম সিওর? অন্য কোনও লোক, মানে...” পুষ্পেন্দুবাবুর বলতে বাধো বাধো ঠেকল, তবু বলে ফেললেন, “স্ত্রী-জাতীয় কেউ নেই এখানে?”

“একটা বেড়াল আছে, মিনি না হুলো জানি না।”

“ও। বেশ, তাহলে বাড়িই ফিরি। শুকু বেচারা জেগে বসে আছে।”

“উত্তম প্রস্তাব। গিয়ে বলুন ব্যাং দেখতে সাপ দেখেছেন... না না, বলুন মরীচিকা বা ওই জাতীয় কিছু।”

পুষ্পেন্দুবাবু উত্তর করলেন না। অন্যমনস্কভাবে দরজার দিকে এগোলেন।

“কাল সকালে তাড়াহুড়োর কোনও দরকার নেই।” শান্তনু জানিয়ে দিল। “আমি অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমোই, প্রায় দশটা-টশটার মতো।”

পুষ্পেন্দুবাবুর মাথাটা নড়ল।

“গুড নাইট।” শান্তনু দরজাটা খুলে দিয়ে দাঁড়াল।

বেরিয়ে যেতে গিয়েও পুষ্পেন্দুবাবু একটু দাঁড়ালেন, “ও হ্যাঁ, গুড নাইট। তবে বুঝলে তো, ধোঁকাটা কিন্তু ঠিক গেল না।”

“বেকার চিন্তা করবেন না। একটা ঘুমের বড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ুন। কাল দেখবেন মাথা-টাথা পরিষ্কার হয়ে ঝরঝরে লাগছে।”

এগিয়ে দরজার কাছে পা দিয়েই আবার ঘুরে দাঁড়ালেন পুষ্পেন্দুবাবু, “তোমার কাছে টর্চ হবে একটা?”

“কেন বলুন তো?”

“যখন আসছিলাম তখন মনে হল ঝোপের কাছে একটা লোক বসেছিল,” একটু ভীত স্বরে বললেন পুষ্পেন্দুবাবু।

“নাঃ, নেশাটা আপনার আজ ভালোই হয়েছে, পুষ্পেন্দুদা। কোথায় লোক, দেখি?” লম্বা লম্বা পা ফেলে শান্তনু বাইরে এল। চাঁদের আলোয় তোয়ালেটা চকচক করে উঠল হঠাৎ।

“ওই, ওই,” শান্তনুর একটা হাত খামচে ধরে আর্তনাদ করে উঠলেন পুষ্পেন্দুবাবু।

ঝাঁকা দিয়ে হাতটা সরিয়ে, এগিয়ে গিয়ে তোয়ালেটাতে একটা নাড়া দিল শান্তনু। ঝোপসুদ্ধু তোয়ালেটা দুলে উঠল সেই ঝাঁকানিতে।

“এই আপনার লোক?” শান্তনুর গলায় অনুকম্পার আভাস। চূড়ান্ত অপ্রস্তুত হয়ে পুষ্পেন্দুবাবু বিদায় নিলেন।

ঘরে ঢুকেই শান্তনু ছিটকিনিটা ভালো করে লাগাল। একটা খিল ছিল, সেটাও আটকে দিল বাড়তি সতর্কতা হিসেবে। হুটহাট কেউ যেন আবার ঢুকে না পড়ে। দোতলায় দেবযানীর ঘরে একটা টোকা দিয়ে চাপা স্বরে বলল, “জেগে আছেন?”

“আছি, এক মিনিট... এবার আসুন।”

ঘরে আলো জ্বলছে। মশারি তখনও তোলা অবস্থায়। শুয়েছিল, তবে ঘুমোয়নি অথবা ঘুমোতে পারেনি। শান্তনুর টোকা শুনে উঠে বসেছে। উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কে এসেছিল, সিংজি নাকি?”

“না, ঝামেলাটা এবার আমার দিক থেকে।”

দেবযানীর চোখে জিজ্ঞাসা।

“আমি বাজি ধরে বলতে পারি, শুকতারাদি, মানে যে মহিলার কথা বলছিলাম... তিনি এই রাত্রেই এখানে পদার্পণ করবেন।”

“হেভন্‌স, কী হবে তাহলে? আপনি ওঁকে সব বলবেন?”

“খেপেছেন নাকি?”

“তাহলে কী করা উচিত এখন?”

“লুকোন একটা ভালো জায়গা দেখে, আর এখুনি আলোটা নিভিয়ে ফেলুন।”

বেডসুইচটা অফ করল দেবযানী। সঙ্গে সঙ্গে ভেতরটা অন্ধকার হয়ে গেল।

“এই অন্ধকারে লুকোব কী করে?”

“দাঁড়ান, রাস্তার দিকের এই জানলাটা বন্ধ করি। এই জানলা দিয়েই আপনাকে দেখে ফেলেছে।”

“ওই যাঃ, আমি তো একেবারে খেয়ালই করিনি।”

জানলাটা চাঁদের আলোয় ভালোই দেখা যাচ্ছিল, সেটা বন্ধ করে শান্তনু বলল, “এবার আলোটা জ্বালতে পারেন।”

পর্দার ফাঁক দিয়ে যেটুকু আলো আসছিল, সেটাও না আসায় এখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। সুইচটা খুঁজে পেল না দেবযানী। শান্তনুও হাতড়ে হাতড়ে খোঁজার চেষ্টা করল। অনিবার্যভাবেই দেবযানীর হাতটা ছুঁয়ে গেল বেশ কয়েকবার। ইলেকট্রিক শকের তীব্র শারীরিক কাঁপুনি তাতে নেই ঠিকই, কিন্তু উষ্ণ কোমল স্পর্শ হৃদয়তন্ত্রীতে যে কম্পন তুলল, তার রোমাঞ্চটাও কম নয়! তবে সেটা মিলিয়ে যেতেও সময় লাগল না। সুইচ অন হবার পর ফিরে আসতে হল বাস্তবে। খাটের এক কোণে বসে শান্তনু বলল, “ভাবা যাক, কোথায় লুকোতে পারেন আপনি। জায়গাটা কাছাকাছি হতে হবে, যাতে সিঁড়িতে আওয়াজ বা দরজায় নক শুনলেই লুকিয়ে পড়তে পারেন।”

“উনি কি শোবার ঘরে আসবেন বলে মনে হয়?” দেবযানীর গলাতেও একটু শঙ্কা।

“অস্বাভাবিক নয়। বলতে কী, ওঁর মতো জাঁহাবাজ মহিলার পক্ষে মনে হয় খুবই স্বাভাবিক। তদন্তের উদ্দেশ্যে আসছেন তো!”

“তাহলে তো বিছানার নিচে লুকোনো চলবে না।”

“অ্যাবসোলিউটলি নট। আমার মনে হয় এই ঘরে লুকোনোটাই যুক্তিযুক্ত হবে না।”

“বাথরুমে?”

শান্তনু একটু চিন্তা করল। গুলি মারো! মাঝরাতে এসে সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খোঁজার অধিকার কারও নেই। ভদ্রতাজ্ঞান যদি লেশমাত্রও থাকে, কখনোই তা কেউ করবে না। অন্য পক্ষে, ভদ্রতাজ্ঞান যদি সত্যিই থেকে থাকে, তাহলে এত রাতে কেউ এখানে আসবেই বা কেন?

“এক কাজ করা যাক বরং, আমরা দুজন ঘণ্টাখানেক নিচে বসি। এলে এর মধ্যেই ওঁরা এসে যাবেন। সেক্ষেত্রে একতলায় আপনি কোথাও লুকিয়ে পড়তে পারবেন, রান্নাঘর, সিঁড়ির ঘর, ঠাকুরঘরও বোধ হয় দেখেছিলাম একটা... বহু জায়গা আছে লুকোবার।”

“আপনি যা ভালো বোঝেন। আমি বরং বিছানাটা ঠিকঠাক করে রাখি। নইলে হয়তো সন্দেহ হবে।”

“গ্র্যান্ড আইডিয়া! আমার মাথায় এটা খেলেনি একদম!” দেবযানীর বুদ্ধিমত্তায় শান্তনু চমৎকৃত হল।

মাথার বালিশটা চেপেচুপে সোজা করে গুছিয়ে রাখল দেবযানী। গায়ে দেবার চাদরটা ভাঁজ করে বালিশের ওপর সেটাকে রাখল। তারপর কোলবালিশটা তুলে সে দুটোর ওপর চাপাল।

শান্তনু মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেবযানীর গোছানো দেখছিল। তার নিজের বহু ব্যবহৃত হালকা-সবুজ পাঞ্জাবি দেবযানীর নরম শরীরটাকে ঢেকে রেখেছে। শোবার আয়োজন করছিল বলেই বোধ হয় দেবযানীর চুল ফিতে-মুক্ত অবস্থায়। ঘন কোঁকড়ানো লালচে কালো চুল পাঞ্জাবির সঙ্গে লাস্যভরে ছোঁয়াছুঁয়ির খেলা খেলছে। আনত অবস্থায় বিছানা গোছাচ্ছে দেবযানী। সেই সাধারণ কাজটুকুর মধ্যেও যেন একটা মিষ্টি ছন্দ! সেই ছন্দের সঙ্গে তাল রেখে রুপোর সরু নেকলেসটা এদিক ওদিক দুলছে। সেটা দেখতে দেখতে শান্তনু প্রায় সম্মোহিত হয়ে পড়েছিল।

“উঠুন, বেডকভারটা একটু টানটান করে রাখি।”

দেবযানীর ডাকে সচকিত হয়ে শান্তনু উঠে দাঁড়াল। একটু কৈফিয়তের সুরে বলল, “বুঝলেন, এসবের বোধ হয় কিছু দরকার ছিল না। কিন্তু আমার একটু নার্ভাস লাগছে। মহিলাটি একটু খান্ডারনি টাইপের।”

“না না, একটু সাবধান হওয়াই ভালো। তা ছাড়া নামটা শুনে মনে হচ্ছে, আমি এ বাড়িতে ওঁকে আসতে দেখেছি। আমার অনুমান যদি ঠিক হয়...” দেবযানী হঠাৎ চুপ করে গেল।

শান্তনু কিছুক্ষণ বাকিটুকু শোনার জন্য অপেক্ষা করে বলল, “কই, কী ঠিক হয় বললেন না তো?”

দেবযানী মৃদু স্বরে বলল, “একটু সতর্ক হওয়াই ভালো।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%