চোদ্দো

সুজন দাশগুপ্ত

ভোরের আলো দেখা দিতে না দিতেই শান্তনুর ঘুম ভাঙল। দেবযানী তখনও অঘোরে ঘুমোচ্ছে। টুথপেস্ট-টুথব্রাশ নিয়ে বাথরুম ঢুকে শান্তনু প্ল্যান অফ অ্যাকশনে মনোনিবেশ করল। তিন-তিনটে অতি জরুরি কর্তব্য আপাতত তার সামনে। এক নম্বর- গাড়ি সারানো, দু-নম্বর- কলকাতায় কারও সঙ্গে যোগাযোগ করে দেবযানীর একটা বন্দোবস্ত করা, তিন নম্বর- পুষ্পেন্দুদার সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করা।

গাড়িটা সারানো আশু প্রয়োজন। ওটা ছাড়া সে সম্পূর্ণ অচল। ঘটনাবলি যে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে আর আঁকাবাঁকা মোড় নিচ্ছে, তাতে শুধু সচল হলেই চলবে না, কিঞ্চিৎ বেগবানও হতে হবে। সম্ভবত মুহূর্তের নোটিসে সুখচিন্তাপুর থেকে পিট্টান দিতে হতে পারে। অবস্থার গতি দেখে মনে হচ্ছে, সম্ভাবনাটা এখন শুধু সম্ভাবনাতেই আটকে নেই, অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে।

গাড়ির রোগটা যদি বড়সড় কিছু হয় তাহলেই চিত্তির! সময় কিংবা পয়সা, কোনোটাই শান্তনুর হাতে আপাতত নেই। অমরজিৎকে একটা ফোন করে দেখা যেতে পারে, এদিকে কোনও ট্রাকওয়ালা বা মিস্ত্রির সঙ্গে জানাশোনা আছে কি না। পুষ্পেন্দুদাকেও সবকিছু খুলে বলে তাঁর শরণ নেওয়া যেতে পারে। তাঁর কাছ থেকে নৈতিক বা মানসিক সমর্থন না মিললেও, পাড়াতুতো জামাইবাবু হিসেবে সাময়িক আর্থিক সাহায্য আশা করাটা বোধ হয় অনুচিত হবে না। কিন্তু পুষ্পেন্দুদার সঙ্গে বোঝাপড়াটা করতে হবে সঙ্গোপনে, শুকতারাদির অজান্তে। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেটা আদৌ সম্ভব হবে কি না বলা শক্ত। ধরে নেওয়া যাক, টাকা ও গাড়ির দুটোরই বন্দোবস্ত হল। সেক্ষেত্রেও একটা দুরূহ সমস্যা রয়ে যাচ্ছে, সেটা হল দেবযানী।

দেবযানীকে সমস্যা হিসেবে ভাবতে গিয়েই বুকে একটা ধাক্কা খেল শান্তনু। দেবযানী একটা সমস্যা? এই ধরনের সমস্যার সঙ্গে আজীবন জড়িয়ে যাওয়ার মধ্যেও একটা আনন্দ! কিন্তু মাতৃভক্তি, নীতিপরায়ণতা, আত্মসংযম, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি ইত্যাদি বাস্তবভিত্তিক নানান প্যাঁচঘোঁচ বিচার করলে দেবযানীকে সমস্যা হিসেবেই ধরতে হয়। কিন্তু সত্যিই কি দেবযানী একটা সমস্যা? সি হ্যাজ প্লেনটি অফ মানি... অন্তত যা ওকে বলেছে। আর দেবযানীকে অবিশ্বাস করতেও মন চায় না। একটা নিষ্পাপ সরলতা আছে ওর মধ্যে। ওই বয়সি অনেক আমেরিকান মেয়েদের মধ্যে শান্তনু যেটা দেখেছে। কিছুটা ছেলেমানুষি, মানুষকে বিশ্বাস করার প্রবণতা, যাকে বলে সুইট ইনোসেন্স... সব মিলিয়ে ভালো লাগার একটা ব্যাপার। কলকাতায় দেবযানীর চেনাজানা বন্ধু নিশ্চয় রয়েছে, কিন্তু চট করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব নাও হতে পারে। কলকাতায় গিয়েই যাতে কোথাও থাকতে পারে, সেরকম একটা জায়গা বার করতে হবে। না, কোনও হোটেল নয়। ওর মতো একটা সুন্দরী মেয়েকে একা একা হোটেলে রাখাটা খুবই রিস্কি হবে। মা? না, মা হয়তো বেঁকে বসতে পারে। সুতরাং অমরজিৎই ভরসা। অমরজিৎ-এর মা ভারী স্নেহময়ী মহিলা। শান্তনুর পরিচিত জানলে আশ্রয় দেবেন। ঘ্যাসঘ্যাস করে টুথব্রাশ ঘষে দাড়িতে হাত বোলাল শান্তনু। এমন কিছু বড় হয়নি, আজকে না কামালেও চলবে। চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে খেয়াল হল চিরুনিটা দেবযানীর কাছে। আঙুল চালিয়েই চুলটা ঠিকঠাক করে নিল। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখল। নাঃ, সভ্যভব্যই লাগছে। গায়ে শার্ট গলিয়ে নেমে এল নিচে।

প্রথম ফোনটা অমরজিৎকেই করা যাক। নম্বরটা মুখস্থই ছিল, কিন্তু লাভ হল না। শুকতারাদি কালকে ফোনে ডায়ালটোন পেয়েছিলেন, আজকে নেই। সুখচিন্তাপুরের টেলিকম ব্যবস্থা এখনও মধ্যযুগে পড়ে আছে। মোবাইল-এর সিগন্যালও খুব উইক। গতরাত্রে আসার পথে একটা পেট্রল পাম্প নজরে পড়েছিল। সেখানে হয়তো একটা টেলিফোন পাওয়া যাতে পারে। ভাগ্যে থাকলে একটা মেকানিকও জুটে যেতে পারে। পকেটে মাত্র পনেরোটা টাকা, সমস্যা সেখানে। দেবযানীর কাছে কি কিছু টাকা মিলবে? মানে সিংজির বাড়িতে ওর কি কিছু ক্যাশ টাকা আছে? না, না, সেটা চাওয়া যায় না। চটি পায়ে বেরিয়ে পড়ল শান্তনু। বেশি দেরি করা চলবে না। খুব ভোরবেলাতেই যে শুকতারাদি আবার হানা দেবেন সে বিষয়ে ও নিশ্চিত। কিন্তু ওর টাকার প্রয়োজনটা আরও জরুরি। পুষ্পেন্দুদাকে সবকিছুর আগেই ধরতে হবে... এই বিপদে উনিই একমাত্র ভরসা!

বাড়ি থেকে বেরতেই একটা রিকশা পাওয়া গেল।

“কাছাকাছি গাড়ি মেরামতের দোকান আছে?”

“আজ্ঞে?”

“গাড়ি, মোটরগাড়ি! কাছাকাছি কোথাও সারানো যাবে?”

“না, কাছাকাছি নেই বাবু।”

‘কাছাকাছি’ কথাটা ব্যক্তিনিরপেক্ষ নয়, শান্তনু এবার প্রাঞ্জল হবার চেষ্টা করল। “দু-তিন মাইলের মধ্যে কিছু নেই?”

“মোটরবাবুর দোকান আছে, প্রায় তিন মাইল দূরে।”

“এখন খোলা পাব?”

“এখন খোলা থাকবে না, খুলতে খুলতে আটটা-নটা।”

“পেট্রল পাম্পে কোনও মিস্ত্রি নেই?”

“কোন পেট্রল পাম্প?” রিকশাচালক লোকটা সতর্ক, চট করে উত্তর দিতে চায় না।

“সামনের রাস্তার মোড়ে যে পাম্পটা।”

“থাকতে পারে বাবু।”

“তার মানে তুমি জানো না?”

“আজ্ঞে না।”

“টেলিফোন পাওয়া যাবে ওখানে?”

“কী খুঁজছেন আপনি, মিস্তিরি না টেলিফোন?”

“দুটোই।”

“টেলিফোন পাবেন নিয়োগী মেডিক্যালে।”

“কদ্দূর সেটা?”

“এই তো সামনে, পেট্রল পাম্পের আগে।”

কত লাগবে আর জিজ্ঞেস করল না শান্তনু। আজকে সারাদিনই লোকটাকে ধরে রাখতে হবে যে করে হোক।

“বেশ, সেখানেই চলো, চটপট।”

“আপনার ফোনটা একটু ব্যবহার করতে পারি?”

নিয়োগী মশাই আলমারির কাচগুলো মন দিয়ে মুছছিলেন। শান্তনুর প্রশ্ন শুনে আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়ালেন।

“কিছু বললেন?”

“আমার একটু ফোন করার খুব দরকার। আপনার ফোনটা ব্যবহার করতে পারি?”

“খুব দরকার হলে পারেন,” সম্মতিতে মাথাটা নোয়ালেন নিয়োগী মশাই। ন্যাকড়া দিয়ে সামনের ড্রয়ারটা মুছলেন। তারপর সন্তর্পণে টেলিফোন সেটটা বার করলেন। সেটিকে ঘষে ঘষে সুন্দর করে পরিষ্কার করলেন কিছুক্ষণ। তারপর শান্তনুকে অবাক করে দিয়ে সেটিকে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে পিছনের ঘরে অদৃশ্য হলেন। অবশ্য পরমুহূর্তে স্যাভলনের একটা বিরাট শিশি নিয়ে উদয় হলেন তিনি। শিশিটাকে কাউন্টারে ওপর রেখে, টেলিফোন সেটটাকে আবার যত্ন করে বার করলেন। দেরাজ থেকে এক পাঁজা তুলো বার করে, একটু ছিঁড়ে, তাতে স্যাভলন ঢাললেন। তারপর সেই তুলো দিয়ে টেলিফোন রিসিভারের মুখটা আর কানটা মুছে শান্তনুর দিকে এগিয়ে দিলেন। দাঁতে দাঁত চেপে শান্তনু নিয়োগী মশাইয়ের কীর্তিকলাপ দেখছিল। এবার রিসিভারটা প্রায় ছিনিয়ে নিল হাত থেকে! কী কপাল দেশের! এইসব লোকরা ওষুধের দোকান খুলেছে। আলমারি থেকে ওষুধ বার করতে করতেই তো রোগী মারা যাবে!

পুষ্পেন্দু মিত্র ইজিচেয়ারে বসে ঝিমোচ্ছিলেন। ভোরের আলোয় ঘুমটা কেটে গিয়ে আর ঘুম আসছিল না। তখনই ফোনটা এল।

“পুষ্পেন্দুদা!” শান্তনুর গলার আওয়াজটা প্রায় আর্তনাদের মতো শোনাল।

“কে বলছেন?”

“আমি শান্তনু, আপনার সঙ্গে প্রাইভেট কথা আছে। কাছাকাছি কেউ আছেন?”

কে, সেটা আর শান্তনু বিশদ করল না।

পুষ্পেন্দুবাবু চকিতে একবার শোবার ঘরের দিকে তাকালেন। শুকতারার নাক ডাকার আওয়াজ পেলেন মনে হল। তাও গলা নিচু করে মুখটা একেবারে মাউথপিসের সামনে এনে বললেন, “না।”

“আপনি চট করে একবার সুরম্যতে চলে আসতে পারবেন?”

“এখুনি?”

“এখুনি, খুব বিশেষ দরকার।”

“কিন্তু শুকতারা যে এখনও ঘুমোচ্ছে?”

বাঁচিয়েছে! শান্তনু মনে মনে বলল। মুখে বলল, “ওঁকে একদম জাগাবেন না! একা আসুন। ওঁকে না নিয়ে এলেই ভালো হয়।”

“কেন?”

“কালকের ঘটনাগুলো একটু পরিষ্কার করে বলতে চাই।”

“কালকের?”

“হ্যাঁ, কালকের। আপনার সাহায্য আমার খুব দরকার।।”

“আমার পক্ষে এভাবে... মানে শুকতারাকে না জানিয়ে...”

“শুকতারাদিকে না হয় পরে জানাবেন। আসলে অনেক কিছু খুব জট পাকিয়ে গেছে। একটু ঠান্ডা মাথায় জটগুলো ছাড়াতে হবে। সেই কাজটাতে শুকতারাদিকে জড়াতে চাই না।” ঢাক গুড়গুড় না করে সরাসরি কথাটা বলল।

“কার সঙ্গে সাতসকালে কথা বলছ?”

শোবার ঘর থেকে আসা শুকতারার ঘুমে জড়ানো কণ্ঠস্বর টেলিফোন মারফত অস্পষ্টভাবে কানে এল শান্তনু্র।

“এখন আর কথা বলতে পারছি না,” বলে ফোনটা কেটে দিলেন পুষ্পেন্দুবাবু।

“যাচ্চলে!”

“আরে তুমি! তুমি, শান্তনু না?”

ফোন নামিয়ে পাশ ফিরে শান্তনু দেখল ব্রিগেডিয়ার সরকার দোকানের সামনে দাঁড়য়ে!

“মেসোমশাই, আপনি!” দোকান থেকে নেমে এসে প্রণাম করল। ব্রিগেডিয়ার সরকার শান্তনুর কলেজের বন্ধু সরোজের বাবা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%