সুজন দাশগুপ্ত
শান্তনুরা চলে যাবার পর শুকতারা মিত্র গুম হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। থমথমে আবহাওয়া পুষ্পেন্দুবাবু একটু হালকা করে দেবার চেষ্টা করলেন।
“বেশ একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেল। কী বলো?”
শুকতারা জবাব দিলেন না।
“অবশ্য একদিক থেকে ভালোই হল। অনেক আজেবাজে সন্দেহ হচ্ছিল শান্তনুকে ঘিরে, দিব্যি কেটে গেল সব। ভদ্র পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছেলে।”
শুকতারা চুপ।
“আমার তো মনে হয় চন্দ্রিমার সঙ্গে ভালোই মানাবে, দুজনেই বেশ স্পিরিটেড। কী বলো?” উৎফুল্ল চিত্তে প্রশ্ন করলেন পুষ্পেন্দুবাবু।
“এত কীর্তির পরেও তোমার ফুর্তির তো কোনও কমতি নেই দেখছি!” তিক্তভাবে বললেন শুকতারা।
“কী মুশকিল! কী করলাম আবার?”
“তোমার জন্যেই অপ্রস্তুত হতে হল সাতসকালে!”
“আমার জন্য?”
“কাঁড়ি কাঁড়ি মদ গেলো, আর জানলায় মেয়েছেলে দেখে বেড়াও!”
“এটা কিন্তু অন্যায় অপবাদ দিচ্ছ। আমি...” পুষ্পেন্দুবাবু কথাটা শেষ করতে পারার আগেই দরজায় ঘন ঘন করাঘাত।
দরজা খুলতেই দুশমনের মতো একটা কুকুর বিকটভাবে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। ইতস্তত না করে পুষ্পেন্দুবাবু সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে ফেললেন আবার।
“টাইগার, স্টপ ইট, নো বার্কিং!” বাইরে মনিবের হুংকার শোনা গেল।
পুষ্পেন্দুবাবু সন্তর্পণে দরজাটা একটু ফাঁক করলেন।
একজন বেঁটেখাটো মাঝবয়সি লোক বিশাল অ্যালসেশিয়ান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুকুর ও মনিবের দুজনের চোখ দিয়েই কেমন যেন হিংস্রতা ফুটে বেরোচ্ছে। কুকুর দেখলেই পুষ্পেন্দুবাবুর হৃৎকম্প হয়, হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। অনুভূতিটা জোরদার করার জন্যেই বোধ হয় পুষ্পেন্দুবাবুর দিকে কুটিল দৃষ্টিতে তাকিয়ে অ্যালসেশিয়ানটা গর্র্র্ গর্র্র্ করে যেতে লাগল।
“ওয়েল,” চোখটা ছুঁচলো করল লোকটা।
এই সংক্ষিপ্ত ভাষণের মর্মার্থ স্পষ্ট হল না পুষ্পেন্দুবাবুর কাছে। একটা দুর্বোধ্য পালটা প্রশ্ন ছুঁড়লেন, “ইয়েস?” সেই সঙ্গে দরজার ফাঁকটা আরও ছোট করে ফেললেন।
“কোথায় গেল সে?”
“কাকে চান আপনি?”
“ডোন্ট প্লে ডাম্ব... বার করো ওকে!”
“কী বলছেন আপনি?”
“পেঁপে আমাকে বলেছে শি ইজ হিয়ার। আমি বাত করব ওর সঙ্গে। আই উইল টক টু হার।”
উতোর চাপান জমছিল ভালোই। বাধ সাধলেন ভিতর থেকে শুকতারা মিত্র।
“কী চায় লোকটা?”
“বুঝছি না ঠিক, বোধ হয় তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়... ‘টক টু হার’ বলছে।”
“‘বোধ হয়’ মানে কী?”
“কোত্থেকে জানি খবর পেয়েছে তুমি এখানে আছ। একটু এসো না প্লিজ!” এই ধরনের সিচুয়েশনে শুকতারার আড়ালে থাকাটাই বাঞ্ছনীয় মনে হয়।
শুকতারা উঠে আসতেই পুষ্পেন্দুবাবু তাঁকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এঁকেই বোধ হয় খুঁজছেন আপনি।”
এত সহজে পুষ্পেন্দুবাবুকে দায়মুক্ত হতে দিল না লোকটি। “ইনি কে? হু ইজ সি?”
“হু আর ইউ?” পুষ্পেন্দুবাবুকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই কথোপকথনের ভার নিলেন শুকতারা।
“হোয়াট?”
“আই অ্যাম অ্যাস্কিং, হু আর ইউ?”
“আমি মিস্টার সিং। ওই লোকটা আমাকে চেনে।” পুষ্পেন্দুবাবুকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল লোকটা।
অসহায়ভাবে তাকালেন পুষ্পেন্দুবাবু শুকতারার দিকে। “কী মুশকিল বলো তো... এঁকে আমি চিনিই না, জীবনে আমি দেখিনি এঁকে, দিব্যি দিয়ে বলছি!”
“চোপ,” পুষ্পেন্দুবাবুকে হুমকি দিয়ে থামিয়ে সিংজি শুকতারাকে বললেন, “আমার মেয়ে কাল রাতে এর কাছে পালিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, ওর সঙ্গে থাকবে বলে সকালে গিয়ে বাড়ি থেকে জামাকাপড় নিয়ে এসেছে!”
এই বুড়ো বয়সে নারীঘটিত কেচ্ছা! প্রবলভাবে প্রতিবাদ করলেন পুষ্পেন্দুবাবু, “আপনি ভীষণ ভুল করছেন মশাই! আপনাকে আমি জীবনে দেখিনি, আপনার মেয়েকেও নয়। নিশ্চয় অন্য কেউ হবে।”

“নট এ চান্স! টাইগার ঠিক চিনেছে! টাইগার!” মনিবের আশকারা পাওয়া মাত্র বীভৎস গর্জন করে দু-পায়ে উঠে দাঁড়াল টাইগার! তারপর দাঁত খিঁচিয়ে রক্ত-হিম করা ‘হাও, হাও’ গর্জন করতে করতে একটা লাফ মারল পুষ্পেন্দুবাবুর দিকে। গলার চেনটা সিংজির হাতে ধরা ছিল ভাগ্যিস!
পুষ্পেন্দুবাবু চকিতে শুকতারার পেছনে আশ্রয় নিলেন।
“শাট আপ!” ভীষণ জোরে কুকুরটাকে ধমক লাগালেন শুকতারা মিত্র। তারপর আঙুল তুলে হুমকি দিয়ে বললেন, “ইউ! সামলাতে পারেন না নিজের কুকুরকে!”
সিংজিও দমবার পাত্র নন। “ও জানে আমার মেয়ে কোথায়।”
“কিচ্ছু জানে না ও, হাড়ে হাড়ে আমি জানি সেটা। ও হল আমার স্বামী।”
“স্বামী! মানে হাজব্যান্ড?” হঠাৎ তথ্যটা পেয়ে সিংজি একটু হতভম্ব।
“ঠিক।”
“আপনারাই পাকড়াশী? এখানে থাকেন?”
“না। পাকড়াশীরা বেড়াতে গেছেন।”
“কিন্তু পেঁপে যে বলল, দেবযানী এসেছিল এখানে রাত্রে। এক ছোকরাও ছিল!”
শুকতারা এরকমই কিছু একটা আঁচ করছিলেন। এবার দিগ্বিজয়ীর মতো মুখ করে বললেন, “আমার মনে হয় এ নিয়ে আমাদের একটু আলোচনা করা দরকার। আপনি ভিতরে আসুন। না, না, কুকুরটা নয়, ওটাকে থামে বেঁধে রাখুন।”
একটু দ্বিধার পর সিংজি আমন্ত্রণটা গ্রহণ করলেন। বিস্মিত শুকতারার সামনে পকেট থেকে একটা বোতল বার করে, তার থেকে হাতে একটু জল নিয়ে সেটা ছেটাতে ছেটাতে ঘরে ঢুকলেন!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন