দশ

সুজন দাশগুপ্ত

কেবলডাঙা যাওয়াটা বলতে গেলেই অকারণেই হল। কনট্রাক্টর কোম্পানির লোকেরা কেউ আসেনি। কোম্পানিতে ঘেরাও না কী জানি একটা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের আসাটাই অনিশ্চিত। পুষ্পেন্দুবাবু ঠিক করলেন প্রথম ট্রেন ধরেই বাড়ি ফিরবেন। শুকতারাকে কয়েকবার ধরার চেষ্টা করলেন। ফোনটা এখনও ডেড। ভালোই হল সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে।

ট্রেন লেট ছিল। সুখচিন্তাপুরে যখন পৌঁছল তখন বেশ রাত। অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পরিমল সরকার প্রস্তাব দিল রেস্টুরেন্টে খাওয়ার। এত রাতে বাড়ি ফিরলে সবাইকে বিপদে ফেলা হবে। স্টেশনের খুব কাছেই আমজাদ আলির রেস্টুরেন্ট-কাম-বার। অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। আমজাদ আলির মাটন রোল এ অঞ্চলে খুব বিখ্যাত। পুষ্পেন্দুবাবু অবশ্য কখনও ওখানে খাননি। কানাঘুষো শুনেছিলেন মাটন কম পড়লে আমজাদ আলি নাকি কড়া গোস্তও চালিয়ে দেয়। কিন্তু খিদের চোটে এবং পরিমলের প্ররোচনায় সেখানেই খেতে রাজি হয়ে গেলেন পুষ্পেন্দুবাবু। শুধু তাই নয়, পরিমল যখন এক পেগ ভ্যাট সিক্সটিনাইন হুইস্কি অফার করল, পুষ্পেন্দুবাবু সেটাও গলাধঃকরণ করলেন। এমনকী দ্বিতীয় পেগ অর্ডারের প্রস্তাবেও আপত্তি করলেন না। শুকতারা মিত্র মদ বস্তুটা একেবারে বরদাস্ত করতে পারেন না। কিন্তু অনাবশ্যক ঘোরাঘুরিতে পুষ্পেন্দুবাবু বাস্তবিকই মর-মর হয়েছিলেন। এই অবস্থায় হুইস্কি একেবারে সঞ্জীবনী সুধার কাজ করে! অল্পক্ষণের মধ্যেই উনি চাঙ্গা বোধ করলেন।

স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরতে সুরম্য-র পাশ দিয়ে যেতে হয়। শান্তনু নিশ্চয় এতক্ষণে এসে গেছে। পুষ্পেন্দুবাবু একবার ভাবলেন রিকশা থামিয়ে দেখা করে যাবেন। ভ্যাট সিক্সটিনাইন-এর প্রভাবে একটা ফ্রেন্ডলি মাইডিয়ার ভাবও ভেতরে খেলা করছিল। কিন্তু রাত বেশ হয়েছে, হয়তো শুয়েই পড়েছে এতক্ষণে। সুরম্যর পাশ দিয়ে যেতে যেতে পাশ ফিরে তাকালেন। দোতলার একটা ঘরে তখনও আলো জ্বলছে। পর্দার ওপরে একটা আবছা ছায়া। কেউ দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। তার মানে সুললিতা মাসি শেষ পর্যন্ত এসেছেন! ছায়া দেখে পুষ্পেন্দুবাবুর এতটুকু সন্দেহ রইল না সেটা স্ত্রীলোকের। ঘড়ির দিকে তাকালেন পুষ্পেন্দুবাবু। অন্ধকারে রেডিয়াম ডায়াল চকচক করে উঠল। নাঃ, বিরক্ত করা উচিত হবে না এখন। তা ছাড়া বাড়ি ফেরার জন্যেও মনটা আঁকুপাঁকু করছে। হঠাৎ কেমন নতুন করে উপলব্ধি করলেন শুকতারা তাঁর কতখানি বুক জুড়ে আছে। সেটা টানা একদিনের বিরহ, না দু-পেগ নির্জলা হুইস্কির প্রভাব, তা অবশ্য বলা শক্ত।

শুকতারা মিত্র শুয়ে পড়ার তোড়জোড় করছিলেন। পুষ্পেন্দুবাবুকে দেখে অবাক!

“তুমি ফিরে এলে যে?”

পুষ্পেন্দুবাবু বউকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “তোমার বিরহ সহ্য হল না গো!”

“কী যা-তা বকছ, মদ গিলেছ নাকি?”

সরাসরি এই আক্রমণে পুষ্পেন্দুবাবু দমে গেলেন একটু। “কেন মদ না খেলে কি তোমাকে আদর করতে পারি না?”

“খেয়েছ?”

“কী?”

“মদ?”

কাঁচুমাচু মুখে স্বীকার করতে হল।

“অল্প একটু, খুবই অল্প, পরিমল বিশেষ করে ধরল।”

“তুমি মানুষ না জানোয়ার?”

পুষ্পেন্দুবাবু আমতা আমতা করলেন, “একটু-আধটুতে তেমন দোষ কী? ওর নাম গিয়ে শরীরটা ঝরঝরে হয়। ওষুধই বলতে পারো খানিকটা, অ্যালিক্সার।”

“বাজে অজুহাত দেখিও না, কতটা খেয়েছ?”

“খুবই অল্প, প্রায় না বললেই হয়। পরিমল খাচ্ছিল, তাই একটু সঙ্গ দিলাম।”

“ওইসব মাতালদের সঙ্গে আর ঘুরবে না। যাও অ্যালাচি বা কিছু একটা খাও গে, মুখ দিয়ে ভকভক করে গন্ধ বেরোচ্ছে।”

“যাচ্ছি যাচ্ছি, তবে মদ্যপ বোলো না পরিমলকে। বি-ই, এম-আই-ই, ব্রিলিয়ান্ট কেরিয়ার। একটু-আধটু...”

“বুঝেছি, তোমাকে আর ওকালতি করতে হবে না।” ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন শুকতারা। মশলার কৌটো থেকে দুটো এলাচ বার করে পুষ্পেন্দুবাবুকে দিয়ে বললেন, “শান্তনু শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে।”

“সুললিতা মাসিও তো এসেছেন দেখলাম।”

“কখন দেখলে তুমি?” ভ্রূ কুঞ্চিত হল শুকতারার।

“এই তো আসার পথে।”

“থেমেছিলে তুমি সুরম্যতে?”

“রাত হয়ে গেছে বলে আর নামিনি। তবে রিকশা থেকে দেখলাম সুললিতা মাসি জানলার পাশে দাঁড়িয়ে।”

“কী করে বুঝলে সুললিতা মাসি?”

“না বোঝার কী আছে? ছায়া পড়েছিল জানলার পর্দায়, চুল আঁচড়াচ্ছিলেন।”

“কী প্রমাণ হল তাতে?”

“কী বলছ শুকু, ছেলে আর মেয়ের তফাত বুঝব না?”

“কতক্ষণ তাকিয়েছিলে তুমি?”

“খুবই অল্পক্ষণ।”

“কতক্ষণ?”

“যতক্ষণ না পর্যন্ত বুঝলাম ব্যাপারটা কী?”

“কোন ব্যাপারটা?”

“আঃ, ছায়াটা শান্তনুর না সুললিতা মাসির। এর মধ্যে ইয়ে কী দেখলে তুমি?” পুষ্পেন্দুবাবু অস্থির হয়ে বললেন।

“সুললিতা মাসি আসেননি।” চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন শুকতারা।

“কী বলছ তুমি, আমি যে দেখলাম!” পুষ্পেন্দুবাবু হতভম্ব।

“তোমার লজ্জা পাওয়া উচিত, আবার বলছ নেশা হয়নি!”

“মাইরি শুকু, আমি হলপ করে বলতে পারি...”

“চুপ কর, চেঁচিয়ো না। ছি-ছি, মাঝরাতে মাতলামো!”

“কী মুশকিল, বিশ্বাস করো আমার নেশা হয়নি। বেশ, প্রমাণ দিচ্ছি আমি... এখান থেকে দাঁড়িয়ে আলমারির বইগুলোর নাম পড়ছি। নজরুলের শ্রেষ্ঠ কবিতা, তারাশঙ্কর, সুবোধ ঘোষ, তার পরেরটা কী যেন, বড্ড ছোট ছোট অক্ষরগুলো...”

“বেশ ধরলাম, তুমি ঠিক দেখেছ। জিনিসটা কী দাঁড়াচ্ছে তাহলে?”

“কী দাঁড়াচ্ছে?”

“সুললিতা মাসি আসেননি, কিন্তু একটা মেয়ে এসেছে সুরম্যতে। মোক্ষদা আর কাউকে আসতে দেখেনি শান্তনুর সঙ্গে।”

“বুঝলাম না।”

“জলের মতোই পরিষ্কার,” শুকতারা মিত্র এবার উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, “সেইজন্যেই তাড়াহুড়ো করে মোক্ষদাকে তাড়িয়েছে যাতে মেয়েটাকে ঘরে আনতে পারে।”

“ছি-ছি-ছি, একজন ভদ্র ছেলের চরিত্র নিয়ে এসব কী বলছ?”

“ঠিকই বলছি, যা বোঝো না, তা নিয়ে কথা বলো না। বাজারের মেয়েমানুষ নিয়ে রাত কাটাবার এমন সুযোগ আর কোথায় পাবে?”

“এটা কিন্তু খুব বাজে ধরনের অভিযোগ হচ্ছে।”

“হচ্ছেই তো!”

“কিন্তু কোনও প্রমাণ ছাড়া?”

“ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে ব্যারিস্টারি ধরো।”

“যাই বলো, আমার ধারণা মিছেই সন্দেহ করছ তুমি।”

“মিছিমিছি করব না আর— হাতেনাতেই প্রমাণ করব। গাড়ি বার করো।”

“কোথায় যাবে তুমি?”

“আমি নয়, তুমি।”

“কোথায়?”

“কোথায় আবার, সুরম্যতে!”

“এত রাতে?”

“সেইজন্যেই তো যাওয়া দরকার, বমালসমেত ধরতে পারবে।”

“না না, এটা অনুচিত। মাঝরাতে ভদ্রলোকের বাড়িতে হানা দেওয়া যায় নাকি?”

“ভদ্রলোক কি না প্রমাণ হয়নি তো এখনও। যাও, বাজে বোকো না!”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%