সাত

সুজন দাশগুপ্ত

শান্তনুর প্রথম কাজ হচ্ছে স্নান করে জামাকাপড় পালটে ফেলা। রাস্তার ধুলোবালি আর শরীরের ঘামে ঘিনঘিনে অবস্থা। সাবান মেখে ভালো করে স্নান না করা পর্যন্ত এই অসোয়াস্তি যাবে না।

বাথরুমটা ঝকঝকে বিলিতি স্টাইলের। টাইল দিয়ে ঘেরা বাথটাব, ওপরে শাওয়ার। বেসিনের ওপরে আয়নার পিছনে লুক্কায়িত মেডিসিন ক্যাবিনেট। বেসিনটাও ন্যাড়াভাবে দাঁড়ানো নয়, নিচে নানান কাজ করা একটা ভ্যানিটি। হ্যারিকেন হাতে তুলে তুলে সব দেখল শান্তনু।

নাঃ, এই পাকড়াশী ভদ্রলোক নিঃসন্দেহে শৌখিন মানুষ। বেসিনের কল আবার খুলল। জল বেশ ঝরঝরিয়েই পড়ছে। ‘ট্যাংকি’তে যখন অনেক জল আছে, চট করে ফুরোবে না। কাজের রমণীটির অভয়বাণীর তাৎপর্যটাও এখন পরিষ্কার হল। ইলেকট্রিসিটি নেই, সুতরাং পাম্প চলবে না। ‘ট্যাংকি’ কথাটা আগে শোনেনি শান্তনু। ট্যাংক-এর ই-কারটা কোত্থেকে পেল কে জানে! টাওয়েল র‍্যাকে দুটো তোয়ালেই শুকনো এবং পরিষ্কার। বাথটাবের সোপবক্সে আনকোরা নতুন সাবান।

মোহগ্রস্তের মতো হ্যারিকেনটা কোনায় রেখে, জামাকাপড় খুলে শাওয়ারের নিচে দাঁড়াল। জল খুলে দিতেই কী আরাম! দেশে এসে পর্যন্ত এরকম সাহেবি বাথরুমে ও স্নান করেনি। প্লাস্টিক ব্যাকিং দেওয়া ডেলিকেট ডিজাইনের শাওয়ার কার্টেন। শাওয়ার হেড থেকে শুরু করে, নব, কার্টেন রড, সোপ কেস— সবকিছুতেই ঝকঝকে নিকেল ক্রোমিয়াম ফিনিশ। হ্যারিকেনের অস্পষ্ট আলোতেও ঝকঝক করছে। নিঃসন্দেহে ইম্পোর্টেড। শান্তনুর মনে হল সে দেশে আদৌ আসেনি। পিটসবার্গ বা ইন্ডিয়ানাপোলিসে কোনও বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গেছে। সুখচিন্তাপুর, শুকতারাদি, রাস্তার ধকল, পিক-পকেট, সবকিছুই একটা দুঃস্বপ্ন— শাওয়ারের ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ধারা সেই দুঃস্বপ্নগুলো ধুয়ে মুছে সাফ করে দিচ্ছে।

স্নান শেষ হতেই অবশ্য শান্তনু বাস্তবজগতে ফিরে এল। আপাতত একটা রূঢ় সত্য হচ্ছে তার সুটকেসটা এখনও গাড়িতে। কী সর্বনাশ! পরার মতন পরিষ্কার জামাকাপড় তো ঘরে নেই। যে দুটো তোয়ালে আছে, সেগুলোও সাইজে বড় নয় যে ভালো করে কোমরে জড়ানো চলে। শান্তনুর অবশ্য খুব একটা ইনহিবিশন নেই। যেটুকু ছিল মার্কিন মুলুকে গিয়ে সেটা অনেকটা গেছে, জামাকাপড় না পরে টুক করে বাড়ির বাইরে গিয়ে গাড়ি থেকে সুটকেস নিয়ে আসা তার পক্ষে অচিন্তনীয় নয়। তবু যস্মিন দেশে যদাচার। হরি মিস্ত্রি না কার আসার কথা আজ রাত্রে, উলঙ্গ অবস্থায় তাকে দেখলে হয়তো হার্টফেল করেই মরবে। তবে এত রাত্রে সে কি আর আসবে? কিন্তু যদি শুকতারাদি এসে হাজির হন? মাই গড! সেটা একটা সিনের মতো সিন হবে!

sujan3

গাড়ির চাবি নিয়ে তোয়ালেটা কোনোমতে কোমরে জড়িয়ে শান্তনু সন্তর্পণে বাইরের দরজাটা খুলল। অন্ধকারটা একটু যেন কেটেছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে চাঁদ। সত্যি কথা বলতে কী, আলোর একটু কমতি হলে শান্তনু খুশিই হত। বাইরে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্মগোপনের ইচ্ছেটা তীব্রতর হল। আশেপাশে কেউ কোথাও নেই, চারিদিক নিঃস্তব্ধ। তাড়াহুড়ো করার কোনও দরকার ছিল না, তবু দ্রুত পায়ে গিয়ে গাড়ির ডিকিটা খোলার চেষ্টা করল। অন্ধকারে হাতড়াতে হল একটু, ক্লিক করে খুলে গেল ডিকির ডালাটা। চাবিটা বাঁ হাতে নিয়ে, ডান হাতে সুটকেস টেনে বার করে মাটিতে রাখল। তারপরে বাঁ হাতে কোমরের তোয়ালের গিঁটটা চেপে ধরে ডান হাতে ডিকিটা বন্ধ করার চেষ্টা করল, ল্যাচটা লাগল না। বার দুই চেষ্টাতেও যখন লাগল না, তখন ‘দুত্তরি’ বলে দুই হাতে ডালাটা ধরে প্রচণ্ড জোরে দড়াম করে নামাল। ল্যাচটা এবার আটকাল ঠিকই, কিন্তু সেইসঙ্গে একটা অবাস্তব ব্যাপার ঘটল। কোত্থেকে দুটো জ্বলন্ত আলোর টুকরো বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে এল শান্তনুর দিকে। আত্মরক্ষার স্বতঃপ্রবৃত্তিতে তড়াক করে পিছনের দিকে একটা লং জাম্প দিল, কিন্তু আলো দুটোকে এড়াতে পারল না। একটা লোমশ কিছু শান্তনুর কাঁধের ওপর লাফিয়ে পড়ল। ভয়ে মুহূর্তের জন্যে প্রস্তরীভূত হল শান্তনু। সংবিৎ ফিরে পেতেই আক্রমণকারীকে দু-হাতে সজোরে চেপে ধরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। করুণ ‘ম্যাও’ শুনে বুঝতে অসুবিধা হল না আক্রমণকারীটা কে! পাকড়াশী মশাইয়ের বেড়াল! শান্তনুর আদুর গা দেখে আকর্ষণ বোধ করেছিল হয়তো!

“ব্যাটাচ্ছেলে, পিলে চমকে দিয়েছিলি একেবারে!” স্বগতোক্তি করে খেয়াল হল হুজ্জতির মধ্যে চাবিটা কোথায় জানি পড়ে গেছে! তার চেয়েও বিশ্রী ব্যাপার, হঠাৎ করেই ও যেন ইচ্ছেমতো নড়তে পারছে না! কারণটা আবিষ্কৃত হল। পিছনের দিকে লং জাম্প দিতে গিয়ে পড়েছে একটা কাঁটাঝোপের ওপর। উত্তেজনায় কাঁটার খোঁচাগুলো খেয়াল হয়নি, কিন্তু কোমরের তোয়ালেটা সেই ঝোপের ডালে ডালে জড়িয়েছে বেশ মোক্ষমভাবে! শান্তনু এক মুহূর্ত ভাবল... অনেক খেলাই তো হল, এখন বাকি মাঝরাতে কাঁটাঝোপের সঙ্গে ধ্বস্তাধস্তি! অসম্ভব, কোনোমতেই না! তোয়ালেটা কোমর থেকে খুলে, সুটকেসটা হাতে তুলে দিগম্বর অবস্থায় স্মার্টলি ঘরে ঢুকে পড়ল শান্তনু।

ঘণ্টাখানেক পরের কথা। ইতিমধ্যেই শান্তনু পরিষ্কার জামাকাপড় পরেছে, বরফমেশিন থেকে বিলিতি শরবত, অর্থাৎ রেফ্রিজারেটর খুলে দু-বোতল বিয়ার সহযোগে উপাদেয় খাবারের সদ্ব্যবহার করেছে। খাবারটা গরম থাকলে আর একটু জমত। কী আর করা! বিয়ারটা বোধ হয় শান্তনুকে বাজিয়ে দেখার জন্য শুকতারাদি রেখেছিলেন। বয়েই গেছে শান্তনুর। সময়মতো খাদ্য আর পানীয় দেহে প্রবেশ করায় সকাল থেকে অঘটনজনিত জমা ডিপ্রেশনগুলো কেটে শান্তনুর প্রাণে স্ফূর্তির সঞ্চার শুরু হয়েছে। এখন ও বেশ ঝরঝরে, মনটাও ফুরফুরে। এ যাত্রায় ভোগান্তি অনেক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাড়ির বাইরে বেরোলে কি সবকিছু কাঁটায় কাঁটায় হয়? ঝুটঝামেলা যেমন পুইয়েছে, তেমন শেষ পর্যন্ত তো একটা সুন্দর বাড়িতে আস্তানা পেয়েছে, পেট পুরে সুস্বাদু খাবার খেয়েছে। আর ইন্ডিয়ান বিয়ার... লেবেলটা ভালো করে দেখেনি, কিন্তু নিঃসন্দেহে মার্কিন মুলুকে যা খায়, তার থেকে বেশি সুস্বাদু। কিক্‌টাও বেশি। পেটটা অবশ্য একটু গুড়গুড় করছে, সেটা বোধ হয় বিয়ারে গ্লিসারিন মেশানোর জন্য। এটা অবশ্য শান্তনুর শোনা কথা... দেশি বিয়ারের আয়ু বাড়ানোর জন্য নাকি ওটা দেওয়া হয়। মরুক গে যাক! সবচেয়ে বড় কথা, ওপরে গিয়ে নরম গদি-অলা বিছানাটা দেখে এসেছে। মশারিও আছে, ঘুমের কোনও ত্রুটি হবে না। মার্কিনি ভাষায় ‘অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য ডে, ইট অল ওয়ার্কড আউট’।

শান্তনু একটা টর্চের খোঁজ করছিল। ডাইনিং টেবিলের একটা ধারে সুটকেসটা হাঁ করে খোলা। ভিতরে জিনিসপত্র সব এলোমেলো অবস্থায়। একটা পাজামা অর্ধেক বেরিয়ে এসে টেবিলের নিচে ঝুলছে। কিছু জামাকাপড় একটা চেয়ারে স্তূপ করা। শান্তনু নিশ্চিত যে একটা টর্চ এনেছে, কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে পাওয়া গেল। যাতে ভেঙে না যায়, সেইজন্য একটা গেঞ্জি জড়িয়ে সুললিতা দেবী টর্চটা রেখেছিলেন, তাই এত বিপত্তি। নিঝুম পল্লিতে গাড়ির চাবি চুরি যাবার সম্ভাবনা অতিশয় ক্ষীণ, তবুও চাবি না পাওয়া পর্যন্ত মনটা খচখচ করবে। তাই টর্চ হাতিয়ার করে শান্তনু আবার বাইরে গেল।

যার খোঁজে বার হল, সেটা খুঁজে পাওয়া গেল সহজেই। গাড়ির ঠিক পিছনে পড়েছিল। কিন্তু তোয়ালেটা উদ্ধার করা গেল না। অনেক চেষ্টা করল শান্তনু তোয়ালের একদিক কাঁটা থেকে মুক্ত করলে, অন্যদিকটা কাঁটায় আটকে যায়। শেষে হাল ছেড়ে দিল। ওটা না হলেও এখন চলবে। সকালবেলা দিনের আলোয় আর একবার চেষ্টা করা যাবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%