সুচিত্রা ভট্টাচার্য
রাজীব চেঁচিয়ে ডাকল বৃষ্টিকে,
—কাম অন্ বেবি, উই’ল বি টুগেদার হিয়ার হোল নাইট।
বৃষ্টি শুনতে পেল না। প্রচণ্ড শব্দে লেকের জল থরথর কাঁপছে। পাখিরা চমকে উঠছে আতঙ্কে। শব্দের ধাক্কায় পৃথিবীর হৃৎস্পন্দন বন্ধ হওয়ার জোগাড়। শব্দ নয়, নাদ। এখানে এলে বোঝা যায় শব্দকে কেন পুরাণে ব্রহ্ম বলা হয়েছে। প্রবল দাপটে ড্রাম বাজাচ্ছে এক ঝাঁকড়াচুল দাড়িঅলা যুবক! তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাওয়াইয়ান গিটার, জ্যাজসেট্, সিন্থেসাইজার। কমনীয় মেয়েলি চেহারার একটি ছেলে জমকালো পোশাক পরে, স্প্যানিশ গিটার হাতে গোটা স্টেজে নেচেকুঁদে গান গেয়ে চলেছে। মুক্ত অডিটোরিয়ামে প্রকৃতির নীচে রাতভর আজ পশ্চিমী রকের জলসা। শ্রোতাদের বয়স পনেরো থেকে পঁয়ত্রিশ। প্রত্যেকেই এমন ভাবে তাল দিচ্ছে যেন সে না তাল দিলেই বাজনার ছন্দ কেটে যাবে।
বৃষ্টি অনেকক্ষণ ধরেই তার দলবলকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। চতুর্দিক এমন ধোঁয়াটে আর শ্রোতার ভিড় এমন জমাট, যে পাঁচ-সাত হাত দূর থেকেও নিজের বন্ধুদের চিনে নেওয়া কঠিন।
রাজীব উঠে এসে টানল বৃষ্টিকে,
—হোয়াটস্ রঙ? কখন থেকে চিল্লাচ্ছি!
—আমিও তো খুঁজছি তোদের। শুভ আসেনি?
—ডোন্ট্ নেম দ্যাট বাগার। রকে নাকি ওর মাইগ্রেন হয়।
কথার সঙ্গে দুলে চলেছে রাজীব। বৃষ্টিও এক পায়ে তাল দিচ্ছে। সিগারেট ধরিয়ে বড় করে ধোঁয়া ছাড়ল। মাইগ্রেন না আরও কিছু। আসলে বাড়িতে বসে শুভ এখন অ্যানুয়ালের প্রিপারেশন চালাচ্ছে। চালাক ছেলে। পরীক্ষার কথা মনে হতেই বৃষ্টি আরও বড় করে ধোঁয়া ছাড়ল। সামনেই একদল ছেলেমেয়ে হাই হুই চিৎকার করছে।
—ওফ্, আজ ওয়েদার যা স্টাফি। আর কে কে এসেছে রে?
—ওই তো জিমি, জিন্ডা, পেপসি, রানা...আরও তিনচার জন আছে, তুই চিনবি না।
জিন্ডা, জিন্সের পকেট থেকে একটা চ্যাপ্টা বোতল বার করল, এক চুমুক খেয়ে এগিয়ে দিল রাজীবকে। রাজীব গলায় অল্প ঢেলে বোতল ফেরত দিল,
—আহ্, ইউ সুইটি পাই, সব সময়ে পকেটে মজুত রাখিস্ কি করে?
—দ্যাটস দি আর্ট! ইউ হ্যাভ টু ইনভেন্ট্ ইট ডিয়ার।
জিমির চোখ স্টেজের দিকে। দু হাত মাথার ওপর তুলে জোর জোর তালি বাজাচ্ছে, তার কানের ঝোলা দুল একই সঙ্গে নাচছে টিং-টিং। বৃষ্টির মন প্রথমে সামান্য খুঁত-খুঁত করছিল। আজই প্রথম সারা রাত বাড়ির বাইরে কাটাবে। সুধাকে অবশ্য বলে এসেছে কেউ যেন তার জন্য চিন্তা না করে। কেন যে বলতে গেল! নিখিলমামার কথাতেই কি!...
পরশু দিন হঠাৎই নিখিল বৃষ্টির কলেজে হাজির। বৃষ্টি সামনেই বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিল। কাল থেকে মীনাক্ষি এক মাথা সিঁদুর পরে কলেজে আসা শুরু করেছে। এই নিয়ে বৃষ্টির বন্ধুবান্ধবরা দারুণ উত্তেজিত। বাড়ির অমতে সেই ছেলেটাকেই বিয়ে করেছে মীনাক্ষি, চলে গেছে ছেলেটার বাড়িতে। তাই নিয়ে জোর তুফান চলছিল। বৃষ্টিকে অবশ্য অলোচনাটা তেমন স্পর্শ করছিল না। বন্ধুদের সঙ্গে কলেজে থাকতে হয়, সেই জন্যই থাকা এখন।
বৃষ্টিকে দেখে নিখিলমামা স্বভাবমতই হৈ-চৈ করে উঠেছিল,—এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম। হঠাৎই মনে হল, আরে তুই তো এখন কলেজে। তাই একটু ঢুঁ মেরে গেলাম। বাড়ি গেলে আজকাল তো তোর দেখাই পাওয়া যায়
—গিয়েছিলে বুঝি? বৃষ্টি নিখিলমামাকে দেখে কম অবাক হয়নি, —কবে গিয়েছিলে?
—এই তো পর পর দু’দিন সন্ধেবেলা ঘুরে এলাম। একদিন তো তোদের পার্কে জোর ইলেকশন মিটিং চলছিল। বাবলু বলল এর মধ্যে কবে নাকি রাজীব গান্ধীও আসছে মিটিং করতে। কবে রে?
—কি জানি। এখন তো রোজই মিটিং মিছিল।
বৃষ্টি এখন পরিপার্শ্বের কোন খবর রাখে না। এই তো সুদেষ্ণা, তৃষিতা আর দেবাদিত্য সেদিন জোর তর্ক জুড়েছিল বি জে পি কংগ্রেস নিয়ে।
দেবাদিত্য বৃষ্টিকে প্রশ্ন করেছিল, —কাকে ভোট দিবি রে বৃষ্টি?
তৃষিতা বলে উঠেছিল, —আমি বাবা স্টেট্ অ্যাসেমব্লিতে কাকে দেব ঠিক করে ফেলেছি।
সুদেষ্ণা বলল,—অ্যাই বলবি না। সিক্রেট। সিক্রেট।
এবার প্রথম ভোটার লিস্টে নাম উঠেছে বলে সুদেষ্ণা তৃষিতারা রীতিমত রোমাঞ্চিত। ছেলেমানুষি। বৃষ্টির এখন কলেজের বন্ধুদের আর ভাল লাগে
না। একদিন দেবাদিত্য জ্ঞান দিতে এসেছিল, বৃষ্টি, শুভকে যা মানায় তোকে তা মানায় না।
বৃষ্টি বিরক্ত হয়েছে,—তুই তোর মত ছ্যাবলামি নিয়ে থাক্ না। আমায় নিয়ে কাউকে মাথা ঘামাতে হবে না।
বৃষ্টির স্নায়ু আজকাল খুব বেশি টান-টান থাকে। সায়নদীপ ছেলেটা তাকে যখন তখন ধরছে রাস্তায়। একদিন হাত ধরে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই গার্জেন হয়ে বসেছে। আজও বিকেলে বেরোনোর সময় পথ আটকেছিল,
—চললে কোথায়?
বৃষ্টি কটকট করে তাকিয়েছে,—তাতে তোমার কি দরকার?
—কখন ফিরছ?
—সেটাও তোমাকে বলতে হবে নাকি?
—তা নয়, আমি তো আর রোজ মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকব না, বাড়ি চিনে ফিরতে পারবে তো?
বৃষ্টি খেপে লাল। তখনই ঠিক করেছে রাত্রে আজ ফিরবেই না। সুধাকে যদিও সে কথা বলেনি। তবু যা বলেছে, তাই ঢের। নিখিলমামা বার বার না বললে হয়ত সেটুকুও...
নিখিলমামা বলেছিল,—কোথায় যাস্ বাড়িতে বলে যাস্ না কেন রে? কেউ তোর খবর দিতে পারে না! কিডন্যাপড্ হয়ে গেলে আমরা কোথায় খোঁজ করব?
বৃষ্টির মনের কোণে চোরা সন্দেহ। মা নিখিলমামাকে খোঁজ নিতে পাঠায়নি তো? নিখিলমামার মুখ দেখে অবশ্য সন্দেহের মেঘ কেটে গেছে। নিখিলমামা গোয়েন্দা হতেই পারে না। সিগারেটের প্যাকেট লুকিয়ে রাখলে যে খুঁজে বার করতে পারে না, সে হবে গুপ্তচর? কপটতা করবে? ছোটবেলায় না তার সঙ্গে নিখিলমামার চুক্তি হয়েছিল দু’জনে মিলে পায়ে হেঁটে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা ঘুরবে! হাসতে হাসতে বলেছিল,
—শাঁকচুন্নিকে কিডন্যাপ্ করবে এমন ভূত আছে নাকি কলকাতায়?
—আছে রে আছে। ভূত সর্বত্র আছে।
বৃষ্টি সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিল। ভূত যে আছে সেটা সেও টের পায়। এই জিমিরই হাবভাব ভাল নয়। কারণে অকারণে বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে। দু একদিন আনন্দের অছিলায় তাঁকে জড়িয়ে ধরারও চেষ্টা করেছিল। এইসব ভূতেদের সামলানোর ক্ষমতা বৃষ্টির আছে।
আরেকটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে বৃষ্টি থামল। গাঁজার নেশা রপ্ত হওয়ার পর সাদা সিগারেটে আর তেমন আরাম পায় না। পার্ক স্ট্রিটের এক পানের দোকান থেকে সে প্রায়ই অল্প অল্প গাঁজা কিনে আনে। জিমি তাকে চিনিয়ে দিয়েছে দোকানটা। বিশেষ একটা কোড বলে চাইতে হয়।
বৃষ্টি ঠুকে ঠুকে সিগারেট থেকে তামাক বার করে ফেলল। ব্যাগে রাখা গাঁজাটুক সযত্নে ভরল সে জায়গায়, দেশলাই কাঠি দিয়ে চেপে চেপে কাগজে ঠেসে দিল, দু হাতের তালুতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গোল করে নিল ভাল করে।
জিমি পাশে উঠে এসেছে। বৃষ্টি দেশলাই জ্বালানোর আগেই হাত ধরে থামাল,
—ওয়ান্ট সামথিং মোর হার্ড? ম্যাসকুলাইন?
বৃষ্টির ভুরু জড়ো।
প্যান্টের হাঁটুর চেন খুলে জিমি প্লাস্টিকের ছোট্ট মোড়ক বার করল। রাজীব দেখেই চিনে ফেলেছে,
—তুই কোন্ ঠেক থেকে রোজ ম্যানেজ করছিস্ রে? আমাদের ওদিকে পুলিশ হেভি ঝামেলা করছে, পাড়াগুলোও হয়েছে তেমনি, দোজ বাগারস্ আর সিম্পলি মেকিং ইট্ হেল্।
জিমি রাজীবের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাল। সব রহস্য সকলকে জানাতে নেই। বৃষ্টিকে ইশারায় স্টেজের পিছনে যেতে বলল,
—এখানে কেমন ঠাণ্ডা মেরে যাচ্ছি। বাইরে একটা দারুণ গলতা আছে, চল্।
জিমির সঙ্গে রাজীবও উঠেছে,—যাবি বৃষ্টি?
বৃষ্টি দোমনা। জিমির সঙ্গ তার একদম ভাল লাগে না। এদিকে আজ আরও চড়া নেশার জন্য তার শরীর ছটফট করছে।
মেয়েলি ছেলেটার গান থেমেছে। পরের জনের প্রস্তুতি শুরু হল। রাজীব একবার জিজ্ঞাসা করল,
—কে উঠছে রে এবার? মার্কো রেঙ্গান্? ফার্টাডোর প্রোগ্রাম কি পরে?
জিমি উত্তর দিল না। সামনের ছেলেমেয়েদের সরিয়ে সে বাইরে যাওয়ার রাস্তা করছে। চারটে ছেলেমেয়ে একসঙ্গে গান ধরেছে,
ফিফটিন্ মেন ইন ডেড ম্যানস্ চেস্ট…ইয়ো হোহো হো...
অ্যান্ড এ বটল্ অফ রাম্।
জলদস্যুদের গানের কি পরিণতি!
অডিটোরিয়ামের বাইরে এসে ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে শব্দগুলো। লেকের জলের ধারে, তিনটে প্রকাণ্ড গাছের মাঝখানে ছোট্ট ঝোপের আড়াল। কেউ এখানে বসে থাকলে আট-দশ হাত দূর থেকেও দেখা যায় না। জিমি রাজীব অভ্যস্ত পায়ে পৌঁছে গেছে সেখানে। পিছনে সম্মোহিতের মত বৃষ্টি।
জিমি পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। গোল করে কাগজ পাকাচ্ছে। রাংতার ওপর এক চিমটে ব্রাউন সুগার রাখল। অন্ধকারে জিমির মুখ যেন অরিজিতের মত। অরিজিৎ আজকাল সর্বক্ষণ নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে কবিতা আওড়ায়।
রাংতার ধোঁয়া নাকে টানার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি প্রথমটা কেমন অনুভূতিশূন্য হয়ে গেল। অন্ধকার দুলে উঠল নাগরদোলার মত। অসংখ্য নীল বুদবুদ নাচছে। চোখের সামনে।
জিমি বৃষ্টির কাঁধে হাত রাখল,—এনজয়িং?
বৃষ্টি অভ্যাসমত হাত সরিয়ে দিল। আবার নাক ডোবাল ধোঁয়ায়। রাজীবের কাঁধে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল আস্তে আস্তে। বিড়বিড় করে কিছু বলার চেষ্টা করল, জিভ জড়িয়ে যাচ্ছে।
রাজীব মাথায় হাত রাখল,—কি বলছিস্ রে?
বৃষ্টি কিছুতেই চোখ খুলতে পারছিল না। জড়ানো স্বরে তবু বলতে চাইছে, আই হেট দেম, আই হেট দেম, আমি ওদের ঘেন্না করি।
তিনটে ছেলে মেয়ে আচ্ছন্ন অবস্থায় এমনভাবে একে অন্যের গায়ে পড়ে আছে যে কাউকে পৃথক করা যায় না। বৃষ্টি বারকয়েক উঠে বসার চেষ্টা করেছিল, আপনা থেকেই পড়ে গেছে। রাজীব বা বৃষ্টির তুলনায় জিমি অনেক পাকা নেশাড়ু। বৃষ্টিকে সে কাছে টেনে নিল। তার কাঁপা কাঁপা হাত বৃষ্টির বুকের ওপর। বৃষ্টির কোন অনুভূতিই নেই। তার চোখ লেকের জলে স্থির।
ওপার থেকে সোনালি আলো এসে পড়েছে জলে। দেখতে দেখতে বৃষ্টির মনে হচ্ছিল জলটা বুঝি এখখুনি লাফ দিয়ে চলে যাবে পৃথিবীর বাইরে। মাঝে মাঝেই জল ফিনকি দিয়ে উঠছে। বৃষ্টি একা সেই দুরন্ত জলের মাথায় ভাসতে থাকল। ঘন ঘন রঙ বদলাচ্ছে অন্ধকার। কালো। সাদা। নীল। সোনালি। সবুজ। কাল্পনিক তুলি দিয়ে বৃষ্টি রঙগুলোকে ধরার চেষ্টা করল অন্ধকারের ক্যানভাসে। অনেক অনেকদিন পর সে ছবি আঁকছে।
আচমকাই বৃষ্টির বুক হুহু করে উঠল। নিজের খেয়ালে আঠেরো বছরের বৃষ্টি একটা খেলা শুরু করতে চেয়েছিল। মাকে না মানার খেলা। বাবাকে যাচাই করার খেলা। সেই খেলাই তার কাছে বুমেরাং হয়ে আসছে। কি করে এখন সে বাবা মাকে বোঝায় এভাবে কষ্ট পেতে তার একটুও ভাল লাগছে না। এই জিমি, রাজীব, সবাই, সবাই খুব খারাপ। তার একটাও বন্ধু নেই। একটাও। সায়নদীপ কি সত্যি তার বন্ধু হতে চায়?
বৃষ্টির নির্জীব চোখ বিশ্ব ঘুরে খুঁজছে কাউকে। কে সে?
রাত্রি দশটায় তিনজনকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে লেক থানার সাবইন্সপেক্টর থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। অঞ্চলটা ভাল নয়। প্রায়শই রাতে তাঁকে রাউন্ডে বেরোতে হয়।
—কে রে? কে ওখানে?
মুখে জোরালো টর্চের আলো পড়তে বৃষ্টির চোখ আরও ধাঁধিয়ে গেল। আবছা আবছা একটা স্বর কানে আসছে। শেষ পর্যন্ত কে তাকে নিয়ে যেতে এল?
বৃষ্টি আলোর পিছনে শুধু কয়েকটা অস্পষ্ট কায়া দেখল।
সাবইন্সপেক্টরের সঙ্গে আরও দুজন ছিলেন প্লেন ড্রেসে।
—দেখে তো মনে হচ্ছে ভদ্র বাড়ির ছেলে মেয়ে! এত রাতে এখানে বসে হচ্ছেটা কি, অ্যাঁ? পাতা-খাওয়া পার্টি।
—ওঠ। ওঠ্।
—আরে, ওই ছেলেটা না! এই শালা...
বৃষ্টির মুখের আরও কাছে আলো এগিয়ে এল।
গভীর রাতে থানা থেকে ফোন পেয়ে জয়া প্রথম ধাক্কায় হতবুদ্ধি হয়ে গেল। রিসিভার ক্রেডলে রাখতেও ভুলে গেছে। দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে মুর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল।
কাল পরশু দু দিন বৃষ্টি খুব একটা রাত করে ফেরেনি। আজ সন্ধেবেলা জয়া সুধার মুখে শুনেছিল বৃষ্টি নাকি কোথায় ফাংশান শুনতে গেছে, ফিরতে রাত হবে। মনে মনে নিশ্চিন্ত হয়েছিল একটু। যাক্, তবু বলে তো গেছে। এটাই এখন জয়ার কাছে বিরাট পাওয়া।
ফোনের শব্দ শুনে বাবলু সুধাও উঠে এসেছে। দুজনেই জয়ার দিকে নির্বাক তাকিয়ে। জয়ার মুখ কাগজের মত সাদা। ঠোঁট কাঁপছে। কোনক্রমে বলতে পারল,
—বৃষ্টিকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে।
দিশাহারা জয়া নিজের ঘরে ঢুকল একবার। বেরিয়ে এল। কাকে ডাকে এখন? নিখিলের বাড়িতে ফোন নেই। ফিরোজকে ডাকবে? রমেনদাকে? রমেনদার চারদিকে অনেক জানাশুনো আছে। সিনিয়ার আর্টিস্ট কাউকে বললেও সাহায্য পেতে পারে। প্রকাশদা। মাস্টারমশাই। সুনীলদা। ফোনের কাছে গিয়ে নোটবুক উল্টোতে লাগল জয়া। পরমূহুর্তে হাত থেকে পড়ে গেল নোটবুকটা।
জয়া ভিতরের প্যাসেজে বার তিন-চার পায়চারি করল। মনে হচ্ছে কেউ তার পাঁজরে তীক্ষ্ণ শলাকা ঢুকিয়ে দিয়েছে। প্রথমে অনুভূতি অসাড় হয়ে গিয়েছিল, তারপরই অসহ্য যন্ত্রণা। এই পরিস্থিতিতে কি যে করতে হয়?
অস্থির কাঁপা কাঁপা হাতে জয়া ডায়াল ঘোরাল।
রীতা ঘুম চোখে বিছানা থেকেই হাত বাড়িয়েছে,
—হ্যালো।
—সুবীরকে একটু ডেকে দেবেন?
—কে বলছেন আপনি?
—আমি বৃষ্টির মা। জয়া। খুব আরজেন্ট দরকার। যদি কাইন্ডলি...
—এখখুনি দিচ্ছি, ধরুন।
মাঝে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। জয়ার মনে হল কয়েক যুগ।
সুবীর ফোন ধরল,—কি হয়েছে? কি হয়েছে বৃষ্টির? কোন অ্যাক্সিডেন্ট?
জয়া প্রাণপণে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরেছে।
—কি হল? কিছু বলছ না কেন? বৃষ্টি কোথায়?
—এখখুনি একবার লেক থানায় আসতে পারবে? বৃষ্টিকে পুলিশে তুলে নিয়ে গেছে। লেকে বসে ড্রাগ নিচ্ছিল।
এত রাত্রে...! সুবীর প্রশ্ন করতে গিয়েও থেমে গেল। এখন আর ওসব জানার সময় নেই।
—আমি এখখুনি পৌঁছে যাচ্ছি।
ঘর থেকে ব্যাগ নিয়ে জয়া দৌড়ে বেরিয়েছে রাস্তায়। ল্যান্সডাউনের দিকে একটা মাত্র ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে। চারদিকে রাত্রি শুনশান। একটা দুটো গাড়ি ছুটে যাচ্ছে দুর্দম গতিতে। মোড়ের পানের দোকান বন্ধ হল এইমাত্র। কলকাতা ঘুমিয়ে পড়ছে।
জয়া ট্যাক্সির দরজা ধরে দাঁড়াল,
—খুব আর্জেন্ট ভাই। লেক থানা।
থানার নাম শুনেই বোধহয় ড্রাইভার আপত্তি জানানোর সুযোগ পেল না।
জয়া পৌঁছনোর আগেই সুবীর পৌঁছে গেছে থানায়। ইতিমধ্যেই সে ডিউটি অফিসারের সামনের চেয়ারে বসে। কোণে, একটা বেঞ্চিতে ঘাড় গোঁজ করে বসে রয়েছে বৃষ্টি। পাশে ঢুলছে দুটো ছেলে। জয়ার পিছন পিছনই পাজামা পাঞ্জাবি পরা মধ্যবয়সী এক সুদর্শন ভদ্রলোক হস্তদন্ত হয়ে ঢুকেছেন। তাঁরও উত্তেজিত চোখ ঘুরে ফিরে বেঞ্চির দিকে। সুবীরের পাশের চেয়ারে বসে পড়লেন ধপ করে,
—কি করি বলুন তো এই ছেলেকে নিয়ে?
ডিউটি অফিসার ভদ্রলোককে দেখে লেখা বন্ধ করেছেন।
—সো মিস্টার মুখার্জি, দিস্ ইজ থার্ড টাইম। এভাবে তো অনন্তকাল চলতে পারে না। আপনার মুচলেকায় আর ভরসা করি কি করে?
ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে অফিসারের হাত চেপে ধরলেন,
—এবারের মত ছেড়ে দিন প্লিজ্। নেক্সট্ টাইম হলে আপনি যা খুশি করবেন। লকআপে পেটাবেন, কোর্টে চালান দেবেন, যা আপনাদের ইচ্ছে। ...আমি কিছু বলতে আসব না। এবার। প্লিজ এবারকার মত।
ডিউটি অফিসার হাত ছাড়িয়ে নিলেন,
—আমি স্যারকে ফোন করে দেখছি। বাট দিস্ ইজ লাস্ট টাইম। অ্যান্ড আই মিন ইট।
ভদ্রলোকের চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ। দেখেই বোঝা যায় বেশ প্রভাবশালী মানুষ।
ডিউটি অফিসার ফোন করছেন; ভদ্রলোক সুবীরের দিকে তাকালেন,
—ছেলেটা এরকম ছিল না জানেন। জয়েন্টে চান্স না পাওয়ার পর থেকেই...কোথা থেকে যে সব ড্রাগ পেড্লারগুলোর সঙ্গে ভাব হল! লোকগুলোকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে মেরে ফেলা উচিত।
ডিউটি অফিসার রিসিভার কানে রেখে মিটিমিটি হাসছেন। ফোন নামিয়ে চোখ রাখলেন ভদ্রলোকের দিকে,
—কিছু মনে করবেন না স্যার, লাস্ট সেপ্টেম্বরে তিনটে ড্রাগ পেড্লার ধরেছিলাম, এমনভাবে কেস বেঁধেছিলাম সেন্টেস্ হতই, অন্তত পাঁচ বছর; আপনিই তাদের হয়ে মামলা লড়ে... আপনার মত নামি মানুষ, দামি লইয়ার...গ্রিপের থেকে বেরিয়ে গেল লোকগুলো...বলতে বলতে নিস্পৃহ স্বরে ডেকেছেন কনস্টেবলকে,—বিমল, ওই জীয়ন মুখার্জি মানে সাহেবের জিমিকে সাহেবের গাড়িতে তুলে দিয়ে এসো তো।
ভদ্রলোক তবু মাথা নামিয়ে বসে রইলেন অল্পক্ষণ। তারপর কোন দিকে না তাকিয়ে ঘাড় নিচু করেই বেরিয়ে গেছেন।
পাশের টেবিলের সাবইন্সপেক্টর হাই তুললেন,
—ভাল দিয়েছিস মাইরি। শালা যত সব চোর ছাঁচোরের হয়ে মামলা লড়বে...আর এখানে এসে...ছেলেটাকে একটু পিটিয়ে নিতে পারলি না? আলালের ঘরের দুলাল। আলালটি এবার নমিনেশন পেলে যে কি হত! এম পি হলে...
জয়া চিত্রার্পিতের মত দাঁড়িয়ে। ডিউটি অফিসার চোখে প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে এতক্ষণে তাকিয়েছেন তার দিকে।
সুবীর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—জয়া রায়। মেয়ের মা।
ডিউটি অফিসার চেয়ারে হেলান দিলেন। টেবিলের ওপর রাখা রুলটা তুলে নিজের তালুতে ঠুকছেন আস্তে আস্তে,
—কি করেন বলুন তো আপনারা? একটা মেয়েকে সামলাতে পারেন না? একটাই তো মেয়ে আপনাদের, না কি?
সুবীর জয়া নীরব। জয়া একবার শুধু মেয়ের দিকে তাকাল। মেয়েরও চোখ এদিকে। ভাষাহীন চোখ।
—দেখে অবশ্য বোঝা যাচ্ছে নতুন ধরেছে। অফিসার গলা ওঠালেন,—রোজ তো এসব কম দেখছি না। ভদ্র বাড়ির মেয়ে, দেখে তো মনে হয় বাড়িতে আপনাদের লেখাপড়া, কালচার টালচার আছে, কি করে ওইসব বজ্জাত পাংকগুলোর সঙ্গে মেশে? কিরকম বাপ মা মশাই আপনারা? মেয়ের খোঁজখবর রাখেন না?
সুবীর জয়া পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়েছে। কি করে বলে তাদের মেয়েকে তারা ভয় পায়। সুবীরের বুকের ব্যথাটা হঠাৎই চাড়া দিয়ে উঠল।
—আজকের মত ছেড়ে দিচ্ছি। নিয়ে যান। এবার কিছু নোট্ফোট করলাম না। ডিউটি অফিসারের বোধহয় সুবীর জয়াকে দেখে এবার করুণা হয়েছে। গলার স্বর কোমল হল,—এখনও সময় যায়নি। একটু গাইড করুন মেয়েকে। আমিও তো বাবা। আমারও ওই বয়সী একটা মেয়ে আছে। বুঝি কোথায় লাগে। তার ওপর মেয়ে বলে কথা,...বড় হয়ে গেছে। কত কি ঘটে যেতে পারে জানেন? বলতে বলতে গলা আরও নামিয়েছেন,—কি অবস্থায় পেয়েছি ওকে জানেন? ওপেন এয়ারে রক ফক কি সবের ফাংশন চলছিল, তার একটু দূরে ওই দুটো পাংকের সঙ্গে লেকের ধারে জড়াজড়ি করে পড়েছিল। নেশায় বুঁদ হয়ে। ছি ছি ছি।
সুবীর জয়ার কানে যেন কেউ গরম সিসে গলিয়ে ঢেলে দিচ্ছে। জয়ার মনে হল এসব শোনার পরও সে বেঁচে আছে কি করে? সুবীরের চোখ মাথার ওপর ঘুরন্ত পাখার দিকে। কী ভীষণ উত্তাপ!
ডিউটি অফিসার হাত নেড়ে ডাকলেন বৃষ্টিকে,
—অ্যাই, এদিকে শোন, এসো এখানে।
বৃষ্টি উঠল না। বোবা চোখে প্রতিক্রিয়াই হল না কোন।
রাজীব জুল-জুল করে তাকাচ্ছে চার পাশে। ডিউটি অফিসারের দিকে চোখ পড়তে জড়ানো প্রশ্ন করল,
—আমি?
—না, তুই না। তোর বাপ্ তো এখনও এল না। যদি না আসে তুই আজ গেছিস্।
বলেই ডিউটি অফিসার হাসি হাসি মুখে সুবীরের দিকে ফিরলেন,
—দেখেছেন মেয়ের অবস্থা! ব্রাউনসুগার নিয়েছে। এখন ঘণ্টাতিনেক মুখে বাক্যি আসবে না। প্রথম দিনের কিক্ তো। তবে বুঝছে সব। একটু আগে তো কাঁদছিল ফোঁচ ফোঁচ করে। কি পড়ে আপনার মেয়ে?
জয়া অস্ফুট উচ্চারণ করল,—ফার্স্ট ইয়ার। হিস্ট্রি অনার্স।
—কোন্ কলেজ?
—প্রেসিডেন্সি।
—বাহ্! কি মেয়ের কি অধঃপতন!
ডিউটি অফিসার কপাল চাপড়ে হায় হায় করে উঠলেন।
—গাড়ি আছে সঙ্গে?
সুবীর মাথা নাড়ল। আছে।
—যান্, মেয়েকে দুজনে মিলে ধরে তুলে নিয়ে যান। ফর হেভেনস্ সেক, ওই মেয়েকে আর যেন থানায় দেখতে না হয়। তাহলে কিন্তু আপনাদের কপালেও দুঃখ আছে।
এর পরও দুঃখ বাকি থাকে!
সুবীর মেয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। জয়াও।
দুজনে দু’হাত ধরে টেনে তুলেছে মেয়েকে। বৃষ্টির বোধহীন চোখে ভাষা ফুটল। স্বপ্নের মধ্যে বাবা মার হাত ধরে হাঁটছে। হাঁটছে...হাঁটছে...দু চোখ টলটল করে উঠল। এত বছর ধরে তবে কি এই দিনটার প্রতীক্ষায় ছিল সে!
গাড়ির সামনে এসে সহসা ঘোরটুকু কেটে গেছে। এই স্বপ্ন তো মুহূর্তের।
গোটা রাস্তা বৃষ্টি গাড়িতে কাঠ হয়ে বসে রইল। প্যান্টশার্ট পরা রক্ত মাংসের স্ট্যাচুর মত। গাড়ি থেকে নেমে দুজনকেই ঠেলে সরিয়ে, সুধার হাত ধরে চলে গেছে নিজের ঘরে। একবারের জন্যও পিছন ফিরে তাকাল না।
জয়া ডাইনিং টেবিলে এসে বসে পড়ল। এতক্ষণ ধরে বাঁধ দিয়ে রাখা কান্না প্রবল বেগে ছিটকে আসতে চাইছে। টেবিলে মাথা রেখে হুহু করে কেঁদে ফেলল জয়া।
সুবীর ভেতরে ঢুকতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল। ফিরে গিয়ে গাড়িতে বসেছে। বেশ খানিকক্ষণ স্টিয়ারিং-এ মাথা রেখে বসেই রইল। তারপর কাঁপা হাতে গাড়িতে স্টার্ট দিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন