সুচিত্রা ভট্টাচার্য
ক্লাস থেকে স্টাফরুমে ফিরছিল জয়া। টানা চারটে ক্লাস নেওয়ার পর সে বেশ ক্লান্ত, তবু এখখুনি তাকে বেরিয়ে পড়তে হবে। বিড়লা অ্যাকাডেমিতে কলকাতা তিনশ’র ওপর এগজিবিশন ওপেন হচ্ছে, প্রথম দিন তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাওয়া দরকার।
করিডোরে আসতেই জয়াকে একটি মেয়ে বলল, —দিদি, আপনার জন্য একজন নিচে অপেক্ষা করছেন।
এই সময় আবার কে এল! তাদের পেন্টারস্ সার্কেলের কেউ! তারা এলে তো ওপরের স্টাফরুমেই চলে আসত!
ছাত্রীটিকে জিজ্ঞাসা করল, —কে? কি নাম?
—তা তো ঠিক বলতে পারব না। ভেতরে আসতে বললাম, উনি বললেন আপনাকেই ডেকে দিতে। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন।
জয়া অল্প ধন্দে পড়ে গেল। যাক গে, যেই হোক, বেরোনোর সময় কথা বলে নেওয়া যাবে। তার আগে একবার চোখে মুখে জল দিয়ে নেওয়া যাক্।
বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করল জয়া। এখনও যে কোন এগজিবিশান শুরু হওয়ার দিন তার বুক কাঁপে অথচ জয়া ভালই জানে তার কোন ছবির তেমন নিন্দে কেউ করবে না। বড় জোর দু একটা নিয়মমাফিক খোঁচা ... ফেসের কনট্যুরে ভাঙচুর চোখ ভরালেও পুরোপুরি মন ভরাতে পারেনি। অথবা নীল সবুজ অদৃশ্য হয়ে ধূসর হলুদের প্রাধান্য ছবির আবেদন ঈষৎ ক্ষুন্ন করেছে বলেই মনে হয়। কিম্বা অ্যাক্রাইলিক ছেড়ে গোয়াশে আঁকা দ্যুতিময় নিসর্গদৃশ্য আমাদের যতটা আকৃষ্ট করে, ততটা মুগ্ধ করে না। খয়েরি রঙের ব্যবহার সেভাবে গভীর ব্যঞ্জনাময় হয়ে উঠতে পারেনি।
ফিরোজ বলে, —নন-প্রোডাক্টিভ্ এক্সারসাইজ অফ ইন্টেলেক্ট বাই নন্ ইনটেলেক্চুয়ালস্।
শ্যামাদাস বলে, —নন্ইন্টেলেকচুয়ালস্? না সোকলড্ ইন্টেলেকচুয়ালস্?
—একই হল। যার নাম চালভাজা, তারই নাম মুড়ি।
জয়া প্রতিবাদ করে, —বারে, ক্রিটিক্রা তাদের মতামত জানাবে না?
নিখিল বলে, —সে তো তুই বলবিই। তোর যা র্যাপো ওদের সঙ্গে।
মনে মনে রাগ করলেও জয়া প্রকাশ করে না। যে যাই বলুক টেনশানটা তার থাকেই। আজকের প্রদর্শনী নিয়েও তার দুশ্চিন্তা কম নয়।
জয়াদের পেন্টারস্ সার্কেলের শিল্পীদের প্রত্যেকের দুখানা করে ছবি নিয়ে কলকাতা তিনশ’ উপলক্ষে বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে আর্টস ফোরাম। অন্য সব খ্যাতিমানদের পাশে তার ছবির কতখানি কদর হবে সে সম্পর্কে জয়া কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারছিল না।
অনেক চিন্তা ভাবনা করে দুটো ছবি বেছেছে সে। একটা ছবিতে বাবু কাল্চারের ট্র্যাজেডি। কয়েকজন লোক উজ্জ্বল আলো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু আলোর নিচে তাদের শরীরেই অন্ধকার। আলোর মধ্যে ফোটাতে চেয়েছে কলকাতার বাবুদের চেহারা। অন্ধকারটাও তাদেরই। দ্বিতীয় ছবিতে মাঝরাত্রে ভিক্টোরিয়ার পরী নেমে এসেছে কলকাতার ফুটপাথে, এক ভিখারির সংসারে। একটা চারকোল ড্রয়িং করারও ইচ্ছা ছিল; হল না। সুহাস আর শ্যামাদাসও ভিক্টোরিয়ার ওপর কাজ করেছে। মিশ্র রঙে। ফিরোজ সন্ধ্যার অন্ধকারে প্রায় মুছে যাওয়া আলোয় গঙ্গার পাড়ে বাঁধা নৌকোগুলোকে ধরতে চেয়েছে জলরঙে। মূলত বাদামিতে। নিখিল শিপ্রা দেবযানী অ্যাক্রাইলিকে কাজ করেছে। নিখিল এঁকেছে ভোরের কলকাতায় জ্যামিতিক ট্রাম। দেবযানীর কলকাতায় মেট্রো রেল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে লোক বেরিয়ে আসছে। ইমপ্রেশনিস্ট টাচে।
ব্যাগ গুছিয়ে নীচে নেমে এল জয়া। গেটের দিকে যেতে গিয়েও হঠাৎ নিথর। গেটের কাছে সুবীর না! সুবীর! কয়েক মুহূর্তের জন্য সমস্ত চিন্তা ভাবনা তালগোল পাকিয়ে গেল জয়ার। এত দিন পর সুবীর! তার কলেজে!
জয়া এগোতে চেষ্টা করল। পা দুটো নড়তে চাইছে না। সুবীর নিজেই এগিয়ে এল। কোনরকম ভূমিকা না করেই বলল,
—তোমার সঙ্গে দরকারি কথা ছিল।
সুবীর কত বদলে গেছে! প্রচুর ভাঙচুর এসেছে শরীরে। সামনের ঘন চুল পাতলা। মাথা জুড়ে রূপালি সুতোর আঁকিবুঁকি। দীর্ঘ শরীর একটু ঝুঁকে গেছে। কপালে স্পষ্ট দুটো ভাঁজ। শেষ কবে সুবীরকে দেখেছিল জয়া! পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে ... প্রায় বছর চার পাঁচ আগে। জয়াকে দেখে অন্যমনস্ক হওয়ার ভান করে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল সুবীর।
জয়ার গলায় স্বর ফুটল না।
সুবীর আবার বলল, —দরকারটা খুব আরজেন্ট। তুমি একটু সময় দিতে পারবে?
সুবীরের গলা ভারী ভারী। ভাঙাও। বোধহয় মদ খাওয়া বাড়িয়েছে।
—এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলবে? ওদিকে একটু চলো আমার সঙ্গে।
—কোথায়?
—মিউজিয়ামের ওপাশটায়।
দুজনে বহুকাল পর পাশাপাশি হাঁটছে। বহুকাল আগে এভাবেই হাঁটত পাশাপাশি। এই মিউজিয়ামের সামনে দিয়েই। তখন জয়া ছিল এই কলেজেরই ছাত্রী। সেদিনকার হাঁটা আর আজকের হাঁটার মাঝখানে বিশাল একটা দেওয়াল উঠে গেছে। সময়ের। সময় কত কিছু নিয়ে চলে যায়। শুধু কি নিয়েই যায়? রাখে না কিছুই? জয়া বুঝতে পারছিল না। এই মানুষটা তার শরীর মন সংপৃক্ত করে রেখেছিল বহুদিন। কত প্রেম, কত যুদ্ধ, আনন্দ, বিষাদ। ...এই মানুষটাই নিষ্ঠুরের মত তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল একদিন। হিংসায় পাগল হয়ে গিয়েছিল। কেন এমন হয়? আজ যাকে মনে হয় ভালবাসি কাল সে অসহ্য হয়ে পড়ে? তবে কি মানুষ নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই ভালবাসে না? অন্যকে ভালবাসা শুধুই ভ্রান্তি?
সদর স্ট্রিটের গির্জার সামনে সুবীর গাড়ি পার্ক করেছিল। সেখানে গিয়ে দাঁড়াল দুজনে।
সুবীর সোজাসুজি কথা পাড়ল,
—বৃষ্টিকে নিয়ে তোমার সঙ্গে কিছু আলোচনা করার ছিল।
জয়া মুহূর্তে সচকিত। আবেগ নিমেষে উধাও।
—কেন? কি হয়েছে বৃষ্টির?
—বৃষ্টি আমার সঙ্গে থাকতে চায়। খুব জেদ করছে। তুমি জান সেকথা? সুবীরের স্বর নয়, যেন সপাং করে একটা চাবুক আছড়ে পড়ল বুকে। জয়ার মুখ থেকে আপনাআপনি ছিটকে এল,
—মানে?
—মানে তো সহজ। ও আমার সঙ্গে থাকতে চায়। রীতা রাজার সঙ্গে নয়। শুধু আমার সঙ্গে।
শব্দগুলো গ্রহণ করতে জয়ার মস্তিষ্ক বেশ কিছুক্ষণ সময় নিল। মেয়ের পরিবর্তন লক্ষ করলেও ঠিক এতটা আশা করতে পারেনি। সেদিনের দৃশ্যটা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সেদিনের সেই পা দোলানো ...! কানে ওয়াকম্যান্ ...! এখন মনে হচ্ছে সেদিনই মেয়েকে শাসন করা উচিত ছিল। দিনের পর দিন মেয়ে বাড়ি ফিরতে আটটা নটা বাজিয়ে দিয়েছে আর সে বসে থেকেছে নিজের অভিমান নিয়ে। হায়রে, এই হিংস্র ক্রূর পৃথিবীতে কে কার অভিমানের খবর রাখে! জয়া বুকে একটা ভারী চাপ অনুভব করল।
—কবে থেকে এসব প্ল্যান শুরু করেছে?
স্থির থাকার চেষ্টা সত্ত্বেও জয়ার গলা কেঁপে গেছে।
—জন্মদিনের দিনই প্রথম বলেছিল আমাকে। ও অ্যাডাল্ট হয়ে গেছে, আর কারুর কাস্টডিতে থাকতে বাধ্য নয়, যার সঙ্গে যেভাবে খুশি থাকবে।
অভিমান থেকে অপমানবোধ সঞ্চারিত হচ্ছে মনে। জয়া ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল
—আমি কি করতে পারি এখানে? আমাকে বলতেই বা এসেছ কেন? থাকুক যেভাবে খুশি।
—তুমি আমার কথাটা বুঝছ না। ও আমাকে নিয়ে একদম আলাদা থাকতে চায়। একদম আলাদা। রীতা রাজাও নয়। তুমি বুঝতে পারছ কথার মানেটা?
জয়ার বুকের ভেতরটা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেল। হঠাৎ কোন তীব্র আঘাত পেলে বেশ খানিকক্ষণ স্নায়ু অসাড় হয়ে যায়। সেই অসাড়ভাব একধরনের নিরাসক্তি এনে দেয় মনে। চিন্তা নৈর্ব্যক্তিক হয়ে পড়ে। জয়ারও ঠিক সেরকমই হল। পরিস্থিতি তবে এই। প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে তার বাবার সঙ্গে থাকতে চায়। বাবার অন্য স্ত্রী পুত্র আছে। মেয়ে বাবার সেই স্ত্রী পুত্রের সঙ্গে থাকবে না। এখানে জয়ার ভূমিকা কি?
—সো? আমি কি করতে পারি?
জয়া নির্বিকার। কঠিন। মনের তোলপাড়ের টুটি নিজেই চেপে ধরে রেখেছে।
—তুমি জানোই তো বৃষ্টিকে আমি কত ভালবাসি। ও যখন আমার কাছে এসে থাকতে চাইছে ... আমার কি হেল্পলেস অবস্থা ...
নিরাসক্ত জয়া এবার কলে আটকে পড়া ইঁদুর দেখছে সামনে।
—মেয়েকে নিয়ে থাকতে চাইলে আবার ডিভোর্স করো। তারপর আবার সপ্তাহে একদিন করে ছেলেকে দেখে আসবে।
—এটা তুমি রাগের কথা বলছ। বৃষ্টিকে নিয়ে কি করা যায় তাই নিয়ে আমি তোমার কাছে সাজেশান চাইতে এসেছি।
—আমি বৃষ্টিকে নিয়ে তোমার সঙ্গে একটি কথাও বলতে রাজি নই। কোর্ট আমাকেই কাস্টডি দিয়েছিল, আমার দায়িত্ব ছিল, আছেও। কি করতে হবে না হবে আমি বুঝব।
কথাগুলো কেটে কেটে উচ্চারণ করল জয়া। মনে মনে বলল, ডিভোর্সের পর বিয়ে করার সময় মেয়েকে ভালবাসার কথা মনে ছিল না?
এতক্ষণে সুবীরও ধৈর্য হারাল,
—দায়িত্ব দেখিও না। মেয়ের কতটুকু খবর রাখো তুমি? কি করে বেড়াচ্ছে জানো? আমি তোমার কাছে এমনি এমনি এসেছি? বৃষ্টি প্রায়ই এসে আমার বাড়িতে উল্টোপাল্টা চেঁচামিচি করছে, যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে সবার সঙ্গে, রীতার মুখের ওপর ফস্ করে সিগারেট ধরাচ্ছে, একদিন মদ খেয়ে ... ও মদ খায় সেটা তুমি জান?
সামনে থেকে এখখুনি মিউজিয়ামটা অদৃশ্য হয়ে গেলেও জয়া বুঝি এত স্তম্ভিত হত না। এই কদিন আগেও যে মেয়ে তারই শরীরের অংশ ছিল, একটু একটু করে হামাগুড়ি দেওয়া থেকে চোখের সামনে আঠেরোয় পৌছল, সেই মেয়ে মদ খেয়ে ...! সুবীরের বাড়িতে গিয়ে হল্লা করছে!
—আমি বিশ্বাস করি না। সেভাবে আমি আমার মেয়েকে মানুষ করিনি।
—সে তো দেখতেই পাচ্ছি। সুবীর হাত ওল্টালো। ‘আমার মেয়ে’ শব্দ দুটো তার কানে ঠক করে বেজেছে, —এই তো সেই মানুষ করার নমুনা!
জয়ার গলা অল্প চড়ল— অমানুষ হয়ে থাকলে তোমার প্রশ্রয়েই হয়েছে। আমাকে জব্দ করার জন্য দামি দামি জিনিস দিয়ে অভ্যেস খারাপ করে দিয়েছ মেয়ের। টেপ চাইলে টেপ, ওয়াকম্যান চাইলে ওয়াকম্যান, জামাকাপড়ের কথা তো বাদই দিলাম। সপ্তাহে একদিন মেয়েকে দেখার নাম করে আমার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা। এতদিন পর যেই নিজের স্বার্থে ঘা পড়েছে, ওমনি...
সুবীর মাথা নিচু করল। হয়ত জয়া ঠিকই বলছে। মেয়েকে দামি জিনিস দেওয়ার পিছনে সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতার অনুভূতি ছিল না তা নয়। কিন্তু সত্যি সত্যি দিতেও তো ইচ্ছাও করত তার। খুব কাছে পেতে ইচ্ছা করত মেয়েটাকে। আবার সেই মেয়ে যখন সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিতে চায়...।
একটা ইচ্ছার সঙ্গে আরেকটা ইচ্ছা কেন যে ঠিকঠাক মিলতে চায় না! দুটো চাওয়া যদি নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু করে তবে মাঝের মানুষটা শুধুই পুড়তে থাকে। এ এক অসহায় দহন।
সুবীর প্রাণপণে নিজের গলা নরম রাখতে চাইল,
—জয়া, আমি তোমার সাহায্য চাইতে এসেছি। এ অবস্থায় আমরা কি করতে পারি? আমরা? বৃষ্টির মা বাবা?
জয়াও নিজেকে শান্ত করল। বুকের মধ্যে ঝোড়ো বাতাস তবু বয়েই চলেছে।
—ঠিক আছে, আমি দেখছি যাতে বৃষ্টি অন্য কারুর সংসারে অশান্তির সৃষ্টি না করে।
‘অন্য কারুর’ শব্দ দুটো কি বেশি জোর দিয়ে বলল জয়া? অন্য কেউ কে? সুবীর? নাকি রীতা, রাজা? সুবীর বুঝতে পারল না।
গাড়িতে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসেছে। স্টার্ট দেওয়ার আগে ভদ্রতা করল,
—কোন দিকে যাবে?
এখন কোন দিকে যে যাবে জয়া?
—তুমি যাও, আমার কাজ আছে।
সূর্য হেলে পড়েছে ময়দানের দিকে। প্রথম বিকেলের সাদাটে সূর্য। ক্রমশ তাপ ফুরিয়ে আসছে। তবু শেষবারের মত ভাস্বর। জয়ার মুখেও সেই পড়ন্ত বেলার রোদ। উল্টোদিকের ফুটপাথে ভিখারি পরিবারের শিশুরা উদ্দাম ছোটাছুটি করে চলেছে। রাস্তায় অবিশ্রান্ত পথচারীদের আসা যাওয়া। চৌরঙ্গিপাড়া নিজস্ব নিয়মে শব্দময়।
এত আলো এত শব্দ সবই নিষ্প্রভ হয়ে গেছে জয়ার কাছে। শরীরটা টেনে টেনে চলার চেষ্টা করল। কখনও কখনও নিজেরই শরীর নিজের কাছে এমন ভারী হয়ে যায়! কলেজের গেটের সামনে এসে দাঁড়াল একটুক্ষণ। এগজিবিশনে যাওয়ার আর স্পৃহা নেই। কি করবে এখন? কোথায় যাবে? হাত তুলে একটা ট্যাক্সি থামাল।
ট্যাক্সি ড্রাইভার মুখ বাড়িয়েছে, —কোথায় যাবেন?
দু এক মুহূর্ত মাথাতেই এল না কিছু। মাথা সম্পূর্ণ ফাঁকা। ঠোঁট দুটো শুধু নিজে থেকে বলে উঠল,
—দেশপ্রিয় পার্ক।
সমস্ত অভিমান, অপমান ক্রোধ হয়ে আছড়ে পড়ল কলিংবেলে।
সুধা দরজা খুলেছে।
—ব্যাপারটা কি? এতক্ষণ ধরে বেল বাজাচ্ছি ...
—ব্যাপারটা কি বুঝতে পারছ না? এই আওয়াজের মধ্যে শোনা যায় কিছু? একদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেই ঝড় তুলে দিয়েছে।
এতক্ষণে জয়ার মস্তিষ্কে ঢুকেছে। উন্মত্ত হেভি মেটাল চলছে বাড়িতে। বাজনার তোড়ে গোটা বাড়ি থর থর।
কাঁধের ব্যাগ ডাইনিং টেবিলের দিকে ছুড়ে দিয়ে জয়া মেয়ের ঘরে ঢুকেছে। উৎকট ধোঁয়ার গন্ধে ঘরটা ভরপুর। বৃষ্টির হাতে সিগারেট। দুটো পা দেওয়ালে তুলে মেয়ে চোখ বুজে অশোভন ভঙ্গিতে শুয়ে। বাজনা শুনছে।
জয়া স্টিরিও বন্ধ করে দিল।
বৃষ্টি তাকিয়েছে।
—সিগারেটটা ফ্যালো।
বৃষ্টি পাকা নেশাড়ুর মত জোরে জোরে টান দিল দুবার। বুকে ধোঁয়া ভর্তি করে নিল। তারপর যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও ছুড়ে দিল জানলার বাইরে।
—কবে থেকে এসব বাঁদরামি শুরু হয়েছে?
বৃষ্টি উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না।
—কি হল শুনতে পাচ্ছ না? আমি তোমাকে বলছি। এসব কবে থেকে শুরু করেছ? নেশা—ভাং, মদ, গাঁজা ...?
বৃষ্টি নিরুত্তর।
—তোমার বাবা আজ আমার কলেজে এসেছিল।
এতক্ষণে বৃষ্টির চোখে ভাষা এসেছে। বিস্ময়।
—তুমি তোমার বাবাকে গিয়ে বিরক্ত কর?
বৃষ্টি চোয়াল শক্ত করল। জয়ার দিকে তাকাচ্ছে না। চোখ দেওয়ালের ক্ষতস্থানগুলোর দিকে।
—তোমার বাবা বলছিল তুমি নাকি ড্রিঙ্ক করে ও বাড়িতে যাও?
বৃষ্টি তবু চুপ। নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। মুখ করমচার মত টকটকে লাল।
—তোমার বাবা বলছিল ...
—তুমি আমার সম্পর্কে বাবার সঙ্গে কথা বলার কে?
আগ্নেয়গিরির মুখ খুলেছে।
—তোমার মা-বাবা তোমাকে নিয়ে সব সময় কথা বলতে পারে।
—মা? বাবা? কে তারা? বাবা বউ বাচ্চা নিয়ে আরামে সংসার করছে; মা শিল্পের সাধনায় জীবন উৎসর্গ করেছে। নিজেরা নিজেদের মত ফুর্তি করো গে যাও, আমাকে আমার মত থাকতে দাও।
—আমার সঙ্গে এইভাবে কথা বলছিস তুই? আমি ফুর্তি করি? একটা ছবি আঁকার পেছনে কত যন্ত্রণা, কত নিষ্ঠা ...
—বেশি যন্ত্রণা ফন্ত্রণা দেখিও না। এসব যন্ত্রণা নিষ্ঠার কথা আমাকে জন্ম দেওয়ার সময় মনে ছিল না?
চিৎকার শুনে বাবলু হুইল চেয়ার ঠেলে দরজায় এসেছে,
—হচ্ছেটা কি এখানে? অ্যাই বৃষ্টি চুপ কর।
—কেন চুপ করব? আমাকে নিয়ে ঢং দেখিয়ে দুজনে আলোচনা করছে!
—মার সঙ্গে এই ভাষায় কথা বলছিস?
—মা দেখিও না। মাকে মার মত হতে হয়। বাবাকে বাবার মত।
মেয়ের মূর্তি দেখে জয়া বিমূঢ়। এই মেয়ের জন্য দিনের পর দিন মামলা লড়েছিল সে! এই পরিণতি দেখার জন্য বড় করেছে! মেয়ে মার দিকে আঙুল তুলে জবাব চাইছে! এই সেই শান্ত বিনীত বৃষ্টি! চোখে জল এসে যাচ্ছিল, দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে কোনরকমে সামলালো জয়া,
—তুই বাবার কাছে গিয়ে থাকতে চাস? বাবার সংসারে অশান্তি শুরু করেছিস? রীতাআন্টিকে অপমান করিস এত স্পর্ধা তোর? এই শিক্ষা পেয়েছিস ছোটবেলা থেকে?
—শিক্ষা দেওয়ার তোমার সময় ছিল? আমার যা ইচ্ছে তাই করব। যা খুশি তাই করব। আমার আঠেরো বছর বয়স হয়ে গেছে। তোমার গার্জেনগিরির পরোয়া করি না আমি।
—বেরিয়ে যা। এখখুনি বেরিয়ে যা বাড়ি থেকে। বদমাইশ মেয়ে কোথাকার।
—কেন? বেরোব কেন অ্যাঁ? জন্ম যখন দিয়েই ফেলেছ তখন বেরিয়ে যা বললেই হবে? জন্মে যখন গেছিই যা চাইব তাই দিতে হবে। যেভাবে চাইব সেভাবে। হয় তুমি দেবে, নয় বাবা।
জয়ার সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল। ঝাঁপিয়ে পড়েছে মেয়ের ওপর। চুলের মুঠি ধরে সপাটে চড় মেরেছে মেয়ের গালে। মেরেই চলেছে।
সুধা দুহাতে চেপে ধরে বাইরে টেনে আনল জয়াকে।
চড় খেয়ে বৃষ্টি কয়েক মুহূর্ত হতভম্ব। এই তার জীবনের প্রথম মার খাওয়া। বাবলুও দরজার সামনে থেকে চলে যাওয়ার পর ঘুরে গিয়ে ব্যাগ থেকে সিগারেট বার করল। স্টিরিও চালিয়ে দিল ফুল ভল্যুমে। ম্যাডোনা তারস্বরে চেঁচিয়ে চলেছে, পাপা ডোন্ট প্রিচ্ ....
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন