ত্রয়োদশ অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

ভয়ংকর ভূমিকম্পের ইঙ্গিত প্রথম টের পায় পশুপাখি, জীবজন্তুরা। হয়ত তাদের প্রাকৃতিক অসহায়তার জন্য অথবা মানসিক বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ না হওয়ার জন্য। এই অপূর্ণতা থেকেই জন্ম নেয় এক প্রখর অনুমানশক্তি। সেই অনুমানশক্তি দিয়েই বাবলু বুঝতে পারছিল জয়ার সঙ্গে বৃষ্টির সেদিনের বাগবিতণ্ডা দুর্যোগের পূর্বাভাস মাত্র। প্রকৃত দুর্যোগ সামনে আসছে। দিদি যদি একটু সময় দিত বৃষ্টির জন্য? অন্তত বাবা মা চলে যাওয়ার পর? তবে জয়াকেও সম্পূর্ণ দোষ দেওয়া যায় কি? সৃষ্টিশীলতার কিছু নিজস্ব ধর্ম আছে, সৃজনশীল মানুষ এক অর্থে স্বার্থপরও বটে। আত্মকেন্দ্রিক।

বিষুব রেখা থেকে শুরু করে দুজন মানুষ যদি দুই মেরুর দিকে হাঁটতে শুরু করে, তবে তারা কোনদিন মিললেও মিলতে পারে। কিন্তু যদি তারা পাশাপাশি দুটো রেলের লাইন ধরে হেঁটে চলে তবে তারা হাঁটতেই থাকে অনন্তকাল, মেলে না কখনই, দূরত্বও কমে না এক চুল। সুবীর আর জয়ার সম্পর্কটা সেরকমই ছিল। একই পৃথিবীতে এরকম দুজন মানুষ থাকতেই পারে কিন্তু একই ছাদের নিচে এদের স্থান হওয়া কঠিন, এক বিছানায় দুর্বিষহ। এই ধরনের নিকটতম সম্পর্কের মধ্যেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ধ্বংসের বীজ লুকিয়ে থাকে। যে বিষিয়ে ওঠা সম্পর্কের থেকে বীজের আবির্ভাব, সেই সম্পর্কের ছায়া তো বীজের ওপর পড়বেই। সেই ছায়াই বোধহয় ফুটে ওঠে পরবর্তী প্রজন্মের অসন্তোষের মধ্যে দিয়ে। তাই কি বাবলুর পাশে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটা হঠাৎ একদিন পাল্টে যায়?

মাঝে মাঝে বাবলুর খুব অবাক লাগে। এই কি সেই বৃষ্টি, যাকে পাশে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে বারান্দায় বসে থাকত! ছোট্ট মেয়ে চুপ করে মামার হাত আঁকড়ে পড়ন্ত বিকেলে তাকিয়ে থাকত সামনের সবুজ গালচেটার দিকে! কোন শব্দ উচ্চারণ না করে তারা পরস্পরের সঙ্গে কত কথাই না বলে ফেলত। নীরবতাও কখনও কখনও শব্দের চেয়ে বেশি মুখর হয়ে ওঠে। কোন কোনদিন প্রশ্নের বান ছোটাতো মেয়েটা,

—রেড সোর্ডটেল আর গাপ্পি এত আলাদা দেখতে হয় কেন?

—ডোডো পাখি কোথায় থাকে ভালমামা?

—ক্যাঙারুদের কেন বাচ্চা বয়ে বেড়ানোর থলি থাকে পেটে? মানুষের কেন থাকে না?

—ভালমামা, তুমি এত ইতিহাস পড়ো কেন?

—পেরেন্টস ডে’তে খালি দিদা যায় কেন? দিদা কি আমার পেরেন্ট?

মেয়েটা কি হঠাৎ বদলেছে? বোধহয় হঠাৎ নয়। বাবলুর সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মন বলে, এটা বদল নয়, ভাঙন। পাহাড়ের ধসের মত। পাহাড়ে ধস তো আকস্মিকভাবে নামে না, ভূমিক্ষয় শুরু হয় অনেক আগে থেকে।

জয়া মিনমিন করে,

—আমার তো কোনদিন সেভাবে চোখে পড়েনি। দিব্যি হাসিখুশি ছিল? হয়ত নিজেকে নিয়ে একটু বেশি ব্যস্ত! হয়ত একটু বেশি জেদি।

বাবলুর হাসি পায়। যারা শাসন করে তারা যে কখন শাসিতের বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দেয়, নিজেরা জানতেও পারে না। পূর্ব ইউরোপের চেহারাটা এখন কি? পাঞ্জাব? কাশ্মীর? রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যা সত্যি সমাজের ক্ষেত্রেও তাই। পরিবার বা ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে কি করে?

বাবলু আবার ঘড়ির দিকে তাকাল। এগারোটা। বৃষ্টি এখনও বাড়ি ফিরল না। আজকাল রোজই তো রাত করে ফেরে, তবে সেও বড় জোর সাড়ে নটা, দশটা। এত রাত তো হয়নি কোনদিন! গেল কোথায়! বাবলুর দুশ্চিন্তা বাড়ছে ক্রমশ। অন্যমনস্ক হওয়ার জন্য বাবলু একটা ম্যাগাজিন খুলল। রাত নির্জন হয়ে আসছে, ঘণ্টা বাজিয়ে শেষ ট্রামটাও বোধহয় চলে গেল। রান্নাঘরে সুধা বাসনপত্র নাড়ানাড়ি করছে, গোটা বাড়ির নিস্তব্ধতার মধ্যে সামান্য শব্দও বড় কানে লাগে।

সন্ধে থেকেই বাড়ি থমথম করে আজকাল। এতদিনকার নেশা টিভিটাকেও বাবলু আজকাল বন্ধ রাখে। মনে চাপ থাকার জন্য সময়টাকে বড় দীর্ঘ মনে হয় তার। কোন কোনদিন সুধা নিঃশব্দে বাবলুর ঘরে এসে দাঁড়ায়,

—তোমাকে খেতে দেব দাদাভাই?

বাবলু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,

—দিদি কোথায়?

—ওপরে। সুধা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে, —বাড়ি ফিরে ইস্তক তো ছাদেই দাঁড়িয়ে থাকে।

মাঝে মাঝে সুধা হা হুতাশ করে, —বিশ্বাস করবে না দাদাভাই, মেয়েটার ঘর থেকে কি বিচ্ছিরি গাঁজার গন্ধ বেরোয় গো। ঘরে ঢুকলেই গা গুলিয়ে বমি উঠে আসে।

—দিদি ঢোকে ও ঘরে?

—কই আর ঢোকে। রোজই তো মেয়ে না ফেরা পর্যন্ত ছাদের আলসেতে দাঁড়িয়ে থাকে, মেয়ে ফিরলে চলে যায় ছবি আঁকার ঘরে। রাতভর হিজিবিজি টানে আর কাটে, কাঁদে বসে বসে। দিদির মত মানুষকে কখনও ওভাবে কাঁদতে দেখিনি গো!

বাবল চুপ করে থাকে। দিদির বোধহয় এ কান্নটা পাওনা ছিল। কান্না নয়, শাস্তি।

ম্যাগাজিনের পাতায় চোখ রেখেই বাবলু টের পেল একটা পায়ের শব্দ প্যাসেজে ঘোরাফেরা করছে। তার দরজা অবধি এসেও ফিরে গেল। শেষ পর্যন্ত তার ঘরে ঢুকেছে।

ঘরে ঢুকেও জয়া দাঁড়িয়ে রইল বেশ খানিকক্ষণ। তারপর দ্বিধাজড়িত প্রশ্ন করল,

—তোর কাছে বৃষ্টির কোন বন্ধুর ফোন নাম্বার টাম্বার আছে? মানে অনেকে তো ফোন টোন্ করে, তুই তো মাঝে মাঝে ধরিস ...

যতটা পঙ্গু তার থেকে নিজেকে দশগুণ বেশি পঙ্গু মনে হল বাবলুর। সে তো আর রাস্তায় বেরিয়ে খোঁজখবর করতে পারবে না। কারুর কোন সাহায্যেই সে আর আসবে না। সে এখন একটা ভগ্নস্তূপ, দু যুগ আগের একটা অশান্ত সময়ের স্মৃতিফলক মাত্র। নিজের শীর্ণ পায়ের দিকে তাকিয়ে ছটফট করা ছাড়া আর কিছুই তার করার নেই। অথচ কত কিছু তার হওয়ার কথা ছিল। ইন্‌জিনিয়ার, গ্লোব ট্রটার, বিপ্লবী। এক নিমেষের ভুলে ...!

দিদির দিকে বাবলু ম্লান মুখে তাকাল,

—সুবীরদাকে একটা টেলিফোন করব? যদি ওখানে গিয়ে থাকে?

কথাটা জয়ার মাথাতে আসেনি তা নয়। যদি সত্যিই ওখানে গিয়ে থাকে, তবে সেটা জয়ার পক্ষে আরও বেশি অসম্মানজনক। মুখে বলল, —না থাক। অন্য কারুর নাম্বার থাকলে দ্যাখ।

বলেই দু এক মিনিট কি ভাবল জয়া, আবারও বলল, —ছেড়ে দে। কাকে আর রাত্তিরবেলা ... কোথায় আর যাবে? মিছিমিছি অন্যদের ব্যস্ত করা।

সুধা জয়ার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে হঠাৎ হাউমাউ করে উঠল,—যেভাবে ছুটে ছুটে রাস্তা পার হয়! কোনদিকে তাকায় না! দিদি তুমি বরং একবার থানাতেই…

—এমন কিছু রাত হয়নি এখনও। সবে সাড়ে এগারোটা। এমনিতেই তো দশটা বাজায়। জয়ার গলায় হাল্কা ধমক। ধমক? না সান্ত্বনা খোঁজা?

জয়া বাইরের দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এ সময়ে রাতের দিকে তাও একটু ঠাণ্ডা বাতাস ওঠে, আজ যেন পৃথিবীও দম বন্ধ করে আছে। দূরে বড় রাস্তার বাতিগুলো টিমটিম। জয়ার চোখ অনেক দূর অবধি দেখার চেষ্টা করল। কোথায় গেল মেয়েটা?

বাবলুও পিছন পিছন বাইরে এসেছে। ঘড়ঘড়ে গলায় বলে উঠল,

—তুই সেদিন ওকে মারধোর না করলেই পারতিস।

এ কথাটা তো জয়াই নিজেকে বলতে চেয়েছে রোজ। তবু বাবলুর মুখ থেকে শুনে ধক করে লাগল বুকে। আপনাআপনি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল,

—তুই তো সামনে ছিলি। ওভাবে অপমান করার পরও যদি কিছু না বলি...

—অপমান তো আমাকেও করে। সব সময়। আমার সামনে সিগারেট ধরিয়ে....

—তুই জানতিস বৃষ্টি সিগারেট খায়! আমাকে বলিসনি তো! কবে থেকে?

—সে অনেক দিন। মাস দুয়েক তো হবেই। ভাবলাম কি জানি এটাই হয়ত এখনকার রেওয়াজ। আমি তো আর তোদের এখনকার নিয়মকানুন জানি না। ওর বয়সী মেয়ে সিগারেট খাবে, রাত করে বাড়ি ফিরবে, ঝাং ঝাং করে বাজনা চালাবে, আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে, তার মা কিছুই দেখবে না, এটাই হয়ত এখনকার কাস্টম্।

বাবলুর বাঁকা বাঁকা কথায় জয়ার মুখে কাতরভাব। এ সব কথা এখন বাবলু না বললেই পারত! ভাবতে ভাবতেই জয়ার পিঠ টানটান। বৃষ্টি ফিরছে না! ল্যান্সডাউনের দিক থেকে! হ্যাঁ, বৃষ্টিই তো।

বাবলুও দেখেছে বৃষ্টিকে।

বৃষ্টি হনহন করে হেঁটে আসছিল, সিঁড়ির সামনে এসে থমকে দাঁড়াল,

—সরি ভালমামা, এক বন্ধুর বাড়িতে আটকে গেলাম, ওদের ফোনটাও খারাপ।

বৃষ্টির হাঁটা অসংলগ্ন। এক হাতে বারান্দার থাম ধরে আছে, যেন সংযত করছে নিজেকে। বাবলুকে নয়, যেন বিবেকের কাছে কৈফিয়ত দিচ্ছে। যাত্রাদলের বিবেক। যে ঘটনার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, পাত্রপাত্রীদের ওপর যার প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা নেই, এমনই এক অকর্মণ্য অস্তিত্ব মাত্র।

বাবলু একটি কথাও জিজ্ঞাসা করল না, শুধু সে দেখছিল বৃষ্টি কিভাবে ভেতরে ঢুকতে গিয়েও অন্ধকারে দাঁড়িয়ে পড়ল। জয়াকে দেখতে পেয়েই গলা কঠিন হয়েছে,

—ডোন্ট মাইন্ড ভালমামা, এরকম আমার হবে। সামটাইম সামটাইম।

বৃষ্টির গলা কি ঈষৎ জড়ানো! বাবলু বুঝতে পারল না। শুধু বুঝতে পারল কথাটা তাকে নয়, জয়ার উদ্দেশে বলা। বাবলু এখানে যাত্রাদলের বিবেক নয়, যাত্রাদলের সঙ্।

জয়া কোন শব্দ উচ্চারণ করতে পারছিল না। গভীর আতঙ্ক তার ক্রোধকে ছাপিয়ে গেছে। একটা হাঁটু কাঁপানো, শিরদাঁড়া নুইয়ে দেওয়া ভয়। এই মেয়েকে সে এখন সামলাবে কি করে?

জয়া পালিয়ে যাওয়ার মত দৌড়ে চলে গেল ভেতরে। সামনে সুধা দাঁড়িয়ে। সুধার চোখেও চোখ রাখতে পারল না জয়া।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%