পঞ্চম অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

কিছু কিছু দৃশ্য ছবি হয়ে বুকে গেঁথে যায় চিরদিনের মতো। দাঁতে দাঁত চেপে ভুলতে চাইলেও আচমকা চোখের সামনে এসে অস্তিত্বের মূল পর্যন্ত নাড়িয়ে দিয়ে যায়। মায়ের মুখের ওপর সেদিন বৃষ্টির ওভাবে পা নাচানোর দৃশ্যটা জয়ার বুকে বিঁধে ছিল বহুদিন। স্টাফরুমে বসে কথা বলতে বলতে, একা স্টুডিওতে ছবি আঁকতে আঁকতে, ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে পড়াতে, কোন প্রস্তুতির অবকাশ ছাড়াই, হঠাৎই ছবিটাকে দেখতে পেত জয়া। একটা উজ্জ্বল ঘর, পোস্টার ওপড়ানোর ক্ষত-চিহ্নে ভরা দেওয়াল, পুরনো আমলের একটা সিঙ্গল-বেড খাট, সেই খাটে শুয়ে বৃষ্টি অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে পা দোলাচ্ছে। ভীষণ সচেতনভাবে উপেক্ষা করছে তাকে। উপেক্ষা? না অপমান? দৃশ্যটা বোধহয় আমৃত্যু জয়ার বুকে রয়ে যাবে।

এ ছাড়াও আরও কিছু দৃশ্য প্রতিটি মানুষের মনে জমা থাকে। মানুষ ভাবে ভুলে গেছে। অথবা সময় সম্পূর্ণ মুছে ফেলেছে দৃশ্যটা। বাস্তবে তা হওয়ার নয়। অবচেতন মনে ছবি রয়েই যায়। সামান্য সূক্ষ্ম ইঙ্গিতে, অবচেতনের পর্দা সরে গিয়ে, ছবিটা জ্যান্ত হয়ে চোখের সামনে নড়াচড়া করতে থাকে। অ্যাকাডেমির সেন্ট্রাল গ্যালারিতে ছাত্র রঞ্জন হালদারের আঁকা পেন্টিংটা দেখতে গিয়ে সেরকমই একটা আন্দোলন হৃদয়ে অনুভব করল জয়া।

অন্ধকার গুহায় এক চিলতে সূর্যের আলো টেরচাভাবে এসে পড়েছে, আলোটুকু ছাড়া গুহাতে আর কিছুই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান নয়। প্রধানত হলুদ আর খয়েরি মিশিয়ে দৃশ্যটা ধরার চেষ্টা করেছে রঞ্জন। তেলরঙের কাজ, রঙে তেমন গভীরতা আসেনি, রেখাগুলোও তত পরিণত নয় কিন্তু ছবিটা দেখেই সুবীরদের ন্যায়রত্ন লেনের বাড়িটা নিখুঁতভাবে জয়ার চোখে ফুটে উঠল।

সুবীরের সঙ্গে জয়া প্রথম দিন গেছে ন্যায়রত্ন লেনের বাড়িতে। গলির পর গলি পেরিয়ে জীর্ণ বাড়িটাতে ঢোকার সময়, আজন্ম বালিগঞ্জে মানুষ হওয়া মেয়েটার প্রথমটা মনে হচ্ছিল বুঝি কোন কোটরে ঢুকছে। প্রাচীন গাছের কোটর। অথবা ওই ছবিটার মতোই কোন ধসে পড়া পাহাড়ের গুহায় ঢুকছে জয়া। সামনেই কালচে সবুজ স্যাঁতসেঁতে উঠোন, উঠোন ঘিরে কোম্পানির আমলের সাবেকি খিলান। উঠোনে পা রাখতেই জয়ার চোখ আটকে গেল সুবীরদের দোতলার বারান্দার স্যান্ড কাস্টিং করা রেলিং-এ। কোন এক অজানা ফাঁক দিয়ে এককুচি সূর্য এসে পড়েছিল রেলিং-এর গায়ে। চতুর্দিকের সাদা-কালো আলোছায়ার মাঝখানে ওই জায়গাটুকু কী তীব্র উজ্জ্বল। গগন ঠাকুরের ছবির আভাস যেন। জয়া মন্ত্রমুগ্ধ। মুখ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, —অসাধারণ! দ্যাখো, দ্যাখো ওই রোদ্দুরটুকু ওখানে কী এক্সকুইজিট্!

সুবীর হেসে উঠেছিল,—ওই রোদ্দুরটা ওখানে তিন মিনিট থাকে। ওটা আমার জ্যাঠামশাই-এর ভাগের আলো।

সুবীর কিছু ভেবে কথাটা বলেনি; আজ জয়ার মনে হয় পৃথিবীতে সবার ভাগেই বোধহয় ওরকম পৃথক পৃথক আলোর টুকরো থাকে। বাদবাকি সবটাই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার। ওই আলোটুকুর জন্যই তো বেঁচে থাকে মানুষ। বৃষ্টিকে একদিন যদি দৃশ্যটা দেখানো যেত! কী সুন্দর একটা পালঙ্কও ছিল ও বাড়িতে। মেহগনি কাঠের। বিডে অ্যাকেনথাস্ পাতার কারুকাজ। পার্ক স্ট্রিটের পুরনো কবরখানার গথিক প্যাটার্নের সমাধিগুলোর মাথায় যেরকম হেলেনিস্টিক কাজ আছে, ঠিক সেরকম।

ছাত্রছাত্রীদের প্রদর্শনী দেখতে এলেই জয়া সব সময় চাপা রোমাঞ্চ অনুভব করে। পাশ করার পর ঠিক এভাবেই সে, নিখিল, শিপ্রা আর শ্যামাদাস মিলে প্রথম এগজিবিশন করেছিল। নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে কার্ড ছাপিয়েছে, প্রেসের লোকদের ঘুরে ঘুরে নিমন্ত্রণ করে এসেছে। সমালোচকরা আসতে পারে, সিনিয়ার আর্টিস্টদের কেউ যদি এসে পড়েন, মাস্টারমশাইরাও আসবেন হয়ত, চিন্তায় চিন্তায় জয়ার পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়েছিল। বুকের মধ্যে অবিশ্রান্ত ড্রাম বেজে চলেছে।

—অ্যাই, বলো না কি হবে? সবাই যদি গালাগাল করে? যদি বলে কিছু হয়নি?

সুবীর তার সমস্ত ভয় ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল,—আমার বউ-এর ছবির নিন্দে করবে! বুকের পাটা আছে কারুর?

সত্যিই খুব সাহস দিয়েছিল সুবীর। সুবীরের ওপর নির্ভর করতে ভালও লাগত তখন। সেই লোকই উদ্বোধনের দিন কি ডোবান ডুবিয়েছিল। কি অবুঝ সব ধারণা নিয়ে যে চলত সুবীর! শিল্পীর স্বামীকেও শিল্পের সমঝদার হতে হবে!! তা না হলে সানগ্লাস পরে হলের ভেতর এগজিবিশন দেখতে দেখতে দুম করে ওরকম একটা মন্তব্য করে বসে! জয়ারই ছবি দেখিয়ে!

—কি দারুণ কাজ দেখেছেন? ভ্যান গখের টাচ্ আছে না?

তিনজন মাত্র শিল্পীর নাম জানত সুবীর। ভ্যান গখ, মাতিস্ আর রেমব্রান্ট্।

সবাইকে সব জানতেই হবে তার কোন মানে নেই। জয়া কতটুকু জানে সেলস্ প্রোমোশন সম্পর্কে? এ কথাটাই কোনদিন সুবীরকে বোঝাতে পারেনি জয়া। সুবীর তাকে এক দিনের জন্যও মানুষ বলে গণ্য করল না। তার শুধু শো-কেসে রাখার জন্য একটা বউ-এর দরকার ছিল। দরকার মতো চাবি খুলে তাক থেকে নামিয়ে আদর-ফাদর করে আবার তাকে তুলে রেখে দেবে। আর সে ঘরে না থাকলে পুতুল তাক থেকে নেমে তার ঘরদোর সামলাবে। এবার হয়ত বিয়ে করে আগের আফশোস মিটেছে।

—দিদি, আমার ছবিগুলো একটু দেখবেন না?

জয়া চমকে তাকাল। সেই থেকে রঞ্জনের ছবিটার সামনেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। হাসার চেষ্টা করল একটু,

—নিশ্চয়ই।

শুধু রত্নাবলী নয়, সৌমেনও রয়েছে তার সহপাঠিনীর পাশে,—দিদি, আপনাকে আমি এগজিবিশনের আগে অনেক খুঁজেছিলাম।

—কেন?

—আপনি যদি পেন্টিংগুলো আগে একটু দেখে দিতেন...

—বেশ তো হয়েছে।

—তবু দিদি আপনি দেখে দিলে...

—দূর। আমি পড়াই বলে কি ছবির এক্সপার্ট নাকি? কতটুকু জানি ছবি সম্পর্কে? আসল ব্যাপারটা হল ফিলিংস্। অনুভূতি। তুমি কিভাবে তোমার চারদিককে দেখছ, সেই দেখার রঙ কিরকম, রূপ কিরকম, সবটাই তোমার নিজের ব্যাপার। দিনে, রাতে, প্রতি মুহূর্তে আলোর সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকটি জিনিসের, মানুষের, জীবজন্তুর চেহারা বদলে যায়। তখন তুমি তাকে কিভাবে দেখছ, তোমার দেখার আনন্দ, তোমার দেখার যন্ত্রণা সব মিলিয়েই তো ছবির নিজস্ব চরিত্র তৈরি হবে।

জয়া তার ছাত্রছাত্রী মহলে বেশ প্রিয়। এদের মধ্যেই সব থেকে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করে সে। বৃষ্টিটাও কি সুন্দর ছবি আঁকতে পারত। চমৎকার রঙ চেনার ক্ষমতা আছে। অথচ একদিনের জন্যও সেভাবে তুলি ধরল না।

ছেলেমেয়েগুলো এখনও জয়াকে ঘিরে আছে। ফিরোজ একদিন ঠাট্টা করে বলেছিল,—তুই কখনও একা হস্ না কেন বল্ তো? যখনই দেখি চ্যালাচামুণ্ডা ঘিরে রয়েছে। তোকে একটু ফাঁকা পাওয়ার চান্সই পেলাম না কখনও।

—পেলে কি করতিস?

—টুক করে মনের কথাটা বলে ফেলতাম।

—ইয়ার্কি হচ্ছে?

—নারে, ইয়ার্কি নয়। তোকে দেখে সত্যিই হিংসে হয়। কলেজে ছেলেমেয়েদের নিয়ে রয়েছিস, বাড়িতে দিব্যি নিজের রাজত্ব, ভাবনাচিন্তা নেই, মনের সুখে ছবি আঁকছিস, বৃষ্টির মতো একটা লাভলি মেয়ে পেয়েছিস...

ফিরোজের গলায় বিষন্নতার সুর চাপা ছিল না। সে এমনিতে দিলখোলা, আমুদে, বোহেমিয়ান টাইপের। প্যারিসে দু বছর থাকার ময় তার পরিচয় হয়েছিল এডার সঙ্গে। জার্মান মেয়ে। ব্রুনেট্। মডেলিং করত। পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা, সেখান থেকে লিভ টুগেদার। ফিরে আসার পরও বহুদিন দুজনের যোগাযোগ ছিল। বিয়েও করবে ঠিকঠাক। এডা এ দেশে এলও একবার কিন্তু দেশটা তার একদম পছন্দ হল না। এত লোডশেডিং। এত বিশ্রী উষ্ণতা! ফিরোজকে বলেছিল তার সঙ্গেই প্যারিসে গিয়ে থাকতে। সে মডেলিং করবে, ফিরোজ ছবি আঁকবে, দিব্যি চলে যাবে দুজনের। ফিরোজ রাজি হয়নি। এডা ফিরে গেল। ফিরোজ হয়ে উঠল দশগুণ বেশি বোহেমিয়ান সারাক্ষণ হাসছে, নাচছে, গাইছে, মদ খেয়ে ধুম হয়ে পড়ছে। কিন্তু ছবির ভেতর আসল ফিরোজ ঠিক ধরা পড়ে যায়। তার সব আঁকাতেই রহস্যময় বিষাদ। কোন উজ্জ্বল রঙ সে ব্যবহার করে না।

জয়া ফিরোজকে বলেছিল,—তুই কাজটা ঠিক করিসনি। তোর তো প্যারিস সুট করে গিয়েছিল; ওর এ দেশটা ভাল নাও লাগতে পারে। ওখানে চলে গেলে তোরও ফ্যামিলি হত, বৃষ্টির থেকেও হয়ত লাভলি মেয়ে থাকত।

ফিরোজের মুখচোখ ম্লান হয়ে গিয়েছিল, —কিন্তু আঁকতে পারতাম নারে।

—কেন? ওদেশে কি ক্যানভাস পাওয়া যায় না

—ক্যানভাস আছে। কিন্তু আমার তো রুট নেই সেখানে। শিকড় ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে? বাদ দে, তুই আমার কথা অত সিরিয়াসলি নিচ্ছিস কেন? একা আছি, তোফা আছি। একা থাকার যে কি আনন্দ তোর মতো সংসারীরা বুঝবে কি করে?

জয়া ফিরোজের কথা শুনে কষ্ট পেয়েছিল। একা কে নয়? ফিরোজই কি একা? এই যে অ্যাকাডেমির সেন্ট্রাল গ্যালারিতে একঘর লোকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, এখনও তো একাই সে।

রঞ্জন জয়ার কাছে দৌড়ে এল,

—দিদি, দারুণ খবর আছে। এইমাত্র আমার একটা ছবি বিক্রি হয়ে গেল!

—তাই! কত’তে?

—বারোশো। টুয়েলভ হানড্রেড।

ছেলেটার চোখ আনন্দে জ্বলজ্বল। ছাত্রের খুশিতে শিশুর মতো উচ্ছল জয়াও।

-ওমা তাই নাকি? এক্ষুনি কিছু খাওয়াও।

—কি খাবেন বলুন...

—যা খাওয়াবে। চপ, কাটলেট, কফি, কোল্ডড্রিঙ্কস, নিদেনপক্ষে এক কাপ চা।

ছেলেটা লজ্জা পেয়েছে, —আপনি এখনও চা পাননি?

বলেই দৌড়েছে চা আনতে। খুব ভিড় না হলেও বেশ কিছু লোকজন এসেছে ছবি দেখতে। ওপাশের গ্যালারিতে ফোটোগ্রাফির এগজিবিশন চলছে। জয়া কোণে পাতা চেয়ারে বসে পড়ল। এই যে জীবনের প্রথম এগজিবিশনে একটা ছবি বিক্রি হওয়া, এর যে কি আনন্দ...ছবির গায়ে ছোট্ট লাল টিপ পড়া...!

জয়ার প্রথম ছবি বিক্রি হয়েছিল পাঁচশো টাকায়। এক অস্ট্রেলিয়ান সাহেব কিনেছিল! আজও জয়া পরিষ্কার ছবিটাকে দেখতে পায়। শীতের কুয়াশায় একটা একলা মোরগ ডেকে ডেকে পৃথিবীর ঘুম ভাঙাচ্ছে। ছবিটার নাম দিয়েছিল, —ডন। সেও ঠিক এভাবেই সেদিন ছুটে গিয়েছিল তার মাস্টারমশাই-এর কাছে। ছটফট করেছিল সুবীরকে খবরটা দেওয়ার জন্য।

সুবীর নিশ্চয়ই অবাক হয়েছিল। এই যে মেয়েটা তার সঙ্গে রয়েছে, নরম-সরম ছোট্টখাট্টো শ্যামলা মেয়ে, যে কি না তার সামান্য আদরেও মোমের মতো গলে পড়ে, সারারাত্রি তাকে না আঁকড়ে ঘুমোতে পারে না, যার ছবি আঁকাটাকে একটা শৌখিন খেয়াল বলে সে হেসে হেসে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে, মনে করেছে আহা, একটা কিছু নিয়ে তো থাকবে, তার প্রথম ছবির দাম পাঁচশো টাকা! টাকা এত সহজেও রোজগার হয়! নির্ঘাত মন খচখচ করে উঠেছিল সুবীরের। তবে নিজেকে চাপা দিয়ে দিয়েছিল,

—কি খাবে? কোথায় খাবে?

বলেই জয়াকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়েছিল বিছানায়।

রঞ্জন সত্যি সত্যি চা এনে ফেলেছে। কোনরকমে কাগজের কাপটা ধরিয়ে দিল জয়ার হাতে,

—দিদি, রমেনবাবু এসেছেন। আমি একটু যাই?

কেন উনি তো ভেতরেই আসবেন? বলতে গিয়েও সংযত হয়েছে জয়া।

প্রথম এগজিবিশনে ক্রিটিক সত্যি এসে পড়লে কিরকম উত্তেজিত বোধ করে ছেলেমেয়েরা সেটা সব শিল্পীই জানে।

জয়া জিজ্ঞাসা করল, —কই রমেনদা?

—ওই তো বাইরে গাড়িবারান্দায় স্বপন আইচ আর নিখিল দত্তরায়ের সঙ্গে কথা বলছেন।

নিখিল আবার এল কোথেকে! ও তো এই সব এগজিবিশনে বড় একটা আসে না!

রঞ্জন দরজা পর্যন্ত পৌছনোর আগেই রমেন নিখিল গ্যালারিতে ঢুকেছে। নিখিল জয়াকে হাত নেড়ে মধ্যিখানে সাজানো ভাস্কর্যগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।

রমেন জয়ার কাছে এসেছে, —কি ম্যাডাম? কতক্ষণ?

—এই খানিক আগে। খবর কি আপনার?

—আমার আর কি খবর। নিউজপেপার অফিসের লোকেদের কোন খবরটবর থাকে না। তারা খবর খোঁজে। তারপর? তোমার সোলো কবে?

—এপ্রিলের দিকে করার ইচ্ছে আছে। আগে তো কলকাতা তিনশ’ সামলাই।

—কি কাজ করছ?

—দেখি। ঠিক করিনি এখনও।

-তুমি তো আজকাল খুব সুররিয়ালিজম-এর দিকে ঝুঁকছ। লাস্ট মান্‌থে দরবার গ্যালারিতে তোমার ‘অ্যাগনি’ ছবিটা দেখছিলাম। পুরনো ফর্ম থেকে অনেক সরে যাচ্ছ মনে হচ্ছে? ওটা তো প্রায়... অ্যাবস্‌ট্র্যাক্‌টের....

—ওই একরকম চেষ্টা আর কি। জয়া কথা ঘোরাতে চাইল। নিজের ছবি সম্পর্কে আলোচনা করতে সে বেশ অস্বস্তিবোধ করে,

—আমার ছেলেমেয়েদের কাজ দেখুন। দারুণ কাজ করেছে। রঞ্জন আর রত্নাবলীর কয়েকটা কাজ তো বেশ ম্যাচিওরড্।

—দেখব। দেখব। রমেন জোরে হেসে উঠল, —ওদের একটা ভাল রিভিউ চাই। তাই তো?

জয়ার মুখে চাপা অর্থপূর্ণ হাসি।

—কবে আসছেন বাড়িতে? আপনার তো পাত্তাই পাওয়া যায় না আজকাল।

—ওভাবে যেতে বললে হবে? জোরদার নেমন্তন্নটন্ন করো। বেশ জম্পেশ পাটি। বাই দা বাই, তোমার মেয়েকে সেদিন দেখলাম। ইউনিভার্সিটির সামনে চুটিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল। বেশ বড় হয়ে গেছে তো! ও কি এখন কলেজে?

—হ্যাঁ, ফার্স্ট ইয়ার। জয়া মৃদু হাসল। হাসলে এখনও তার ডান গালে গভীর টোল পড়ে, —আমরা এখন বুড়ির দলে। বয়স কম হল?

কত হল? ষাট ও সত্তর...এই নিখিল, জয়া কি বলছে শোন, ও নাকি বুড়ি! এখনও ইচ্ছে করলে...

জয়া আড়চোখে ছাত্রছাত্রীদের দেখে নিল। রমেন সাহা এরকমই। মুখের কোন রাখঢাক নেই।

—আহ্ রমেনদা, কি হচ্ছে কি? আপনার নেমন্তন্ন কনফার্মড। শুধু একটা রিঙ করে আসবেন।

নিখিল একমনে একটা ব্রোঞ্জের মূর্তি দেখছে। পেন্টিং-এর থেকেও মূর্তি গড়ার দিকে নিখিলের ঝোঁক বেশি। বিয়ে করার পর ছবি, স্কালচার, এগজিবিশন প্রায় মাথায় উঠেছে তার। একটা প্রায়-সরকারি অফিসে শাড়ির ডিজাইনিং-এর কাজ করতে হয় তাকে। বছরে এখন বড়জোর আট দশটা ছবি আঁকে কি আঁকে না। মূর্তি গড়ে আরও কম।

জয়া ডাকল, —তুই কি অফিস থেকে আসছিস? যাবি আমার সঙ্গে? নিখিল মূর্তি থেকে চোখ সরাল না, —কোথায়?

—সেমিনারে।

—কোথায় সেটা?

—আশুতোষ হলে। চল্, চারজন ইটালিয়ান পেস্টার এসেছে। অনেকে আসবে। প্রকাশদাদের সঙ্গেও দেখা হয়ে যেতে পারে।

—দুৎ। ও সব সেমিনার টেমিনার আমার পোষায় না। লেকচার দেওয়া তোর পেশা, তুই যা। সিনিয়ার টিনিয়ারদের সঙ্গে দেখা করারও আমার কোন ইচ্ছে নেই।

—তুই এখন করবিটা কি?

—ছবি দেখব। ছেলেমেয়েগুলো আশা করে কার্ড দিয়ে এল, ভাল করে দেখব না? নিখিল ঘুরে দাঁড়াল, কাজ নেই, কম্মো নেই, শুধু সেমিনার! তোকেও যেতে হবে না। চল, আমার সঙ্গে ফিরবি।

জয়া দ্বিধায় পড়ল। সেমিনারটায় গেলে ভালই হত। এ সব সেমিনারে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে যায়। আর যোগাযোগ না রাখলে আজকের দুনিয়ায় কে কাকে পোঁছে? তাছাড়া মডার্ন ইউরোপিয়ান ট্রেন্ডগুলো সম্পর্কেও...।

—যাবি, কি যাবি না ভাবছিস তো? যেতে হবে না। চল, তোদের বাড়িতে যাই, অনেকদিন বাবলুর সঙ্গে আড্ডা দেওয়া হয়নি। মন খুঁতখুঁত করলেও নিখিলের সঙ্গে বেরিয়ে এল জয়া। বাড়িই ফিরবে।

অ্যাকাডেমির উল্টোদিকের মাঠে মেলা শুরু হয়েছে। মেলার রঙিন আলোয় সদ্যনামা অন্ধকার বর্ণময়। রবীন্দ্রসদনের সামনে এসে দাঁড়াল দুজনে। ট্যাক্সি ধরবে।

রবীন্দ্রসদনের মেইন গেটে তিনটে লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। তাদেরই একজন ঘুরে ঘুরে দেখছে জয়াকে। জয়ার প্রথমটা একটু অস্বস্তি হল। লোকটা জয়ার দিকেই এগিয়ে আসছে পায়ে পায়ে। পরনে ধুতি-শার্ট, চোখে চশমা, লম্বাটে মুখ, তোবড়ানো ভাঙা গাল। ভীষণ চেনা চেনা যেন!

—কি খবর তোমার? কেমন আছ?

গলাটা শুনেই জয়া চিনতে পেরেছে। প্রবীর। সুবীরের দাদা। সুবীরের থেকে কতই বা বড়? বেশি হলে বছর চারেকের। এর মধ্যেই কী চেহারা ভেঙেছে! পঞ্চাশে পৌঁছনোর আগেই সন্তুরে বুড়ো যেন। নিখিলের থেকে একটু তফাতে সরে গেল জয়া।

—আপনি কেমন আছেন?

—এই কেটে যাচ্ছে।

বাবা মা? বলতে গিয়েও জয়া থমকে গেল। সুবীরের বাবা মাকে কি এখন আর বাবা মা সম্বোধন করা যায়?

প্রবীর বলল, তোমার নামটাম তো খুব দেখি আজকাল কাগজে। সব সময় আমার চোখে না পড়লেও, সুবুর বউদি তো ঠিক খুঁজে খুঁজে বার করে।

সুবীর নামটাতেই আড়ষ্টতা এসে গেল জয়ার। প্রবীর লক্ষ করল না। কথা বলেই চলেছে, —আমাদের মেয়েটা কেমন আছে? অনেক বড় হয়ে গেছে, তাই না?

—এই নভেম্বরে তো আঠেরো হয়ে গেল।

মাঝে মাঝে মেয়েটাকে বড় দেখতে ইচ্ছে করে।

জয়ার খারাপ লাগল। ঠাকুর্দা ঠাকুমা, জেঠু জেঠি সম্পর্কে আকর্ষণ দূরে থাক, ধারণা তৈরি করারও সুযোগ পেল না বৃষ্টি। এ ব্যাপারে জয়ারই বা কি করার ছিল? পরিস্থিতির কাছে মানুষ বড় অসহায়।

একটুক্ষণ চুপ থেকে প্রবীর আবার কথা শুরু করেছে, —সুবুর কাছ থেকে অবশ্য মাঝে মাঝেই বৃষ্টির খবর পাই। সুবু আজকাল প্রত্যেক মাসেই দু-একবার করে যায় বাড়িতে।

—বাড়ির সবাই ভাল আছে তো? জয়া কথার মোড় ঘোরাতে চাইল, —টুকাই বুকাই কোন্ ক্লাসে পড়ছে?

—টুকাই এবার মাধ্যমিক দেবে। বুকাই এইটে। মাঝে এক বছর ফেল করল তো। আমারই মতো মাথা হয়েছে দুটোর। প্রবীর একটু রসিকতা করার চেষ্টা করল। —তোমরা তো এখনও ওই বাড়িতেই? দেশপ্রিয় পার্ক? তোমার ভাই-এর খবর কি?

—সেই একই রকম। হুইল চেয়ার।

এত বছর পর প্রবীরের সঙ্গে কথা বলতে জয়ার ভাল লাগছিল। শরীর বুড়িয়ে গেলেও, মানুষটা এখনও সেই সাদামাটা, ভালমানুষ। সুবীরের সঙ্গে তুমুল গণ্ডগোলের সময় একমাত্র এই লোকটাই জয়াকে বলেছিল,

—আমি জানি সুবুর সঙ্গে তোমার বনা খুব কঠিন। সুবুটা এত স্বার্থপর... বাবা-মা যাই বলুক, তোমার ডিসিশন তুমিই নেবে। সুবুর সঙ্গে থাকো তুমিই। তোমার বাবা মা-ও থাকে না, আমার বাবা মা-ও না। ...

একবার বাড়িতে যেতে বলবে নাকি প্রবীরকে? বৃষ্টির সঙ্গেও দেখা হয়ে যাবে? থাক। ছিঁড়ে যাওয়া সুতোতে নতুন করে গিঁট বাঁধার চেষ্টা করে লাভ নেই। জয়া অন্য কথায় গেল,

—অনেকদিন পর আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভাল লাগছে, আপনি কি এখানে থিয়েটার দেখতে...?

—না না। ওই বন্ধুরা রয়েছে, ওদের অফিস ক্লাবের ফাংশন। গানটান হবে। চলি। ওরা দাঁড়িয়ে আছে। তুমি কি বাড়ির দিকে?

—হ্যাঁ।

প্রবীর চলে যাওয়ার পর নিখিল এগিয়ে এল,

—কে রে? কথা শুনে মনে হচ্ছিল সুবীরের কেউ হয়?

—আগে দেখিসনি? সুবীরের দাদা। চেহারাটা এত বদলে গেছে, আমিই চিনতে পারিনি।

—কি বলছিল কি?

—কি আর বলবে? ফরমাল কথাবার্তা। মেয়ে কেমন আছে, সুবীর এখন মাঝে মাঝে নাকি তার বাড়িতে যায়, এই সব আর কি।

—যাক্। নবাবের মতি ফিরেছে তা হলে? নিজের বাড়ির কথা উঠলে যা মুখ বেঁকাত! বাবা মা দাদা কেউ যেন মানুষই নয়!

—এরকমই বোধহয় হয় রে। জয়ার গলায় আচমকা দার্শনিক সুর, —আকাশ ছোঁওয়ার নেশায় পেলে মানুষ মাটিকেই ভুলতে চায়। আর একটু বয়স হয়ে গেলে সেই মাটিই আবার টানতে শুরু করে। হেঁচকা টান।

একটা ফাঁকা ট্যাক্সি দেখে নিখিল দৌড়ল। ট্যাক্সিতে উঠে কিছু দূর যেতে যেতেই বার বার তাকাচ্ছে ঘড়ির দিকে। জয়া ভুরু তুলল,

—তুইও আজকাল ঘড়ি দেখছিস! তাও সন্ধে ছটায়।

—সাধে কি দেখছি। তোর মতন তো আর আমার মুক্তজীবন নয়। তোর বাড়ি যাব বলে তোকে তো সেমিনার থেকে ভাগিয়ে আনলাম, এদিকে বউ টাইম লিমিট করে দিয়েছে। আটটার মধ্যে বাড়ি না ঢুকলে ক্যানভাসে ছুরি চালিয়ে দেবে।

—বেশ করবে। তুমিও আরতিকে কম নেগলেক্ট করো না। সী হ্যাজ দা রাইট টু ডিমান্ড ইওর কম্পানি।

—হ্যাঁ, ওই সব বলে বলেই তো তোরা ওর মাথাটা বিগড়ে দিয়েছিস।

এলগিন রোডের মোড়ে ট্রাফিক সিগনালে থেমেছে ট্যাক্সি। শীতের সন্ধ্যা বেশ গাঢ় হয়ে এসেছে। জয়া ভাল করে গায়ে চাদর জড়িয়ে নিল।

—ডিসেম্বর পড়তেই এই। শীত এবার জাঁকিয়ে পড়বে মনে হচ্ছে।

—হ্যাঁ। ফুলস্লিভগুলো বার করে ফেলতে হবে।

পরশু ফিরোজ এসেছিল। আর্টিস্ট কলোনির ব্যাপারে সেন্ট্রাল থেকে কি একটা গ্রান্ট ফান্টের চেষ্টা করছে। ওর কোন্ রিলেটিভ আছে দিল্লিতে, খুব ইনফ্লুএনশিয়াল বিজনেসম্যান, তার থ্রু দিয়েই...

—ওর যত সব বড় বড় ব্যাপার। বাপের পয়সা আছে। নিজেও প্রচুর ঘাঁতঘোঁত জানে...

—খালি ওর লাইফটাই কেমন হয়ে গেল। বাউণ্ডুলে...

—বাউণ্ডুলে না আরও কিছু। জাতে মাতাল তালে ঠিক। যথেষ্ট হিসেবী। দ্যাখ না, চার ছ’ মাসের মধ্যে ঠিক চারদিক ম্যানেজ করে ফেলবে। ওর যা এখন নামডাক...

—আমাকেও বলছিল ওর সঙ্গে জয়েন করার জন্য।

—খবরদার। একদম ওর মধ্যে যাস না। এখন ওর রিসেন্ট সঙ্গিনী কে হয়েছে জানিস তো?

—না তো! কে?

—কিছুই তো খবর রাখিস না। তোদের দেবযানী।

—যাহ্। জয়ার মুখে অবিশ্বাসের হাসি।

—বিশ্বাস হচ্ছে না? একটা কথা মনে রাখিস, তোদের ওই দেবযানী পারে এমন কোনও কাজ নেই।

জয়ার মুখে তবু অবিশ্বাস। নিখিল দেবযানীকে একদমই সহ্য করতে পারে না। কলেজে পড়ার সময় মধুশ্রী বলে একটা মেয়ের ওপর একটু দুর্বলতা ছিল নিখিলের। একেবারে প্লেটোনিক স্তরের। তাই নিয়ে জয়ারাও খুব খেপাত নিখিলকে। একদিন জয়ার বাড়ির আড্ডাতে উঠেছিল কথাটা। দেবযানী সেখান থেকেই শুনে কথায় কথায় গল্প করে এসেছিল আরতিকে। ব্যস্, আর যায় কোথায়! নিখিলের সঙ্গে সে সময় কি যে সাংঘাতিক ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল আরতির! দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙে ভাঙে। তারপর থেকেই আরতি অত্যন্ত সন্দেহবাতিকগ্রস্ত হয়ে পড়ে। জয়াও আরতির লিস্টের বাইরে ছিল না। জয়া অবশ্য গায়ে মাখেনি। এরকম তো হতেই পারে। মানুষ কখন কাকে ভালবাসবে, কখন কাকে সন্দেহ করবে, তার তো কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই। মনটাকে অত বশে রাখাও যায় না। যদি যেতই তবে কেন এখনও সুবীরের বিভিন্ন অনুষঙ্গ মনে পড়ে যায় তার! এগারো বছর পরেও!

বাড়িতে ঢুকে জয়া সুধাকে বলল,

—তাড়াতাড়ি একটু কফি করে ফ্যাল তো। আর নিখিলদাদাকে কিছু খাবার করে দে।

সুধা চলে যাচ্ছিল, কি মনে হতে আবার ডেকেছে,

—বৃষ্টি ফিরেছে?

সুধা ইতস্তত করল, —না। মানে আজ ফিরতে দেরি হবে।

নিখিল বাবলুর ঘরে গিয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছে। বাবলু নিখিলকে খুব পছন্দ করে। আর একজনও তার পছন্দের ছিল। সুবীর। তবে পছন্দ করে বলে যে মতে মেলে তা নয়। নিখিল বাবলু এক জায়গায় হলেই কিছুক্ষণ পর তর্ক শুরু হয়ে যায়। দুজনেই পাগলের মতো চেঁচাতে থাকে। বিশেষত রাজনীতির প্রসঙ্গ এলে। জয়া পারতপক্ষে তাদের আলোচনায় যোগ দেয় না। ইরাক কুয়েত দখল করে ভাল কাজ করেছে কিনা, রাষ্ট্রসংঘে ঠিক ঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কিনা ইত্যাদি প্রসঙ্গে জয়ার উৎসাহ নিখিল বাবলুর থেকে অনেক কম।

কফি খেয়ে জয়া যখন বাথরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে এল, তখনও তুমুল তর্ক চলছে দুজনের। ঘরে গিয়ে মুখে ক্রিম-ট্রিম মাখল, তখনও চলেছে তর্ক। টিভিতে বাংলা খবর শেষ হয়ে এল, তখনও।

জয়া বাবলুর ঘরে এল। সঙ্গে সঙ্গে নিখিল বাবলু দুজনে মিলে সাক্ষী মানতে শুরু করেছে জয়াকে। যেন জয়ার মতামতের ওপর নির্ভর করছে আমেরিকা ইরাকে সৈন্য পাঠাবে, কি পাঠাবে না অথবা চন্দ্রশেখর সরকারের গদির অবস্থা কি হবে।

—তোকে না আরতি তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছে?

নিখিলকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠতে হল। তর্কের মাঝখান থেকে উঠে যেতে হলে কেমন পরাজিত পরাজিত লাগে নিজেকে। প্যাসেজে এসে জুতো পরছে,

—বৃষ্টি ফেরেনি এখনও?

—তাই তো দেখছি। খুউব বন্ধুবান্ধব বেড়েছে আজকাল। আবার বলছিল নেতারহাট বেড়াতে যাবে বন্ধুদের সঙ্গে। সারাক্ষণ ডানা মেলে উড়ছে।

—সে তো হবেই। নতুন কলেজে ঢুকেছে, একটু তো পাখা গজাবেই। শুধু কি পাখনা? কল্‌জেও বেড়েছে। নইলে ওভাবে মেয়ে মুখের ওপর পা দোলায়!

আজ প্রবীরের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়াটা আকস্মিক হলেও পুরোপুরি আকস্মিক মনে হচ্ছিল না জয়ার। এমন তো বহু সময়ই ঘটেছে, যে লোকের সম্পর্কে ভাবছে সে অথবা তার ঘনিষ্ঠ কেউ তার পরেই হাজির হয়েছে বাড়িতে। এই তো পরশু বিকেলে কয়েকটা ছবির ফ্রেমের ব্যাপারে শ্যামাদাসের কাছে যাবে ভাবছিল, তার খানিক পরেই পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে দেখা হয়ে গেল শ্যামাদাসের বউয়ের সঙ্গে। প্রায় দু’তিন বছর পর। কোন ঘটনাটা যে ঠিক আকস্মিক, সেটার বোধহয় সঠিক সংজ্ঞা হয়ও না। তবে প্রবীরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অত ই্‌মোশনাল হয়ে পড়াটাও কোন কাজের কথা হয়নি। এই বয়সে জোলো আবেগ...! আবেগের দিন কবেই পিছনে ফেলে এসেছে জয়া। প্রবীরের কোন্ কথাতে সে দুর্বল হয়ে পড়েছিল? সুবীরের প্রসঙ্গে? না বৃষ্টির?

বৃষ্টির কথা মনে পড়তেই জয়া সুধাকে ডাকল,

—আজ কেন দেরি হবে বৃষ্টি কিছু বলে গেছে?

বাবলু হুইল চেয়ারে নিজস্ব বাথরুমে যাচ্ছিল। বাবলুর সুবিধামত প্রিয়তোষ কমোড, বেসিনের ব্যবস্থা করে নতুন বাথরুম তৈরি করে দিয়েছিলেন। জয়ার ঘরের সামনে হুইল চেয়ার থামাল বাবলু,

—শুধু আজ কেন? রোজই তো বৃষ্টি দেরি করে ফেরে। তুই নিজে সন্ধেবেলা বাড়ি থাকিস না, তাই জানিস না।

অন্য সময় হলে পাত্তা দিত না; এখন কথাটা জয়ার গায়ে লেগে গেল,— সন্ধেয় থাকি না মানে? আমি কি আড্ডা মেরে বেড়াই?

—আড্ডা মারো, কি কি করো সেটা তুমি জানো। যা ফ্যাক্ট আমি তাই বলছি। বেশ কয়েকদিন ধরেই বৃষ্টি সন্ধেবেলা ফিরছে না এটাও ফ্যাক্ট, তুই থাকিস না, খবর রাখিস না, সেটাও।

—তোরা তো থাকিস্। তোরা জিজ্ঞেস করতে পারিস না?

বাবলু উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। হুইল চেয়ার ঠেলে এগিয়ে গেল। সুধা তখনও জয়ার সামনে দাঁড়িয়ে। জয়া এবার তার দিকে ফিরল,

—হাঁ করে দেখছিস্ কি? সারা দিন তেতে পুড়ে, মুখের রক্ত তুলে খেটে এসে আমাকেই যদি সব খবর রাখতে হয়... তোরা বাড়িতে আছিস কি জন্য? বলতে বলতে চোখ পড়েছে টেবিলের ফুলদানির দিকে, —ওটা পরশুর ফুল না? ওটা বদলানোরও সময় পাওনি? গাছগুলোকে রোদ খাওয়ানো হচ্ছে? নাকি সেটারও সময় পাও না?

সুধা জানে এটা তার দিদির রাগের সময়। দিদির সমস্ত বাহারী গাছেদের মাপা রোদ চাই, মাপা ছায়া। না হলেই সুখী গাছ সব শুকিয়ে মরে যাবে। এ সময় দিদিকে কোন কথা বোঝানোও যাবে না। সুধা ঘাড় নিচু করে চুপচাপ হজম করল বকুনিগুলো।

জয়া সশব্দে মেয়ের ঘরের দরজা খুলল। সঙ্গে সঙ্গে উৎকট কড়া গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মেরেছে। বৃষ্টি কি আজকাল সিগারেট খাচ্ছে নাকি! পোড়া তামাকের গন্ধ! না বদ্ধ ঘরের ভ্যাপসা গন্ধ! ঘরে যথারীতি বিশ্রী ভাবে জামাকাপড়, জিনিসপত্র ছড়ানো। পোস্টারহীন ঘরটাকে কী কুৎসিত লাগছে। কোন জিনিসে মেয়েটার এতটুকু যত্নআত্তি নেই। হয়ত যা প্রয়োজন তার থেকে বেশি পেয়ে এসেছে বলেই। ছোটবেলা থেকেই ওর চাওয়াগুলোকে আরও সংযত করা উচিত ছিল।

না দিয়েই বা কি উপায় ছিল? সব সময় মনে রাখতে হত মেয়েটার বাবা যেন কোন ভাবেই জিততে না পারে। বাবা মাও যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন তারা চুটিয়ে আদর দিয়ে গেছে নাতনিকে। জয়া মেয়ের জন্য সময় দিতে পারত কতটুকু? কিন্তু নিজের আঁকা ছাড়া আর যা খাটাখাটুনি করেছে সবই তো এই সংসারের জন্যই। বৃষ্টির জন্যই। না হলে এ বাড়িতে আসার পর কি দরকার ছিল তার আঁকার স্কুলে পার্ট টাইম মাস্টারি নেওয়ার? কিংবা বড়লোকের ছেলেমেয়েদের শৌখিন আঁকা শেখার টিউশনি ধরার? উদয়াস্ত দোকান বাড়ি সাজানোর পরিশ্রম? আর্ট কলেজের চাকরিটা পেয়ে সে তো বেঁচে গেছে। তার ছবি যাতে মোটামুটি বিক্রি হয়, একটা নিশ্চিত রোজগার থাকে, আর্ট ডিলাররা যাতে মাথায় হাত বুলোতে না পারে, তার জন্য পরিশ্রম ছোটাছুটি তো করতেই হয়। যার জন্য এত পরিশ্রম, এত চিন্তাভাবনা, সেই মেয়েও কেমন দূরের হয়ে গেছে আজকাল।

জয়ার বুক নিংড়ে দীর্ঘশ্বাস গড়িয়ে এল। সে নিজেও তো মেয়েকে আর সেভাবে কাছে ডাকতে পারে না। কেমন যেন বাধ বাধ ঠেকে। দীর্ঘদিনের অনভ্যাস নিকটতম সম্পর্কেও মরচে ধরিয়ে দেয়। আবার সেদিনের দৃশ্যটা জয়ার মনে পড়ে গেল। মেয়ে তাকে দেখেও কানে ওয়াকম্যান লাগিয়ে পা নাচাচ্ছে।

জয়া মেয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাবলুও তো একটু নজর রাখতে পারে। সারাদিন নিজের ঘরে শামুকের মত গুটিয়ে আছে। নিজের খোলে। কেবল কোন কারণে আঁতে ঘা লাগলেই...।

থাক, যে যেভাবে খুশি থাকতে চায়। কে কবে জয়ার কথা ভেবেছে? সুবীর চেয়েছিল তার সময়, তার শরীর, তার অখণ্ড মনোযোগ। তার চাহিদা মত সব জুগিয়ে যেতে পারলে সম্পর্কটাই ভাঙত না হয়ত। পরগাছার মত কেটে যেত জীবনটা। একা ওই মানুষটাকে দোষ দিয়েই বা কি লাভ। বাবা মা ভাই বৃষ্টি সবাইকে নিয়েই তো তার জীবন। তারা কতটুকু দিয়েছে জয়াকে? চলে আসার পরও তো বাবা মা মুখের গুমোট আস্তরণ দিয়ে সব সময় বলতে চাইত, জয়া ফিরে যা। জয়া ফিরে যা। অন্তত বৃষ্টির মুখ চেয়ে। আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে অনুভব করারও চেষ্টা করেনি মেয়ে তার নিজের হাতে গড়া সংসার ফেলে এসেছে কত যন্ত্রণায়।

একটা জলপ্রপাত তুষারের তূপ হয়ে জমে গেছে বুকে। সবাই পর। সবাই পর।

জয়া দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল।

সুধা ডাকল পিছন থেকে, —দিদি, খেয়ে যাবে না?

—স্টুডিওতে দিয়ে যাস্।

—বৃষ্টি এলে তোমাকে ডাকব?

জয়া পলকের জন্য দাঁড়াল। তারপর আবার উঠতে শুরু করেছে,

—না। থাক্।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%