সুচিত্রা ভট্টাচার্য
ডিসেম্বর শেষ হয়ে এল। অতিথি শিল্পীর ভূমিকায় শীত এখন কলকাতায় তার স্বল্পকালীন দাপট দেখাচ্ছে। কদিন ধরেই থার্মোমিটারের পারদ দশ-এগারোয়। দিল্লি-টিল্লিতে তো রীতিমত থরহরিকম্প অবস্থা। রোজই টেম্পারেচার পাঁচ ছয়। আপার ইন্ডিয়া জুড়ে শৈত্যপ্রবাহ চলছে। কাগজ খুললেই রোজ ঠাণ্ডায় দু-একজনের মারা যাওয়ার খবর। ফরিদাবাদ থেকে ফিরে সুবীর আবার ফরিদাবাদ গেছে। এতদিনে চলে আসার কথা। ফিরেছে কি?
ওয়াড্রোব খুলে বৃষ্টি মিনিটখানেক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। জন্মদিনের পর থেকে বাবার ট্যুরের পরিমাণ যেন বেড়ে গেছে। শেষবার ফিরে একবারই মাত্র বৃষ্টিকে ফোন করেছিল। আগে কত ঘন ঘন ফোন আসত।
হ্যাঙার থেকে কাশ্মিরী শালটা বার করে বৃষ্টি শুঁকল একবার। এখনও ইউক্যালিপটাসের গন্ধ লেগে আছে। এত মোটা শাল দরকার নেই, কলকাতার শীতে কাচ বসানো গুজরাটি চাদরটাই যথেষ্ট। এ বাড়ির সকলে বেশ শীতকাতুরে হলেও বৃষ্টির শীতবোধ একটু কম। ডিসেম্বর পড়তে না পড়তেই এ বাড়িতে লেপ কম্বল সব বেরিয়ে পড়ে। সারা দুপুর ধরে গা গরম করতে থাকে ছাদে। বিকেল না হতেই সেঁধিয়ে যায় যার যার বিছানায়। বৃষ্টিরই শুধু পাতলা কম্বলে রাত কেটে যায়; লেপ লাগে না। এই লেপ গায়ে দেওয়া নিয়ে কী যুদ্ধই না হত বৃষ্টির দিদার সঙ্গে। বৃষ্টি কিছুতেই লেপ নেবে না; মৃন্ময়ী দেবেনই। যেই না রাত্রে ঘুম এসেছে ওমনি লেপ উঠিয়ে দিয়েছেন নাতনির গায়ে। বৃষ্টিও সেয়ানা কম নয়, ঝট করে সরিয়ে দিয়েছে।
—ওরকম করে না সোনা, ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
—আমার শীত করছে না।
—না করুক। তবু গায়ে থাক। কদিন আগে জ্বর থেকে উঠেছ মনে নেই?
—সে তো দু মাস আগে। আমার গা কুটকুট করছে।
—করুক।
—আমি কিছুতেই লেপ গায়ে দেব না। বৃষ্টি ঘাড় বেঁকিয়ে উঠে বসেছে।
—আচ্ছা জেদি মেয়ে তো! ডাকব মাকে?
—ডাকো। মা আমার কলা করবে।
বৃষ্টি ভালভাবেই জানত যতই অবাধ্য হোক দিদা সত্যি সত্যি মাকে ডাকবে না কখনই। কত অত্যাচার যে করেছে এক সময় দাদু দিদার ওপর। রাতদুপুর অবধি জাগিয়ে রাখা, খাওয়া নিয়ে বায়না, স্নান নিয়ে বায়না...। যতদিন ছিল দুজনেই চোখে হারাত বৃষ্টিকে। কেন যে পুট-পুট করে অত তাড়াতাড়ি মরে গেল দুজনে! বৃষ্টিকে বেশি ভালবাসত বলেই কি? প্রিয়তোষ মারা যাওয়ার সময় বৃষ্টি মাত্র দশ, মৃন্ময়ীর সময়ে বারো।
দুটো বৃষ্টি একরাশ জামাকাপড় টেনে নামাল ওয়াড্রোব থেকে। দরজা বন্ধ করে সিগারেট ধরাল। মাঝে মাঝেই ভাবে সিগারেট খাওয়ার সময় আর দরজা বন্ধ করবে না। তবুও কেন যে করে! কাজটা অনুচিত মনে করে বলেই কি! নাকি শুধুই প্রচলিত সংস্কার মেশা কুণ্ঠা!
দুটো সুখটান দিয়ে সিগারেটটা জানলার বাইরে ফেলে দিল বৃষ্টি। ফ্লেয়ারকাট সালোয়ার-কামিজ হাতে তুলেও ছুড়ে দিল বিছানায়। উঁহু, এটা নয়। জিনসের প্যান্টের সঙ্গে লাল পাতলা পাঞ্জাবিটা পরবে আজ। মা একদম পাঞ্জাবিটাকে সহ্য করতে পারে না। প্রথম যেদিন পরেছিল সেদিন কী উষ্মা!
—ছিঃ, এটা কি পরেছিস?
—কেন? খারাপ কিসের?
—খারাপ না? গা দেখা যাচ্ছে। তোর অস্বস্তি হয় না?
—এরকম তো আজকাল সবাই পরে। সেদিন বুলবুলদিও তো এই টাইপের একটা পরে এসেছিল।
—পরুক। তুমি পরবে না। যথেষ্ট অশালীন লাগে দেখতে। আর কোনদিন যেন না দেখি...
বৃষ্টি আজ এটাই পরবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গায়ে গলিয়ে নিল লাল পাঞ্জাবি। জিনসের প্যান্টের বোতাম আটকাল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বেঁধে নিল চুড়ো করে। ন্যাচারাল শাইন লিপস্টিক লাগাল ঠোঁটে, চোখে হাল্কা আই লাইনার। এমন ভবে, যাতে আছে, আবার নেই!
ফোন বেজে উঠল। বৃষ্টি বেরোতে গিয়েও বেরোল না। মা আজ বাড়িতে আছে। একটু আগে দুজন ছাত্র এসেছিল। ছাত্রদের অ্যানুয়াল এগজিবিশন নিয়ে আলোচনা চলছিল জোর। তারা না যেতেই বাসুদেবন। লোকটা কেন আর্ট গ্যালারির মালিক যেন? ভেনাস? চিত্রদীপ? না জুপিটার? বৃষ্টি নামটা ঠিক স্মরণ করতে পারল না।
—বৃষ্টি, তোমার ফোন।
বৃষ্টি দরজা খুলে বাইরে এল। এখন আবার কার ফোন! বাবা।
ড্রয়িংরুমে ফেরার আগে জয়া দাঁড়িয়েছে,
—উঠে এসে ফোনটা তো একটু ধরতে পারিস। দেখছি আমি একটা দরকারি কথা বলছি।
হুঁহ্। ভারী তো কাজ। হয় কৃষ্ণ সিরিজ, নয় রাধা সিরিজ। লোকটা তো এসেছে ওই জন্যই। বৃষ্টি দেওয়ালের দিকে মুখ করে রিসিভার তুলল। লাল পাঞ্জাবিটাকে দেখিয়ে। শরীরের ভাঁজগুলোকে প্রকট করে।
—কি ব্যাপার অরিজিৎ! তুই! হঠাৎ!
—খুব আরজেন্ট দরকার রে।
—বল্।
—তোর মামার কাছে ফার্স্ট রাইখের ওপর একটা ভাল বই আছে বলছিলি না?
—বলেছিলাম নাকি? সো?
—বইটা একবার দিবি আমাকে? এই ধর্ দিন দশেকের জন্য?
—মামা অদ্দিনের জন্য বোধহয় দেবে না। ম্যাক্সিমাম দিন তিন-চার।
—তাই দিস। যেদিন কলেজ খুলবে সেদিনই আনিস প্লিজ।
অরিজিৎ ফিরে গেছে তার পুরনো জগতে। নেতারহাটের দুঃখী ছেলেটা নেতারহাটেই রয়ে গেল। সেই শাল-মহুয়ার জঙ্গলে। পাইন বনে।
কী সুন্দর একটা কবিতা আবৃত্তি করেছিল অরিজিৎ। বৃষ্টি কবিতাটার মানে বুঝতে পারেনি কিন্তু শব্দগুলো এখনও লেগে আছে কানে। মানে বুঝবে কি করে? কবিতা পড়ার অভ্যাসই তার তৈরি হয়নি কোনদিন। হৃদয়ের কোমল তারগুলো বাজতেই চায় না। রঙ-তুলির মতো তারাও নির্বাসিত।
বৃষ্টি ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল। মা কি তার ড্রেসটা লক্ষ করেছে? না করলেও করাতে হবে। ড্রয়িংরুমের পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকল। মা আর বাসুদেবনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সেন্টার টেবিল থেকে ম্যাগাজিনগুলো তুলে ঘাঁটতে লাগল, যেন কোন এক বিশেষ পত্রিকা এখ্খুনি তার দরকার। লাল মলাটের একটা পুরনো ‘ভোগ্’ তুলে নিল হাতে। পাতা ওল্টাচ্ছে। এই বয়সের ইন্দ্রিয় সিগনাল পাঠাচ্ছে, দেখছে, দেখছে। বাসুদেবন তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে।
জয়া বিরক্ত মুখে বাসুদেবনকে বলে উঠল, —ঠিক আছে। নেক্সট উইকের শেষাশেষি খোঁজ নিয়ে যাবেন, যদি শেষ করতে পারি তো....
—প্লিজ ম্যাডাম, যে কটা কমপ্লিট হয়েছে সেগুলোই যদি...
—অদ্ভুত কথা বলছেন! হাফফিনিশড্ ছবি....
—আপনার মতো আর্টিস্টদের হাফফিনিশড্ কাজও ভ্যালুয়েবল। আপনার লাস্ট গণেশ সিরিজটা...
ম্যাগাজিনটা নিয়ে বেরিয়ে এল বৃষ্টি। বাসুদেবনের কি এক্সপ্রেশান! এক চোখে গিলছে তাকে, অন্য চোখে রাধা সিরিজের আব্দার। যাক্, বৃষ্টির উদ্দেশ্য সফল। মার গলায় বেশ ঝাঁঝ ছিল।
পেন্সিল হিল্ পায়ে গলিয়ে বেরোনোর আগে বৃষ্টি বাবলুর দরজার সামনে দাঁড়াল একটু। ভালমামা নিবিষ্ট মনে ক্রসওয়ার্ড পাজল করছে। ঠিক খুঁজে খুজে শক্ত শব্দগুলোকে বার করে ফেলে। বৃষ্টি দু-একবার চেষ্টা করে দেখেছে। বেশ খটোমটো। তবে সময় কাটানোর পক্ষে আইডিয়াল।
বাবলু এখন এত তদ্গত যে বৃষ্টির দাঁড়িয়ে থাকা খেয়ালও করল না। বৃষ্টি একবার ভাবল ডেকে বিসমার্কের বইটার কথা বলে; পরমুহূর্তে ভাবল থাক, এ সব সময় ডাকলে ভালমামা ভীষণ রেগে যায়।
রাস্তায় নামতেই বৃষ্টির মনটা খুব ভাল হয়ে গেল। চমৎকার এক ঝকঝকে দিন ফুটে আছে বাইরে। শীতের রোদের রঙ এত নরম, এত সোনালি হয়! এরকম দিনে মনখারাপ করে থাকাই যায় না। যে কোন ঘ্যানঘেনে ভিখিরিকেও পয়সা দিয়ে দিতে ইচ্ছে করে।
পার্কের রেলিঙে হেলান দিয়ে রোদ পোহাচ্ছে টুকুনরা। বাড়ির কাছে এমন একটা পার্ক থাকলে তার রেলিঙে আড্ডা মারার প্রশস্ত জায়গা। তার সঙ্গে শীতের রোদটুকু তো উপরি পাওনা।
—কিরে? খুব মাঞ্জা দিয়ে? চললি কোথায়?
পিকলুর ডাক শুনে বৃষ্টি দাঁড়িয়ে পড়ল। ছোটবেলায় টুকুন রনি পিকলুদের সঙ্গে খেলা করত পার্কে। লায়লি মামণিরাও সঙ্গে থাকত। লায়লিরা কবেই বেহালায় ফ্ল্যাট কিনে উঠে চলে গেছে। মামণির সঙ্গে দেখা হলে কিরে কেমন আছিস সম্পর্ক। শৈশবের বন্ধুরা আর কজন টিকে থাকে শেষ পর্যন্ত? টুকুন পিকলুদের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক অবশ্য ততটা ভাঙা নয়, মাঝে মাঝে কথাবার্তা বলে, আড্ডা মারে সময় পেলে।ব্যস্, ওই পর্যন্তই।
বৃষ্টি দেখল রনিদের সঙ্গে ওই ছেলেটাও দাঁড়িয়ে। সাদা টি-শার্ট পরা, ট্রাউজারসও সাদা। কলকাতার কপিলদেব। চার্লি চ্যাপলিনের মতো আটকে গিয়েছিল ট্রেনের দরজায়।
রাস্তা পেরিয়ে পার্কের ধারে গেল বৃষ্টি,
—খুব মেয়েদের আওয়াজ দিচ্ছিস আজকাল?
—আওয়াজ খাওয়ারই তো ড্রেস!
—আমাকেই দিচ্ছিস? নাকি যে যায় তাকেই…?
টুকুন চুপ থাকতে পারল না, —তুই প্রেমনগর দেখেছি বৃষ্টি? ইয়ে লাল রঙ কব মুঝে ছোড়েগা...
—এক ঘুসি মারব। পাঞ্জাবিটা কত দিয়ে কিনেছি জানিস?
—আমাদের ভাই জাহাজের খবরে কি দরকার। খাই দাই। খেলি টেলি। আর তোদের দেখলে একটু আওয়াজ দিই,। আর কি চাই?
বৃষ্টি লক্ষ করল কপিলদেব মিটিমিটি হাসছে। সরাসরি তাকাচ্ছে না। আড়চোখে তাকে দেখে সেই অন্যমনস্কতার ভান। সুধামাসি সেদিন বলছিল ছেলেটার বাবা নাকি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। ওরা, মা আর ছেলে, নাকি আলাদা আলাদা থাকে সব সময়। মা-তো কারুর সঙ্গেই মেশে না।
ছেলেটাকে আড়াল করে চোখের ইশারায় রনিকে জিজ্ঞাসা করল, কে রে ছেলেটা?
—চিনিস না? বুবলু। সায়নদীপ ব্যানার্জি। জেম অফ আ বয়। স্টারস স্পোর্টিং-এর ওপেনার। রনি বেশ জোরেই বলে উঠেছে, —অলরেডি লিগে এবার তিনটে সেঞ্চুরি হয়ে গেছে। বস্ এবার ঠিক বেঙ্গল খেলবে। গত বছর আল্ডার টোয়েন্টিটুতে যা খেলেছে না.... সায়ন, একে চিনিস? বৃষ্টি রায়।...এই তোর ভাল নামটা কি যেন? খঞ্জনী না কি একটা নাম আছে না?
—শিঞ্জিনী। বৃষ্টি ছেলেটার দিকে সরাসরি তাকাল, —তবে আমি বৃষ্টি। টিপটিপ করে নয়। মুষলধারে পড়া।
স্কুল পর্যন্ত বৃষ্টির শিঞ্জিনী নামটা খুব চলেছিল। তারপর মেয়েদের কৈশোর যেভাবে হারিয়ে যায়, সেভাবে কবে যে দুম করে হারিয়ে গেল নামটা! নিজের গলাতেই নামটা এখন কেমন অচেনা লাগে। তবু নামটা তো আছেই। কাগজে কলমে, সার্টিফিকেটে, মার্কশিটে। অনেকটা তার বাবা মা’র পরিচয়ের মতো। শিঞ্জিনী রায় ডটার অফ সুবীর রায় অ্যান্ড জয়া রায়....
বৃষ্টির মজা লাগছে ছেলেটাকে দেখতে। কি বিটকেলভাবে সেদিন দৌড়চ্ছিল সকালে। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল,
—কাঁধে কিটসব্যাগ নিয়ে দৌড়ও কেন তুমি? মাঠে রাখলে চুরি যাবে সেই ভয়ে?
সায়নদীপ মুহূর্তের জন্য থতমত।
—না মানে ওটা এক টাইপের ওয়েটট্রেনিং। ওতে দু কাঁধের জোর বাড়ে। এনডিওরেন্স্ বাড়ে। রজার ব্যানিস্টার বলেন যতটা শরীরের ক্ষমতা আছে সেটাকে পুরো স্ট্রেচ করার পর আরও পরিশ্রম করলেই এনডিওরেন্স বাড়ানো সম্ভব।
বাহ্। স্মার্টলি জ্ঞান দিচ্ছে তো! যতটা ক্যাবলা ভেবেছিল ততটা তো নয়!
—তোমাদের ক্লাবে জিম্ন্যাশিয়াম নেই? বৃষ্টি ওজন তোলার ভঙ্গি করল—বারবেল তুলতে পারো না?
রনি বলে উঠল, —ফাজলামি হচ্ছে? কলকাতার কটা ক্রিকেট ক্লাবে জিম্ আছে রে?
—না, আমাদের ক্লাবে জিম নেই। তবে আমি একটা জিমে ভর্তি হয়েছি। আমাদের কোচ বলেন ...
ও বাবা, এ যে কথায় কথায় কোটেশন দেয় দেখি! বৃষ্টি মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছে সায়নদীপকে, —আর কে কে তোমাকে কি বলে ভাই? পার্কে ব্যায়াম করার সময় ছাদে দাঁড়ানো মেয়েদের দিকে ঘুরে ঘুরে তাকাতে কে বলেছে তোমায়? গাভাস্কার? না বয়কট? ওতে কি আইসাইট্ ভাল হয়? বলের সুয়িং দেখে খেলতে সুবিধে হয়?
এতক্ষণে সায়নদীপ লজ্জা পেয়েছে। লাজুক মুখে হাসছে। হাসিটা শিশুর মত সরল।
টুকুন সায়নকে বাঁচানোর জন্য কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল, —আমাদের কথাও কিছু জিজ্ঞেস কর্। রনি কি দারুণ ফিল্ডিং করছে সে খবর রাখিস্?
রনির বাড়ির সামনে সেদিনের জটলাটা মনে পড়ে গেল বৃষ্টির। মুখে বলল, —হ্যাঁ, ওকে সেদিন দেখলাম বটে। রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে দিয়ে একটা মেয়ের সঙ্গে ফিল্ডিং করতে করতে যাচ্ছিল।
—হ্যাহ! তুই কাকে দেখতে কাকে দেখেছিস্? রনি হাঁ হাঁ করে উঠেছে।
—ঠিকই তো। তুই তো আজকাল প্রায়ই বিকেলে হাওয়া হয়ে যাস্। টুকুন চোখ ঘোরাল, —ডুবে ডুবে জল খাচ্ছ গুরু?
—তোরাও যেমন। বৃষ্টি নাচাচ্ছে; তোরাও নাচছিস্।
—তাই? বৃষ্টি ভুরু ওঠাল, —মেয়েটার নাম সীমা আবস্তি। লেকমার্কেটে থাকে। মেয়েটার বায়োডাটা বলব? আরও কিছু?
—যাও না বস্, যেখানে যাচ্ছিলে যাও। রনি গজগজ করছে, —একটু কাঠি না করলে কি সুখ হচ্ছিল না?
বৃষ্টি ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে সান্গ্লাস বার করল। নাহ্, রনিকে আর বিপদে ফেলে লাভ নেই। চুল ঝাঁকাল,
—চলি রে, এরপর দাড়ালে হয়ত টুকুন পিকলুও আমাকে ভাগাতে চাইবে। সব সময় মনে রাখবি আমার নাম বৃষ্টি। বৃষ্টি কভার্স এ লট্ অফ্ গ্রাউন্ড। বৃষ্টির লক্ষ চোখ থাকে।
—চোখ কি শুধু বৃষ্টিরই থাকে? আমাদের থাকে না? এই ধরো তুমি গত সোমবার নিউএম্পায়ার, বুধবার লাইটহাউস আর বৃহস্পতিবার গ্লোবে ইভনিং শো-এ সিনেমা দেখতে গিয়েছিলে।
সায়নের কথার আকস্মিকতায় বৃষ্টি হতবাক। গোয়েন্দা নাকি রে বাবা?
সায়ন নির্বিকারভাবে বলে চলেছে, —সোমবার তোমার সঙ্গে ছিল দুটো ছেলে একটা মেয়ে, একটা ছেলে লম্বাচওড়া, আরেকটা ছোটখাটো উইক চেহারা, বুধবার ওই লম্বা ছেলেটা সঙ্গে ছিল, বৃহস্পতিবার ....
—ব্যস্, ব্যস্, হয়েছে। এবার থামো।
বৃষ্টি হাত উঁচু করল। মনে বেশ ধন্দ লেগেছে। প্রেমে টেমে পড়েছে নাকি! ছেলেটার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল,
—ছিঃ। ওভাবে মেয়েদের পেছনে পেছনে ঘুরতে নেই। তুমি না ভাল ছেলে?
তৃষিতাদের বাড়িতে এর আগে একবারই এসেছে বৃষ্টি। বাড়িটা বেশ পুরনো। তৃষিতার ঠাকুর্দা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একতলাটা ভাড়া নিয়েছিলেন। বোমা পড়ার ভয়ে কলকাতায় বাড়িভাড়া তখন দারুণ সস্তা। বাড়িটার সামনে বড় লোহার গেট। একপাশে পাথরের ফলকে লেখা— গ্রেস গ্রোভ্।
গেট খুলে ঢুকতেই প্রথমে ছোট্ট গাড়িবারান্দা। লাল সিঁড়ি দিয়ে উঠে আরেকটা বারান্দা পেরিয়ে পর পর ঘর। হাইরাইজের আমলে এরকম চেহারার বাড়ি কমে যাচ্ছে কলকাতায়।
গাড়িবারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ডাকল, —তৃষিতা।
রোগা মতন এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। বোধহয় তৃষিতার বাবা।
—এসো এসো। তুমি বৃষ্টি?
বৃষ্টি আগেরবার এসে তৃষিতার বাবাকে দেখেনি।
—সবাই এসে গেছে?
—সব্বাই। এসেই খালি বৃষ্টির খোঁজ। এই শীতেও।
কিছু কিছু লোকের কণ্ঠস্বরে এত স্নেহ মাখানো থাকে! স্নেহের জাদু সহজেই বশ করে ফেলতে পারে অন্যকে। বৃষ্টি ঝপ করে একটা প্রণাম ঠুকে ফেলল। এমনিতে সহজে সে কারুর পায়ে হাত দেয় না।
—থাক থাক। সোজা এঘর দিয়ে বাঁদিকে চলে যাও।
খাটে পা মুড়ে বয়স চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে সবাই। চারিদিকে ইতস্তত ছড়ানো এক রাশ ছবি। নেতারহাটের।
বৃষ্টিও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকল ছবিগুলো।
—সেই ছবিটা তো দেখছি না? সেই ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট? হানিমুন কাপ্ল্?
—ওটা বিক্রম নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। কাউকে দেবে না।
সুদেষ্ণা বলল, —বিক্রমটা বেশ পারভার্ট আছে। একা একা দেখবে আর রেলিশ করবে।
শুভ বলল,—ছাড় তো বিক্রমের কথা। সিনেমার পর আজ বসা হচ্ছে, কি হচ্ছে না? বলতে বলতে তৃষিতের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল,—ভাল ছেলে মেয়েরা না হয় ফিরে আসবে। কিরে পরভিন, আজ একটু জিন্ হবে নাকি? কিচ্ছু টের পাবে না বাড়িতে।
—হ্যাঁ হ্যাঁ। দুটো এলাচ মুখে দিয়ে নিলেই ব্যস। বৃষ্টি পরভিনকে সাহস দিতে চাইল।
তৃষিতা বৃষ্টির মুখে আঙুল রেখেছে,—এই আস্তে। বাবা পাশের ঘরেই আছে।
তৃষিতার চুপ করানোর চেষ্টা দেখে পরভিন হেসে উঠল। তার মধ্যে আরও বিদ্রোহী বিদ্রোহী ভাব এসেছে।
সুদেষ্ণা বলে উঠল,—আমি কিন্তু আজ থাকছি না।
—কেন?
—একটা পার্টি আছে সন্ধেবেলা। মা’র। যেতেই হবে সঙ্গে।
বৃষ্টি আর পরভিন চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। সুদেষ্ণার সব সময় বড় বড় ব্যাপার। স্যাটারডে ক্লাব, লেক ক্লাব, তাজবেঙ্গল।
—তোর গাড়ি দুটো নাগাদ আসবে না? আমাদের একটু এস্প্ল্যানেডে ছেড়ে দিস্।
তৃষিতার বাবা ঘরে ঢুকলেন,—তোমরা কি এবার খেতে বসবে?
দেবাদিত্যর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠেছে।
তৃষিতা বলল, —হ্যাঁ হ্যাঁ চল্, বসে পড়ি। দেবাদিত্য তো সেই দশটার সময় এসেছে। ওর নিশ্চয়ই খিদে পেয়ে গেছে এতক্ষণে।
দেবাদিত্য লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল,—না, না, আমার খিদে পায়নি। বেরোনোর সময় কাকিমা যা এক কাপ চা খাইয়েছে ওতেই চার পাঁচ ঘন্টার জন্য নিশ্চিন্ত। সঙ্গে পাঁউরুটির চুয়িংগাম।
তৃষিতার বাবা বললেন, —তাহলে আমি খাবার দাবার রেডি করে ডাকি তোমাদের?
তৃষিতার বাবা চলে যেতেই দেবাদিত্য বেশ চনমনে হয়ে উঠেছে।
—খাওয়ার আগে তৃষিতার নেমন্তন্নর অনারে আমি একটা দুরন্ত নিউজ দিতে পারি।
—কি রে?
—মীনাক্ষি লটঘট চালাচ্ছে। বহুত পুরনো।
—যাহ্। হতেই পারে না।
—হতে পারে না কিন্তু হয়েছে। বচপন্ কা মোহব্বত্। আশিক ক্ষুর চালায়।
—মানে?
—পাড়ার দাদা। বড়দা নয়, মেজদা ফেজদা টাইপ্।
—কি করে হয়! মীনাক্ষি তো এক্কেবারে অন্যরকম। সফ্ট। টেন্ডার নার্ভাস। বাবা মার খুব বাধ্য। ওর বাবা মা জানে?
—জানে তো বটেই। মেয়ে মোহব্বত করবে; বাপ মা টের পাবে না? গায়ের গন্ধে টের পাবে। এই নিয়েই তো ওদের বাড়িতে হেভি ঝামেলা চলছে। পরশু ওর বাবা খেপে গিয়ে ছেলেটাকে রাস্তায় ধরে কি সব তড়পেছে, পুলিশ ফুলিসের ভয় দেখিয়েছে, ওমনি রাত্রেই হিরোর চামচারা এসে কষে রগড়ে দিয়ে গেছে বাড়িসুদ্ধ সবাইকে। ওই ইকনমিকসের মোটা পার্থ, ও তো ওদের পাশের পাড়ায় থাকে, ওদের বাড়ির সামনে গণ্ডগোল দেখে গেছিল...
বৃষ্টি বলল,—আমি বিশ্বাস করি না।
—আমিও। সুদেষ্ণা বলল,—বড় গুল মারিস তুই। তোর মত মিথ্যেবাদী...
দেবাদিত্যর মুখে আহত ভাব। সুদেষ্ণা সুযোগ পেলেই যা তা ভাষায় কথা বলে তার সঙ্গে।
দেবাদিত্য উত্তেজিতভাবে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তৃষিতা হাতের ইশারায় থামাল। তার মা এবার খেতে ডাকতে এসেছেন।
একটা বেশ বড়সড় ঢাকা বারান্দায় পুরনো আমলের শ্বেতপাথরের খাবার টেবিল। খেতে বসে সকলে মিলে পেছনে লেগেছে দেবাদিত্যের।
—মাসিমা, দেবাদিত্যকে রুই মাছ এক পিস্ বেশি দেবেন।
—এই তৃষিতা, আরেকটা ফ্রাই দে দেবাদিত্যকে।
—নে না, লজ্জা পাচ্ছিস কেন? আরেকটু ফ্রায়েড রাইস নে।
—মেসোমশাই, দেবাদিত্য আরেক পিস্ মুরগির ঠ্যাং নেবে।
দেবাদিত্য ঠাট্টাগুলো গায়ে না মাখার চেষ্টা করল। অনেকদিন পর তার বেশ ভালমত খাওয়া জুটেছে দুপুরে।
তৃষিতার মা বললেন, —তোমরা সবাই মিলে ওর পেছনে লেগেছ কেন? কি এমন খায় বেচারা? ওইটুকু তো ঘিভাত নিয়েছে। বলতে বলতে হাসছেন, খায় হচ্ছে তোমাদের তৃষিতার বাবা।—ছটা বাটি নিয়ে, সাজিয়ে...বসে...
তৃষিতা বলে উঠল,—সত্যি, জানিস মার বৌভাতের দিন কি হয়েছিল? ওই যে সব বরের পাতে খাওয়ার নিয়ম ফিয়ম আছে না... বাবা খাওয়ার পর মা যখন বসেছে তখন পাত একেবারে আয়নার মত চকচকে।
তৃষিতার বাবা-মা’র কান বাঁচিয়ে শুভ ফিসফিস করল,
—তুই সামনের টেবিলে বসেছিলি বুঝি?
তৃষিতা বাঁ হাতে একটা চাপড় মারল শুভকে। তৃষিতার বাবা বলে উঠলেন,—ওই একদিন। একদিনই আমার জুটেছিল। তারপর থেকে কে খায়, কে খায় না সেটা তোমরা তোমাদের মাসিমার চেহারা দেখলেই বুঝতে পারবে।
তৃষিতার মা তাঁর ভারী চেহারা নিয়ে একটু লজ্জায় পড়লেন যেন,—আর তুমি যে আমাদের শান্তিনিকেতনের বাড়িতে গিয়ে বিকেলবেলা ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে? কিসের জন্য?
—তোমার জন্যে।
—বাজে বোকো না। বাবা কখন ফিরে আলুর চপ বেগুনি আনতে দেবে তার জন্যে। তোমরা বিশ্বাস করবে না, রোজ সাত আটটা করে বেগুনি, সাত আটটা করে আলুর চপ খেত। তারপরও মাকে বলত, মিষ্টি ফিষ্টি কিছু নেই? নোন্তা খেয়ে মুখ কেমন করছে।
—ওই তো মেয়েদের দোষ। কথার অর্থও বোঝো না। তখন তো মিষ্টি ছিলে তুমি, নোনতা ছিল তোমার বাবা। কী ঝাল! তবে বেশ সুস্বাদু। আমার হজম হয়ে গেছে। এখন অবশ্য তোমারও সেই মিষ্টত্ব আর নেই। তবু ....
তৃষিতা হাসছে—আমার বাবা মা’র রোমান্স শান্তিনিকেতনের খুব ফেমাস ঘটনা। কি বলব নাকি মা? ...
একটা অসম্ভব সুন্দর সুখী পরিবারের দৃশ্য। এই দৃশ্যগুলো বৃষ্টি কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। এই সব দৃশ্য দেখার আশঙ্কাতেই ছোট থেকে কোন বন্ধুর বাড়ি সহজে যেতে চাইত না সে। আজ কেন যে এল?
তৃষিতার মা পাশে এসে দাঁড়ালেন,—এই মেয়ে, তুমি তো কিছুই খাচ্ছ না দেখছি?
তৃষিতার মা’র মুখে কী সুন্দর মা মা ভাব। বৃষ্টির চোখে জল এসে গেল।
তৃষিতার বাবা বললেন, —তোমরা, আজকালকার মেয়েরা, কি বলো তো? বন্ধুদের সঙ্গে দিন রাত টো টো করছ, এখানে ছুটছ, সেখানে ছুটছ কিন্তু খাওয়ার বেলায় ...সব ডায়েটিং চলছে!
এভাবে কি কোনদিন বৃষ্টি বন্ধুদের ডাকতে পেরেছে বাড়িতে? পারবে কি? এভাবে মা দাঁড়িয়ে আদর করে খাওয়াবে সবাইকে! বাবা দেখাশোনা করবে!
ধীরে ধীরে অন্য বৃষ্টিটা দখল নিচ্ছে মস্তিষ্কের। শরীরের কোষে কোষে জমে থাকা তীব্র অভিমান হিংস্র রাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে শিরায় উপশিরায়। এই সময় বৃষ্টি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অনেক কষ্টে সামলে রাখার চেষ্টা করল নিজেকে।
ঘরে ফিরে খাটের ওপর পা ছড়িয়ে বসেছে সবাই।
তৃষিতা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে।
সুদেষ্ণা একটা বালিশ টেনে গড়িয়ে পড়ল, —মাসিমা মেসোমশাই দারুণ। কী জলি দুজনেই।
তৃষিতা দাঁত দিয়ে হেয়ার ক্লিপ্ আলগা করল, —দু জনে একসঙ্গে মুডে থাকলে যা ... বিশেষ করে আমার বাবা ...
বৃষ্টি হঠাৎই উঠে দাঁড়িয়েছে, —আমি যাচ্ছি।
—কোথায়? বন্ধুরা সবাই এক সঙ্গে চমকে উঠল।
—সে কৈফিয়ত কি তোদের দিতে হবে? বৃষ্টির গলা অস্বাভাবিক রূঢ়! বন্ধুরা স্তম্ভিত।
—সিনেমা যাবি না?
—না।
—বাহ্। নিজে সবাইকে নাচালি; কেটে পড়বি?
—আমার ইচ্ছে। দ্রুত পায়ে বৃষ্টি একেবারে রাস্তায়। শুভ দেবাদিত্যরা পিছন পিছন কিছুটা এসেও দাঁড়িয়ে পড়ল। এ কয়েক মাসেই তারা লক্ষ করেছে বৃষ্টি মাঝে মাঝেই কেমন অস্বাভাবিক আচরণ করে। হঠাৎ যদি উচ্ছল, তো হঠাৎই রাগী, গম্ভীর, রুক্ষ। এই সময় ওকে না ঘাটানোই ভাল। নেতারহাটে যা কাণ্ড করেছিল!
রাস্তা দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে উদভ্রান্তের মত হেঁটে চলেছে বৃষ্টি। পেনসিল হিল পরা এক সুবেশা মেয়েকে শীতের দুপুরে ওভাবে হাঁটতে দেখে অনেকেই দেখছে ঘুরে ঘুরে। বৃষ্টির কোনদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। কোনরকম অনুভূতিই নেই তার। দুবার হোঁচট খেতে খেতে বেঁচে গেল। একজন পথচারীর সঙ্গে ধাক্কা লাগল সজোরে। লোকটা কিছু বলার আগেই দেখল মেয়েটা বিশ পঁচিশ হাত দূরে চলে গেছে। ভিড়ের মাঝখানে এসে পড়তে বৃষ্টির সম্বিৎ ফিরল। হাঁটতে হাঁটতে হাজরার মোড়ে চলে এসেছে। এবার কোথায় যাবে স্থির করতে পারছে না। ট্রামস্টপে গিয়েও ফিরে এল। মাথার ভেতর একটা যন্ত্রণা তাকে কুকুর-তাড়া করে চলেছে। কি করবে সে এখন? বাড়ি ফিরে যাবে? কখখনো না। হঠাৎই যন্ত্রচালিতের মত এগিয়ে গেছে টেলিফোন বুথের দিকে। পাগলের মত ব্যাগে একটা কয়েন খুঁজছে। একটা কয়েন। হাতে নিয়েই ডায়াল ঘোরাতে আরম্ভ করেছে। মস্তিষ্কের যন্ত্রণাটা ছড়িয়ে দেবে ওপারেও। রীতা ফোন ধরেছে, —হ্যালো! কে বৃষ্টি! কি খবর তোমার?
—বাবা ফিরেছে?
—হ্যাঁ, পরশু।
—বাবাকে দাও।
—তোমার বাবার শরীরটা খুব ভাল নেই। ঘুমোচ্ছে।
—ডাকো। বলো বৃষ্টি ডাকছে।
—তুমি কি পরে রিঙ্ করতে পারো না? কিংবা তোমার বাবা যদি উঠে তোমায় ফোন করে? বুকে ব্যথা হচ্ছে বলছিল ...
—তুমি ডেকে দাও। আমার এখখুনি দরকার। এখখুনি।
—ধরো। দেখছি। রীতার গলায় বিরক্তি।
বৃষ্টি দাঁতে দাঁত ঘষল। নিশ্বাস পড়ছে ঘন ঘন।
সুবীর রিসিভার তুলেছে। গলায় ঘুমঘুম ভাব,
—কিরে, কি বলছিস্?
—কি ঠিক করলে? কবে থেকে থাকছ আমার সঙ্গে?
—শোন্ শোন, তোকে আমার কয়েকটা কথা বলার আছে।
—আমি কোন কথা শুনতে চাই না।
—লক্ষ্মী মেয়ে, এরকম করে না।
—আই জাস্ট ওয়ান্ট্ টু হিয়ার ইয়েস অর নো ফ্রম ইউ। না বলছ?
—উঃ, কখন না বলোম? কি পাগলের মত ...
—ও। তাহলে আমি এখন পাগল! তোমরাই সব সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ! বৃষ্টি হাতের মুঠো শক্ত করল,—পাগলামি করছি? ও কে। লেট ইট্ বি সো।
হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বাড়ি অবধি চলে এসেছে,বৃষ্টি নিজেও জানে না। কলিংবেল বাজাতে গিয়ে হুঁশ ফিরল। বাড়িতেই কেন ফিরল সে!
সুধা হাই তুলতে তুলতে দরজা খুলেছে। দেখেই বোঝা যায় আরামে ঘুমোচ্ছিল।
—এখন ফিরলে যে! তোমার না সন্ধেয় ফেরার কথা!
—কেন? বৃষ্টি খরখর করে উঠল, —আমি এলাম বলে তোমার ঘুমের ডিসটার্ব হল?
কাঁচা ঘুম ভাঙা বিরক্তিতে সুধা বলল, —আমার আবার ডিসটাব্। হুকুমের বাঁদি ফরমাশ মত খাবার দেব, বাসন মাজব, বাজার করব, দরজা খুলব .. আমি কথা বলার কে? তোমার মা খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে গেল বলে একটু যা গড়িয়েছিলাম ...
বৃষ্টি আরও রুক্ষ হল, —সরো তো। লেকচার মেরো না।
নিজের ঘরে ঢুকে বিছানায় ব্যাগ আছড়ে ফেলেছে। এখনও রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বিড়বিড় করল, আমি পাগল? আমি পাগল? বৃথাই জানলার গরাদটাকে বাঁকানোর চেষ্টা করল কয়েকবার। ওয়াকম্যানে সজোরে লাথি মারল। সব ভেঙে দেবে। সব। দরজা খোলা রেখেই সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিস্ফল আক্রোশে দেখছে পুরু গরাদটাকে।
—কি ব্যাপার! তুই সিগারেট খাচ্ছিস!
বৃষ্টি চমকে তাকাল। ভালমামা হুইল চেয়ারে দরজায়।
বাবলু আবার বলল, —তুই সিগারেট ধরলি কবে থেকে!
বৃষ্টি কাঁধ ঝাঁকাল, —ধরলাম।
—তোর আস্পর্ধা তো কম নয়!
—আস্পর্ধার কি আছে? বৃষ্টির গলা শীতল, —সিগারেট খাওয়া কি ক্রাইম নাকি? অনেকেই খায়। আমিও খাই।
বৃষ্টির মধ্যে আর কোন লুকোছাপা নেই। বাবলু হাঁ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
বৃষ্টি মুখ ঘুরিয়ে নিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন