নবম অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

রোমিলা থাপারের বইটা ফেরত দিয়ে পরভিনের সঙ্গে লাইব্রেরি থেকে বেরোল বৃষ্টি! সকালে কলেজে আসার সময় বইটার দিকে তার নজর পড়েছিল। বেশ কয়েক দিন হল ফেরত দেওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে।

আজকাল বৃষ্টি দরকারি কাজগুলো বড় ভুলে যাচ্ছে। নবনীতার নিউ ইয়ারস গ্রিটিংস্ সাত-আট দিন হল এসেছে, এখনও উত্তর দেওয়া হয়ে উঠল না। সামান্য একটা কার্ড কিনে পোস্ট করা, তাও মনে থাকছে না। হপ্তা দুয়েক ধরে একটা বল্গাছাড়া বুনো রাগ তাকে আলটপ্‌কা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এই মাথা ঠাণ্ডা, হাসিমুখে কথা বলছে লোকের সঙ্গে, আবার এই মেজাজ আগুন বাড়িতে কারণে অকারণে মুখ করছে সুধাকে, বাবলুর সঙ্গেও দু দিন ঝগড়া হয়ে গেল, বাবলু তার সঙ্গে কথা বলছে না। ক্লাসে লেকচার শুনবার সময় সব সময় নিজেকে সুস্থিত রাখতে পারে না সে। কেন অমন মুর্খের মত কাজ করে ফেলেছিল সেদিন? কি দরকার ছিল তার ওভাবে বাবাকে ফোন করার? ভাবতে গেলেই বৃষ্টির প্রতিটি রোমকূপে অপমানের হুল ফুটতে থাকে। প্রতি পলে মনে হয় রীতা নামের মহিলাটিও নিশ্চয়ই সেদিন দাঁড়িয়েছিল বাবার পাশে, সুবীর যখন তাকে পাগল ভাবছিল নিশ্চয়ই মনে মনে হেসেছে, ভেবেছে, দ্যাখো মেয়ে ভাবে বাবা এখনও তার বাচ্চাবেলার কেনা গোলাম, হুকুম করলেই সুড়সুড় করে মেয়ের পিছন পিছন বেরিয়ে পড়বে! তা কি আর হয়! সুবীর এখন রীতার স্বামীই নয়, রাজার বাবাও বটে! মা ছেলের সেই টানের সঙ্গে এই ধিঙ্গি অসভ্য মেয়েটা পেরে উঠবে কেন?

বৃষ্টি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল,

—তুই যা। আমার ক্লাস করতে ভাল লাগছে না। তাছাড়া এ ডি আর তো ক্লাস নিতে আসেই না, মিছিমিছি পাস ক্লাসে গিয়ে বসে থাকা...

—আজকে যদি আসে? একদিন ক্লাসে না দেখলে গোটা বছর অ্যাবসেন্ট করে দিতে পারে। লাস্ট ইয়ারে সেকেন্ড ইয়ারের কয়েকজনকে নাকি করেছিল।

—মামদোবাজি নাকি? নিজে সারা বছর গুলতানি মেরে বেড়াবে, ক্লাস নিতে আসবে না…

—গুলতানি কি বলছিস্ রে? পার্টির কাজ করে বেড়ান...

—পার্টি করে বলে মাথা কিনে নিয়েছে নাকি? গভর্নমেন্ট থেকে কি ওকে মুখ দেখানোর জন্য মাইনে দেয়? আমি যাব না। দেখি কি করে আমাকে সারা বছর অ্যাবসেন্ট করে!

—আমি একবার যাই। রণজয়ও গেছে। ও বলছিল...

—ও। তুই তাহলে ক্লাস করার জন্য যাচ্ছিস্ না? বৃষ্টি হঠাৎই খুব নিষ্ঠুরভাবে বলে উঠল, —আহ্লাদীপনা করতে যাচ্ছিস্?

পরভিন আহত চোখে তাকাল বৃষ্টির দিকে। বৃষ্টি আজকাল এরকমই বিশ্রীভাবে কথা বলে।

উত্তর না দিয়ে পরভিন উঠে যাচ্ছিল, বৃষ্টি তার হাত ধরে টেনেছে, লঘু গলায় বলল— শোন্ শোন্, কি এত কথা থাকে রে তোদের?

—সেটা তোকে বলব কেন? পরভিন গম্ভীর।

বৃষ্টি পরভিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল,

—চুমু ফুমু খাচ্ছিস? গায়ে হাত ফাত দিচ্ছে?

পরভিন জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিল,

—তুই আজকাল খুব ভালগার হয়ে গেছিস বৃষ্টি।

বৃষ্টির মুখ সঙ্গে সঙ্গে বেঁকে গেছে,

—কথাগুলোই ভালগার? আর কাজগুলো খুব রোমান্টিক, তাই না?

জ্বলন্ত চোখ হেনে পরভিন দৌড়ে ওপরে উঠে গেল। বৃষ্টি নিজের মনে কাঁধ স্রাগ করল। পরভিনের এই সতী সতী ভাব সে একদম বরদাস্ত করতে পারে না। নীচে নেমে দেখল সামনের মাঠে দেবাদিত্য, শুভ আর বিক্রম দাঁড়িয়ে গল্প করছে। ওদের পাস সাবজেক্ট আলাদা। বৃষ্টি ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেবাদিত্যকে বলল,

—তুই যে আজ বড় ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা মারছিস!

দেবাদিত্যের মুখে স্বভাবসুলভ হাসি, —কোথায়? তুই তো এসে গেছিস। পরভিন কোথায়? একটু আগে তোর সঙ্গে ঘুরছিল দেখলাম!

—পরভিনটা খুব খেপে গেছে। নিজেরই কপাল পোড়াচ্ছে।

—কে কার কপাল পোড়ায়! ওই দ্যাখ্, ওই ওদিকের থামটার আড়ালে...

—কে রে?

—কে আবার। অরিজিৎ। আজও ব্যাটা ড্রাগ নিয়ে ব্যোম হয়ে বসে আছে।

অরিজিৎকে দেখে বৃষ্টির বুক ছমছম করে উঠল। মাসখানেক হল অরিজিৎ ড্রাগ ধরেছে। হোস্টেলে গিয়ে মোটা পার্থদের সঙ্গে ব্রাউন সুগার নেয়।

বিক্রম বলল, —ওর বাবা মার কথাটা একবার ভাব। কি আদরের ছেলে। দিব্যি পড়াশুনো করছিল, লাইব্রেরি যাচ্ছিল...ওর বাবার উচিত ওকে ধরে আগাপাশতলা চাবকানো।

—কেন, চাবকাবে কেন? বৃষ্টি তখ্‌খুনি ঝন্ করে উঠেছে, —কোন্ রাইটে পেটাবে? কারণ ছাড়া কোন ফল হয় না।

শাল মহুয়ার জঙ্গলের অরিজিৎকে দেখতে পাচ্ছিল বৃষ্টি। কি অপূর্ব ধ্বনিময় কবিতা!

শুভ বলল, —ঠিক বলেছিস্। ওরও তো কোন মেন্টাল প্রবলেম থাকতে পারে।

বিক্রম বিজ্ঞের মত মুখ করল, —মেন্টাল প্রবলেম না কচু। ও সব অজুহাত। আসলে ক্যাপিটালিস্ট ব্লকের দেখাদেখি থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিগুলোতেও এসব ভাইস্ ঢুকেছে।

—থাম্ তো। শুভ ফস্ করে সিগারেট ধরাল, —লেকচার দিস না। ড্রাগ নেওয়া উচিত নয়, ঠিক আছে, মেনে নিলাম উচিত নয়। তবে উচিত তো অনেক কিছুই নয়। কটা উচিত হয় রে? মাস্টারদের ক্লাসে ফাঁকি দেওয়া উচিত নয়, ছাত্রদের পড়াশুনো না করে গুণ্ডাবাজি করা উচিত নয়, গভর্নমেন্টের লোকেদের অফিসে ঘুমোনো উচিত নয়, ঘুষ খাওয়া উচিত নয়, প্রাইভেট কোম্পানির লোকেদের দুনম্বরী করা উচিত নয়, ব্যবসায়ীদের বাটপার হওয়া উচিত নয়, ভোটের আগে লিডারদের ঝুড়ি ঝুড়ি গুল মারা উচিত নয়, এই তোদের সুদেষ্ণার কথায় কথায় নোটের গরম দেখানো উচিত নয়...

—এর মধ্যে আবার সুদেষ্ণাকে আনছিস্ কেন? বেশ তো লিস্ট তৈরি করছিলি...

শুভ বাধা পেয়ে বিরক্ত হয়েছে। কটমট করে তাকাল দেবাদিত্যর দিকে, —তোর গায়ে লেগে গেল বুঝি? নেতারহাট যাওয়ার সময় তোকে কত টাকা দিয়েছিল রে সুদেষ্ণা? তিন শ? না পুরোটাই?

—তুই জানলি কি করে? কে বলেছে?

—কে বলবে আবার। সুদেষ্ণাই সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে। তুই কি ভেবেছিলি তোকে টাকা দিয়ে সুদেষ্ণা সেটা গোপন রাখবে? হারামের পয়সা বিলোচ্ছে...

দেবাদিত্যর মুখটা করুণ হয়ে গেল।

বিক্রম বলল, —হারামের পয়সা বলছিস্ কেন? ওর বাবা কত বড় ডাক্তার জানিস? ওর বাবার ফি জানিস?

—ডাক্তার মারাস্ না তো। ওরকম অনেক ডাক্তারের ইনকাম ট্যাক্স ফাইল আমার বাবার কাছে আসে। ওদের দুনম্বরী পয়সা রগড়েই তো আমার বাবার পেট চলে। নিউ আলিপুরে সুদেষ্ণার বাবা কত বড় একটা নার্সিংহোম খুলেছে জানিস্? রুগীদের গলা মুচড়ে রোজগার। আঙুল গুনে বল্ তো নার্সিংহোমগুলোতে কটা নরমাল ডেলিভারি হয়, আর কটা সিজারিয়ান?

শুভ গাঁক গাঁক করে চেচাচ্ছে। বৃষ্টির খুব মনঃপূত হল কথাগুলো,

—যা বলেছিস। যেদিকে তাকাবি সব শালা চোর, ঘুষখোর। টপ টু বটম। খালি নিজেদের সুখ শান্তি খুঁজছে। করাপ্ট্, সেলফ্ সেন্টারড্...

—আমার ছোট কাকা নকশাল মুভমেন্টের সময় গুলি খেয়ে মরে গেল। ঠিক হোক, ভুল হোক, একটা কিছুর জন্য তো মরেছিল? সেই লোকটার কথা এখন আমাদের বাড়িতে কেউ ভুলেও উচ্চারণ করে না। আমার দাদু ঠাকুমার কাছে পর্যন্ত সেই ছেলে হল বোকার হদ্দ আর বুদ্ধিমান হচ্ছে আমার ঘুষখোর বাবা।

দেবাদিত্য শুভকে বলল,—তুই কি রে? সারাক্ষণ নিজের বাবাকে গালাগাল করিস কেন? সবার সামনে? ছিঃ।

বিক্রম বলল, —তুই নিজে কি? বাপের পয়সায় টুকটাক মাল খেয়ে বেড়াচ্ছিস, ফুর্তি মারছিস...

শুভ খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠল,—প্রথমত, আমি বাপের পয়সায় মাল খাই না, বাবার বোতল থেকে খাই। দ্বিতীয়ত, বাবার পয়সায় আমার একটা ন্যায্য অধিকার আছে, সেটুকু আমি নিতেই পারি।

দেবাদিত্য বলল, —তোকে দেখলে আমার ভয় করে রে শুভ। তুই যখন বড় হয়ে চাকরি বাকরি করবি, বিয়ে থা করবি, তখন যে তুই কি জিনিসে পরিণত হবি…

—কিসে পরিণত হব? এ পারফেক্ট নাটবল্টু টু দিস্ মডার্ন সোসাইটি। মোটা মাইনের চাকরি জোগাড় করব কম্পিটিটিভ্ পরীক্ষা টরীক্ষা দিয়ে, তারপর এনরমাস ঘুষ নেব, প্রমত্ত হুড়োহুড়ি করব, যাকে বলে ফুল এনজয়মেন্ট অফ লাইফ ইন এভ্‌রি সেন্স, তারপর পঞ্চাশের পর থেকে প্রেশার আর সুগারের ওষুধ, ষাটে অক্কা। ততদিনে আমার ছেলেও একটা পারফেক্ট আমি তৈরি হয়ে যাবে।

দেবাদিত্য হাত ওল্টালো।

বৃষ্টি চুপ করে বন্ধুদের কথা শুনছিল। নাহ্। এরা সবাই তার সাময়িক সঙ্গী হতে পারে মাত্র; বন্ধু নয়। এদের সকলের স্বভাবেই কোন না কোন রকম হ্যাংলামি রয়েছে। দেবাদিত্যর মধ্যেও। ঠাট্টার মোড়কে হ্যাংলামিকে ঢেকে রাখতে চাইলেও মাঝে মাঝে এমন প্রকট হয়ে পড়ে! অভাব থেকেই হয়ত ওর এই অভ্যাসটার জন্ম হয়েছে। নিজেরই অবচেতনায়। নাকি বৃষ্টিরই ভুল? বিক্রম, রণজয়, শুভদের মতো স্পষ্টভাবে দেবাদিত্যকে পড়তে পারে না বৃষ্টি।

সূর্য দূরে ইকনমিকস্ বিল্ডিং-এর মাথায় নেমে এসেছে। থেকে থেকেই দৌড়ে আসছে হিমেল হাওয়া। গঙ্গাসাগরের বাতাস। বৃষ্টি ভাল করে গলায় স্কার্ফ জড়িয়ে নিল। পরশু থেকে জোর কাশি হয়েছে। ঘরে ফিরে রাতে ফ্যান চালিয়েছিল। সেই জন্যই কি?

কাল রাত্রে বৃষ্টির ঘঙঘঙ কাশি শুনে মা এসে একবার দাঁড়িয়েছিল দরজায়। কোন কথাও বলেনি, কিছু জিজ্ঞাসাও করেনি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখে চলে গেল। সুধামাসি বলছিল, কয়েক দিনের জন্য নাকি শান্তিনিকেতন যেতে পারে। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এক্সকারশান্। যেখানে খুশি যাক, বৃষ্টির তাতে কি?

বৃষ্টি শুভকে বলল, —কিরে, যাবি তো?

—তুই কোথায় যাচ্ছিস? বাড়ি?

—দূর, এত তাড়াতাড়ি কি বাড়ি ফিরব? চল্, একটা সিনেমায় যাই।

শুভ দেবাদিত্যকে জিজ্ঞাসা করল, —যাবি আমাদের সঙ্গে?

দেবাদিত্য এড়িয়ে গেল, —তোরা যা। আমার হোস্টেলে কাজ আছে।

শুভ আর বৃষ্টি কলেজের বাইরে বেরিয়ে এল। কদিন ধরে বেশ কনকনে শীত পড়েছে। বেলাও তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে আসে এখন।

শুভ বৃষ্টিকে আঙুল তুলে দেখাল, —ওই দ্যাখ্। বড়লোকের বেটি বই দর করছে।

বৃষ্টি দেখার আগেই সুদেষ্ণা দেখতে পেয়েছে বৃষ্টিকে, —অ্যাই বৃষ্টি দেখে যা, বইটার কি দাম চাইছে!

শুভ নিচু গলায় বলল, —যেতে হবে না। বল্ কাজ আছে।

শুভর ছেলেমানুষি দেখে বৃষ্টি হেসে ফেলল, —দাঁড়া না, দেখি কি করছে।

—তুই যা, আমি সিগারেট কিনছি।

—আমার জন্যও এক প্যাকেট নিস্।

সুদেষ্ণার হাতে ফ্রেঞ্চ কুকিং রেসিপির বই। ইদানীং সুদেষ্ণার রান্নাবান্নার বইতে খুব আগ্রহ হয়েছে। গ্রন্থমেলা থেকেও তিন-চারটে রান্নার বই কিনেছিল। বিয়ের পর জয়ন্তকে খাওয়ানোর রিহার্সাল দিচ্ছে। ন্যাকা ন্যাকা কাণ্ড যত। রান্নাবান্নার ব্যাপারে বৃষ্টি মোটেই উৎসাহী নয়। তবু বইটা দু-চার পাতা ওল্টালো,

—কত চাইছে?

—সেভেনটি। আমি তিরিশ বলেছি।

—একটা ছুরি গলায় বসায়ে দ্যান দিদি, তবু পারব না। মা সরস্বতীর দিব্যি, পঞ্চাশে কেনা। আপনাদের দিতে পারলে আমারই তো ভাল লাগে। একটু যদি কাজে লাগতে পারি...

দোকানদার ছেলেটি যথেষ্ট সপ্রতিভ। বই বিক্রির চেয়ে সুন্দরী ক্রেতার সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়াতেই বেশি আনন্দ তার।

—থাক তাহলে। সুদেষ্ণা সরে এল দোকান থেকে।

শ্যাওলা-সবুজ চাদর জড়ানো ছেলেটা শেষবারের মত মরিয়া চেষ্টা করল,

—দিদি, লাস্ট দর পঞ্চান্ন, কোথাও আপনি এই বই এক পয়সা কমে পেলে আমার গলায় গামছা দিয়ে টাকা আদায় করে নেবেন।

—আমি থার্টির বেশি এক পয়সা দেব না।

বৃষ্টি তরলভাবে বলল, —নিয়ে নিলেই পারতিস্। অনেকগুলো চিংড়ির প্রিপারেশান ছিল দেখলাম। তোর পাইলট প্রন্ খেতে ভালবাসে বলছিলি না?

—নারে, জানিস না, এরা আমাকে চান্স পেলেই চিট্ করে। সেদিন মোঘল ল্যান্ড রেভেনিউ সিস্টেমের ওপর একটা বই কিনলাম, ওটা রণজয় আমার থেকে আট টাকা কমে কিনেছে।

শুভ কখন পায়ে পায়ে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে,

—কিরে, কিনলি না যে? দরে বনল না বুঝি?

—নাহ্। অনেক বেশি চাইছে।

—কত বেশি? তোর একদিনের গাড়ির তেলের খরচার থেকেও?

সুদেষ্ণা ভ্রূকুটি করল। তারপর বৃষ্টির দিকে ফিরে, কাঁধের ব্যাগ দোলাতে দোলাতে বলল, —কোথায় যাচ্ছিস? চল্ না একটু কফি হাউসে যাই। সুনীতা ওখানে একটা জাপানি ছেলেকে নিয়ে আসবে।

—কে সুনীতা? সুনীতা আগরওয়াল?

—না, সুনীতা চাওলা। ইকোর। জাপানি ছেলেটা নাকি থার্ড ওয়ার্ল্ডের এডুকেশন সিস্টেমের ওপর কাজ করছে। সোর্স মেটিরিয়াল চায়।

বৃষ্টির এই ধরনের কথাবার্তায় পিত্তি জ্বলে যায়। একটা মিজিগুচি বা টাকাশিমা ভিখিরির দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নানা রকম থিসিস্ লিখে যাবে, তা নিয়ে এত আদিখ্যেতা করার কি আছে? সুনীতা চাওলা মেয়েটা পারেও বটে। ভালমামা এসব আদিখ্যেতার কথা শুনলেই রেগে যায়। বলে, স্লেভ্ মেন্টালিটি। কিছু কিছু মানুষের জন্য পৃথিবীটাই আর বাসযোগ্য থাকবে না। বৃষ্টি মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করল,

—নারে, আমি আর শুভ একটা জায়গায় যাব।

সুদেষ্ণা রাস্তা পেরিয়ে যেতে বৃষ্টিরা বউবাজার মোড়ের দিকে এগোল।

শুভ বলল, —আজ সিনেমা থাক্। চল্, তোকে আজ রাজীবদের আড্ডায় নিয়ে যাই। দেখবি কত হৈচৈ, হুল্লোড়, মস্তি...একটা অন্য লাইফ...

ঝাঁচকচক একটা নতুন বাড়ির দোতলার ফ্ল্যাটের বেল টিপল শুভ। জিন্‌সের ওপর কালো পুলওভার পরা এক কুচকুচে কালো মেয়ে দরজা খুলেছে। শুভকে দেখেই তার মুখে এক গাল হাসি,

—হাই বিগ ম্যান্। তিন চার দিন ডুব কেন?

শুভ বৃষ্টিকে দেখাল, —মিট্ বৃষ্টি। আমার ক্লাসমেট্। অ্যান্ড দিস ইজ জিন্ডা। জয়ন্তী সেন।

জিন্ডা বলল, —হাই।

রাজীবদের ফ্ল্যাটে ঢুকেই প্রথমেই চোখে পড়ে ধোঁয়াশামাখা এক বিশাল হলঘর। এত বিশাল যে বৃষ্টির মনে হল তাদের গোটা বাড়িটাই বুঝি এই হলে ঢুকে যাবে। ঘর জুড়ে ইতস্তত ছড়িয়ে দামি সোফাসেট, কোণে রঙিন টি ভি-তে হিন্দী ফিল্মের ক্যাসেট চলছে। তার সামনে তিন চার জন ছেলে, গোটা দুয়েক মেয়ে। কেউ সোফায় বসে নেই, সকলেই আরাম করে বসে দেওয়ালজোড়া পুরু কার্পেটের ওপর। দুটো ছেলের হাতে গ্লাস, গ্লাসে পানীয় টলটল করছে। বৃষ্টি আর শুভকে দেখে সকলেই ঘুরে তাকাল,

—হ্যালোও!

শুভ হাত নাড়ল।

জিন্ডা বৃষ্টিকে বলল, —দাঁড়িয়ে রইলে কেন? বোসো।

সোফায় শুভর পাশে বসে বৃষ্টি বলল, —ঘ্যাম্ ফ্ল্যাট তো রে! কি করেন রাজীবের বাবা?

—বিজনেস্। আমার বাবার ক্লায়েন্ট। এখানে থাকে না। হাওড়ায়।

শুভ বৃষ্টির কানে তথ্য ঢেলে চলেছে,—ছেলেই এ বাড়ির কেয়ারটেকার। একটা বুড়ো চাকরও থাকে। ভদ্রলোক মাঝে মাঝে ফুর্তি করতে আসে এখানে। আসার আগে রাজীবকে নোটিস পাঠায়, বেটা, আজ তুমি কাটো, আজ আমার পালা। অনেক ভি আই পি, টি আই পি আসে তখন। সরকারি। বে-সরকারি। আমলা। মিনিস্টার। আমার বাবাও আসে। খুব নাচাগানা, খানাপিনা—…বলতে বলতে এক চোখ বন্ধ করে বিচিত্র অর্থপূর্ণ মুদ্রা করল শুভ।

পাশের ঘর থেকে এক যুবককে তাদের দিকে আসতে দেখে শুভ কথা থামাল। এই শীতেও ছেলেটা শুধু একটা বুকখোলা টিশার্ট পরে আছে, জিনসের প্যান্টে অসংখ্য তালি, এক কানে দুল চকচক করছে। ঘরে অনেকের গায়েই যদিও গরম পোশাক নেই তবু এর পোশাক যেন একটু বেশি বেপরোয়া। বৃষ্টির পাশে এসে নির্দ্বিধায় বসে পড়ল।

শুভ বলল, —বৃষ্টি। শী ইজ্ বৃষ্টি রায়।

ছেলেটা চকচকে হাসি হাসল, —দারুণ নাম তো! আমি জিমি। জীয়ন মুখার্জি।

বৃষ্টি আলতো হাসল। যার ফ্ল্যাট সে কোথায়? রাজীব?

জিমি বুঝি বৃষ্টির মনের কথা বুঝতে পারল, —চলো, ভেতরে চলো। রাজীবটার খুব মাথা ধরেছে। টেকিং রেস্ট্।

পাশের বড় সুসজ্জিত ঘরে প্রকাণ্ড খাটে পাজামা-পাঞ্জাবি পরে শুয়ে ছিল রাজীব। রাজীবের মুখ বেশ কমনীয়, প্রায় মেয়েলি, মুখ দেখে পনেরো-ষোল বছরের বেশি বলে মনে হয় না।

প্রথমে পরিবেশটা অস্বস্তিকর ঠেকলেও, ছেলেমেয়েগুলোর আন্তরিকতায় বৃষ্টি কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ সাবলীল হয়ে উঠল। রাজীব ছেলেটা তো এমন ভাবে কথা বলছিল যেন বৃষ্টি তার কতদিনের চেনা। ছোট্টখাট্টো মিষ্টিমুখ নিধি কার্লেকার একটা গ্লাস দিতে চাইল বৃষ্টিকে,

—চলবে?

বৃষ্টি বলল, —নো, থ্যাংকস্।

—চলে না বুঝি?

—চলে না আবার! শুভ ফুট কাটল, —নেতারহাটে গিয়ে এক ওয়াটার বটল্ ভর্তি মহুয়া একাই সাফ করেছে…

বৃষ্টি লজ্জা পেল। নেতারহাটে সত্যিই বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিল। পরদিন কি কষ্ট! রাঁচি পৌছে টি এম তো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান আর কি। কিন্তু এই মুহূর্তে তার ড্রিঙ্ক করতে একটুও ইচ্ছে করছে না। আবার এরা তাকে গাঁইয়া, আনস্মার্ট ভাবুক সেটাও ভাবতে ভাল লাগল না। বৃষ্টি ব্যাগ থেকে সিগারেট বার করে ধরাল,

জিমি জিজ্ঞাসা করল, —প্লেন্?

বৃষ্টি প্রথমটা মানে বুঝতে পারেনি, বলে ফেলল, —না, ফিল্টার।

রাজীব জোরে হেসে উঠল, —জিমি জিজ্ঞেস করছে প্লেন সিগারেট, না ভেতরে মালমশলা কিছু আছে?

গাঁজা টাজার কথা বলছে নাকি!

—না, না, প্লেন।

জিমি একটা সরু সিগারেট বাড়িয়ে দিল, —লাইক টু হ্যাভ ওয়ান?

বার বার না বলা যায় না। বৃষ্টি কাঁধ ঝাঁকাল,

—শিওর। হোয়াই নট?

প্রথম টানটা দিতেই বুকে সজোরে ধাক্কা। এ ধাক্কা কলেজে প্রথম দিন সিগারেট খাওয়ার ধাক্কার থেকেও অনেক বেশি প্রবল। নিশ্বাস বন্ধ করে ধাক্কাটাকে হজম করল বৃষ্টি। ধোঁয়াটাও। দ্বিতীয় টান, তৃতীয় টানে...আহ্, সব মুছে যাচ্ছে মাথা থেকে। সব। মা, বাবা, দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা বিষাদ সব মিলিয়ে গেল মহাশূন্যে। বৃষ্টি আবারও টান দিল। ভাসছে। ভাসছে। মহাশূন্যে পাক খেয়ে চলেছে। পৃথিবী নেমে গেল অনেক নিচে। রাজীব, জিমি জিন্ডা, শুভ ইন্দ্রজিৎ নিধি সবাই ভেঙেচুরে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। বোতলের ভূতের মত দেখাচ্ছে সকলকে।

বৃষ্টি খিলখিল করে হেসে উঠল। এই কি সুখ!

পর পর কয়েক দিন কলেজ থেকে সোজা রাজীবদের ফ্ল্যাটে হাজির বৃষ্টি। দু-দিন তো শুভকে ছাড়াই। সন্ধেবেলায় একটা সাজানোগোছানো ঘরে এক ঝাঁক ছেলেমেয়ের সঙ্গে দিব্যি সময় কেটে যায়। বিকেলের পর আর কি করি কি করি ভাবটা নেই। এ ওর পিছনে লাগছে, ক্রিকেট ফুটবল টেনিস নিয়ে গলা ফাটাচ্ছে কেউ, কেউ রাজনীতি নিয়ে। কোন ব্যাপারেই কেউ বেশি গভীরে যায় না। পালকের মত হাল্কা জীবন। ভাসো। শুধু ভেসে থাকো। তাদের পাড়ার সায়নদীপ ছেলেটা রামবোকা। খেলা নিয়ে সিরিয়াস, শরীর নিয়ে সিরিয়াস, জীবন নিয়ে সিরিয়াস। সেদিন দেখে মনে হয়েছিল মাকে নিয়েও সিরিয়াস। যেভাবে মার পিঠে হাত দিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকে গেল! মাঝে একদিন সকালে মুখোমুখি পড়ে যেতে বৃষ্টি ভদ্রতা করে জিজ্ঞাসা করেছিল,

—তোমার মামা কেমন আছেন?

ছেলেটার চোয়াল এমন ঝুলে পড়ল যেন মারাই গেছেন ভদ্রলোক। বলল,—বাঁদিকটা পড়ে গেছে। কি করে যে মামিমার চলবে এখন!

সেদিন সারা সন্ধে ভোঁ হয়ে বসে বৃষ্টি ভেবেছে আর হেসেছে। হেসেই গেছে নিজের মনে। ছেলেটাকে ভুগতে হবে। ভাবতে ভাবতে বৃষ্টি ক্রমশ ডুবে গেছে চড়া পাশ্চাত্ত্য বাজনায়। মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে অবশ।

দিনগুলো একই রকমের বর্ণহীন, সন্ধ্যাগুলো সম্মোহক। এভাবেই অনন্তকাল কেটে যেতে পারত বৃষ্টির। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। নিস্তরঙ্গ পুকুর জানতেও পারে না কোথা থেকে ছোট্ট ইঁটের কুচি এসে শান্ত জলকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়।

রাস্তা থেকেই অনেক কটা গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল বৃষ্টি। খুনখুনে গলার হাসিটা শুনে চিনতে পারল। শিপ্রা হালদার। শান্তিনিকেতন থেকে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বেড়িয়ে আসার পর বাড়িতে আজ আড্ডা বসিয়েছে।

বৃষ্টি বাইরে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছে করছে না।

কদিন ধরেই সামনের পার্কটা আলোয় আলোময়। শীতকালীন হ্যান্ডিক্র্যাফ্‌ট্‌সের মেলা বসেছে। ওপাশের টেনিসকোর্টে যথারীতি সান্ধ্য ক্রীড়ার আসর। রনিদের বাড়ির দৈনিক চিৎকার শব্দ আর আলোতে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

সুধা দরজা খুলে দিতে বৃষ্টি ঘরের দিকেই যাচ্ছিল, ফিরোজ পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখে ফেলেছে তাকে,

—কেরে বিড়ালের মত পা টিপে টিপে ভেতরে যায়? আয় এদিকে।

বৃষ্টি অনিচ্ছা সত্ত্বেও ড্রয়িংরুমের দরজায় এসে দাঁড়াল।

মা, ফিরোজ আঙ্কল, রমেন মামা, শিপ্রামাসি সোফায়। ভালমামা জানলার কাছে, হুইল চেয়ারে।

—তোকে যেন একটু শুকনো শুকনো লাগে!

অন্যদের দিকে তাকানোর আগে মার সঙ্গেই যে কেন চোখাচোখি হয়ে গেল! বৃষ্টি তাড়াতাড়ি চোখ ঘুরিয়ে নিয়েছে ফিরোজের দিকে,

—ড্যাম টায়ার্ড। তোমার আর্টিস্ট কলোনির খবর কি বলো? কবে ইনগরেশন?

—হবে শীগগীরই। লাল ফিতের ফাঁসে একটু ফেঁসে আছে। তা সিনরিটা, তুমি এত রাত্রে কোথ্‌থেকে? কোন রাখাল বালকটালক জুটেছে নাকি?

রমেন জোরে হেসে উঠল,

—হোয়াট এ স্ট্রেনজ কোয়েশ্চন ফিরোজ? এই বয়সে রাখাল বালক আসবে তো কি আমাদের মত আধবুড়ো ভামেরা চারদিকে নেচে বেড়াবে?

ফিরোজ আঙ্কলের মুখে লালচে আভা, ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমে আছে কপালে, মাঘ মাসেও। রমেনমামার হাসিটাও বেশ অস্বাভাবিক। দুজনেই মনে হয় টিপ্‌সি আছে।

বৃষ্টি ঠোঁট টিপে হাসল, —ইস্, রাখাল বালক কি জীবনের মোক্ষ নাকি? আমিও তোমাদের মতই আড্ডা মারছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে।

শিপ্রা আবার খুনখুনে হাসি ছিটিয়ে দিল,

—ওয়েল সেড ডার্লিং। আয়, তুই আমার পাশে আয়, তোকে কতদিন আদর করিনি।

বৃষ্টির গা গুলিয়ে উঠল। শিপ্রামাসি এমন চকাৎ চকাৎ শব্দ করে চুমু খায়! বৃষ্টির আপত্তি কি টের পেল জয়া? আচমকা বলে উঠেছে,

—আমরা কিন্তু পয়েন্টটা থেকে সরে গেলাম। যে কথা হচ্ছিল...

ফিরোজ বলল,—বোস্ বৃষ্টি, তুইও শোন। তোর মা একটা ভাইটাল প্রশ্ন তুলেছে। ট্র্যাডিশনাল ভ্যালু বলে কিছু থাকবে, কি থাকবে না।

শিপ্রা অ্যাশট্রেতে সিগারেট গুঁজল,—আমার তো মনে হয় ট্র্যাডিশনাল ভ্যালু শব্দটারই কোন মানে হয় না। মরালিটির কি কোন রিজিড ডেফিনেশান থাকতে পারে? বাচ্চা মেয়েটা রয়েছে, তাও বলি, ভিক্টোরিয়ান যুগে তো চেয়ার টেবিলের পায়াকে পর্যন্ত কাপড় পরাত ব্রিটিশরা, এখন তাদের গিয়ে দ্যাখো, হামলে পড়ে সব পিপ্ শো দেখছে। দুনিয়ার যতরকম নষ্টামি সব করছে প্যারিসে গিয়ে। ওদের দেখাদেখি আমাদেরও এই দুমুখোপনা।

ফিরোজ সোফায় হেলান দিল, —আমি বাবা অত ভ্যালুজ, মরালিটি বুঝি না। যা করতে মন চায় না, সেটাই অন্যায়, অশালীন ব্যস্। মনই হল গড। কন্‌সেন্সই আসল। নীতিফিতি বলে কিস্যু নেই।

বাবলু জানলা থেকে মুখ ঘোরাল, —তার মানে একটা সোসাইটির নিজস্ব সংস্কার, মূল্যবোধ সব মিথ্যে?

রমেন বিশেষ কথা বলছে না। বাবলুর প্রতিটি কথা শুধু ঘাড় নেড়ে নেড়ে সমর্থন করে যাচ্ছে।

—আহা, মূল্যবোধ কেন মিথ্যে হবে? ফিরোজ সোজা হল, —তবে মূল্যবোধ ভাঙতেই পারে। সোসাইটির যে কোন ক্রাইসিসে…

—এই, এইটাই হল আসল কথা। বাবলু রীতিমত উত্তেজিত হয়ে পড়েছে,

—তাহলে আগে খুঁজতে হবে ক্রাইসিস্‌টা কেন এল, কি ভাবে এল। এখন আমরা এমন একটা অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যেখানে অর্ধেক মানুষই যা বিলিভ করে সেটা করে না। এক ধরনের হিপোক্রেসি...

—রাইট্! দ্যাখো গে যাও, যে ব্যাটা দিনে মার্কসিস্ট্, রাত্রে সেই ইনডাসট্রিয়ালিস্টের পেয়ালা থেকে মাল খাচ্ছে। চল্লিশ বছর আগেও, এ দৃশ্য কল্পনা করা যেত? তাদের অনড় ভ্যালুজ যদি বদলে যেতে পারে, মধ্যবিত্তের মূল্যবোধ ভাঙবে না কেন? চোখের সামনে মানুষ যা দেখে, তাতেই রিঅ্যাক্ট করে।

শিপ্রা আরেকটা সিগারেট ধরাল, —এই যে কথা আর কাজের কন্ট্রাডিকশন, এতে ভ্যালুজে ঘা লাগবেই। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা। এর থেকে আমাদের পরের জেনারেশান কি শিখছে? আমাদের ছেলেমেয়েরা?

গুরুগম্ভীর কথার ঝাপটায় বৃষ্টির মাথা ভারী হয়ে আসছিল। ফুরফুরে মেজাজটা থিতিয়ে আসছে। তার উপস্থিতি নিয়ে এরা কেউই তেমন আর সচেতন নয়।

ফিরোজ বলল, —মাইরি তোরা বিশ্বাস করবি না, সেদিন ভোরবেলা আমাদের বাড়িতে এক মহিলা এসে উপস্থিত। বছর পঞ্চাশ বয়সেও চেহারায় দিব্যি চেকনাই...

রমেন প্রশ্ন করল, —রেণুকা কাপাডিয়া? খুব ফর্সা?

—না, না, মিসেস কাপাডিয়াকে আমি চিনি। তার ওরকম কুড়ি কুড়ি হাবভাব নেই। ···বলে কিনা, ছবি দিন, নতুন গ্যালারি খুলছি, এগজিবিশান করব। আমি তো হাঁ। চিনি না, জানি না···

—তুমি কি বললে?

—বলোম, আপনি জানলেন কি করে এ বাড়িতে একটা আঁকিয়ে থাকে? উত্তর শুনে আরও তাজ্জব। বলে, খাম্বাজ গ্যালারির মিসেস জিন্দাল নাকি ওকে বলেছে ফিরোজ আনোয়ার নামে একটা লোক ছবিটবি আঁকে, ব্যাটার বাজারদর নাকি বেশ ভাল।

জয়া বলল, —মনে হচ্ছে লক্‌শমি সুব্রামানিয়ম। থিয়েটার রোডে নতুন গ্যালারি খুলেছে।

—লক্ষ্মী সরস্বতী বুঝি না, মহিলা না হলে আমি নির্ঘাত দোতলা থেকে ফেলে দিতাম। আর্টকে তোরা কোন পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছিস ভাব। স্রেফ কমোডিটি। নাথিং মোর দ্যান স্নো পাউডার।

জয়া বলল, —এটা তুই ঠিক বলছিস না। সর্বত্রই এ জিনিস চলে। তুই ছবি আঁকতে পারিস; সে করছে তার বিজনেস। দোষটা কোথায়?

—দোষ তাদের বলছি না তো, দোষ আমাদের। যেভাবে ফরমাশ আসছে···আচ্ছা তুই বল না, এই যে তুই ফরমাইশি কৃষ্ণ রাধা এঁকে যাস্···এসব আঁকতে তোর নিজের ভাল লাগে?

—না লাগার কি আছে? আর্ট ইজ আর্ট। বিক্রি হলেও। না হলেও।

ফিরোজ লম্বা নিশ্বাস ফেলল,

—তুই অনেক বদলে গেছিস জয়া।

একটা কথাতেই ঘরের আবহাওয়া ভারী হয়ে গেল।

বৃষ্টির এতক্ষণে মজা লাগছিল। ফিরোজ আঙ্কল ভাল টাইট দিয়েছে মাকে। মা গুম। টুক করে দরজা থেকে সরে গেল বৃষ্টি।

সুধা রান্নাঘর থেকে ডাকল,

—তুমি কি এখন খেয়ে নেবে? না পরে সবার সঙ্গে?

বৃষ্টির খিদে পাচ্ছিল। বলল, —আমাকে এখনই দিয়ে দাও।

ঘরে ফিরে সালোয়ার কামিজ ছেড়ে নাইটি পরে নিল। আজকাল নিজের ঘরে ঢুকলেই শরীরে তার এক ধরনের কষ্ট হয়, বুকে যেন দম আটকানো অনুভূতি। এ সময় ঘরে বসে টানা দুখানা সিগারেট খেয়ে মানসিক স্থিরতা নিয়ে আসে সে। আজ মনটা তত ভার ভার নেই। সিগারেট ধরাল না। নিজের মনে সুর ভাঁজতে ভাঁজতে খাবার টেবিলে এল। সুধা খাবার দিয়ে দিয়েছে।

বৃষ্টি চামচ করে ফ্রায়েড রাইস মুখে তুলছিল, সুধা এসে দাঁড়াল,

—তোমার একটা ফোন এসেছিল।

—কার ফোন?

—নাম বলেনি। মেয়েছেলের গলা। খালি জিজ্ঞাসা করল তুমি বাড়ি আছ কিনা। নেই শুনেই রেখে দিল।

ওফ্। এই মেয়েছেলে শব্দটা কিছুতেই সুধামাসির জিভ থেকে সরানো গেল না।

—কটার সময় করেছিল?

—সাড়ে সাতটা হবে। টিভিতে বাংলা খবর চলছিল তখন।

কে ফোন করতে পারে! মীনাক্ষি কদিন ধরে কলেজে আসছে না। কিন্তু মীনাক্ষিদের বাড়িতে তো ফোন নেই! হঠাৎই স্নায়ুতে বিদ্যুৎঝিলিক। আজ পঁচিশে জানুয়ারি না! বাবার জন্মদিন! সেদিন ফোনে কথা কাটাকাটি করার পর একবারও বৃষ্টি বাবাকে ফোন করেনি, শনি রবিবারে দেখাও করতে যায়নি, বাবার ফোন এলেও ধরেনি পারতপক্ষে।

বাবা কী রীতাকে দিয়ে ফোন করিয়েছিল!

বৃষ্টি ঝটপট খাওয়া শেষ করে ডায়াল ঘোরাল,

—হ্যাপি বার্থডে বাবা। সরি, লেট হয়ে গেল।

সুবীরের গলায় প্রচ্ছন্ন অভিমান, —বেটার লেট দ্যান নেভার। কেমন আছিস?

—ভাল। ফাইন্। তোমার শরীর কেমন?

—ঠিক আছে।

—বাই দা বাই, রীতাআন্টি কি আমাকে ফোন করেছিল?

—তা তো জানি না। দেখছি জিজ্ঞাসা করে···

রিসিভার ধরেই বাবা রীতাকে ডাকাডাকি করছে। ভাসা ভাসা মেয়েলি গলা শোনা গেল, কথা বোঝা যাচ্ছে না। ড্রয়িংরুমে এত জোরে জোরে হাসছে সবাই! ভালমামাও। ভালমামা এখনও এত জোরে হাসতে পারে! রবিবার অকারণে কি চিল্লান না চিল্লালো!

এক দৃষ্টে অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ দেখছিল ভালমামা, একটা অ্যাঞ্জেল অবিকল মার মত নিস্পৃহ মুখে গোমড়ামুখো রেডসোর্ড টেলের দিকে তাকিয়ে। কেঁচো রাখার ভাসমান পাত্র প্রায় খালি। জলে অনর্গল বুদবুদ। টিভি বোবা।

বৃষ্টি গায়ে পড়ে ভাব জমানোর চেষ্টা করতে গিয়েছিল,

—তোমার আজ রুটিন ব্রেক? অ্যাকোয়ারিয়াম তো তুমি দুপুরে দ্যাখো?

বাবলুর চোখের পাতা নড়েনি।

—টিভি চালিয়ে দেব? সাদ্দাম হোসেনের খবর নেবে না?

—একদম ফাজলামি মারবে না। বাবলু আচমকা ফেটে পড়েছিল,—টিভিটা কাল থেকে খারাপ হয়ে পড়ে আছে, সে হুঁশ কারুর আছে? একজন শান্তিনিকেতনে গিয়ে মজা করছেন, আরেকজন বাড়িতেই থাকেন না···

—ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখছ না কেন?

—ন্যাকামো হচ্ছে? জানো না আমি কালার টিভি দেখি না?

—সুধামাসিকে বললেই পারতে। মনোহর পুকুরের দোকানটায় খবর দিয়ে আসত।

—কেন? সব কথা বলতে হবে কেন? আক্কেল নেই কারুর? সবাই যে যার মত আরামে রয়েছে, কারুর তো কোন সুখের অভাব দেখি না। শুধু আমার ব্যাপারেই···

বাবা নয়, রীতা কথা বলছে ফোনে, —হ্যালো বৃষ্টি, হ্যাঁ আমিই ফোন করেছিলাম।

বৃষ্টির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

—তুমি তো প্রতিবছরই এদিন বাবার কাছে আসো, এবার কোন খোঁজখবর নেই, ভাবলাম তোমার শরীরটরীর খারাপ হল কিনা··তোমার বাবা সারাদিন ধরে তোমার জন্য ছটফট করছে। ···মুখে কিছু বলছে না···

বৃষ্টি দড়াম করে রিসিভার নামিয়ে রাখল। ঝরঝরে মেজাজ নিমেষে বিস্বাদ হয়ে গেছে। ওই মহিলার ন্যাকাপনা এবার বন্ধ করতে হবে।

বৃষ্টি ঘরে এসে সশব্দে দরজা বন্ধ করল। সিগারেট ধরাল একটা। সুধা ঠিকই বলেছে! মেয়েছেলে! মেয়েছেলেই তো!

মেয়েছেলে। মেয়েছেলে। মেয়েছেলে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%