পঞ্চদশ অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

পরদিন বিকেলের দিকে নিখিলকে অফিসে ফোন করল জয়া।

টিফিনের পর এই সময়টাতেই ঘণ্টাখানেক নিখিল পাগলের মত কাজে ডুবে থাকে। সরকারি অফিসের রীতিমাফিক এখনও টিফিনের রেশ চলছে সর্বত্র। কেউ খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছে, কেউ ঝিমিয়ে নিচ্ছে টুক করে, নিছক অলস মুখেও বসে কেউ কেউ। একদল সামনের ইলেকশানে ভি পি সিং, রাজীব, চন্দ্রশেখর, আদবানির ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা জুড়েছে। রাজ্য নির্বাচন নিয়ে এবার কেউ তেমন আগ্রহী নয়, যেন ফলাফল সবারই জানা। দু চারটে ছেলেছোকরা সিনেমা ফুটবল নিয়ে যে মেতে নেই, তা নয়। মেয়েরা সজ্জা, রান্না আর পরনিন্দা পরচর্চায় মুখর। এই পরিবেশে নিখিলকে কর্মরত দেখলে কেমন বেমানান লাগে। অবশ্য বাকি কোন সময়ই অফিসে নিখিলের টিকি দেখা যায় না।

নিখিল বিরক্ত হল। কাজের সময় কোনরকম বাধা সে পছন্দ করে না। তার টেবিল জুড়ে ডিজাইনিং পেপার, কম্পাস, সেট্-স্কোয়্যার, স্কেল। কয়েকটা তুলি, দুচারটে ছোট রঙের শিশি, টিউব। একটা শাড়ির ডিজাইনের কাজ আজ তাকে শেষ করতেই হবে। তার মাঝে এই ফোন...।

নিখিল অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠল। জি এম-এর দশ বাই ছয় কিউবিক্‌লের সুয়িং ডোর ঠেলেছে। জি এম সামনে বসা লোকটার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই রিসিভারের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন। ইঙ্গিতে বললেন, ভদ্রমহিলা।

নিখিল টেবিলের দিকে পিছন করে দাঁড়াল।

—কি ব্যাপার জয়া! তুই!

—কি করছিস্?

নিখিল আড়চোখে একবার জি এমকে দেখে নিল,

—ভীষণ সিরিয়াসলি কাজ করছি।

—একটু আসতে পারবি? আজ?

—কোথায়? তোর বাড়িতে?

—না। কলেজে চলে আয়। তোকে আমার খুব দরকার। নিখিলের সন্দেহ হল,

—তোর গলাটা এরকম লাগছে কেন রে? কিছু হয়েছে নাকি? এনি অ্যাক্সিডেন্ট?

—না, না, তেমন কিছু নয়। তুই একবার আয় না প্লিজ্।

নিখিল ঘড়ি দেখল,—ঠিক আছে, চারটের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি।

ফোন রেখে জি এম-এর দিকে তাকিয়ে একগাল হাসল নিখিল। ভদ্র লোক গোমড়া হয়ে গেছেন। দশ আঙুলে বিলি কাটছেন নকল চুলে,

—আজকেও তাহলে ডিজাইনটা পাচ্ছি না?

—কাল দিয়ে দেব। এত তাড়া করছেন কেন? সবে নতুন ফিনানশিয়াল ইয়ার পড়েছে, তার ওপর কদিন পরেই ইলেকশন, এখন কি আর তাঁতীদের দিয়ে কাজ ওঠাতে পারবেন?

—কাল ঠিক দিচ্ছেন তো?

—নিখিল দত্ত রায় যা বলে তাই করে।

নিখিল দরজা দুলিয়ে বেরিয়ে এল। এই সব সরকারি আমলাগুলোর পাকা পাকা ভাবভঙ্গি দেখলেই তার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। লোকটার মাথার পরচুলটা একদিন টেনে খুলে দেওয়ার ইচ্ছা আছে নিখিলের। তারপর রিজাইন করবে চাকরি থেকে। মাথায় চুল না লাগানো থাকলে কী বিকট যে লাগে লোকটাকে। একদিন বাথরুমে নিখিল দেখে ফেলেছিল। রুমাল দিয়ে চকচকে টাক মুছছিলেন ভদ্রলোক। একটা গোল হুলো বেড়ালের মত মুখ, মাছি-গোঁফ...! এই অফিসেই কি না কাজ করে যেতে হয় তাকে।

আরতি জেদ না করলে থোড়াই করত এ চাকরি। আজকাল আর্টিস্টদের বাজার খুব খারাপ না। অনেকগুলো আর্ট গ্যালারি হয়ে গেছে। বছরে চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার টাকার ছবি তো হেসে খেলে বিক্রি হয়ে যায়। সঙ্গে দু চারটে ফরমাইশি কাজ করতে পারলে তো কথাই নেই! জয়াও চাকরিতে ঢুকল, তাদের ইন্টিরিয়ার ডেকরেশনের ব্যবসাটাও উঠে গেল। জয়টা দিব্যি এখন ছবির জগতে ডুবে গেছে। মিডিয়ার সঙ্গেও যথেষ্ট ভাল সম্পর্ক রেখে চলে। রমেন সাহা আর সফিকুল হোসেন তো এক সময় দারুণ ব্যাক্ করেছিল জয়াকে। নিখিলের বরাবরই কপালটা খারাপ। লাস্ট এগজিবিশনেও জয়ার ছবি বিক্রি হল আঠেরো হাজারে, পোলিশ কনস্যুলেট থেকে কিনল। আর নিখিলের ছবি নিল বাংলাদেশ কনস্যুলেট। এগারোতে। ভাবতে গেলেই বুকটা মাঝে মাঝে চিনচিন্ করে ওঠে নিখিলের। পরক্ষণেই নিজেকে ধমকায়, ছিঃ নিখিল, জয়া না তোমার কত দিনের বন্ধু।

জয়ার জন্য নিখিলের সব সময়ই খারাপ লাগে। কি করে যে ওইরকম একটা হাম্‌বাগের পাল্লায় পড়েছিল। প্রথম দিন থেকেই তার সুবীরকে চালিয়াত ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি। কথার যাদুতে বশ করে ফেলতে ওস্তাদ। বিয়েটা ভেঙে শাপে বর হয়েছে। কত স্বাধীন ভাবে কাজ করছে জয়া। এক সময় যা দিন গেছে বেচারির। তার মধ্যেও মনের জোর কি সাংঘাতিক। রাতের পর রাত জেগে ছবি এঁকে গেছে। সত্যি কথা বলতে কি, নিখিলের মনে হয়, মানসিক বিপর্যয়ের সময় থেকেই জয়ার ছবি অনেক বেশি পরিণত হয়েছে। এমন চমৎকার রঙের কাজ করে একেক সময়।

বাথরুম থেকে মুখে জল দিয়ে এসে ব্রাশ, তুলি, স্কেল সব ড্রয়ারে ঢুকিয়ে চাবি দিল নিখিল, শান্তিনিকেতনী ব্যাগ ঝুলিয়ে নিল কাঁধে। কি হতে পারে জয়ার? বাবলুর কিছু হল নাকি? না বৃষ্টির? সেই কলেজে পড়ার সময় থেকে জয়ার জীবনের সমস্ত ওঠা পড়া তার চোখের সামনে ঘটে গেছে। বিয়ের সাক্ষী তো বটেই, ডিভোর্সেরও। বৃষ্টির কাস্টডি নিয়ে মামলা চলাকালীন জয়া যখন মাঝে মাঝে হতাশায় ভেঙে পড়ত, এক মুহূর্তের জন্যও সে দুর্বল হতে দেয়নি জয়াকে। জয়াও কম করেনি তার জন্য। জয়া না থাকলে আরতির সঙ্গে বিয়েটাই ভেঙে যেত তার। হিস্টেরিক আরতিকে জয়াই ঠাণ্ডা মাথায় সামলেছে। একেই কি বন্ধুত্ব বলে? যদি তাই হয় তবে কেন জয়ার খ্যাতিকে ঈর্ষা করে সে? হীনম্মন্যতাবোধ?

ওয়েলিংটন থেকে বাসে এসে বাকি রাস্তা হেঁটেই মেরে দিল নিখিল। জয়া স্টাফরুমে ছিল। নিখিলকে দেখেই বেরিয়ে এসেছে। জয়াকে দেখে রীতিমত ঘাবড়ে গেছে নিখিল। তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল কলকাতা তিনশ’র এগজিবিশনে। একটু অন্যমনস্ক ছিল যেন সেদিন। নিখিল জিজ্ঞাসাও করেছিল; এড়িয়ে গেছে জয়া। সেদিনও তো এত খারাপ লাগেনি জয়ার মুখ চোখ!

—কি হয়েছে তোর? এরকম দেখাচ্ছে কেন তোকে? চোখের নিচে কালি! মুখ শুকনো?

কলেজের গেট থেকে বেরিয়ে জয়া এক নিশ্বাসে বলে ফেলল,

—বৃষ্টিকে নিয়ে খুব প্রবলেমে পড়েছি। ও একদম পাগল হয়ে গেছে।

—কেন? কি হয়েছে?

—উন্মাদের মত আচরণ করছে। কোন কথা শুনছে না। চল্, কোথাও বসে বলছি।

রাসেল স্ট্রিটের ছোট রেস্তোঁরায় বসে সব শুনে নিখিল একেবারে রুদ্ধবাক। বৃষ্টি নেশা করে বাড়ি ফিরছে। গালিগালাজ করছে জয়াকে! সুবীরের কাছে চলে যেতে চেয়েছিল! উত্তেজনায় পর পর কয়েকটা সিগারেট খেয়ে ফেলল নিখিল,

—তাই তোকে কদিন কোথাও দেখা যাচ্ছে না! ফিরোজের কলোনি শিলান্যাসের দিনও যাস্‌নি। সবাই তোর কথা বলছিল।

—ছাড়্ ওসব। এখন কি করা যায় তাই বল্। আমি কিছু ভাবতে পারছি না। আমারই হয়ত ভুল হয়েছে কোথাও। জয়ার গলা ধরে এসেছে। চোখের জল আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সে।

এই কি সেই বৃষ্টি যে আরতির গায়ের সঙ্গে লেপটে ছিল বৌভাতের দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা? আরও ছোটবেলায় ঝুলে পড়ত নিখিলের দাড়ি ধরে? ডায়মণ্ডহারবারের পিকনিকে গিয়ে কি নাচই না নেচেছিল ছোট্ট মেয়েটা। বড় নিশ্বাস ফেলে অ্যাশট্রেতে সিগারেট নেভাল নিখিল। মেয়েটার কি অসাধারণ ছবি আঁকার হাতও ছিল!

—শান্ত হ’। ভেঙে পড়লে চলবে নাকি? ভেবে চিন্তে একটা রাস্তা বার করতে হবে। সুবীরের সঙ্গে এই নিয়ে আর তোর কোন কথা হয়েছে?

—না। রোজই চার পাঁচবার করে ফোন করে মেয়েকে। মেয়ে ফোন ধরেই না। ধরবেই বা কখন? বাড়ি থাকলে তো। আমি কিছুই বলিনি আর। যদি কিছু একটা ভালমন্দ করে বসে! যদি হুট্ করে বাড়ি থেকে চলে যায়!

—দাঁড়া, দাঁড়া। যাবে কোথায়? গেলেই হল?

নিখিল গভীর ভাবে ভাবার চেষ্টা করছিল ব্যাপারটাকে। হয়ত বৃষ্টি ডিপ মেলানকলিয়ায় ভূগছে। অনেক সময় এরকম হয়। ডিপ্রেশন মনে অনেক দিন চেপে রাখলে হঠাৎ এভাবেই এক্সপ্লোড্ করে। নিজেকে ভীষণ নিঃসঙ্গ ভাবতে ভাবতে...

—আচ্ছা, কাদের সঙ্গে মেশে বল্ তো?

—ঠিক বলতে পারব না। কলেজেরই বন্ধুবান্ধব হবে। সেদিন একটা ছেলে ওর খোঁজ করতে এসেছিল বাড়িতে, দেবাদিত্য না কি যেন নাম, দেখে তো ভালই মনে হল ছেলেটাকে। মাঝে কদিন বৃষ্টি বাড়ির থেকে বেরিয়েও কলেজ যায়নি। সেসময়ই খোঁজ নিতে এসেছিল। পাড়াতেও একটা নতুন ছেলের সঙ্গে কথা বলে মাঝে মাঝে। কাল যখন ঝড় উঠল, তখন সেই ছেলেটাই তো বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেল বৃষ্টিকে। বাবলু বলছিল ছেলেটা নাকি ভাল ক্রিকেট খেলে।

—ওদের ডেকে কথা বলা যায় না?

—কে বলবে? বাবলু? ওকে তো তুই জানিস্‌ই। কখন কি মুড থাকে। আমারই হয়েছে জ্বালা, সবার মেজাজমর্জি বুঝে চলতে হয়। আমি কাউকে ডেকে কিছু বললে বৃষ্টি কি ভাবে রিঅ্যাক্ট করবে!... এদিকে পাড়াতেও তো টি টি পড়ে গেছে। পাশের বাড়ির অবিনাশ উকিল সেদিন তো রাস্তায় আমাকে ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কত কথাই শোনালেন। আমি কি করি বলতো?

নিখিল চুপ করে রইল। পাড়ার কোন ছেলে বা মেয়ে হঠাৎ বিপথে গেলে প্রতিবেশীরা মজাই পায়। যেন রসের খোরাক। তার ওপর সেই ছেলেমেয়ের মা যদি ডিভোর্সি হয় তবে তো সোনায় সোহাগা।

—তুই নরম করে ওর সঙ্গে একবার কথা বলে দেখেছিস? সমস্ত ব্যাপার জানতে চেয়ে?

জয়া দু দিকে মাথা নাড়ল। কি করে বোঝাবে বৃষ্টিকে দেখলেই এখন তার হাত পা কাঁপে। সব সময় যে অত উগ্র মেজাজে থাকে তার সঙ্গে নরম করে কথা বলা যায়ই বা কি ভাবে? চোখের সামনে মুহুর্মুহু সেই দৃশ্যটা ভেসে ওঠে। মেয়ে তার মুখের ওপর পা দোলাচ্ছে। কানে ওয়াকম্যান।

জয়ার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে এল। তাড়াতাড়ি রুমাল চেপেছে মুখে। মনে মনে বলছে, তোর জন্য সময় দিইনি কোনদিন। খুব অন্যায় হয়ে গেছে। সব সময় ফিরিয়ে দেব তোকে। একবার সুযোগ দে বৃষ্টি।

একটা সুযোগ দিবি না বৃষ্টি? আমি তোকে আমার কথাগুলো বুঝিয়ে বলতাম।

রিসিভার নামিয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করে উঠল সুবীর। মেয়েটা আজকেও বাড়ি নেই। প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে সুবীরের নিজের ওপর। কী কুক্ষণেই যে জয়ার সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিল। মেয়েটা বোধহয় সারা জীবনের মত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

সুবীর আলগাভাবে চেয়ারে হেলান দিল। ঝুঁকে জল খেল টেবিলের গ্লাস থেকে। মাথার ভেতরটা দপদপ করছে। এয়ার কণ্ডিশনড় ঘরে বসেও ঘামছে বিশ্রী ভাবে। টাইএর নট্ আলগা করল। বেল টিপে ডাকল বেয়ারাকে,

—এসিটা ফুল্ করে দাও।

—ফুল তো করাই আছে সার।

—তাই? ঠিক আছে যাও।

সুবীর শার্টের উপরের বোতামটা খুলে দিল। টয়লেটে গিয়ে মুখে জলের ঝাপটা দিল খানিকটা। আয়নায় মার্কেটিং ম্যানেজার সুবীর রায়কে কী বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে! পারচেজের নায়ার আজ সকালেই বলছিল,

—ইউ আর লুকিং সিক। টেক সাম্ রেস্ট ম্যান্।

সুবীর রায়ের বিশ্রাম কোথায়? বিশ্রাম, অবসর শব্দগুলো কবেই তো মুছে গেছে সুবীরের অভিধান থেকে। সেই ন্যায়রত্ন লেনের গলি থেকে একুশ বছর বয়সে সেলস্‌ম্যান হিসাবে জীবন শুরু। তারপর আর কোনদিন দাঁড়াবার সময় পেল কোথায়! সুবীর কোনদিনই স্রোতের মানুষ হতে চায়নি। স্রোতের মানুষ ভাসতে ভাসতে চড়ায় আটকে গেলে আটকেই থাকে। স্রোতের সঙ্গে নয়, সুবীর চেয়েছিল সে যেদিকে যাবে স্রোতকেও যেতে হবে সেদিকে। হায় রে মানুষের স্পর্ধা।

সুবীর আবার টেবিলে এসে বসল। কোয়ার্টারলি মার্কেটিং প্রজেকশানটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করছে।

বেয়ারা নিজেই ঢুকল,

—স্যার, আপনার দাদা এসেছেন দেখা করতে। আসতে বলব?

সুবীর ফাইল বন্ধ করল,—বলো।

সামনের চেয়ার টেনে বসেছে প্রবীর। মুখচোখ উসকো খুসকো, দু তিন দিন মনে হয় দাড়ি কামায়নি। নীল শার্ট বেশ ময়লা।

প্রবীরকে দেখেই সুবীরের মনে পড়ে গেছে কাশীপুর জুট মিলে লকআউট শুরু হয়েছে; কদিন আগেই কাগজে দেখছিল। তখনই মনে হয়েছিল একবার দেখা করে আসবে বাবা মা দাদা বৌদির সঙ্গে।

প্রবীর হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছে,

—ভাবিইনি তোকে এখন অফিসে পাব। এখানে হেড অফিসে আমাদের আজ গেট মিটিং ছিল। ফেরার পথে ভাবলাম একবার ঢু মেরে যাই। তুই তে অনেক সময় সন্ধের পরও থাকিস্।

—মিটিং-এ কি হল? চান্স আছে খোলার?

প্রবীর উত্তর দিল না। তাদের জুট মিল প্রায়ই বন্ধ থাকে। ছ মাস খোলা, তা ছ মাস বন্ধ থাকে। সে সময় দ্বারস্থ হতে হয় এই ভায়েরই। ভাই যদিও বিরক্ত হয় না তবু তার খুব খারাপ লাগে। কি করবে? এই বয়সে কোথায় আর...?

সুবীর জিজ্ঞাসা করল —বৌদির কি খবর? টুকাই বুকাই-এর পরীক্ষা কেমন হল?

—ওই এক রকম। বাবা মার শরীরটাই ভাল না। বাবাকে তো আজকাল না ধরলে হাঁটাচলাই করতে পারে না।

সুবীর নিজের হাতের দিকে অজান্তে তাকিয়ে ফেলল। তার কাঁপাটাও বাড়ছে একটু একটু করে। মানিব্যাগ থেকে টাকা বার করল,

—এটা রাখ্।

প্রবীর হাত বাড়াল না,—থাক্ না। এখনও আছে হাতে। লাগলে চেয়ে নেব।

—রাখ্। বাবার ওষুধও তো কিনতে হবে। পারলে মাকে একটা টনিক কিনে দিস।

প্রবীর মাথা নিচু করল। সুবীরের বুকটা কটকট করে উঠেছে। দাদাকে দেখলে আজকাল তার বড় মায়া হয়। কিছুই করে উঠতে পারল না জীবনে। খুব ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে মারপিট লাগলে কিভাবে বুক দিয়ে তাকে আগলে রাখত দাদা। সেই সম্পর্ক আলগা হতে হতে এখন শুধুই দায় ওঠানো। সম্পর্কের তবে এটাই কি শেষ ধাপ? মনে হলেই আবেগ প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করা সুবীর, কেমন বিহ্বল হয়ে পড়ে।

—আয় না একদিন আমার ওখানে। টুকাই বুকাই আর বৌদিকে নিয়ে। তোরা তো আর আসিস্‌ই না। দাদাদের সঙ্গে রাজার তো...

প্রবীর তবু মাথা নামিয়েই আছে। বৃষ্টির মতই তার মনের ছাপ অতি সহজেই মুখে ফুটে ওঠে। প্রবীর একটুও পছন্দ করে না রীতাকে। কেন যে করে না? জয়া ওর বেশি পছন্দের ছিল বলেই কি?

সুবীরও চুপ করে রইল।

প্রবীর খানিক পরে মাথা তুলেছে। একটু ভয়ে ভয়ে নিচু গলায় বলল,—তুইও তো বাড়িতে আসতে পারিস্। সেই লাস্ট কবে ডাক্তার নিয়ে গিয়েছিলি। বাবা মা তোকে খুব আশা করে। শোকাতাপা মানুষ, কবে আছে, কবে নেই।

সুবীর মৃদু হাসল,—ঠিক আছে, আজকালের মধ্যেই যাব একবার।

বেয়ারা চা দিয়ে গেছে। প্রবীর চায়ে চুমুক দিল।

—হ্যাঁরে, আমাদের মেয়েটা কেমন আছে রে? ফার্স্ট ইয়ার চলছে তাই না?

মা, বাবা, দাদা, বৌদি সকলের কাছেই বৃষ্টি এখনও ন্যায়রত্ন লেনের বাড়িরই মেয়ে। হক না সে মানুষ বালিগঞ্জে তার মায়ের কাছে। সম্পর্কের এই ধারাটা কি অদ্ভুত! সুবীর নিজেকে আর ন্যায়রত্ন লেনের বাড়ির ছেলে বলে ভাবতে পারে না, বৃষ্টিও থাকে না সুবীরের কাছে তবুও...।

হয়ত সম্পর্কের নিয়মই এরকম। অসংখ্য ঝুরিনামা বৃদ্ধ বট ভাবে সমস্ত ঝুরিগুলো তারই অংশ। এদিকে ঝুরিরা নিজেদের প্রাণরস নিজেরাই মাটি থেকে আহরণ করে চলেছে। তাদের মধ্যে দিয়েই বেঁচে আছে বৃদ্ধ বট। কখন যে তার নিজের কাণ্ড মরে গেছে, সে খেয়ালও নেই। তাছাড়া পুরোপুরি কোন সম্পর্ক বোধহয় ছেঁড়েও না। অদৃশ্য তন্তুতে কোথাও রেশ থেকেই যায়। নাহলে বাবা মা এতদিন পরেও কোন প্রসঙ্গে জয়ার কথা উঠলে বৌমা সম্বোধন করে কথা বলেন! অথচ রীতাকে রীতা।

সুবীর অন্যমনস্ক ভাবে মাথা নাড়ল,—ভালই আছে। চল্, উঠবি তো? তোকে ধর্মতলার মোড়ে নামিয়ে দিই। এখন তো এখান থেকে বাসফাসও পাবি না। সাড়ে সাতটা বাজতে যায়।

প্রবীরকে নামিয়ে দেওয়ার পর ড্রাইভারকে রেড রোড হয়ে, রেসকোর্স ঘুরে বাড়ি যেতে বলল সুবীর। হঠাৎ দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। অনেক দিন আগে, জয়ার সঙ্গে ডিভোর্স হওয়ার পর পরই, ছোট বৃষ্টিকে নিয়ে বাবা মার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। তাদের দেখে চিৎকার করে দোতলার বারান্দা থেকে জ্যাঠতুতো দাদা বলছিল জ্যাঠাইমাকে,

—ফেরিঅলাটা মেয়ে নিয়ে এসেছে দেখলাম? তা তোমাদের আদরের সুবুর বউটা আর কোন বেটাছেলে পাকড়াও করতে পারল?

ওইটুকু মেয়ে ঠিক বুঝে নিয়েছিল বিদ্রূপটা। তারপর থেকে কিছুতেই আর ও বাড়িতে যেতে চাইত না। সুবীর বললেও নয়। মেয়েটা বড্ড বেশি অভিমানী। সিটে হেলান দিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নেবার চেষ্টা করল সুবীর। জানলার নামানো কাচে হাত রাখছে বার বার। আজ এত হাওয়া কম কেন?... মেয়েটা কি আর কোনদিন কথা বলবে না তার সঙ্গে?

বাড়ির সামনে এসে গাড়ি দাঁড়িয়েছে। সুবীর ঘুমিয়ে আছে। ঘুমিয়েই আছে।

ড্রাইভার ডাকল,—সার, এসে গেছি।

সুবীর চমকে তাকিয়েছে। কখন এত ঘুমিয়ে পড়েছিল! থতমত চোখে তাকাল চারদিকে। ড্রাইভার দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে।

সুবীর ক্লান্ত পায়ে লিফ্‌টের সামনে এসে দাঁড়াল।

এখনও আর কত ওঠা নামা বাকি আছে জীবনের!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%