দ্বিতীয় অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

কালীঘাট মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই শব্দটা শুনতে পেল বৃষ্টি। ন’টা চৌত্রিশের ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকে গেছে। বৃষ্টি একটু অসহায় বোধ করল। আজ সে অন্য দিনের মত তাড়াহুড়ো করে নামতে পারবে না। শাড়িতে সে কোন সময়ই খুব স্বচ্ছন্দ নয়। স্কার্ট ব্লাউজ, সালোয়ার কামিজ বা প্যান্ট শার্টই তার নিত্য দিনের পোশাক। আজ সে ইচ্ছে করেই শাড়ি পরেছে। আজকে সে অন্য দিনের থেকে নিজেকে পৃথক করে রাখবেই।

আজ খুব সকালে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল বৃষ্টির। মধ্য হেমন্তের ভোরে তখনও ঘর জুড়ে ছড়িয়ে ছিল আগের রাতটা। দিন আসার আগে রাত শেষবারের মত ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে নিচ্ছিল সব কিছু। ভোরের দিকে এ সময় বেশ হিম হিম ভাব। এখনও যদিও সেভাবে জাঁকিয়ে ঠাণ্ডা পড়েনি, আসি আসি করেও শীত রোজ দোমনা হয়ে একটু করে এগোচ্ছে পিছোচ্ছে তবু সে যে আসছে সেটা স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। এ সময় ভোরের পৃথিবী সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ থাকে। এ সময় পৃথিবীতে সব কিছুই বড় পবিত্র। এরকমই একটা সময়ে বাইরে পাঁচিলের গায়ে একটা ছোট্ট পাখি পিকপিক ডেকে উঠেছিল। সেই ডাকেই চমকে বিছানায় উঠে বসেছিল বৃষ্টি। ঘুমের শেষ রেশটুকু কাটার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গিয়েছিল কথাটা। মুহূর্তেই শরীর জুড়ে অচেনা শিহরন, আশ্চর্য অনুভূতি।

... শী উইল বি ইন দা কাস্টডি অফ হার মাদার টিল শী অ্যাটেইনস হার এজ অফ এইট্টিন.....

যত দিন না বৃষ্টির আঠেরো বছর বয়স হয় ততদিন সে মায়ের হেপাজতে থাকবে। যত দিন না বয়স আঠেরো বছর হয়। যতদিন না..... তারপর? আঠেরো বছর বয়স হলে?

ওই শব্দ কটা এখনও বৃষ্টির মনের ভেতর ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। কেউ যেন ধাক্কা দিয়ে বার বার মনে পড়িয়ে দিচ্ছে কথাটা। আজকেই। তবে কি কথাটার বিশেষ কোন উদ্দেশ্য আছে! নইলে অত ভোরে আজ ঘুমই বা ভাঙবে কেন? জীবনে খুব কম দিনই এত সকালে ঘুম থেকে উঠেছে বৃষ্টি।

স্কুলে নবনীতা বলত,

—ঘুম হ্যাজ ফোর স্টেজেস। প্রথম রাতে নন্ র‍্যাপিড আই মুভমেন্টের ডিউরেশন বেশি, র‍্যাপিড আই মুভমেন্টের কম। ক্রমে র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট প্রোলঙড্ হতে থাকে, শেষ রাত্তিরে গিয়ে....

ভোরের বেলা প্রতিদিনই তো সে গভীর ঘুমে। নবনীতার ভাষায় পুরো নন্ র‍্যাপিড আই মুভমেন্টের স্টেজ। বেশির ভাগ দিনই আটটা নাগাদ সুধামাসি ঠেলেঠুলে তোলে তাকে।

নবনীতার কথা মনে পড়তেই বৃষ্টির অল্প মন কেমন করে উঠল। নবনীতা জে এন ইউতে চলে গেছে। অনেক দিন ওর কোন চিঠি আসছে না। বিজয়া গ্রিটিংসও আসেনি। নতুন বন্ধুবান্ধব পেয়ে বৃষ্টিকে ভুলেই গেছে হয়ত। স্কুলে থাকতে ওই যা একটু কাছাকাছি ছিল বৃষ্টির। তার বাইরে আর বিশেষ কেউ বৃষ্টির নিষেধের কাঁটাতার টপকে তেমন ঘনিষ্ঠ হতে পারেনি কখনও।

মন্থর পায়ে বৃষ্টি প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল। একটা ট্রেন চলে যাওয়ার পর দু-চার মিনিটও খালি থাকে না প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে অফিস টাইমে। ডাউনের এদিকটা গিজগিজ করছে মানুষে। তার মধ্যেই ক্লোজ সার্কিট টিভিগুলোতে যথারীতি রঙিন নাচাগানা চলেছে। ব্যস্ত সমস্ত অফিসযাত্রীরা কয়েক মুহূর্তের জন্য গিলে নিচ্ছে গভীর আবেগময় প্রেমের দৃশ্য। বৃষ্টি মুখ ঘুরিয়ে নিল। ওই সব ন্যাকা ন্যাকা জড়াজড়ি করা প্রেমের নৃত্য তার একদম সহ্য হয় না। প্রেম শব্দটাতেই এক ধরনের শারীরিক বিতৃষ্ণা আছে তার। এলোমেলো পায়ে সামনে একটু এগোতেই বৃষ্টির চোখ আটকে গেল আরেকটা টিভির ঠিক নীচে। সকালের সেই বিদ্‌ঘুটে ছেলেটা না! হ্যাঁ, ওই তো। ছেলেটা পাড়ায় নতুন এসেছে। বেশ ম্যাচো টাইপ ফিজিক, রুক্ষ তামাটে মুখ, সলিড গোঁফঅলা। নামটা জানা হয়নি এখনও। রনি পিকলুদের সঙ্গে দারুণ দোস্তি হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।

টিভি-র দিকে না তাকিয়ে ছেলেটা হাঁ করে তাকিয়ে আছে বৃষ্টির দিকেই। চোখাচোখি হতেই মুখ ঘুরিয়ে নিল। অন্যমনস্কতার ভান করছে! বৃষ্টির হাসি পেয়ে গেল। এ সমস্ত ভান রাস্তাঘাটে পুরুষের চোখে অহরহ দেখে আজকাল। সব সময়ে যে খারাপ লাগে তাও নয়। স্বাভাবিক নারীর মত পুরুষের দৃষ্টি মাঝে মাঝে উপভোগও করে সে। তবে কেউ কেউ যা গোগ্রাসে গেলে! ভাবতেই অবাক লাগে এই সব হ্যাংলা লোকগুলোই যখন বাড়িতে যায় তখন তারা কত সভ্য, ভদ্র। বাবা, দাদা, ভাই, পিসেমশাই, মেসোমশাই। একই মানুষের কতরকম যে চেহারা থাকে! কোনটা যে মুখোশ! কোনটা মুখ!

যেমন তার মা। বাড়িতে সব সময় কী গম্ভীর, দাপুটে। নিজে যা চাইবে সেভাবেই হতে হবে সব কিছু। না হলেই তুলকালাম। সুধামাসিকে বকছে বৃষ্টির ওপর মেজাজ, ভালমামাকে পর্যন্ত ছাড়ছে না। কখনও একেবারেই চুপচাপ, নিজের খেয়ালে একটানা ছবি এঁকে চলেছে। খেয়াল। খেয়াল। এই খেয়ালেই কখনও একগাদা প্যাকেট বুকে চেপে ঢুকছে বাড়িতে,

—বৃষ্টি দ্যাখ্ এই মেখলাটা কি গরজাস্ না? পিংক-এর সঙ্গে ব্লু-এর কনট্রাস্ট। এটা তোকে খুব ভাল মানাবে।

কখনও,—এই ধোতি সালোয়ারটা পরে কামিজের কাঁধটাঁধ দেখে নে তো। আর এই রাখ একশ টাকা। তোর হাতখরচ।

বৃষ্টি আদৌ পিংক বা ব্লু ভালবাসে কিনা, ধোতি সালোয়ার পছন্দ করে কিনা, তা নিয়ে এক বিন্দু মাথাব্যথা নেই মা’র। এই মা’ই আবার নিজের লোকজন বাড়িতে এলে একদম অন্যরকম। হাসিখুশি, উচ্ছল।

—অ্যাই বৃষ্টি, এদিকে শুনে যা তোকে দেবযানী ডাকছে।

উফ্। কী রিপাল্‌সিভ মহিলা ওই দেবযানী। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল বৃষ্টির। আহ্লাদী আহ্লাদী। আমাদের বরোদাতে বাবা আর্টিস্টদের মধ্যে এত প্রফেশনাল জেলাসি ছিল না। দীপক বলে, কলকাতার সব কিছুর মধ্যেই বড্ড বেশি পলিটিক্স। নেকু। নিজে যেন কখনও পলিটিক্স করে না! এই তো রমেন সাহাই সেদিন মাকে এসে বলছিল তাদের নিউজ পেপার অফিসে গিয়ে দেবযানীমাসি নাকি চুকলি খেয়ে এসেছে। রমেন সাহারই নামে। মার সঙ্গে বেশি ভাব বলে রমেনমামা নাকি মার ছবির বেশি বেশি প্রশংসা করে আর দেবযানী ড্রিঙ্কস্ অফার করেনি বলেই কাগজে বিশ্রী সমালোচনা করেছে তার এগ্‌জিবিশনের। এর পরও নাকি ওর স্বামী দীপক বলে, তোমাদের ক্রিয়েটিভ আর্টের ওয়ার্ল্ডটা বড় নিষ্ঠুর! সব সময়ে ল্যাং মারামারি! সারাক্ষণ বরের কোটেশন ঠোঁটে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দীপক কা জরু কাঁহিকা। কি যেন বলে এদের? কক পেক্‌ড! বরসোহাগী!

শিপ্রা হাল্‌দার তাও একরকম। যদিও অনর্গল বকবক করেই চলে, কারুর কথা শোনে না, কেউ শুনছে কিনা পরোয়াও করে না। অবিরাম সিগারেট খেয়ে চলেছে। চেইন স্মোকার!

আর ফিরোজ আঙ্কল্ যে কখন সেন্সে থাকে, কখন থাকে না! সব সময়ই অ্যালকোহলের গন্ধ ছুটছে মুখ দিয়ে। ছোটবেলায় কি জোর জোর চুল টানত, আদর করত গাল টিপে টিপে। আজকাল দেখলেই, হাই ইয়াং লেডি, তুই তো রোজ একটু একটু করে ব্লুম করছিস্ রে! মাতালের প্রলাপ। পুজোর আগে একদিন তো এসে ড্রয়িংরুমের কার্পেটে পড়ে কি গড়াগড়ি। কোন্ ক্রিটিকের সঙ্গে নাকি ঝামেলা হয়েছে। গড়াচ্ছে আর চিৎকার করছে, আমার ছবিতে ডেপথ্ কম? দাঁত ভেঙে দেব শালাদের। তোর চোদ্দপুরুষ আর্টের কিছু বোঝে, অ্যাঁ? সজ্ঞানে থাকলে এই ফিরোজ আঙ্কল একেবারে ভিন্ন মানুষ। কত মার্জিত, ভদ্র, স্নেহশীল।

বাবাই বা কম কিসে! এমনিতে কত হাসিখুশি, দিলদরিয়া। সব সময় একটা মিষ্টি ভালবাসার গন্ধ যেন বাবার গায়ে। অথচ এই বাবাই রীতাআন্টির সামনে টুক্ করে কেমন খোলসের মধ্যে।

ভাবতেই পুরনো অভিমানটা সারা বুকে ছেয়ে গেল বৃষ্টির। সেই পুরনো পাথরচাপা অভিমান। জমাট। শীতল।

বৃষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়েও ফেলতে পারল না। হুড়হুড় করে পাতাল ট্রেন ঢুকে পড়েছে। ভিড় ঠেলে সামনের কামরায় উঠে বৃষ্টি সিটের ধারে দাঁড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই গেটের কাছে হাসির রোল দেখে ঘাড় ঘুরে গেছে। গেট বন্ধ হওয়ার সময় গেটে আটকে গেছে। আর কেউ নয়, সেই ছেলেটাই। গেট থেকে ছাড়া পেয়ে দ্বিতীয় চেষ্টায় ভেতরে আসতে পারল। অপ্রতিভ মুখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। সব সময়ই বোধহয় অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা করতে ভালবাসে ছেলেটা। ভোর থেকেই যা কমিক সিন্ দেখিয়ে চলেছে। বৃষ্টি বেশ কৌতুক বোধ করল।

নির্জন ভোরে, সুধাকে ঘুম থেকে না তুলে, বৃষ্টি পায়ে পায়ে ছাদে উঠে গিয়েছিল। ছাদের দরজার ছিটকিনি খুলতেই বুক ছলাৎ। গাঢ় মেঘের মত কুয়াশা চতুর্দিকে, কুয়াশা জড়িয়ে ঘুমিয়ে সামনের পার্ক, রাস্তাঘাট। একটু দূরের সব কিছুই কেমন অস্পষ্ট। বাড়ি ঘরগুলো ঝাপসা হতে হতে অদৃশ্য ক্রমশ। ফিরোজ আঙ্কলের মিস্টিক পেন্টিং-এর মত। রহস্যময়। গোটা ছাদ শিশিরে, রেণুতে মাখামাখি হয়ে আছে। পিছল ছাদে পা টিপে টিপে আলসেতে এসে দাঁড়াতেই সামনের পার্কে ছেলেটা। জগিং করতে করতে গোটা পার্ক শুধু চক্কর দিয়ে চলেছে। পিঠে হ্যাভারস্যাকের মত ভারী এক কিটস্ ব্যাগ। ঘন কুয়াশার মধ্যে কী কিম্ভূতই না দেখাচ্ছিল ছেলেটাকে। পিঠে বস্তা নিয়ে যেন ধোঁয়ায় নাচছে এক রঙিন রোবট। হাল্কা নীল ট্র্যাকস্যুট পরা। আচমকা মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে পড়ে ব্রেকডান্সের মত ঘাড় ঘোরাতে শুরু করল। বৃষ্টি থ! কাঁধ থেকে ব্যাগ নামায় না কেন! ঘাড়ে ব্যথা হয়ে মরবে যে! এক্সারসাইজ থামার পর পিঠ থেকে কিটস্ ব্যাগ নামল। ব্যাগ থেকে বেরোল ইয়া এক ক্রিকেট ব্যাট। ব্যাটসুদ্ধ অত বড় ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে দৌড়োয়! ওয়েট ট্রেনিং! দুহাতের গ্রিপে ব্যাট ধরে শ্যাডো প্র্যাকটিস্ শুরু হল তারপর! অদৃশ্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কখনও ফরোয়ার্ড খেলছে, কখনও ব্যাকফুট। কখনও স্কোয়্যার কাট্ করছে, কখনও ড্রাইভ।

হাঃ, কলকাতার কপিলদেব। বৃষ্টির ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি। কত আজব চিড়িয়াই যে আছে এই শহরে!

এস্‌প্ল্যানেডে, পাতাল থেকে মাটিতে উঠে ট্রামলাইনের ধারে দাঁড়াল বৃষ্টি। কাঁধের ব্যাগ বুকের কাছে জড়ো করে একবার আকাশের দিকে তাকাল। সূর্যের কোন চিহ্ন নেই কোথথাও। সূর্য বোধহয় আজ আর উঠবেই না। যেদিন সে জন্মেছিল সেদিনও নাকি সারাদিন সূর্যের দেখা মেলেনি। নভেম্বরে কোন কারণ ছাড়াই বৃষ্টিতে ভেসে গিয়েছিল কলকাতা। বৃষ্টির দাদু প্রিয়তোষ বলেছিলেন, আমাদের বাড়িতেও বৃষ্টি এসেছে।

বৃষ্টির মুখে মাথার ওপরের ধূসর আকাশটার ছায়া। তার কোন জন্মদিনই কখনও কোন আনন্দের দিন হতে পারে না। আঠেরো বছরও না। তার জন্মটাই একটা দুর্ঘটনা মাত্র। বার্থ বাই মিয়ার চান্স। দুটো মানুষের মুহূর্তের আনন্দের বাই প্রোডাক্ট। কিম্বা ভুলের। আনন্দ ফুরিয়ে গেছে, ভুল ভেঙে গেছে। খেলা শেষ।

কলেজ স্ট্রিট মুখে আধ ফাঁকা ট্রামে উঠে বসবার জায়গা পেয়ে গেল বৃষ্টি। বিষন্ন মুখে জানলা দিয়ে কর্মব্যস্ত শহরটাকে দেখছে। তার আজকের জন্মদিনটাও কি একটু অন্য রকম হতে পারত না? চারদিক রোদ্দুরে ভেসে যেতে পারত, একটা হৈ-চৈ আমোদ আহ্লাদের সাড়া পড়ে যেতে পারত পৃথিবীতে, ঝকঝকে নীল আকাশ ঘোষণা করত বৃষ্টি রায় আজ থেকে সাবালিকা।

আঠেরো বছর বয়স পর্যন্ত বৃষ্টি রায় শুধু মায়ের হেপাজতে থাকবে। আদালতের এই রায়েই কেমন একটা বন্দীজীবন বন্দীজীবন ভাব। বন্দীই তো। একা থাকলেই বৃষ্টি নিজের বন্ধ ঘরে নির্জন সেলের কয়েদী। জানলার মোটা মোটা লোহার গরাদগুলো বলবান পুরুষ প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে পাহারায়। কেন যে সেই লোকটা এমন একটা শাস্তি দিয়েছিল বৃষ্টিকে? লোকটার মুখ চেষ্টা করলেও বৃষ্টি ভুলতে পারে না। মাঝবয়সী গাঁট্টাগোট্টা চেহারা, অনেকটা তাদের পাড়ার কাউন্সিলার সুরেন ভড়ের মত দেখতে। এরই এক কলমের খোঁচায় নাকি টুকরো টুকরো হয়ে যায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। বৃষ্টিরা হয়ে যায় ভাঙা ঘরের শিশু।

সাড়ে ছ’ বছরের বৃষ্টিকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছে লোকটা;

—তোমার নাম কি মা?

—বৃষ্টি। উহু, শিঞ্জিনী রায়।

—বাহ্, কি মিষ্টি নাম। কোন্ ক্লাসে পড়ো তুমি?

—ক্লাস টু।

—বাহ, তা তুমি কাকে বেশি ভালবাস মামণি? বাবাকে? না মাকে?

—তোমাকে বলব কেন?

—বাহ্, আমাকে তো বলতেই হবে। না হলে আমি জানব কি করে তুমি কার কাছে থাকতে চাও।

বৃষ্টি গুম্।

—বলো মা, কাকে বেশি ভালবাস?

—দুজনকেই।

—কিন্তু তোমার মা বাবা যে এখন থেকে আলাদা আলাদা থাকবে। তুমি কার কাছে থাকতে চাও?

—দুজনের কাছেই।

—কিন্তু লক্ষ্মী মেয়ে, তোমাকে যে দুজনের একজনকে বেছে নিতে হবে। বাবা, কিম্বা মা।

বৃষ্টি সেই মুহূর্তে একটা ছোট্ট চারাগাছ। জীবন্ত কিন্তু অসহায়। প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডবে থর থর কাঁপছে।

—আমি কাউকে চাই না, কাউকে না।

দৌড়ে বাইরে এসে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেছে, বাবা নয়, মা নয়, দাদুর কোমর। দাদুকে আঁকড়ে ধরে আশ্রয় খুঁজছে।

টানা এক বছর বৃষ্টিকে নিয়ে লড়ে গিয়েছিল বৃষ্টির মা বাবা। বৃষ্টিকে নিয়ে লড়াই? না নিজেদের জেদের লড়াই? কী আতঙ্কেই না তখন দিন কেটেছে বৃষ্টির। কোর্ট কেস নিয়ে কেউ আলোচনা করলেই কান খাড়া করে থেকেছে। দাদু যেদিনই তার জন্য বাবল্‌গামের প্যাকেট কিনে এনেছে, দিদা তৈরি করেছে তার প্রিয় এলাচের গন্ধভরা রসগোল্লার পায়েস, সেদিনই বুঝেছে কেসের ডেট্ আছে। কি হবে শেষ পর্যন্ত? আর কি কোনদিন সে বাবাকে দেখতে পাবে? নাকি মাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে চিরদিনের মত?

বোকা। বোকা। কী বোকাই না ছিল তখন। নিজের নির্বুদ্ধিতার কথা ভাবলে এখন নিজের ওপরই রাগ হয় বৃষ্টির। এই রাগটা যদি সবার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া যেত! মা, বাবা, ভালমামা, রীতাআন্টি সবাইকে যদি সমঝে দেওয়া যেত একবার!

রীতার নামটা মনে আসতেই দপ করে বৃষ্টির মাথা আরও গরম হয়ে গেল। বাবা তোমাকে বিয়ে করেছে, তোমার সংসার নিয়ে তুমি থাকো, বৃষ্টিকে নিয়ে আদিখ্যেতা করার চেষ্টা কেন? মহিলাকে দেখলেই বৃষ্টির গা জ্বলে যায়। এরই গলা শোনানোর জন্য সকালে টেলিফোনে বাবার কী অনুরোধ উপরোধ!

—বৃষ্টি লক্ষ্মীসোনা, এক সেকেন্ড একটু ধর্। রীতা তোকে বার্থডে উইশ করতে চাইছে।

ভাগ্যিস ঝপ্ করে নামিয়ে দিয়েছিল ফোনটা। নইলে হয়ত ফোনে বাবার পুচকে ছেলেটার গলাও শুনতে হত।

এবার বৃষ্টির রাগ গিয়ে পড়ল বাবার ওপর। বলা নেই, কওয়া নেই, দুম করে গত বছর জন্মদিনে কি আক্কেলে ওই মহিলাকে নিয়ে হাজির হয়েছিল! গোটা সন্ধেটাই তেতো হয়ে গিয়েছিল গতবার। মহিলাকে জব্দ করার জন্য বাবাকে আজ পুরো সন্ধেটাই আটকে রাখতে হবে।

পাশের সিটে এক বিপুলকায় মহিলা ক্রমাগত বৃষ্টিকে ঠেলে ঠেলে নিজের জায়গা বাড়িয়ে চলেছেন। জানলা থেকে মুখ সরিয়ে বৃষ্টি ভদ্রমহিলার দিকে কটমট করে তাকাল,

—ঠিক হয়ে বসুন। আমাকে তো কোণে চিপে ফেলছেন।

মহিলার বয়স বছর পঞ্চাশেক। দেখেই বোঝা যায় নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে খুবই বিব্রত হয়ে থাকেন সব সময়। বৃষ্টির কথার রূঢ়তায় কিছুটা আহত ভাব তাঁর মুখে,

—কি করব বলো? দেখতেই তো পাচ্ছ নিজেই কেমন সিট্ থেকে অর্ধেক বেরিয়ে আছি।

মুখ থেকে প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল, খেয়ে দেয়ে গায়ে গার্দানে এত বড় শরীরটা তৈরি করার সময় মনে ছিল না? পর মুহূর্তে সামান্য মায়াও হল মহিলার ওপর। অনেকে তো অসুখেও এ রকম মোটা হয়ে যায়। তবে শারীরিক অসহায়তার সুযোগ নিয়ে অন্যের অসুবিধা সৃষ্টি করতে অনেকেই দ্বিধাবোধ করে না। নিজেকে ছাড়া অন্যের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে মাথা ঘামাতে চায়ও না চট করে। তার ভালমামাই তো সারাদিন হয় হুইল চেয়ার, নয় খাটে পড়ে আছে। পান থেকে চুন খসলেই চিল চিৎকার। সুধামাসির সঙ্গে কি বিশ্রী ভাষায় কথা বলে একেক সময়। একমাত্র মা’র সামনেই অতটা মেজাজ দেখানোর সাহস পায় না। সাহস পায় না? নাকি সামনেই পায় না মাকে? কতটুকু সময়ই বা। মা বাড়িতে থাকে। সারাদিনই ঘুরছে বাইরে বাইরে। কলেজ, এগজিবিশন, সেমিনার, বন্ধুবান্ধব। আর বাড়ি থাকলে তো হয় মেজাজ, নয় নিজের ইজেল, ক্যানভাস, ব্রাশ, তুলি নিয়েই ধ্যানস্থ। একেক দিন তো সারা রাত ধরে চিলেকোঠার স্টুডিওতে বসে ছবি এঁকে যায়। সে সময় মার সামনে পৃথিবীটারই কোন অস্তিত্ব থাকে না। বিশ্বসংসার ধ্বংস হয়ে গেলেও মা তখন ফিরে তাকাবে না। এমনকি বৃষ্টি মরে গেলেও না।

বৃষ্টির দিদা তখন সদ্য মারা গিয়েছেন। বারো বছরের বৃষ্টি এক বিছানায় শুয়ে। মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে আঁতকে বিছানায় উঠে বসেছে বাচ্চা মেয়েটা। চোখ টিপে দৌড়েছে পাশের ঘরে। মা নেই। নিঃশ্বাস চেপে, তীর বেগে অন্ধকার টপকে ছুটেছে ছাদের স্টুডিওতে। হাঁপাচ্ছে,

—আমার ভয় করছে।

মা শুনতেও পেল না। টেম্পেরায় কতগুলো বাঁকাচোরা মানুষের মুখ। ফুটিয়ে তুলতে মগ্ন তখন। সাংঘাতিক রাগী মুখ সব। কেউ কেউ ভৌতিক মুখোশ পরা। লাল কালো বেগুনি মুখোশ।

বৃষ্টি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঢোক গিলছে বার বার। তারপর নিঃশব্দ পায়ে নেমে এসেছে সিঁড়ি বেয়ে। সোজা সুধামাসির ঘরে, মেঝেতে পাতা মাদুরের বিছানায়।

—সুধামাসি, ও সুধামাসি...

—কে? কে? কি হয়েছে? সুধামাসি ধড়মড় করে উঠে বসেছে।

—আমি তোমার কাছে শোব।

বৃষ্টির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সেই সব দিন কি সে ভুলে যেতে পারে? কি ভাগ্য যে মার মনে আছে আজ তার জন্মদিন। নিজেকে নিয়ে যারা ব্যস্ত থাকে অন্যের কথা ভাবার তাদের সময় কোথায়?

মারা যাওয়ার আগে দিদা প্রায়ই বলত,

—মার ওপর এত অভিমান করিস কেন? সারা দিন ধরে মাকে কত খাটাখাটুনি করতে হয় বল্ তো? সবই তো তোর জন্য।

কচু। যত সব আলগা সান্ত্বনার কথা। বৃষ্টির জন্য কেউ কিছু করেনি কোনদিন। করবেও না। ছোটবেলায় মিছিমিছি কিছু কষ্ট পেয়েছে বৃষ্টি। সারাক্ষণ বোকার মত ভেবেছে কখন মা ফিরবে কাজ থেকে।

আর্ট কলেজে লেকচারারশিপ পাওয়ার আগে ইন্টিরিয়ার ডেকরেশন নিয়ে মা মেতেছিল খুব। নিখিল দত্ত রায়ের সঙ্গে পার্টনারশিপে ব্যবসা। এই একটা অফিস সাজাচ্ছে, ওই একটা শোরুম করছে। সকাল না হতেই নিখিলমামা হৈ হৈ করে হাজির বাড়িতে,

—জয়া, মার্কোনিদের অডারটা পেয়ে গেলাম বুঝলি। ব্যাকসাইডটা যদি মিরর দিয়ে কভার করা যায়, দুপাশেও দেওয়াল জোড়া আয়না, তাহলে দোকানটাকে বেশ ইলংগেটেড্ লাগে।

—বাইরে কয়েকটা মিউরালস্‌ও দেওয়া যেতে পারে। আর ডলফিনের মোটিফটা যদি...

ড্রয়িংরুমের দরজার পাশে তীর্থের কাকের মত দাঁড়িয়ে থাকত বৃষ্টি। কতক্ষণে নিখিলমামার চোখ পড়বে এদিকে, কাজ থামিয়ে চোখ পিটপিট করবে,

—আয় বৃষ্টি ঝেঁপে...

বৃষ্টি সুড়ৎ করে একেবারে নিখিলমামার গায়ের কাছে। তখন থেকেই নিখিলমামার মুখভর্তি দাড়ির জঙ্গল। এত দাড়ি যে চোখ কপাল ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। চুল পর্যন্ত আঁচড়ায় না কখনও।

বৃষ্টি চোখ পাকিয়ে শাসন করত,—আজও তুমি চুল আঁচড়াওনি? সঙ্গে সঙ্গে নিখিলমামা বৃষ্টিকে উঁচু করে তুলে দোলাতে শুরু করত,

—আমায় ক্ষমো হে ক্ষমো...

—নো ক্ষমা। নিলডাউন হও।

—কান ধরে? না, না ধরে?

নিখিলমামা হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ত। তাই দেখে মার কী বিরক্তি, কী বিরক্তি।

—বৃষ্টি এখন যাও তো ঘর থেকে। দেখছ না আমরা কাজের কথা বলছি।

—আহা, থাক্ না একটু। খামোকা বকছিস্ কেন?

—তুই আর ওকে মাথায় তুলিস না তো? ভীষণ অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। কারুর কথা শোনে না। ওইটুকু মেয়ের কী জেদ।

জেদের দেখেছেটা কি? বৃষ্টি বলেই এতদিন সহ্য করে গেছে সব কিছু। আর নয়। আঠেরো বছর বয়স একটা মাইলস্টোন। আজ থেকে জীবনটাকে আমূল বদলে ফেলতে হবে। তাই করবে যা করতে নিজের ইচ্ছে করে। আর কোন ছেলেমানুষি নয়। কোনও উচ্ছ্বাস নয়। মিছিমিছি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলে নিজেকে শুধু খেলো করাই হয়। সকাল থেকেই নিজেকে বদলাতে শুরু করে দিয়েছে। সব পোস্টার খুলে ঢুকিয়ে দিয়েছে খাটের নীচে। মনটা একটু চিনচিন করেছিল; প্রশ্রয় দেয়নি। বেডসাইড টেবিলে এক বছরের বৃষ্টির দারুণ মিষ্টি ছবি ছিল একটা। দুহাত বাড়িয়ে গাবলু গুবলু মেয়েটা কারুর কোলে উঠতে চাইছে। ছবিটাকেও সরিয়ে দিয়েছে চোখের সামনে থেকে।

মেডিকেল কলেজ আর ইউনিভার্সিটির মাঝখানে ট্রামটা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রয়েছে। জানলা দিয়ে মুখ বার করে বৃষ্টি দেখল ট্রামের তার ছিঁড়েছে। একগাদা বাস, গাড়ি জমে গেছে চারপাশে। বৃষ্টি মনে মনে হাসল। আজ যে তার ছিঁড়বে সেটা তো অবধারিত। আজ যে দিনটাই অশুভ। ভাগ্যিস ট্রামের আর কেউ জানে না আজ অপয়া মেয়েটার জন্মদিন বলেই ট্রামটা এখানে এভাবে আটকে গেল!

বৃষ্টি ট্রাম থেকে নেমে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে শুরু করল।

কলেজের গেটের কাছে আসতেই শুভর সঙ্গে দেখা। শুভ বৃষ্টিকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল,

—আই ব্বাস্, আজ কি ড্রেস দিয়েছ বস্! লুকিং ডেঞ্জারাসলি গরজাস্! মাধুরী দীখ্‌শিতের বাজার ফিনিশড্।

আগুন রঙ রাজকোট শাড়িতে, কপালের লাল টিপে, চুলের বাহারে, অঙ্গে বিভঙ্গে বৃষ্টির এখন মরালীর ভাব। শুভর কথায় অহংকারী স্বর ফোটাল গলায়,

—তুলনা করার আর লোক পেলি না? শেষ পর্যন্ত হিন্দী ফিল্মের হিরোইন?

—কি করব বল্, হলিউডের হিরোইনরা তো আর শাড়ি পরে না। শুভ হাত ওল্টালো, —যাবি নাকি আজকে গ্লোবে? স্ট্যালোনের একটা ভাল বই এসেছে।

বৃষ্টি ঠোঁট টিপে হাসল —সরি, পারলাম না। আজ একটু কাজ আছে।

—কাজ? তোর? ফিল্ম দেখা ছাড়া তোর আর কোন কাজ থাকে নাকি? তোর জন্যই তো এস্‌প্ল্যানেডে ইংলিশ বইগুলো চলে।

—ফালতু বকিস্ না। আমারও কাজ থাকে।

শুভ ফিসফিস করে উঠল—অ্যাপো ট্যাপো আছে নাকি?

বৃষ্টি উত্তর দিল না। মনে মনে বলল, অ্যাপো তো আছেই। বাবার সঙ্গে। শুধু অ্যাপো নয়, বোঝাপড়াও।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%