সুচিত্রা ভট্টাচার্য
রীতা দরজা খুলতেই বৃষ্টি তাকে প্রায় ভেদ করে ভেতরে চলে এল। লিভিংরুম পার হয়ে সোজা একেবারে সুবীরের শোবার ঘরে। কোন দিকে তাকাল না।
শোবার ঘরের টেবিলে বসেই বোর্ড মিটিং-এর জন্য কাগজপত্র গোছাচ্ছিল সুবীর। তার বিশাল ফ্ল্যাটে দুটো পেল্লাই সাইজের বেডরুম, একটা স্টাডি, প্রকাণ্ড ডাইনিং কাম ড্রয়িং হল। বেশি রাত পর্যন্ত জরুরি কাজ না থাকলে সুবীর স্টাডিতে ঢোকে না। শোবার ঘরের টেবিল চেয়ারেই টুকটাক কাজ সেরে নেয়। বৃষ্টিকে দেখে সে ভূত দেখার মত চমকে উঠেছে,
—কিরে তুই এখন? কোথ্থেকে? এ সময়?
বৃষ্টি উত্তর দিল না। স্টোনওয়াশ প্যান্টের ওপর সাদা শার্ট পরেছে, শার্টের ওপর হাতকাটা জ্যাকেট। কাঁধ পর্যন্ত চুল ফুলে ঝামর হয়ে আছে। দামি বেডকভার পাতা খাটে পা ঝুলিয়ে শুয়ে পড়ল। দু চার সেকেন্ড। তারপর লাফিয়ে উঠে চলে গেছে ডাইনিং স্পেসে। ফ্রিজ খুলে এটা নাড়ছে, ওটা ঘাঁটছে। একের পর এক ঢাকা খুলে রান্নাকরা খাবারগুলো দেখল, শুঁকল, খোলাই রেখে দিল। বিয়ারের ভর্তি বোতলটা বার করে গালে ঠেকাচ্ছে, ঘ্রাণ নিল, মুখভঙ্গি করল বিচিত্র। আবার যথাস্থানে রেখে দিয়েছে।
সুবীরও মেয়ের পিছন পিছনই বেরিয়ে এসেছে,
—কিরে? কি খুঁজছিস্? খাবি কিছু?
রাজা প্রথমটা খেয়াল করেনি বৃষ্টিকে। তন্ময় হয়ে টিভিতে রঙিন বিজ্ঞাপন দেখছিল। এখন কাঠ হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। হাঁ করে দেখছে বৃষ্টির কাণ্ডকারখানা।
রীতাও দরজায় স্তব্ধ দাঁড়িয়েছিল এতক্ষণ। সুবীরের দেখাদেখি সেও এবার কাছে এল,
—স্যান্ডউইচ খাবে? ফ্রেঞ্চ টোস্ট্ ভেজে দেব? ডিপ ফ্রিজে হ্যাম আছে, খেতে পারো।
বৃষ্টি যেন কথাটা শুনতেই পায়নি। সশব্দে ফ্রিজের দরজা বন্ধ করল। অস্থির পায়ে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে
—বিজয়, অ্যাই বিজয়, আমাকে কটা লুচি ভেজে দাও তো।
আদেশ দিয়েই আবার শোবার ঘরের দিকে গেল।
সুবীর টেবিলের কাগজপত্র গুটিয়ে ফেলল। এই সব দিনে তার কাজ মাথায় উঠে যায়।
বিজয় জিজ্ঞাসু চোখে দাঁড়িয়ে আছে রীতার নির্দেশের অপেক্ষায়। রীতা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, —মাংস বার করে গরম করে দিস্ সঙ্গে।
শুনেই বৃষ্টি দাঁড়িয়ে পড়েছে। আবার বিজয়কে ডাকছে। এবার বেশ জোরে,
—লুচির সঙ্গে আলুভাজা। কিম্বা বেগুন ভাজা।
মেয়ের হাবভাবে সুবীর যথেষ্ট নাড়া খেয়েছে। গলাটাকে নরম রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। মেয়ে যেন তার একটা কথাতেও না আহত বোধ করে,
—কোথ্থেকে আসছিস বল্ তো? খুব খিদে পেয়েছে বুঝি?
এ কথারও উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না বৃষ্টি। সে যেন এ বাড়িতে কথা নয়, নিজস্ব কোন জরুরি কাজে এসেছে। সুবীরের ড্রয়ার এক টানে খুলে ফেলল। কি যেন খুঁজছে। হঠাৎ পেয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বার করে ফেলেছে সুবীরের ওয়ালেট্টা।
ওয়ালেট হাতে নতুন করে খাটে গিয়ে বসল।
রীতা দরজায় পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে। রাজাও গুটি গুটি এসে গেছে তার পাশে। গোটা ফ্ল্যাট কয়েক মিনিটেই থমথমে।
সুবীর পরিবেশ হাল্কা করতে চাইল। মেয়ের পাশে গিয়ে বসেছে,
—রীতা, বিজয়কে তাড়াতাড়ি খেতে দিতে বলো। আমার মেয়ের ভীষণ খিদে পেয়েছে। তুমি নিজেই গিয়ে নিয়ে এসো না!
বৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, —আমার খাবার বিজয় দিয়ে যাবে।
সুবীর মেয়ের ব্যবহারে ক্রমশ স্তম্ভিত। বৃষ্টি এত অভদ্র হয়ে গেল কবে থেকে! এত অবুঝ! কেন কিছুতেই কিছু বুঝতে চাইছে না! বড় বিপন্ন বোধ করল সুবীর। সেই ভাবটুকু কাটাতেই বুঝি আদরের মেয়ের পিঠে হাত রেখেছে,
—কত টাকা লাগবে তোর?
বৃষ্টি সুবীরের হাত আস্তে করে পিঠ থেকে নামিয়ে দিল। ওয়ালেট থেকে কয়েকটা নোট বার করে নিজের ব্যাগে পুরতে গিয়েও, কি ভেবে থামল সামান্য। সরাসরি রীতার দিকে চোখ ফেলেছে,
—তিনশ নিলাম। এনি অবজেকশন্?
বলেই ওয়ালেট সুবীরের কোলে ছুড়ে দিল। রীতাকে ভেদ করে আবার বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে। রীতার পাশে দাঁড়ানো রাজাকে কীট পতঙ্গের মত উপেক্ষা করে। রীতা দাঁতে ঠোঁট চেপে ধরল। মাথা ঠিক রাখার চেষ্টা করছে।
বৃষ্টি ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসল। দু-হাতে তবলা বাজিয়ে চলেছে টেবিলে।
—কি বিজয়, হল?
বিজয় সভয়ে উঁকি মারছে। সে রান্না করে। ঝড়ের মেজাজ মর্জি বোঝ তার ক্ষমতার বাইরে।
রীতা বৃষ্টির পিছন থেকে হাত নেড়ে ইশারায় বিজয়কে বলল, —ভাল প্লেটে দিস্।
বৃষ্টি ঠিক শুনতে পেয়ে গেছে। শুনেছে? না বুঝে নিল? এ বাড়িতে এলেই ইন্দ্রিয়গুলো তার বেশি প্রখর হয়ে ওঠে। সুয়োরাণীর বখে যাওয়া রাজকন্যার মত হুকুম করল,—প্লেটে নয়। চারটে লুচি। হাতে দেবে।
অজস্র বিজ্ঞাপন শেষ হয়ে টিভিতে চিত্রহার শুরু হয়েছে। গোটা ফ্ল্যাটের ভূতুড়ে নিস্তব্ধতাকে কাটিয়ে তুলতে একটা ছেলে একটা মেয়ের পিছনে দৌড়ে দৌড়ে গান শুরু করে দিল—ম্যায় তেরে পেয়ারমে পাগল···। মেয়েটাও সঙ্গে সঙ্গে সুর ধরছে,—ম্যায় তেরে পেয়ারমে পাগল···। বৃষ্টি কটমট করে টিভির দিকে তাকাল। পারলে যেন চোখ দিয়েই টিভির দৃশ্যটাকে ভস্ম করে দেয়। নিজের মনে বিড়বিড় করে চলেছে, ইডিয়েট বক্স। ইডিয়েট বক্স।
বিজয় পাশে এসে ডাকল,—দিদি, লুচি।
বৃষ্টি লুচি কটা ছিনিয়ে নিল। শুধু লুচিই নিল, আলুভাজা নয়। হাতে লুচি নিয়ে, গ্রিলে ঘেরা সাততলার ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে। অফিস থেকে পাওয়া সুবীরের ফ্যাশনদুরস্ত যোধপুর পার্কের ফ্ল্যাটটা বড় রাস্তার ওপর। অসংখ্য গাড়ি-ঘোড়া সব সময় ছুটছে নিচ দিয়ে। অন্ধকারে দাঁড়ালে মনে হয় নিচে হাজার হাজার আলোর রশ্মি যেন চতুর্দিকে ছিটকে ছিটকে যাচ্ছে ক্রমাগত। বৃষ্টি নিষ্পলক তাকিয়ে রইল সেদিকে।
ফাল্গুন পড়তে না পড়তেই বাতাস শিশুর মত চঞ্চল। বৃষ্টির ফোলা চুল হাওয়ায় আরও এলোমেলো হয়ে গেল। মিনিট কয়েক চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর ঘরে ফিরল। এখনও সে দাঁতে লুচি ছিড়ে চলেছে।
হাতের মুঠোয় লুচি চেপে বৃষ্টি এবার হানা দিল অ্যান্টিরুমটায়। রীতার নিজস্ব সাজঘরে। এক পলক নিজেকে দেখল আয়নায়। লিপস্টিক হাতে তুলেই ছুড়ে ফেলে দিল।
সুবীর তখনও শোবার ঘরের খাটে বসে। রীতা দরজায় নিথর। তার হাতের মুঠোয় পর্দার কোণ চেপে ধরা।
রীতাকে পাশ কাটিয়ে আবার সুবীরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল বৃষ্টি,
—কবে থেকে?
ভিড় বাসের পাদানিতে একটা পা রাখার জন্য যেভাবে অসহায় আর্তি জানায় অফিসযাত্রীরা, সুবীরের গলায় অবিকল সেই আর্তনাদ,
—একটু বোঝ্···একটু প্লিজ বোঝ্···একটা কথাও তো আমি তোকে···
সুবীরের প্রার্থনাকে আমলই দিল না বৃষ্টি। এই দৃশ্যে সে এখন অভ্যস্ত। রীতাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
—তুমিই কথা দিয়েছিলে। ইউ। ইউ জাস্ট্ কান্ট্ ব্যাক্ আউট্ নাউ।
সুবীরের চোখ মেয়েকে অতিক্রম করে রীতার দিকে। রীতা ছেলেকে খামচে ধরে আছে। রাজাও আঁকড়ে ধরে রীতার আঁচল।
বৃষ্টি রীতার দিকে ফিরল। রাজাকেও এক পলক দেখে নিল। এতক্ষণে তার মুখে হাসি ফুটছে। নিষ্ঠুর কসাই-এর হাসি। হাসিতে আত্মপ্রসাদ ঝরে পড়ছে। রীতার চোখ থেকে চোখ না সরিয়েই সুবীরকে বলল, —চার মাস হতে চলল। বি কুইক মাই সুইট ড্যাড্। বলেই ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল ফ্ল্যাট থেকে। রাজাকে আলগা ঠেলে সরিয়ে। সুবীরের দিকে একবারও না ফিরে।
লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার বোতাম টিপল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেছে। ছুটতে ছুটতে।
গভীর রাত্রে আচমকা কোন শব্দ শুনলে অনেকক্ষণ তার রেশ কানে লেগে থাকে। সেরকমই বৃষ্টির জুতোর আওয়াজ মিলিয়ে যাওয়ার অনেক পরেও শব্দটার রেশ কানে রয়ে গেল রীতার।
সুবীর ঘাড় ঝুলিয়ে বসেই আছে। রীতা খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ছেলেকে নিয়ে নিজের মনে চলতে থাকা টিভির সামনে বসল। তাকিয়েই আছে শুধু। কিচ্ছু দেখছে না। তীব্র অপমানের ঝাপটায় তার সমস্ত বোধ বুঝি অসাড় হয়ে গেছে। রাজাও বুঝতে পারছে একটা কিছু ঘটে গেছে বাড়িতে। দমকা হাওয়াটা, যাকে মা বলে তার দিদি, এরকমই এসে ওলোট পালোট করে দিয়ে যায় তাদের সব কিছু। মাঝে মাঝেই। রাজা কার্যকারণগুলো সঠিক বুঝতে পারে না। এটুকুই বোঝে দিদিটা চলে যাওয়ার পর বাবা মা এভাবেই আলাদা আলাদা বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর দুজনেই জোরে জোরে ঝগড়া করে। এক সময় মা গিয়ে বিছানায় শুয়ে কাঁদতে থাকে। বাবা চুপ করে বসে থাকে ব্যালকনিতে।
সুবীর উঠে এসেছে ঘর থেকে। রীতার পাশে এসে বসল। রাজাকে আঁকড়ে ধরে বাঘিনীর মত বসে আছে রীতা। সুবীরের আচমকা নিজেকে ভীষণ বিচ্ছিন্ন মনে হল। সম্পূর্ণ একা। উত্তাল সমুদ্রে কম্পাসবিহীন দিক্-ভ্রান্ত জাহাজের মতো। সামনে ডুবো পাহাড়। নিজের মনে বিড় বিড় করে উঠল,
—কী যে হল মেয়েটার! ···কেন যে এরকম করছে!···এত বুঝদার ছিল···কত শান্ত···
রীতা ঘাড় ঘুরিয়ে সুবীরকে দেখে নিল। তারপর হিম গলায় কাজের লোকটাকে ডাকল,
—বিজয়, রাজার খাবার দিয়ে দাও।
বিজয় কিচেনের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিন সে নিজে নিজেই রাজার রাতের খাবার তৈরি করে। শুধু যেসব দিন তার বাবুর আগের পক্ষের এই মেয়েটা এসে তুফান তুলে দিয়ে যায়, সে সব দিনে সে কাজের দিশা হারিয়ে ফেলে। কী তিরিক্ষি মেজাজ যে মেয়েটার! তার দাপুটে বৌদি পর্যন্ত ভয়ে জুজু হয়ে যায়। আগে মেয়েটা তো আসতই না। ন মাসে ছ মাসে যাও বা আসত তাও বাবার সঙ্গে। কাঠ কাঠ বসে থাকত। শান্তশিষ্ট। দুঃখী দুঃখী। একদম চুপচাপ। দেখে বিজয়ের মায়া লাগত। হঠাৎই মেয়েটার মূর্তি একেবারে উল্টে গেছে।
বিজয় মাথা চুলকোল, —রাজার জন্য চিকেন সুপ করব?
—করো।
সুবীর পর পর সিগারেট খেয়ে চলেছে। হাতের আঙুলগুলো মৃদু কাঁপছে। আজকাল সামান্য মানসিক উত্তেজনাতেও এই এক নতুন উপসর্গ হয়েছে তার। ফরিদাবাদ ট্যুরে একদিন বিশ্রীরকম মাথাও ঘুরে গিয়েছিল। হাইপার টেনশন। ডাক্তার তাকে সিগারেট খাওয়া ছাড়তে বলেছে। পারলে মদও। আরও বলেছে মান্থলি চেক আপ্ মাস্ট্।
রীতা উঠে টিভি বন্ধ করে দিল। সুবীরের অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল তাতে। টিভির অর্থহীন শব্দগুলো তাও এতক্ষণ একটা পর্দা তুলে রেখেছিল দুজনের মাঝখানে। সেটা সরে যেতেই সুবীর রীতা মুখোমুখি।
সুবীর লক্ষ করল রীতার চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। এসব সময়ে কি করা উচিত সেটা সুবীর আজও রপ্ত করতে পারেনি। শেষের দিকে জয়া বলত,—স্যাডিস্ট। কাছের লোকের চোখের জল দেখে তুমি আনন্দ পাও। ভীষণ ব্রুট তুমি।
সুবীর নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলে উঠল,
—বৃষ্টিটা একেবারে পাগল হয়ে গেছে।
—পাগল হয়েছে? না আদর দিয়ে তোমরাই পাগল করে তুলেছ? রীতা ঝপ করে বলে উঠেছে।
সুবীর দুহাতে চুল খামচে ধরল, —কি করতে পারি বলো? কি করব?
—কি করবে মানে? শাসন করতে পারো না? তুমি তো তার বাবা; সহবত শেখাতে পারো না? যখন খুশি এসে আমাকে যাচ্ছেতাই অপমান করে চলে যাবে; আমাকে সেটা হজম করে যেতে হবে?
—কি শাসন করব? এখানে এলে ঘাড় ধরে বার করে দেব?
—সে কথা আমি বলেছি কোনদিন? তার বাপের বাড়ি, সে যখন খুশি আসবে যাবে, আমি বলার কে? তা বলে বাপ হয়ে জিজ্ঞেসও করবে না মেয়ে অত মুঠো মুঠো টাকা নিয়ে কি করে? কিভাবে ওড়ায়? মায়েরও বলিহারি যাই। এদিকে এত নাম আর মেয়েটিকে যা তৈরি করেছে···ঘেন্না···ঘেন্না···
সুবীর চুপ করে গেল। বৃষ্টির মুঠো মুঠো টাকা ওড়ানোর কথাটা তারও যে মাথায় আসেনি তা নয়। না দিয়ে তার উপায়ই বা কি! বাবা হয়ে কিছু তো দিতে হবে মেয়েকে। মেয়ে ঘুষ ভাবলেও। রীতাকে তো সে বলতে পারে না এই মেয়ে পৃথিবীতে এসেছে তারই ইচ্ছায়, বলতে পারে না এই মেয়েই তার বুকে বিব বিব বেজে চলে অনুক্ষণ। ভেবেছিল এই মেয়েকে দিয়েই বেঁধে ফেলা যাবে জয়াকে। বাঁধা তো গেলই না, মেয়েও ছিটকে গেল কক্ষ থেকে। এইরকম এক নির্বোধ মানুষের আবার সংসার করতে চাওয়ার ইচ্ছাটাকে একটা কুৎসিত নিটোল ঠাট্টা ছাড়া আর কিই বা মনে হতে পারে? সেই ঠাট্টাটাই বার বার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টি।
রীতা বলল, —আমার কথা নয় ছেড়েই দাও, ওইটুকু বাচ্চাটার সঙ্গে কিরকম ব্যবহারটা করে লক্ষ করেছ? চিন্তা করে দেখেছ ওই শিশুটার মনে কি রিঅ্যাক্শন হতে পারে? তোমাদের জন্য রাজাকে ভুগতে হবে কেন?
দমবন্ধ করা কষ্টের মধ্যেও সুবীরের হাসি পায়। গোটা নাটকে এখন একটাই ভিলেন। সে নিজে। রীতা দায়ী নয়, হয়ত জয়াও দায়ী নয়, বৃষ্টি দায়ী নয়, রাজা তো নয়ই। এখন শুধু সবাই মিলে তাকে বেঁধে মারার অপেক্ষা।
সুবীর রাজাকে কাছে টানল,
—কিরে, দিদিকে দেখে তোর ভয় করে?
রাজা আধ-আধ বুলিতে বলে উঠল, —দিদি খুব লাগি।
—থাক, আর আদিখ্যেতা করতে হবে না। রীতা ছেলেকে টেনে নিল, —মেয়েকে নিয়ে ঢং করছ করো, আমার ছেলেকে ...
রীতার গলায় জয়ার স্বর। সব মেয়েই বোধহয় এরকম পোজেসিভ। ভাবতে গিয়ে হোঁচট খেল সুবীর। সে নিজেও বা কম কিসে? জয়ার প্রত্যেকটি মুহূর্তের ওপর সে কি দাবি জানাত না? রীতার ওপরই বা কি কম অধিকার ফলিয়েছে সে? জয়া মেনে নেয়নি, রীতা মেনে নিয়েছে। এটুকুই যা তফাত। সবাই তো এক ছাঁচে গড়া হয় না। সুবীরের এক কথায় তার অফিসের রীতা ব্যানার্জি চাকরি ছাড়তে দ্বিধা করেনি।
রীতা এখনও গজগজ করছে, —মেয়ে এসে আমাকে শাসিয়ে যায় বাবাকে নিয়ে চলে যাব, তুমি সেটা তারিয়ে তারিয়ে শোন, এনজয় করো। বলতে পর্যন্ত পারো না ভদ্রবাড়ির ছেলেমেয়েরা বড়দের সঙ্গে ওই আচরণ করে না।
সুবীর এতক্ষণে ধৈর্য হারাল। কোণঠাসা বেড়ালের মত ফ্যাঁস করে উঠেছে, —সব দোষ শুধু বৃষ্টিরই—না? মনে রেখো, এক হাতে তালি বাজে না। তোমার ত্রুটি নেই? মেয়েটা যে সেই তেরো চোদ্দ বয়স থেকে কোনদিন তোমাকে আপন বলে ভাবতে পারেনি তার সবটাই ওর দোষ? তুমি কতটা চেষ্টা করেছ? তুমিও তো ওকে রাইভাল ভাবো, ভাবো না?
সুবীরের কথার আঘাতে রীতা স্তব্ধ। সুবীর থামল না, —তুমিও তো ভেবেছিলে লাক্সারি বাসে বেড়াতে গেলে পাশে যে কোপ্যাসেঞ্জারটা বসে থাকে, বৃষ্টিও সেরকমই কেউ একজন। আছে থাকুক, না থাকলে আরও ভাল হত। আরও আরামের হত যাত্রাটা। জীবনটা। ভাবোনি?
অপ্রিয় সত্য হঠাৎ হাটের মাঝে এসে পড়লে সম্পর্কগুলো অনেক উলঙ্গ হয়ে যায়। রীতা কেঁদে ফেলল।
সুবীর আরও কিছুক্ষণ নির্বাক বসে থাকার পর উঠে এসেছে ব্যালকনিতে। বেতের চেয়ার টেনে বসে পড়ল পার্ক স্ট্রিটের পুরনো কবরখানার নার্সারি থেকে কিনে আনা অ্যারেলিয়া গাছটার পাশে। এক সময় জয়া তাকে গাছের নেশা ধরিয়েছিল। নেশার আনন্দ চলে গেলেও অভ্যাসটা রয়ে গেছে।
রাত্রিতে গাছে হাত দিতে নেই, তবু সুবীর বাহারি পাতাগুলোতে আলতো হাত বোলাল। রেগে গেলে সে মাথা ঠিক রাখতে পারে না। রীতাকে নির্মমভাবে কথাগুলো বলে ফেলে খারাপ লাগছিল তার। যেমনই হক, তর চরম নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে এই রীতাই তো পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। একদিনের জন্যও তার কোন কাজের প্রতিবাদ করেনি। মনে যাই থাক, রীতা কখনও সামান্যতম দুর্ব্যবহারও করেনি বৃষ্টির সঙ্গে। মনের ওপর তো হাত চলে না। কোন মানুষ সম্পূর্ণ রিপুমুক্ত হতে পারে!
সুবীর আবার সিগারেট ধরাল। আঙুলের ফাঁকে জলন্ত সিগারেট টিপটিপ কাঁপছে। এত কাঁপছে কেন! তবে কি তার বাবার মত তারও পার্কিন্সনস্ ডিজিজ্ আসছে!
সুবীরের বাবার অসুখটা ইদানীং বেড়েছে। হাত পার সঙ্গে মাথা পর্যন্ত কাঁপে। কদিন আগে স্পেশালিস্ট নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে এনেছিল সুবীর।
সুবীরের শরীর শিরশির করে উঠল। অসুখটা বংশগত।
জয়া বলত, ন্যায়রত্ন লেনের গাছকে টালিগঞ্জের টবে এনে পুঁতলেই কি তার চরিত্র বদলে যায়? গাছ সেই গাছই থাকে। শুধু ফুল ফল হয় না। উপড়োনো শিকড় নিয়ে শুকিয়ে মরে তাড়াতাড়ি।
তবে কি চাইলেও রক্তের সম্পর্ককে অস্বীকার করা যায় না? একেই কি নিয়তি বলে?
ফরিদাবাদের চক্করটা মাথায় ফিরে ফিরে আসছে। ডাক্তারের কথা মনে পড়ল, চেক আপ ইজ্ মাস্ট। কি চেক করবে সুবীর? শরীর? সময়? সম্পর্ক?
নিজের অজান্তেই কাচের শোকেস থেকে স্কচের বোতলটা বার করে সোফায় এসে বসেছে। সোনালি তরল টিলটিল দুলছে বোতলে। জয়া বোধহয় আবার জিতে গেল। ভাঙাচোরা দুর্গন্ধময় সরু ন্যায়রত্ন লেনের গলিটাই রয়ে গেছে তার শরীরে।
গ্লাসে অনেকটা হুইস্কি ঢালল সুবীর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন