সুচিত্রা ভট্টাচার্য
—আমরা একবার নেতারহাট গিয়েছিলাম তোর মনে আছে বৃষ্টি?
পরশু রাত্রে খেতে বসে কোন প্রস্তুতি ছাড়াই বলে উঠেছিল জয়া। ডাইনিং টেবিলে মোমবাতির আলোয় বৃষ্টি মার মুখটা দেখতে পায়নি ভাল করে। আজকাল শীতকালেও এত লোডশেডিং হয়!
বৃষ্টির মন পলকের জন্য ভিজে গিয়েছিল। পরক্ষণেই ভুল ভেঙেছে। জয়া নিজের কথার পিঠেই কথা চাপিয়ে দিয়েছে, —শুধু আড্ডা আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে জীবন কাটবে না বৃষ্টি। কোন্ কলেজে পড়া মেয়ে এত রাত অবধি রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে? এবার এসব কমাও
সেই শাসন। শুধুই শাসন। আবহমানকাল থেকে শুধু তো শাসনটুকুই আছে।
শাসন তো করে সব বাবা মা’ই। স্থানকালপাত্র ভেদে সেই শাসনের অর্থ পাল্টে যায়।
রাঁচি বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে মার কথাগুলো মনে পড়তেই একটা অসহ্য খারাপ লাগায় মেজাজ তেতো হয়ে গেল বৃষ্টির। ওদিকে সুদেষ্ণা একটানা গজগজ করে চলেছে, —এইসব ধ্যাধেড়ে বাসে যেতে হবে! এখনই তো ছাদে লোক উঠতে আরম্ভ করেছে! টানা ছ’ ঘণ্টা মুর্গিঠাসা অবস্থায়...।
অঞ্জন বলল,— তোর জন্য এখানে আলাদা গাড়ি থাকবে ভেবেছিলি নাকি? স্কুলে থাকতে কখনও বন্ধুদের সঙ্গে এক্সকারশানে যাসনি? নাকি সেখানেও তোদের বাড়ির গাড়ি যেত?
—তোরা ওভাবে নিচ্ছিস কেন? সুদেষ্ণার গলায় মিনতি,— এই বৃষ্টি, টুরের তো একটা অ্যালট্মেন্ট আছে, যদি কিছু এক্সট্রা লাগে আমি দিয়ে দিচ্ছি, স্যারের কাছে গিয়ে বল না একটা জিপ টিপ ভাড়া করতে। এখানকার লোকগুলোর গায়ে কী বোঁটকা গন্ধ! কেমন সব চোয়াড়ে চাষাড়ে টাইপ...
—এদের সঙ্গে যেতে তোর ঘেন্না করছে নারে? বিক্রম বলে উঠল, —কিন্তু আনফরচুনেটলি এরাই দেশের এইট্টি পারসেন্ট। যেতে হয় সবার সঙ্গে চল্, নয়ত দ্যাখ ফেরার টিকিট ফিকিট পাস্ কিনা।
বৃষ্টি জানে না এরকম পরিস্থিতিতে কি করতে হয়। তবে লোকাল লোকেদের সঙ্গে যেতে তার মোটেই আপত্তি নেই। কলকাতার বাসট্রামের যাত্রীর থেকে কি আর খারাপ হবে এখানকার লোকজন! বিক্রমের খোঁচাটা তবু ভাল লাগল না তার,
—তোর ওই ফাঁকা বুলিগুলো একটু বন্ধ কর্ তো। সুদেষ্ণার অসুবিধে হচ্ছে বলে একটা প্রোপোজাল দিয়েছে। এই নিয়ে তুই আর অঞ্জন ফালতু বুকনি শুরু করলি কেন?
—বুকনির কি আছে? যা বিশ্বাস করি, তাই বলছি।
—কি বিশ্বাস করিস?
—তোরা বুঝবি না। দিন রাত তো নিজেদের নিয়েই পড়ে আছিস। কামিজের কাটিং কিরকম হবে, কোথায় রাজস্থানী দুল পাওয়া যায়, কোথায় গুজরাটি নাকছাবি, চাইনিজ ডিশ পার্ক স্ট্রিটে ভাল, না ট্যাংরায়, এর বাইরে চিন্তা করিস্ কোন সময়? এর বাইরেও একটা দেশ আছে, সেখানে কোটি কোটি মানুষ হাড়ভাঙা খেটেও এক বেলার বেশি পেটের ভাত জোগাড় করতে পারে না...
সব সময় বিক্রম আর অঞ্জনের মুখে বিপ্লবের ফুলঝুরি ছুটছে! বৃষ্টির রাগ হয়ে গেল। বিক্রমকে জিজ্ঞাসা করল,
—তোর শার্টটার কত দাম রে?
—কেন?
—এমনিই। বল্ না। জিনস্টাও মনে হচ্ছে ফরেন্?
—এটা আমার কাকা পাঠিয়েছে কানাডা থেকে।
—তোর কাকা কি কানাডাতেই সেট্লড্?
—হ্যাঁ। সো হোয়াট?
—তুই ‘স্যাটে’ বসেছিলি না? স্যাট্ দিয়ে ইন্ডিয়ার কোন্ কোন্ গ্রামে পড়তে যায় রে ছেলেমেয়েরা?
বিক্রম এতক্ষণে বৃষ্টির ব্যঙ্গ ধরতে পেরেছে। তৃষিতাও মজা পেয়ে এগিয়ে এল,— তুই বিক্রমদের ঠাট্টা করছিস্ বৃষ্টি? দেখিসনি কিছুদিন আগে অঞ্জন কিরকম দাড়ি রেখেছিল? এই অঞ্জন, ওটা কার প্যাটার্ন ছিল রে? লেনিন? না হো চি মিন?
অঞ্জন অল্প থতমত খেয়ে গেল।
বিক্রম বলল, —ওই দ্যাখ, শুভ কি বলছে।
শুভ চেঁচিয়ে সকলকে ডাকছে, —অ্যাই, তোরা এদিকে আয়। এই বাসটা আগে ছাড়বে। আমি সিটে খবরের কাগজ রেখে এসেছি।
দেবাদিত্য বৃষ্টিদের পাশে এসে দাঁড়াল, —শুভটা হেভি বোর হচ্ছে বুঝলি। তখন থেকে মাল কেনার ধান্দা করে যাচ্ছে; স্যার ওকে কিছুতেই ছাড়বেন না। খালি বলছেন, শুভ তুমি বেশ স্মার্ট আছ, তুমি সঙ্গে থাকলে আমি কনফিডেন্স পাই।
মীনাক্ষী হেসে উঠল, —ঠিক হয়েছে। উচিত জব্দ।
দেবাদিত্য, মীনাক্ষী আর তৃষিতা আগে আগে হাঁটছে। হাতে হাতে নিজস্ব লাগেজ। অরিজিৎ বৃষ্টিকে বলল,
—ভাল ধরেছিলি দুটোকে। সব সময় ধান্দা চালাচ্ছে কি করে আমেরিকায় কেটে পড়বে। কিছু বললেই উল্টো জ্ঞান দিয়ে দেয়। বলে যাব তো নলেজ গ্যাদার করতে, নলেজের আবার স্বদেশ বিদেশ কি? বাপ্ মার পকেট বেশি গরম থাকলে বক্তৃতা দিয়ে ভিজে ঘাসেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া যায়।
অরিজিতের মত রামপড়ুয়ার মুখে এ হেন কথাবার্তা বৃষ্টি আশা করতে পারেনি। বৃষ্টি একবার ঘড়ি দেখল। আটটা কুড়ি। এখনও ভোরের শীত লেগে রয়েছে রাঁচির বাতাসে। সূর্য যথেষ্ট চড়া কিন্তু রোদ্দুরের তাত এখনও পুরোপুরি ফুটে বেরোচ্ছে না। অরিজিতের কথায় ফিরোজ আঙ্কলের সেদিনের চেঁচামিচি মনে পড়ল বৃষ্টির। মা’র দু’একজন কলেজের বন্ধু পাকাপাকি ভাবে প্যারিসে থেকে গেছে; তাদের ওপর কি রাগ ফিরোজ আঙ্কলের,
—বিদেশে গিয়ে থাকতে চাস্ থাক, প্যারিসে নাইটক্লাব আছে, সাতচল্লিশ রকমের পাঁউরুটি পাওয়া যায়, দুশো রকমের মদ, তোর ইচ্ছে না হলে তুই ফিরিস না। তা বলে যদি কোন পুঙ্গির পুত বলে শিল্পের আত্মা খুঁজতে আমি ভিখিরির দেশ ছেড়ে প্যারিসে গিয়ে পড়ে আছি তবে সে ব্যাটা মিথ্যুকেরও বেহদ্দ। ডোন্ট মাইন্ড ইয়াং লেডি, এই লোকগুলো কেন্নোরও অধম।
রেগে গেলে দু’একটা দেশের গালাগাল বেরিয়ে যায় ফিরোজ আঙ্কেলের মুখ থেকে। বৃষ্টি আরেকটু তাতানোর চেষ্টা করেছিল,
—তাই তুমি এখানে আর্টিস্ট কলোনি করতে চাইছ?
—কারেক্ট। আমার কলোনিতে সব আর্টিস্ট স্বাধীনভাবে কাজ করবে।... একটা কমিউনিটি লাইফ, যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেককে ফিল করছে, চিন্তা কমিউনিকেট করছে, ভাষা কমিউনিকেট করছে। এ নিউ ফর্ম অফ আর্ট মুভমেন্ট। ক্রিয়েটিভ আর্টের জগতে ইনডিভিজুয়ালের যেমন একটা মূল্য আছে, গোষ্ঠীবদ্ধতারও একটা মূল্য আছে।
—সেই জন্যই তো প্যারিসে....
—হোয়াই প্যারিস? হোয়াই নট ইন মাই সিটি? আমার কলোনিতে থাকবে ছোট ছোট অজস্র কটেজ, সেখানে হলুদ রোদ, সঙ্গে সবুজের চালচিত্র। আমি দেখাতে চাই আমার শহরও কি পারে। যদি আমরা চাই।
ফিরোজ আঙ্কল কী ভীষণ ভালবাসে কলকাতাকে। বোধহয় বৃষ্টির থেকেও অনেক বেশি।
বাসে উঠে পিছনের সিটে চোখ চলে গেল বৃষ্টির। রণজয় আর পরভিন তন্ময় হয়ে গল্প করছে।
অনেকক্ষণ থেমে আছে বাসটা। বৃষ্টি জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। আনমনা চোখ একটা দোকানের দিকে পড়তেই কারেন্ট খেলে গেছে শরীরে। দোকানটাকে সে চেনে! সাধারণ গঞ্জ মতন জায়গায় ওষুধের দোকান। ময়লা সাইনবোর্ড। বাস থেকে মনে হচ্ছে ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। বৃষ্টির চোখ চঞ্চল। ওই তো দরজির দোকানের সাইন বোর্ডে লেখা, কুরু। বাস থেকে নেমে ওই দোকানেই তো ঢুকেছিল বাবা!
... কাগজে মোড়া বড় একটা বোতল ভরে ফেলল কাঁধের ব্যাগে। তারপর পাশের দোকান থেকে শালপাতার ঠোঙায় একরাশ জিলিপি। কমলারঙ, গরম, মুচমুচে, কিটকিটে মিষ্টি। বাসে ফিরতেই মা হিশহিশিয়ে উঠল,
—ফের তুমি কিনলে ওসব? একটা দিন না গিলে থাকতে পারো না?
বাবার মুখে অপ্রস্তুত হাসি,—রাঁচি থেকে নিতে ভুলে গেলাম। খাচ্ছি তো এইটুকুন, মেডিকেল ডোজ।
মা একবার ছোট্ট বৃষ্টিকে দেখে নিয়েই জানলার বাইরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ থেকে সানগ্লাস বার করে পরে নিল। শাড়ির আঁচলে মুখ নাক চাপা। ভয়ানক ধুলো উড়ছে। সব ঝাপসা।...
সুদেষ্ণা ড্রাইভারের পিছনের লেডিজ সিটে বসে এই ডিসেম্বরেও দরদর ঘামছে। দেবাদিত্যরা শেষের টানা লম্বা সিটে কোরাসে গান ধরেছে। বিক্রম গেয়ে উঠল,
—চিটে গুড়ে পিঁপড়ে পড়লে...
বাকিরা দোহারকি দিল, —নড়তে চড়তে পারেএএ না...
সাঁওতাল মেয়েরা ওদের ভঙ্গি দেখে এ ওর গায়ে হেসে গড়াগড়ি। টি এম মুখ ঘুরিয়ে রয়েছেন। এ সময় মাস্টারমশাইরা প্রকৃতি দেখতে ভালবাসেন।
বাসে বেশির ভাগই স্থানীয় উপজাতির মানুষ। দুজন সাঁওতাল যুবক মীনাক্ষীর পাশের জানালা বেয়ে তর তর করে ছাদে উঠে গেল। মীনাক্ষী ভয়ে হাত সরিয়ে নিল। বাসে ওঠার পর থেকেই সিঁটিয়ে ছিল মেয়েটা।
বাস দাঁড়িয়েই রয়েছে। মনে হয় এখানে আজ হাটবার।
পিছন থেকে শুভর চিৎকার শুনতে পেল বৃষ্টি, —এই মেয়েরা, তোরা গাইছিস্ না কেন? তৃষিতা, তুই তো সব সময় গলা মেলাস্, তুই গা।
তৃষিতা ঘাড় ঘুরিয়ে ভেংচি কাটল। ভিড়ের ফাঁক দিয়ে কেউ দেখতে পেল বলে মনে হল না। তৃষিতার কোলের পাশে এক আদিবাসী শিশু জড়োসড়ো দাঁড়িয়ে। কন্ডাক্টর তাকে টেনে সরিয়ে দিল,
—ইধার আ যা। মেমসাব কো তন্ মত্ কর্।
মীনাক্ষী তৃষিতার ঊরুতে চিমটি কাটল,
—এই, কন্ডাক্টর তোকে মেমসাহেব বলছে।
লোকটাকে দেখে বৃষ্টির হাসি পেয়ে গেল। কি বিদ্ঘুটে চুলের ছাঁট, জুলপি চাঁছা, ব্যাকব্রাশ করা চুল ঘাড় অবধি লতানো, রাস্তার হিন্দি সিনেমার পোস্টারে যেরকম দেখা যায়। হিরোস্পেশাল। মাথায় তেলও মেখেছে অঢেল। তেলের উগ্র গন্ধ বাতাসে ম-ম করছে। এমন একটা লোকের মুখে মেমসাহেব সম্বোধন শুনেও তৃষিতা বেশ বিগলিত। তৃষিতার গায়ের রঙ যথেষ্ট চাপা, কালোই বলা যায় তাকে। মেমসাহেব বলে ডাকলে ভিখিরিকেও বেশি পয়সা দিয়ে ফেলে সে। লজ্জা লজ্জা মুখে বলল,
—ফাজলামো হচ্ছে? তোরা যাই বল লোকটার ফিজিক কিন্তু দারুণ।
বৃষ্টি মীনাক্ষি চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। বাসটাও ছাড়ল ঠিক সেই মুহূর্তে। ধীরে ধীরে ঘামের ওপর উষ্ণ বাতাসের ছোঁয়া। শীতের শুরুতেও এসব অঞ্চলে দুপুরে এত গরম থাকে কি করে কে জানে!
দূরে ছোট ছোট টিলা দেখা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বৃষ্টি বলল, —মীনাক্ষি, তুই বিহারের এদিকটায় আগে কখনও এসেছিস?
—এদিকে আসিনি, তবে মধুপুরের দিকে গেছি। ওখানে আমাদের একটা বাগানবাড়ি আছে। প্রায় শীতেই বাড়িসুদ্ধ দলবেঁধে হল্লা করতে যাওয়া হয় ওখানে। তুই এসেছিস?
—এসেছিলাম একবার। ছোটবেলায়। তেমন খুব একটা মনে নেই।
—এদিকটা ভীষণ ড্রাই। মধুপুরের দিকে আমগাছ-টাছ আছে প্রচুর।
—ড্রাই সয়েলেরও একটা রাফ বিউটি আছে। কি সুন্দর তালে তালে টিলাগুলো আসছে আর মিলিয়ে যাচ্ছে দ্যাখ।
বেলা তিনটে নাগাদ বাস থামল এক গ্রামে। এর পর থেকে শুরু হবে পাহাড়, জঙ্গল। বাস মিনিট দশেক দাঁড়াবে বলে সবাই নেমে পড়ে হাত-পায়ের খিল ছাড়াচ্ছে। শুভ লম্বা অ্যাথলেটিক চেহারা কোমর থেকে ভাঙছে আর সোজা করছে। কাল অনেক রাত অবধি ট্রেনে যে উন্মত্ত হুড়োহুড়ি করেছে তার কোন চিহ্নই নেই কারুর শরীরে। ঘণ্টা তিনেক ঘুমিয়েই সব আবার তরতাজা।
—ইয়ে বনারি হ্যায় তো?
অঞ্জন চিৎকার করে গল্প জুড়েছে এক থুরথুরে বুড়ির সঙ্গে। জনসংযোগ! বুড়ি কি বুঝল কে জানে, ফিক করে হাসি উপহার দিল একটুকরো।
—ইধর কোয়েল নদী কাঁহা হ্যায়? কোয়েল? কোয়েল?
বৃষ্টি অঞ্জনকে ডাকল, —এই ফিরে আয়। ওই টোনে হিন্দি বলে আর লোক হাসাস না।
অঞ্জন থামল না।
—তুমহারা গ্রামকা কাছমে হোনা চাহিয়ে। ম্যাপমে দেখা হ্যায়। ম্যাপ জানতা হ্যায়? ম্যাপ? অ্যাটলাস্?
দেবাদিত্য বলল, —তোর ওই ল্যাঙ্গুয়েজ ট্রাইবাল বেল্টে চলবে না। এখানে দরকার সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ। দেখব নাকি একবার ট্রাই করে?
এদের মাঝে পড়ে বুড়ি বিড়বিড় করে কি যে বলে চলেছে বোঝা যায় না।
টি এম একা হাঁটতে হাঁটতে উল্টোদিকে চলে গিয়েছিলেন, ফিরে এসে ডাকছেন ছেলেমেয়েদের,
—এখান থেকে পাহাড়ে ওঠার পর একটা রাস্তা সেপারেট হয়ে চলে গেছে বেতলা ফরেস্ট, ডাল্টনগঞ্জ। ওই পথে একটা ফিফটিনথ সেনচুরির বিধ্বস্ত কেল্লা আছে। তাছাড়া রাজা মেদিনী রায়ের ভাঙাচোরা মাটির ফোর্টও পড়ে পথে। আর কিছুটা গেলে...
—ক্লাস নিচ্ছে রে, কেটে পড়।
ক্রমে সকলেই টি এম এর কাছ থেকে দূরে সরতে সরতে বাসের কাছে। বিক্রম বাসে হেলান দিয়ে দামী ক্যামেরাটা নিয়ে খুটখাট করছিল। রণজয় বাসের জানালা দিয়ে প্রশ্ন করল,
—ক্যামেরায় কিছু প্রবলেম হচ্ছে নাকি?
—টাইমারটা মনে হয় গণ্ডগোল করছে।
—ছাড় তো, টাইমার দিয়ে কি হবে? ছবি উঠলেই হল।
বিক্রম সামান্য অন্যমনস্ক ছিল। হঠাৎই রণজয়ের দিকে তাকিয়ে কান এঁটো করে হাসল, —আরে, খেয়ালই করিনি তুই কথা বলছিস। তোরাও যাচ্ছিস নাকি আমাদের সঙ্গে!
রণজয় পরভিন বাস থেকে নামেনি। বিক্রমের ঠাট্টা গায়ে মাখল না তারা।
বাস স্টার্ট নিচ্ছে। কন্ডাক্টর ডাকল, —চলিয়ে, চলিয়ে, পোঁহুছনেমে অ্যায়সে হি শাম হো যায়েগি।
শুভ বাসের আড়ালে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। ধ্যাত্তেরি বলে ছুঁড়ে ফেলে দিল সিগারেট।
কন্ডাক্টর ভুল বলেনি। বাস থেকে নেমে গভর্নমেন্ট লজের ডরমেটরিতে ঢুকতে ঢুকতে সূর্যের প্রায় চিহ্নমাত্র নেই। পাহাড়ে ওঠার পর থেকেই গরমের ছিটেফোঁটা মুছে গিয়েছিল। এখন বেশ কনকনে পাথুরে ঠাণ্ডা। অন্ধকার ভাল করে নামার আগেই চতুর্দিক হিমশীতল।
ছেলেরা মেয়েরা পৃথক পৃথক দুটো ঘরে। টি এম-এর একার জন্য একটা ডবল বেড়। মেয়েরা এসেই প্রথমে বাথরুম দখল করতে শুরু করে দিয়েছে। সারাদিনের রোদখাওয়া ধুলোমাখা মুখ এক্ষুনি মসৃণ চকচকে করে ফেলতে হবে।
বৃষ্টি শাল জড়িয়ে বাইরের আঙিনায় এসে দাঁড়াল। পশ্চিম আকাশে এখনও সামান্য লালচে আভা। বৃষ্টির সামনের পাহাড়গুলো যদিও এর মধ্যেই অন্ধকার মেখে নিয়েছে গায়ে। যেন গুটিসুটি মেরে বসে থাকা কালো বুড়ো। ট্রেনের জানলা থেকে দেখা ব্রাহ্ম মুহূর্তের আকাশটা সারাদিনে কতবার যে রঙ বদলাল! রাঁচিতে ঢোকার আগে, ভোরের আলো যখন পাহাড়ে পড়েছিল, তখন
পাহাড় যেন নীল সবুজে মেশা এক ধ্যানস্থ সন্ন্যাসী, আবার সেই পাহাড়রাই দুপুরে বাস থেকে একদল বর্ণহীন প্রবল পুরুষ, এখন সন্ধ্যায় তারাই অসহায় কালো বৃদ্ধ।
নিখিলমামা বলত, —বুঝলি বৃষ্টি, ইন্অ্যানিমেট্ অবজেক্টের কোন নিজস্ব ক্যারেক্টার থাকে না। সেটা কোথায় রয়েছে, কেন রয়েছে তার ওপর কিভাবে লাইট অ্যান্ড শেড কাজ করছে, সেটাই ঠিক করবে বস্তুর ক্যারেকটর। যেমন ধর তোদের ওই দুধঅলার সাইকেলটা। ভোরবেলা যখন দুপাশে দুধের ক্যান ঝুলছে, তখন মনে হয় না সাইকেলটা যেন বাঁক কাঁধে জল দেওয়ার ভারী? আবার ওই সাইকেলের হ্যান্ডেলের মাঝখানটায় লাল টুপি বসিয়ে দে, ওটা তখন হয়ে যাবে বুলফাইটের ষাঁড়। ম্যাটাডোরের দিকে রেগে ছুটছে।
বৃষ্টির ছোটতে কী নেশাই না ছিল আঁকার! বলতে গেলে নিখিলমামার কাছেই তার নাড়া বাঁধা।
ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় বৃষ্টিদের স্কুলে এক বিরাট সিট্ অ্যান্ড ড্র কমপিটিশন হয়েছিল। আট-দশটা স্কুল মিলিয়ে হাজারখানেক ক্ষুদে শিল্পী। বৃষ্টি ফার্স্ট। প্রাইজ ডে’র দিন মা আসবে বলে কথা দিয়েও আসেনি। সেদিনই কার একটা এগজিবিশনের প্রিমিয়ারে আটকে গিয়েছিল। হয়ত কোন নামকরা আর্টিস্টের। হয়ত কোন বন্ধুর। অনেক রাত্রে প্রাইজ দেখে মা বৃষ্টিকে আদর করার চেষ্টা করেছিল,
—তোর রাগ হয়েছে বৃষ্টি? কি করব বল, এমনভাবে সবাই আটকে দিল...
বৃষ্টি একটা কথাও বলেনি। একফোঁটা জলও আসেনি তার চোখে। দাদু দিদা মা ভালমামা কেউই বুঝতে পারেনি আর কোনদিন ছবি আঁকবে না বৃষ্টি।
বৃষ্টির মনে হল এই মুহূর্তেই তার একটা সিগারেট দরকার। একটা সিগারেট। একটা সিগারেট।
ছেলেরা কোত্থেকে তিন-চারটে লাঠি জোগাড় করে ফেলেছে। এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছে আর অন্ধকারে ঝোপেঝাড়ে অকারণ লাঠি চালাচ্ছে। কীটপতঙ্গ সাপখোপ কি যে ওরা মারে।
টি এম্ ম্যানেজারের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঘোষণা করলেন, —লাস্ট মান্থে এখানে একটা বাঘ বেরিয়েছিল। যে জঙ্গলটা রয়েছে সেখান থেকেই। ইউজুয়ালি এদিকে বাঘ থাকার কথা নয়, তবে কোন কোন সময় অন্য রেঞ্জ থেকে চলে আসে এক-আধটা। লোকাল গ্রামের কুঁড়েঘর থেকে একটা ছাগল তুলে নিয়ে গেছে। তোমরা যখন তখন যেখানে সেখানে বেরোবে না। যদিও প্রতিটি বাঘের একটা নির্দিষ্ট জোন্ থাকে...
দেবাদিত্য থামিয়ে দিল টি এম-কে, —গাঁয়ে মানুষ ছিল না স্যার? নাকি বাঘেরাও আমাদের মতো মাটন্ খেতে ভালবাসে?
বিরলকেশ, সৌম্যদর্শন অধ্যাপক হেসে ঘরে চলে গেলেন। এসব ট্যুরে ছেলেমেয়েদের টীকাটিপ্পনি উপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সুদেষ্ণা বারান্দা থেকে বৃষ্টিকে ডাকল,
—এই বৃষ্টি, বাথরুম খালি। মুখ হাত ধুবি তো চলে আয়।
বৃষ্টির জায়গাটা ছেড়ে একটুও নড়তে ইচ্ছে করছে না। চাঁদ ওঠার পর অন্ধকার অনেক মিহি। দূরে, বহু নীচে, কয়েকটা আলোর ফুটকি। কোন গ্রামট্রাম! না শীতে স্থানীয় অধিবাসীরা কাঠকুটো জ্বেলেছে!
...ছ’ ফুট লম্বা, ফর্সা, মেদহীন শরীরে পুঁতে রঙ সোয়েটার পরে গটগট করে বাবা নেমে যাচ্ছে পাইন গাছের মাঝখান দিয়ে। নামতে নামতে নামতে নামতে একটা দীঘির পাড়ে গিয়ে হারিয়ে গেল।
—মা, বাবা কোথায় চলে গেল?
—জাহান্নামে। চল, আমরা ফিরি।
—বাবা আসবে না?
—আসবে। সময় হলেই। নেশা ছুটলে।
ক্ষুদে বৃষ্টি একটা ইটের টুকরো তুলে ইউক্যালিপটাসের গুঁড়িতে কাঁচা হাতে বানান করে করে লিখে দিল, —বাবা, জলদি এসো।...
বাবা এখনও ফরিদাবাদে। কবে যে ফিরবে!
—কিরে, একটা সিগারেট চলবে নাকি? ধর, অনেকক্ষণ তো শুকননা আছিস।
চাঁদের আবছা আলোয় শুভর মুখ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল না বৃষ্টি।
—লজ্জা করে না বলতে? নিজেরা ফাঁক পেলেই টুকটাক চালিয়ে যাচ্ছিস? গোটা দে একটা। আমার প্যাকেট রুমে।
সিগারেট ধরিয়ে সারাদিন পর মৌজ করে টান দিল বৃষ্টি। চোখ বুজে অনেকক্ষণ ধরে ধোঁয়াটাকে গিলল।
—আহ্। মাথাটা একদম ধরে গেছিল। চা-ফা দেবে না?
—চা খেয়ে কি হবে? বিক্রম আর রণজয় ট্রাইবালদের ঠেকের দিকে গেছে। এখানে এসে যদি মহুয়া দিয়েই না শুরু করা যায়....
—তুই সত্যি কলকাতা থেকে কিছু আনিসনি? সেদিন যে খুব হিড়িক তুললি?
—ধুস্, কেউ কন্ট্রিবিউট করল না। নিজের পয়সায় আনি আর সবাই মিলে ফাঁক করে দিক।
—টি এম্ ঝামেলা করবে না তো?
পরভিন কখন গুটিগুটি এসে বৃষ্টির পাশে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টির কথায় হি হি হেসে উঠল, —স্যারের কাছেই একটা ছোট বোতল আছে। ব্যাগ খোলার সময় রণজয় দেখে ফেলেছে। অ্যাই শুভ, আমি কিন্তু আজ একটু মহুয়া টেস্ট করব।
—যা যাহ্। কতটুকুনি জোগাড় হয় তার ঠিক নেই। মেয়েরা বাদ। শেষে খেয়ে একটা কিছু কেলো করো...
বৃষ্টি ছুঁসে উঠল, —এম সি পির মতো কথা বলিস না তো। মাল খাওয়ায় আবার ছেলেরা মেয়েরা কিরে?
রাতে খাওয়াদাওয়ার পর শাল কম্বল পুলোভার জড়িয়ে সকলে বসেছে বারান্দায়। টি এম এতক্ষণ ম্যানেজারের সঙ্গে গল্প করছিলেন, একটু আগে শুতে গেলেন। গোটা ট্যুরিস্ট লজ নিস্তব্ধ। বোর্ডাররা যে যার বন্ধ ঘরে। বাঙালি নবদম্পতি অনেকক্ষণ বাইরে বসেছিল, তারাও একটু আগে দরজা বন্ধ করেছে।
শুভ গুম হয়ে বসে আছে। বিক্রমরা একফোঁটা মহুয়াও জোগাড় করতে পারেনি। অঞ্জন মাউথ অরগ্যান বাজিয়ে সুর ধরল,
—হ্যায় আপনা দিল, তো আওয়ারা...
না জানে কিস্পে আয়েগা...
সারাদিন পর মন উদাসকরা সুরে চোখ জড়িয়ে আসছে সকলের। দেবাদিত্যর মতো ছেলেও নিশ্চল তাকিয়ে দূরের আঁধারের দিকে। আকাশে পাতলা মেঘের স্তর থাকায় চাঁদের দীপ্তি ছড়াচ্ছে না পুরোপুরি।
...ঘুম ভেঙে গেছে অন্ধকারে। কম্বল পায়ের কাছে জড়ো। বিছানায় উঠে বসতেই দুটো চাপা কণ্ঠস্বর।
—ভেবে থাকলে অন্যায় কি? মেয়ে পড়ে থাকবে আর মা ড্যাং-ড্যাং করে লন্ডন প্যারিসে বেড়াতে যাবে!
—তুমি অফিস ট্যুরে যাও না? তখন মেয়েকে কে দেখে? আসলে তোমাকে আমার হাজব্যান্ড বলে পরিচয় দেওয়া হয়, সেটাই তোমার আঁতে লাগে। হিংসুটে কোথাকার। টাকার ধান্দা ছাড়া তো জীবনে কিছু শেখোনি।
কাচের গ্লাসে টুং-টাং শব্দ। মা খাটে ফিরেছে। বন্ধ চোখেও বৃষ্টি বুঝতে পারছে মা দেখে নিচ্ছে মেয়ে ঘুমিয়েছে কি না। আবার ফিরে গেছে।
—আমি বলছি তুমি যাবে না। যাবে না ব্যস।
—একশো বার যাব! এ সুযোগ বার বার আসে না। একবার তোমার জন্য ফ্রেঞ্চ-স্কলারশিপ মিস্ করেছি...
—আমার জন্য? না বাচ্চা হবে বলে?
—তুমিই তো ফাঁসিয়েছিলে। ইচ্ছে করে। যাতে আমি না যেতে পারি তাই। ...
এত বছর পর দৃশ্যগুলো কেন উঠে আসছে বৃষ্টির চোখে? আসছেই যদি তবে কেন শুধুই ভয়ঙ্কর সেগুলো? বুক ভেঙে আচমকা একটা কান্না উঠে আসতে চাইছে। চোখের দু কূল ছাপিয়ে গেল। অঞ্জনের সুর ভেঙে দিল শেষ প্রতিরোধ। নিঃসীম ফিকে জ্যোৎস্না মিলিয়ে গেল চোখের জলের পর্দার ওপারে। বৃষ্টি হাঁটুতে মুখ গুঁজল।
ফ্রিসবিগুলো বাতাসে ভাসছে। ভাসতে ভাসতে, দুলতে দুলতে এক হাত থেকে অন্য হাতে যাচ্ছে, সেখান থেকে আরেক। শুভ হলুদ ছুঁড়ে লুফে নিল নীল। মীনাক্ষি নীল ধরে গোলাপি ছুঁড়েছে। বিক্রম সবুজ ছুঁড়ে লাল। প্লাস্টিকের চাকতি নয়, যেন একঝাঁক রঙিন পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে মায়াবী রোদ্দরে বিকেলের আকাশে। শীতল বাতাস কেটে কেটে। পাইন গাছের ওপারে, মাঠের প্রান্তে মিলিটারি ছাউনি থেকে দু-চারজন জওয়ান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে রঙিন পাখিদের ওড়াউড়ি।
দেবাদ্যি একটা সবুজ ফ্রিসবি ছুঁড়ে দিল বৃষ্টির দিকে,
—এই বৃষ্টি ধর।
চাকতিটা সামনে এসেও সোঁ করে মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে লেকের পাড়ে। সুদেষ্ণার ছোঁড়া নীল ফ্রিসবি বৃষ্টির নাকের সামনে দিয়ে হাওয়ায় বেঁকে চলে গেল শুভর দিকে। বিক্রমের হলুদ চাকতি বৃষ্টির আঙুল ছুঁয়ে পালিয়ে গেল। বৃষ্টি অধৈর্য হয়ে উঠছে। আশ্চর্য! সবাই কি সহজেই ধরে ফেলছে, সে কেন পারছে না? এবার ধরতেই হবে। লাফিয়ে উঠতে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়েছে নিজেরই সালোয়ারে পা জড়িয়ে। স্বচ্ছ ওড়না ছিটকে গেল!
দেবাদিত্য দাঁত বার করে হেসে উঠল,
—এবার পারবি। ওঠ। ধর।
বৃষ্টি কামিজের ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল। সব আনন্দের মুহূর্তই তার আঙুলে ছোঁয়া দিয়ে দূরে সরে যায়। কই, আর কারুর তো এরকম হচ্ছে না!
বৃষ্টির ফর্সা মুখে রক্ত জমেছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। দুটো পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে, কোন এক সুড়ঙ্গ পথ ধরে কনকনে বাতাস দৌড়ে আসছে হঠাৎ হঠাৎ।
ইউক্যালিপটাসের একটা সরু ডাল ভেঙে শুঁকছে অরিজিৎ। বৃষ্টি তার দিকে এগিয়ে গেল,
—চল, একটু হেঁটে আসি।
অরিজিৎ দলের সঙ্গে থাকতে সব সময়ই অস্বস্তিবোধ করে। বৃষ্টি লক্ষ করেছে, যে কোন একজনের সঙ্গে কথা বলার সময় সে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। স্বাভাবিক। অকারণে চশমা খুলে রুমাল দিয়ে চোখ মোছা অরিজিতের প্রিয় মুদ্রাদোষ। বৃষ্টির হাতে ডালটা ধরিয়ে সেই কাজটাই সারল সে। তারপর বলল,
—চল। আমারও ওই ফ্রিসবি খেলা ঠিক আসে না।
শুভ চিৎকার করে বলল,—তোরা চললি কোথায়?
বৃষ্টি গলা ওঠাল,—পরভিন রণজয়কে খুঁজতে।
—অরিজিৎ এখনও মাইনর আছে। ওকে নিয়ে যাস না। তেমন কিছু সিন দেখে ফেললে ওর চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিবি। সেন্সরড হয়ে যাবে।
অরিজিৎ কিছুই বুঝতে পারল না,
—কেন রে? কি হয়েছে রণজয়দের?
বৃষ্টি উত্তর দিল না। মনে মনে বলল, হয়নি। হবে। তখন মজা বুঝবে।
হাঁটতে হাঁটতে অপেক্ষাকৃত নির্জন জায়গায় চলে এসেছিল অরিজিৎ আর বৃষ্টি। এখানে গাছপালা একটু বেশি ঘন, শাল ছাড়াও বেশ কয়েকটা পলাশ, মহুয়া, সেগুন গাছও রয়েছে। বাতাসের ফিসফাস ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না এই মুহূর্তে।
অরিজিৎ আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল।
—কিরে, কি হল তোর!
—ভাল লাগছে না রে। আর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না।
ছোট্ট লাল নুড়ি তুলে অরিজিৎ ছুঁড়ল সামনের শালগাছের গায়ে।
—এই শালবনে যদি সারাটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যেত। ওই জঙ্গলে কুঁড়েঘর তৈরি করে আদিবাসীদের মতো থাকতে পারতাম।
বৃষ্টির ভুরু কুঁচকে গেল। মেয়েদের একা পেলেই অনেক ছেলে অহেতুক রোমান্টিক হয়ে উঠতে চায়। গত বছরই লেকের ধারে তাকে একা পেয়ে পিকলুও কেমন গদগদ হয়ে পড়েছিল।
গম্ভীর মুখে অরিজিৎকে বলল,
—এনাফ্। অনেক হয়েছে। চল, এবার ফেরা যাক।
—বিশ্বাস করছিস না আমাকে? সত্যি বলছি, অন গড, আমি আর পারছি না। কলকাতায় ফিরে সেই আবার মুখ গুঁজে পড়াশুনো, বই নোটস...। অরিজিৎ থেবড়ে মাটিতে বসে পড়ল।
হল কি ছেলেটার! এ তো ঠিক প্রেম নিবেদনের সংলাপ নয়! বৃষ্টি ধীর পায়ে অরিজিতের পাশে এসে নিচু হল।
—কি হল তোর বল তো?
—কী হালেই না জুতে দিয়েছে আমাকে বাবা মা। সেই ক্লাস ওয়ান থেকে। ওয়ান থেকে কেন? নার্সারি থেকেই। স্কুলে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে, উল্টোদিকের বাড়ির সিঁড়িতে, ঠায় বসে থাকত মা। স্কুল থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ত, দেখি দেখি, কি টাস্ক দিয়েছে? ক্লাস ওয়ার্কে কত পেলি? হিঁচড়োতে হিঁচড়োতে বাড়িতে এনেই আবার বই-এর সামনে, তোমাকে বড় হতে হবে বাবুন, মন দিয়ে পড়াশুনো করো। ক্লাস ফাইভ থেকে স্কুলের পরে টিউটোরিয়াল। বাড়ি ফিরতে সেই সন্ধে। কোন লাইফ নেই। খেলা নেই। গল্পের বই পড়বে না। মাধ্যমিকের আগে সায়েন্স গ্রুপের জন্য তিনটে টিউটর লাগিয়ে দিল। এককাঁড়ি খরচা, তবুও। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা। শরীর টলছে। মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে। তোতাকাহিনীর পাখিটার মতো। কানের কাছে ভনভন চলছে, তোকে নিয়ে আমাদের খুব আশা বাবুন। যেন আরেকটা জে সি বোস বা সি ভি রমন চাই। চাই-ই। মাধ্যমিকে অঙ্কে পেলাম ফরট্টিফোর।
—মাত্র ফরট্টিফোর? কেন রে?
—নয়তো কি? অঙ্ক আমার একটুও ভাল লাগে না। মাথাতেই ঢোকে। শেষমেষ বাধ্য হয়ে এইচ. এস-এ. আর্টস পড়া। মেনে নিল। এখন চায় আমি একটা পারসিভাল হই বা আর সি মজুমদার। সামথিং অরিজিনাল। বিগ্। নইলে বাবা মা আমাকে ছাড়বে না। কি করে বোঝাই হিস্ট্রি ইজ নট অলসো মাই কাপ অফ টি। আমার লিটারেচর ভাল লাগে।
—সেটাই পড়লে পারতিস।
অরিজিৎ শব্দহীন বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ। নখ দিয়ে এক মনে পাশের মাটি খুঁড়ছে। দূরে অপসৃয়মান সূর্যের ক্ষীণ রশ্মি এসে পড়েছে তার মুখে। এই ক’ মাসের চেনা অরিজিৎ একদম অন্যরকম। অবসন্ন।
—কি করে পড়ব? সাহিত্য পড়ে তো আর শেক্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ হওয়া যায় না! কী ভালই যে লাগত কবিতা পড়তে। তুই জীবনানন্দ পড়েছিস বৃষ্টি? সেই কবিতাটা? সেই যে,
পৃথিবী এখন ক্রমে হতেছে নিঝুম। সকলেরই চোখ ক্রমে বিজড়িত হয়ে যেন আসে;/ যদিও আকাশ সিন্ধু ভরে গেল অগ্নির উল্লাসে;/ যেমন যখন বিকেলবেলা কাটা হয় ক্ষেতের গোধূম/ চিলের কান্নার মতো শব্দ করে মেঠো ইঁদুরের ভিড় ফসলের ঘুম/ গাঢ় করে দিয়ে যায়। —এইবার কুয়াশায় যাত্রা সকলের।
অরিজিৎ যন্ত্রণায় নুয়ে পড়েছে। এক ক্লিন্ন, ন্যুব্জ, বৃদ্ধ যেন।
শালবনের ফাঁক দিয়ে অদূরে কিছুটা ফাঁকা জায়গা। তিন-চারটে মিশকালো আদিবাসী শিশু খেলা করছে সেখানে। ঢিল ছুঁড়ছে পরস্পরের দিকে। আদিম খেলা।
অরিজিতের পিঠে আলতো হাত রাখল বৃষ্টি, —চল্। ওঠ। অন্ধকার হয়ে আসছে।
শুভ রাগে ফেটে পড়ল, —অপদার্থের দল। দু দিনে একটু মহুয়া জোগাড় করতে পারলি না? তোরা টি. এম-কে সামলাস, আমি কাল নিজেই যাব।
বিক্রম বলল, —ওদের পাড়াতেও তো গিয়েছিলাম কিন্তু কাকে যে বলতে হবে সাহস করে সেটাই...
—এতে সাহসের কি আছে? পয়সা ফেলবি, জিনিস কিনবি। এত ক্যাবলা তোরা....
মীনাক্ষি আচমকা ঝাঁঝিয়ে উঠল, —তোদেরও বলিহারি যাই। বেড়াতে এসেছিস বলে কি খেতেই হবে? না খেলে কি হয়? বাবা মা বিশ্বাস করে ছেড়ে দিয়েছে আর তোরা এখানে...
মীনাক্ষির কথায় চোখ জ্বলে উঠল বৃষ্টির, —বেশি খুকিপনা করিস না তে। বাবা মা অনেক দেখেছি। বেড়াতে এসেছি, খেতে ইচ্ছে করছে, খাব।
—তুইও খাবি!
খাবোই তো। ইচ্ছে হলে খেয়ে বেহেড হব। বাবা মা যা চাইবে, তাই করতে হবে নাকি সবসময়? তোর বাবা মা সব কাজ বুঝি তোর পারমিশান নিয়ে করে?
দেবাদিত্য মাঝখানে পড়ে থামাতে চাইল, —বৃষ্টি, কি হচ্ছেটা কি? মীনাক্ষি তো ঠিকই বলছে। খেতে ইচ্ছে করলে কলকাতা ফিরে গিয়ে যখন ইচ্ছে হয় খাবি। সাহস থাকলে বাড়ির লোকের সামনে খাবি। বেড়াতে এসে লুকিয়ে লুকিয়ে...
—এখানেও খাব। দরকার হলে বাড়িতে গিয়েও খাব। তুই আমাদের কথার মাঝখানে এসে ভাঁড়ের মতো দাঁড়িয়েছিস কেন?
মীনাক্ষি বলল, —দেবাদিত্য সরে আয়। না খেয়েই ও মাতাল হয়ে গেছে।
দেবাদিত্য হাঁ করে বৃষ্টির দিকে তাকিয়েছিল। বুঝি বৃষ্টিকে পড়তে চাইছে।
তৃষিতা বলল, —এই ছেলেরা, তোরা বেরো তো ঘর থেকে। ঘুম পাচ্ছে।
পরভিন বলল, —কি হয়েছে? আরেকটু থাকুক না ওরা। সবে তো রাত দশটা! কাল বাদে পরশুই তো...
সুদেষ্ণা মুখে কোল্ডক্রিম মাখছিল। তার বিদেশী নাইলন নাইটির ওপর শাল জড়ানো। মুখ ফিরিয়ে শান্ত গলায় পরভিনকে বলল, —তোর যদি ইচ্ছে হয় সারারাত বাইরে গিয়ে আড্ডা মার। আমরা ঘুমোব।
ছেলেরা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সঙ্গে পরভিন।
তৃষিতা চাপা গলায় বলল, —পরভিনটা ভীষণ বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। বাড়িতে সব সময় রিপ্রেশনের মধ্যে থাকতে থাকতে একটা সাংঘাতিক কিছু করবার ইচ্ছে গ্রো করে। ছেলেদের সঙ্গে জীবনে মেশেনি তো।
সুদেষ্ণা ঠোঁট ওল্টাল,—ও তো প্রথম প্রথম কলেজে এসে ফিলজফির অরিন্দমের সঙ্গেও কদিন ঘুরেছিল।
—বেশ রেবেল রেবেল ভাব এসেছে ওর মধ্যে। যেদিন ওর বাড়িতে জানবে...ওর দাদাসাহেব ওর ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে খাবে। আসলে যারা যত কনফাইন্ড থাকে...। দেখছিস না জার্মানি পোল্যান্ডে কি অবস্থা।
বৃষ্টি টান টান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। কি মনে হতে আবার উঠে বসেছে। বালিশের পাশে রাখা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বার করল। রাগটা না থিতোলে ঘুম আসবে না তার।
দুপুরবেলা খেয়ে উঠে বৃষ্টি একাই বেরিয়ে পড়ল লজ থেকে। জনা পনেরো আদিবাসী শালগাছের নীচে জটলা করছিল, একটা মেয়েকে ভরদুপুরে একা দেখে ঘুরে ঘুরে দেখছে। বৃষ্টি তাদের লক্ষই করল না। লালচে মেটে পথে এলোমেলো হাঁটল কিছুক্ষণ। জায়গাটা সত্যিই সুন্দর। লোকবসতি এত কম যে মাঝে মাঝেই মনে হয় সভ্য সমাজ থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে। ইউক্যালিপটাসের হাল্কা গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে রয়েছে। বৃষ্টি চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস টানল। আহ্।
হঠাই পশ্চিমের একটা বাড়িতে চোখ আটকে গেল বৃষ্টির। ওই বাড়িতেই সেবার উঠেছিল না! হলুদ রঙ বাড়ি। অ্যাসবেসটসের ছাদ! হয়ত ওটাই। হয়ত ওটা নয়।
বৃষ্টি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল বাড়িটার দিকে। গেটে ওয়াটার ওয়ার্কস ইন্সপেকশন বাংলোর সাইনবোর্ড। উকিঝুঁকি দিতেই নেভি-ব্লু লঙ্কোট পরা বুড়ো দারোয়ান বেরিয়ে এল।
—কিস্কো চাহিয়ে? শর্মাজি আভি নেহি হ্যায়।
বুড়োর কথা বৃষ্টির কানে ঢুকল না। সামনের লম্বা করিডোরে চোখ অশান্তভাবে ঘুরছে। ডানদিকে পর পর দুটো সেকেলে দরজা। বাঁদিকে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। বাগান। একটা অর্জুন গাছ। কুঁয়ো। এই বাড়িটাতেই ছিল তারা।
কোন্ ঘরটায় তারা ছিল! প্রথম, না দ্বিতীয়! একবার যদি দেখা যেত!
বুড়োকে অগ্রাহ্য করে বৃষ্টি এগোল। দুটো ঘরেই তালা ঝুলছে। বন্ধ ঘরে ফ্যাঁসফাঁস করে লড়াই করছে দুটো প্রাণী। দরজাতেও নখের আঁচড়ের আওয়াজ।
বৃষ্টি তীরবেগে বেরিয়ে এল। সোজা কাল বিকেলের মাঠটার দিকে হাঁটছে। কোথাও যদি একটু বসতে পারত সে! এই চড়া রোদের মধ্যে একটু ছায়া! একদম একা!
ফ্রিসবি খেলার মাঠ এখন শুনশান। মাঠের পরেই লেক। লেকের জল রোদ্দুরে ঝিকমিক। এই মাঠটাকেই দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ উপত্যকা বলে মনে হয়েছিল ছেলেবেলায়! ওই লেকটাকে টলটলে জলের হ্রদ! হয়ত এ রকমই হয়। ছোটবেলায় যা বিশাল, বর্ণময়, রোমাঞ্চকর, বড় হলে সেটাই একেবারে ছোট্ট, ম্যাড়মেড়ে। পাইন গাছগুলোকেও আর তত উঁচু লাগছে না বৃষ্টির।
ছ’ বেডের ডরমেটরির ষষ্ঠ বিছানায় ডাঁই স্যুটকেস, কিটসব্যাগ, জামাকাপড়, সোয়েটার। টুকিটাকি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে সকলে। কাল ভোরে ফেরার পালা।
সুদেষ্ণা খাটের বাজুতে রাখা শাল ভাঁজ করে তুলল নিজের স্যুটকেসে। স্যুটকেস বন্ধ করতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। আসার সময় কি করে যে সব জামাকাপড় ঢুকেছিল ভেতরে!
—অ্যাই তৃষিতা, একটু চেপে ধর না প্লিজ।
তৃষিতা চাপতে শুরু করল। নিশ্বাস বন্ধ করে। হাঁটু দিয়ে। হঠাৎ দমকা হাসি এসে ছিটকে বার করে দিল নিশ্বাসটাকে। স্যুটকেস ছেড়ে গড়িয়ে পড়েছে হাসতে হাসতে। হাসির দমকে দেহ কাঁপছে থর থর। পাগলের মতো অবস্থা প্রায়। কাপড়জামা গুছনো থামিয়ে বাকিরা হাঁ করে দেখছে তাকে।
মীনাক্ষি তার দু কাঁধ চেপে ধরল, —উন্মাদ হয়ে গেলি নাকি? কি হয়েছে। বলবি তো?
—ওই হানিমুন কাপল্টা ..হিহি.. হিহি... হিহি... গাছের আড়ালে গিয়ে ছেলেটা চুমু খাচ্ছিল মেয়েটাকে।... হিহি... তাদের ফেরার সময় কী করুণ অবস্থা।
সুদেষ্ণা আর মীনাক্ষিও হাসিতে ফেটে পড়ল। বৃষ্টিও। দুপুরের পর এই প্রথম প্রাণ খুলে হাসছে সে।
ম্যাগনোলিয়া পয়েন্টে সূর্যাস্তের পর জিপ প্রথমে মিলিটারি অফিসারের বউ ছেলেমেয়েকে পৌছতে গিয়েছিল, ফিরে এসে নিয়ে যাবে বাকি সকলকে। নবদম্পতিও ছিল বৃষ্টিদের সঙ্গে। জিপ জঙ্গলে মিলিয়ে যাওয়ার পর সদ্য কলেজে ওঠা ছেলেমেয়েদের দঙ্গল এড়িয়ে একটু বোধহয় একান্ত হতে চেয়েছিল দুজনে।
—কি গান গাইছিল মেয়েটা শুনেছিস? তুঁহু মম প্রাণ হে...। সুর করে দেখাতে গিয়ে তৃষিতার গায়ে গড়িয়ে পড়েছে সুদেষ্ণা।
তৃষিতা দম নেওয়ার চেষ্টা করল, —আর দেবাদিত্য কী না করছিল! এমন ভয় দেখাল দুজনকে...এখানে প্রায়ই বাঘ আসে, বুননা ভাল্লুক মহুয়া খেয়ে ঘুরে বেড়ায়...বিক্রম আবার ক্যামেরা নিয়ে মাঝে মাঝেই ট্রাই করে যাচ্ছিল যদি কোন ইনটিমেট শট নেওয়া যায়।
—নিয়েছে তো? জানিস না? ওই চুমু খাওয়ার সিন্টা? ফ্ল্যাশ জ্বলতেও ওরা টের পেল না। বলতে বলতে বৃষ্টি হেসে গড়াগড়ি। হাসতে হাসতে ঘুষি ছুঁড়ছে বালিশে।
—তোরা ওভাবে হাসছিস? পরভিনের মুখ হাসিহাসি কিন্তু হাসছে না,
—বেচারা মেয়েটা ভয়ে কিরকম কেঁদে ফেলল…
—তোর খুব মায়া হয়েছে নারে? তুইও কি ওরকম...?
—না হয় জিপটা আসতে একটু দেরিই করেছিল। অবশ্য জঙ্গলটা বেশ ঘন।
গুম গুম শব্দে দরজায় ধাক্কা পড়ছে। পরভিন ছিটকিনি খুলল। অঞ্জন আর শুভ।
—হাই বেবিজ! গেট রেডি ফর দা ক্যাম্পফায়ার।
—তোরা পেয়েছিস?
—শুভ অপদার্থ নয়। শুভ কোন কাজে ফেল করে না। তবে যে টেস্ট করবে তাকেই নাচতে হবে। আগে খেয়ে নিই চল, তারপর নীচের মাঠটায় গিয়ে...
ভালই ফেয়ারওয়েল ডিনারের বন্দোবস্ত করেছেন টি, এম। ফ্রায়েড রাইস, চিকেন দোপেঁয়াজা, কাস্টার্ড।
রুমে যাওয়ার আগে টি. এম আরেকবার বলে গেলেন,
—তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ো কিন্তু সকলে। কাল সকাল সাতটায় বাস।
আকাশ আজ তারায় তারায় ঝকঝক। আজকালের মধ্যেই বোধহয় পূর্ণিমা। ফিনফিনে মসলিনের মতো চাঁদের কিরণ ছড়িয়ে গেছে সকলের গায়ে, মুখে। উগ্র অথচ মিষ্টি একটা গন্ধ নাকে এসে লাগল বৃষ্টির। কি ফুল এটা! বুক ভরে ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করল। জঙ্গলে গাছেদের মাথায় রুপোলি সরের মতো জ্যোৎস্নার ঢেউ। সব দুঃখ ছাপিয়ে একটা ভাল লাগা। একটা অসম্ভব ভাল লাগা। সমস্ত পার্থিব অস্তিত্ব যেন তুচ্ছ হয়ে যায় এই ভাল লাগার কাছে। এই মুহূর্তেই যদি মৃত্যু হত বৃষ্টির!
শুকনো ডালপালার আগুন ঘিরে এগারোটা নিস্পাপ আত্মার মতো সকলে বসে। গোল হয়ে। মুখে তাদের কেঁপে কেঁপে উঠছে অগ্নিশিখা। পরভিনের মাথা রণজয়ের কাঁধে।
বিক্রম ওয়াটার বটল এগিয়ে দিল পরভিনকে,
—এক চুমুক। বেশি নয়।
বেশ কিছুটা গলায় ঢেলে ফেলল পরভিন। দু হাতে রণজয়কে জড়িয়ে ধরল।
বৃষ্টি তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে প্লাস্টিকের বোতল। ঢক ঢক করে অনেকটা গিলে নিল। একটা তীব্র কষা স্বাদ। মুহূর্তের জন্য নিশ্বাস বন্ধ।
আবার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে ঘরটা। তালা বন্ধ। ভেতরে দুটো রাগী জন্তু রোঁয়া ফুলিয়ে ঝগড়া করছে। থাবা খুলে নখ বার হয়ে এল। ক্ষতবিক্ষত করছে বৃষ্টিকে।
বোতল হাত ঘুরে শুভর কাছে। এক হেঁচকায় কেড়ে নিয়েছে বৃষ্টি। ঢেলেই চলেছে গলায়। শুভ বাধা দেবার আগেই।
—কি হচ্ছে কি? একাই সবটা মেরে দিবি নাকি? শালা কালেকশনে কেউ যাবে না... কারুর মুরোদ নেই...
অঞ্জন উঠে বোতলটা নিয়ে নিল।
দেবাদিত্য আর অঞ্জন একসঙ্গে ড্যানি হুইটেন ধরেছে—
আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু টক অ্যাবাউট ইট...
আই ডোন্ট... আই ডোন্ট... আই ডোন্ট...
রণজয় পরভিনকে হাত ধরে টেনে তুলল। সঙ্গে মীনাক্ষি তৃষিতা। বিটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঁচজন নাচতে শুরু করেছে। মীনাক্ষি বা তৃষিত মহুয়া না খেলেও নাচে কম উৎসাহী নয়।
আগুন থেকে সিগারেট ধরিয়ে নিল সুদেষ্ণা আর বৃষ্টি। গানের তালে তালে ক্ল্যাপ দিচ্ছে বাকি সবাই। অরিজিতও।
উঠতে গিয়ে বৃষ্টির পা টলে গেল। সুদেষ্ণার কাঁধে চাপ দিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনরকমে দাঁড়াতে পেরেছে। নাচবার চেষ্টা করছে। শিথিল পা বেসামাল বার বার। তবুও আগুন ঘিরে টলমল পায়ে নেচে চলার চেষ্টা।
অঞ্জনের হাত থেকে আবার বোতলটা টেনে নিল।
—দে না শালা আরেকটু।
—তুই আউট হয়ে গেছিস মাইরি। হল্লা শুরু করেছিস। স্যারের ঘুম ভেঙে গেলে...
—হ্যাঙ ইওর স্যার। গুলি করে মেরে দেব সব্বাইকে।
আদিম মানবীর মতো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে বৃষ্টির চুল। কাঁধের শাল ছুঁড়ে ফেলে দিল ঘাসের গায়ে। ঘোর লাগা গলায় চিৎকার করছে, —আই ডোন্ট্...আই ডোন্ট্... আই ডোন্ট…
তৃষিতা বৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে বসানোর চেষ্টা করল। বৃষ্টি বদ্ধ মাতাল। তার চোখের সামনে দুটো রোঁয়া ফোলানো হিংস্র জন্তুর মুখ। জ্বলন্ত সিগারেট ছুঁড়ে মারল জন্তুদুটোর মুখে। স্খলিত গলায় শাসিয়ে উঠল,
—দেখে নেব। দেখে নেব তোমাদের। কত ধানে কত চাল... শুধু নিজেদের ফুর্তি লোটা...!
এর পরই পড়ে গেছে মাথা ঘুরে। সুখ-স্মৃতিহীন মাতালের ঘুমে ডুবে গেছে কয়েক মিনিটের মধ্যেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন