তৃতীয় অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

সুবীর মুগ্ধ চোখে দেখছিল মেয়েকে। শাড়ি পরে বৃষ্টি আজ একদম অন্যরকম। প্রথমটা তো দূর থেকে দেখে চিনতেই পারেনি সুবীর। এই বয়সের মেয়েরা হঠাৎ শাড়ি পরলে কেমন সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। একটা সম্পূর্ণ নারী যেন। জীবনের সব রূপ রস বর্ণ গন্ধে ভরা।

অনেক দিন পর গোপন অভিমানটা লম্বা নিঃশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এল সুবীরের বুক থেকে। এই মেয়েকে পৃথিবীতে আনতে চায়নি জয়া।

হাল্‌কা সুরে পশ্চিমী সঙ্গীত বেজে চলেছে শৌখিন রেস্তোঁরায়। সন্ধেবেলা পার্ক স্ট্রীটের এই ছোট্ট বিলাসপুরীতে আলো-ছায়ার মায়া। রঙিন আলোর আবছা বিচ্ছুরণ, এয়ারকন্ডিশনারের কৃত্রিম পাহাড়ী শীতলতা, সব মিলে মিশে এক স্বপ্নের পরিবেশ। এত চাপা আলো যে পাশের টেবিলের মানুষগুলোকেও পরিষ্কার বোঝা যায় না। একই ছাদের নীচে, পাশাপাশি থেকেও যে যার মত পৃথক এখানে। অচেনা।

সুবীর মেন্যুকার্ড এগিয়ে দিল বৃষ্টির দিকে।

—মেন্যুকার্ড কি হবে? বলো না যা হোক কিছু।

সুবীরের এতক্ষণে খটকা লাগল। এত চুপচাপ কেন মেয়ে? গাড়িতে আসতে আসতেও কথাবার্তা বলেনি বিশেষ। সুবীরের কথার উত্তরে হুঁ হাঁ করে গেছে মাত্র। এখনও স্বর যথেষ্ট নিরুত্তাপ। অথচ অন্যান্য দিন খেতে ঢুকে বৃষ্টিই আগে মেন্যুকার্ড পড়তে শুরু করে দেয়। হঠাৎ হঠাৎ কোন অদ্ভুত খাবারের নাম বার করে জিজ্ঞাসা করে,

—আজ এটা ট্রাই করলে কেমন হয় বাবা? বেকড্ অ্যাভোক্যাডো উইথ্ ক্র্যাব্? স্যালাড নিকয়েস খাবে? হোয়াইটিং বার্সি?

সব সময় নতুন কিছু খুঁজে বার করার চেষ্টা। আগে আগে সুবরও মেয়ের সঙ্গে মেন্যুকার্ড পড়ে যেত সমান তালে। আজকাল আর সবসময় তাল রাখতে পারে না।

—সিজ্‌লার খাবি? উইথ কাশ্মিরী নান্?

বৃষ্টি কাঁধ ঝাঁকাল, যার অর্থ হ্যাঁ’ও হয়, না’ও হয়। যেন কোন খাবারেই আজ তেমন আসক্তি নেই তার।

ওয়েটারকে নিচু গলায় খাবার অর্ডার দিয়ে মেয়ের মুখোমুখি হল সুবীর,

—কি হয়েছে রে তোর? মন খারাপ? আজকের দিনে আমার ছোট্ট সুন্দর গুড়িয়াটা এত গ্লুমি কেন?

—কিছু হয়নি তো।

বৃষ্টির মুখে হাসি হাসি ভাব ফুটল; হাসল না,

—তুমি ট্যুরে যাবে বলছিলে না? কবে যাচ্ছ?

—দেখি। নেক্সট্ উইকে যেতে পারি।

—কদ্দিনের জন্য?

—এবার গেলে দিন পনেরো তো বটেই। কম্পানি নতুন ব্রাঞ্চ খুলছে ফরিদাবাদে।

—ও।

নিজের মনে নেলপালিশের রঙ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল বৃষ্টি। সুবীর বুঝতে পারল তার ট্যুরে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে মোটেই তেমন আগ্রহী নয় মেয়ে। নেহাত কথা বলার জন্যই প্রশ্ন। হলটা কি! গত বছরের জন্মদিনের রাগটা কি এখনও পুষে রেখেছে মনে?

সুবীর মেয়েকে খোশামোদ করতে গেল,

—আজ তুই দুপুরে এলি না কেন? কাল আমি অফিসের সবাইকে বলে রেখেছিলাম, আজ থেকে আমার মেয়ে অ্যাডাল্ট হচ্ছে, শী ডিজার্ভস্ এ ফুল ডেজ কম্পানি উইথ্ মি।

বৃষ্টি সুবীরের দিকে তাকালই না। ভীষণ মনযোগ দিয়ে হাতের নখ দেখেই চলেছে।

—বাড়িতে আজ কোন প্রোগ্রাম নেই তো? চল্, আজ তাহলে তোকে নিয়ে গোটা কলকাতাটা চক্কর দিয়ে ফেলি।

পাশের টেবিলে পুতুলের মত একটা বাচ্চা বাবা মা’র মাঝখানে বসে স্যুপ খাচ্ছে। মা চামচে করে তুলে দিচ্ছে মুখে, বাবা রুমালে মুখ মুছিয়ে দিল। বৃষ্টির চোখ আঙুল থেকে উঠে সেদিকে স্থির। স্থির চোখেই বলে উঠল,

—আমাকে নিয়ে যতক্ষণ খুশি ঘুরবে? রীতাআন্টিকে বলে এসেছ তো?

সুবীরের আদর মাখানো হাসি ভরা মুখে একটা পিন বিঁধে গেল যেন। কথাটা কি বৃষ্টি সরল ভাবে বলল? না ইচ্ছে করে আঘাত করার জন্য? সুবীর ধরতে পারল না। ইদানীং সব সময় সব জায়গায় ঠিক ঠিক মাথাও কাজ করে না। দিন রাত সহস্র সমস্যা ঘুরছে মস্তিষ্কে। অফিসে এম ডি সর্বদা কাঁটার ওপর দিয়ে দৌড় করাচ্ছে। বাজার ডাল্ বলে আমাদের বসে থাকলে চলবে রায়? রিসেশান থাকবেই। কম্পানিকেও তো থাকতে হবে। ডু সামথিং রায়। অবিরাম পাগলাঘণ্টির মত বেজে চলেছে এম ডির বাণী...তোমার মত এফিশিয়েন্ট মার্কেটিং ম্যানেজার...! কি করবে সুবীর? আবার কাঁধে প্রোডাক্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়বে রাস্তায়? একুশ বছরের সুবীরের মত? যে কিনা ন্যায়রত্ন লেনের অন্ধ কুঠুরি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাবা মা দাদা কারুর কথা ভাবেনি? পরোয়া করেনি ঠুনকো বংশমর্যাদার? অনামী কম্পানির আলতা সিঁদুর ফিরি করা থেকে শুরু করে আজ পৌঁছেছে মাল্টিন্যাশনাল কম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজারে? এখন চব্বিশ ঘণ্টা মাথার ভেতর শুধুই টার্গেট, মান্থলি প্রোজেকশন, রিসেশান...। এরই সঙ্গে রক্তচাপ ওঠা নামা করার মত দিনভর মাথা বেয়ে উঠছে নামছে শেয়ারের দর। কখনও দুচার হাজার আসে না তা নয় কিন্তু চাপা উত্তেজনা ঘুসঘুসে জ্বরের মত শরীর ছেয়ে থাকে সর্বক্ষণ। অফিস থেকে মাঝে মাঝেই ডায়াল ঘোরায়,

—হ্যালো মিত্তালজি, আভি হাল কেয়া হ্যায়?

—ঠিক হ্যায়। প্রাইস্ ইজ সোরিং আপ্।

একটু রিলিফ্। একটুই। এর পরই হয়ত এম ডির ডাক, ডু সামথিং রায়। বাড়িতেও ঠিক মত সময় দিতে পারে না। রীতা অনুযোগ করে,

—একটা দিনও কি তুমি আমাদের সঙ্গে থাকতে পারো না? ছুটির দিনেও এত কিসের কাজ তোমার?

সুবীর করবেটা কি? প্যাডকে চলে এলে ঘোড়াকে ছুটতেই হয়। জকিই ছুটিয়ে নিয়ে চলে।

তার মধ্যেও কখনও একটু জিরোতে পারলে, সামনে বসে থাকা মেয়েটা বুকের ভেতর বিব্ বিব্ করে বেজে ওঠে। নিজের সঙ্গে একা হলেই বৃষ্টি এসে ঘোরাফেরা করতে শুরু করে সুবীরের মনে। দু বছরের দামাল পায়ে হাঁটা বৃষ্টি, পাঁচ বছরের অবিরাম পাকা পাকা কথা বলে যাওয়া বৃষ্টি, সাত বছরের ঠোঁট ফোলানো অভিমানী বৃষ্টি, বারো বছরের আহত চোখে তাকিয়ে থাকা বৃষ্টি, নানান বয়সের বৃষ্টিরা এসে তালগোল পাকিয়ে দিতে থাকে সব কিছু। ভীষণ ভাল লাগাতে বুক থৈ থৈ করে ওঠে। তার সঙ্গে একটা যন্ত্রণাও কুরে কুরে খেতে থাকে সুবীরকে। গোপন এক রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা। সব বাবারই কি এমন হয়? নাকি সুবীরের মত বাবাদেরই শুধু?

জয়া নিষ্ঠুরভাবে কেড়ে নিয়ে গেল মেয়েটাকে। প্রিয় সম্পদ হারিয়ে ফেলার পর তার অভাব দ্বিগুণ চতুর্গুণ হয়ে বাজতে থাকে বুকে। প্রথম প্রথম তাও এই অভাবটাকে অনুভব করতে সময় লেগেছিল কিছুদিন। তখনও একটা জেদ, একটা অসহ্য রাগ, পরাজয়ের অপমান সুবীরকে আবিষ্ট করে রেখেছিল। নিস্ফল ক্রোধে বুনো ষাঁড়ের মত লণ্ডভণ্ড করে দিতে ইচ্ছে করত বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড। তবে রাগের আয়ু আর কতদিন? সময়ের নিয়মে ধীরে ধীরে শান্ত হয়েছিল সুবীর। তখনই অভাববোধটা প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয় তাকে। একটা মানুষ সারাদিন পর খেটেখুটে বাড়ি ফিরছে, কেউ তার জন্য কোথ্‌থাও অপেক্ষা করে নেই, এই চিন্তায় নিঃসঙ্গ মানুষ নিঃসঙ্গতর হয়। সেই সময়ই রীতাকে না পেলে...। রীতাকে বিয়ে করার আগে লক্ষবার ভেবেছে সুবীর। আবার ভুল হচ্ছে না তো?

বৃষ্টির দিকে সুবীর নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। পুরনো সেলস্‌ম্যানটা মনে মনে কথা সাজিয়ে নিচ্ছে।

মেয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অন্য দিকে। এদিক ওদিকের লোকজন দেখছে।

সুবীর টেবিলের সামনে ঝুঁকল,

—রীতা আজ তোকে একবার নিয়ে যেতে বলেছিল; যাবি, চকিতে মুখ ফিরিয়েছে বৃষ্টি,

—কেন?

—বারে, জন্মদিনে একবার বাড়িতে যাবি না? তোর ভাইটারও তো দিদিকে একটু দেখতে ইচ্ছে করে।

—ভাই ভাই করছ কেন? আমার কোন ভাই টাই নেই।

বৃষ্টির ফর্সা মুখ পলকে থমথমে লাল। রাগ, দুঃখ, অভিমান বড় সহজেই তার মুখে ছাপ ফেলে দেয়।

সুবীর বুঝল কথাটা বলা ঠিক হয়নি। বৃষ্টি রীতা রাজাকে এখনও মেনে নিতে পারেনি। তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ বদলে নিল,

—জন্মদিনে কি নিবি বল্? ক্যামেরা? ফরেন রিস্টওয়াচ্? পারফিউম? বৃষ্টি সন্ন্যাসিনীর মত নির্লিপ্ত,

—দিও যা হোক কিছু।

মেয়ের কথার ভঙ্গিতে হঠাৎ ধৈর্য হারাল সুবীর। কি এমন অপরাধ করেছে সে? নিজের ইচ্ছে মত জীবন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাও তার থাকবে না?

—ওভাবে কথা বলছিস্ কেন? কোন দিন কি দিইনি তোকে? যখন যা চেয়েছিস তাই দিয়েছি। জার্মান টেপ, জাপানি ওয়াকম্যান, ফ্রেঞ্চ পারফিউম, ইটালিয়ান সিল্কের ড্রেস মেটিরিয়াল...

বৃষ্টি দমল না,

—সে তো ঘুষ দিয়েছ।

—ঘুষ!

—নয় তো কি? বৃষ্টির গলা বরফের ছুরির মত ধারালো,

—তুমি দিয়েছ, মা দিয়েছে...। দেবে নাই বা কেন? নিজেদের সুখটুকু বজায় রেখে বৃষ্টিকে ভালবাসতে গেলে তার মাসুল দিতে হবে না? দশ টাকা চাইলে তখখুনি একশ টাকা বার করে দাও, ভাবো কিছু বুঝি না?

সুবীর স্তম্ভিত। এই কি তার সেই আদরের ছোট্ট গুড়িয়া! বার্বিডল আর আইসক্রিম পেলে যে বাবাকে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিত! মেয়ের ঔদ্ধত্য দেখে ভেতরে ভেতরে রাগ হলেও কিছুতেই তেমনভাবে রাগতে পারল না সুবীর। রাগের সঙ্গে একটা চাপা ভয়ও আঁচড় টানছে বুকে। বৃষ্টি যে তার দুর্বলতম জায়গা। গলাটাকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করল,

—খুব রাগ করে আছিস্ মনে হচ্ছে? বোকা মেয়ে, বাবা মার উপহার কি কখনও ঘুষ হতে পারে? ছাড়, ও সব কথা। আজ তুই কি নিবি বল্। আজ তুই যা চাইবি, তাই দেব।

মেয়ে এবার একটু গলেছে,

—যা চাইব তাই দেবে?

—চেয়ে তো দ্যাখ্। সুবীরের গলা মায়ায় ভরে এল।

কি একটা কথা বলতে চেয়েও বলতে পারছে না বৃষ্টি। চোখ বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে ধরল। ঢোঁক গিলল ঘন ঘন। তারপর দুম করে বলে ফেলেছে,

—যদি বলি তোমাকে চাই?

সুবীর হেসে ফেলল। মেয়ের পলকে রাগ, পলকে আবদার। সুবীরের কাছেই।

—পাগলি কোথাকার। আমাকে আবার চাওয়ার কি আছে? আমি তো আছিই।

—এভাবে নয়। বৃষ্টি এবার স্পষ্টভাবে কেটে কেটে বলছে কথাগুলো,

—অন্য কারুর সঙ্গে শেয়ার করে নয়। আমি এখন অ্যাডাল্ট। ইচ্ছে করলে মার কাছে না থেকে তোমার সঙ্গেও থাকতে পারি। শুধুই আমরা দুজন।

চূড়ান্ত ধাক্কাটাতে সুবীরের মুখ নিমেষে রক্তশূন্য। মুখ থেকে প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল, তা কি করে হয়? ঝানু মার্কেটিং ম্যানেজার সুবীর রায় দ্রুত গিলে ফেলেছে কথাটা। মুখে হাসি ফোটাতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে হল। সামনের মেয়েটা যেন এতদিনকার চেনা বৃষ্টি নয়, অন্য কোন বৃষ্টি, যার বীজ বোনা হয়েছিল প্রায় এক যুগ আগে, কোর্টরুমে, যে সম্ভবত ভূমিষ্ঠ হয়েছে আজই, সে এ কোন খেলায় মেতে উঠতে চাইছে? সুবীরকে কি যাচাই করতে চায় সুবীরের মেয়ে?

ওয়েটার খাবার নিয়ে এসেছে। সামান্য স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারল সুবীর। গরম তাওয়া বসিয়ে দিয়ে গেছে দুজনের মাঝখানে। শব্দ করে ধোঁয়া উঠছে।

বৃষ্টি প্রশ্ন করল, —কি হল? কিছু বললে না যে?

—হুঁ...দেখছি...তুই যখন বলছিস্..সুবীর মেয়ের প্লেটে নান্ তুলে দিল,

—নে, খেয়ে নে তো আগে। পরে কথা হবে।

সিজলার কেটে মুখে পুরল বৃষ্টি। আয়েস করে চিবোচ্ছে মাংসটা। টেরচা চোখে তাকিয়ে আছে সুবীরের দিকে। সুবীরের মনে হল, মাংস নয়, মেয়ে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে তারই অস্বস্তিটুকু।

মাথা নামিয়ে সুবীর খাবারে মন দেওয়ার চেষ্টা করল। বৃষ্টির চোখ দুটো কী অসম্ভব তীক্ষ্ণ। সুবীর বুঝি ধরা পড়ে যাচ্ছে। একটা দৃশ্য পলকে চোখের সামনে দুলে উঠল সুবীরের।

...একজন চব্বিশ বছরের যুবক পার্ক স্ট্রিটের পরিত্যক্ত কবরখানায়, ভাঙা বেদির ওপর বসে, গোগ্রাসে মুড়ি চিবোচ্ছে। চারদিকে ঘন গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের মাঝে দুশো বছর আগের অসংখ্য কবর। গাছগাছালি কাঁপিয়ে মাঝে মাঝেই চৈত্রের বাতাস উঠছে এলোমেলো। পাতায় পাতায় শন্ শন্ শব্দ বাজছে। যুবকটি মুড়ি খেতে খেতে আড়চোখে দেখে নিচ্ছিল আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকা তরুণ তরুণীদের। কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না তো! দেখতে দেখতেই চোখ আটকেছে রাধাচূড়া গাছের নীচে বসে থাকা শ্যামলা রঙ মেয়েটির দিকে। মেয়েটির চোখ দুটো খুব উজ্জ্বল, ঘন! সামান্য লম্বাটে মুখ। নাক খুব তীক্ষ্ণ নয়। ঠোঁটের কাছটা অল্প উঁচু। সব মিলিয়ে একটা মায়াজড়ানো ভাব। হাঁটু মুড়ে বসে থাকার জন্য উচ্চতা আন্দাজ করা যাচ্ছিল না; খুব একটা লম্বা নয়। যুবক লক্ষ করল মেয়েটি ছবি আঁকতে আঁকতে ফিরে ফিরে তার দিকেই তাকাচ্ছে। চোখ দেখে মনে হয় সে যেন এই জগতেই নেই। একবার করে যুবককে দেখেই নিজের স্কেচ-বুকে ডুবে যাচ্ছে। যুবক চকিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট। মেয়েটি তাকেই স্কেচ্ করছে নাকি? উঠে দাঁড়াতেই মেয়েটির আত্মমগ্নতা কেটে গেছে। মুখে অপ্রস্তুত হাসি। যুবক সোজা এগিয়ে গেল। একেবারে সামনে গিয়ে ঝুঁকেছে স্কেচ্ বুকের ওপর। হ্যাঁ, সেই তো! জুতোশুদ্ধ পা ছড়ানো, গলায় টাই, নিভাঁজ শার্ট প্যান্টের ক্রিজ্, পাশে ব্রিফ কেসটা পর্যন্ত পড়ে আছে। শুধু মুখটাই তার নয়, কোন ভিখিরির যেন। ঠোঙায় মুখ ডুবিয়ে গোগ্রাসে মুড়ি খাচ্ছে। ভিখিরির দু চোখে বিশ্ব গিলে ফেলার খিদে। ...

নিজের ভেতর সুবীর আজও স্পষ্ট দেখতে পায় সেই ধোপদুরস্ত ভিখিরির স্কেচটাকে।

জয়া কি করে যে প্রথম দিনই সুবীরের আসল চেহারাটা ধরে ফেলেছিল?

জয়া বড় বেশি দেখে ফেলেছিল তাকে।

জয়ার চোখের সঙ্গে বৃষ্টির চোখের এত মিল!

বৃষ্টি আবার জিজ্ঞাসা করল, —চুপ করে গেলে কেন? কি ঠিক করলে?

—দাঁড়া, একটু তো সময় দিবি। সুবীর ঢোঁক গিলল।

বৃষ্টির মুখে তবু মরিয়া ভাব। যেন একটা দ্ব্যর্থহীন উত্তর ছাড়া সুবীরকে সে কিছুতেই ছাড়বে না।

—তবু কদ্দিন?

—অন্তত দু এক মাস। যা মুখে এল বলে ফেলল সুবীর। চকিতে উল্টো প্রশ্ন এসে গেল মাথায়, —তুই আমার সঙ্গে থাকতে চাইছিস কেন? মার সঙ্গে কিছু হয়েছে?

—নাআ।

—তোর মা জানে, তুই আমার সঙ্গে থাকতে চাস্?

না।

—তবে?

—তবে আবার কি? আমি এটাই চাই।

—তোর মা আপত্তি করতে পারে...

হু কেয়ারস্।

—দুঃখ পেতে পারে?

বৃষ্টি ফিক করে হেসে ফেলল।

—মার কথা ছাড়ো। তোমার অসুবিধে আছে?

কোন উত্তর না দিয়ে করুণ মুখে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল বৃষ্টির বাবা। বৃষ্টি বিন্দুমাত্র নরম হল না,—মার দুঃখ কষ্ট নিয়ে তোমার খুব ভাবনা, তাই না?

বিদ্রূপটা তীক্ষ্ণ ফলার মত বিঁধল সুবীরকে। শেষ চেষ্টা করল তবুও,

—ওভাবে নিচ্ছিস কেন? ছোট থেকে তুই মার সঙ্গে রয়েছিস, একটা এতদিনের অ্যাটাচমেন্ট, তুই চলে এলে কষ্ট পাবে না?

বৃষ্টি ন্যাপকিনে হাত মুছে নিল ভাল করে, —আমি কি চাই, আমি তোমাকে বলে দিলাম। এখন তুমি কি করতে পারবে সেটা তোমার ব্যাপার।

সুবীরের মনে হল এই মুহূর্তে তার চারপাশটা বড় বেশি অন্ধকার। নিজের মেয়ের মুখটাও ভালভাবে দেখতে পাচ্ছে না সে। আন্দাজে হাত নেড়ে শুধু ওয়েটারকে ডাকতে পারল সুবীর।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%