বৃষ্টির হাত বুকে চেপে চুপ করে শুয়ে আছে সুবীর। বাথাটা তার এখন অনেক কম।
গতকাল সকালেই টেলিফোন পেয়ে বৃষ্টি উদ্ভ্রান্তের মত ছুটে এসেছিল নার্সিংহোমে। করিডোরে দাঁড়িয়ে রীতা তখন কথা বলছিল প্রবীরের সঙ্গে। রীতার চোখের নীচে কাজলের চেয়েও ঘন কালো দাগ, দেখেই বোঝা যায় তার ওপর দিয়ে একটা বড় সড় ঝড় বয়ে গেছে। প্রবীরের হাতে ছোট্ট একটা প্লাস্টিক ব্যাগ। মুখে অশান্ত উদ্বেগ। প্রবীর উত্তেজিত ভাবে বলছিল,
—কেন, এখনও লিকুইড্ ডায়েট কেন? ডাক্তার তো কাল বলছিলেন এবার একটু একটু করে... মা সেই জন্যই তো গলা মুরগি পাঠিয়ে দিল। এটা দিতে অসুবিধে কি আছে?
রীতা কিছু বলতে যাচ্ছিল, সামনে হঠাৎ বৃষ্টিকে দেখেই সে ত্ৰাসতাড়িত।
বৃষ্টি চঞ্চল চোখে তাকাল,
—কেমন আছে বাবা?
রীতা তাড়াহুড়ো করে বলে ফেলল,—একটু বেটার। তুমি যাও না ভেতরে গিয়ে দেখে এসো। এমন ভাবে বলল যেন বৃষ্টি চোখের সামনে থেকে সরে গেলেই সে বাঁচে।
প্রবীর নির্বাক হয়ে দেখছিল বৃষ্টিকে। কত দিন পর দেখল তাদের বাড়ির মেয়েটাকে? প্রায় ন দশ বছর। সময় কি দ্রুত সব বদলে দেয়! শুককীট থেকে রঙিন প্রজাপতি ডানা মেলেছে। প্রবীরের হঠাৎই মনে হল, এ মেয়েকে বোধহয় তাদের ন্যায়রত্ন লেনের গলিতে মানাতও না। ওখানে আলো বাতাস এত কম!
বৃষ্টি ততক্ষণে পর্দা সরিয়ে কেবিনে ঢুকে পড়েছে। ঢুকতেই নাকে মৃদু ওষুধের গন্ধ। সাদা চাদরে ঢাকা সুবীরের লম্বা ফর্সা শরীর যেন বিছানায় নিষ্প্রাণ, মুখ জানলার দিকে ফেরানো। আকাশ দেখছে। টানা পর্দার ফাঁক দিয়ে, কাঁচের শার্সির ওপারে, যতটা আকাশ দেখা যায় ততটুকুই। গোটা আকাশটাকেই যে হাতের মুঠোয় ধরতে চেয়েছিল, তার ওইটুকু আকাশের ফালিই সম্বল এখন।
খুব আস্তে, যেন দেওয়ালও না শুনতে পায়, এভাবে ডেকেছে বৃষ্টি,
—বাবা...
সুবীরের মুখ ঘুরল, এক পলক খুঁজল শব্দের উৎসকে, তারপরেই বৃষ্টির দিকে চোখ আটকেছে। সঙ্গে সঙ্গে বুক উথলে উঠেছে তার। পরক্ষণেই প্রবল ভয়ের আলোড়ন। মুখ বিকৃত হয়ে গেল, দাঁতে ঠোঁট কামড়ে, সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে চেষ্টা করল সুবীর।
বৃষ্টিও আতঙ্কে জমে গেছে। কয়েক সেকেন্ড। তারপরই ছুটে এসেছে বাইরে,
—তাড়াতাড়ি এসো, বাবা কিরকম করছে!
প্রবীর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছিল ডাক্তারকে খবর দিতে। রীতা ধড়মড় করে সুবীরের কেবিনে। তার মিনিটখানেকের মধ্যেই নার্স। কর্তব্যের সঙ্গে বিরক্তির ঝাঁঝ মিশিয়ে বলেছিল,
—আপনারা বাইরে দাঁড়ান। ডক্টর আসছেন।
বাইরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি আর রীতা। পাশাপাশি। দুজনের মনেই তখন এক চিন্তা, তবু দুজনের মন যেন কত আলোকবর্ষ দূরে। দুজনেই চায় কেবিনের ভেতরের মানুষটা ভাল হক, সুস্থ হক, একজনের বুকে অজানা ভবিষ্যতের জন্য একরাশ আশংকা, অন্যজনের মধ্যে জমে থাকা অপরাধের গ্লানি। বৃষ্টির মনে হচ্ছিল, সেই কি তবে তার বাবার একমাত্র মানসিক চাপ? সে আসতেই রীতাও কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেল, যেন বৃষ্টি একটা হিংস্র জন্তু। বাঘের হাত থেকে গ্রামের লোক যেভাবে নিরীহ গরু ছাগল বাঁচায়, সেভাবেই রীতা যেন আগলে রাখতে চায় সুবীরকে।
রীতাকে দোষ দিতে পারল না বৃষ্টি। গত কয়েক মাসের উন্মত্ত আচরণের প্রতিটি দৃশ্যই তার চোখের সামনে। দিনের পর দিন অত্যাচারের শাবল চালিয়ে সেই তো রীতার শক্ত মাটিটাকে আলগা করে দিয়েছে। নাহলে রীতা সুবীরের স্ট্রোক হওয়ার তিন দিন পরে খবর দেয় তাকে! এই মহিলার ওপর বিদ্বেষ আর ঈর্ষা ছাড়া আর কোন অনুভূতি ছিল না বৃষ্টির। কিন্তু ঈষা আর বিদ্বেষ থেকে সত্যিই কি কিছু পাওয়া যায়! বৃষ্টি কি পেল!
প্রবীরের সঙ্গে হন্তদন্ত হয়ে ডাক্তার ঢুকলেন ঘরে। বৃষ্টির কনুই-এর কাছে হাতের চাপ। রীতা নিজের অজান্তেই বৃষ্টির হাত আঁকড়ে ধরেছে। খরস্রোতা নদীতে ডুবন্ত মানুষ যেভাবে ভাসমান কচুরিপানাকেও খামচে ধরে।
নিজের মনের আশঙ্কা ছাপিয়ে হাতটার অসহায়তা ছুঁয়ে যাচ্ছিল বৃষ্টিকে। এখ্খুনি যদি সুবীরের কিছু হয়ে যায়, যতই কষ্ট হক, কতটুকুনি বিপদ হবে বৃষ্টির? তার নিজস্ব আশ্রয় আছে, খাওয়াপরার চিন্তা নেই, মাকে যতই নির্লিপ্ত মনে হোক সেই মা মাথার ওপর ছাতার মত রয়েছে, রীতার কি আছে? অভ্যস্ত সুখের জীবন ছেড়ে রাজাকে নিয়ে কিভাবে কাটাবে বাকি জীবনটা? রীতার বাবা মার অবস্থা ভাল নয়, নিজের চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছে, জয়ার মত বিশেষ কোন গুণও নেই তার। হাতটা যেন এই সব কথাগুলোই বলতে চাইছিল বৃষ্টিকে। শিকড়-ওপড়ানো অসহায়তার কাছে নিজের কষ্ট, অভিমান সব কিছুই কি ক্ষুদ্র মনে হল বৃষ্টির। সে কি তবে সেই কাশীর মহিষী করুণা যে নিজের শীত কমাতে অন্যের ঘরে আগুন লাগিয়ে উত্তাপ জোগাড় করতে চেয়েছিল!
বৃষ্টিও নিজের অজান্তে হাত রেখে ফেলেছিল রীতার হাতে,—চিন্তা কোরো না, বাবা ভাল হয়ে যাবে।
মিনিট দশেক পর ডাক্তার আর প্রবীর বেরিয়ে এল,
—ঘাবড়াবার কিছু নেই, সাডেন টেনশন থেকে একটা এক্সাইট্মেন্ট্ এসেছিল, সিডেটিভ দিয়েছি, এখন ঘুমোবেন কিছুক্ষণ।
প্রবীর এসে বৃষ্টির মাথায় হাত রাখল,—আমাকে চিনতে পারছিস্? আমি তোর জেঠু।
চিনেছে বৃষ্টি। কিছু কিছু মানুষকে চিনিয়ে দেওয়ার দরকার হয় না। দেখলেই চিনে ফেলা যায়। বাবার সঙ্গে মিলও আছে অনেক। অতটা লম্বা ছিপছিপে না হলেও মুখের ধাঁচ একই ধরনের। একই রকম গলার স্বর, কথা বলার ভঙ্গি।
বৃষ্টি নিজেও বুঝতে পারল না কেন যে চোখে আচমকা জল এসে গেল তার। একেই কি তবে নিকটজনের টান বলে?
প্ৰবীর বলল,—মন খারাপ করছিস কেন? তোকে দেখে সুবু একটু বেশি খুশি হয়েছিল তো...
খুশি, না ভয়? বাবার সেই ভয়ার্ত মুখটা বৃষ্টির বুকে গেঁথে গেছে। বোধহয় চিরজীবনের মত।
সেই মুখ এখন অনেক শান্ত, স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে ঠোঁট দুটো অল্প নড়ে উঠছে। আলগা তন্দ্রায় ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্ন দেখছে সুবীর।...একটা বাচ্চা ছেলে শ্যামবাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞাপনের নিয়ন বাতি দেখছে। জ্বলছে নিভছে বিশাল বিশাল বিজ্ঞাপন... বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং বদলে হয়ে গেল স্কুলের ক্লাস। বাংলা ক্লাসে অমূল্যস্যার লিখতে দিয়েছেন, বড় হয়ে তোমরা কে কি হতে চাও। বাচ্চা ছেলেটা লিখেছে, বড়লোক হব, অনেক বড়লোক। মাস্টার মশাই বলছেন, প্রথমে টাকাটাই চিনলি রে বাপ? পড়াশুনো করে আগে কিছু তো একটা হ, তারপর বড়লোক হবি।...ক্লাসশুদ্ধ সবাই হাসছে। সব্বাই। ... দৃশ্য বদলে গেল। ছেলেটার কাঁধে পাউডার লিপস্টিকের ব্যাগ, জ্যাম জেলি আচারের শিশি, ওষুধে ভরা ভারী ব্রিফকেস্...দৌড়চ্ছে, দৌড়চ্ছে, দৌড়চ্ছে...অসংখ্য গলিখুঁজি...হঠাৎ একটা চওড়া রাস্তার মোড়ে জয়া। রাস্তাটা ঘন সবুজ, রাস্তার দুদিকে মৃতদেহের স্তৃপ ..জয়া আর সুবীর দুজনে মিলে দৌড়ল কিছুক্ষণ। তারপর অন্য রাস্তায় চলে গেল জয়া, সঙ্গে একটা বাচ্চা মেয়ে, আধফোটা ফুলের মত। বৃষ্টি।...আবার দৌড়। এবার পাশে রীতা, রাজা...কোন কোন মোড়ে আচম্বিতে দেখা হচ্ছে বৃষ্টির সঙ্গে। অজানা বাঁকে এসে এক পলক দেখা দিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টি। ...আবার দৌড়...রীতা, রাজা...জঙ্গলের গাছপালার ফাঁকে বৃষ্টির মুখ...নদীর জলে ভেসে উঠল বৃষ্টির মুখ...সেই ছেলেটা ছুটতে ছুটতে আয়নায় দেখা সুবীরের মত পুরোদস্তুর লোক হয়ে গেছে...হঠাৎ তার মুখটা একটা ঘোড়ার মুখ হয়ে গেল...আবার সুবীর... বৃষ্টি নেই, রীতা নেই, রাজা নেই...ঘোড়া একা দৌড়চ্ছে সরু গলি দিয়ে...ন্যায়রত্ন লেনের গলি, অন্তহীন গলি..গলি ক্রমশ অন্ধকার হচ্ছে...ঘোড়ার মুখ দিয়ে গাঁজলা উঠছে..হাঁটু ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল ঘোড়া…
সুবীর চোখ খুলল।
বৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকেছে,
—কিছু বলবে?
সুবীর দু’দিকে মাথা নাড়ল।
—কি অসুবিধে হচ্ছে?
—একটু জল খাব।
মাথার পাশের টেবিলে রাখা কাটগ্লাসের জগ থেকে বৃষ্টি জল গড়িয়ে দিল। সুবীর দু চুমুক খেল মাত্র। আবার চোখ বুজেছে।
—তোর মাকে একটা কথা বলতে পারবি?
বৃষ্টি স্থির চোখে তাকাল সুবীরের দিকে।
—তোর মার সমস্ত ইজেল, ক্যানভাস, রঙ, তুলি আমি ফেরত পাঠিয়েছিলাম তবু একটা স্কেচ আমার কাছে রয়েই গেল। আমাকে এঁকেছিল তোর মা। পার্ক স্ট্রিটের পুরনো কবরখানায় বসে। আমাদের প্রথম পরিচয়ের দিন।
বৃষ্টিকে কেউ যেন সমূলে নাড়িয়ে দিল। বাবা মার সম্পর্ক নিয়ে তার এতদিনকার ধারণা, বিশ্বাস চিড় খেয়ে যাচ্ছে। সম্পর্কের সব সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার পরও এ কোন্ গ্রন্থিতে বাঁধা পড়ে আছে তার বাবা মা! গ্রন্থিটা কি বৃষ্টি!
নাকি আরও গভীর কোন চেতনা! বৃষ্টি বুঝতে পারছে না।
কাল রাত্রে নার্সিংহোম থেকে ফিরবার সময় দেখেছিল মা ছাদে অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে। তাকে দেখেই নীচে নেমে এসেছিল। ভালমামা তখন তাকে জিজ্ঞাসা করছে,
—কেমন আছে এখন সুবীরদা? কি দেখে এলি?
ভালমামার গলায় উৎকণ্ঠা। তবে তার থেকেও বেশি উদ্বেগ যেন মার মুখে। বৃষ্টির চোখে চোখ পড়তেই মা মুখ ঘুরিয়ে নিল। নিজের মুখোশপরা ছবির মানুষগুলোর মতই লুকিয়ে ফেলল নিজেকে।
বৃষ্টি বলেছিল,—এখন একটু বেটার। ডাক্তার তো বলছেন ভয়ের কিছু নেই।
মা নিঃশব্দে ঢুকে গিয়েছিল নিজের ঘরে। বৃষ্টি বুঝেছিল তার জন্য নয়, তার উত্তরটা শোনার জন্যই এতক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়েছিল মা।
অনেক রাত অবধি বিছানায় ছটফট করেছিল বৃষ্টি। সায়নদীপই ঠিক। শুধু একটা দৃষ্টিকোণ থেকে কোন সম্পর্ককেই বিচার করা যায় না। করাটা বোকামি। প্রতিটি মানুষই কোন এক নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে নিজের কাছেই অসহায়। বাবা মার ঝগড়া, হিংস্রতা, একসঙ্গে থাকতে না পারা যতটা সত্যি, ততটাই সত্যি অন্ধকার ছাদে মার একা দাঁড়িয়ে থাকা অথবা বাবার কাছে গোপনে থাকা মার পুরনো স্কেচ্।
বৃষ্টি খাট থেকে নেমে পড়েছিল। শৈশবের মত কখন পায়ে পায়ে ছাদে উঠে গেছে টেরও পায়নি।
জয়ার স্টুডিওতে এখন প্রায় সারা রাতই আলো জ্বলে। বেশির ভাগ দিন স্টুডিওতে পাতা ক্যাম্বিসের খাটেই ঘুমিয়ে পড়ে জয়া। নীচে আর নামে না।
বৃষ্টি কাচের শার্শিতে চোখ রেখেছিল। চতুর্দিকে রঙের দোয়াত, টিউব, তুলি ব্রাশ নিয়ে জয়া ক্যানভাসের সামনে নিথর বসে।
অনেকদিন পর স্টুডিওটাকে দেখছিল বৃষ্টি। ধুলোপড়া কয়েকটা ক্যানভাস কোণে জড়ো করা। দেওয়ালের পিঠে অবহেলায় পড়ে বহুদিন আগের পেন্টিং। কন্টি পেনসিলগুলো ঘরময় গড়াগড়ি খাচ্ছে। জয়া কি ঝকঝকেই না রাখত তার স্টুডিওটাকে!
বৃষ্টি দেখল মার সামনে রাখা ক্যানভাসে একটা দুটো রঙের আঁচড় পড়েছে মাত্র! রঙ তুলিতে কি যেন ধরতে চাইছে মা; পারছে না।
কতক্ষণ যে দাঁড়িয়েছিল বৃষ্টির মনে নেই। হঠাৎ মা তাকিয়েছে তার দিকে। প্রথমে দৃষ্টি দূরমনস্ক, দেখছে কিন্তু দেখছে না। ক্রমে চোখ পলকহীন। সেই পলকহীন চোখ ভেদ করে চলে গেল বৃষ্টিকে। সেই দৃষ্টির টানে বৃষ্টি কখন ঢুকে গেছে স্টুডিওতে। দুজনে পাশাপাশি বাক্যহীন বসে রইল। দীর্ঘক্ষণ।
জীবন তো একটাই। সেই জীবন কতভাবেই না ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে মানুষ। জীবনের মানে খুঁজছে। নিজেদের মত করে। জয়া, সুবীর, রীতা, ফিরোজ, নিখিল, শিপ্রা, বৃষ্টির বন্ধুবান্ধব। সায়নদীপও। অন্যের ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে বৃষ্টিই শুধু হারিয়ে ফেলছিল নিজেকে।
সুবীর আবার চুপ করে শুয়ে আছে। বৃষ্টি তার মাথায় হাত রাখতে গেল। ঠিক তখনই রীতা এসেছে। সঙ্গে রাজা। বৃষ্টিকে দেখেই রাজা মুহূর্তে ভয়ে কাঠ। চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। ফর্সা মুখ আতঙ্কে সাদা হয়ে গেছে।
বৃষ্টি হাসার চেষ্টা করল।
রাজা একটুও ভরসা পেল না। মাকে আঁকড়ে ধরে আছে।
বৃষ্টির চোখ ঝাপসা হয়ে এল। রাজার মুখ আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। বদলাতে বদলাতে কখন বৃষ্টির মুখ হয়ে গেল। সেই ছোট্ট বৃষ্টি! মার হাত চেপে ঠকঠক করে কাঁপছে। বাবা ফিরেও তাকাচ্ছে না।
বৃষ্টি আর দাঁড়াল না। মন্থর পায়ে বেরিয়ে এল নার্সিংহোম থেকে। বিকেল ফুরিয়ে আসছে। এবার বৃষ্টির জনসমুদ্রে একলা হাঁটার পালা। বৃষ্টিকে পাশে রেখে একটা লম্বা মিছিল চলে গেল। আর চারদিন পরে ভোট। বৃষ্টি এবার প্রথম ভোট দেবে।
সন্ধ্যা নামল শহরে। রাস্তার বাতিগুলো সব একে একে জ্বলে উঠেছে। সায়নদীপ।
সায়নদীপ এখনও দিশেরগড়ে। জিতছে। অবিরাম জিতছে! সায়ন হারতে জানে না। তার জন্য এই শহরে অপেক্ষা করছে বৃষ্টি। একজন দুঃখী মানুষই শুধু তার বন্ধু হতে পারে এখন।
হৃদয়ের জমা কষ্ট হৃদয়েই রয়ে গেল। থাক। অভিমান আর যন্ত্রণার দানা না হয় মুক্তো হয়েই জমা থাক বুকে। রাজা ভাল থাকুক।
আর একটাও বৃষ্টি যেন তৈরি না হয় কোথ্থাও।
——