চতুর্দশ অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

কদিন ধরেই করবীর শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। প্রায়ই বিকেলের দিকে ঘুসঘুসে জ্বর। হঠাৎ হঠাৎ মাথা ঘুরে যায়। ডাক্তার বলেছেন, অ্যাকিউট্ অ্যানিমিয়া, হিমোগ্লোবিন কমে গেছে, বেশ কিছুদিন টানা বিশ্রাম নিতে হবে। সঙ্গে ওষুধ, টনিক।

ওষুধের দোকান থেকে বেরিয়ে পিকলুর সঙ্গে মার শরীর নিয়ে আলোচনা করছিল সায়নদীপ। বেশি বয়সে চাকরিতে ঢুকে মার খুবই কষ্ট হচ্ছে। এবার সায়নের একটা কাজ জোগাড় করে ফেলা উচিত।

পিকলু বলল—তোমার খেলার কি হবে?

চৈত্র মাসের সেলের বাজার এতক্ষণ গমগম করছিল দুদিকের ফুটপাতে। পসারিরা এখন একে একে দোকান গোটাচ্ছে। সারাদিন সাংঘাতিক গুমোটের পর সন্ধ্যা থেকে আকাশ রক্তবর্ণ। সেদিকে এক ঝলক তাকিয়ে সায়ন উদাস,

—ক্লাবে গোপালদা বলছিলেন স্পোর্টস কোটায় রেলে চান্স পাওয়া যেতে পারে। তবে তখন আর রঞ্জিতে বেঙ্গল খেলার কোন স্কোপ্ থাকবে না।

—কেন? রেলওয়েজের হয়েও তো খেলা যায়?

—যায়। কম্পিটিশান খুব টাফ্ হয়ে যাবে। অল ইন্ডিয়া ব্যাপার তো। এমনিতেই বেঙ্গলের প্লেয়ারদের ওরা তেমন পোঁছে না।

—সেটা ঠিক। এখানে থাকলে নেক্সট্ ইয়ারে তোমার চান্স শিওর ছিল।

—চেষ্টা করলে ওখানেও চান্স করে নিতে পারব। পারতেই হবে। এখনও আমার ব্যাক্‌লিফ্‌টে গণ্ডগোল রয়ে গেছে। কিছুতেই সোজা ব্যাট নামাতে পারছি না। মন্টুদা বলছিলেন আড়াআড়ি ভাবে যদি...

আচম্বিতে দমকা হাওয়া উঠল। ধুলোর ঝড়ে নিমেষে রাস্তাঘাট ঝাপসা হয়ে গেছে। সোঁও সোঁও আওয়াজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করেছে ধুলোবালি। কাগজের টুকরো, শালপাতা, প্লাস্টিক ছিটকে ছিটকে যাচ্ছে। চোখে মুখে সূচের মত বিঁধছে ধুলোর ঝড়! লোকজন এলোমেলো দৌড়তে শুরু করেছে। সায়ন পিকলু দুজনেই চোখ বুজে ফেলল।

ঝটকা হাওয়ার সঙ্গে আলোগুলোও নিভে গেল আচমকা। কোথাও তার-ফার ছিঁড়ল বোধহয়। তালবেতাল বাতাসে সারাদিনের গুমোট ভাব কেটে গেছে পুরোপুরি। বছরের প্রথম কালবৈশাখি এসেছে।

ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করল। আকাশচেরা আলোয় ঝলসে যাচ্ছে পথঘাট। সেই আলোতেই মেয়েটাকে দেখতে পেয়ে পিকলু সায়ন চমকে উঠেছে। অদ্ভুত বেতালা পায়ে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছে বৃষ্টি।

ঝড়ের ঝাপটায় একবার ডানদিক, একবার বাঁদিকে টলে পড়েও টাল সামলাবার চেষ্টা করছে প্রাণপণ। যেন রাস্তা নয়, ভরা বর্ষার নদী পার হতে চায় মেয়েটা।

সায়ন পিকলু মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। বৃষ্টি সম্পূর্ণ নেশাগ্রস্ত। অন্ধকারে এদিক ওদিকে তাকাচ্ছে বার বার। সায়নের গলা থেকে বেরিয়ে এল,

—একি! কি অবস্থা মেয়েটার!

পিকলু সায়নের হাত ধরে টানল। সে এ সমস্ত ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে রাজি নয়। পাড়ার সবাই জানে বৃষ্টি এখন পুরো বখে গেছে।

—যেতে হবে না। যত সব ঝুট্‌ঝামেলা। কি ব্রাইট ছিল মেয়েটা, কি হয়ে গেল! মাল-ফাল টেনেছে বোধহয়।

সায়ন তবু এগোল পায়ে পায়ে,

—মেয়েটাকে তো দেখছি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া দরকার। এভাবে রাস্তার মাঝখানে ফেলে...

—আমি নেই। উড়ন্ত ধুলো আটকাতে পিকলু হাতে মুখ আড়াল করল, —কে যাবে বাবা আগ বাড়িয়ে? ওর যা মেজাজ!

—তাবলে দেখেও মুখ ঘুরিয়ে চলে যাব?

—ছাড়ো তো, ও ঠিক পৌছে যাবে। ওস্তাদ মেয়ে। প্রায়ই তো আজকাল এই দশা হয়।

সায়ন আশ্চর্য হয়ে গেল। পিকলু না বৃষ্টির ছেলেবেলার বন্ধু! এরকম সঙ্গীন অবস্থায় কেউ বন্ধুকে ফেলে চলে যেতে পারে!

সায়ন একাই এগিয়ে গেল,

—বাড়ি যাবে তো?

বৃষ্টির ঘোরলাগা চোখ পিটপিট করে উঠল। যেন সায়নকে চিনতে অসুবিধা হচ্ছে। বাতাসের জন্য সায়নের কথাগুলোও কানে ভাল করে পৌঁছল না তার। তার কাছে এখন সবই অস্পষ্ট। আজই সে প্রথম নেশার ট্যাবলেট খেয়েছে।

সায়নের দিকে ঢুলুঢুলু চোখে তাকিয়ে বৃষ্টি স্খলিত প্রশ্ন করেছে, —আমার বাড়ি কোথায়?

ঝড় বাড়ছে। দু-চারটে বড় ফোঁটা পড়ল গায়ে। পাশ দিয়ে দৌড়ে যাওয়ার সময় পথচারিরা থমকে দাঁড়িয়ে দেখে নিচ্ছে সুন্দরী নেশাড়ু মেয়েটাকে।

সায়নের স্বরে ধমক এল,

—একটা কথাও নয় আর। চলো আমার সঙ্গে।

হাত ধরে টানতে টানতে মেয়েটাকে বাড়ির দিকে নিয়ে যেতে চাইল সায়ন।

কয়েক পা গিয়েও বৃষ্টি দাঁড়িয়ে পড়েছে,

—আমি তোমার সঙ্গে যাব কেন?

সায়ন কোন কথা বলল না। বিকট শব্দে কাছে কোথাও বাজ পড়ল। বাতাস আরও দামাল।

বৃষ্টি গলা চড়াল,

—তুমি এখানে কেন? গুড বয়রা তো এখন মায়ের আঁচল ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। যাও, বাড়ি যাও। মিষ্টি মিষ্টি স্বপ্ন দ্যাখোগে।

বৃষ্টির একটা কথার সঙ্গে অন্য কথা মিশে যাচ্ছে। চড়া গলা ধীরে ধীরে খাদে নেমে গেল।

সায়নের কষ্ট হল মেয়েটাকে দেখে। মানুষ নিজেকে নিজে এভাবে ধ্বংস করে ফেলে কেন? ধবধবে সাদা চাদরে ঢাকা বাবার মুখটা দেখতে পেল সায়ন। শ্মশানের হাওয়ায় মুখ থেকে চাদর সরে গিয়েছিল একবার। একবারই। কী বীভৎস ক্ষতবিক্ষত মুখ! বর্শার খোঁচা লাগল সায়নের বুকে। মেয়েটার হাত সজোরে চেপে ধরেছে!

—কেন এভাবে নিজেকে নষ্ট করছ? তোমার মত ব্রাইট মেয়ে...

—নো লেকচার। নো সারমন। নো পুরুতগিরি। হু আর ইউ? আমার গার্জেন? আমি কোন গার্জেন-ফার্জেনের তোয়াক্কা করি না।

—আমি তোমার বন্ধু। জাস্ট এ ফ্রেন্ড্।

—হেল উইথ ইওর ফ্রেন্ডশিপ। আমি বন্ধু চাই না। আমার কেউ নেই। নো বডি। নান্। আয়াম অল অ্যালোন ইন দিস্ গ্রেট প্ল্যানেট্।

মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। ঝড়ের সঙ্গে একবার এদিকে যাচ্ছে, একবার ওদিকে। বৃষ্টিকে নিয়ে সায়ন কোনরকমে তাদের বাড়ি পর্যন্ত পৌছল। তখনও বৃষ্টি অবিরাম বকবক করে চলেছে,

—আমি ভালদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করব না, আমি তোমাদের ঘেন্না করি... অল মায়ের পুতুপুতু ছেলে... ক্যাবলা ক্যাবলা... গুড়ি গুডি... ড্যাম ইউ।

ঝড়ের ঝাপটায় পার্কের ভেতরের কাঁঠালি চাঁপা গাছটার ডাল মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ল।

আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে বিদ্যুৎ শিকড় ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই ঝলকানিতে রাত ফালা ফালা। মুহূর্তের জন্য দিনের মত আলোকিত রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি। পর মুহূর্তেই কালিমালিপ্ত।

মুহূর্তের ঝলকানিতেই তিনটে মুখ স্পষ্ট হল। বাইরের বারান্দায় ঝড়ের ঝাপ্টা মেখে জয়া সুধা নিশ্চল। বাবলু হুইলচেয়ারে স্থির।

সুধারই প্রথম সম্বিত ফিরল। হুড়মুড় করে নেমে এসেছে রাস্তায়। সায়নকে সরিয়ে, সপসপে ভেজা মেয়েটাকে দুহাতে জাপটে ধরেছে।

বৃষ্টি ভেজা কাঠের মত দাঁড়িয়ে রইল।

—যাব না। ছেড়ে দাও আমাকে।

সুধা প্রাণপণে টানছে বৃষ্টিকে। সায়ন চকিতে তাকাল জয়া আর বাবলুর দিকে। সবার মুখই আবার অন্ধকারে। এখানে তার আর দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয়। লজ্জায় মিশে যাওয়া মানুষদের দেখতে ভয় পায় সায়ন।

সায়ন বাড়ির দিকে দৌড়ল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%