অষ্টাদশ অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

থানা থেকে ফেরার পর সব শুনে রীতা যে অত রেগে যাবে সুবীর ভাবতেও পারেনি।

—হল তো? আমি জানতাম ওই মেয়ে বাপ মাকে না ফাঁসিয়ে ছাড়বে না। সুবীর থামানোর চেষ্টা করেছিল। কিচ্ছু ভাল লাগছিল না তার। বৃষ্টি কি ভাবে ঘোলাটে চোখে তার হাত ছাড়িয়ে চলে গেল! এই অভিমান কি শুধু সে মেয়ের সঙ্গে থাকতে রাজি হয়নি বলেই? যদি তাই হয়, তবে তাকে যে কোন একটা জীবন বেছে নিতে হবে। হয় মেয়ের ভবিষ্যৎ, নয় এভাবে ধুকপুক ধুকপুক করে, এক পা জলে ডুবিয়ে, অন্য পা জমিতে রেখে, কোনরকমে বেঁচে থাকা। সারা রাত সেদিন জেগে কাটিয়েছিল সুবীর।

পর দিন সকাল থেকেই ভেবেছে মেয়েকে ফোন করে। বৃষ্টির সঙ্গে তার একবার দেখা হওয়া খুব দরকার। রিসিভার তুলে ডায়াল ঘুরিয়েছে, ফোর সিক্স ফাইভ সেভেন....অর্ধেক নম্বর ঘুরিয়ে থেমে গেছে। মেয়ে যদি ফোন না ধরে। নিশ্চয়ই ধরবে না। ফোন করার আগেই তাকে সিদ্ধান্তটা নিতে হবে।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সুবীর সারাক্ষণ রীতা আর রাজার সামনে বসে রইল। বার বার সে রাজাকে দেখছিল। কী ঘন কালো চোখের পাতা, মায়াকাড়া জাপানী পুতুলের মত মুখ। রীতাও কেমন নিরুদ্বেগ।

সুবীরের সিদ্ধান্তটা বার বার পিছলে যাচ্ছিল। রীতা জয়া নয়। রীতার নিজস্ব কোন চাহিদা নেই, নিজস্ব কোন লক্ষ্য নেই, নিজস্ব কোন স্বপ্ন পর্যন্ত নেই। যা কিছু আছে সবই সুবীরকে কেন্দ্র করে। অথবা রাজাকে। উদ্বেগহীন মানুষকে কি নির্মম আঘাত করা যায়?

আরও কয়েকটা দিন দ্বিধায় কেটে গেল সুবীরের।

রীতাও বোধহয় কিছু আঁচ করতে পারছিল। কদিন ধরেই সুবীর কি যেন ভাবে সর্বক্ষণ। যেন কিছু বলতে চায়, বলতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত রীতা ধৈর্য রাখতে পারল না,

—কি ভাঁজছ বলো তো কদিন ধরে?

সুবীরের দৃষ্টি শূন্য।

রীতা আবার প্রশ্ন করল,

—কি চাও বলো তো পরিষ্কার করে?

সুবীর হঠাৎই মরিয়া। যদি রীতাকে রাজি করানো যায়।

—মানে বলছি আর কি, তুমি যদি মাস দুয়েকের জন্য রাজাকে নিয়ে বাপের বাড়িতে ঘুরে আসো...

—কেন?

—না, এমনিতেও তো রাজার বড় একটা মামারবাড়িতে যাওয়া হয় না। আমি সে কদিন বৃষ্টিকে এখানে এনে, মানে এই দুমাসে.... মেয়েটার নেশা টেশা যদি ছাড়ানো যায়......

রীতা হতবাক মুখে সুবীরের দিকে তাকিয়ে রইল। সে ঠিক এই কথা একদম আশা করেনি। ছ বছরেও মানুষটা তার আপন হল না। কত নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করল কথাটা। যে নিঃসঙ্গ সুবীরকে সে বিয়ে করেছিল, তার অনুরাগ, আবেগ সব মরে ভূত হয়ে গেছে। ছোটবেলায় দেখা শীতকালের হুড্রু ফলসটার কথা মনে পড়ল রীতার। এক গভীর নিঃস্ব জলপ্রপাত। জলের দাগ আছে, অস্তিত্ব নেই। সে না হয় এখন ব্যবহার করা একটা পুরনো শরীর। কিন্তু রাজা! রাজাকেও তেমন করে সুবীর ভালবাসতে পারল কোথায়! বৃষ্টিই সবটুকু জুড়ে বসে আছে। বৃষ্টি! না বৃষ্টির মা! মেয়ের মধ্যে দিয়ে সুবীর বোধহয় এখনও মাকেই খোঁজে। এ নিয়ে যুদ্ধ করা ছায়ার সঙ্গে লড়তে যাওয়ারই সামিল। ছায়াকে যুদ্ধে জিততে দেবে না রীতা।

রীতা মুখ ভাবলেশহীন রাখার চেষ্টা করল,

—কবে যেতে হবে? কাল, না আজই?

সুবীরের মুখে মুহূর্তের জন্য রঙমশাল জ্বলে উঠল। রীতা এত সহজে রাজি হবে ভাবতেও পারেনি। সুবীর রীতার হাত জড়িয়ে ধরল,

—তুমি... তুমি আমাকে.....

রীতা হাত ছাড়িয়ে নিল।

—আজ গোছগাছ করে নিই, কাল সকালেই চলে যাব।

সত্যি সত্যি রীতা জামাকাপড় গোছানো শুরু করল সে রাত্রেই। নিজের শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ, স্যুটকেসে থাক থাক সাজাল, ছেলের জামাকাপড় একটা একটা করে ভাজ করে তার ওপর। ওইটুকু ছেলে কি বুঝল কে জানে, সাঁড়াশির মত আঁকড়ে ধরে আছে রীতাকে। বাবার দিকে সভয়ে তাকাচ্ছে আর সঙ্গে সঙ্গে লুকিয়ে পড়ছে মার পিছনে।

সুবীরের বুকটা মুচড়ে উঠল। একি দেখছে সে! রাজা তো নয়, যেন বৃষ্টি জয়াকে আঁকড়ে ধরে আছে। মেয়ের চোখে আতঙ্ক।

পলকে সুবীরের কি যে হয়ে গেল। মনে হল ভীষণ জোরে কেউ মুগুর চালাচ্ছে তার বুকে। সেই আঘাত তীব্র যন্ত্রণা হয়ে কাঁকড়াবিছের কামড় বসাল হৃৎপিণ্ডে। গলগল করে সুবীর ঘামতে শুরু করল। বুক চেপে কোনক্রমে বসে পড়ল বিছানায়।

রীতা প্রথমটা খেয়াল করেনি। রাজা ডুকরে ওঠায় চমকে তাকাল,

—একি! কি হল তোমার! অত ঘামছ কেন?

সুবীরের মুখ থেকে অস্ফুট কিছু শব্দ ছিটকে এল। অনেক কষ্টে বুকটাকে দেখাতে পারল শুধু।

রীতা কম্পিউটারের গতিতে মস্তিষ্কে ছকে ফেলল তাকে এখন কি কি করতে হবে। প্রথমেই ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানকে ফোন করল। এখখুনি আসুন।

ডাক্তার এসেই ই সি জি করল। অ্যাটাক তত মারাত্মক নয়। হৃদয়ে ধাক্কা লাগলেও প্রাচীর এখনও অক্ষত। বেশ কয়েক দিন বিশ্রাম প্রয়োজন। টোটাল বেডরেস্ট। শরীর ও মনের। ডাক্তারবাবুর মতে ওয়াচে রাখার জন্য এখন কিছুদিন নার্সিংহোমই নিরাপদ।

রীতা ঠিক এই আশঙ্কাটাই করছিল। যেভাবে মনের ভেতর উত্তাল ঝঞ্ঝা চলছে সুবীরের! ভয়ঙ্কর রাগ হল বৃষ্টি আর জয়ার ওপর। সুবীরকে মেরে না ফেলা পর্যন্ত ওদের বোধহয় শান্তি নেই।

মস্তিষ্কের ছক মতই প্রথম দিন খবর দিল না বৃষ্টিকে। বাপের বাডিতে টেলিফোন করল, ন্যায়রত্ন লেনের বাড়িতে খবর পাঠাল বিজয়কে দিয়ে। ছোট বোন আর মা খবর পেয়েই তার কাছে চলে এসেছে, বাবা ভাই নার্সিংহোমে দৌড়াদৌড়ি করছে, বোন অফিস কামাই করে দু দিন ধরে সামলালো রাজাকে। প্রবীর, প্রবীরের বউও ছুটে এসেছিল সঙ্গে সঙ্গে।

সুবীর কোন সময়ই পুরোপুরি জ্ঞান হারায়নি। কড়া ট্রাংকুলাইজার তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে মাত্র। ঘুম ভাঙলেই তার চোখ কাউকে খুঁজছে। রীতা হাঁ হাঁ করে উঠছে,

—উঁহু, কোন কথা নয়। এখন একদম কথা নয়। পরে সব শুনব। প্লিজ।

রীতার বাবা বললেন, —হ্যাঁরে, এরকম হঠাৎ কেন হল রে! এত সুস্থ সবল ছিল!

প্ৰবীর বলল,—সেদিন অফিসেই ওর মুখচোখ আমার ভাল লাগেনি। আমি জানতাম একটা কিছু.....

রীতার একবার মনে হল বাবাকে সব কথা খুলে বলে। পারল না। তার স্বামী আগের পক্ষের মেয়ে নিয়ে বিষম সমস্যায় আছে, তাকে চলে যেতে বলছে। বাড়ি ছেড়ে, এ কথা বলে বেড়ানো তার পক্ষে খুবই অপমানজনক। আত্মমর্যাদা নেই তার? বিয়ের ছ বছর পর বাবা মাকে কি বলা যায় কি ভয়ঙ্কর নিরাপত্তার অভাব বোধ করে সে? হয় ওই মেয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে সুবীরকে, নয়ত মানুষটা নিজের আগুনে নিজেই দগ্ধে মরবে যার পরিণাম হবে এইরকম। এই ভবিতব্যই কি তার ভাগ্যে লেখা ছিল?

সুবীরকে অবশ্য আটচল্লিশ ঘণ্টার বেশি ভুলিয়ে রাখতে পারল না রীতা। তৃতীয় দিনই সুবীর প্রশ্ন করল,

—বৃষ্টি আসেনি? বৃষ্টিকে খবর দিয়েছ?

কি নিষ্ঠুর লোক। রাজা নয়, সুবীর বৃষ্টিকে খুঁজছে। রীতা অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালো,

—কাল সবাই খুব ব্যস্ত ছিল তো, তাছাড়া তোমার অফিসের লোকজন এসে গেল অনেক, আজ ফোন করে দেব।

কথাটা বলেই রীতা বুঝল সে ধরা পড়ে গেছে। সুবীর তার দিকে নিনিমেষ তাকিয়ে। রীতা অফিসে ফোন করেছে, নিজের বাবা মাকে ডেকেছে, প্রবীরদেরও খবর পাঠিয়েছে, শুধু বৃষ্টিকেই.....

রীতার মা বললেন,—ঠিকই তো, মেয়েটাকে খবর দিসনি তুই?

রীতা কিছুক্ষণ গোঁজ হয়ে বসে রইল। তারপর ফোন করল নার্সিংহোম থেকেই।

টেলিফোন পেয়ে বাবলু প্রথমে ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করল। সুবীরদার মত প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষের হার্ট অ্যাটাক! একটু সময় নিয়ে প্রশ্ন করল,

—কবে হয়েছে বললেন? তিন দিন আগে?

—হ্যাঁ, ...মানে ডাক্তাররা বলছিলেন খুব একটা ভয়ের কিছু নেই তাই..... হয়ত দু-চারদিনের মধ্যে ছেড়েও দেবে।

বাবলু ফোন রেখে কয়েক মিনিট চুপ করে চিন্তা করল। খবরটা কাকে আগে দেবে? জয়া? না বৃষ্টি? বৃষ্টি এখন অনেকটা শান্ত হয়েছে তবু কিভাবে সে খবরটাকে নেবে কে জানে!

বাবলু হুইল চেয়ার চালিয়ে জয়ার ঘরেই ঢুকল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%