দ্বাদশ অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

মার সঙ্গে ওরকম বিশ্রী ভাষায় কথা বলার পর সারা রাত ঘুমোতে পারল না বৃষ্টি। উদ্দাম বাজনা শেষ হওয়ার পর, রাগ ঝিমিয়ে পড়ল একটু একটু করে। কেন যে ওরকম অশালীন হয়ে পড়ল! মা কি তার জন্য কম করেছে এতদিন। মা’ও তো একটা বিয়ে করে ফেলতে পারত, তা না করে এত পরিশ্রম করেছে, সে তো শুধুই তার কথা ভেবে। বৃষ্টি ঠিক করল সকালে উঠেই মার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির মত বদলে যেতে শুরু করল। অন্য বৃষ্টিটা ছায়া ফেলতে শুরু করল তার মনের ওপর। সেই বৃষ্টি একটা কথাই ভাঙা রেকর্ডের মত কানে বাজিয়ে চলেছে, বৃষ্টি, তুই কি মূর্খ। মা তোকে নিয়ে ভিন্ন হয়েছিল তোর বাবার সঙ্গে যুদ্ধে জিততে চায় বলে। পরিশ্রম শুধু মেয়ের জন্য করেনি, করেছে নিজেরই প্রতিষ্ঠা আর খ্যাতির জগৎ বিস্তার করার জন্য। যদি তোর মা তোকে সত্যিই ভালবাসত, তবে কি তোর মার দিনগুলো, সন্ধেগুলো সবই চলে যেত বন্ধু বান্ধব, ছাত্রছাত্রী, ক্যানভাসের দখলে? মনে করে দেখ, কবে তোর মা শুধু তোকে নিয়েই একটা পুরো দিন কাটিয়েছে। বৃষ্টি মন দিয়ে সেরকমই একটা দিন খোঁজার চেষ্টা করল। নেই। সত্যিই সেরকম দিনের অস্তিত্ব নেই বৃষ্টির জীবনে।

যদি সেরকম দিন না’ই থাকে, তা হলে ওই নির্লজ্জ ভদ্রমহিলা তার ওপর জোর ফলায় কোন অধিকারে? ভাবে কি করে সে’ই বৃষ্টির সমস্ত চিন্তা কৰ্ম ভূত ভবিষ্যতের নিয়ন্তা?

অনুতাপ ক্রমশ ক্ষোভে, ক্ষোভ ক্রমশ রাগে পরিণত হচ্ছিল বৃষ্টির। বাবার চেহারা মনে পড়তেই রাগ রূপ নিল আক্রোশের। বাবা কিনা শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে চুকলি খেল মার কাছে? মেয়ের একটা নিষ্ঠুর ঠাট্টাকেও বরদাস্ত করার শক্তি নেই? অথচ মুখে কত বড় বড় ভালবাসার কথা! কোন স্তরে নেমে গেছে তার বাবা?

টানা তিন দিন বাড়িতে শুয়ে রইল বৃষ্টি। উৎকট দেওয়াল আর লোহার গরাদের দিকে অবিরাম তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। এ বাড়িতে সে আর থাকবে না। যেখানে থাকলে প্রতিনিয়ত শুধু বিরক্তি আর ক্রোধের সঞ্চার হয়, সেখানে থাকার থেকে না থাকাই ভাল। সুবীরের বাড়িতেও সে আর জীবনে পা রাখবে না। সব থেকে ভাল হয় যদি কোথাও একটা আস্তানা জোটানো যায়। পেয়িংগেস্ট হয়ে। অথবা কোন হোস্টেল টোস্টেলে।

বৃষ্টির মনে পড়ল দাদু তার নামে কিছু টাকা ফিক্সড্ ডিপোজিট করে গিয়েছিলেন। সে এখন মাইনর নয়, ইচ্ছে করলেই সে টাকা তুলে ফেলতে পারে। যত দিন না লেখাপড়া শেষ করে চাকরি বাকরি জোগাড় করা যায় ওই টাকাতে কি কোনক্রমে চলবে না? না হয় টিউশ্যনি ধরবে গোটাকয়েক। দেবাদিত্য অনেক টিউশনি করে, নিশ্চয়ই দুচারটে জুটিয়ে দিতে পারবে তাকে।

যেদিন প্রথম বাড়ি থেকে বেরোল, সেদিনই খবরের কাগজ থেকে টুকে নিয়েছে দুটো ‘পেয়িংগেস্ট চাই’ এর ঠিকানা। একটা বেহালায়, অন্যটা ঢাকুরিয়ায়। কলেজে এসেই দেবাদিত্যকে বলল,

—আমাকে কয়েকটা টিউশনি জোগাড় করে দে তো।

দেবাদিত্য হাঁ করে দেখছিল বৃষ্টিকে,

—তুই টিউশ্যনি করবি! কেন বস্, গরীবদের বাজার মারবে কেন?

—ফাজলামি নয়, আমি সিরিয়াস। আমার ভীষণ দরকার। আরজেন্ট।

—রেজিস্ট্রি ফেজিস্ট্রি করে ফেলেছিস নাকি? ছেলেটা কি মীনাক্ষির হিরোর মত? চাকরি বাকরি করে না?

বৃষ্টি খেপে গেল। মানুষের যত বিপদই হক, দেবাদিত্য কিছুতেই ঠাট্টার মোড়কের বাইরে আসতে পারবে না। এরকম বন্ধু থাকার থেকে না থাকাই ভাল। বৃষ্টি দেবাদিত্যর সঙ্গে সারাদিন আর একটি কথাও বলল না।

কলেজ থেকে বৃষ্টি তৃষিতার সঙ্গে বেরোল। বাস স্টপে এসে তৃষিতা বলল, —চল, আমাদের বাড়িতে চল। আমার এক কাকা এসেছে, নেভিতে চাকরি করে, এমন অদ্ভুত অদ্ভুত অভিজ্ঞতার গল্প বলে ...

বৃষ্টি বলল, —নারে, আমার কাজ আছে।

—ছাড় তো তোর কাজ। কাজ মানে তো শুভর সেই বন্ধুটার বাড়িতে আড্ডা।

—কে বলেছে তোকে?

—শুভই বলছিল। তৃষিতা চোখ ঘোরাল, —আমি বলছি বৃষ্টি ওই রাজীব ছেলেটা কিন্তু মোটেই সুবিধের নয়, রণজয় বলছিল ওর বাবার নাকি অনেক ফিশি ব্যাপার আছে।

বৃষ্টি শুভর ওপর বিরক্ত হল। শুভ কোন কথাই কি ঘোষণা না করে থাকতে পারে না? মুখে বলল,

—তোর মামা নিশ্চয়ই কয়েকদিন থাকবে। অন্য দিন যাব, আজ সত্যিই একটা কাজ আছে।

তৃষিতা কাঁধ ঝাঁকিয়ে এসপ্ল্যানেড়-এর ট্রামে উঠে পড়ল। তৃষিতার ভাব ভঙ্গিতে পরিষ্কার বোঝা যায় সে বৃষ্টির কথা বিশ্বাস করেনি।

দুটো ঠিকানার মধ্যে ঢাকুরিয়াতেই আগে যাবে বলে ঠিক করল বৃষ্টি। ঢাকুরিয়া সে মোটামুটি চেনে, মাধ্যমিকের সময় ওখানে একটা টিউটোরিয়ালে যেত সে। তাছাড়া সুবীরের বাড়িও তো ঢাকুরিয়ার কাছেই।

ঠিকানা খুঁজে, বাড়িটা বার করতে বৃষ্টির খুব একটা সময় লাগল না। ছোট্ট দোতলা বাড়ি, সামনে অল্প ফাঁকা জায়গায় ফুলের বাগান, দেখেই বৃষ্টির বেশ পছন্দ হয়ে গেল।

কলিংবেল বাজাতে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক নেমে এসেছেন। লোহার জাল দেওয়া দরজার ওপার থেকে জিজ্ঞাসা করলেন,

—কাকে চাই?

—আপনি কি শশধর দত্ত? যিনি কাগজে পেয়িংগেস্টের অ্যাড্ দিয়েছিলেন?

ভদ্রলোক দরজার তালা খুলে বৃষ্টিকে ঘরে এনে বসালেন।

—কে থাকবেন? আপনি ... মানে তুমি থাকবে? ডোন্ট মাইন্ড, আমি তোমার থেকে বয়সে অনেক বড় বলে তুমি বলছি।

বৃষ্টি এরকম জেঠুসুলভ কথাবার্তা একদম সহ্য করতে পারে না, তবু শান্তভাবে বলল, —হ্যাঁ, আমিই।

—তুমি কি চাকরি করো?

—না, স্টুডেন্ট। ফার্স্ট ইয়ার।

—এখন আছ কোথায়?

—দেশপ্রিয় পার্ক।

—তোমার বাবা মা?

গোড়াতেই এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে আঠেরো বছরের বৃষ্টি ভাবতেও পারেনি। মাস গেলে টাকা নেবে, বিনিময়ে থাকতে দেবে, এতে এত জেরার কি আছে! একটু তীক্ষ্ণ গলাতেই বৃষ্টি উল্টো প্রশ্ন করল,

—কেন বলুন তো?

—বাহ্। যাকে থাকতে দেব তার সঙ্গে ভালমত আলাপ পরিচয় করব না? বৃষ্টি এক মুহূর্ত ভেবে নিল। তারপর পরিষ্কার উচ্চারণে বলল,

—আমি দেশপ্রিয় পার্কে মার সঙ্গে থাকি। বাবা যোধপুর পার্কে। আলাদা।

ভদ্রলোক সামান্য থতমত খেলেন। মিনিটখানেক চুপ করে থেকে বললেন, —ওয়েল, সে তোমাদের ফ্যামিলি অ্যাফেয়ার। আমার তাতে আগ্রহ নেই। আমি শুধু দুটো ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে চাই। এক, মাসে বারোশ টাকা পড়বে, তুমি দিতে পারবে? যদি পারো তোমার সোর্স অফ্ ইন্‌কাম কি? দুই, তোমার বাবা মার নিশ্চয়ই কোন আপত্তি নেই, আমি কি সেটা কোনভাবে কনফার্ম করতে পারি?

—বাবা মার মতামতের কি দরকার? আমি তো অ্যাডাল্ট।

ভদ্রলোক হাসলেন, —অ্যাডাল্ট হলেই কি বাবা মার সঙ্গে সব সম্পর্ক ঘুচে যায়? তাছাড়া তুমি সত্যি বলছ কিনা সেটাও তো আমাকে ভেরিফাই করতে হবে।

বৃষ্টির ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠল। বাসস্ট্যান্ডে এসে রাগে অনেকক্ষণ ধরে পায়চারি করল সে। পেয়িংগেস্ট থাকতে গেলেও বাবা মার ওপর নির্ভর করতে হবে তাকে? হোস্টেলে গেলে হয়ত ঠিকুজি কুষ্ঠিই চাইবে। একটা স্বাধীন দেশের প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের একা থাকার এতটুকু স্বাধীনতা নেই? বাবা মা তাকে কিছুতেই শান্তিতে থাকতে দেবে না?

বেহালার ঠিকানায় যাওয়ার সমস্ত উৎসাহ বৃষ্টি হারিয়ে ফেলল। মনেও নেই কখন চলে গেছে রাজীবদের ফ্ল্যাটে।

বৃষ্টি এ কদিনে জেনে গেছে এই ফ্ল্যাটের আড্ডায় গাঁজা মদ ছাড়াও চরস, মারিজুয়ানা, নেশার ট্যাবলেট সবই চলে। যে সব ছেলেমেয়েরা আসে, তারা সবাই প্রায় এসব নেশায় অভ্যস্ত। বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের পরিবারেই বৈভবের অভাব নেই, ফলে ছেলেবেলা থেকেই সুখ, আনন্দের অনুভূতিগুলো এদের অনেক ভোঁতা। নেশার মাধ্যমে সেই ভোঁতা অনুভূতিগুলোতেই কৃত্রিমভাবে শান দেওয়ার চেষ্টা করে সবাই। বৃষ্টি শুনেছে রাজীব কখনও কখনও বন্ধুবান্ধব নিয়ে নিষিদ্ধ ছবিরও আসর বসায়। সুদেষ্ণার কাছে ওই সব জান্তব ছবির বর্ণনা শুনেছে সে। ও ব্যাপারে বৃষ্টির কণামাত্র আগ্রহ নেই, সে যায় শুধুই নেশার তালিম নিতে।

বৃষ্টি আবার একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। রাজীবের ফ্ল্যাটটাই হবে এখন থেকে তার সন্ধেবেলার স্থায়ী ঠিকানা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%