অষ্টম অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

মেয়েটাকে অনেকক্ষণ আগেই দেখতে পেয়েছিল সায়নদীপ। মেডিকেল কলেজের উল্টো ফুটপাথ ধরে অন্যমনস্কভাবে হাঁটছে। এত অন্যমনস্ক যে আচমকা কেউ সামনে এসে পড়লে স্থির দাঁড়িয়ে পড়ছে, ঠিক করতে পারছে না কোন পাশে সরে জায়গা করে দেবে সামনের পথচারীকে। দু হাত বুকের কাছে জড়ো, হালকা নীল শৌখিন শাল আষ্টেপৃষ্টে জড়ানো। শালের নিচ দিয়ে কাঁধ থেকে ঝোলা ব্যাগ প্রায় কামিজের ঝুল বরাবর নেমে এসেছে, দুলছে হাঁটার তালে তালে। প্রত্যেকটি মানুষেরই হাঁটার নিজস্ব ছন্দ আছে। চরিত্রও। বৃষ্টিকে পাশ কাটিয়ে এইমাত্র যে মেয়েটি ভিড়ের মাঝখান দিয়ে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় এগিয়ে চলে গেল, তাকে দেখেই বোঝা যায় সমস্ত রকম প্রতিকূল পরিস্থিতি সে কাটিয়ে চলে যেতে পারবে। কিন্তু এই মেয়েটা কেমন!

মেডিকেল কলেজের সামনে এসে মেয়েটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। রাস্তার মাঝখানে বড়সড় একটা ভিড়। ভিড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে এক দেহাতী বউ হাউ-হাউ করে কাঁদছে আর দুর্বোধ্য ভাষায় হাসপাতালের দিকে আঙুল দেখিয়ে কিছু বলতে চাইছে, মাঝে মাঝে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। সন্ধের দিকে এমনিতেই এ অঞ্চলে বেজায় ভিড় থাকে। টুকটাক উপলক্ষ এসে গেলে আরও বেশি ভিড় জমে যায়। যেন দল বেঁধে সব চিড়িয়াখানায় মজা দেখছে। হাসপাতালই এ শহরের শ্রেষ্ঠ চিড়িয়াখানা।

মোড়ের ট্র্যাফিক পুলিশটা বেশ কয়েক মিনিট পর এগিয়ে এল,—কি হচ্ছে কি এখানে, অ্যাঁ? রাস্তা জ্যাম করে ঝামেলা? হল্লা করতে হয় ফুটপাথে যাও।

এক এক করে লোক সরতে শুরু করেছে। মেয়েটাও হাঁটতে শুরু করেছিল, সেই সময়েই চোখাচোখি হয়ে গেল সায়নদীপের সঙ্গে।

মাঝে মাঝেই মেয়েটাকে এখানে ওখানে চোখে পড়ে যায় সায়নদীপের। আলাপের পর দু-একবার দূর থেকে দেখে হাতও নেড়েছে। মুখে হাসির আভাস ফুটলেও কাছে যেতেই মেয়েটা বদলে গেছে। সায়নকে এগোতে দেখলেই রোদচশমার আড়ালে লুকিয়ে ফেলেছে নিজেকে। কোন দিন সায়ন বলেছে,

—হাই। কলেজ?

—হুঁ।

মেয়েটা হয়ত মুখ ঘুরিয়ে বাস আসছে কি না দেখার চেষ্টা করেছে কিংবা একমনে তাকিয়ে থেকেছে বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং-এর দিকে।

—তুমি কি আমার সঙ্গে কথা বলা পছন্দ করছ না?

বৃষ্টির মুখে স্পষ্ট অসন্তোষ।

আবার কোন দিন নিজেই যেচে ডেকেছে সায়নকে,

—জাসুসের মত আমার পেছন পেছন ঘোরো কেন বলো তো? কি মতলব তোমার?

—মতলবের কি আছে? খেলার পর ও-পাড়ায় আমরা দল বেঁধে সরবত খেতে যাই, তখনই তোমাকে দু-চার দিন চোখে পড়েছিল। তাই ভেবেছিলাম বলে তোমাকে চমকে দিই।

—ঢপ মেরো না। ডেফিনিটলি এ তোমার রোমিও কোচের টিপস্।

সায়ন এ সব কথায় ভারী অসহায় বোধ করে।

কখনও বা বৃষ্টি আরও কাছে এগিয়ে আসে,

—তোমার হেভি কৌতূহল না? আমার সম্পর্কে?

সায়ন থতমত।

—কৌতূহলী বেড়ালের কি হয়েছিল জান?

—না তো।

—নেক্সট দিন কথা বলার আগে জেনে আসবে।

সেই মেয়েটাই অবাক চোখে দেখছে সায়নকে! সায়ন যেচে কথা বলবে কি না ভাবল। আজ তার মা সঙ্গে রয়েছে। যদি মেয়েটা মার সামনে উল্টোপাল্টা কিছু বলে দেয়!

বৃষ্টি নিজেই এগিয়ে এল,—তুমি এদিকেও!

সায়ন চোখের ইশারায় দেখাল, মা।

মা সামান্য তফাতে দাঁড়িয়ে ছোট মামিমার সঙ্গে কথা বলছে। জিজ্ঞাসা করবে না ভেবেও সায়ন প্রশ্ন করে ফেলল,

—কলেজ থেকে?

বৃষ্টি ঘাড় নাড়ল।

—এত দেরি! ছ’টা তো প্রায় বাজে!

—খেলা করছিলাম। ডাংগুলি। বৃষ্টি ঠোঁট টিপে হাসল। বলেই সচেতন হয়েছে,—তোমরা এখানে কেন? হসপিটালে?

—আজ সকালে আমার এক মামার সেরিব্রাল হয়েছে।

সায়নের মামিমা হাসপাতালের ভেতরে চলে গেলেন। করবী ছেলের দিকে এগিয়ে আসছে। বৃষ্টিকে দেখে থমকাল সামান্য।

সায়ন বলল,—মা, একে চেনো তো? আমাদের পাড়ার বৃষ্টি। টিপ টিপ করে পড়া নয়, মুষলধারে পড়া।

করবী মৃদু হাসল,—চিনব না কেন? দেখেছি তো ওকে। তুমি কি এত দূরে কলেজে আসো?

—হুঁ। বৃষ্টি চকিতে ভদ্র-সভ্য, —আপনার ভাই এখন কেমন আছেন?

—ভাই না। মামাতো দাদা। বাহাত্তর ঘণ্টা না গেলে বলছে কিছু নাকি বোঝা যাবে না। তোর কিরকম মনে হল রে বুবলু?

—মনে তো হল মার্জিনালি বেটার। কিছুটা ব্লিডিং হয়ে গেছে তো। তবে বাঁ দিকটা বোধহয়...

—আমার থেকে মাত্র চার বছরের বড়। ভীষণ মারত আমাকে ছোটবেলায়। এখন কি অসহায় শিশুর মত অবস্থা!

করবীর স্বরে বিষণ্ণতা। সায়ন বৃষ্টি নিশ্চুপ। মিনিটখানেক পর বৃষ্টি বলল,—আমি চলি। আপনারা ব্যস্ত রয়েছেন।

—না, না, আমরাও ফিরব এখন। তুমিও তো বাড়ি ফিরছ, চলো আমাদের সঙ্গে।

সায়ন লক্ষ করল মার কথায় বৃষ্টি বেশ সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। দেখেই বোঝা যায় এক্ষুনি বাড়ি ফেরার তার একটুও ইচ্ছে নেই।

—এই বুবলু একটা ট্যাক্সি দ্যাখ্ না।

সায়ন বৃষ্টিকে আড়চোখে আরেক প্রস্থ দেখে নিল,—তোমরা দাঁড়াও। আমি এমারজেন্সির সামনে থেকে ধরে আনছি।

ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে সায়ন ঘাড় ঘুরিয়ে বৃষ্টিকে প্রশ্ন করল,

—তোমার অন্য কোথাও যাওয়ার ছিল নাকি?

—তেমন কিছু না। এক বন্ধুর বাড়ি যাব ভাবছিলাম।

—কোন্ দিকে? পথে পড়বে? তা হলে নামিয়ে দিতে পারি।

—না, সে অন্যদিকে। লেক গার্ডেন্সে।

—ও। সায়ন হাল্কা নিশ্বাস ছাড়ল।

—তোমার মামার সঙ্গে আলাপ হল সেদিন, বারান্দায় বসে ছিলেন, পিকলু কান্নানকে ডেকে কথা বলছিলেন, তখন।

নিমেষের আলোয় সায়নদীপ দেখল বৃষ্টির মুখে বাঁকা হাসি। যেন জানতে চাইছে ছেলেটা এবার কি এক পা এক পা করে এগোচ্ছে তার বাড়ির দিকে! হাল্কা গলায় জিজ্ঞাসা করে উঠল,

—তোমার প্র্যাকটিস কি বন্ধ এখন? দৌড়-টৌড় চলছে না?

সায়ন হেসে ফেলল, —কেন? তুমি বুঝি আর ভোরবেলা ওঠো না? আমি এখন এক দিন করে পার্কে দৌড়ই। শনিবার। তাও খেলা না থাকলে।

—ওই ব্যাগ নিয়েই?

—না। এমনিই। ওটা সিজনের প্রথম দিক ছিল। মিড সিজনে এখন হাল্কা কিছু ব্যায়াম, প্র্যাকটিস, দৌড়ঝাঁপ ব্যস।

করবী এতক্ষণ জানলার বাইরে চুপচাপ তাকিয়ে ছিল। অনেকক্ষণ পর কথা বলল,

—তোমার মা-ই তো বিখ্যাত শিল্পী জয়া রায়, না?

—হুঁ।

—সেদিন কি একটা কাগজে তোমার মা’র ইন্টারভিউ দেখছিলাম...কী গুণী তোমার মা।

বৃষ্টি ঝট করে জানলার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে নিল। সায়ন বুঝতে পারল এ আলোচনা ঠিক পছন্দ করছে না মেয়েটা। সোজা হয়ে বসল সায়ন। বৃষ্টির মায়ের মুখটা মনে পড়ল তার। সায়নের মার সঙ্গে কতই বা তফাত হবে বয়সের? নিশ্চয়ই চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হবেন। তবু এখনও মুখ কত মসৃণ। চকচকে। কমনীয়। সে তুলনায় তার মার মুখে অনেক বেশি ক্লান্তির ছাপ। চোখের নীচে ঘন কালি, কপালের দিকের চুল সবই প্রায় সাদা। রেয়ার ভিউ মিরারে মাকে দেখার চেষ্টা করছিল সায়ন। ঝাপসা। কি তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে গেল মা! মাত্র সাত বছরের মধ্যে! বুড়িয়ে গেল? না ফুরিয়ে গেল? ফুরিয়েই গেল।

ভয়ঙ্কর দুর্যোগের আঘাতে এভাবেই বোধহয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় কেউ কেউ। আবার অনেকে দুর্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়েই নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। বালির ঝড়ের ভয়ে আতঙ্কিত মরুভূমির ইঁদুরের মত তারা গর্ত খুঁড়ে মাটির তলায় ঢুকে নিরাপত্তা খোঁজে না। উটের মত কষ্টসহিষ্ণু হতে শেখে। পরিশ্রমীও।

বাবার মৃত্যুর পর সায়ন তিলে তিলে নিজেকে নিজের মত করে গড়ে তুলছে। গোটা দিনটাকেই নিয়মের ছন্দে বেঁধে রাখে সে।

খুব ভোরে বিছানা ছাড়া সায়নদীপের বহুদিনের অভ্যাস। ছোটবেলায় সকালে উঠে চিৎকার করে পড়া মুখস্থ করত। তার বাবা বলত,

—ভোরবেলা মস্তিষ্ক তাজা থাকে বুবলু। গ্রহণক্ষমতা অনেক বেশি বৃদ্ধি। পায়।

খেলাধুলোয় নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়ার সময়ও সে কথা ভোলেনি সায়ন। ক্রীড়ানুশীলনেরও শ্রেষ্ঠ সময় এই সকাল। ভোর হলেই ট্র্যাকস্যুট পরে, কাঁধে কিটসব্যাগ ঝুলিয়ে ট্রামে উঠে পড়ে সে। ক্লাবে প্র্যাকটিস না থাকলে সামনের পার্কটা তো রয়েছেই।

সকালের শুরুতে ফাঁকা ট্রামে চেপে ময়দানের দিকে এগোতে ভারী ভাল লাগে সায়নদীপের। মনে হয় একটা সরীসৃপ বহন করে নিয়ে চলেছে তাকে। তারই শরীরের ফাঁকফোকর দিয়ে, আধফোটা সকালকে দেখতে দেখতে, সে পৌঁছে যায় তার তীর্থক্ষেত্রে। বিশেষ করে সিজনের কয়েকটা মাস, অক্টোবর থেকে মার্চ, বিশেষ ব্যত্যয় হয় না।

গত বছর থেকে সায়ন খুব আশা জাগিয়েছে তার কোচের মনে। ছেলেটার মধ্যে প্রচণ্ড জেদ আছে। হার না মানার জেদ। পরিশ্রমে ক্লান্ত না হওয়ার জেদ। ভাল পেডিগ্রির রেসের ঘোড়ার মত ট্রেনারের সব হুকুম নিঃশব্দে তামিল করে যায় ছেলেটা।

সায়ন তার কোচ ঝন্টুদার কথামত টেন্টে এসেই প্রথমে জগ করে। তারপর কিছুটা স্প্রিন্ট টানে। তারপর ধীরে ধীরে দৌড়য়। আবার স্প্রিন্ট টানে। তারপর কুকুরের মত জিভ বার করে কিছুক্ষণ হাঁপায়। আবার দৌড়য়। আবার দৌড়য়। আবার। রজার ব্যানিস্টারের কথা ভীষণভাবে মেনে চলে সে। নিজেই নিজেকে বলে,

শরীরের ক্ষমতাটাকে স্ট্রেচ করো। শরীর সব সইতে পারে যদি মনের সাহায্য পায়।

এই রকম খাটুনির পর প্যাড গ্লাভস চড়িয়ে এসে নেটের উইকেটের সামনে দাঁড়ায় সায়ন। দলজিৎ ছুটে আসে বল করতে। কখনও অন্তু, রবীন। সায়ন প্রত্যেকটি বল খুব মন দিয়ে খেলে। যেন নেট আউট হওয়ার ওপরেই তার জীবন মরণ নির্ভর করছে। এই গুণের জন্য সায়নকে নেটে বল করে আরাম পায় ক্লাবের সকলে।

দলজিৎ বলে,

—তুমি সব সময় এত সিরিয়াস থাকতে পারো কি করে বলো তো? প্রত্যেকটা বল ম্যাচের মত করে খেলো?

সায়নের উত্তর বড় অদ্ভুত লাগে তাদের, —আমার কাছে প্র্যাকটিসটাই আসল ম্যাচ। এই সময় যদি পুরো কনসেনট্রেশন আনতে পারি, তা হলে ম্যাচে প্র্যাকটিসের মতই হালকা লাগবে। মনযোগের জন্য ছটফট করতে হবে না।

নেটে বল ছাড়া সত্যিই আর সায়ন কিছু দেখে না। কানের কাছে ক্রমাগত শুধু ভেসে আসা কথাগুলোই শুনতে পায়। হাত পায়ের নড়াচড়া শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করে সেইমত।

...বাঁ পা-টা এগোও। একটু আড়াআড়ি। হ্যাঁ, এইভাবে। ...কোন সময়...উহু, ব্যাটটা আরও পরে আসবে। একটু পরে। না। আরও আস্তে। লেটে খেললে জোর পাবি বেশি। টাইমিংটাই আসল।

সায়ন জানে এখন তার নিজেকে গড়ার সময়। এখন শুধু শুনতে হয়। মা’র কথা, কোচের কথা, বন্ধুদের কথা, গুরুজনদের কথা। শেষ পর্যন্ত কোন কথাদের সে অন্তরে রাখবে সেটা সে ঠিক করবে। কিন্তু মন দিয়ে শোনাটা বড় জরুরি।

প্র্যাকটিস শেষ হলে পেটের মধ্যে ক্ষিদেটা চনচন করে ওঠে। সায়ন তখন তাদের লনের সামনে এসে প্যাড খুলতে খুলতে চেঁচায়,

—শম্ভুদা…

ক্যান্টিনের মালিক শম্ভু হাঁক শুনলেই কাঁচা পাঁউরুটিতে মাখন মাখাতে আরম্ভ করে। ক্যান্টিনের ছেলেটা এসে স্ট্যু পাঁউরুটি রেখে যায় সামনে। মোহন দলজিৎ রবীন মাঝে মাঝেই চোখ টেপে তাদের ক্লাবের ক্রিকেট সেক্রেটারি গোপালদাকে। গোপালও তাদের তালে তাল মিলিয়ে ঠাট্টা করে ওঠেন,—কি চাষাড়ে হ্যাবিট রে তোর! স্টুতে কাঁচা রুটি ডুবিয়ে ডুবিয়ে খাস! তুই তো নাম করে গেলে মুড়ি দিয়ে শ্যাম্পেন খাবি রে!

সায়ন হাসে। সবাই কি আর একরকম হয়! যে কোনো একটা ঘাসের মাঠের ওপর দিয়ে গেলেই তার যে মনে হয় কোনো ক্রিকেট পিচের ওপর দিয়ে হাঁটছে, এ অনুভূতি কি অন্যের হয়! ভোরবেলা মা যখন ডেকে দেয় তাকে, তখন ঘুমচোখে বাথরুমের আয়নায় নিজের মুখ দেখতে গিয়ে মনে হয়, সে নয়, অন্য একটা লোক আয়নায় দাঁড়িয়ে আছে, তার সাদা সোয়েটারে নীল ভি বর্ডার, মাথার ক্যাপে ন্যাশনাল এমব্লেম, এই প্লেয়ারটাকে আর কেউ দেখতে পায় কি? পরিশ্রমের পর খেয়ে-দেয়ে সায়নের শরীরটা বেশ তাজা লাগে। এরপর একে একে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় ক্লাবের সবাই। কেউ কেউ উৰ্দ্ধশ্বাসে দৌড়োয়। বাড়ি গিয়ে তাদের অফিস ছুটতে হবে কিংবা কলেজ। বি. কম পাশ করার পর সায়ন আর পড়াশুনো করেনি। তার পড়াশুনোর জগৎ ভিন্ন।

খেলা না থাকলে প্র্যাকটিস থেকে ফিরে একা একাই সায়ন স্নান-খাওয়া সেরে নেয়। করবী অফিস বেরিয়ে যায় সাড়ে নটার মধ্যেই। স্বামীর মৃত্যুর পর সহানুভূতি দেখিয়ে, দয়া দেখিয়ে তাকে একটা ছোট চাকরি দিয়েছিল সরকার। কাজ থেকে ফিরতে তার সেই সন্ধে। সারা দুপুর সায়ন একা বাড়িতে বসে নিজের পড়াশুনো করে। তার বেশির ভাগ বই-ই খেলাধুলা সংক্রান্ত। প্রায় দুপুরেই ক্যাসেট চালিয়ে একই খেলা বার বার দেখে সে। গাভাস্করের কোনো বিশেষ ইনিংস, রিচার্ডস-এর কোনো চোখ ঝলসানো সেঞ্চুরি বা গ্রেগ চ্যাপেলের রাজসিক ব্যাটিং। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই খেলা। একই দৃশ্য। বারবার। স্লো-মোশনে। রিপ্লে করে। স্টিল করে। তাকে আরও নিখুঁত হতে হবে। এটাই তার এখনকার পড়াশুনো।

সারা দুপুর পড়াশুনো করে মস্তিষ্কে একটা ঝিমধরা ভাব আসে। মাথা ছাড়াতে সায়ন ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়, পার্কে গিয়ে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে গল্প করে। এ সময়টাই তার একমাত্র অবসর। বন্ধুরা নানান তর্কে গলা ফাটায়। এখন ইরাক আমেরিকার যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে সকলেই উত্তেজিত। যুদ্ধ বা মৃত্যুর আলোচনা সায়নকে একটুও টানে না। সে নীরবে দেখে দূরের রাস্তাঘাট, মানুষজন। চৌরাস্তার মোড়ে জীর্ণ সালোয়ার কামিজ পরা এক বুড়ি পাগলি সারাদিন ধরে ট্রাফিক কনট্রোল করার চেষ্টা করে, কেউ তাকে মানে না, তবু সে নিজের মনে কাজ করে যায়, যেন কলকাতার সমস্ত অবাধ্য যানবাহনকে বশে রাখার জন্যই তার জন্ম হয়েছিল। সায়ন একদৃষ্টে পাগলিটাকে দেখে।

এসব সময়, কখনও কখনও, বৃষ্টিকেও চোখে পড়ে সায়নের। কখনও কখনই। তখন বৃষ্টির হাঁটাচলা অন্যরকম। অশান্ত। যেন চাপা উত্তেজনায় টান টান। আবার এই মেয়েকেই বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা হলের সামনে দেখেছিল ভেলপুরি খেতে খেতে হি-হি করে প্রাণ খুলে হাসতে। হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছে রাস্তায়। তখন মনে হয়েছিল এই মেয়ের নাম বৃষ্টি মানায় না, ওর নাম হওয়া উচিত রোদ্দুর। শীতের রোদ্দুর।

সায়ন পিছন ফিরে বৃষ্টিকে দেখল। নিরীহ মেয়ের মত জড়োসড়ো বসে আছে। পাশে তার মা-ও নীরব। দু’জনের মুখ দু জানলায়।

বৃষ্টির শান্ত ভঙ্গি রহস্যময় লাগল সায়নের। বাসস্টপে রোদচশমার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টি, সিনেমা হলের সামনে উচ্ছল হাসিতে ভেঙে পড়া বৃষ্টি, ট্যাক্সির পিছনের সিটে আড়ষ্ট বসে থাকা বৃষ্টি, কোনটা ওই মেয়ের আসল রূপ? নাকি অন্য কোন বৃষ্টি লুকিয়ে আছে এইসব ছদ্মবেশের আড়ালে?

সায়নদের বাড়ির সামনে ট্যাক্সি থামতেই বৃষ্টি আগে দরজা খুলে নেমে গেল,

—থ্যাংক ইউ মাসিমা। অন্য দিন ফেরার সময় যেরকম ভিড়ের মধ্যে উঠতে হয়।

—যা বলেছ। ফেরার পর শরীরে আর কিছুই থাকে না। এসো না আমাদের বাড়িতে। একটু চা-টা খেয়ে যাবে।

বৃষ্টি ইতস্তত করল,—না, আজ নয়, অন্য এক দিন। আপনি বাড়ি গিয়ে রেস্ট নিন। আপনাকে খুব টায়ার্ড লাগছে।

করবী জোর করল না। সায়ন মনে মনে ধন্যবাদ দিল বৃষ্টিকে। মা সন্ধের সময় একা থাকতেই ভালবাসে আজকাল।

সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে উঠছে করবী। সায়নও। চারতলার ফ্ল্যাটে উঠতে করবী বড় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সায়ন ওঠে জগিং করতে করতে।

ঘরে ঢুকেই সামনের সোফায় বসে করবী কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিল। সায়ন বলল,—দেখেছ তো, কেন বলেছিলাম চারতলার ফ্ল্যাট নেওয়াটা উচিত হয়নি? এর পর আরও বয়স বাড়বে, ধকলও বাড়বে।

করবী হাতের ইশারায় বলল, এক গ্লাস জল।

জল খাওয়ার পর ধাতস্থ হল একটু,

—সব কিছুই কি নিজের ইচ্ছেয় হয় রে? তোর দাদুর তো শুধু এই জমিটাই পড়ে ছিল। দাদা, সুনু, রেবা সবাই মিলে যা ঠিক করবে তাই তো হবে? জমির দাম বেশি দিয়েছে বলে প্রোমোটারও তো একটু ওপরের দিকেই ফ্ল্যাট দেবে। তাও বাবা একতলার থেকে ভাল। নীচে যা নোংরা! ধুলো!

সায়ন চুপ করে গেল। মা-ই শুধু ফ্ল্যাট নিয়েছে। মাসিরা, মামারা জমি বিক্রির ক্যাশ। তাদের আছে অনেক। এই ধরনের ফ্ল্যাটে তাদের পোষাবেও না।

করবী হঠাৎ প্রশ্ন করল,—মেয়েটা খুব ঠাণ্ডা, তাই না?

মার কথাটা প্রথমে ঠিক বুঝতে পারল না সায়ন,—কোন মেয়েটা?

—ওই যে এল আমাদের সঙ্গে। বৃষ্টি।

—কখনও ঠাণ্ডা, কখনও গরম, এই বয়সে যা হয় আর কি।

করবী হেসে ফেলল,—তুই এই বয়স, এই বয়স বলছিস কেন? তুই কি বুড়ো নাকি?

সায়ন মাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল,—তুমিই বা এমন বুড়ি বুড়ি হয়ে থাকো কেন? শরীরে না পোষালে ক’দিন ছুটিও তো নিতে পারো। খাও, দাও, রেস্ট নাও...

সায়ন ভালভাবেই জানে মা শয্যাশায়ী না হওয়া পর্যন্ত ছুটি নেবে না।

করবী জামাকাপড় বদলাতে নিজের ঘরে উঠে গেল। দু ঘরের মাঝারি ফ্ল্যাট। সঙ্গে কিছুটা ড্রয়িংরুমের জায়গা। ডাইনিং স্পেসটা বেশ ছোট। একটা ফ্রিজ, চারটে চেয়ার আর ছোট ডিম্বাকৃতি খাবার টেবিলেই পুরো জায়গাটা ভরে গেছে।

করবী ঘর থেকে জিজ্ঞাসা করল,—চা খাবি নাকি? করব?

সায়ন ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সেখান থেকেই বলল,—তুমি চুপচাপ শুয়ে থাকো। আমি করছি।

সায়ন যখন চা নিয়ে ঘরে ঢুকল, করবী শুয়েই ছিল। চোখ বন্ধ করে। মুখ একহাতে আড়াআড়ি ঢেকে। কাপ রাখতে গিয়ে সায়ন দেখল মার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে।

—কি হল? আবার কান্নাকাটি কেন? ওঠো। উঠে বোসো। টুলুমামা ঠিক সামলে উঠবে।

করবী উঠে বসে চোখ মুছল,—উঠলেই ভাল।

—উঠবেই। টুলুমামার ভীষণ মনের জোর। একবার যদি সেই জোর দিয়ে চায় আমি সুস্থ হয়ে উঠব, তা হলে ঠিক উঠে দাঁড়াবে।

—সে কি আর সব জায়গায় হয়? শরীরের ওপর কি আর মানুষের হাত থাকে?

—নিশ্চয়ই থাকে। কত অ্যাথলিট তো মনের জোরে ক্যানসার উড়িয়ে দিচ্ছে। আর তুমিই তো বলতে টুলুদা চাইলে পারে না এমন কোনো কাজ নেই।

—তা ঠিক। তোর বাবাকে বিয়ে করার সময় তোর দাদু কম আপত্তি করেছিল? টুলুদাই তো বলে বুঝিয়ে...তখন টুলুদা না পাশে থাকলে...

এ গল্প মায়ের কাছে বহুবার শুনেছে সায়ন। শুনতে ভালও লাগে। কিন্তু এই মুহূর্তে অন্য ভয় পাচ্ছিল সে। টুলুমামার কথা বলতে বলতে মা বাবার প্রসঙ্গে যাবেই।

সায়ন কথা ঘোরাল,—ক্লাবে দু-চারটে চাকরির খবর আসছে, বন্ধুরা অনেকেই বলছে নিয়ে নিতে, কি করি বলো তো?

—তুই কি চাস?

—আমি খেলতে চাই। তবে চাকরিও তো দরকার।

—চাকরি করলে খেলার ক্ষতি হবে?

—তা তো একটু হবেই। সেজন্যই তো নিতে চাইছি না।

—দ্যাখ তুই যা ভাল বুঝিস...

সায়ন জানে মা কোনো ব্যাপারেই তার ওপর জোর করবে না। বাবা মারা যাওয়ার পর মা আমূল বদলে গেছে। মাঝে মাঝে সায়নের বিশ্বাসই হয় না। এই কি তার ছোটবেলায় দেখা দোর্দণ্ডপ্রতাপ মা! যার ভয়ে বাবা গুটিয়ে থাকত সব সময়! মার জন্য হঠাৎই বড় কষ্ট হল সায়নের। বুকের ভেতর একটা শুঁয়োপোকা নড়াচড়া করছে। নড়ছে। নড়ছে। নড়েই চলেছে।

গভীর অরণ্যে এক সন্ন্যাসী দস্যু রত্নাকরকে বলেছিলেন, ডাকাতি তো করছ; তোমার পাপের ভাগী কে হবে? বউ? ছেলে? মেয়ে? বাবা? মা? কেউ না। রত্নাকর যাচাই করতে গিয়ে দেখেছিল সেটাই সত্যি।

মিথ্যে কথা। পাপের ভাগ সবাইকেই নিতে হয় বৈকি। মা, বাবা, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে। একথা সায়নের থেকে বেশি আর কে জানে। চোখের সামনে, নিজেরই মায়ের অন্তরে যে তীব্র অনুশোচনার দহন দেখছে এই সাত বছর ধরে সেটা কি পাপের অংশীদারী নয়? পাপ কি কারুর একার?

খালি কাপ ডিশ তুলে নিয়ে সায়ন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল। পিছন থেকে করবীর স্বর,

—বুবলু, তুই আমায় নিয়ে চিন্তা করিস না। তুই চাকরি করতে চাইলে চাকরি কর, খেলতে চাস খ্যাল...আমি কোনো মত চাপাব না।

করবী যেন সায়নকে নয়, নিজেকেই শোনাতে চাইছে কথাগুলো।

কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না সায়ন।

মুহূর্ত পরে করবী হঠাৎই বলে উঠেছে,—তোর বাবার মুখটা তোর মনে পড়ে বুবলু?

সঙ্গে সঙ্গে সায়নের চোখের সামনে ঘরটা দুলে উঠল। সাদা চাদরে ঢাকা... একই মৃতদেহ। চাদর সরতেই একটা বীভৎস, নুন ছাল উঠে যাওয়া ক্ষতবিক্ষত মুখ।

সায়ন চোখ বুজে ফেলল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%