চতুর্থ অধ্যায়

সুচিত্রা ভট্টাচার্য

.....দাস্ দা ফ্রেঞ্চ রেভল্যুশন হ্যাড ডিফারেন্ট স্টেজেস্। ফার্স্টলি ইট ওয়াজ অ্যান অ্যারিস্টোক্র্যাটিক মুভমেন্ট লেড বাই দা...

একটানা ভরাট গলায় লেকচার দিয়ে চলেছেন পি কে সি। লেকচারটা বৃষ্টিকে এক অন্য জগতে নিয়ে চলে যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপ, সেখানকার দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, কামনাবাসনা ভরা সে এক অন্ধকার সময়। একটা যুগ চলে যাচ্ছে, আরেকটা যুগ আসছে। মাঝের সময়টা বড় নিষ্ঠুর। যুগ পরিবর্তনের ধারাই এরকম।

শুনতে শুনতে বৃষ্টির ডিকেন্সের উপন্যাসটার কথা মনে পড়ে যায়। ...দোজ ওয়্যার দা বেস্ট অফ টাইমস, দোজ ওয়্যার দা ওয়ার্স্ট অফ টাইমস... মানুষের হিংস্রতা, ক্রূরতা, অব্যক্ত ভালবাসা, মহত্ত্ব....

দেবাদিত্য কিছুতেই বৃষ্টিকে শান্তিতে তার এই প্রিয় ক্লাসটা শুনতে দেয় না। পিছন থেকে অবিরাম ফিসফিস করে চলেছে। কি না বলছে বৃষ্টিকে! মিনার্ভা, এথেনা, ঊর্বশী। বৃষ্টি বারকয়েক কটমট করে পিছন ঘুরে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ নামিয়ে নিচ্ছে। মাথা নিচু করে নোট নেওয়ার ভান করছে। পেন বন্ধ করেই।

বৃষ্টি আবার সামনে তাকাল। পি কে সি ছড়ানো লেকচার গোটাতে শুরু করেছেন। পিরিয়ড শেষ হয়ে এল।

....বুর্জোয়াজি এবং পুরোহিত সম্প্রদায় তৎকালীন ফ্রান্সের কৃষকদের নিকট বিশেষভাবে ঋণী ছিলেন...

পি কে সির কথা বলার ভঙ্গির সঙ্গে কার যেন খুব মিল! ভালমামার! এক একদিন মনমেজাজ ভাল থাকলে ভালমামা এভাবেই সুন্দর করে ইতিহাসের কথা শোনায় বৃষ্টিকে। সে সব দিন যদিও এখন বিরল। ভালমামার জীবনে দুর্ঘটনাটা না ঘটলে ভালমামাও পি কে সি হতে পারত। ডিগ্রি ছাড়াই হিস্ট্রি, ফিলজফি, পলিটিক্সের ওপর যা দখল। সারাদিনই মোটা মোটা বই ঘাঁটাঘাটি করছে। বৃষ্টির বুকটা টনটন করে উঠল। কি মরতে যে ভালমামা কলেজ স্ট্রীটে এসেছিল কোন এক উগ্রপন্থী নেতার বক্তৃতা শুনতে! তখন নাকি বেশিরভাগ কমবয়সী ছেলেমেয়েদেরই রক্ত বিপ্লবের নামে চনমন করে উঠত। বিপ্লব তো হয়েছে ছাই। মাঝখান থেকে ভালমামার জীবনটাই বরবাদ হয়ে গেল। কেউ কেউ বোধহয় এভাবেই ছিটকে যায় স্বাভাবিক জীবন থেকে।

ঘণ্টা পড়েছে। পি কে সি ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতেই দেবাদিত্যর দিকে ঘুরে দাঁড়াল বৃষ্টি,

—তুই কি রে? একটা দিনও পি কে সির লেকচার মন দিয়ে শুনতে দিবি না?

দেবাদিত্যর মুখে নকল গাম্ভীর্য—তুই পি কে সির ক্লাস শুনিস?

—তো কি করি?

—খালি তো ওই মুখটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকিস? কেন রে? আমরা নেই? আমাদের দিকে তাকাতে পারিস না?

দেবাদিত্যটা এরকমই বিশ্ব ফাজিল। সারাক্ষণ হ্যা হ্যা করে বেড়াচ্ছে। কলেজের যে কোন জায়গায়, পাঁচ সাতটা মেয়ের জটলায় একটা ছেলে দেখলে দূর থেকেও বলে দেওয়া যাবে ওটাই দেবাদিত্য। সব সময় সখী পরিবৃত। বৃষ্টি ভাবতেই পারে না যে ছেলের বাবা মারা গেছে আট বছর বয়সে, মা চোদ্দ বছরে, মানুষ হচ্ছে কাকার কাছে, সে কাকাও নাকি এমন কিছু রাজার হালে রাখে না ভাইপোকে, সেই ছেলের এত লাইফ ফোর্স আসে কোত্থেকে?

তৃষিতা একদিন বলছিল,—দেবাদিত্যর ব্যাপারই আলাদা। ওর পাঁচটা ফুসফুস আছে। একেকটা ফুসফুস একেকটা মেয়ের জন্য রিজার্ভড। একসঙ্গে ও পাঁচটা মেয়ের জন্য প্রাণ দিয়ে দিতে পারে। ফুসফুসগুলোর নেচারও আলাদা আলাদা। শান্ত নরম মেয়ের জন্য শান্ত নরম ফুসফুস, এই ধর বালিহাস টালিহাঁস টাইপের, উদ্দাম বন্য মেয়ের জন্য একটা নেপোলিয়ানিক ফুসফুস, ফাজলামির জন্য মোল্লা নাসিরুদ্দিনের...

পরভিন প্রশ্ন করেছিল,—আর ওই যে ইনা বলে মেয়েটার সঙ্গে ঘোরে, যাদবপুরে জিওলজি না কি পড়ে, মেয়েটার তো হেভি ফান্ডা...ওর জন্য? মীনাক্ষী বলে উঠেছিল,—ওর জন্য একটা বিক্রমাদিত্যের ফুসফুস আছে। সেই ফুসফুসের কিছুটা সেডিমেন্টারি রক, কিছুটা গ্রানাইট। নইলে জিওলজির সঙ্গে খাপ খাবে কি করে?

রণজয় বলেছিল,—আসলে চার পাঁচটা ফুসফুসের কমে ও বাঁচবেও না। যা বীভৎস জায়গায় থাকে! একদিন ওর বাড়ি গিয়েছিলাম...প্রথমে তো কিছুতেই নিয়ে যাবে না, ট্যাণ্ডাই ম্যাণ্ডাই করছে...তারপর সে কি গলি! গলির পর গলি, তস্য গলি, জীবনে কোনদিন সেসব জায়গায় রোদ্দুর ঢোকে না, স্কটিশচার্চ স্কুলের পেছনে, বিশ্রী চাপা দুর্গন্ধ, ভ্যাটে নোংরা পচে আছে, জাস্ট মনে মনে হেল ভিশুয়ালাইজ কর, তা হলেই বুঝে যাবি। ওখানে থাকতে গেলে দুটোর বেশি ফুসফুস লাগবেই, নইলে টিবি হয়ে মরতে হবে। তার ওপর ওর কাকিটার যা পচা মেজাজ...

বৃষ্টি চুপ করে শুনছিল। ওরকম অন্ধকার স্যাঁতসেতে গলির বাড়িগুলো কেমন হয় সে জানে। তার ঠাকুর্দা ঠাকুমাই তো থাকে ওরকম বাড়িতে। খুব ছোটতে মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে গিয়েছে সে। দাদু, ঠাকুমা, জেঠু, জেঠি বাদে আর সবাই কেমন মিন টাইপের। মানে বাবার জ্যাঠা কাকার দল। হঠাৎ হঠাৎ অন্ধকার ঘুপচি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কি জেরাই না করত।

—তুই সুবুর মেয়ে?

বৃষ্টি ভয়ে ভয়ে বলত,—হুঁ।

—তুই তো সুবুর কাছে থাকিস না, তাই না?

বৃষ্টি রা কাড়ত না।

—তোর মা চাকরি বাকরি করছে?

বৃষ্টি গম্ভীর হয়ে যেত,—মা এখন বিজনেস করে। নিখিলমামার সঙ্গে।

শুনে টাকমাথা লুঙ্গিপরা বাবার জাড়তুতো দাদাটার কি খ্যা খ্যা হাসি। ঘরে ঢুকে জোরে জোরে বউকে বলত,— অনু, সুবুর মেয়ের কথা শুনেছ? ওর মা নাকি এখন বিজনেসে নেমেছে।

বৃষ্টি তখন হাসিটার অর্থ বুঝতে পারেনি। বাবাকে বলেছিল, মা বিজনেস করে শুনে ওরা অত হাসাহাসি করছে কেন?

বাবা বলেছিল,—ওদিকে যেতে হবে না। ঠাকুমার কাছে যা।

ওরকম দম চাপা শ্যাওলাধরা বাড়িতে থাকলে মনটাও বোধ হয় ছোট হয়ে যায়। দেবাদিত্যর কাকি নাকি রণজয়কে শুনিয়েই বলে উঠেছিল,

—বন্ধুবান্ধবের চা বিস্কুটের পয়সা কি তোমার বাবা ধরে দিয়ে গেছে?

দেবাদিত্য হাতের মুদ্রায় বোঝাতে চেয়েছিল, কাকি পাগল।

বেচারা। বৃষ্টির দেবাদিত্যর ওপর মায়া হয়েছিল খুব। ওরকম একটা সংসারে আরশোলা টিকটিকির মত থাকতে হয়, বাবা মা কেউ নেই। থাকলেও কি খুব ভাল হত? কে জানে?

হাতের ব্যাগ দিয়ে দেবাদিত্যর পিঠে ঠোক্কর দিল বৃষ্টি, —তোর দিকে তাকাতে যাব কেন রে? নিজের মুখ কখনও আয়নায় দেখেছিস?

সঙ্গে সঙ্গে ফাজিল ছেলেটা একেবারে কাছে এসে বৃষ্টির চোখে চোখ রেখেছে,—দেখেছি। তোদের চোখের আয়নায়। চপ খাওয়াবি?

বৃষ্টি হেসে ফেলল। এমন মজার কথা বলে দেবাদিত্য! তার কলেজের বন্ধুগুলো স্কুলের বন্ধুদের থেকে এত আলাদা। নিষেধের কাঁটাতার তুলতে চাইলেও হেঁচকা টানে সেটাকে উপড়ে দেবে এই সব বন্ধুরা। টাটকা বাতাসের ধাক্কায় বৃষ্টির মনে একটু আগেও জমে থাকা মেঘটা উধাও।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে রনিদের বাড়ির সামনে আসতেই মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল বৃষ্টির। কী তুমুল চিৎকার, তর্জনগর্জন! রনির মা বাবা অশ্রাব্য ভাষায় খিস্তিখেউড় করছিলেন পরস্পরকে। এমন চেঁচামেচি যে বাইরেও লোক দাঁড়িয়ে গেছে দু একটা।

এমনিতে বৃষ্টিদের পাড়ায় অন্যের বাড়িতে সচরাচর উঁকি দেয় না কেউ। আধুনিক সভ্যতার নিয়ম মেনে প্রতিটি বাড়ি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে উদাসীন স্ত্রীটলাইটের মত। কখনও কখনও একটা বাতি নিভু নিভু হলে অন্যের আলো এসে পড়ে তার ওপর। সৌজন্যের। তার বেশি কিছু করা এসব পাড়ায় প্রাচীন গ্রাম্যতা বলে মনে করা হয়। কৌতূহল এখানে ভীষণ চাপা। চাকরবাহী। তবে কলহের মাত্রা বস্তির পর্যায়ে নামলে একটু চাঞ্চল্য তো জাগবেই।

মোড়ের মাথায় পিকলু টুকুনকে দেখে বৃষ্টি জিজ্ঞাসা করেছিল, —কি ব্যাপার রে? সাতসকালে ষাঁড়ের মত চেল্লাচ্ছে কেন দুজনে?

পিকলু বলে উঠেছিল, —রনির বাবা মাসের দু সপ্তা যেতেই সব টাকা ঘোড়ার পেছনে ঢেলে আসে; কোন বউ সহ্য করবে?

টুকুন বলল, —বাজে বকিস না। রনির মার বাতিক আছে। রনির বাপটাকে সবসময় এমন সন্দেহ করে...ভাষা শুনেছিস? দিনের পর দিন রনিটা কি করে যে বরদাস্ত করে!

কি ব্যাপার কে জানে কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের কি শুধু এই পরিণতি? রনির মা কী ভালই না বাসতেন বৃষ্টিকে ছোটবেলায়। একবার সরস্বতী পুজোর দিন রাস্তার মাঝখানে বৃষ্টির শাড়িটাড়ি খুলে বিদিকিচ্ছিরি অবস্থা। মাসিমা কী যত্ন করে কুঁচি দিয়ে পরিয়ে দিয়েছিলেন। রনির সঙ্গে খেলতে গিয়ে ঝগড়া হলে সব দোষ রনির। বৃষ্টি খুব লক্ষী মেয়ে। রনির জন্মদিনে কী সুন্দর হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শোনাতেন। সেই মাসিমা ওরকম নোংরা ভাষায়....!

দেবাদিত্য আবার খোঁচাচ্ছে বৃষ্টিকে,

—এই বৃষ্টি, খাওয়া না মাইরি। অতগুলো স্কলারশিপের টাকা ড্র করলি…

—অ্যাই না। তৃষিতা পিছন থেকে গলা ওঠাল—বৃষ্টি কদিন ধরে যা ড্রেস মারছে, ক্যান্টিনে ওর নো অ্যাডমিশান হয়ে গেছে। গেলেই হাইজ্যাকড। আর তোরাও সব এমন কিছু মেডিভাল নাইট নো’স যে ওকে উদ্ধার করে আনতে পারবি।

কালো লঙস্কার্টের ওপর মিশকালো টপে বৃষ্টি আজ ভিক্টোরিয়ার পরী। কালো রঙই তার সব থেকে প্রিয়।

নাইটদের নাম শুনে শুভ ফিচেল হাসি হাসল,—নাইটরা কি শুধু মেয়েদের উদ্ধারই করত রে? চেস্টিটি বেল্টের গল্প জানিস না? সেই ক্রুসেড লড়তে যাওয়ার সময় নাইটরা বউদের চেস্টিটি বেল্ট পরিয়ে তালাচাবি লাগিয়ে দিয়ে যেত। অন্য নাইটদের ভয়ে। তার মানে বুঝলি তো? নাইটমাত্রই সাধুসন্ত নয়। আমরা যদি সেরকম নাইট হই সেটা কি ভাল হবে? তা বস্, রোজ রোজ তোমার এরকম খুনখারাবি ড্রেসই বা কেন? এনিথিং ঢুকুটুকু?

দেবাদিত্য বৃষ্টির হাত ধরে টানল,—ঢুকুটুকু কেন? ওপেন। আমার সঙ্গে। চল্ তো বৃষ্টি আমরা নিমতলায় যাই।

কলেজ ক্যান্টিনে ঢুকতে গেলেই প্রথম যে অনুভূতির সম্মুখীন হতে হয় সেটা হল অন্ধকার। তারপর মোহনদার উনুন আর অজস্র সিগারেটের ধোঁয়া মিলেমিশে একটা পোড়া পোড়া গন্ধ। একসময়ের সাদা দেওয়াল বিবর্ণ বাদামী। এটাই দেবাদিত্যর নিমতলা।

প্রথম প্রথম এখানে ঢুকতে বৃষ্টির নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত। চোখমুখ জ্বালা করত। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।

সুদেষ্ণা নাকে রুমাল চাপা দিয়ে ঢুকেছে যথারীতি,

—শুভ, একটা সিগারেট দে তো।

শুভ প্যাকেট খুলে সিগারেট গুনল। বেজার মুখে বলল, —তুই তো তিনটে টান মেরে ফেলে দিবি, কি লাভ হয় এরকম সিগারেট খেয়ে?

সুদেষ্ণা শুভর প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট প্রায় ছিনিয়ে তুলে নিল,

—ধোঁয়ার গন্ধটা কম লাগে।

বৃষ্টি মুখ বেঁকাল। হুঁ, ধোঁয়ার ভ্যাক্সিনেশান! কত ঢংই না জানে সুদেষ্ণা।

সুদেষ্ণাকে বন্ধুবান্ধবরা প্রায় কেউই পছন্দ করে না। সে কলেজে এসে প্রথমদিনই জানিয়েছে তার বাবা বিখ্যাত হার্ট স্পেশালিস্ট ডক্টর অসিত দাস। তার মা তিনটে নামকরা সোশাল ওয়েলফেয়ার অরগানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট কিংবা ভাইস প্রেসিডেন্ট। সে পরপর দুদিন এক রঙের গাড়ি চড়তে পারে না। দরকারে অদরকারে লোকজনকে দেদার টাকা বিলোয় সে। কলেজের দারোয়ানের মেয়ের বিয়েতেও অবলীলায় তিনটে একশ টাকার নোট বার করে দিয়েছিল। সে অর্থ দিয়ে কুর্নিশ কিনতে ভালবাসে। তার দুটো সেকেন্ড জেনারেশান অ্যালসেশিয়ান, একটা খাঁটি বিদেশী স্প্যানিয়েল আর একজন টল ডার্ক হ্যান্ডসাম বয়ফ্রেণ্ড আছে।

ক্যান্টিনের দরজায় দরজায়, সিঁড়িতে দল বেঁধে বসে ছেলেমেয়েরা। গোছায় গোছায়। আলাদা আলাদা। বাংলার শিক্ষাসংস্কৃতির পীঠস্থান ঐতিহ্যবাহী এই কলেজে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সকলেরই নিজস্ব পরিমণ্ডল আছে। চট করে কেউ তার বাইরে যায় না। আবার সব নিয়মেরই তো কিছু ব্যতিক্রম থাকে। দেবাদিত্য সেই ব্যতিক্রম। সুদেষ্ণাও।

শুভ হাঁক মারল, এই বাচ্চা, কি আছে রে?

এতটুকুন একটা ছেলে এসে দাঁড়িয়েছে, টেবিলের পাশে। হাইট টেবিলের মাথায় মাথায়। খালি গা, কালো রঙ, দেবশিশুর মত মুখ। কি করে যে মোহনদা ঠিক একটা করে বাচ্চা জোগাড় করে ফেলে। এই চার মাসে কম করেও গোটা পাঁচেক বাচ্চা বদল হতে দেখল বৃষ্টি। শিশুশ্রমিক নাকি এদেশে বেআইনি।

বাচ্চাটা গড়গড় করে ধারাপাত মুখস্থ বলে চলেছে,—চা, চপ, ডিমের ডিবিল, মাপলেট...

একদম উল্টোদিকে, কোণে, ফিলজফির অর্চিতা এক গণ্ডা বাউল নিয়ে বসে। নিজেই মাঝে মাঝে তাদের গুপীযন্ত্র নিয়ে পিড়িং পিড়িং বাজাচ্ছে। একটা বাউল তো বেশ বুড়ো। লোকটার সামনের প্লেটে চারখানা চপ। কী বিদঘুটে শখ যে অর্চিতার! বাউল ধরে গান শোনার!

বৃষ্টি চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, —কিরে, এবার কোন ডিস্ট্রিক্ট?

—বাঁকুড়া। ওন্দার কাছে হেতমপুর গ্রাম থেকে। শুনবি? এর গান শুনবি?

বৃষ্টি মুখে বলল,—পরে। মনে মনে বলল, রক্ষে করো।

কে যে কিসে আনন্দ পায়!

রণজয় ব্যস্তসমস্তভাবে ক্যান্টিনে ঢুকে বৃষ্টিদের টেবিলে এসে বসে পড়ল, —অ্যাই, ডেট ফেট ফাইনাল। স্যারের সঙ্গে কথা হয়ে গেল। তিনটে জায়গার অপ্‌শন আছে। রাজগীর, নেতারহাট, শিমলিপাল। চুজ করো কোথায় যাবে।

—রাজগীর ঠিক হয়েছিল না?

—দুটো অপ্‌শন বেড়েছে। চারদিনের ট্যুর। বাজেট পার হেড চারশ টাকা।

শুভ হৈ হৈ করে উঠল,—শিমলিপাল, শিমলিপাল।

রণজয়ের কথাটা কানে বাজল বৃষ্টির। রাজগীর, নেতারহাট, শিমলিপাল। নেতারহাট নামটা বড় চেনা চেনা! নেতারহাট না মাদারিহাট কোথায় শেষবারের মত বেড়াতে গিয়েছিল বাবা মার সঙ্গে? দূর, মাদারিহাট তো নর্থ বেঙ্গলে। নেতারহাটেই গিয়েছিল। বাবার কাছে শুনেছে আরও ছোটতে নাকি ওয়ালটেয়ার গিয়েছিল তারা। আরেকবার সিমলা। সেই জায়গাগুলোর কথা কিছুই মনে নেই। বরং আবছাভাবে মনে আছে নেতারহাটের কিছু কথা। নীল আকাশ ছোঁওয়া উঁচু উঁচু গাছ, যতদূর চোখ যায় সবুজ এক উপত্যকা, একটা টলটলে জলের হ্রদ, গাঢ় সোনালি রঙ রোদ্দুর।

—কিরে সুদেষ্ণা, তুই কি ঠিক করলি?

—শিমলিপাল নয়, রাজগীর চলো। হটস্প্রিং আছে, নালন্দা আছে…

—টি এমও সেই কথাই বলছিলেন। আরও কত ধ্বংসাবশেষ...

—ছাড়্ তো, টি এম-এর ধান্দা অন্য। ওখানে জরাসন্ধর কুস্তির আখড়া আছে না? টি এম তো প্রতি বছরই নেতাজি ইনডোরে টিকিট কেটে কুস্তি দেখতে যান। ধোবি প্যাঁচ, এরোপ্লেন স্পিন প্যাঁচ সব কিছুরই তো অরিজিন জরাসন্ধ।

বিক্রমের রসিকতায় হাসির হল্লা উঠল।

—কিরে বৃষ্টি, তুই কিছু বলছিস না যে?

বৃষ্টি অন্যমনস্ক। স্কুল থেকে কতবার বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, বৃষ্টি কোনও এক্সকারশানেই যায়নি। বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার কথা উঠলেই একটা চাপা অস্বস্তি হত তার। যদি কেউ বাবা মার কথা তোলে! বাবা মার ডিভোর্সের ব্যাপারটা স্কুলের সকলেই জানত যে। ছোটখাটো খোঁচাও সে কম খায়নি।

শম্পা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলত; —তোর তো মজা রে শিঞ্জিনী, দুটো বাড়ি, ডবল আদর, তার ওপর তোর মা আর বাবা যদি আবার বিয়ে করে তা হলে মোট দুটো মা, দুটো বাবা। তুই কি লাকি রে!

ওই বয়সের ছেলেমেয়েরা এমন নির্মম হয়। কলেজে ব্যাপারটা অন্যরকম। এখানে কেউ কারুর বাবা মার অতীত নিয়ে সেভাবে কৌতূহলী নয়। অন্তত বৃষ্টির তাই ধারণা।

তৃষিতা ঠেলল বৃষ্টিকে,—এই বৃষ্টি, কোথায় হারিয়ে গেছিস? ফের। ফের। নেতারহাট ভোটে জিতছে। এনি অবজেকশন?

বৃষ্টির মনে তবুও দ্বিধা। গেলে হয়।

—কিরে, যাচ্ছিস তো তুই?

—দেখি, পরে জানাব।

—নো পরে ফরে। পরশু টাকা ডিপোজিট করতে হবে। কিরে দেবাদিত্য তুইও চুপ যে?

তৃষিতার প্রশ্ন দেবাদিত্যও যেন এড়ানোর চেষ্টা করল, —আগে তো চপের অর্ডারটা দে। এই শুভ, দ্যাখ না।

শুভ গলা ওঠাল,—এই বাচ্চা, সাতটা ভেজিটেবল চপ। সঙ্গে সাত কাপ গরম জল।

সুদেষ্ণা রসিকতা পছন্দ করে না,

—নারে। সাতটা চপ। সাতটা চা।

শুভ আয়েস করে আবার একটা সিগারেট ধরিয়েছে। ফট করে তার হাত থেকে সিগারেটটা কেড়ে নিয়েছে বৃষ্টি। শুভর মতই আরাম করে টান দিল। আআহ্। ধোঁয়াগুলো মাথায় ঢুকে কারুকার্য শুরু করে দিয়েছে। জন্মদিনের দিন প্রচণ্ড জোরে টেনে ফেলেছিল। জীবনের প্রথম টান। সঙ্গে সঙ্গে বুকে কী জোর ধাক্কা! কাশতে কাশতে চোখ মুখ লাল। কাশি থামার পর কনুই দুটো টেবিলে রেখে চুপচাপ মাথা চেপে বসেছিল অনেকক্ষণ। ক্রমে মাথার ভেতরটা কি আশ্চর্য রকমের হাল্কা!

বিক্রম চোখ গোল করে তাকিয়ে আছে বৃষ্টির দিকে,

—বস্। তুমি তো বেশ ওস্তাদ হয়ে গেছ! কাউন্টারটা আমায় দিও।

বৃষ্টি মনে মনে হাসল। তাকে তো ওস্তাদ হতেই হবে। সে এখন আঠেরো।

দূরের টেবিলে একজনকে হাত নাড়ল দেবাদিত্য। বৃষ্টি ঘুরে তাকাল। অরিজিৎ রোজকার মতই একলা এসেছে চা খেতে।

—এই অরিজিৎ, ওখানে কেন?

অরিজিৎ টেবিলের কাছে এল কিন্তু বসল না।

—বোস্।

—নারে, আমি একটু লাইব্রেরি যাব।

—এক্সকারশনে যাচ্ছিস তো? কদিনের জন্য তোর লাইব্রেরি কিন্তু বন্ধ থাকবে।

ঠাট্টাটা গায়ে মাখল না অরিজিৎ,—ইচ্ছে তো আছে। পরশুই দেখতে পাবি যাচ্ছি কিনা।

সুদেষ্ণা বৃষ্টির কানে কানে বলল, —বাবার পারমিশন পাওয়ার আগে পর্যন্ত ও ডিসিশন জানাতে পারবে না। পিতৃভক্ত রামের এক কাঠি বাড়া। পিতৃভক্ত রামপ্রসাদ। বউ নিয়ে বিছানায় শোওয়ার আগেও বাবার অনুমতি নেবে।

সারাক্ষণ বই-এর পাতায় মুখ গুঁজে থাকে অরিজিৎ, হাই মাইনাস পাওয়ারের চশমা। বয়সের তুলনায় মুখটা বেশ ভারিক্কি। দেখলে মনে হয় যেন কনফুসিয়াসের জীবনপঞ্জি, লাইব্রেরি আর আলাউদ্দিন খিলজির ওপর সেমিনার অ্যাটেন্ড করার জন্যই অনেক কষ্টে বেঁচে রয়েছে সে।

বৃষ্টির সুবীরের মুখটা মনে পড়ে গেল। তার জন্মদিনের পর পরই ফরিদাবাদ চলে গেছে। যাওয়ার দিন সকালে ফোন করেছিল। গলায় নকল উচ্ছ্বাস ফোটালেও বাবার ঘাবড়ানো ভাবটা এখনও যায়নি। মেয়ের একটামাত্র আক্রমণেই অবস্থা বেহাল? হায় রে।

বাচ্চা ছেলেটা সাতটা ডিশ অদ্ভুত কায়দায় ব্যালেন্স করতে করতে টেবিলে এনে রাখল। ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে যেন ভাসতে ভাসতে এল ছেলেটা।

—বাচ্চাগুলো তে সার্কাসে যেতে পারে রে, তবু একটা হিল্লে হয়। দুহাত নেড়ে বাচ্চাটার হাঁটার ভঙ্গি বন্ধুদের নকল করে দেখাচ্ছে দেবাদিত্য,—কি হাতের ব্যালেন্স দেখেছিস?

শুভ কথাটাকে খুব একটা আমল দিল না। চপে কামড় বসিয়ে প্রশ্ন করল,—ড্রিঙ্কস কি কলকাতা থেকে নিয়ে যাওয়া হবে? বিহারে নাকি দাম কম?

তৃষ্ণিতা আঁতকে উঠল,—তুই ড্রিঙ্ক করবি?

—করি তো মাঝে মাঝে। একটু একটু। বাবার বোতল থেকে।

—ধরা পড়ে যাস না?

—যতটা খাই ততটা জল ঢেলে রেখে দিই। বাবাটাও হেভি সেয়ানা। বোতলে দাগ মেরে রাখে আজকাল। সেদিন মার ওপর খুব হম্বিতম্বি করছিল, স্কচ এত লাইট হয় কি করে? এ নিঘাত তোমার গুণধর ছেলেদের কাজ। যেদিন হাতেনাতে ধরব...

বৃষ্টি লক্ষ করল হাসতে হাসতে শুভর চোয়াল শক্ত হয়ে যাচ্ছে। মুখ চোখ টানটান,

—তুমি শালা নিজে বন্ধুবান্ধব নিয়ে মাল খেয়ে হল্লা করবে, রাতদুপুর অবধি ব্লু দেখবে, আর ছেলেদের বেলায় নীতি ঝরে পড়ছে। হিপোক্রিট। দেব একদিন একখানা ক্যাসেট হাপিস করে... রাজীবদের ফ্ল্যাটটা তো ফাঁকাই....

—অ্যাই। কি হচ্ছে কি? রণজয় ধমকে থামানোর চেষ্টা করল শুভকে।

—হবে আবার কি। আমার কাছে কোন রাখঢাক গুড়গুড় নেই। শুভ বেপরোয়া,—নিজের বাপ বলে কি ধোওয়া তুলসীপাতা নাকি? যা ফ্যাক্ট শুভ সেটা বলবেই।

অবাক চোখে শুভকে দেখছিল বৃষ্টি। অনেকটা যেন তার মনের কথাই বলছে শুভ।

মিনিট খানেক টেবিলে সবাই নীরব। থমথমে আবহাওয়াটা কাটাতেই বোধ হয় বিক্রম বলে উঠল—রণজয়, পরভিন যাবে না?

রণজয় চোখ কুঁচকে তাকাল বিক্রমের দিকে,—আমি কি করে বলব?

বিক্রম আবার জিজ্ঞাসা করল, ও আজকে কলেজে আসেনি কেন রে?

চপে কামড় দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল রণজয়।

—আমাকে জিজ্ঞেস করছিস কেন?

—ওর বাড়ি থেকে ওকে ছাড়বে? বিক্রমের মুখে তবু নিরীহ জিজ্ঞাসা।

তৃষিতা, সুদেষ্ণা, দেবাদিত্য সবাই মুখ টিপে টিপে হাসছে। বৃষ্টি বুঝল একটা নাটক চলছে, কিন্তু কি যে ঘটছে সে ঠিক ঠিক ধরতে পারছে না। বোকা বোকা মুখে তৃষিতার দিকে তাকাল।

তৃষিতা বৃষ্টির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, —সেদিন রণজয়কে আমাদের সঙ্গে সিনেমায় যেতে বলোম, গেল না, মনে আছে? সেদিনই সন্ধেবেলা নিউ এম্পায়ার থেকে পরভিনের সঙ্গে বেরোচ্ছিল, মীনাক্ষি দেখেছে। বেকবাগানের মোড়েও পরশু বিকেলে...

রণজয় তৃষিতার ফিসফিস কথায় হঠাৎ ভীষণ খেপে গেল, —তোদের কি আর কোন টপিক নেই? সব কিছুর একটা লিমিট আছে।

দেবাদিত্য আর চুপ থাকতে পারল না, —ঠিকই তো। এমনভাবে সবাই রণজয়কে আঙুল দেখাচ্ছে যেন রণজয় একাই মাছরাঙা। এদিকে আমি যে অবিরাম পুকুরে ঠুকরে যাচ্ছি, সেটা কেউ পাত্তাই দেয় না!

ঘন গুমোট আবহাওয়াকে ফুরফুরে করে তুলতে সত্যিই দেবাদিত্যটার কোন জুড়ি নেই। গুম হয়ে যাওয়া শুভ পর্যন্ত হেসে ফেলল।

ঠিক এই মুহূর্তে যে ঘটনাটা ঘটলে সকলেই আশ্চর্য হয়ে যেত, সেই ঘটনাটাই ঘটল। ক্যান্টিনে ঢুকছে পরভিন স্বয়ং। সঙ্গে মীনাক্ষি। এদিক ওদিক তাকিয়ে বন্ধুদের খুঁজছে।

দেবাদিত্য সুর ভেঁজে উঠল, —এই মাছ এসে পড়্, টেবিলেতে বসে পড়্...

রণজয় আর থাকতে পারল না, হিংস্র চোখে সবার দিকে তাকিয়ে উঠে গেল টেবিল ছেড়ে।

পরভিন সরল মুখে জিজ্ঞাসা করল, —আমাদের দেখে রণজয় উঠে গেল কেন?

—ও কিছু না। হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করল দেবাদিত্য, —ওই নেতারহাটে এক্সকারশানে যাওয়া হচ্ছে, সেখানে কটা বোতল যাবে, তাই নিয়ে রণজয়ের সঙ্গে শুভর ঝগড়া হচ্ছিল।

—বোতল? কেন? পরভিনের চোখে অপার বিস্ময়।

—ছিপি খুলে খাওয়ার জন্য ভাই। তুমি ড্রিঙ্কস-এর নাম শোননি?

দেবাদিত্যর ঠাট্টায় পরভিন হোঁচট খেল। নিচু গলায় প্রশ্ন করল, —ড্রিঙ্ক করলে মুখ থেকে খুব গন্ধ বেরোয় না?

বিক্রম হা হা করে হেসে উঠল, —নিশ্চয়ই বেরোয় খুকুমণি। তুমি খাবে? পাঁচদিন মুখ থেকে গন্ধ বেরোবে। মিনিমাম।

সুদেষ্ণা বলল, —কেন এত ভয় দেখাচ্ছিস ওকে? নারে পরভিন, তুই জিন খেয়ে দেখতে পারিস? জিনের গন্ধ বেশিক্ষণ থাকে না। চল, নেতারহাটে তোকে টেস্ট করাব।

পরভিনের মুখটা হঠাৎ কেমন কাঁদ কাঁদ হয়ে গেল। তার গলায় মিনতির সুর,—অ্যাই বৃষ্টি, তৃষিতা, তোরা একবার আমার বাড়িতে গিয়ে বলবি? ছেলেরা যাচ্ছে সে কথা বলার দরকার নেই। বলবি কমপাল্‌শন। লেডি প্রোফেসররাও যাবে।

পরভিনের কথায় শুভ বিরক্ত হল,—কেন? আমরা কি বাঘ ভালুক নাকি? মেয়ে দেখলেই গপ করে খেয়ে ফেলব?

পরভিনের চোখে অসহায় ভাব, —দ্যাখ, সব বাড়ি তো একরকম হয় না। আমি তো তোদের বলেইছি আমাদের বাড়ি কিরকম কনজারভেটিভ। এই কো-এড কলেজে পড়ি বলে এখনও কম কথা শোনায় দাদাসাহেব! আম্মি জোর না করলে...

বৃষ্টি পরভিনের পিঠে হাত রাখল,—ডোন্ট ওরি। আমরা এমনভাবে তোর বাড়িতে গিয়ে ভয় দেখিয়ে আসব যেন না গেলে কলেজ থেকেই তোকে...

—তার সঙ্গে বলে দিস নেতারহাটে মোঘল পিরিয়ডের প্রচুর রেলিক্স আছে। দেবাদিত্য ফুট কাটল, —নতুন খোঁড়াখুড়ি শুরু হয়েছে...

—যদি জানতে পারে গুল মারছি?

—ছাড় তো। প্রত্যেক সপ্তাহে একটা করে নতুন জায়গায় গাঁইতি মারা শুরু হয়, নইলে আমাদের বইগুলো অত মোটা হয় কি করে?

সুদেষ্ণা উঠে দাঁড়াল,—আমি চলি রে। জয়ন্ত ব্রিটিশ কাউন্সিলের গেটে ওয়েট করবে। ওর কাছে আজকের ফিল্মের কার্ড আছে।

—কি বই?

—দা স্প্রিং। রোমান্টিক। জয়ন্ত রোমান্টিক ফিল্ম ভীষণ পছন্দ করে।

রোমান্টিক? না উদ্দাম জড়াজড়ি? বৃষ্টি দেবাদিত্যর দিকে বিচিত্র ভ্রূভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে পড়ল।

শুভ বলল, —কিরে, তুইও সুদেষ্ণার সঙ্গে চললি নাকি?

-ধুস। ওরা হাত ধরাধরি করে চাঁদ দেখুক। আমার খেয়েদেয়ে অনেক কাজ আছে।

কলেজের গাড়িবারান্দার নীচে এসে একটু দাঁড়াল বৃষ্টি। পুরনো আমলের ভারী থামগুলোর পাশে জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়েরা প্রেমের ক্লাসে মগ্ন। কি যে এত কথা থাকে এদের? তিন-চারটে জোড়াকে বৃষ্টি চিনতে পারল। তুখোড় প্রেমিক-প্রেমিকা হিসাবে এদের বেশ নাম হয়েছে কলেজে। শেষ থামের পাশে বসা ভাস্বতী আর সন্দীপকে নিয়ে উপকথাও চালু হয়ে গেছে। মীনাক্ষি বলছিল অর্চিতা নাকি গান বেঁধেছে ওদের নিয়ে। গ্রামেগঞ্জে বাউলদের দিয়ে গাওয়াবে সে গান।

সন্দীপ নাকি ভাস্বতীকে বলে, —আমি তোমাকে ভালবাসি।

ভাস্বতী বলে, —জানি।

সন্দীপ বলে, —তোমার ফিলজফির নোটটায় ভুল আছে।

ভাস্বতী বলে, —জানি।

সন্দীপ বলে, —তোমার বাবা আমাকে দেখলেই চটে যায়।

ভাস্বতী বলে, —জানি।

সন্দীপ বলে, —তোমাকে নিয়ে একটু ঝোপের আড়ালে যেতে ইচ্ছে করছে।

ভাস্বতী বলে, —জানি।

তারপর দুজনে হাত ধরাধরি করে উঠে যায়। তারপরের দৃশ্যগুলো অ্যাডাল্ট। এই নিয়েই হবে অর্চিতার গান। ময়মনসিংহ গীতিকার সুরে।

বৃষ্টি ঠোঁট কামড়াল। প্রেমের শেষ দৃশ্য তো রনির মা-বাবা। কিংবা তার নিজের। রোমিও জুলিয়েটের বিয়ে হলেও শেষ পর্যন্ত হয়ত একই অবস্থা হত। জুলিয়েট কৌটো ছুঁড়ছে, বাসন ভাঙছে; রোমিও রাগে গরগর করতে করতে হিংস্র নেকড়ের মতো গোটা বাড়ি দাপাচ্ছে। আর শহরের লোক তালি দিয়ে মজা দেখছে। হাহ্।

হাঁটতে হাঁটতে কলেজের বাইরে এল বৃষ্টি।

ভবানীপুরের নীলামাসির বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই বৃষ্টি বুলবুলদির গলা পেল। চোস্ত হিন্দিতে দক্ষিণ বারাসতের কাজের লোকটাকে ধমকাচ্ছে। বৃষ্টি ঢুকতেই গলার স্বর বদলে ফেলল,

—ওমা তুই এসে গেছিস? আমি আজ সন্ধেবেলা ঠিক তোদের বাড়ি যেতাম।

বৃষ্টি বলল, —ছাড়ো তো, সেই আমাকে ফাঁসালে...? এখন বই দুটো চটপট দিয়ে দাও। না হলে আজ বাড়ি ঢোকা যাবে না।

—কেন রে? বাবলুমামা খুব রেগে গেছে?

—রাগবে না? জানো না ওগুলো ভালমামার হাড়পাঁজরা? কাল বাড়িতে এই নিয়ে তুলকালাম হয়ে গেছে। তোমাকে নাকি তিন-চার বার ফোন করে দিয়ে যেতে বলেছিল..

কাজের মেয়েটা কথার ফাঁকে সুড়ৎ করে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল, তার মুখ থেকে খবর পেয়েই বোধহয় নীলামাসি বেরিয়ে এসেছে,

—এই তো বৃষ্টি এসে গেছে। বৃষ্টি, তুই একটু বোস তো, চিংড়িমাছের একটা নতুন প্রিপারেশন করেছি চিলি সস, সয়া সস আর ধনেপাতা দিয়ে, এরা কেউ খেতে চাইছে না, তুই একটু টেস্ট করে দ্যাখ তো।

বৃষ্টি ভাবল কী কুক্ষণেই না এসে পড়েছে সে। মার এই মাসতুতো দিদিটির অদ্ভুত সব কুখাদ্য রান্না করার বাতিক আছে। এই ভয়ে বুলবুলদির বন্ধুরা এ বাড়ির পথ মাড়ায় না, আত্মীয়স্বজনরা আঁতকে ওঠে। বৃষ্টিও আসে কচিৎ কালেভদ্রে। তাও কিনা ফেঁসে গেল আজ?

কাজের মেয়েটা স্যুপ খাওয়ার বাটিতে একটি ঘন কালো মণ্ড এনে টেবিলে রাখল। সেদিকে তাকিয়েই বৃষ্টির গা গুলিয়ে উঠল। বুলবুলদি সামনের সোফায় বসে দিব্যি মিটিমিটি হাসছে।

বৃষ্টির একটু রাগই হল এবার, —তুমি কি গো? ভালমামা তোমায় ফোন করল আর তুমি ডুব মেরে বসে রইলে?

বুলবুলদি বলল, —যাহ্ বাবলুমামা ফোন করেছে না হাতি। একবার করেছিল তাও কথা বলতে না বলতেই লাইন কেটে গেল। তোদের কলকাতায় কি এক বাড়িতে তিন-চারবার ফোন পাওয়া যায়?

বৃষ্টি বুলবুলদির মুখ দেখেই বুঝতে পারল বুলবুলদি মিথ্যা কথা বলছে। বুলবুলদি লেখাপড়ায় এত ভাল, সোশিওলজিতে পি.এইচ.ডি. করছে, এত সুন্দর দেখতে, তবু দুটো যা বদভ্যাস আছে! এক, মিথ্যা কথা বলতে চোখের পাতা কাঁপে না, দুই, যে কোন কথা শুরু করলেই তা শেষ করে কলকাতার নিন্দা দিয়ে।

বুলবুলদি বৃষ্টির গম্ভীর মুখ দেখে কি বুঝল কে জানে, গলা নরম করল একটু, —কাল সন্ধেয় ন্যাশানাল লাইব্রেরি থেকে ফেরার সময় ভাবলাম তোদের বাড়ি যাই, এমনভাবে লোডশেডিং হয়ে ট্রামগুলো সব দাঁড়িয়ে পড়ল...সত্যি, তোদের জন্য কষ্ট হয়, কি বিচ্ছিরি শহরে যে মানুষ হয়েছিস তোরা। আমাদের দিল্লিতে বাবা...

নীলামাসি বলল, —থাম্ তো। দিল্লিতে তো শুধু অফিস, বিজনেসডিল্ আর ভাও। ছ্যা ছ্যা ওখানে মানুষে থাকে? কলকাতায় লোডশেডিং হয় বলেই তো লোকে জ্যোৎস্না দেখতে পায়, চাঁদের দিকে তাকায়, কবিতা লেখে...।

নীলামাসির কথায় কৃতজ্ঞ বোধ করল বৃষ্টি। গপগপ করে উৎকট ঝাল খাবারটাও গিলে নিল। নীলামাসি ভীষণ আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল,

—কেমন হয়েছে রে?

বৃষ্টির বলতে ইচ্ছে করছিল, এক গ্লাস জল; মুখ দিয়ে বেরল, —ভাল।

নীলামাসি গজগজ করতে শুরু করল, —তাও তো তুই কিছু বললি, যেমন বজ্জাত হয়েছে বুলবুলের বন্ধুরা, তেমন হয়েছে তার মা। কিছুতেই এদিক মাড়ায় না। তোর মেসসা এই বয়সে আর কত রকম খাবার খাবে বল।

বীরেনমেস দিল্লিতে অডিট সার্ভিস থেকে রিটায়ার করার পর গত বছর কলকাতায় সপরিবারে পাকাপাকি ফিরে এসেছেন। বুলবুলদি কিছুতেই আসতে চায়নি, নীলামাসি আসার জন্য পাগল। বীরেনমেসোর কাস্টিং ভোট নীলামাসির দিকে পড়েছিল। সেই নিয়ে বুলবুলদির রাগ এখনও যায়নি।

নীলামাসি বলল, —জানি বলে লাভ নেই, তবু জয়াকে বলিস পারলে একবার যেন আসে।

বৃষ্টি ঘাড় নাড়ল। মনে মনে বলল, মাকে বলতে আমার দায় পড়েছে। তোমার যদি টান থাকে, নিজে গিয়ে বোনকে হাত ধরে নিয়ে এসো। সে নিজেই আবার কবে এবাড়িতে আসবে তার ঠিক নেই। কোন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যেতেই তার ভাল লাগে না। এরকম ম্যানিয়াক মাসি আর কুচুটে দিদির বাড়িতে তো নয়ই। সেবার দিল্লিতে গিয়ে নেহাত দায়ে পড়ে...।

মা-র সঙ্গে বছর তিনেক আগে শেষবারের মতো বেড়াতে গিয়েছিল বৃষ্টি। শুধু মা-র সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া সেই একবারই। বেড়াতে যাওয়া না বলে বৃষ্টিকে নীলামাসির বাড়িতে জমা রেখে দিল্লিতে মা নিজের কাজ সারতে গিয়েছিল বলাই ভাল। সাতদিনের সাতদিনই মা ব্যস্ত ছিল নিজের ছবির এগজিবিশন, রিভিউ, সেল নিয়ে। সারাদিন ধরে আর্টিস্ট ফোরাম, গ্যালারি আর আর্ট প্রোমোটার। বৃষ্টি যেন বাড়তি লাগেজ। স্টেশনের ক্লোকরুমে জমা থাকার মতো পড়ে রইল নীলামাসির বাড়িতে।

ভালমামার বই দুটো ব্যাগে পুরে যত তাড়াতাড়ি পারা যায় নীলামাসির বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল বৃষ্টি।

বাড়িতে ঢুকে বৃষ্টি বাবলুর ঘরে উঁকি দিল। খাটের কাছে রাখা নিজস্ব পোর্টেবল টিভিতে মন দিয়ে সাড়ে সাতটার খবর শুনছে বৃষ্টির ভালমামা। বার্লিনের প্রাচীর ভাঙার পর এখন রোজই কোন নতুন চমকের প্রত্যাশা। এ সময়ে কেউ কথা বললে সে খুব রেগে যায়।

বৃষ্টি খাটের ওপর বই দুটো রাখল। বাবলু একবার সেদিকে তাকিয়ে আবার মন দিয়েছে খবরে।

বৃষ্টির হঠাৎই একটু ভালমামার পিছনে লাগতে ইচ্ছে হল,

—তোমার ভি পি সিং-এর খবর কি? ইস্ট ইউরোপের কোন দেওয়াল-টেওয়াল আর ভাঙল?

বাবলুর ভুরু জড়ো হল।

বৃষ্টি ভালমামার খাটে বসে পড়ল,

—কোন্ড ওয়ার-টোয়ার আর চলবে না বুঝলে। এবার ভাঙাভাঙির পালা। সব ভেঙে যাবে।

খুব একটা কিছু ভেবে নয়, এমনি বলার জন্যই কথাটা বলেছে। দুটো মতবাদের লড়াই শুরু হয়ে গেছে, বিভিন্ন দেশগুলোর দেওয়াল টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে দিন দিন। বৃষ্টির ভালমামা এসব নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত থাকে আজকাল। কাউকে ডেকে যেচে কথা বলার অভ্যাস তার বহুকাল চলে গেছে।

সুধা দরজায় এসে প্রায় ফিসফিস করে ডাকল বৃষ্টিকে। বাবলুর প্রয়োজন ছাড়া সে এ ঘরে ঢুকতে ভয় পায়।

—জলখাবার খাবে কিছু?

বৃষ্টি মাথা দোলালো।

—চা, কফি?

বাবলু টিভি থেকে চোখ না সরিয়ে বলে উঠল, —আমাকে এখন চা কফি দেবে না। সন্ধে থেকে আমার তিন-চারটে চোঁয়া ঢেঁকুর উঠেছে।

বাবলুর স্বর এমনই রূঢ় যে সে ঘরে অন্য যে কেউ বসে থাকতে অস্বস্তিবোধ করবে। বৃষ্টি তবু বসে রইল।

এতক্ষণে বাবলু যেন মৃদু সচেতন হয়েছে, —সোজা বুলবুলদের বাড়ি থেকে ফিরছিস?

—হুঁ।

—ও। তাই এত তাড়াতাড়ি! অন্য দিন তো ন্যাশনাল নেটওয়ার্ক শুরু হওয়ার আগে ফেরাই হয় না।

ভালমামা কি কখনও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না! বৃষ্টিও এরকম লোককে জব্দ করতে জানে।

—বুলবুলদি বলছিল তুমি নাকি মাত্র একবার ফোন করেছিলে? তাও নাকি কথা হয়নি? লাইন কেটে গিয়েছিল?

বাবলু তৎক্ষণাৎ উত্তেজিত, —বুলবুল ডাহা মিথ্যেবাদী। আর কোনদিন আমার কাছে বই চাইতে আসুক।

—তোমারও বলিহারি যাই, বই দুটো দিয়েই ফেরত চাওয়ার জন্য এত ব্যস্ত কেন?

—সে কৈফিয়ত কি তোকে দিতে হবে নাকি? যা, এখান থেকে। কেউ কিছু বলে না বলে দিনকে দিন...

বৃষ্টি খাট থেকে নেমে পড়ল। এ ঘরে বসে থাকা আর নিরাপদ নয়। বৃষ্টি কিছুতেই ভেবে পায় না এত সামান্য কথায় কি করে একটা মানুষ এত উত্তেজিত হয়ে পড়ে! আর যদি হয়ে পড়েও বৃষ্টি তাকে থোড়াই কেয়ার করে।

নিজের ঘরে এসে বৃষ্টি কানে ওয়াকম্যান লাগিয়ে নিল। বিছানায় শুয়ে, পা দোলাতে দোলাতে, হার্ডরকস্ শুনছে। এ সময়ে তার চোখের সামনে থেকে বিশ্বসংসার ভোজবাজির মতো মিলিয়ে যায়। আকাশ গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ভেঙে পড়লেও এখন সে খেয়াল করবে না। কখনও কখনও তার মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে, হাত মুঠো করছে, কখনও বা সম্পূর্ণ শিথিল হয়ে শুয়ে থাকছে বিছানায়। যে কেউ এখন তাকে দেখলে উন্মাদিনী ছাড়া কিছু বলবে না।

হঠাৎই দরজায় চোখ পড়তে বৃষ্টি চমকে উঠল। মা তার দরজায় দাঁড়িয়ে। মা কখন এল! আজ এত তাড়াতাড়ি!

মাকে দেখেই মস্তিষ্কে আলোড়ন শুরু হয়ে গেছে। কদিন ধরেই মা যেন নজর করছে তাকে। শুধু বাবা কেন, এই মহিলারও কিছু শিক্ষা পাওয়া দরকার। জয়ার মুখ একঝলক দেখে নিয়েই বৃষ্টি আবার পা নাচাতে শুরু করল।

জয়া কি একটা বলল, বৃষ্টি শুনতে পেল না। পা দোলাতে দোলাতেই কান থেকে ওয়াকম্যান সরাল। বাজনার বিটগুলো মৃদু হয়েছে,

—কিছু বলছ আমাকে?

—বলছি গান শোনা ছাড়া কি আর তোমার কোন কাজ নেই? পড়ছিস না যে?

—ইচ্ছে। জোরের সঙ্গে বলতে গিয়েও গলাটা কেঁপে গেল। বৃষ্টি বুঝতে পারল মা-র সম্পর্কে ভয়টা তার কাটতে সময় লাগবে। তবু জোর করে পা দোলাতে চেষ্টা করল। আবার।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%