সুচিত্রা ভট্টাচার্য
ঘুম ভাঙার পরও অনেকক্ষণ বিছানায় চুপচাপ শুয়েছিল জয়া। এ সময়টা তার ধ্যানের সময়। প্রতিদিন এভাবেই চোখ বুজে শুয়ে নিজেকে খনন করার চেষ্টা করে সে। কাল রাত থেকে একটা ছবি ধরা দিয়েও ধরা দিচ্ছে না মাথায়। কোথায় যেন একটা বড় রকমের ফাঁক থেকে যাচ্ছে। কোথায় যে ফাঁকটা? কোথায়? ছবির বিন্যাসে? না রঙে? নতুন করে কল্পনায় রঙগুলোকে সাজাতে চাইছিল জয়া।
ভেতরের প্যাসেজে টেলিফোনটা বেজে উঠল। বাজছে। বেজেই চলেছে।
ঘোর অন্যমনস্কতায় জয়ার প্রথমটা মনে হল বাইরের দরজায় কলিংবেল বাজাচ্ছে কেউ। একবার দুবার শোনার পর ভুল ভাঙল। এত সকালে কে ডাকছে টেলিফোনে। দিনের শুরুতেই বাইরের লোকের ডাকাডাকি জয়া একদম পছন্দ করে না।
ধাতব ঝংকার তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর হচ্ছে। ফোনটা কেউ ধরছে না কেন? সুধা গেল কোথায়? বিরক্ত মুখে জয়া বিছানায় উঠে বসল। নিজের অজ্ঞাতেই চোখ চলে গেছে পুরনো জার্মান দেওয়াল ঘড়িটার দিকে। সাতটা দশ। মানে সুধা বাজারে। সকালে কেউ বিছানা ছেড়ে ওঠার আগে বাড়ির বাজার সেরে ফেলে সুধা। বাবলুর ঘুম ভাঙলেও ভাঙতে পারে কিন্তু সকালে ধরে বসিয়ে না দিলে নিজে থেকে উঠতে নড়তে পারে না বাবলু। আর বৃষ্টি তো উঠবেই না!
শাড়ির আঁচল গুছিয়ে নিয়ে জয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এল। যথেষ্ট বিরস মুখে রিসিভার তুলেছে,
—হ্যালো!
ও প্রান্ত মুহূর্তের জন্য নীরব। মুহূর্ত পরে স্বর ফুটল,
—আমি সুবীর। সুবীর বলছি।
আজ এত সকালে সুবীর কেন! জয়া সামান্য থমকাল সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেছে। আজ বৃষ্টির জন্মদিন। প্রতি বছরই জন্মদিনে মেয়ে ঘুম থেকে ওঠার আগে সুবীরের ফোন আসে।
—বৃষ্টি ওঠেনি এখনও?
জয়ার বুকের ভেতরটা কোন কারণ ছাড়াই কেন যে হু হু করে উঠল! সক্কালবেলা আচমকা সুবীরের গলা শুনল বলেই কি! নাকি আজ বৃষ্টির জন্মদিন বলে! জয়া ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। একেক সময় নিজের মনকেও কেন যে এত অচেনা লাগে! সংযত হতে সময় লেগে গেল বেশ কয়েক সেকেন্ড, তবুও গলার ভারী ভাবটাকে কাটানো গেল না,
—ধরো দেখছি। মনে হয় এখনও ঘুমোচ্ছে।
কথাটা বলেও একটুক্ষণ রিসিভার কানে ধরে রইল। আর কিছু কি বলবে সুবীর? কিছু না হোক, নিছক কুশল জিজ্ঞাসা? ছোট্ট দুটো শব্দ, কেমন আছ? দুজন পরিচিত মানুষের সাধারণ সৌজন্য বিনিময়? নাহ্, জয়া টেলিফোন ধরলে কখনই অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না সুবীর। দরকার ছাড়া একটি বাক্যও অপচয় করে না। কবেই বা করত? চিরকালই তো এরকম আত্মসর্বস্ব।
জয়া নিঃশব্দে রিসিভার নামিয়ে রাখল। গোটা বাড়ি ঘুমোচ্ছে অঘোরে। নিঝুম। এত নিঝুম যে নিজের নিশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়। ঘর দিয়ে চতুর্দিক চাপা বলে ভেতরের এই প্যাসেজটাতে এমনিতেই আলো কম। দরজা জানলা সব খোলা থাকলে তাও একটু উজ্জ্বল লাগে। ছোটখাটো হলঘর সাইজের এই প্যাসেজটা বাবা মা বেঁচে থাকাকালীন ফাঁকাই থাকত। এখন জয়া নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়েছে। অনুজ্জ্বল বলে বেশি কিছু রাখেনি। মাঝখানে একটা শ্বেতপাথরের গোল টেবিলে চাইনিজ পেন্টিং করা একটা মাত্র চিনামাটির ফুলদানি। এধার ওধারে ছড়ানো পেতলের পট হোল্ডারে বাহারী জুনিপার, জেড, মনেস্টেরিয়া। সব একটা করে। দেওয়ালে ওল্ড মাস্টারস প্রিন্ট্ একটাই। ভ্যান গখের সূর্যমুখীর খেত। হঠাৎ তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায় এমন হলুদ। এই ছবিটার জন্যই জায়গাটা খানিকটা যা উজ্জ্বলতা পেয়েছে।
নিখিল সুযোগ পেলেই ব্যঙ্গ করে,
—তোর এই একটা একটা করে সব কিছু রাখার ওপর ফ্যাসিনেশানটা কবে যাবে বল তো? এখনও এত একাকিনী শোকাকুলা ভাব কেন?
এত দিনের পুরনো, এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েও, নিখিল যে কেন এমন খোচা মারে হঠাৎ হঠাৎ! জয়া রেগে যায়,
—এটা যার যার পারসোনাল চয়েস্। এর মধ্যে অন্য ইঙ্গিত আনছিস কেন?
বলে বটে, কিন্তু অন্তরে যেন নিখিলের কথারই প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। অতীত তো একটা না একটা ছায়া ফেলবেই মানুষের ওপর। ইচ্ছে করলেই বা সেই ছায়াকে মুছে ফেলা যায় কই!
প্যাসেজ টপকে মেয়ের ঘরের ভেজানো দরজার পাল্লা ঠেলতেই জয়ার বুক ধক করে উঠল। বৃষ্টি ঘরে নেই।
চোখের সামনে শুধুই সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল একটা ঘর। আধো আলো আধো ছায়ায় ঘরময় যেমন তেমন ছড়িয়ে বৃষ্টির বইখাতা, গানের ক্যাসেট, জুতো। কাঠের বাক্সের ডালায় অজস্র জামাকাপড়ের অগোছালো স্তূপ। রঙিন সুজনি ঝুলছে খাট থেকে। সুবীরের কিনে দেওয়া বিদেশী ওয়াকম্যান বিধ্বস্ত বিছানায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে গোটা ঘর যেন তছনছ করে দিয়ে গেছে কোন অপরিচিত দস্যু।
জয়ার ত্রস্ত চোখ নির্জন ঘরে পাক খেল কয়েক বার। ঘর জুড়ে, ওয়াড্রোবের গায়ে, দেওয়ালে, দরজায় সর্বত্র সারি সারি রঙিন পোস্টার। হাস্যমুখ বরিস বেকার, কপিলদেব, সুন্দরী ম্যাডোনা, ছলনাময়ী সামান্থা ফক্স, শচীন তেন্ডুলকার, গিটার হাতে জর্জ মাইকেল। এছাড়াও আছে আরও অনেকে, জয়া তাদের চেনে না। পোস্টারে পোস্টারে চারদিকের দেওয়াল প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে। ছোটবেলা থেকেই প্রিয় মানুষদের বিচিত্র পোস্টার লাগানোর কি যে নেশা মেয়েটার!
বৃষ্টির বিছানার পাশের টেবিলে মস্কিউটো রিপেলেন্টের লাল চোখ স্থির জ্বলছে। পশ্চিমের জানলার পেলমেট থেকে ঝোলা ভারী পর্দা দুটোর গায়ে, বন্ধ কাচের শার্সিতে প্রভাতী আলোর আভাস। মন কেমন করা স্মৃতির মত। মনোরম কিন্তু বিষন্ন।
আবছা আলো, রঙিন পোস্টার, সবুজ পর্দা সব মিলিয়ে পুরো দৃশ্যটার একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। কিন্তু জয়াকে এই মুহূর্তে তেমন করে টানতে পারল না ছবিটা।
গেল কোথায় মেয়েটা! এ সময় ঘুম থেকে ওঠে না তো কখনও! দ্রুত ভেতরের প্যাসেজে ফিরে জয়া বাথরুমের দিকে গেল। বাথরুমের দরজা খোলা; বৃষ্টি সেখানেও নেই। বেরিয়েছে কোথাও, নাকি ছাদে উঠেছে! এই সেদিন পর্যন্তও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছাদে একা দাঁড়িয়ে থাকত মেয়ে।
জয়া রাগারাগি করত, —লেখা নেই, পড়া নেই, যখনই দেখি বৃষ্টি ছাদে উঠে দাঁড়িয়ে আছে, তোমরা ওকে একটু বকাবকি করতে পারো না মা?
মৃন্ময়ী বলতেন, —সব সময় খিচখিচ করিস না তো। লেখাপড়া তো করেই, নইলে ভাল রেজাল্ট করছে কি করে? ওখানে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখতে ভালবাসে, তাও বন্ধ করে দেব?
আজকাল সেই মেয়ে বাড়িতে থাকেই বা কতক্ষণ যে চারপাশের পৃথিবীতে চোখ বোলাবে! একটু উঁচু ক্লাসে ওঠার পর থেকেই তো ছাদে ওঠার অভ্যাস চলে গেছে। এখন বাড়িতে থাকলেই সারাক্ষণ ঝমঝম করে বিদেশী বাজনা চালায়, নয়ত স্নায়ু টানটান করা ইংরিজি থ্রিলার পড়ে। এখনকার ছেলেমেয়েদের জীবন থেকে নরমসরম ব্যাপারগুলোই ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিও তার ব্যতিক্রম হল না। অথচ জয়ার বাবা মা মারা যাওয়ার আগেও এই মেয়ে কত নিরীহ ধরনের ছিল, কত শান্তও। কবে থেকে যে বদলে গেল বৃষ্টি! জয়ার বাবা মা দুজনেই পর পর মারা যাওয়ার পর থেকে! না সুবীর বিয়ে করার পর! জয়া ঠিক ঠিক নজর করে উঠতে পারেনি। বদলটাই মাঝে মাঝে বড় চোখে লাগে তার। মেয়ের ভাবভঙ্গিতে ইদানীং কেমন যেন চাপা উগ্রতা।
ছাদে উঠতে গিয়ে সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ টাঙানো নিজের আঁকা পুরনো ল্যান্ডস্কেপটায় চোখ পড়ে গেল জয়ার। ছবিটাতে বেশ ধুলো জমেছে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে না দিলে সুধা কিছুই লক্ষ করে না। আজ একটু সুধাকে বকাবকি করা দরকার। এত অযত্ন কেন! এত অবহেলা!
ছাদে উঠেই জয়া বৃষ্টিকে দেখতে পেল। আলসেতে ভর দিয়ে আচ্ছন্নের মত একদৃষ্টে সামনের পার্কের দিকে তাকিয়ে আছে মেয়ে। ক্ষণিকের জন্য জয়া স্থির। বিহ্বল। মা নয়, যেন এক অপরিচিত নারী অন্য এক পরিপূর্ণ রমণীকে দেখছে। বিশাল আকাশের নীচে, ছাদে একা দাঁড়িয়ে থাকা ওই যুবতী কি জয়ারই মেয়ে! পিছন থেকে কী বড়সড় লাগছে বৃষ্টিকে!
জয়া আড়ষ্ট গলায় ডাকল, —বৃষ্টি, তোমার ফোন।
বৃষ্টি শুনতে পেল না।
জয়া আবার বলল, একটু জোরে,
—অ্যাই বৃষ্টি, তোর বাবার ফোন এসেছে।
বৃষ্টি ঘুরে তাকাল। দৃষ্টি উদাস, ভাবলেশহীন। জয়া অবাক। বাবার নাম শুনলেই তো মেয়ের মুখ চোখ ঝলমল করে ওঠে! আজ ব্যাপার কি!
ধীর পায়ে বৃষ্টি সিঁড়ি দিয়ে নামছে, পিছন থেকে মেয়েকে দেখছিল জয়া। মেয়েটা তার ভারী সুন্দর হয়েছে। নরম। গোলাপি। মাথাভরা থাক থাক চুল। কালো চোখের পাতা। ছোট্ট চিবুক। ফোলা ফোলা গাল। অনেকটা রেনোয়ার পেন্টিং-এর মত। গড়নটাই যা একটু রোগাটে; বেশি লম্বা নয় বলে ততটা রোগা লাগে না অবশ্য।
সুবীরের মা বলতেন, —নাতনি আমার বৌমার গড়ন পাবে, মুখ গায়ের রঙ সুবীরের।
জয়ার বাবা প্রিয়তোষ খুব মজা পেতেন শুনে, — কী করে যে আপনারা ওইটুকু বাচ্চার মুখ গড়ন কেমন হবে বুঝে ফেলেন? আমার তো বাবা ওইটুকু শিশুদের সবাইকেই একরকম লাগে।
ওইটুকু শিশু দেখতে দেখতে কবে এত বড় হয়ে গেল! এই তো সেদিন তিলে তিলে তৈরি হল জয়ারই শরীরের মধ্যে। অদৃশ্য তুলি দিয়ে জয়া মেয়ের চোখ এঁকেছে, মুখ এঁকেছে। লেওনার্দোর মোনালিসার থেকে তার সৃষ্টিই বা কম কিসে!
সেই বৃষ্টি এক দুই তিন করে আজ পুরো আঠেরো।
আঠেরো! আঠেরো শব্দটা ঝন করে মস্তিষ্কে বেজে উঠল কেন?
আলিপুর জজ কোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে জয়াকে শাসিয়ে ছিল সুবীর, —দেখে নেব। দেখে নেব, মেয়ের আঠেরো বছর বয়স হলে কিভাবে তুমি তাকে আটকে রাখতে পারো।
সুবীরের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই-এর পর সেদিনই সদ্য কাস্টডির মামলার রায় বেরিয়েছে। হিংস্র আক্রোশে পরস্পরের দিকে প্রকাশ্যে কাদা ছোঁড়াছুড়ি সেদিনই সবে শেষ।
সুবীরের উকিল বলেছিল, —মি লর্ড, এই ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন এঁর পুরুষ বন্ধুর সংখ্যা কত? দুই? পাঁচ? দশ? মনে হয় কড় গুনেও উনি শেষ করতে পারবেন না। উনি যখন স্বামীর বিনা অনুমতিতে মেয়ে ফেলে বিদেশ চলে গিয়েছিলেন তখন কজন পুরুষ বন্ধু ওনার সঙ্গী ছিল? মেয়ের জন্য উনি দিনে কতটা সময় খরচা করেন? আর কতটাই বা নিজের আঁকাঝোকার জন্য? ছবি এঁকেই বা ক পয়সা ওনায় রোজগার যে মেয়েকে প্রপারলি মানুষ করতে পারবেন বলে দাবি করছেন?
জয়ার উকিলও কম যায়নি, —মি লর্ড, আমার মাননীয় বন্ধু আমার ক্লায়েন্টের বিদেশ যাওয়ার কথা তুলে অশোভন ইঙ্গিত করছেন। উনি বাইরে গিয়েছিলেন মাত্র দু মাসের জন্য, ছবির এগজিবিশন করতে, বিদেশী সরকারের ডাকে, ভারতের ডেলিগেট হয়ে যা কিনা যে কোন শিল্পীর কাছে খুবই সম্মানের ব্যাপার। মেয়েও সে সময় আমার ক্লায়েন্টের বাবা মার কাছে অতি আদরেই ছিল। আসলে ওই ভদ্রলোকই স্ত্রীর খ্যাতি, যশ, প্রতিভাকে সহ্য করতে পারেননি। ওনাকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন তো কদিন উনি মদ্যপান না করে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফেরেন? স্ত্রীকে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দিয়ে মেয়ের সামনে কোন আদর্শ স্থাপন করেছেন? ঈর্ষাকাতর, মদ্যপ বাবার কাছে থাকা ভাল? না দাদু-দিদার ছায়ায় থেকে শিল্পী মায়ের কাছে বড় হওয়া ভাল?
তিক্ত সেই মামলায় জিতে পাওয়া মেয়ে আজ পূর্ণ যুবতী। বৃষ্টি নীচে এসে ফোন ধরেছে, জয়া একটু তফাতে দাঁড়িয়ে বাপ মেয়ের কথা শোনার চেষ্টা করল। ডাইনিং টেবিলের কাছে রাখা রবার গাছের পাতা দেখার ভান করে ওদিকেই কান সজাগ।
বৃষ্টি একবার পিছন ফিরে জয়াকে দেখে নিল। বেশ নিচু গলায় কথা বলছে। যেন মাকে লুকিয়ে গোপন কথা সেরে নিচ্ছে বাবা নয়, নিষিদ্ধ কোন পুরুষের সঙ্গে। সব কথা পরিষ্কার বুঝতে পারল না জয়া। টুকরো টুকরো দু একটা বাক্য কানে এল মাত্র।
...তুমি একা কিন্তু।
...দুপুরে হবে না। বিকেলে। আফটার ফাইভ। ...
...কলেজেই এসো। কলেজ স্ট্রিট ক্রসিং এ।
নিম্ন স্বরে বললেও বৃষ্টির কথাবার্তা স্পষ্টতই কাঠ কাঠ। নির্লিপ্ত। কথা বলতে বলতেই দুম করে ফোন কেটে দিয়ে হনহন করে ঢুকে গেল বাথরুমে।
আশ্চর্য! বাবার সঙ্গে তো এভাবে কথা বলে না বৃষ্টি! জয়ার মনে পড়ল গত বছরও জন্মদিনে সুবীরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে সন্ধের মধ্যেই বৃষ্টি বাড়ি ফিরে এসেছিল। জয়া জিজ্ঞাসা করেছিল,
—তুই এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলি যে?
জবাব না দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল মেয়ে।
সুবীরের সম্পর্কে কোন কথাই কখনও জয়াকে এসে বলে না বৃষ্টি। জয়ার মতই চাপা অন্তর্মুখী হয়েছে। এমনকি সুবীর যে আবার বিয়ে করেছে সে কথাও বৃষ্টির মুখ থেকে বেরোয়নি কোনদিন। ছেলে হওয়ার খবরও না। জয়া জেনেছিল শিপ্রার কাছ থেকে। শিপ্রার দাদা সুবীরের কলিগ।
জয়া জুনিপার গাছের টবের দিকে এগিয়ে গেল। গোড়ার মাটি শক্ত জমাট বেঁধে গেছে। ছোট্ট একটা লোহার শিক তুলে জয়া গাছটার গোড়া খোঁচাতে শুরু করল। বাবার ওপরও টান কি তবে কমে যাচ্ছে বৃষ্টির? অথচ এই মেয়েই কী ছটফটই না করত বাবার জন্যে! কোর্টের রায়ে সপ্তাহে একদিন মেয়েকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার অধিকার পেয়েছিল সুবীর। একদিনই। রবিবার এলেই মেয়েও সকাল থেকে সেজেগুজে তৈরি। গাড়ির হর্ন শুনলেই ছুটে বেরিয়ে যেত বাইরে,
—বাবা এসেছে। আমার বাবা এসে গেছে।
জয়া কী যে কাঁটা হয়ে থাকত সেই সব দিনগুলোতে! যদি বৃষ্টি আর না ফেরে? যদি বাবার কাছেই থেকে যায়? সুবীর আবার বিয়ে করার পর অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করেছিল।
মেয়ে বাথরুম থেকে বেরোতেই জয়া প্রশ্ন করল,
—তোর জন্মদিনে এবারও বন্ধুরা কেউ আসবে না সন্ধেবেলা?
বৃষ্টি নিষ্পলক তাকাল জয়ার দিকে। যেন জরিপ করছে মাকে,
—শুনলেই তো সন্ধেবেলা থাকব না।
জয়া অপ্রস্তুত। মেয়েও তবে এতক্ষণ তাকে লক্ষ করছিল! কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল,
—তোর জন্য কাল একটা ফিরহন্ কিনে এনেছি। দেখেছিস?
—দেখিনি। দেখে নেব।
বৃষ্টি ঘরে ঢুকে গেল।
মেয়ের গলায় পরিষ্কার ঝাঁঝ! মাঝে মাঝে এভাবেই মুখিয়ে ওঠে আজকাল। ভালভাবে কথাই বলতে চায় না।
নিখিল বলে, —ও কিছু না। এ বয়সে ওরকম একটু আধটু হয়। মা বাবার কথা শুনতে ভাল লাগে না, মনোমত সব কিছু না পেলে বিরক্তি আসে। নিজের কথাই ভেবে দ্যাখ্ না, ওই বয়সে বাবা মা’র কথা শুনে চলতে তোর ভাল লাগত?
জয়া প্রতিবাদ করে না, কিন্তু জয়া জানে জয়া ছিল অন্যরকম। কারুর ওপর মেজাজ করা তার ধাতে ছিল না। সে ছিল অনেক ভিতু, অনেক নরম, খুব বেশি আবেগপ্রবণ। সে ছিল ফারকোটের পকেটে মানুষ হওয়া ডলপুতুলের মত। সামান্যতম নিষ্ঠুরতাও তার সহ্য হত না। একটা কুকুরকে রাস্তায় মরে পড়ে থাকতে দেখলেও সে কেঁদে কেটে একসা হত।
সদরের ইয়েল লক খুলে সুধা বাড়িতে ঢুকল। জয়াকে টবের কাছে দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
—কি হয়েছে গো গাছটার?
—হবে আবার কি? ভাল করে দেখাশোনা করিস না, গোড়াগুলো খুঁড়ে ঝরো ঝুরো করে দিতে বলেছিলাম না?
—সময় পাইনি গো। তুমি ছেড়ে দাও, আমি আজ খুঁড়ে দেব।
সুধা বাজারের থলি রান্নাঘরে রাখতে গেল। সেখান থেকেই মুখ বাড়িয়েছে,
—দিদি, চা দেব?
এই সময় ঘুম থেকে উঠে নিজের কাজে ডুবে যাওয়া জয়ার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। সামনে অ্যানুয়াল এগজিবিশন। দুটো ছবি শেষ করতেই হবে। সুধাকে বলল,
—ওপরে দিয়ে যাস। শুধু চা। বিস্কুট-ফিস্কুট না।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়েও জয়া ঘুরে দাঁড়াল,
—কি এনেছিস বাজার থেকে?
—রুই মাছ আর মুর্গি।
—খেয়াল আছে মেয়েটার আজ জন্মদিন? ফ্রাই-এর জন্য ভেটকি মাছের কয়েকটা ফিলেট আনতে পারতিস?
—এনেছি গো এনেছি। সুধা নিজস্ব ভঙ্গিতে মাথা দোলাল, —সুধার সব খেয়াল থাকে। বৃষ্টির জন্মদিনের কথা আমাকে মনে পড়িয়ে দিতে হবে? কার্তিক মাসের সাতাশ তারিখটা আমার ঠিক খেয়ালে থাকে। গতবারও তো আমিই মনে করে....
—থাম তো। জয়া খেপে উঠল। সুধা ইদানীং নিজেকে বড় বেশি বাড়ির গিন্নি ভাবতে শুরু করেছে।
—অত যদি সব দিকে খেয়াল, সিঁড়ির ছবিতে ময়লা জমে কি করে? যেদিকে তাকাব না সেদিকেই...
সুধা কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরে পালাল। তাকে এখন মেল ট্রেনের গতিতে সকালের কাজ সারতে হবে। চা জলখাবারের পাট চুকলেই কুটনো কোটা, মশলা বাটা, রান্নাবান্না...। সাড়ে দশটা এগারোটার মধ্যে জয়া বৃষ্টি দুজনেই যে যার কলেজে ছুটবে।
চিলেকোঠার স্টুডিওতে গিয়ে ক্যানভাসের সামনে বসল জয়া। কাল রাতে অর্ধেক আঁকা হয়েছে ছবিটা। মূলত প্রাথমিক রঙ দিয়েই এবার ছবিটাকে ফোটাতে চাইছে। লাল হলুদ আর নীল মিশিয়ে এক তীব্র একাকীত্বের অনুভূতি। হচ্ছে না। কিচ্ছু হচ্ছে না। তবে কি রঙগুলোকে ভেঙে দেওয়া দরকার? জয়া নতুন করে অস্থির হয়ে উঠল। যে কোন ছবি নিজস্ব উপলব্ধির সঙ্গে না মেলা পর্যন্ত এরকমই অতৃপ্তিতে ছটফট করতে থাকে সে। একবার ভাবল ক্যানভাসটাই মুছে ফেলে প্রথম থেকে শুরু করবে, পর মুহূর্তে মত বদলাল। হাতে ব্রাশ তুলে ক্যানভাসের নীল রঙটাকে গাঢ় করতে চাইল আরেকটু। বার দুয়েক আঁচড় টেনেই ব্রাশ ছুঁড়ে ফেলে দিল। মন বসছে না। একেক দিন এরকমই হয়। কিছুতেই ছবির মধ্যে পুরোপুরি ঢুকতে পারে না।
সুধা চা নিয়ে ঘরে ঢুকেছে। টুলের ওপর কাপ রেখে চলে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল,
—কিছু বলবি?
—দিদি, দাদাভাই-এর কোমরের ব্যথাটা তো আবার খুব বেড়েছে। কালকেও সন্ধেবেলা খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল।
জয়ার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। দু তিন বছর ধরে শীত আসার আগে বাবলুকে কোমরের ব্যথাটা খুব ভোগাচ্ছে। গত বছর তো আট দশ দিন একেবারেই শয্যাশায়ী ছিল ভাইটা। ডক্টর কয়াল বলছিলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ভোগান্তিটুকুও বাবলুর কপালে আছে।
ঊনসত্তর সালে, কলেজ স্ট্রিটে, দু দলের বোমাবাজির মাঝখানে পড়ে মেরুদণ্ডে স্প্লিন্টার ঢুকেছিল বাবলুর। তখন বাবলু সবে হায়ার সেকেন্ডারি দিয়েছে, জয়া আর্ট কলেজের ফোর্থ ইয়ারে। নিজেদের যথাসর্বস্ব দিয়ে প্রিয়তোষ মৃন্ময়ী চিকিৎসা করিয়েছিলেন ছেলের। সুবীর তখন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। জয়ার সঙ্গে সদ্য পরিচয় হয়েছে তার। জয়ার ভাইকে সারিয়ে তোলার জন্য সেও অসম্ভব দৌড়াদৌড়ি, পরিশ্রম করেছিল সে সময়। শেষ পর্যন্ত প্রাণে বাঁচলেও নিম্নাঙ্গ প্রায় অসাড় হয়ে গেল বাবলুর। কোনদিন আর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারল না। একখানা পোর্টেবল টিভি, বই, ম্যাগাজিন, আর বড়সড় একটা অ্যাকোয়ারিয়াম নিয়ে নিজস্ব জগতে নির্বাসিত হয়ে থাকে সে। সেই জগতে সময় স্থির হয়ে আছে প্রায় একুশ বছর। নিস্তরঙ্গ সেই জীবনে বিন্দুমাত্র আলোড়ন উঠলে বাবলু হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। মেজাজ দিনকে দিন আরও তিরিক্ষে হয়ে উঠছে। বৃষ্টির সঙ্গে তো ইদানীং মোটেই বনে না। কথায় কথায় খিটিমিটি, ঝগড়া, চিৎকার, চেঁচামেচি। অথচ ছোটবেলায় এই ভালমামা বলতে বৃষ্টি প্রায় অজ্ঞান ছিল।
জয়া সুধাকে বলল, —ঠিক আছে, আজ ফেরার সময় ডাক্তারবাবুকে খবর দিয়ে আসব।
সুধা চলে যাওয়ার পর জয়া আরেকবার ছবিতে মন বসানোর চেষ্টা করল। ঘণ্টা দেড়েক মগ্ন রইল রঙ তুলি ক্যানভাসে। স্টুডিও বন্ধ করে যখন নীচে নেমে এল তখন তার মন অনেক প্রফুল্ল। ছবিটার পূর্ণ চেহারা চোখের সামনে এসে গেছে, আজ রাতে কাজ করলেই শেষ হয়ে যাবে।
ঘরে এসে ঘড়ি দেখে জয়া চমকে উঠল। নটা চল্লিশ। এগারোটা থেকে ক্লাস আজ। তাড়াতাড়ি জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমের দিকে ছুটল,
সুধা আমার ভাত বেড়ে ফ্যাল। অনেক দেরি হয়ে গেছে।
স্নান সেরে, চিরুনি হাতে ভাই-এর ঘরে ঢুকল একবার। বিছানায় আধশোয়া হয়ে বাবলু খবরের কাগজ পড়ছে। হুইল চেয়ারটা একেবারে দরজার সামনে পড়ে। আস্তে করে খাটের দিকে সেটাকে ঠেলে দিল জয়া,
—কি রে, আজ ব্যথাটা কেমন?
বাবলু কাগজ থেকে চোখ ওঠাল না—ঠিক আছে।
—আজ ডক্টর কয়ালকে বলছি একবার এসে দেখে যাক।
—কি হবে দেখে? বাবলু গোমড়া মুখে খবরের কাগজের পাতা ওল্টালো, আরও কড়া কিছু পেইনকিলার দেবে এই তো।
জয়া কথা বাড়াল না। ভাই-এর মুখের প্রতিটি অভিব্যক্তি সে চেনে। বাবলু ভীষণভাবে চাইছে একবার ডাক্তারবাবু এসে তাকে দেখে যাক কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করবে না।
ডাইনিং টেবিলে যেতে গিয়েও কি মনে করে একবার বৃষ্টির ঘরেও ঢুকল।
সকালবেলার লণ্ডভণ্ড ঘরখানা ফাঁকা, শুনশান। চতুর্দিকের দেওয়াল জুড়ে বোবা যন্ত্রণার মত শুধুই অজস্র কালশিটে। একটাও রঙিন পোস্টার নেই। কোথ্থাও।
জয়া স্তব্ধ হয়ে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন